অনুসরণকারী

শনিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৩

খিল চতুর্থ পর্ব


 



খিল
সাথী দাস
চতুর্থ পর্ব




প্রাত্যহিক নিয়ম মেনে নাগের বাড়ির সংসারযাত্রা শুরু হয়েছে। কেবল নিয়ম বহির্ভূত মাধবীলতার গর্ভের কলঙ্ক ঐ আহ্লাদী। জাগতিক কোনও নিয়ম-নিষ্ঠা তাকে স্পর্শ করতে পারে না। মেয়েটা এতবড় বাড়ির কোন কোণে বসে এখন চোখের জল ফেলছে, কে জানে!
সংসার বড় নির্মম এক জায়গা। বুকের ভিতর মায়া আর স্নেহ বাতাসের অভাবে শ্বাসরোধ হয়ে মরে গেলেও, প্রকাশ্যে তার অস্তিত্ব জানান দেওয়া যায় না। কিন্তু গর্ভধারিণীর কাছ থেকে এমন প্রহার ও গালমন্দ যে কন্যার কতখানি বুকে বাজে, তা মাধবীলতা বেশ বোঝে। মাধবীলতাকেও এককালে অনেকে আড়ালে-আবডালে অপয়া বলত। ওর জন্মের পর মা শয্যা নিয়েছিল। কঠিন অসুখে মা গত হলে কয়েক বছর পর তার যাত্রাপথ নিঃশব্দে অনুসরণ করেছিল বাবা।
বিছানার এককোণে বসে নিজের অতীতের কথা ভাবছিল মাধবীলতা। শৈশবে বাপ-মা হারা মাধবীলতা নিজের ঠাকুমার অন্ধস্নেহ থেকে কখনো বঞ্চিত হয়নি। মাথার ওপর বাবা-মা ছিল না বলেই হয়তো অন্যান্য নাতি-নাতনিদের থেকে তার প্রতি ঠাকুমার স্নেহ ও প্রশ্রয় একটু বেশি ঝরে পড়ত। তখন মাধবীলতা সবেমাত্র ফ্রক ছেড়ে কাপড় পরতে শুরু করেছিল। নিজের বাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে সিংহদুয়ারের মধ্যে তার যত দৌরাত্ম্য বজায় ছিল। পরিবারের বাইরে সখী বলতে দু-একজন সমবয়সী সই। তাদের সঙ্গে মাধবীলতা যত প্রাণের কথা বলত।
হঠাৎ একদিন মাধবীলতা শুনল জ্যেঠুমণি তার প্রিয় বন্ধুর গৃহনির্মাণ উপলক্ষ্যে প্রতিদিন ভোরের প্রথম রেলগাড়িতে চেপে পাড়ি দেবে এক অচেনা গণ্ডগ্রামে। বন্ধু তার সমস্ত জীবনের উপার্জন ও সঞ্চয় নিঃসংকোচে পাঠাবে মাধবীলতার জ্যেঠুমণির কাছে। পূর্বে কিনে রাখা একটি জমিতে সেই অর্থ দিয়ে কয়েক মাসের পরিশ্রমে তিলে তিলে নির্মাণ করতে হবে দ্বিতল আবাস। নির্মাণকার্য দেখাশোনার সেই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল মাধবীলতার জ্যেঠুমণির ওপর। দৈনন্দিন রোজনামচায় অভ্যস্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে এমন একটি চমকপ্রদ সংবাদ কানে আসামাত্রই দ্রুতপায়ে সেই সংবাদ নিজের পরম প্রিয় দুই সইয়ের কানে ঘটা করে তুলে এসেছিল মাধবীলতা।
মাধবীলতার বাড়ি একেবারে শহরতলিতে। বাতাসে কলকারখানার ধোঁয়া ওড়া বিষাক্ত শহর না হলেও, এলাকাটাকে একপ্রকার মফঃস্বলে বলা চলে। যদিও আজ তার অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। জ্যেঠুমণি ও ঠাকুমা গত হওয়ার পর বারকয়েক ও বাড়িতে গেলেও শৈশবের আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা মাধবীলতা আর অনুভব করতে পারেনি। বাড়ির দেওয়ালগুলোও হয়ে গিয়েছিল অচেনা। তবে মাধবীলতার বিবাহপূর্বের দৃশ্য ছিল কিছুটা ভিন্ন।
পিচঢালা চওড়া রাস্তা দেখার জন্য মাধবীলতাকে কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করতে হতো না। জ্যেঠুমণির গ্রাম ভ্রমণকালে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা সমস্ত ভাইবোনদের একটাই কাজ ছিল। সন্ধের ট্রেনে জ্যেঠুমণি ফিরলে বাটিভর্তি মুড়ি মুড়কি বাতাসা খেতে খেতে তার মুখ থেকে গ্রামের গল্প শোনা। গল্প শুনতে শুনতে নিজের কল্পনায় মাধবীলতা কতবার পৌঁছে যেত সেই গ্রামে। মুগ্ধ হয়ে গল্প শোনার সময় প্রায়ই তার মনে হতো, গ্রামের সোনালী ধানের শীষ ছুঁয়ে কেমনভাবে সন্ধে নামে, কখনো দেখা হবে না। মাধবীলতার দু'চোখে থাকত অপার বিস্ময়। জ্যেঠুমণিকে অজস্র প্রশ্নে উত্যক্ত করে তুলত মাধবীলতা। জ্যেঠুমণিও মাধবীলতার আনন্দে উজ্জ্বল মুখটা দেখতে দেখতে ধৈর্য নিয়ে সকল প্রশ্নের উত্তর দিত। এমনভাবে একটি বসন্ত পেরিয়ে যাওয়ার পর প্রজাপতি ও ঋতুচক্রের যৌথ আশীর্বাদে একদিন একটি আশ্চর্য ঘটনার সম্মুখীন হল মাধবীলতার জ্যেঠুমণি।
বৈশাখের তীব্র দাবদাহে মাধবীলতার ক্লান্ত জ্যেঠুমণি এক-আধদিন নাগের বাড়ির পাশে অস্থায়ী শিবমন্দিরের বাইরের সিঁড়িতে আশ্রয় নিত। গ্রীষ্মকালে অস্বস্তিকর গরমের পাশাপাশি আকাশ ভেঙে আকস্মিক কালবৈশাখীর তান্ডব ছিল নিত্যসঙ্গী। একদিন কালবৈশাখী ঝড়ের প্রকোপে পড়ে ধুলোর বলয়ে ঢেকে গেল গোটা গ্রাম। মিস্ত্রী-মজুররা দুপুর থাকতেই হাতের কাজ ফেলে নিশ্চিন্ত স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। হাতঘড়ির দিকে চেয়ে মাধবীলতার জ্যেঠুমণি দেখল, তখনো বাড়ি ফেরার গাড়ির সময় হয়নি। ছাতা খুলে মন্দিরের সিঁড়িতে আশ্রয় নেওয়ার অভিপ্রায়ে সেদিকে এগোতেই এক ভদ্রলোক ডেকে উঠেছিল,
-ও বড়দাদা, বলি রোজ এভাবে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ান, মন্দিরের চাতালে বসে থাকেন, পাশে এই যে নাগের বাড়ি রয়েছে, চোখে পড়ে না? গেরস্ত ঘর, চারটি মুড়ি বাতাসা জল খেতে চাইলে, কেউ কি আপনাকে অভুক্ত ফিরিয়ে দেবে নাকি মশাই?
-আজ্ঞে সকালের খাবার তো ঝোলায় পুঁটুলি বেঁধে সঙ্গে নিয়েই আসি। গিন্নি রাত থাকতে উঠে রেঁধে বেড়ে দেয়। দুপুরে দুটো শুকনো মুড়ি চিঁড়ে চিবিয়ে দিব্যি কেটে যায়। আসলে এই গ্রাম আমার কাছে একেবারে অচেনা তো.... হঠাৎ আপর-দুপুরে গেরস্ত বাড়িতে গিয়ে পড়লে বাড়ির মেয়েমানুষরা বিব্রত হতে পারে। তখন তাদের বিশ্রামের সময়...
-আমাদের বাড়ির সম্পর্কে আপনি কিচ্ছুটি জানেন না মশাই। রেলস্টেশনে নেমে একটিবার বলবেন, নাগের বাড়ি যাব। অন্ধ মানুষও আপনাকে পথ দেখিয়ে আমার বাড়ির উঠোনে পৌঁছে দিয়ে যাবে। আর আমার গিন্নি? সে তো লোকজনকে পাত পেড়ে খাওয়াতে পারলে আর কিচ্ছুটি চায় না। সারাদিন আমার হেঁশেলে আগুন জ্বলছে, হাঁড়ি-কড়াই চড়ছে। আমার গিন্নিই তো আজ আমাকে ঠেলে পাঠালে মশাই। বলে বাড়ির বাইরে মানুষটাকে রোজ দেখি, কোনোদিন এসে এক গেলাস জল চেয়ে খেলো না! এত ঝড় বাদল, মানুষটা বাইরে কোথায় ঘুরবে? তুমি ওকে বাড়ির দাবায় এসে বসতে বলো। আমি চায়ের জল চাপিয়ে দিই।
চায়ের আসরে উষ্ণ পানীয়র অজুহাতে আলাপ পরিচয় বাড়ে। ধীরে ধীরে নাগ পরিবারের সঙ্গে মাধবীলতার জ্যেঠুমণির অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি পায়। তারপর একদিন আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় নাগের বাড়িতে মাধবীলতার জ্যেঠুমণির যাতায়াত। নাগ বাড়ির বড় গৃহকর্তা তার সংবাদ নিতে এলে সে গলবস্ত্র হয়ে জোড়হাতে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণার মতো গৃহকর্ত্রীর সামনে বলে বসে, "আপনার মতো লক্ষ্মীমন্ত মানুষের দেখা আমি আর দুটি পাইনি। একজন অচেনা মানুষকে ঘরে ডেকে এনে আপনি তিনবেলা তার ভরপেট আহারের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এই অন্নের ঋণ দিন-দিন বেড়েই চলেছে ঠাকরুন। আমি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। বাজারে চারটি দোকান আছে। তাতে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মচারী কাজ করে। আপনাদের বাড়ি যেমন বড়, মন তার চেয়েও বড়। এত বড় মনের মানুষের এত ঋণ আমি শোধ করতে পারব না। কোনও সম্পর্ক ছাড়া রোজ এভাবে পাত পেড়ে খেতে আমার বিবেকে বাধে বৌদিদি। যদি আমাকে দুটো ভাত খাওয়াতেই হয়, তবে আমার ভাইয়ের একটি বিবাহযোগ্যা কন্যা আছে। আমার ভাই আর তার বৌ মারা গেছে বহুকাল আগে। বাপ-মা মরা অসহায় মেয়েটার আমিই বাপ, আমিই মা। ঐ মেয়ের অন্ন বস্ত্র বাসস্থান ভবিষ্যৎ আর সুখের দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে মা জননী। তবেই আমি নিশ্চিন্ত হয়ে আমার মেয়ের বাড়িতে এসে তিনবেলা পেট পুরে খেয়ে যাব। কত্তা আপনার ছোট ছেলেটিকে আমার বড় পছন্দ হয়েছে। তার সঙ্গে আমাদের মাধুর বিয়ের প্রস্তাব রাখছি। আপনারা একটিবার আমার মাধুকে দেখে আসবেন চলুন। এতদিন তো খেলাম আপনাদের বাড়ি। এবার আপনারা যদি একবার এই গরিবের ভিটেতে পায়ের ধুলো দেন.... অর্থে আমি আপনাদের সমান না হলেও কথা দিচ্ছি, আপ্যায়নে বিন্দুমাত্র ত্রুটি রাখব না। চাঁদের আলোর মতো রূপ আপনার ছেলের। গুরুজনকে কত ভক্তি শ্রদ্ধা করে, কত মান দিয়ে কথা বলে। এমনটা তো আজকাল দেখাই যায় না। বৌদিদির শিক্ষা ঐ ছেলের মধ্যে আছে। আমার মাধু এখানে খুব ভালো থাকবে। বৌদিদি আর ছোট ছেলেটিকে নিয়ে একটিবার এই গরিবের ঘরে আসুন কত্তা। আপনাদের যাতায়াতের সমস্ত ব্যবস্থা আমি নিজে করব..."
এই ঘটনার কিছুদিন পর মাধবীলতা হঠাৎ আবিষ্কার করেছিল, ঘরের ভিতরে ডাক ছেড়ে কাঁদছে তার ঠাকুমা। দেওয়ালে মাথা ঠুকে হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে সে চিৎকার করে বলেছিল, "নিজের মেয়ে তো নয়। তাই মেয়েটাকে এমন জলে জঙ্গলে ফেলে দিতে চাইছে। নিজের মেয়ে হলে পারত বাড়ির কারও সঙ্গে কোনও যুক্তি-বুদ্ধি না করে অমন জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ভূতের বাড়িতে মাধুর সম্বন্ধ করে একেবারে পাকাকথা বলে আসতে? আমরা ছেলে দেখলাম না, ছেলের বাড়িঘর দেখলাম না, তারা মেয়ে দেখল না, শুধু একজনের ওপর ভরসা রেখে একেবারে পাকাকথা? বাপ-মা মরা আমার নাতনিটাকে একেবারে জলে ফেলে দিচ্ছে গো.... মেয়েটা তিনবেলা চারটি ভাত খায় বলে তোর ঘরের অন্ন ফুরিয়ে যাচ্ছে নাকি রে? কাল থেকে আমি না খেয়ে ওকে খাওয়াব বাপ! কিন্তু এমন জঙ্গলে মাধুর বিয়ে দিস না। এতদূরের পথ! গ্রাম-গঞ্জ, জলা জমি! মশার কামড়ে জ্বরজ্বালা হয়ে মরে গেলে আমি একটিবার মেয়েটাকে চক্ষের দেখাও দেখতে পাব না বাপ আমার..."
ঠাকুমার কান্না শুনে সেদিন খুব অবাক হয়েছিল মাধবীলতা। ভয়ে ঘরের এককোণে বসেছিল। উঠোনের মাঝে দাঁড়িয়ে কোমরে গামছা বেঁধে হাতে নিমের দাঁতন নিয়ে শুরু হয়েছিল জ্যেঠুমণির আস্ফালন। গলা ছেড়ে চিৎকার করে সে বলেছিল, "জলে ফেলে দিচ্ছি? তোমার নাতনিকে আমি জলে ফেলে দিচ্ছি? মা এতবড় কথাটা তুমি বললে আমাকে? মাধু কি আমারও মেয়ে নয়? নিজের বাপ-মাকে ও কতটুকু পেয়েছে? আমার কোলেই তো বড় হল। নেহাৎ আমার চার ছেলে, একটা মেয়ে থাকলে আমি নিজের মেয়ের সম্বন্ধ ওখানেই করে আসতাম! নাগের বাড়ির সম্পত্তির হিসেব তুমি জানো? তারা সাত ভাই। যৌথ পরিবার, যৌথ সম্পত্তি। সর্বমোট আশি বিঘে জমি ছিল, দেখাশোনার লোকের অভাবে গোপনে কত জমি বেচে দিয়েছে। তাও এখনো যা সম্পত্তি আছে, সেই সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা হলেও এক-একজনের ভাগে কত জমি থাকবে বুঝতে পারছ? আমাকে মাধুর খাওয়ার খোঁটা দিচ্ছ তুমি? এমন বাড়িতে তোমার নাতনির বিয়ে দিচ্ছি, ও বাড়িতে যা আছে, সাত পুরুষ বসে খেলেও শেষ হবে না। তাদের চাষ-আবাদ, বাড়িঘর, মেয়ে-বৌদের গা ভর্তি শাড়ি-গয়না, রান্না-খাওয়ার বহর দেখলে রাজার রাজত্বও লজ্জা পাবে। শুধু কী তাই? বৌদিদির কী অমায়িক ব্যবহার! আজ তুমি আমাকে এতবড় কথাটা বললে তো? মাধু বছরখানেক নাগের বাড়িতে থেকে ঘর করে আসুক। মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে এই তুমিই সেদিন বলবে, হ্যাঁ হাতে ধরে আমার ব্যাটা একটা বিয়ে দিয়েছিল সত্যি! আমাদের বংশের সেরা জামাই হয়েছে! মাধুর কপাল সোনা দিয়ে বাঁধানো বটে! যেমন ঘর, তেমন হিরের টুকরো বর!"
মানুষ চিনতে নেহাৎ ভুল করেনি মাধবীলতার জ্যেঠুমণি। বৌভাতের রাতে মেয়ের বাড়িতে পাত পেড়ে রাজকীয় নৈশভোজ সেরে ফিরে আসার আগে মাধবীলতার শ্বশুরমশাইয়ের হাত ধরে সে অনুনয়ের সুরে বলে এসেছিল, "মেয়ে আমার ছোট পরিবারে ছোট উঠোনে রান্নাবাটি খেলে মানুষ হয়েছে। এতবড় ঘর, এতবড় পরিবারে ও অভ্যস্ত নয় কর্তা। আমাদের মেয়ে সংসার সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না, বোঝে না। কাজকর্মও খুব বেশি পারে না। কিছু ভুকচুক করলে নিজের মেয়ে মনে করে খানিক বকে দেবেন, তবুও একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবেন।"
মৃদু হেসেছিল মাধবীলতার শ্বশুরমশাই। তবে মাধবীলতার শাশুড়ি এগিয়ে এসে বলেছিল, "এই যে আপনি আজ কথাটা বলে গেলেন আপনাদের মেয়ে কিছু জানে না, কিছু পারে না, বোঝে না.... এটা কেবল আপনি জানেন। আর আমরা এই দুটো মানুষ সদ্য জানলাম। আজকের পর আর কেউ কোনোদিনই জানবে না, যে নাগের বাড়ির বৌ কিছু জানে না, কিছু পারে না। দায়িত্ব নিয়ে আমি আপনাকে এই কথা দিলাম... আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।"
একবুক সুখ সঙ্গে নিয়ে কন্যাদায় থেকে মুক্তিলাভ করে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল মাধবীলতার জ্যেঠুমণি। কিন্তু ভয় বাসা বেঁধেছিল নববধূর বুকের গোপনে। একেবারে ছাদনাতলায় গিয়ে প্রথম দেখা হয়েছিল সেই মানুষটার সঙ্গে। নিয়মরক্ষার খাতিরে শুভদৃষ্টির সময় লাল চেলি, স্বর্ণালংকার আর ফুলের গয়নার ফাঁক দিয়ে একবার মাত্র তার দিকে চেয়েছিল মাধবীলতা। তারপর লজ্জায় আর মাথা তুলতে পারেনি। সেই মানুষটা একটু পর পুষ্পশোভিত ঘরে আসবে। অচেনা ঘর, পুষ্পবেষ্টিত অনভ্যস্ত শয্যা, অজানা আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অপরিচিত একটা মানুষের সঙ্গে মাধবীলতা একা...
জানলা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে মাধবীলতা ভাবছিল তার প্রথম স্পর্শের কথা! শাড়ি গয়না আর ঘোমটায় ঢেকে তাকে বিছানার এককোণে সকলে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। ভয়ে মাধবীলতার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। সে ঘরে এসেছিল। আগল তুলে শয্যার অপর প্রান্তে দীর্ঘক্ষণ বসেছিল। অতর্কিতে মাধবীলতার ঘোমটা সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, "তোমার তো দেখছি ভারি দেমাক! ঘরের মধ্যে এসেছি, তবুও আমার সঙ্গে একটাও কথা বলার প্রয়োজন মনে করো না!"
মাধবীলতা স্বল্প জীবনে যত শব্দ শিখেছিল, তার কাছে বকা খেয়ে সেদিন ভুলে গিয়েছিল সমস্তই। সে বজ্রের মতো কঠিন স্বরে বলেছিল, "বড়দের প্রণাম করতে হয়, তা কি জানোনা? দাদু তোমার কুষ্ঠি দেখেছে। আমি তোমার থেকে পাক্কা আট বছর একুশ দিন এগারো ঘন্টা একত্রিশ সেকেন্ড আগে জন্মেছি। তুমি কি সেই খবর রাখো? আমার সম্পর্কে কিছুই তো জানো না দেখছি। এই অপরাধে তোমাকে কালই তোমার জ্যেঠুর বাড়ি ফেরত পাঠানো হবে।"
ফুঁপিয়ে কেঁদে পালঙ্ক থেকে নেমে স্বামীর পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মাধবীলতা। কেঁদে বলেছিল, "জ্যেঠুমণি অনেক কষ্ট করে আমার বিয়ে দিয়েছে। আমি এই বাড়ির এককোণে থেকে যাব। মাটিতে শুয়ে থাকব। যেখানে বলবেন, যেভাবে বলবেন, সেখানে সেভাবেই থাকব। দয়া করে আমাকে ফেরত পাঠাবেন না। জ্যেঠুমণি সহ্য করতে পারবে না।"
তড়িঘড়ি নিজের পায়ের ওপর থেকে শাড়ি গয়নার ভারে কুন্ডলী পাকানো ভীত প্রাণীটাকে টেনে তুলেছিল সে। মাধবীলতা তখন আকুল হয়ে কাঁদছিল। চন্দনের নকশা কাটা সাজ বুঝি নষ্ট হয়েছিল চোখের জলে। সিঁদুর গিয়েছিল ঘেঁটে। ফুলের গয়না আলগা হয়েছিল। কিন্তু তবুও সে লণ্ঠনের মৃদু আলোয় মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়েছিল মাধবীলতার ঢলঢলে মুখটার দিকে। হঠাৎ একহাতে মাধবীলতার ছোট্ট দেহটা ঘিরে ধরে অপর হাতে মাধবীলতার গাল স্পর্শ করে সে বলে উঠেছিল, "এই তো আমার লাল টুকটুকে বৌ কথা বলতে পারে। তবে তুমি বোবা নও! আমি ভাবলাম, সবার সঙ্গে কথা বলে। শুধু আমার সামনে এলেই বৌ বোবা হয়ে যায় কেন? যাক! সব ঠিক আছে। পরশু রাত থেকে কতবার চেয়েছিলাম তোমার দিকে। একবারও আমাকে দেখোনি তুমি! কেন? আমাকে পছন্দ হয়নি? সত্যি বলো মাধু। একটুও পছন্দ হয়নি?"
তার বজ্রকঠিন কণ্ঠের এমনতর আকস্মিক পরিবর্তনে মরমে মরেছিল মাধবীলতা। তার হাত থেকে মুক্তির জন্য উদগ্রীব হয়েছিল। কোনোক্রমে বাহুবন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে শয্যার এককোণে আত্মগোপন করেছিল সে। নবদম্পতির মধ্যে সারারাত নানাপ্রকার হাস্যকৌতুকের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে খানিক সন্ধিস্থাপন হলেও, প্রথম রাতে সে জোর করে কাছে আসার চেষ্টা করেনি। হয়তো নবদাম্পত্যের সুমিষ্ট ঘ্রাণটুকু সে মুগ্ধতা আর বিহ্বলতায় বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তার হাতের ওপর মাথা রেখে সেই রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল মাধবীলতা। পরদিন ভোরবেলা ঘুমের মধ্যেই নিজের আলতা পরা পায়ে মাধবীলতা মৃদু সুড়সুড়ি অনুভব করে। পা-টা কুঁকড়ে শাড়ির পাড়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেও তার খুনসুটি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়নি। প্রথমে একবার সুড়সুড়ি, তারপর একাধিকবার। সেই ছিল প্রথম গভীর স্পর্শ। সবশেষে সে চেপে ধরেছিল মাধবীলতার আলতা রাঙা দুটি চরণ। নববধূর নূপুর উঠেছিল ঝমঝমিয়ে। ঘুম ভেঙে একলাফে উঠে বসেছিল মাধবীলতা। শাড়ির আঁচল সামলে চোখ মেলে দেখেছিল ঘরের ভিতর কেউ নেই। কেবল বাসি বিছানার ওপর নববধূর আলতা রাঙা পায়ের কাছে গুটিকয়েক টাটকা রক্তগোলাপ পড়ে রয়েছে, সঙ্গে একটি ভাঁজ করা কাগজ।
যে পুরুষ প্রথম রাতে ধমকে-চমকে চোখ রাঙিয়ে হাপুস নয়নে কাঁদিয়ে প্রণাম আদায় করে, রাত্রিশেষের প্রথম প্রভাতে সেই পুরুষই নতমস্তকে বধূর চরণ স্পর্শ করে! ভাঁজ করা কাগজটা খুলে মাধবীলতা দেখল তাতে লেখা রয়েছে, "নিজের মানুষকে আপনি সম্বোধনে দূরে সরিয়ে রাখতে নেই। শিবঠাকুর পাপ দেয়।"
যারপরনাই বিহ্বল হয়ে গোলাপ ফুলের ঝরে যাওয়া কয়েকটি পাপড়ি হাতের মুঠোয় নিয়ে মাধবীলতা নাক ডুবিয়েছিল অপার্থিব সুগন্ধে। সেই ছিল প্রথম প্রণয়ের সূত্রপাত...
নবদাম্পত্যের আড় ভেঙে প্রিয় পুরুষের কাছে সহজ হয়ে নিজেকে উন্মুক্ত করতে মাধবীলতার বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। কিন্তু সুখস্বপ্নের মতো সেই স্পর্শকাতর ও স্মৃতিবিজড়িত রাতের পর অপেক্ষা হয়েছিল মাধবীলতার নিত্যসঙ্গী। দিনের সমস্ত সময় কেবল দৃষ্টিবিনিময় হতো তার সঙ্গে। আর মনের ভিতরে গোপনে লালিত হতো রাতে ঘরের দরজায় খিল তোলার অপেক্ষা। মৃগাঙ্ক গর্ভে আসার আগে তার সঙ্গে একান্তে কাটানো সুন্দর দিনগুলোর স্মৃতি আজও মাধবীলতার স্মৃতিতে অমলিন। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারে সকলের মধ্যে থেকে প্রকাশ্যে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো কিংবা তাকে স্পর্শ করার মতো দুঃসাহস মাধবীলতার কোনোকালেই ছিল না। তার জন্য ছিল গোপন অবসর, আগলের আড়ালে নির্দিষ্ট পরিসরের নিশ্চিন্ত আড়াল। মাধবীলতার মতো একজন সংযত নারীর গর্ভের সন্তান হয়ে শুধুমাত্র পুরুষসঙ্গ লাভের তাগিদে আহ্লাদী এমন সর্বনাশী হয়ে ওঠে কোন লজ্জায়!
মাধবীলতা আর ভাবতে পারে না। নিধি জলখাবার রেখে গেছে। কিন্তু মাধবীলতা অভুক্ত অবস্থায় বসে একনাগাড়ে চোখের জল ফেলে চলেছে। হঠাৎ ঘরের বাইরে থেকে লতা হাঁক দেয়,
-ও বড়মা, করো কী? চক্কোত্তিদের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় চাঁপার সঙ্গে দেখা হল। তুমি নাকি তাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছ, আমার সঙ্গে তোমার কথা আছে। তা সকালেই তো এলাম বাপু। তখন তো কিছু বললে না। এখন ঝটপট বলো দেখি। ঘরে গিয়ে আমার মেলা কাজ আছে। বেলা তো আর কম হল না...
মাধবীলতা নীরবে কেঁদে ভাসাল। লতা ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে মাধবীলতার পায়ের কাছে পিঁড়ি পেতে বসে বলল,
-ও বড়মা, কাঁদো কেন? কী হয়েছে? বড় বৌ আবার খারাপ কথা বলেছে?
-সে তো দিনরাতই উঠতে-বসতে বলছে। চামড়ার মুখ আছে, বলতে পারলেই হল। ও আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু আজ...
-কী হয়েছে আজ?
লতার দুটো হাত চেপে ধরে মাধবীলতা আকুল হয়ে বলল,
-কাজের জন্য তুই সাত পাড়া ঘুরে বেড়াস লতা! কত মানুষের সঙ্গে তোর ওঠাবসা। গত বছর মল্লিক বাড়ির মেজ মেয়েটার কত ভালো ঘরে সম্বন্ধ করে দিলি। আমি তোকে ঘটকালি বাবদ এক টুকরো জমি দেব। তুই আমার আহ্লাদীর জন্য একটা ছেলে খুঁজে দে। ওর বিয়েটা দিতেই হবে। নইলে ও বারমুখী মেয়েকে ঘরে আটকানো যাবে না।
বিস্ফারিত দৃষ্টিতে মাধবীলতার দিকে চেয়ে লতা হাত ছাড়িয়ে নিল। ভীত কণ্ঠে বলল,
-কী বলছ বড়মা!! সব জেনেশুনে ঐ মেয়ের বিয়ের ঘটকালি করব আমি? তারপর কিছু হলে ছেলের বাড়ির লোক আমাকে ছেড়ে কথা বলবে? আর কিছু মনে ক'রো না.... আহ্লাদীর যা কেচ্ছা, জেনেশুনে ঐ মেয়েকে কে বিয়ে করবে বলো?
-দূর থেকে কোনও সম্বন্ধ নিয়ে আয়। যারা তেমন কিছু জানবে না। তুই আমাকে উদ্ধার কর লতা। এই মেয়ের বিয়ে না দিয়ে আমি শান্তিতে চোখ বুজতে পারব না। বড় বৌ ওকে ছিঁড়ে খাবে। আমি বেঁচে থাকতেই এই, চোখ বুজলে তো.... কোনও শত্তুরও আমার মেয়ের রূপ নিয়ে কুকথা বলতে পারবে না। শাড়ি আর গয়না দিয়ে আমি আহ্লাদীর মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ঢেকে দেব। যে ছেলে ওকে বিয়ে করবে, তাকে জমি-জায়গা লিখে দেব। ছেলের বিষয়-সম্পত্তি, বাড়িঘর, টাকাপয়সা, চাকরি-বাকরি কিচ্ছু চাই না। সব আমি দেব। শুধু ছেলেটা যেন একটু ভালো হয়!
মৃদু হাসল লতা। ঘামে ভেজা কাপড়ের আঁচলটা কোমর থেকে খুলে মুখের ঘাম মুছে মৃদু হেসে বলল,
-সম্বন্ধ সবসময় সমানে সমানে হওয়া ভালো বুঝলে! ভালো ছেলে একটা ভালো মেয়েই চাইবে বড়মা। সে তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে আসবে কেন? তোমার অনেক টাকা আছে। কিন্তু সত্যি কথা কী জানো? তোমার মেয়ে তো আর বোবা কালা খোঁড়া নয়, যে টাকায় শরীরের খুঁত ঢেকে যাবে। টাকা দিয়ে মানুষের দেহের খুঁত ঢাকা যায়, কিন্তু চরিত্রের খুঁত? তোমার মেয়ের যা চরিত্র, বিয়ের পরেও যে সে এমনধারা কাজ.... ঠিক আছে। এত করে বলছ যখন, তোমার মুখ চেয়ে আমি দেখব, যদি কিছু করা যায়.... এখন চললাম গো। বেলা অনেক হল। কিছু খবর থাকলে তোমাকে জানাব।
চোখের জল চোখে চেপে থমথমে মুখে ঘরের ভিতরে একা বসে রইল মাধবীলতা। চরিত্র সংশোধনের কোনও জাদুকরী পন্থা যদি তার জানা থাকত, হয়তো এক মুহূর্তে বদলে দিতে পারত কন্যার জীবন। কিন্তু যে নারী একবার গোপন সুখের স্বাদ পেয়ে আদ্যোপান্ত পুরুষ খাদক হয়ে উঠেছে, তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করে এক পুরুষের ঘরমুখী করা কি সত্যিই সম্ভব? দুশ্চিন্তায় জর্জরিত হয়ে মাধবীলতা আবারও চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

খিল তৃতীয় পর্ব


 


খিল
সাথী দাস
তৃতীয় পর্ব




নাগ পরিবারের সর্বকনিষ্ঠা কন্যার নাম আহ্লাদী। মৃগাঙ্কর বিবাহের বেশ কয়েক বছর পূর্বে মাধবীলতার অজান্তে তার গর্ভে আশ্রয় নিয়েছিল এই কন্যাভ্রূণ। নারীদেহ থেকে ঋতুচক্র বিদায়গ্রহণের প্রাক্কালে যে স্বাভাবিক পরিবর্তন ও অনিয়ম শুরু হয়, সেই অনিয়মের মধ্যে নিদারুণ অসাবধানতায় ঘটে গিয়েছিল সেই অঘটন। নিজের ও স্বামীর মান-সম্মান রক্ষার্থে সকলের অলক্ষ্যে তাকে গর্ভ থেকে দূর করতে চেয়েছিল মাধবীলতা। কিন্তু অত্যধিক বয়সে গর্ভধারণের জন্য ও নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার কারণে সেই সময় ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভপাত সম্ভব হয়নি। মাধবীলতার পড়ন্ত যৌবনে এমন একটি সংবাদ বিবাহযোগ্য মৃগাঙ্কর কাছে অত্যন্ত বিরক্তির কারণ হয়েছিল। দীর্ঘদিন মায়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছিল সে। শশাঙ্ক ভাবলেশহীন। এই পৃথিবীতে কারও জীবনের কোনোপ্রকার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার মতো মানসিক দৃঢ়তা ঈশ্বর তাকে প্রদান করেননি। মেধাবী অঙ্কন পড়াশোনার কারণে বহুদিন আগে বাড়ির চৌকাঠ অতিক্রম করে চলে গেছে হোস্টেলে। সে বাড়ি ফেরে অতিথির মতো। নিজস্ব মতপ্রকাশের কোনও প্রয়োজনবোধ সে করে না। তিন পুত্রসন্তানের পর একটি কন্যাসন্তান চূর্ণী। পুরুষসর্বস্ব সংসারে তার মতামতের ভূমিকা নিতান্তই নগণ্য। সুতরাং অজস্র মানসিক টানাপোড়েন অতিক্রম করে মৃত্যুর দরজায় পা রেখে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বে এই কন্যার জন্ম দিয়েছিল মাধবীলতা।
বিনা আমন্ত্রণে পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া মেয়েটির পরিবার প্রদত্ত প্রকৃত নাম আজ আর কেউ মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে সে আহ্লাদী নামে পরিচিত। শূন্য বিছানা দেখে মাধবীলতার বুক ভয়ে কেঁপে উঠল।
স্বামী অমৃতলোকে পাড়ি দেওয়ার পর মাধবীলতা আহ্লাদীকে বুকে করে মানুষ করেছে। মৃগাঙ্ক তাকে জন্মের পর থেকে একেবারেই পছন্দ করে না, এ সংবাদ মাধবীলতার অজানা নয়। সর্বোপরি যখন একটি শিশুকন্যার উপস্থিতির কারণে মৃগাঙ্কর জন্য আসা একের পর এক সম্বন্ধ ভেঙে যেতে শুরু করল, তখন মাধবীলতার সঙ্গে সামান্যতম কথাবার্তাও বন্ধ করে দিয়েছিল সে। বেশ কিছু বিবাহযোগ্যা সুন্দরী পাত্রীর পরিবার থেকে তুমুল আপত্তির পর তৃণা এ বাড়িতে বধূরূপে প্রবেশ করে। তৃণার বাড়ি থেকে প্রথমে মৃদু আপত্তি জানালেও, পরবর্তীতে নাগ পরিবারের আভিজাত্য ও রাজ ঐশ্বর্যর কাছে মাথা নত করেছিল কন্যাপক্ষ। এছাড়া চাকুরিজীবি পাত্র মৃগাঙ্ককে তারা হাতছাড়া করতে চায়নি। তবে মৃগাঙ্কর কাছে পূর্বেই তৃণা নিজের চাহিদা প্রকাশ করে ঘোরতর আপত্তি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল। বিবাহ পরবর্তী জীবনে নিজের গর্ভধারণের মতো সুন্দর মুহূর্তে সে মাধবীলতার গর্ভের অনাকাঙ্খিত জঞ্জালের দায়িত্ব কিছুতেই নিতে পারবে না। বিবাহের বহু পূর্ব থেকেই তৃণার প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে মৃগাঙ্ক। এক্ষেত্রে আহ্লাদীর ওপর বিরক্তির কারণে মৃগাঙ্ক সহজেই এই প্রস্তাবে সম্মত হয়। বড়দা ও বড় বৌদির চক্ষুশূল হয়ে খেলা করতে করতে আহ্লাদী খানিক অনাদরেই বেড়ে উঠেছে নাগের বাড়ির উঠোনের এক কোণে।
মেয়েকে বাড়ির ভিতর কোথাও খুঁজে না পেয়ে ভয়ে মাধবীলতার পা কাঁপতে শুরু করল। সেদিনও এমনই এক সকাল ছিল। আগের দিন রাতে হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে নিরুদ্দেশ হয়েছিল আহ্লাদী। এই মেয়ের ওপর মাধবীলতা ভরসা রাখতে পারে না। পাশাপাশি নিজের বড় ছেলে যে অত্যন্ত রগচটা ও বদমেজাজি, সেই সংবাদ মাধবীলতা বিলক্ষণ জানে। জ্বলন্ত অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিতে হাঁড়ির সঙ্গে সরার ন্যায় তৃণাও সিদ্ধহস্ত। মাধবীলতার যত জোর মেজ ছেলে এবং মেজ বৌমার ওপর চললেও, বড় ছেলে ও বড় বৌকে অত্যন্ত সমীহ করে চলে সে। নিতান্তই ভয়ে এই ভক্তির প্রকাশ, তা মাধবীলতা নিজেও অস্বীকার করতে পারে না।
এই বাড়িতে আহ্লাদীর মাত্র একজনই শুভাকাঙ্খী আছে। নিজের ঘর ছেড়ে ধীর পায়ে তার ঘরের দিকে পা বাড়াল মাধবীলতা। টুয়া সুর করে পড়া মুখস্ত করছিল। হঠাৎ ঠামকে নিজেদের ঘরের সামনে দেখে পড়া বন্ধ করে সে দরজার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। ঘরের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে ভিজে চুল আঁচড়ে সমান করছিল শশাঙ্ক। দোকানে যাওয়ার আগে একবার মাঠে ঘুরে যেতে হবে। মাধবীলতাকে দেখে চিরুনি ফেলে ছুটে এসে শশাঙ্ক বলল,
-মা বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন? ভিতরে এসো।
শশাঙ্ক মায়ের হাত ধরে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করল। কিন্তু মেজ ছেলের এমন আন্তরিক আপ্যায়নের পরও চাপা স্বরে কেঁদে উঠল মাধবীলতা। হতবাক শশাঙ্ক জিজ্ঞাসা করল,
-তুমি কাঁদছ কেন মা?
-চুপ চুপ! আস্তে! বড় খোকা শুনে ফেলবে। দেওয়ালেরও কান আছে।
-কী হয়েছে? দাদা কী শুনবে?
-আহ্লাদী ঘরে নেই রে শশী!
-কী বলছ মা! তবে কী আবার...
-লতা কিভাবে ভিতরে ঢুকল সকালে খেয়ালই করিনি শশী। তখন ওর সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত ছিলাম। ভাবলাম, মেজ বৌমা ভোরে উঠে বোধহয় সদর দরজার খিল খুলেছে। তাই লতা উঠোনে আসতে পেরেছে। দেওয়াল তোলা বাড়ি। ভিতর থেকে দরজা না খুললে গিরিলের আগল ভেঙে তো কেউ ঢুকতে পারবে না। এখন বুঝতে পারছি আমার ঘরের, সদর দরজার, সব খিল খুলে আহ্লাদী বেরিয়ে গেছে। এখন ভোরে বেরিয়েছে নাকি রাত থাকতেই.... ও মা গো! এই মেয়েকে আমি কী করে আটকাব শশী? তোর দাদা জানতে পারলে কী হবে রে? একটু বাইরে বেরিয়ে দেখবি বাবা? দাদাকে কিছু জানাস না। ও এক্ষুণি আপিসে বেরোবে। ভালোয় ভালোয় বেরিয়ে যাক।
-আমি দেখছি মা। নিধি আমাকে খেতে ডাকলে বলবে মাঠে কাজ ছিল, তাই হঠাৎ বেড়িয়ে গেছি। আর কিছু ভেঙে বলার দরকার নেই। ঘরে ফিরে কথা হবে...
ঘর থেকে মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে পড়ল শশাঙ্ক।
আজ সাইকেল নিয়ে আহ্লাদী বেরোয়নি। বেরোনো সম্ভব হয়নি। অন্ধকার থাকতেই ঘর ছেড়ে সে পালিয়ে এসেছে ভালোবাসার টানে। অশ্বত্থ গাছের পাশের জমাট অন্ধকার ভোরের ছোঁয়ায় ক্রমে ফিকে হয়ে আসছিল। সাইকেলটা গাছের পাশে রেখে বেরিয়ে এসেছিল সেই পুরুষ। তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আহ্লাদী। শিরা ওঠা সমর্থ হাতে সেই পুরুষ স্পর্শ করেছিল আহ্লাদীর দেহ। উত্তেজনার তীব্রতায় গাঢ় হয়েছিল আহ্লাদীর কন্ঠ। ও অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞাসা করেছিল,
-তোমার বাড়ির লোক আমাকে মানবে তো?
-না মানলে তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব। লোহার মতো শরীর আমার। খেটে খাব। পারবে না আমার সঙ্গে ঘর ছাড়তে?
-খুব পারব! কিন্তু তোমার কোনোদিন মনে হবে না তো, আমাকে বিয়ে করে তুমি ভুল করেছ!
-এ কথা কেন বলছ?
-সবই তো জানো! প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়া, বাড়ির বাইরে রাত কাটিয়ে আসা ঘরছাড়া মেয়েকে কেউ জেনেশুনে ঘরে তুলতে চায়? কেউ চাইবে না। কিন্তু তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও কেন?
কোনও উত্তর দিল না সেই পুরুষ। কিন্তু তার দৃষ্টির গোপন অর্থ আহ্লাদী বিলক্ষণ বোঝে। এই দৃষ্টি সে প্রথম দেখেছিল হারু কাকার চোখে।
চিরচেনা একজন মানুষ হারু কাকা। যার কোলে-পিঠে-কাঁধে চেপে আহ্লাদী ঘুরে বেরিয়েছে নিজেদের চাষের জমিতে, মাঠে-ঘাটে, পুকুর পাড়ে, মাছের আড়তে.... সেই মানুষটা যেদিন ওর হাত ধরে খড়ের গাদার পিছনের অন্ধকারে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সেদিন প্রথমে ভয়ে আঁতকে উঠে আহ্লাদী প্রায় কেঁদে ফেলেছিল। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালের গরুগুলো এই আকস্মিক অনভিপ্রেত মুহূর্তের সাক্ষী হতে চায়নি। তারা দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে চাইছিল। সেদিন আহ্লাদীর অসহায়তার সাক্ষী ছিল হারু কাকা নিজে। পাহাড়ের মতো একজন পুরুষ চেপে বসেছিল আহ্লাদীর কুসুম কোমল দেহের উপরে। কিন্তু নিজের আসুরিক শক্তি সে আহ্লাদীর কমনীয় দেহের ওপর প্রয়োগ করেনি। দৈহিক অত্যাচারের পরিবর্তে আহ্লাদীকে উপহার দিতে চেয়েছিল অপার সুখানুভূতি। বালিকার প্রাথমিক অসহায়তাকে নারীর অবাক বিস্ময়ে পরিণত করার গোপন মন্ত্র হারু কাকার করায়ত্ত ছিল। হারু কাকার বন্য আদরের হাত থেকে মুক্তির জন্য ছটফট করেছিল আহ্লাদী। কিন্তু নিষিদ্ধ বেড়াজালটুকু নিতান্ত সাবধানতার হাত ধরে অতিক্রম করার পর, সেই অচেনা স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল অবর্ণনীয়। এক মুহূর্তে হঠাৎ বড় হওয়ার যে অশ্লীল অনুভূতি, তার রেশ দীর্ঘদিন আহ্লাদীর মনে গেঁথে ছিল।
বালিকাবেলায় হারু কাকার স্পর্শে নিজের পরিচিত দেহকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিল আহ্লাদী। এ যেন আর তার নিজের দেহ নয়। যে কামনার আগুন ধিকিধিকি জ্বলে নারীর মননের অভ্যন্তরে, আহ্লাদীর দেহে অবস্থিত নরকের সেই অজানা দ্বারের গোপন আগল হারু কাকার স্পর্শে মহাসমারোহে উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘদিন পর্যন্ত আহ্লাদীর দেহের সমস্ত অনুভূতি ও যাবতীয় চাহিদার নিয়ন্ত্রক ছিল হারু কাকা। ধীরে ধীরে আহ্লাদীর বুকের ওপর সদ্য প্রস্ফুটিত দুটি কুঁড়ির অবৈধ মালিক ও নিহন্তা হয়ে উঠেছিল সে। মায়ের পাশে শুয়ে কন্যার রাত কেটে যেত চোখ মেলে। মাধবীলতা বালিকার মনের এই পরিবর্তন বুঝতে পারেনি। পাশবালিশটা কেবল জেনেছে আহ্লাদীর মনের তীব্র ইচ্ছের কথা। আয়নার দিকে চেয়ে আহ্লাদী নিজেকে চিনতে পারত না। বালিকার দেহের ভিতর থেকে একজন পূর্ণবয়স্কা কামুক নারী যেন সর্বদা অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দিয়ে ওর বাড়ন্ত দেহটা জরিপ করত। কামাতুর হারু কাকার লালায়িত দৃষ্টির মতোই অনিয়ন্ত্রিত ছিল সেই অনুভূতি।
স্কুল পালিয়ে হারু কাকার জমিতে পৌঁছে যেত আহ্লাদী। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত চুপটি করে। হারু কাকা মাঠের ধান ফেলে রেখে সকলের চোখ এড়িয়ে সরে আসত তার কাছে। হলদেটে দাঁতের সারি মেলে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করত, "কী রে? আজও স্কুলে যাসনি? পড়ালেখায় মন বসেনা তোর?"
মাথা নেড়ে না বলত আহ্লাদী। হারু কাকা এগিয়ে এসে সবুজ ফিতে দিয়ে সযত্নে সাজানো আহ্লাদীর বেণী করা চুল মুঠি করে টেনে বলত, "তুই কি আমারে কাজ-কাম করতে দিবি না? তোর বড়দা জানতে পারলে আমারে গাঁ ছাড়া করবে..."
আকুল হয়ে হারু কাকার ঘর্মাক্ত হাত চেপে ধরে জানতে চাইত আহ্লাদী, "যেখানেই যাও, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে তো?"
ঘামে ভেজা গামছার পাশে দুপুরের পান্তা আর ডাঁটাচচ্চড়ি পড়ে থাকত। এক সুবিশাল বনস্পতিকে পাহারায় রেখে রোদে পুড়ে যাওয়া একটা সুবিশাল দেহ ধীরে ধীরে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মিশিয়ে দিত আহ্লাদীকে। বালিকার স্কুলের শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যেত, চুলের বেণী আলগা হতো, তবুও সে পরিণত পুরুষের বন্য আদরের হাত থেকে নিষ্কৃতি চাইত না।
বছর ঘোরে, নতুন ধান গোলায় ওঠে। কিন্তু হারু কাকা আহ্লাদীর কাছে ক্রমে পুরোনো হয়ে যায়। তার আদরের ধরণ, রমণের গতি, শ্বাস ও দেহের উত্থান-পতন, সবই যেন বড় পরিচিত। কোথাও কোনও নতুনত্ব নেই। নিজের গগনচুম্বী চাহিদার সীমারেখা বুঝতে পারত না আহ্লাদী। ওর পুষ্ট দেহের অলিগলি রাস্তার কুকুরের মতো শুঁকে বেড়াত হারু কাকা। কিন্তু আহ্লাদীর কামনার তল সে পেতো না। তার পর যে ওর জীবনে এসেছিল, তার কথা ভাবতে গেলে আহ্লাদীর মন উদাস হয়ে যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহ্লাদী বলল,
-আমি আজ যাই। বড়দা একতলায় খেতে নামার আগে বাড়িতে ঢুকতে হবে।
আহ্লাদীর হাত টেনে ধরে সেই পুরুষ বলল,
-আবার কবে আসবে?
-জানি না। খবর পাঠাব। খুব ইচ্ছে করলে নিজেই চলে আসব। তবে এটুকু বলতে পারি, তুমি আমার কাছে না এসে থাকতে পারলেও, আমি খুব বেশিদিন তোমাকে ছাড়া একা থাকতে পারব না। আমি আসব।
বিদায়কালে একটি আকস্মিক চুম্বনের বিনিময়ে প্রেমিক পুরুষের কাছ থেকে প্রগাঢ় স্পর্শ আদায় করে নিল আহ্লাদী। পায়ে পায়ে খানিকটা হেঁটে এসে ধুলোমাখা রাস্তার বাঁকে শশাঙ্ককে দেখে থমকে গেল সে।
-ঐ এসেছে। দ্যাখো তোমার পেয়ারের বোন বাড়িতে পা রেখে বাড়িশুদ্ধু লোকের পিণ্ডদান করে আমাদের উদ্ধার করেছে। এবার আমরা সবাই একসঙ্গে নিশ্চিন্তে স্বর্গবাসী হবো। শশীকে জিজ্ঞাসা করো দেখি, বোনকে ও কোথা থেকে উঠিয়ে আনল!
তৃণার চিৎকারে অস্থির হয়ে কম্পিত কলেবরে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো মাধবীলতা। শশাঙ্কর পাশে মাথা নামিয়ে আহ্লাদী দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিত্য গৃহকর্ম সহায়িকা চাঁপা হাতের কাজ ফেলে রেখে চেয়ে রয়েছে নাগের বাড়ির নতুন কোনও খোরাকের আশায়। নিধি রান্নাঘরের বাইরে বেরিয়ে বাড়িতে ভাসুরের উপস্থিতির কারণে মাথায় কাপড় চাপিয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে শশাঙ্কর দিকে চাইল। কিন্তু ওর নীরব প্রশ্নের কোনও উত্তর শশাঙ্ক দিল না। মৃগাঙ্ক খাওয়া ফেলে এঁটো হাতে উঠোনে বেরিয়ে এসে বলল,
-আমি ওকে বাড়ির বাইরে পা রাখতে বারণ করেছিলাম। ও কোথায় গিয়েছিল শশী?
-দাদা এভাবে চিৎকার ক'রো না। ও ঘরে যাক। আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলছি।
-তুমি কী বুঝিয়ে বলবে শশী ঠাকুরপো? এই মেয়ের কেচ্ছা-কারবার তো কারও জানতে বাকি নেই। এবার এর একটা ব্যবস্থা করো। বেহায়াপনারও তো একটা সীমা আছে নাকি! আমার ছেলে দুটো বড় হচ্ছে। বড়টা তো দেখতে দেখতে হাতে-পায়ে বেড়ে সেয়ানা হয়ে গেল। এরপর ওরা বাইরে থেকে কিছু শুনে ঘরে এসে আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলে, আমি মা হয়ে তাদের কী জবাব দেবে শুনি? কোন লজ্জায় উত্তর দেব? বলি ছেলেপিলেরা বড় হচ্ছে না? তোমার ঘরেও তো টুয়া বড় হচ্ছে। ও চোখের সামনে এমন বেলেল্লাপনা দেখলে তো তাই শিখবে।
ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা টুয়ার হাত ধরে নিধি দ্রুত প্রবেশ করল ভিতরে। ঘরের মধ্যে মেয়েকে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে আগল তুলে দিল। তৃণার নিরন্তর বাক্যবাণ মাধবীলতার গায়ে যেন জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিল। তৃণা একনাগাড়ে বলে চলেছে,
-আমরা দুটো বৌ ঘরের মধ্যে উদয়-অস্ত খেটে-খেটে মরে যাচ্ছি। ঘরের একটা কাজে-কম্মে পায় না, নির্লজ্জ গতরখাকি মেয়েমানুষ গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ব্যাটাছেলে ধরার জন্য অন্ধকার থাকতে চোখ খুলে উঠে রাস্তায় চরতে বেরিয়ে যাচ্ছে। জগতে এত মেয়েমানুষ দেখেছি, বাপের জন্মে এমন আক্কেলহীন বেহায়া মেয়েমানুষ দেখিনি বাবা, যার নাকি মদ্দা মানুষ ছাড়া একটা দিনও চলে না.... গর্ভের তো নয়, বংশের কলঙ্ক! কত জন্ম পাপ করলে এমন একটা বেহায়া মেয়েমানুষ পেটে ধরা যায়...
সশব্দে একটা চড় এসে পড়ল আহ্লাদীর গালে। মাধবীলতা গুমরে কেঁদে বলল,
-বল আর কত কথা শুনতে হবে তোর জন্য? বল বল.... এত লোক লাইন পার হতে গিয়ে রেলে কাটা পড়ে মরে, তুই মরিস না কেন? বল তুই মরিস না কেন? কবে তোর মরণের খবর পাব?
মার খেয়ে উঠোনে আছড়ে পড়েছিল আহ্লাদীর দেহ। কোমর পর্যন্ত এলো চুলের মুঠি মাধবীলতার মুঠোর মধ্যে রয়েছে। চুড়িদারের ওড়নাটা উঠোনের ধুলো মেখে গেল। নিধি দৌড়ে এসে মাধবীলতাকে টেনে ধরে বলল,
-ও মা, ছাড়ুন ওকে। এতবড় মেয়ের গায়ে কেউ এভাবে হাত তোলে? আপনি ঘরে চলুন।
-ছাড়ো মেজ বৌ! আমার মরণ হয় না গো! এই মেয়ে নিজেও মরবে না। আমাকেও শান্তিতে বাঁচতে দেবে না। আমি কী পাপ করেছিলাম গো...
মৃগাঙ্ক আর তৃণা মুখ ফিরিয়ে চলে গেছে দোতলায়। এলোপাথাড়ি মারের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে সবে উঠে বসতে যাচ্ছিল আহ্লাদী। শশাঙ্ক ওকে ধরে তুলতে গেল। শশাঙ্কর হাত ছাড়িয়ে একছুটে ছাদের সিঁড়িতে পা রাখল আহ্লাদী। খোলা জানলার গরাদ ধরে ঘরের ভিতর থেকে টুয়া দু'চোখ মেলে আহ্লাদীর কান্না দেখল। মাধবীলতার ঘর থেকে চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। শশাঙ্ক দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই টুয়া ওর কাছে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-ও বাবা, সোনাপিসিকে ঠাম মারল কেন? ঠাম কাঁদছে কেন?
ঢোঁক গিলে শুষ্ক কণ্ঠে শশাঙ্ক বলল,
-জানি না মা!
-মিথ্যে কথা। তুমি সব জানো। বলো না বাবা...
-তোর সোনাপিসি...
-কী করেছে সোনাপিসি?
টুয়ার নিষ্পাপ কৌতূহলী মুখের দিকে চেয়ে শশাঙ্ক কোনোমতে বলল,
-তোর সোনাপিসি আজ সকালে ঘরের খিল ভেঙে পালিয়ে গিয়েছিল, পুজোর ফুল চুরি করতে। তাই ঠাম রাগ করেছে সোনা। আমাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করিস না মা। এর বেশি আমি কিছু জানি না। তোর মা সব জানে। মাকে একটু জিজ্ঞাসা করে আয় দেখি, বল বাবা আড়তে বেরোবে। দুটো ভাত পাওয়া যাবে?
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

খিল দ্বিতীয় পর্ব




খিল
সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব




মাধবীলতার পরিত্রাহি চিৎকার নিধির ঘরের দরজায় সশব্দে আঘাত করছিল। গায়ের কম্বল আলগা করে চোখ মেলে উঠে বসার চেষ্টা করল নিধি। শশাঙ্কর ঘুম অনেক আগে ভেঙে গেছে। তবুও বিছানায় চুপ করে শুয়েছিল সে। কারণ ওর বুকের ওপর নিধির জ্বরতপ্ত ঘুমন্ত দেহটা এলিয়েছিল। নিধির শীতল হাত চেপে ধরে শশাঙ্ক বলল,
-আজ উঠতে হবে না। আমি বাইরে গিয়ে বলছি তোমার জ্বর।
-না না, শরীরের কথা বললে মা আবার ও বাড়ির কথা তুলে খোঁটা দিয়ে না জানি কী বলবে! সব কথায় আমার বাবাকে টেনে কথা বলে। আমার একদম ভালো লাগে না। পান থেকে চুন খসলেই আমাকে জমিদার বাড়ির মেয়ে বলা কেন? আমি কোন ঘরের মেয়ে তোমার মা আর দাদা কি বিয়ের আগে জানত না? নাকি সব জেনেশুনেই এমন ঘর থেকে মেয়ে নিয়ে এসেছে, যার হয়ে কথা বলার জন্য আগেপিছে কেউ থাকবে না! আমি যাই, তিনবেলা সবার থেকে এত কথা শুনতে...
-সবসময়ই তো মা কিছু না কিছু বলছে! তুমি কাজ করলেও বলছে। না করলেও বলছে। কাজ করে শোনার থেকে, না হয় না করেই শুনলে! ওষুধ খেয়েও তো শরীর ঠিক হল না! বাড়িতে ডাক্তার ডাকব?
-এখন তেমন শরীর খারাপ লাগছে না। শুধু একটু দুর্বল লাগছে। কাল দিদি কয়েকটা কাজ দিয়ে গিয়েছিল। করতে পারলাম না। রাগ করে আবার কী বলবে কে জানে!
তৃণা নিজের ঘর থেকে ঘুমচোখে বেরিয়ে ভেঙে পড়া খোঁপা সামলে দোতলার বারান্দা থেকে হাঁক পেড়ে বলে উঠল,
-সকাল সকাল এত চিৎকার কেন লতাদি? বাড়িতে ডাকাত পড়ল নাকি?
-আজ তোমার এত বেলা কেন বড়বৌ?
-তা সে কৈফিয়ৎ কি তোমাকে দিতে হবে নাকি গো?
-না না বড় বৌ। আমি তা বলিনি.... ভাবলাম তোমার শরীর খারাপ করল কিনা...
-বালাই ষাট! শরীর খারাপ করে মরুক আমার শত্তুর! দুনিয়ার সব শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে আমি দিব্যি ভালো আছি। মাকে তো বলেই রেখেছিলাম কাল। মা বলিনি আপনাকে? ভুলে গেছেন নাকি! আমার ঘরের মানুষটার আপিসের এক কলিগের মেয়ের বিয়ে ছিল। সে কী আর সাধারণ ঘরের মতো যে সে বিয়েবাড়ি গো? যেমন উঁচু মানুষজন, তেমন তাদের বিয়ের আয়োজন! আলো, বিয়ের মন্ডপ, রান্না-খাওয়ার বহর আর মেয়ের গায়ের গয়না দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড়! জামাই তো নয়, যেন রাজপুত্তুর! জামাই নাকি বিদেশে থাকে। মস্ত চাকরি করে। বিয়ের পর মেয়েকে নিয়ে সেখানে চলে যাবে। গা ভ'রে শাড়ি গয়না পরে গেছি। তাও ওদের পাশে নিজেকে যেন কেমন ধারা লাগছিল। তা কাকডাকা সকালে তোমার এত হাঁকডাক কেন শুনি? আমরা কাল কত রাতে ফিরেছি জানো? দিলে তো আমার কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে! মেজ বৌ ওঠেনি? আমি যে কাল তাকে বলে রাখলাম সকালে উঠে বাসি কাজ সেরে বাবার মাথায় একটু জল ঢেলে যেন বাটায় জল-বাতাসা দিয়ে দ্যায়! একটা দিনও কি সে...
-গা-টা হঠাৎ বড্ড গসগস করছে দিদিভাই। মাথা তুলতে পারছিলাম না। শেষ রাতে ঘুমিয়েছি। ভোরবেলা ঘুম ভাঙেনি...
একতলার ঘরের দরজা খুলে নিধি বেরিয়ে এসেছে বারান্দায়। তৃণার মন থেকে তখনো বিয়েবাড়ির রেশ কাটেনি। দেহের ভাঁজে জুঁইফুলের সুগন্ধি জড়িয়ে রয়েছে। এক গা গয়না ঝনঝনিয়ে মাথার চুল সামলে খোঁপা শক্ত করে তৃণা বলল,
-জ্বরটা বোধহয় ভালোই বাধিয়েছিস বোন। তোর তো দেখি আমার ছেলেদের মতো অবস্থা! একদিন একটু বেশি কাজ দেখলেই কাজের নামে গায়ে জ্বর এসে যায়! তারা পুরুষমানুষ! তাদের সঙ্গে কী আর মেয়েমানুষের তুলনা করলে চলে রে? তা তুই আবার শরীর খারাপের কথা বলতে কষ্ট করে উঠে এলি কেন? শশীকে দিয়ে বলে পাঠালেই হয়। যা ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক। তুই শুয়ে থাকলে, সংসার কি আর থেমে থাকবে? কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। দিব্যি চলে যায়। তোকে কিছু করতে হবে না। তারপর তো আবার এর-ওর কাছে বলে বেড়াবি, এরা শরীরের ভালো-মন্দ বোঝে না। কাজটাই আগে। বরের ঘরে এসে রাজার হালে থাকলে কী হবে? একটু সুযোগ পেলে শ্বশুরবাড়ির নিন্দে করতে তো কেউ ছাড়ে না।
-এভাবে বলো কেন দিদি? আমি কার কাছে কবে কী বলেছি?
-তা সে চোখ-কান খোলা রাখলেই জানা যায়। নেহাৎ মাথার ওপর দেবতার মতো ভাসুর ছিল। নইলে এতবড় সংসারে কী দিয়ে কী হয়, সেই খোঁজ কে রাখে! সবার জন্য এত করেও মানুষটা নিজের জনের কাছ থেকে প্রাপ্য মান পেল না। তুই ঘরে যা বোন, আমিই স্নান সেরে আসছি। তোর ঘরে চা পাঠিয়ে দেব। মা আপনি শাকপাতা কিছু রাখলে দেখেশুনে রাখুন। লতাদি মোচা এনেছ গো? তোমাদের বড়বাবু সেদিন মোচাচিংড়ির কথা বলছিল। আনলে রেখে যেও। সন্ধেবেলা এসে আমার ঘর থেকে পয়সা নিয়ে যেও বুঝলে! এখন আমি স্নানে গেলাম। নিচে নামতে পারছি না।
-তোমার কাছে আমি কোনদিন টাকা চেয়েছি বড় বৌ? তোমার যা ইচ্ছে হয় নাও না! তোমার কাছে টাকা বাকি রাখা মানেই ব্যাঙ্কে থাকা জমা থাকা.... ওসব নিয়ে আমি ভাবি না। টাকা-পয়সার ব্যাপারে আপিসবাবুর মতো সজ্জন মানুষ আর দ্বিতীয়টি নেই।
-তাও ভালো। ঘরের লোক না দিলেও, বাইরের লোক তো খানিক মান দ্যায়! মা আপনি স্নান সেরে নিন। আমি স্নান সেরে রান্নাঘরে ঢুকে চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। ছেলেপিলেরা সব ইস্কুল পাঠশালায় যাবে! তার আপিস আছে। ওদিকে বাবার পুজো হল না। এখনো রান্নাঘরে হাঁড়ি চড়ল না.... কোনদিকে যে যাই...
-দিদি আমি ঠাকুরঘরে যাচ্ছি। তোমাকে আর এদিকে আসতে হবে না।
-তোর যে শরীর খারাপ বললি মেজ?
-মন খারাপ হওয়ার থেকে শরীর খারাপ হওয়া ঢের ভালো দিদিভাই। তুমি চায়ের জল চাপাও। আমি স্নান সেরে পুজো দিয়ে এসে কুটনো কুটে দিচ্ছি। চাঁপা কাজে এসে পড়লে ওকে বাসন মাজতে দিয়ে ঠাকুরঘরের বারান্দা মুছিয়ে নেব। আপাতত ভিতরটা মুছে জল বাতাসা দিয়ে আসি।
কর্মব্যস্ততায় একটি নতুন সকাল শুরু হল মফঃস্বলের বুকে। দুই গৃহলক্ষ্মীর মধ্যে যা কিছু মনোমালিন্য গ্লানি সকলই ধুয়ে যাবে নিত্যকর্মের চাপে। সকালের যত মলিনতা বিকেলের চায়ের উষ্ণতায় বাষ্প হয়ে উবে যায়, সংসারের এই নিয়ম...
মাধবীলতা এ সংসারে আসার পর ঘরের ভিতরে ও বাইরে অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। নিতান্তই অপরিণত বয়সে নাগের বাড়িতে পা রেখে শাড়ি, গয়না আর সিঁদুরের ভারে জড়োসড়ো হয়ে থাকত সে। শাশুড়ি মাকে নিয়ে তার কোনও অভিযোগ ছিল না। প্রাণ দিয়ে মাধবীলতাকে আগলে রাখত সে। রক্ষা করত সাংসারিক রুক্ষতা থেকে। আজও মাধবীলতা শয়নে স্বপনে জোড়হাতে তাকেই স্মরণ করে। মাধবীলতার মনে স্থির বিশ্বাস, এ সংসারের যা কিছু শ্রী, আয়-উন্নতি.... সকলই তার শাশুড়ি মায়ের আশীর্বাদ।
বিয়ের পর একান্নবর্তী সংসারে মাধবীলতার কোনও সক্রিয় ভূমিকা না থাকলেও, সকালবেলা চোখ মেলে কাঠের উনুনে হাঁড়ির পর হাঁড়ি চড়তে দেখে অবাক হয়ে যেত সে। একসঙ্গে এত রান্না সে কস্মিনকালেও দেখেনি। সুবৃহৎ হাঁড়ি-বাসনের ঝনঝনানি, রান্নার ঠাকুরের চিৎকার, বাড়ির পুরুষদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যস্ততা, সেই সঙ্গে আকাশ-বাতাস জুড়ে রান্নার সে এক অপূর্ব সৌরভ! বিবাহ পরবর্তী প্রত্যেকটি দিনই যেন এক-একটা অনুষ্ঠানের দিন মনে হতো। কর্মে তৎপর স্বামীকে ঘোমটার আড়াল থেকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখত মাধবীলতা। কাজের ফাঁকে নবদাম্পত্যের সেই চোরা দৃষ্টিবিনিময় নিয়ে মধ্যাহ্নভোজনের পর মেয়েমহলে যে চটুল রঙ্গ-রসিকতার আবহ সৃষ্টি হতো, আচারের বোয়াম কোলে নিয়ে সেই সকলই নতমস্তকে উপভোগ করত মাধবীলতা। একা থাকলে আজও পাতানো সইরা স্মৃতিতে এসে ভিড় করে। তারা কোথায় আছে, সে প্রশ্ন বুকের গভীরে ঢেউয়ের মতো মাথা তুলে আবার আছড়ে পড়ে সৈকতে।
সকালের জলখাবারের পর মাধবীলতা দুপুরের অপেক্ষা করত। মাঠ থেকে সমস্ত কৃষকরা ফিরলে গোবর দিয়ে নিকোনো উঠোনে সারি সারি চাটাই পেতে তাদের খাওয়ানোর যে এলাহি আয়োজন করা হতো, তা দেখে মাধবীলতার হৃদকম্প শুরু হয়ে যেত। রান্নার ঠাকুর ও বাড়ির পুরুষ মানুষদের পাশে থেকে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণার মতো একহাতে বালতি অপর হাতে একটা হাতা নিয়ে খাবার পরিবেশন করত মাধবীলতার শাশুড়ি। মাধবীলতা মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত সেইদিকে। মায়াঘেরা সেই হাতদুটো যখন সন্ধেবেলায় গন্ধ ফুলের তেল মেখে মাধবীলতার সিঁথির চারপাশে বিলি কেটে দিত, ভালোলাগায় মাধবীলতার চোখে জল এসে যেত। নাগের বাড়ির প্রত্যেকটি ঘর সর্বদা কোলাহলে মুখর হয়ে থাকত। আজ সেই বাড়িও নেই, সেই পরিবারও নেই। সকল স্মৃতি বুকের পাঁজরের মধ্যে মাধবীলতা একলা বয়ে বেড়ায়।
সেই সময় সংসার অনেক বড় ছিল। এতজনের মধ্যে আজীবন থেকেও মাধবীলতা কোনোদিন কোনও অভিযোগ জানায়নি। সময় যেন উল্কার বেগে পার হয়ে যেত। দিনের শেষে নিজের দিকে চাওয়ার সময়ও থাকত না। তবুও স্বল্প চাহিদায় কত সুখ ছিল মনে। এখন নিজের পুত্রবধূদের মধ্যে নিত্য কলহ, উচ্চাশা, অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা মাধবীলতাকে প্রতিদিন নতুনভাবে আশাহত করে। কনিষ্ঠ পুত্রবধূ ভিটেছাড়া। সে কোনোদিনই হয়তো এ বাড়িতে ফিরবে না। শিবালয়ের নিত্যপুজোয় অংশগ্রহণ করবে না। তার কাছে পরিবারের সুখ, সমৃদ্ধি ও স্মৃতির ভাঁড়ার সমৃদ্ধ করার চেয়ে ব্যক্তিগত ভালোলাগার মূল্য অধিক।
গ্রাম থেকে শহরের দূরত্ব বেশি, নাকি মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব বেশি.... তার সঠিক পরিমাপ মাধবীলতা জানে না। কেবল জানে তার চেনা পথ বদলেছে। যাত্রী বদলেছে, যানবাহন বদলেছে। আগে ঘোর বর্ষায় নাগের বাড়িতে পা রাখাটা ছিল এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। নাগের বাড়ি থেকে রেল স্টেশনের দূরত্ব বেশি নয়। বরাবরই ঘর-বারান্দা কাঁপিয়ে রেলগাড়ি স্থানীয় স্টেশনে নিজের প্রবেশ ও প্রস্থানের বার্তা জানান দেয়। সেই স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় বর্ষাকালে কাদার আধিক্য পথযাত্রীর বিরক্তির কারণ হয়ে উঠত। একটা পায়ের গোড়ালি কাদার আলিঙ্গন থেকে টেনে তুলতে না তুলতেই আর একটা পা হারিয়ে যেত কর্দমাক্ত ভূমির অন্তরালে।
রেলস্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত পথ অতিক্রম করে একাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি ক্রয়ের সামর্থ্য অতীতে একমাত্র নাগ পরিবারেরই ছিল। পাড়ায় সর্বপ্রথম বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় তাদের বাড়িতেই। গ্রামাঞ্চলে সূর্যদেবের আগমনে প্রভাত যত দ্রুত হয়, সূর্যাস্তের কালে সন্ধ্যাও জমির ফসল স্পর্শ করে ততটাই শীঘ্র। সবুজ ধানজমির দিগন্তরেখা ছুঁয়ে তড়িঘড়ি গোধূলি নামে। ভারি মজার মানুষ ছিলেন মাধবীলতার স্বামী। সন্ধের পর বাড়ির সকলকে সাক্ষী রেখে হ্যারিকেন হাতে নিয়ে তিনি বিদ্যুতের আলোর সন্ধান করতেন। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বিদ্যুৎ স্থানান্তরিত করার ফলে বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে প্রদীপের আলোর মতো ক্ষীণ আলো সারাদিন ধরে টিমটিম করে নাগের বাড়ির প্রত্যেকটা ঘরে জ্বলত। টর্চের আলোয় ছাদের দিকে চাইলে দেখা যেত মাথার ওপর পাখা ঘুরছে ঠিকই, তবে সেই বাতাস গায়ে লাগত না। কাজেই হাতপাখার বিরাম ছিল না। তবে সেই আলো-ছায়ায় নবদাম্পত্যের প্রেমের কুঁড়ি ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
একতলা ও দোতলা জুড়ে শুরু হয়েছে নিত্যদিনের সাংসারিক কর্ম তৎপরতা। বাবাই ও টুবাই সামান্য প্রাতরাশ সেরে সাইকেলে চেপে চলে গেল পড়তে। শশাঙ্কর ঘর থেকে টুয়ার কন্ঠ ভেসে আসছে। কবিতার সুর ছড়িয়ে পড়ছে একতলায়। দোতলায় মৃগাঙ্কর হাঁকডাকে রান্নাঘরে বাসনের শব্দ হঠাৎ বৃদ্ধি পেল।
কলঘর থেকে স্নান সেরে বিছানার এককোণে চাদর জড়িয়ে দলাপাকানো অবস্থায় একটি দেহকে শুয়ে থাকতে দেখে মাধবীলতা কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উঠল,
-কী রে মহারানি? বেলা কত হল, সেই হুঁশ আছে? এমন তোর ঘুম, বাড়িতে ডাকাত পড়লেও ঐ ঘুম ভাঙবে না! তোকে বিছানা থেকে নামিয়ে মাঠে-ঘাটে ছুঁড়ে ফেললেও তুই নাক ডেকে ঘুমোবি। আর কতকাল এভাবে বেলা পর্যন্ত ঘুমোবি রে? ফেল করে তো পড়ালেখার পাট চুকল। এবার বড়দা যে ছেলে ধরে আনবে তার গলায় মালা দিয়ে বিদেয় নে দেখি। কী রে! তখন থেকে ডাকছি, ঘুম ভাঙে না নাকি? আহ্লাদী? এই...
একটানে খানিকটা চাদর সরিয়ে ফেলল মাধবীলতা। একটা কোমল পাশবালিশকে কুন্ডলী পাকিয়ে চাদর দিয়ে সযত্নে ঢেকে রাখা রয়েছে। মাধবীলতার বুক ভয়ে কেঁপে উঠল। আবার মেয়ে না বলে পালাল! গৃহকর্ম সহায়িকা চাঁপা ধূমায়িত চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে গেছে কিছুক্ষণ আগে। চা প্রায় জুড়িয়ে গেল। কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে মাধবীলতা ডেকে উঠল, "আহ্লাদী!"
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

 

খিল প্রথম পর্ব


 


খিল
সাথী দাস
প্রথম পর্ব



-ও বড়মা! সব কোথায় গেলে গো? সকাল হয়ে রোদ উঠে গেল, সাতটার ট্রেন বাঁশি দিয়ে ইস্টিশন ছেড়ে গেল, এখনো সব ঘুমুচ্ছ নাকি? রান্নাঘরের দোর বন্ধ কেন? আপিসবাবুর আপিস নেই আজ? এক কাপ চা কি পাব না? কাল যে নটে শাকের কথা বলেছিলে, আজ এনেছি। কই গো বড় বৌ? দেখেশুনে শাক নিয়ে ঘরে তোলো। এরপর বেলা বাড়লে পাড়া বেরিয়ে এলে তো আবার আমার নামে শাশুড়ির কান ভাঙিয়ে বলবে, লতাদি ঝাড়া বাছা শুকনো শাক গছিয়ে দিয়ে গেছে। সব পটের বিবিরা কোথায় গেলে গো? দেখার বেলা তো দেখে নেবে না, পরে যেন আবার আমার বদনাম ক'রোনা বাপু! এই লতার ক্ষেতের টাটকা কলা, মুলো, মোচা, কুমড়ো, পুঁই, শাকপাতা নেওয়ার জন্য সব বৌ-ঝিরা হত্যে দিয়ে বসে থাকে। আমি বাজার দিয়ে এলে তবে তাদের উনুনে হাঁড়ি-কড়াই চড়ে! বলি কী হল'টা কী? বাড়িশুদ্ধু সব আফিং টেনে নেশাভাঙ করে ঘুমুলে নাকি গো? কোথায় সব?
নাগের বাড়ির পুকুর থেকে গামছা ভিজিয়ে শাকের চুপড়ির ওপর ভিজে গামছাটা ঢাকা দিয়ে রাখে লতা।
নাগের বাড়ির সঙ্গে লতার সম্পর্ক বহুদিনের। লতার বাবার ছিল স্থানীয় বাজারে পাইকারি সবজির ব্যবসা। বাবা বেঁচে থাকাকালীন লতাদের খাওয়া-পরার অভাব মোটেও ছিল না। পাইকারি সবজি বিক্রেতা যেমন দু'হাতে কাঁচা পয়সা উপার্জন করেছে, তেমন স্ত্রী-পুত্রকন্যার জন্য মন খুলে ব্যয় করেছে। ফলস্বরূপ সবজির চুপড়ি নিয়ে লাইন পারাপার করার সময় রেলে কাটা পড়ে সে দেহ রাখার পর তার স্ত্রী-পুত্রকন্যা আবিষ্কার করে, ব্যবসায়ীর সঞ্চয় বলতে স্ত্রী-পুত্রকন্যার সুস্বাস্থ্য আর নিজস্ব জন্মভিটে; এছাড়া তেমন কিছুই নেই। লতা তখনো জংলী ফুলছাপ জামা ছেড়ে কাপড় পরেনি। সেই সময় থেকে সে দাদার সঙ্গে সংসারের বৈঠা শক্ত হাতে ধরেছিল। লতার কুসুমকোমল হাত কায়িক পরিশ্রমে কঠিন হলেও, কাঠিন্যের আড়ালে মেয়েমানুষের কোমল মন স্পর্শ করেছিল এক যুবক। কিন্তু লতার দাম্পত্যজীবন সুখের হয়নি। চেনা প্ৰেমিক স্বামী হওয়ার পর বর্ষার আকাশের মতো রঙ বদলে অচেনা হয়েছিল। মা গত হওয়ার পর এক কন্যাসহ দাদার ঘরে ফিরে আসে লতা।
কুলমর্যাদা কেবলমাত্র মেয়েমানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে, ঠিক যেমন থাকে সুগন্ধি চন্দন গাছের সঙ্গে বিষধর সাপ। কুলরক্ষার দায়ও কেবল মেয়েমানুষের ওপর বর্তায়। কিন্তু স্বামীগৃহ থেকে নিজ বাসভবনে ফিরে লতা প্রথম যে সত্য উপলব্ধি করেছিল তা হল; কুলমর্যাদা, কুলরক্ষার মতো কঠিন কঠিন শব্দ নিজের কাঁধে বয়ে বেড়ানো মেয়েমানুষ নিজে যখন দু'কুল হারা হয়, তখন এই পৃথিবীতে তার মূল্য কানাকড়িও থাকে না।
একমাত্র মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে নিজের ভাগের জমি-জিরেত বুঝে নিয়ে দাদার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে এক নতুন লড়াই শুরু করে লতা। এখন লতার ঘরের পাশে লকলক করে বেড়ে ওঠা কলাগাছ থেকে সুদৃশ্য মোচা ঝোলে। ঘরের লাগোয়া এক চিলতে জমিতে মহানন্দে মাথা দোলায় রকমারি শাকপাতা। চালের ওপর বাস করা পুঁইশাক, লাউ কিংবা কুমড়ো ফুল লতার দৈনন্দিন যুদ্ধের নিত্যসঙ্গী। মাচার উচ্ছে হলুদ হয়ে পচে ওঠে, বেগুনে পোকা লেগে যায়, কিন্তু লতার জেদ আর জীবনীশক্তির কাছে ওরা বারংবার হেরে যায়। সমস্ত দিন পরিশ্রমের পর লতা রাত জেগে কাগজের ওপর আঠার প্রলেপ দিয়ে তৈরি করে ঠোঙা। সকালে উঠে দড়ি দিয়ে ঠোঙা বেঁধে বাজারের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে মুদিখানার দোকানে বিক্রি করে আসে। ঘরের মেঝেতে, তক্তপোষের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ঠোঙাগুলো যখন লতা গুছিয়ে রাখে, তখন ওর মেয়ে এগিয়ে আসে মাকে সাহায্য করতে। প্রথম প্রথম মেয়ের হাত চেপে ধরত লতা। ওকে কিছুতেই এত কষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। ও অনেকদূর পর্যন্ত পড়বে, অনেক বড় মানুষ হবে। কিন্তু মেয়ে রাত জেগে পড়াশোনা করার পর যখন মায়ের পরিশ্রমের ভাগীদার হতে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে, লতার চোখের জল বাঁধ মানে না।
পুজোর সময় শাড়ি-চুড়িদারে সুতো আর চুমকির কাজ ছাড়াও শীতে কাঁথা সেলাই করে লতার অতিরিক্ত কিছু টাকা উপার্জন হয়। লতা বেশ কিছু টাকা জমিয়ে ফেলেছে। নাগের বাড়ির বড়বাবুকে লতা ভয়-ভক্তি করে আপিসবাবু বলেই ডাকে। সেই আপিসবাবু ব্যাঙ্কে মস্ত কাজ করে। সে কথা দিয়েছে ব্যাঙ্ক থেকে লোনের ব্যবস্থা করে দেবে। শাক-সবজির পাশাপাশি দুটো গরু কিনে দুধের ব্যবসা শুরু করতে পারলে খানিক সুখের মুখ দেখবে মাতা-কন্যা।
লতার মেয়ে দু'চোখে অপার বিস্ময় মেখে চেয়ে থাকে দেওয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা বাড়িটার দিকে। ওটা তার মামারবাড়ি। কিন্তু মামারবাড়ি থাকলেই যে মামারবাড়ির আবদার থাকবে, তাকে ছুঁয়ে এমন কথা মায়ের দাদা কোনোদিন দেয়নি। সে নিঝুম রাতে পরিশ্রান্ত লতার গলা জড়িয়ে তার যত আবদার জানিয়ে অভিযোগহীনতার চাদরে নিজেকে মুড়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
-বলি ও বড়মা?
-আসছি রে দাঁড়া! কোমরে ব্যাথা, গাঁটে ব্যাথা, হাঁটুতে ব্যাথা.... এই হাড় জিরজিরে গতরখানা নিয়ে রাতে চোখ বুজে ঘুমাই। সকালে চোখ মেলে বুঝতে পারি না খাটে শুয়ে আছি নাকি ঘাটে! আমার গতর তো লোহা দিয়ে তৈরি। আর ব্যাটার বৌদের গতর সব তুলোয় মোড়া বুঝলি লতা.... একটুতেই আহা-উহু! আর বৌ নিয়ে দোর দিয়ে ব্যাটাদের আদিখ্যেতা দেখলে মনে হয় অমন পিরিতের কপালে নুড়ো জ্বেলে দিই। ও মা গো! এতখানি বেলা হয়ে গেল, এখনো বাসি উঠোন রয়েছে! দ্যাখ দেখেছিস, একটা দিন চোখ মেলতে দেরি হয়েছে, আমার সংসারের অবস্থাটা একবার দ্যাখ লতা! কার হাতে সংসার দিয়ে আমি চোখ বুজব বল দেখি.... ও মা, তোমার সোনার সংসার আমি ধরে রাখতে পারলাম না। রাজ্যের সব লক্ষ্মীছাড়া মেয়েমানুষগুলো এসে ব্যাটার বৌ হয়ে আমার কপালে উঠে বসেছে। তোমার আশীর্বাদে ছেলেপুলে নাতি নাতনি নিয়ে দু'বেলা দুটো ভাত ফুটিয়ে খাচ্ছি। এতখানি বেলা হল, শিবের মাথায় এখনো জল পড়ল না। কোনও অমঙ্গল যেন না হয় মা! বৌগুলোর দোষ নিও না মা গো!
মাধবীলতার কন্ঠ নাগের বাড়ির প্রতিটি ঘরের দেওয়ালে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে ফিরে আসছিল। ঐতিহ্যবাহী এই নাগের বাড়ির কাহিনি স্বল্প কথায় লিপিবদ্ধ করা সম্ভব নয়। যতকাল মাধবীলতার শাশুড়ি সাত ভাই ও তিন বোনকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছিল, ততদিন নাগের বাড়ির দাপট পৌঁছত রেল স্টেশন পর্যন্ত। কিন্তু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার আগে মাধবীলতার দূরদর্শী শাশুড়ি যাবতীয় পৈতৃক সম্পত্তির বন্টন করে সাত ভাইয়ের ভাগের জমি, সংসার ও বসতবাড়ি ভিন্ন করে। মাধবীলতার শ্বশুরকুলের জ্ঞাতিরা পাড়ার আশেপাশে ছড়িয়ে থাকলেও এখনো সকলের মধ্যে যথেষ্ট সদ্ভাব বর্তমান।
মাধবীলতার বাড়ির মস্ত উঠোনের একপাশে স্থাপিত রয়েছে একটি শিবালয়। শিবের আশীর্বাদে তার সংসার ধনে ও জনে পরিপূর্ণ। ঘরে সর্বদা কমলা বাঁধা। ভাঁড়ার ঘরে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণার বাস।
মাধবীলতার জ্যেষ্ঠ পুত্র মৃগাঙ্ক নাগ সরকারি ব্যাঙ্কের একটি শাখায় চাকুরিরত। মা ষষ্ঠীর কৃপাদৃষ্টিতে তার স্ত্রী তৃণার কোল আলো করে দুটি বংশধর জন্ম নিয়েছে। তাদের আদরের নাম বাবাই ও টুবাই। উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরিজীবী পুরুষের স্ত্রী এবং গৃহের কর্ত্রী হওয়ার পর যখন দুটি পুত্রসন্তানের জননী হওয়ার সৌভাগ্য তৃণার হল, তখন তার মনের সহজেই আশ্রয় নিল গোপন দর্প।
দুই বংশধরের প্রতি মাধবীলতার প্রচ্ছন্ন স্নেহ ও ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পেল, যখন দ্বিতীয় পুত্র শশাঙ্ক নাগের স্ত্রী নিধির গর্ভে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নিল। মেজ বৌয়ের প্রথম গর্ভে কন্যাসন্তান হওয়ায় মাধবীলতার মুখের হাসি খানিক দেখা দিয়েই মিলিয়ে গিয়েছিল। যদিও একমাত্র কন্যা টুয়াকে নিয়ে শশাঙ্ক ও নিধির আনন্দের অন্ত ছিল না। তবে নাগের বাড়িতে নিধির অস্তিত্ব সর্বদাই তৃণার প্ৰভাব ও প্রতিপত্তির কাছে ম্লান হয়ে যেত। সংসার যাত্রার প্রতি পদে নিধি আবিষ্কার করত, স্বামীর অর্থবলের মাপকাঠিতে শ্বশুরগৃহে স্ত্রীর আদরের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
দিনের বেশিরভাগ সময় সংসার, রান্নাঘর ও মাধবীলতার মনোরঞ্জনের জন্য কেটে যাওয়ার পর রাতে যখন তৃণার দুর্ব্যবহারে মনোবেদনা তীব্রতর হয়, তখন নিধি শশাঙ্কের বুকের ভিতর মুখ লুকিয়ে নিঃশব্দে কাঁদে। পাশে টুয়া পথ ভুলে পৌঁছে যায় ঘুমের দেশে।
শশাঙ্কের উপার্জন নিয়ে নিধির কোনও অভিযোগ না থাকলেও, যৌথ সংসারে নিজের অবস্থান নিয়ে নিধি অত্যন্ত মর্মাহত। বিবাহকালে শশাঙ্কর অভিভাবকস্বরূপ বরকর্তা হয়ে নিধির পিতৃগৃহে দাঁড়িয়ে মৃগাঙ্ক অনেক প্রকার কথা দিয়ে এসেছিল। সে বলেছিল, বাড়ির সকল পুরুষমানুষ চাকরি করতে বাইরে বেরিয়ে গেলে পৈতৃক জমিজমা ও চাষবাসের বড় ক্ষতি হয়। কর্মচারীর হাতে ছেড়ে দিলে পারিবারিক ব্যবসার অস্তিত্ব থাকে না। তাই মৃগাঙ্কর কথা মান্য করে শশাঙ্ক চাকরির পথে না হেঁটে পৈতৃক বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। যেহেতু সে চাকুরিজীবনে প্রবেশ করেনি, সেই কারণে শশাঙ্ক, তার স্ত্রী এবং ভবিষ্যতে এক বা একাধিক সন্তানের যাবতীয় দায়িত্ব মৃগাঙ্ক ও সমগ্র নাগ পরিবার নেবে।
নিধির কন্যাদায়গ্রস্ত হত দরিদ্র পিতা যখন নাগের বাড়ির বিষয়-সম্পত্তির কথা শুনেছিল, তখন বুঝেছিল চাষের জমিই হল পরিবারের আয়ের মূল উৎস। চাকরি তো উপলক্ষ্য মাত্র। কেবল ক্ষার, লবণ ও কেরোসিন তেল ব্যতীত ঐ পরিবারের আর কোনও কিছু কেনার প্রয়োজন পড়ে না। সকলই চাষের জমিতে সোনার মতো ফলে। আর এই বিপুল ফলনের পিছনে রয়েছে মিতভাষী পুরুষ শশাঙ্কর কঠোর পরিশ্রম।
নাগের বাড়ির মতো এতবড় পরিবার থেকে নিধির জন্য সম্বন্ধ আসাটা ছিল চির অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রকে স্পর্শ করার স্পর্ধার মতো অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য একটি বিষয়! তবে প্রথম দর্শনে নিধির বাবার শশাঙ্ককে বড় পছন্দ হয়েছিল। লাজুক, সদা হাস্যোজ্জ্বল পুরুষমানুষটিকে দরজার আড়াল থেকে একবার দেখে লজ্জায় পালিয়ে গিয়েছিল নিধি। তবে মেয়ের চোখের ভাষা বুঝতে পিতার বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়নি। নিধির খাওয়া-পরা, নিশ্চিন্ত জীবন ও সুখের কথা চিন্তা করে নিধিকে শশাঙ্কর হাতে তুলে দিয়ে চিন্তামুক্ত হয়ে নিজের স্বর্গারোহণের পথ প্রশস্ত করে কন্যার পিতা।
সময়ের প্রভাবে সংসারের চাকা ঘোরে। ক্রমে নিধি বুঝতে পারে, সমস্ত ব্যবসার মূল মধ্যমণি মৃগাঙ্ক নিজে। শশাঙ্ক কেবলমাত্র বড়দা'র আজ্ঞাবহ দাস ব্যতীত আর কিছুই নয়। সমস্ত মাস দেহের ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে রোদে পুড়ে হিমে ভিজে পরিশ্রম করার পর বড়দা'র কাছে ব্যবসার সমস্ত হিসেব দিয়ে তার হাত থেকে অবনত মস্তকে নিজের পারিশ্রমিকটুকু নিয়ে ঘরে ফিরে আসে শশাঙ্ক। উপার্জনের সমস্ত টাকা নিধির কাছে গচ্ছিত রেখে টুয়াকে বুকে আগলে শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ে মানুষটা। ঘুমন্ত ও পরিশ্রান্ত শশাঙ্কর মুখের দিকে চেয়ে, তার প্রতি মায়ায় জড়িয়ে নিধি ভুলে থাকে সকল অভিযোগ।
দরিদ্র পরিবারের কন্যার সঙ্গে ভাইয়ের বিবাহের সম্বন্ধ করার কারণটাও ক্রমে নিধির কাছে স্পষ্ট হয়। সংসারের জ্যেষ্ঠ পুত্রের মনের মধ্যে নিভৃতে বাস করে কর্তৃত্ব হারানোর ভয়। সংসারের সর্বেসর্বারূপে সকলের মাথার ওপর পূজ্য হয়ে বসে থাকতে চায় সে। শশাঙ্ক বড় দাদাকে দেবতার মতো পুজো করে। সম্মান ও শ্রদ্ধায় সদা আনত হয়ে থাকে। মৃগাঙ্কর অর্থবল ও মাধবীলতার নীরব প্ররোচনায় শশাঙ্ক কিংবা নিধির সঙ্গে যতখানি দুর্ব্যবহার করার স্পর্ধা তৃণা দেখাতে পারে, উত্তরার দিকে সে কিন্তু চোখ মেলেও চাইতে পারে না। তার প্রথম এবং অন্তিম কারণ একাধারে উত্তরার পিতা ও স্বামীর অর্থবল, অন্যধারে উচ্চশিক্ষিতা উত্তরা নিজেও চাকুরিরতা।
আপিসবাবু মৃগাঙ্ক বর্তমানে শশাঙ্ক, নিধি ও টুয়ার প্রতি দায়সারা কর্তব্য পালন করলেও, নাগের বাড়ির সর্বকনিষ্ঠ পুত্র অঙ্কন নাগ ও তার স্ত্রী উত্তরা যখন বাড়িতে পদার্পণ করে, তখন উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে স্থূলকায় বেতনের বিনিময়ে শ্রম প্রদানকারী অঙ্কন নিজের পছন্দ করা পাত্রীর সিঁথি যখন রাঙিয়ে দিতে চাইল ভালোবাসার সিঁদুর রঙে, মাধবীলতা এমন বেহায়া সম্পর্ককে সামাজিক মর্যাদা দিতে প্রবলভাবে অস্বীকার করে। বিয়ের উপযুক্ত ছেলের জন্য নিজে দেখেশুনে পাত্রী মনোনয়নের যে উচ্চাশা মায়ের মনে ছিল, তা পূর্বে দুই অগ্রজ পূরণ করেছে। অঙ্কনের ক্ষেত্রেও মাধবীলতার মনে এমনই আশা ছিল। কিন্তু উত্তরার প্রেমে অর্ধন্মাদ অঙ্কন পরিবারে এই প্রথম প্রেমের বিবাহকে কেন্দ্র করে নিজের মায়ের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করতেও প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। মাতাপুত্রে যখন তীব্র কলহ শুরু হয়, নাগের বাড়ি ও পরিবারের সম্মানের কথা চিন্তা করে অবশেষে ছোট ভাইয়ের জেদের কাছে পরাস্ত হয়ে কোমর বেঁধে বিয়ের আয়োজন করতে মধ্যস্থতায় নামে মৃগাঙ্ক এবং শশাঙ্ক। অতিকষ্টে মাধবীলতাকে রাজি করিয়ে বিবাহের পর অঙ্কন ও উত্তরাকে তারা পাঠিয়ে দেয় শহরে। কর্মসূত্রে শহরেই তাদের বাস। শহরের উপকণ্ঠে উত্তরার বাবার উপহার দেওয়া একটি সুদৃশ্য ফ্ল্যাটে অঙ্কন ও উত্তরা নিজেদের ছন্দে স্থাপন করে ভালোবাসার নীড়।
বাড়ির ক্ষুদ্র-বৃহৎ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যখন মাধবীলতার জ্যেষ্ঠ কন্যা চূর্ণী হাজির হয়, তখন নামজাদা মোক্তার জামাইয়ের আদরের অন্ত থাকে না। বড় ননদের কোল আলো করে আসা প্রথম পুত্রসন্তান অশোকের আদর ঈর্ষণীয়। কিন্তু প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার কালে নাড়ির ষড়যন্ত্রে দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের ক্ষমতা চিরতরে হারায় চূর্ণী। অবশেষে একটি দরিদ্র কন্যাকে তার বাবা-মায়ের অনুমতিক্রমে দত্তক নিয়ে নিজ কন্যার মতো পালন করে সে। মাধবীলতার কাছে চূর্ণীর পালিতা মেয়েটির তীব্র আবদার ও আদর চোখ মেলে চেয়ে দেখে টুয়া। সকল উপহার ও আনন্দ কেন্দ্রিক যা কিছু সামগ্রী, সকলই সর্বাগ্রে প্রবেশ করে তৃণার ঘরে। কেবল উত্তরার কাছে নিরবচ্ছিন্ন প্রশ্রয় ও আদর পায় টুয়া।
মাধবীলতার কার্যকলাপ দেখে নিধি আপনমনে মৃদু হাসে। যে কনিষ্ঠ পুত্রবধূ এককালে মাধবীলতার চক্ষুশূল হয়েছিল; মূল্যবান উপহার, শাড়ি, অর্থ ও গয়নার ভারে সেই ক্ষণিকের অতিথি কুলবধূ এখন মাধবীলতার সর্বাধিক স্নেহের পাত্রী। উত্তরার হাত ধরে নিধি বুঝতে পারে, অর্থের প্রভাবে মাতৃস্নেহের রঙও কত সহজে বদলায়।
ঐতিহ্যবাহী গগনচুম্বী নাগের বাড়ির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ঘুণপোকার বাস, তার দংশনে ক্ষতবিক্ষত নিধি মৃতপ্রায়। সাদাসিধে আপনভোলা শশাঙ্ক সাংসরিক তত্ত্বে তেমন মনোযোগী নয়। চারবেলা স্ত্রী-কন্যাসহ পেট ভরে চারটি ভাত খেতে পেলেই সে নিশ্চিন্ত হয়ে বড়দাদার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিতে প্রস্তুত থাকে। সংসারের যুদ্ধক্ষেত্রে নিধির কথাও শশাঙ্কর কাছে মূল্যহীন। সকল বিষয়ে মৃগাঙ্কর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। কিন্তু নিধি বড় সহজেই উপলব্ধি করতে পারে, ভাসুর ঠাকুরের প্রকৃত পরিচালিকা হল দুইটি পুত্রসন্তানের জননী ঐ নারী। সে বাঁকা হাসি ঠোঁটের কোণে সাজিয়ে সর্বদা সকল ক্ষেত্রে নিজেকে উত্তম ও নিধিকে অধম প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর।
একদিকে সুউচ্চ বাড়ির বাইরে মৃগাঙ্কর যাবতীয় ফরমায়েশ দায়িত্ববান বেতনভুক্ত কর্মচারীর মতো অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শশাঙ্ক। অন্যদিকে গৃহমধ্যে নিধি হল তৃণার সর্বক্ষণের আজ্ঞাবহ দাসী। রামধনুর মতো সংসারে থেকে মানুষের নানান রঙ দেখে, নিজের অবহেলিত মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জল চোখে চেপে প্রতিরাতে নিজের ঘরে প্রবেশ করে নিধি।
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত


ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট