অনুসরণকারী

শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ফ্রেমের বাইরে কেউ অন্তিম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

অন্তিম পর্ব



                                                          ।। স্ক্রিনে যে মুখ ফিরে আসে না।। 


অবন্তীর বাবার সঙ্গে কথা বলে সাম্পান জানতে পারল, তার স্মৃতিতে লোকটার মুখের আদল ঝাপসা হয়ে এলেও, গালের কাটা দাগটা আজও ভদ্রলোককে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায়। গালে একটা কাটা দাগের ওপর ভিত্তি করে কি একজন আস্ত মানুষকে খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব? এছাড়া আর উপায়ই বা কী! পুলিশের কাছে গিয়ে এ কথা বললে বিষয় আরও জটিল, অবিশ্বাস্য এবং হাস্যকর হয়ে যাবে। 


সাম্পানের কাছেও যে এই অতীতের স্মৃতি খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নয়। তবে অবন্তীর শেষ কয়েকটা ভিডিওতে ওর অসংলগ্ন কথাবার্তা সাম্পানকে ভাবিয়েছে। একটা গোটা দিন ওর সঙ্গে কাটিয়েছে সাম্পান। মেয়েটা হয়ত সাহায্যও চেয়েছিল। সাম্পান বুঝতে পারেনি। সেই অপরাধবোধ থেকে অন্তত একটা দিন নিজেরা চেষ্টা করে দেখাই যায়। 


দুশ্চিন্তাকে সঙ্গী করে রাত কাটল কোনোক্রমে। পরদিন ভোরবেলা কোন এক অজ্ঞাত কারণে অবন্তীর বাবা এবং সাম্পান সমস্ত দিন হোটেলের বাইরে সময় কাটিয়ে এল। দু-একবার কান্নায় বুক ভাসানো ছাড়া একাকী অবন্তীর মায়ের আর কোনও কাজ ছিল না। দুপুর গড়িয়ে যখন প্রায় বিকেল হয়ে আসছে, তখন ওরা হোটেলে ফিরল। সাম্পানের মুখে নেমে এসেছে অন্ধকার। অবন্তীর বাবার মুখেও আলো জ্বলে ওঠার মতো কোনও কারণ দেখা যায়নি। 


দু'দিনব্যাপী সমুদ্র সৈকতসহ সমুদ্র সংলগ্ন এলাকায় হন্যে হয়ে খোঁজার পর তখন সাম্পান হতাশ হয়ে আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গেলে কেবল বাঁকা কথা শুনতে পাওয়া যায়। তবুও হাল ছাড়েনি অবন্তীর বাবা। মেয়েকে জীবন্ত কিংবা মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করাই তখন তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। 


ঘোর অমানিশায় সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে সাম্পানের মনে হল, ওটা পৃথিবীর কোনও জায়গা নয়। অন্য কোনও অচেনা জগতের দোরগোড়ায় সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আকাশে চাঁদ নেই, তারা নেই। যতদূর চোখ যায়, কেবল ঘন কালো অন্ধকার। 


যেন কেউ ইচ্ছে করেই আকাশের যাবতীয় আলো নিভিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারেই রাত্রির যত সৌন্দর্য। কিন্তু এমন নিকষকালো রাত্রি সাম্পান এর আগে কখনও দেখেনি। যেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে যত রাজ্যের অশুভ ইঙ্গিত ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। 


সমুদ্রের একটানা গর্জন শোনা যাচ্ছে। ভারী, শ্বাসরোধ করা একটা শব্দ। মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোনও দানব সমুদ্রের অতল থেকে উঠে আসতে চাইছে। 


ভেজা বালির ওপর পা রাখলে কেমন একটা সোঁ সোঁ ঠান্ডা অনুভূতি উঠে আসে। যেন বালি নয়, কারও জমাট বাঁধা নিশ্বাস। মানুষের বুকের ওঠানামার মতো জলে ভিজে বালুতট বসে যায়। তারপর আবার রোদ পেয়ে জেগে ওঠে। ঢেউ ভেঙে আসে আর ফিরে যায়। প্রতিবারই আগের চেয়ে একটু বেশি রাগ নিয়ে, একটু বেশি শব্দ করে। মাঝে-মাঝে ফেনার ভেতর অদ্ভুত সব ছায়া নড়েচড়ে ওঠে। সে কি কেবল সাম্পানের চোখের ভুল? নাকি সত্যিই কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অস্থিরচিত্তে তাদের অস্তিত্ব বোঝা যায় না।


হাওয়ার সঙ্গে নোনা গন্ধ মিশে আছে। তার ভিতরে কেমন একটা পচা পুরোনো গন্ধ। রক্তের গন্ধ, মাছের আঁশটে গন্ধ। বুঝি বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা কোনও রহস্য হঠাৎ জেগে উঠেছে। দূরের গাছগুলো অন্ধকারে বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে, অনেকটা হাত ছড়িয়ে ডাকার ভঙ্গিতে। 


ভয়ের কোনও কারণ নেই। তবু বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা শিহরণ জেগে উঠতেই সাম্পান মুখটা ফিরিয়ে নিল। এরই নাম কি ভয়? সাম্পানও কি তবে ভয় পাচ্ছে! পুরো সৈকত জুড়ে অস্বস্তিকর নীরবতা, যেটা সমুদ্রের শব্দ সত্ত্বেও ভাঙে না। বরং আরও চেপে বসে বুকের ওপর। 


এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন সৈকতে দাঁড়িয়ে সাম্পানের মনে হল, ও একা নয়। অবন্তীর বাবা ছাড়াও ওর আশেপাশে আরও কেউ আছে, কিছু একটা আছে। শুধু সেটা কে বা কী, ওটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন! যে প্রশ্ন মনে জেগে উঠতেই সাম্পানের প্রাণে বিভীষিকা জন্ম নিল। 


-আমার মেয়েটাকে কি তবে সমুদ্র গিলে খেল? আমি পারলাম না ওকে বাঁচাতে? সেবার সমুদ্রের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলাম ওকে। এবার আর পারলাম না। আমাকে এভাবে একা করে দিয়ে ও...


চাপা কান্নায় হারিয়ে গেল অবন্তীর বাবার শেষ কথাগুলো। হয়তো তার কাছে বলার মতো নতুন কিছু ছিল না। সাম্পানের কাছেই বা নতুন করে শোনার মতো কি থাকতে পারে! একজন মানুষকে তিলে তিলে ভেঙে পড়তে দেখেও সাম্পানের কিছুই করার ছিল না। 


-রুমে চলুন প্লিজ। এভাবে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘুরে বেড়ালেই কি অবন্তীকে খুঁজে পাওয়া যাবে? পুলিশ তো নিজের কাজ...

-কিচ্ছু করবে না পুলিশ। আমি মেয়েকে না নিয়ে কোথাও যাব না। 

-আচ্ছা, এখন ফিরে চলুন। 


সাম্পানের জোরাজুরিতে উঠে দাঁড়াল অবন্তীর বাবা। জীর্ণ দেহটাকে টেনে টেনে নিয়ে চলল কেবল। 


-না না.... না বলতে নেই। খোদার ওপর খোদকারি কেউ করে! ও ডাইনি যাকে নেবে ঠিক করে, তাকে নিয়েই ছাড়ে। দু'দিন আগে আর পরে... 

-কে! 


সমুদ্র সৈকত থেকে কিছু দূরে লোহার বেঞ্চের এককোণে বস্তা গায়ে জড়িয়ে বসে রয়েছে একজন পাগলের মতো ভিখারি। কিন্তু তার কথাবার্তা বিকৃত মস্তিষ্কসুলভ নয়। অবন্তীর বাবার আগেও সাম্পান পিছু ফিরল। লোকটাকে মাটি থেকে টেনে বেঞ্চের ওপর ফেলে চেপে ধরল। 


-মানে! কে ডাইনি? 

-দুটো ভাত দিবি আমায়? তিনদিন খেতে পাইনি রে!

-কে ডাইনি? 

-ওই যে, ও। আমার ব্যাটাকে খেয়েছে। মাছ ধরতে গেল। একেবারেই গেল। ও সমুদ্র না। ও ডাইনি। দে না বাবা! দুটো ভাত! আমার ব্যাটা মরে গেল। কী খাব আমি? 


অবন্তীর বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ডুকরে কাঁদছে। লোকটাকে ছেড়ে পকেট হাতড়ে একটা দশ টাকার নোট বের করে সাম্পান বিরক্ত হয়ে অবন্তীর বাবাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ভিখারিটা একনাগাড়ে প্রলাপ করছে। হঠাৎ একদম স্থির হয়ে গেল সাম্পানের দুটো পা। 


-আমার কি তেমন বুকের পাটা আছে রে বাপ! আমি কি নারার মতো মরা বেটি ফেরাতে পারি! যে বেটি আমাকে দুটো ভাত দেবে! 

-কী! কে মেয়ে ফিরিয়েছে? 


ময়লা, ছেঁড়া কাপড়ে মোড়া ভিখারিটা রাস্তার ধারে বসে থাকে। অবন্তীর সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে যেদিন সাম্পান এসেছিল, সেদিন ওকে দেখেছে। কিন্তু তেমন গুরুত্ব দেয়নি। অবহেলায় ছুঁড়ে দেয়নি একটা পয়সাও। মুখ ফিরিয়ে চলে গেছে। যেন ওর কোনও অস্তিত্বই নেই এই পৃথিবীতে। আজ ওই ভিখারিটাকেই খুব ভালো করে দেখল সাম্পান। 


যেন শহরের কোলাহলের মধ্যে এক নিঃশব্দ ছায়া। তার চুল ও দাড়ি জট বেঁধে শক্ত হয়ে গেছে। ধুলো আর ঘামের স্তরে গায়ের আসল রঙ হারিয়েছে। মুখের চামড়া রোদে পুড়ে খসখসে। চোখ দুটো গভীর গর্তের মতো। ক্লান্তি আর দীর্ঘ অভাবের ছাপ সেখানে স্পষ্ট। গায়ে দেওয়া জামাটি বহুদিন ধোয়া হয়নি। কোথাও কোথাও ছিঁড়ে সুতো ঝুলে আছে। পায়ের একপাটি জুতো, সেটাও ছিঁড়ে গেছে। কেবল স্মৃতির মতো টিকে আছে লোকটা। তবু তার বসে থাকার ভঙ্গিতে এক অদ্ভুত স্থিরতা জড়িয়ে রয়েছে। হাতের বাড়িয়ে একই ছন্দে সে ভিক্ষা চায়। কিন্তু দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকে অদম্য সহনশীলতা, যেন প্রতিদিনের অবহেলার মাঝেও সে মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকার দাবিটুকু ধরে রেখেছে। সাম্পান ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর। 


-নারা কে? আরও টাকা দেব। এই নিন। এই যে। সব টাকা আপনার। পেট ভরে ভাত খাওয়াব। বলুন না! নারা কে? তার মেয়ের কী হয়েছিল? 

-নারু পাগলা। বেশি লোভ করতে গিয়ে মাছ ধরা ছেড়ে লোক নে নৌকো বাইত। মেয়েটা ওর সঙ্গেই থাকত। নৌকো ডুবে আমার ব্যাটার মতো নারুর বেটিকেও ডাইনি খেয়েছে। ওই ডাইনির দিব্যি, আমি পোড়াকপাল মেনে নিয়েছি বাবু। কিন্তু নারু নাকি শয়তানকে বশ করে নিজের মেয়েকে ফিরিয়েছে। আমি বলি না, লোকে বলে। সেই বেটিকে নিজের কাছে রাখার জন্য এখন নাকি তার একটা শরীল চাই। 

-এই.... এই নারু পাগলা দেখতে কেমন? 


অবন্তীর বাবার বিস্ফারিত দৃষ্টির দিকে সাম্পান চাইতে পারল না। কন্যাস্নেহে অন্ধ দুই জন্মদাতার অদৃশ্য লড়াইটা অনুভব করে ওর চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। ভিখারি বলল, 'আলখাল্লার মতো জামা পরে ঘোরে। চোখ দুটো কটা। আর.... নারুর গালে একটা কাটা দাগ আছে।' 


ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়ল অবন্তীর বাবা। সাম্পান আর বেশি প্রশ্ন করার সাহস পেল না। শুষ্ককণ্ঠে জানতে চাইল, 'নারুর বাড়ি কোথায়?' 


ভিখারিটা হেসে উঠল ফ্যাসফ্যাস করে। সর্দি বসে যাওয়া ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে ঘোৎঘোৎ করে বলল, 'সে আমি কী জানি বাবু! সে পাগলা কখন কোন শ্মশানে পড়ে থাকে! জ্যান্ত মানুষ ছেড়ে মড়া নিয়ে কারবার তার। ও বাবু! পেট ভরে ভাত দেবে বললে যে!' 


সাম্পান ছুটে এগিয়ে গিয়েছিল। আবার ফিরল। দুটো পাঁচশো টাকার নোট লোকটার হাতে গুঁজে অবন্তীর বাবাকে নিয়ে একটা অটোতে চেপে বসল। 


দুর্ঘটনার পর প্রায় দিন সাতেক সময় পেরিয়ে গেছে। সাম্পান সমস্ত অভিযোগের আগুনে জল ঢেলে নির্বিঘ্নে ফিরে গেছে নিজের বাড়িতে। অবন্তীও ফিরেছে নিজের ফ্ল্যাটে। তবে তার বাবা যেন একটা জীবন্ত লাশ ফিরিয়ে এনেছে। অবন্তীর মধ্যে সেই প্রাণোচ্ছল ব্যাপারটাই আর নেই। জ্বরে ভুগে কাহিল হয়ে পড়েছে সে। 


সেই অমাবস্যায় প্রায় শেষরাতে শ্মশান চত্বরে অবন্তীকে তন্নতন্ন করে খুঁজে হয়রান হয়েছে ওর বাবা আর সাম্পান। নারু পাগলার পরিচয় সকলে জানলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। লোকটা যেন রাতারাতি হাওয়ায় মিশে গেছে। শ্মশান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটা পরিত্যক্ত ডাস্টবিনের পাশে তেল-সিঁদুরচর্চিত অবন্তীকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। ওকে ঘিরে গুটিকয়েক কুকুর গলা ছেড়ে ডাকছিল, ওর গা শুঁকে দেখছিল। তারপর কেঁউ কেঁউ করে ছিটকে সরে যাচ্ছিল দূরে। 


আজ সকালের পর থেকে অবন্তীর ধুম জ্বর ঘাম দিয়ে ছেড়েছে। ওর সঙ্গে ফ্ল্যাটেই ওর বাবা-মা রয়েছে। অসুস্থ মেয়েকে দেখাশোনার জন্য, সেই সঙ্গে প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের অহেতুক প্রশ্নবাণ এড়িয়ে যাওয়াটাও ছিল উদ্দেশ্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে অবন্তীর বাবার একমাত্র ভরসা সাম্পান। অচেনা জায়গায় হাসপাতাল ও থানা-পুলিশের বিষয়টা ও একা হাতে এত সুন্দরভাবে সামলে নিয়েছে, যে কৃতজ্ঞতার খাতিরে অবন্তী একটু সুস্থ হতেই ওর বাবা সাম্পানকে নিজেদের ফ্ল্যাটে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেছে। 


বৈঠকখানার সান্ধ্য আড্ডা ছেড়ে চায়ের কাপ নিয়ে ব্যালকনিতে উঠে এল সাম্পান। রান্নাঘর থেকে কী যেন ভাজার গন্ধ আসছে। চনমনে খিদেটা একটু সইয়ে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সাম্পান বলল, 'সে রাতের কথা বহুবার জানতে চেয়েও কোনও উত্তর পাইনি। ফোন করলেও ধরো না। তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগে না। ভিডিও বানানো কবে থেকে শুরু করবে? সেটা অন্তত বলো.... অবন্তী! কী দেখছ ওভাবে? তুমি চিনতে পারছ না আমায়?' 


দুটো জোনাকি যেন দপ করে জ্বলে উঠল অবন্তীর দু'চোখে। মুহূর্তের জন্য। তারপরই আলোটা হারিয়ে গেল। আধো অন্ধকারে মিশে জমাট অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল অবন্তী। সাম্পানের খুব অদ্ভুত লাগল। মৃদু ডাকেও মুখ ফেরাল না অবন্তী। 


চায়ের কাপ আর প্লেটটা দেওয়ালের ওপর রেখে অবন্তীর হাতটা সাম্পান ধরার চেষ্টা করেই ছিটকে গেল একহাত দূরে। কোনও জীবন্ত মানুষের দেহে এত ঠান্ডা হতে পারে! অবন্তীর হাতটা বরফের মতো শীতল। সরাসরি সাম্পানের দিকে চেয়ে রয়েছে অবন্তী। ওর চোখের মণির কালগর্ভ থেকে দুটো জোনাকি উঁকি দিয়েই হারিয়ে গেল। অবন্তীর অমন হিংস্র দৃষ্টির সঙ্গে সাম্পান পূর্বপরিচিত নয়। তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করতেই হাত লেগে অসাবধানতার কারণে চায়ের কাপ-প্লেটটা মেঝেতে আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে গেল। ব্যস্ত হয়ে ছুটে এল অবন্তীর বাবা। ততক্ষণে অবন্তীর মা গরম-গরম চাউমিন তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। 


টেবিলের দিকে একবার চেয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল সাম্পান। বড় বড় বাহারি বাটির মধ্যে ধোঁয়া ওঠা চাউমিন, পাশেই কাঁটা চামচ আর চপস্টিক। আতঙ্কে তখন সাম্পানের খিদে মরে গেছে। খুব জরুরি কোনও কাজ মনে পড়ে যাওয়ায় তখনই অবন্তীর ফ্ল্যাট ছেড়ে সাম্পান বেরিয়ে গেল।


সমস্ত রাত সাম্পান দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি। মন ভালো করার জন্য সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে ও  যেভাবে নাজেহাল হয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি সাম্পান চায় না। কিন্তু এভাবে নিজের পিঠ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসার জন্য অনুশোচনা যে একেবারেই ছিল না, তা নয়। তবে পরোপকারের মূল্য যদি নিজের জীবন ও পরিবারের সম্মান দিয়ে পরিশোধ করতে হয়, তবে তেমন উদারতা থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। 


নিজেকে অনেকরকম ভাবে সান্ত্বনা দিয়ে ভোররাতে সাম্পান একটু চোখ বন্ধ করেছে। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন না হলেও, তন্দ্রা নেমে এসেছে ওর দু'চোখের পাতায়। 


নেটদুনিয়ায় খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ। ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়ে সাম্পানের হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। কম্পিত হাতে প্রতিবেদনের লিঙ্কে ক্লিক করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কতগুলো নির্মম অক্ষর... 


আরবান কুইন খ্যাত জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং মডেল অবন্তী নিখোঁজ হয়ে গেছে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট থেকে। ঘরের মধ্যে অবন্তীর বাবা এবং মাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পৈশাচিকভাবে খুন করা হয়েছে তাদের। অবন্তীর বাবা এবং মায়ের গলায় আমূল বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে চপস্টিক। ঘরের একটা জিনিসও স্থান পরিবর্তন করেনি। সুতরাং আন্দাজ করা যায় ডাকাতি এই খুনের উদ্দেশ্য নয়। 


প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, রাত আটটা নাগাদ অবন্তীকে ফ্ল্যাটের নিচে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। প্রতিবেশীরা প্রশ্ন করলেও কোনও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। রাত আটটার পর অবন্তীর সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল? নেই উত্তর। পুলিশ এবং প্রশাসন কী বলছে? এ রাজ্যে মানুষের নিরাপত্তা কতটা? অবন্তী অন্তর্ধান রহস্যের নেপথ্যে কি রয়েছে আরও গূঢ় কোনও চক্রান্ত? অবন্তী কি আবার হাসিমুখে ধরা দেবে মুঠোফোনের ফ্রেমে? উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে অবন্তীর অগুনতি অনুরাগী এবং রাজ্যবাসী। 


সাম্পানের মাথা ভোঁ-ভোঁ করে ঘুরছে। হাত থেকে ফোন নামিয়ে রেখে টলতে-টলতে বাথরুমে প্রবেশ করল ও। নির্ঘুম রাত আর দুর্ভাবনার কারণে ওর মাথা ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়। সিঙ্কে হড়হড় করে খানিকটা বমি করে চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দেওয়ার সময় গত রাতে দেখা অবন্তীর সেই বীভৎস মুখটা মনে পড়ছিল। 


সেই ক্রুর মুখে ফুটে ওঠা অভিব্যক্তি যেন এতক্ষণে স্পষ্ট উচ্চারণ পেল, প্রতিশোধ! প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এত আয়োজন। সহজে ফিরে আসা.... তারপর আবারও হারিয়ে যাওয়া... 


ঝকঝকে রোদ্দুরে মোড়া কাঠফাটা দুপুরে এই কোলাহলপূর্ণ শহরের বুকে বসে সাম্পানের গল্প শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু কেউ না জানলেও সাম্পান জানে, অবন্তী ফিরবে না। ওর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ও ফিরে গেছে নিজের জায়গায়। নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে, জন্মদাতার কোলের উষ্ণতায়...


ফোনের স্ক্রিনে অবন্তীর হাসিমুখ আর কোনোদিনও দেখা যাবে না। ওর জায়গা দখল করে নিয়েছে ফ্রেমের বাইরে জেগে ওঠা অন্য কেউ। সে এখন অবন্তীর শরীরে ধিকিধিকি বাড়ছে। 


একদিন গেল। দু'দিন গেল। ক্রমে শোরগোল স্তিমিত হয়ে এল। ধীরে ধীরে মানুষের সময়সরণী থেকেও হারিয়ে গেল অবন্তী অন্তর্ধান রহস্য। স্থানীয় থানায় জমা পড়ল নতুন অভিযোগ। সমাধান না হওয়া একটা সাধারণ কেস হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেল আরবান কুইন। 


মানুষও তাকে মনে রাখল না। অবন্তীর লক্ষ লক্ষ অনুসরণকারী কিছুদিনের মধ্যেই খুঁজে নিল মনোরঞ্জনের নতুন মানুষ। দলে-দলে সকলে ভিড়ল সেখানে। কারণ এই জনবহুল এবং ঘটনাবহুল দুনিয়ায় মানুষের স্মৃতিতে মানুষের স্থায়িত্বের মেয়াদ দু'দিন। মাত্র দু'দিন! 


(সমাপ্ত)

ছবি : সংগৃহীত

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

ফ্রেমের বাইরে কেউ অষ্টম পর্ব


 

ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

অষ্টম পর্ব



                                                                    ।। লাস্ট আপলোড ।। 


অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে সাম্পান নিজের ফোনটা ফেরত পেয়েছে। ওর ফোনে তেমন আপত্তিজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। এমনকি অবন্তীর সঙ্গে কোনও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের এক টুকরো ছবি পর্যন্ত ছিল না। অবন্তীকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ দু-চারটে ছবি, যা কোনোভাবেই ওকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে না।


থানা-পুলিশ নিয়ে জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। সাম্পান হোটেল কিংবা সমুদ্র সৈকত ছেড়ে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়নি। তবে নিজের বাড়িতে ফোন করে জানানো হয়েছে, সাম্পান সমুদ্র ভ্রমণের মেয়াদ খানিক বাড়িয়ে নিয়েছে। সেই দিক থেকে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে। কিন্তু সে আর কতদিনের জন্য! দুশ্চিন্তায় সাম্পানের কপালে ভাঁজ পড়েছে। এই দুশ্চিন্তা কেবল ওর নিজের জন্য নয়। জলজ্যান্ত মেয়েটা হঠাৎ এভাবে উধাও হয়ে গেল কোথায়! 


অবন্তীর মায়ের কান্নার তীব্রতা খানিক কমে এসেছে। তবে অবন্তীর বাবা ভীষণ রকম চুপ করে গেছে। তাকে দেখলে হঠাৎ মনে হয়, পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কোনও আতঙ্ক প্রতি মুহূর্তে মানুষটাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। 


অবন্তীর প্রোফাইলে ঢুকে বসেছিল সাম্পান। ফোন ঘেঁটে ওর সর্বশেষ পোস্টটা দেখছিল। সমস্ত দিন অবন্তী সঙ্গে থাকায় ফোন খুলে ওর পোস্টগুলো দেখা হয়নি। এখন খুব খুঁটিয়ে সাম্পান দেখল, শেষ কয়েকটা ভিডিওতে অবন্তীর কথাবার্তা এমনকি চোখের দৃষ্টিও যেন একটু অসংলগ্ন ছিল। 


বালিশে মাথা রাখতেই সাম্পানের চোখদুটো কালঘুমে ভেঙে আসতে চাইল। কিন্তু ও একের পর এক ভিডিও দেখে চলল। ভিডিওতে কোথাও কিছু নেই। তবে অবন্তীর দু'চোখে জেগে রয়েছে কেমন এক আতঙ্ক, নীরব অস্থিরতা। কিংবা বলা যায়, কারও আদেশ একমনে পালন করে চলেছে সে। অবন্তীর ফোন পুলিশের কাছে জমা রয়েছে। ওটা ঘেঁটে যদি কোনও সূত্র পাওয়া যেত, তবে হয়তো ওর এই আকস্মিক অন্তর্ধান রহস্যের কিছু কিনারা করা সম্ভব হত। 


চোখ বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে ছিল সাম্পান, ভাবছিল একের পর এক কথা। প্রত্যেকটা সূত্রকে এক জায়গায় রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হিসেব মেলেনি। অবন্তীর বাবার দৃষ্টিতে উদ্বেগ যথেষ্টই রয়েছে, তবে সেই সঙ্গে তার অস্থির দৃষ্টি যেন পথেঘাটে কিছু খুঁজছে। ওই ভদ্রলোকের মধ্যে সমস্ত দিন ধরে একটা অস্থিরতা দেখেছে সাম্পান। 


ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ভিডিওতে অবন্তী হাসছে, কখনও আবার গম্ভীর হয়ে পিছু ফিরে দেখছে। অবন্তী বলেছিল, ওকে যেন এখানে টেনে আনা হয়েছে। ও নিজে আসতে চায়নি। এই কথার অর্থ কী? বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও কিছু নেশার ঘোরে বকে যাওয়া প্রলাপ ভেবে এত সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


দরজা খুলে হোটেলের বারান্দায় পৌঁছতেই মুখোমুখি দেখা হল অবন্তীর বাবার সঙ্গে। বিপরীত দিকের হোটেলে যে ঘরে অবন্তী ছিল, ঠিক তার পাশের ঘরেই ওরা রয়েছে। অবন্তীর ঘরের মধ্যে যে বৃত্ত দেখা গিয়েছিল, তা কে এঁকেছে? ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চুলগুলোই বা কার? 


রহস্য ঘনীভূত হতে হতে সাম্পানের উত্তেজনা অস্থিরতা একেবারে চরম সীমায় পৌঁছেছে। একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগের আশায় সাম্পান বারান্দায় এসেছিল। কিন্তু অবন্তীর বাবার ইশারা ওর কপালে গভীর ভাঁজের জন্ম দিল। ভদ্রলোক ডাকছেন ওকে। ধূমপানের আশা বিসর্জন দিয়ে হোটেল ছেড়ে রাস্তায় নেমে এল সাম্পান। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় একটা। ঘুমে ঢলে পড়া দারোয়ান সাম্পানের দিকে একটু অদ্ভুত দৃষ্টিতে চাইলেও বিশেষ হৈ-হল্লা বা আপত্তি করেনি। 


-আমার মেয়ের সঙ্গে যদি তোমার কোনও সম্পর্ক থাকে, তবে তুমি আমায় বলতে পারো। 

-আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার সামান্য বন্ধুত্বও নেই। সম্পর্ক তো দূরের কথা। আলাপ হয়েছে এখানে এসে। আপনি বিশ্বাস না করলে আমার সত্যিই কিছু করার নেই। 

-একটা কথা ওর মাকে আমি বলতে পারছি না। পৃথিবীর কাউকে কখনও বলতে পারিনি। 

-কী কথা? কী হয়েছে? 


অবন্তীর বাবার দিকে চেয়ে সাম্পানের মনে হল, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র অসহায় মানুষটার সামনে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দু'চোখে ভয় আর অবিশ্বাসের মিশেল স্পষ্ট। হঠাৎ সাম্পানের হাত ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগল অবন্তীর বাবা। 


-পুলিশকে আমি সব কথা বলতে পারিনি বাবা। 

-আপনি আগে বসুন এখানে। পড়ে যাবেন। 

-আমার মেয়ে নিজে এখানে আসেনি। তাকে আনা হয়েছে। ওই মেয়ে আমার সব, ওকে তুমি বাঁচাও। ওকে খুঁজে বের করো। আমার ভুলের শাস্তি ও পেতে পারে না। 


স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সাম্পান। এই একই কথা ও অবন্তীর মুখেও শুনেছে। সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে গেল। কার্য-কারণ খুঁজে পেতে বেশি কষ্ট করতে হল না। এ যেন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনও গভীর অথচ গোপন রহস্যের উদঘাটন হতে চলেছে। 


-একটু খুলে বলুন তো, কী বলতে চাইছেন! 


ঘড়িতে রাত দুটো। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে অবন্তীর বাবা বলল, 'তার গালে একটা কাটা দাগ ছিল। ওই মুখ আমি কখনও ভুলব না বাবা, কোনও দিনও না.... আমি ইচ্ছে করে তার মেয়েকে ছেড়ে দিইনি। আমি বুঝতে পারিনি। নিজের মেয়ের কাছে পৌঁছনোর জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম.... আমার মেয়ে আমাকে না জানিয়ে কিছুতেই সমুদ্রে বেড়াতে আসবে না। নিশ্চয়ই এসব তার কীর্তি।'


জনবহুল শহরের বুকে বসে এসব গল্পকথা শুনলে সাম্পান হয়তো হেসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু বাতাসে নোনা গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন, সেই সঙ্গে গা ছমছমে অন্ধকার। হঠাৎ দূরে চাইলে মনে হয় শত-শত প্রেত অট্টহাসি হেসে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। এই অবস্থায় মন দুর্বল হয়, ফেলে আসা অতীতকে এত সহজে অস্বীকারের সাহস হয় না। 


সমুদ্রের শব্দ যেদিক থেকে ভেসে আসছে সেদিকে চেয়ে সাম্পান বলল, 'আপনিই বলুন, কোথা থেকে শুরু করব আমরা?' 


(চলবে...)

ছবি : সংগৃহীত

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

প্রথম পর্ব


।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।।

চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ একটানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে ভিডিও এডিট করতে হয়েছে। সন্ধের আগেই পিঠ কোমর জবাব দিয়েছে। চোখ ভেঙে এসেছে ঘুমে। আর বসে থাকতে পারছিল না। তারপরই অবন্তী আশ্রয় নিয়েছে বিছানায়।

মাথায় যেন পর্বত চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। সেই যে সন্ধের মুখে ও ঘুমিয়েছিল, ঘুম ভাঙল এখন। ক'টা বাজে? সময়ের কোনও ধারণা অবন্তীর নেই। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে রইল সে।

অবন্তী নিজেকে কথা দিয়েছে, যতরকম কাজ থাক, যত ব্যস্ততাই ওকে গ্রাস করুক, কোনওভাবে ভিডিও আপলোডের সময় এদিক-ওদিক হবে না। পরিশ্রমের প্রতি প্রকৃত অর্থে সৎ হলে, সাফল্য কখনও উঁকি মেরে টুকি ব'লে পালায় না।

অবন্তী বরাবরই একগুঁয়ে মেয়ে। যদিও জেদ করে আজ পর্যন্ত ও যা করেছে, তাতে ওর ভালোই হয়েছে। অবন্তী বোঝে, যে কোনও কাজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। মাঝে-মাঝে জীবনটা যে একঘেয়ে মনে হয় না, তা নয়।

হতাশা কিংবা আলসেমি চেপে ধরলে তখন আরও বেশি জেদ চেপে যায় অবন্তীর মনে। নিজেকে শাসন করে ও বলে, ভোঁতা লোহাও ক্রমাগত ঘষতে ঘষতে এক সময় ধারালো হয়ে ওঠে। তখন সেই অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন করা যায়। সাফল্যকে এফোঁড়-ওফোঁড় করা তো খুব ছোট ব্যাপার।

অবন্তীর কাজের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা ভীষণ রকম প্রয়োজনীয়। মনোরঞ্জনের আরও একশো এক রকম পথ আজকের মানুষের সামনে খোলা রয়েছে। মাত্র এক ক্লিকেই উধাও হয়ে যাবে দর্শক। মানুষকে টেনে বেঁধে রাখতে হবে স্ক্রিনের সঙ্গে। সর্বক্ষণ ঝাঁ চকচকে বিষয়বস্তু হয়ে মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠতে না পারলে ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ফোন বেজে উঠল মৃদুস্বরে। অবন্তীর আলগা ঘুমে যেন কোনওভাবেই ব্যাঘাত না ঘটে, সেই স্পর্শকাতর বিষয়ে যন্ত্রটাও যেন সচেতন। অবশেষে চোখ টেনে খুলল অবন্তী। মা ফোন করছে।

'উমম.... বলো।'
'এই ভর সন্ধেবেলা পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস? ঘরে কি একটু সন্ধেবাতিও দিতে নেই? বুঝি না বাপু তোদের কাজ-কারবার! সারাদিন চোখ ঘুমে ঢুলঢুল করবে, রাতে পেঁচার মতো জেগে বসে থাকবি।'
'কী বলবে বলো না...'
'হ্যাঁ বলছি বলছি। বেশি কথা বললে তো আবার আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হয়ে যায়! বলছি এবার জন্মদিনে বাড়ি আসবি তো? নাকি ওই ফ্ল্যাটেই একলা পড়ে থাকবি? বাবা জিজ্ঞাসা করছিল। তুই আসতে না পারলে এবার আমরা যাব।'
'পরশু রাতে আমার ট্রেন আছে মা।'
'ও মা! সে কী! আবার ট্রেন!! ক'দিন পরই জন্মদিন। বাপ-মা যে জন্ম দিয়েছে, সেটাও মনে রাখার প্রয়োজন নেই! ও গো শুনছ...'
'আরে মা! আবার শুরু করলে...'
'হ্যালো...'
'বাবা প্লিজ মাকে বোঝাও।'
'সে আমি তোর মাকে সামলে নেব। তা কোথায় যাচ্ছিস এবার?'
'এই জন্য আমি তোমাকে এত্ত ভালোবাসি বাবা। সে তো এখন বলব না। ওখান থেকে ছবি ভিডিও পাঠাব। তুমি গেস করবে।'
'প্রত্যেকবার তোর এই না ব'লে যাওয়াটা আমাদের খুব চিন্তায় ফেলে রে! হঠাৎ রাত নেই, দুপুর নেই.... ফোন করে বলিস, এখানে আছি। ওখানে আছি। বাড়িতে তো একটু বলে যেতে হয়! কোথায় যাচ্ছিস, ক'দিনের জন্য যাচ্ছিস...'
'উঁহু! প্রথম তিন সেকেন্ডে সব রিভিল করে দিলে শেষ পর্যন্ত ভিডিও কেউ দেখবে বাবা? জীবনে ওই থ্রিলটাই হল আসল। এরপর কী হবে? এরপর কী হবে? এটা কোথায়? এখানে যাওয়ার খরচ কেমন.... এসব জানার জন্য সবাই হাঁ করে বসে থাকবে। ভিউজ আমার, টাকা আমার। গাড়ি তোমার।'
'গাড়ি মানে?'
'মানে আমি সব মনে রেখেছি। যারা তোমাকে ন্যায্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিল, তাদের চোখের সামনে তোমাদের বাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। এখানে আমি মাথা গোঁজার মতো একটা ছোট ফ্ল্যাটও করেছি। আর ছ'টা মাস অপেক্ষা করো বাবা। আশা করছি দুটো ট্রিপ মারতে পারলে গাড়িটাও হয়ে যাবে। আমাদের প্রথম গাড়ি বাবা! তুমি শুধু মাকে একটু সামলে রাখো প্লিজ!'

বোধহয় বাবার কন্ঠ বুজে এসেছিল। তবুও অবন্তীর খুব ভালো লাগল। মায়ের সামনে ও কোনওদিনই নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। ওর যত গল্প বাবার সঙ্গে। সেই বাবা গল্প করতে করতে হঠাৎ চুপ করে গেল আজ। অবন্তী জানে, বেশি আনন্দে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আর দুঃখে পাথর...

বিছানা ছেড়ে অবন্তী বাথরুমে গেল। একলা থাকার মতো এক কামরার একটা পুঁচকি ফ্ল্যাট গত বছর অবন্তী কিনেছে। হাত বাড়ালেই সমস্ত কিছু এখন হাতের সামনে পাওয়া যায়। অবন্তীর এই ফ্ল্যাটে অভাব নেই, একাকীত্বও নেই।

নিজেকে পরিপাটি রাখতে অবন্তী বড় পছন্দ করে। ব্রাশ করতে করতে বাথরুমের আয়নার দিকে চেয়ে অবন্তী ভাবল, এমন বিলাসিতার জীবন সত্যিই ওর প্রাপ্য ছিল! মাত্র দু'বছরের মধ্যে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেল ও।

কলেজ ছেড়ে চলে আসার দুঃখটা এখন অবন্তীকে আর কাবু করতে পারে না। রাতারাতি এই গগনচুম্বী সাফল্য ওর সমস্ত দুঃখ ঘুচিয়ে দিয়েছে। অবন্তীর একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে সর্বক্ষণ সজাগ রয়েছে প্রায় আট লক্ষ অনুসরণকারী। ফোনটা হাতে তুলে নিলেই তারা নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে অদৃশ্য শক্তিকে সঙ্গী করে।

এই লোক দেখানো জীবন নিয়ে অবন্তী বেশ খুশি। ক্যামেরার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদেখা ভয় নিয়ে ওর বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ক্যামেরার সামনে ঝকঝকে হাসি আর বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা ওর একমাত্র মূলধন। ক্যামেরার বাইরের অদৃশ্য সন্ত্রাস সম্পর্কে কেউ না জানলেও তেমন ক্ষতি নেই। ডিজিটাল জনপ্রিয়তার অভিশাপ ওকে আজ পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি।

হলদে ফুলওলা সিঙ্কে কুলকুচি করে জল ছুঁড়ে দিল অবন্তী। দেখনদারির স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টগুলো থরে থরে সাজানো রয়েছে বাথরুমের একদিকে। ব্র্যান্ড প্রোমোশনের জন্য এসব জিনিস প্রায় প্রত্যেক মাসে ওর ঠিকানায় আসে। ক্যামেরার সামনে বাধ্য হয়ে কিছুক্ষণের জন্য এগুলো ব্যবহার করে প্রশংসার বন্যায় ভেসে যেতে হয়। তারপর জিনিসগুলো আবর্জনার মতো জমতে থাকে ঘরের এককোণে। সবই যে খারাপ তা নয়। কিছু জিনিস সত্যিই ভালো হয়। সেগুলো অবন্তী রেখে দেয় নিজের ব্যবহারের জন্য।

সময়বিশেষে অবন্তীরও দুঃখ হয়। এখনও ও 'না' বলতে শিখল না। বোল্ড ফটোশুট? আগেপিছে কিছু না ভেবে হ্যাঁ বলে দিল। ব্রাইডাল ফটোশুট? এককথায় হ্যাঁ। অকারণ কোল্যাব? হয়তো এতে অবন্তীর কোনও লাভ নেই। তবুও টাকার জন্য রাজি হয়ে যায় সে। অবন্তীর এখন একটাই পরিচয়, ও হল কন্টেন্ট। সেই অর্থে মানুষ নয়।

মানুষের কিছু অনুভূতি থাকে একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু অবন্তীর হাসি-কান্না, মনখারাপ, ব্যক্তিগত ভাবনা আবেগ সবই বিক্রি হয় খোলা প্ল্যাটফর্মে। বিনিময়ে ড্যাশবোর্ডে বিছিয়ে থাকে ঘন সবুজ গালিচা। হু-হু করে বৃদ্ধি পায় অনুসরণকারীর সংখ্যা।

অবন্তীর কাছে মানুষের পরিচয় মানুষ হিসেবে নয়। তারা কেবল একটা সংখ্যা, এনগেজমেন্ট, রিচ। দর্শকও সেই অর্থে নেটনাগরিক নয়। তারা আসলে অবন্তীর শিকার। অবন্তী গিলে খাচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়। জাগিয়ে দিচ্ছে তাদের লোভ। দর্শকের মনের গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসাপরায়ণতা, প্রতিযোগিতা.... সমস্তই জলের দামে দেদার বিকিয়ে যাচ্ছে। অবন্তীর খাতায় জমা হচ্ছে প্রচুর টাকা। কিন্তু ওর জন্য খরচ হয়ে যাচ্ছে আট লক্ষেরও বেশি মানুষ। অথচ তারা জানতেও পারছে না।

কে কাকে দেখছে? তারা অবন্তীকে দেখছে? না! হাসে অবন্তী। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। অবন্তী প্রতি মুহূর্তে ঈগলের দৃষ্টিতে দেখছে তাদের। মন্তব্য বিভাগ থেকে তাদের ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারে অবন্তী। তাদের রাগ, ঘৃণা, হতাশা, আক্ষেপ.... প্রবল হয়ে ওঠে রিপু। তার দমন অসম্ভব। মানুষকে খেপিয়ে তোলার যে ছলাকলা অবন্তী বিগত কয়েক বছরে রপ্ত করেছে, সেই মোহ থেকে একজন অনুসরণকারীরও নিষ্কৃতি নেই।

অবন্তী যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রাণবন্ত, সুহাসিনী এবং বাকপটু। পরিবেশিত বিষয়বস্তুর মধ্যে দুর্দান্ত উপাদান রয়েছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা চলে না। কিন্তু তার উপস্থাপনা অত্যন্ত ঝকঝকে। যদিও মনের ভিতরে সে একপ্রকার স্বীকৃতির তেষ্টায় আক্রান্ত। সেই সঙ্গে আজকাল জমা হয়েছে নিদারুণ ভয়। হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া কিংবা নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

অবন্তীর ফ্ল্যাটের দরজায় রাত নামল। শহরের আলো একে একে জ্বলছে। যেন অদৃশ্য কোনও হাত আকাশের গা হাতড়ে আলোর সুইচ টিপে দিচ্ছে। রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল অবন্তী। বাতাস যেন ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে। নীরবতার মধ্যে ভেসে আসছে অচেনা শব্দ। ঠিক শব্দও নয়, যেন ফিসফিস করে কেউ ডাকছে। অবন্তীর নাম ধরে...

এসবে অভ্যস্ত অবন্তী। রাতে একা থাকলে মনে হয় ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটা আসবাব এখনই কথা বলে উঠবে। প্রথমে একা থাকতে বেশ অসুবিধা হলেও এখন বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে। স্ক্রিনের নীলচে আলো অবন্তীর মুখে অদ্ভুত ছায়া ফেলে রেখেছে।

ভিডিওতে দ্রুতগতিতে কাটছাঁট চলছে। ফ্রেমের পর ফ্রেম, শব্দের পর শব্দ। রাতই অবন্তীর কাজের সময়। কীবোর্ডে আঙুল চলতে থাকে অবিরাম। কিন্তু মনে হয় যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে হঠাৎ যেন আর একটা ছায়া দুলে উঠে। চমকে তাকায় অবন্তী। কোথাও কিছু নেই।

ফ্ল্যাটের বাইরে অলৌকিক রাত নেমে এসেছে। বাতাসে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল অবন্তী। একটু ফাঁক পেলেই ওখান দিয়ে বেয়াদপ হাওয়া ঢুকে পড়ে। লিফটের দিক থেকে ধাতব শব্দ এল। ডিং! করিডোরের দেওয়ালে আলো-ছায়া কেঁপে ওঠে, যেন দেওয়ালগুলো শ্বাস নিচ্ছে।

কাজে একদম মন বসছে না। বিরক্ত লাগছে। হেডফোন খুলে ছুঁড়ে ফেলতেই নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে আসে। নিজের শ্বাসের শব্দও অবন্তীর কাছে ঘোর অচেনা লাগে। স্ক্রিনে পজ করে রাখা ভিডিওতে থমকে গেছে অবন্তীর মুখ। যেন রক্তশূন্য প্রাণহীন রুক্ষ একটা মুখ। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম স্থির।

অবন্তীর অস্বস্তি বাড়ল। ভিডিওর এফেক্টটা ও বদলে দিল। হ্যাঁ, এবার মানুষের মতো লাগছে। সেই মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে ভাবটা চলে গেছে। প্রত্যেকবার এই একই ফিল্টার ব্যবহার করে অবন্তী। তবে আজ নিজেকে দেখে এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?

ল্যাপটপের ওপর অবন্তীর হাত থেমে যায়। ও বেশ বুঝতে পারে, ওকে গিলে খাচ্ছে ভয়। নাঃ! অনেক কাজ হয়েছে। এবার সত্যিই একটা লম্বা ছুটি দরকার। উল্টোপাল্টা ভাবনারা মাথায় ভিড় করছে।

অবন্তী মনস্থির করে এই ছুটিতে ও কেবল বেড়াবে। ট্রাইপড আর ক্যামেরা নিয়ে বেশি কারসাজি করবে না। আরামদায়ক চেয়ারে বসে আড়মোড়া ভেঙে একবার বাঁই করে ঘুরে যায় অবন্তী।

ঘরের বাইরে নিশুতি রাত হাসে না, কাঁদেও না। শুধু ধীরে ধীরে অবন্তীর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।

।। ফিল্টারের আড়ালে ফাঁদ ।।

নাকের সামনে ম্যাগির বাটিটা নিয়ে বড় করে শ্বাস নিল অবন্তী। জিভে জল এসে গেল। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার ও সাধারণত খায় না। তবে আজ কাজে যখন একটু ঢিলেমি দেওয়া হয়েই গেল, তখন একদিন খাবারেও চিট করাই যায়।

একনাগাড়ে হাবিজাবি স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহারের ফলে অবন্তীর মুখের চামড়াটা বেশ রুক্ষ হয়ে গেছে। শুকনো খোসার মতো মৃত কোষগুলো উঠছে। মা থাকলে চিৎকার করে বলত, অবন্তী সাপের মতো খোলস ছেড়েছে। এখন কিছুদিন ব্র্যান্ড প্রোমোশনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।

চামড়ার ক্ষতি করে শুট করাই যেত, কিন্তু মানুষকে নিজের বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ দেওয়া যেত না। মিথ্যে ব্যাপারটা খানিকটা ফিল্টারের মতো। এমনিতে বেশ ভালো, কিন্তু প্রকৃত রূপটা ধরা পড়ার আগে পর্যন্তই।

মুখের চামড়াটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নিজের কন্টেন্ট বদলে নিয়েছিল অবন্তী। কিন্তু একই ফ্ল্যাটের হোম ট্যুর আর কতদিন মানুষ দেখবে? ঘরের প্রতিটি দরজা-জানালার পর্দা, এমনকি বালিশের কভার থেকে শুরু করে অবন্তীর মেঝের পাপোষের রঙ পর্যন্ত মানুষ জানে। ঘরের প্রত্যেকটা কোণ ছুঁয়ে গেছে যান্ত্রিক ক্যামেরার লেন্স।

অগত্যা অবন্তীর ক্যামেরা ঘুরে গেছে নিজের থালার দিকে। স্বাস্থ্যকর কন্টেন্টের জন্য সমস্ত দিন স্যালাড আর ডালিয়ার খিচুড়ি খাওয়ার পর রাতে একবাটি মশলাদার ম্যাগি যেন অমৃত মনে হচ্ছে। সুড়ুৎ করে খানিকটা ঝোল টেনে নিতেই সরাসরি নাকে উঠে গেল মশলাটা।

খ্যাক-খ্যাক করে কাশি শুরু হল। সেই সঙ্গে নাক জ্বালা করছে। জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সমস্ত ঘর ডুবে গেল অন্ধকারের অতলে। হঠাৎ স্থির হয়ে থাকা ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে চমকে উঠল অবন্তী।

গোটা ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তার মধ্যে স্ক্রিনে ফ্যাকাশে অবন্তী একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তার চোখে কেমন যেন আতঙ্ক বিস্ফারিত শীতল দৃষ্টি। ঘরের অন্ধকারে বিদ্যুতের অভাব স্পষ্ট।

অস্ফুটে একটা আওয়াজ বেরিয়ে গিয়েছিল অবন্তীর কন্ঠ চিরে। কাশির দমকে চোখে জল আসছে। দৃষ্টি ঝাপসা। অবন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। এখনও স্ক্রিন থেকে অবন্তী চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তবে চাউনিটা আগের মতো অস্বস্তিকর নয়।

এই প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে অবন্তী ভিডিও আপলোড করতে পারল না। ও স্পষ্টই বুঝতে পারল, বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না আর। ল্যাপটপ বন্ধ করে অবন্তী বিছানায় উঠল।

ম্যাগির বাটির একটা সাধারণ ছবি তুলে অবন্তী শান্তি পেল না। খাবারের সেই ছবির ওপরে একের পর এক ফিল্টার লাগিয়ে চলল। তারপর খুলল নিজের ইন্সটা। আইডির নাম আরবান কুইন অবন্তী, ঝকঝকে প্রাণোচ্ছল একজন মানুষের ছবি রয়েছে। শতরকম ফিল্টার পেরিয়ে একবাটি ম্যাগির ছবি স্টোরিতে ঝুলিয়ে সেই রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আরবান কুইন।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত।

রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সেই তো এলে ভালোবাসা দ্বিতীয় পর্ব


 



সেই তো এলে ভালোবাসা
সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব




মধ্যরাতের এমন কত শুভ্র অপ্রাপ্তি ভোরের আলোর সঙ্গে মিশে আলগোছে ভূমি স্পর্শ করে। যা মনকে যাতনা দেয়, তেমন অনুভূতিদের সযত্নে মনে ধরে রাখলে সংসার হয় না। সংসার করতে গেলে একজনকে নির্লজ্জ হতে হয়। যাবতীয় আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে বারংবার ভিক্ষুকের মতো হৃদয় পেতে দাঁড়াতে হয় প্রিয় মানুষের সামনে। দয়া ভিক্ষা করতে হয়। করুণাও ভিক্ষা করতে হয়। অরুণাক্ষর মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, গলা ছেড়ে কেঁদে চোখ লাল করে ফেলে। দারুণ অভিমানে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খায় সঞ্চারিণীকে। পান করে ওর দেহসুধা। তপ্ত দুপুরে ওর সঙ্গ কামনা করতে ইচ্ছে হয়।

পরমুহূর্তেই বিস্বাদ হয়ে ওঠে মন। কামনার রাতগুলোতে একাধিকভাবে সঞ্চারিণীর প্রত্যাখ্যানে নিজেকে কেমন নারীদেহলোলুপ কামুক পুরুষ মনে হয়। মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা জন্মায় নিজের প্রতি। আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছয়। সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে নিজেকে নষ্ট চরিত্রের পুরুষ ভাবতে দ্বিধা হয় না।

সঞ্চারিণীর রূঢ় আচরণ প্রতি মুহূর্তে অরুণাক্ষকে মনে করিয়ে দেয়, সে প্রতারক। এ জগতে যা কিছু সঞ্চারিণীর প্রাপ্য ছিল, কথা দিয়েও সেসব কিছুই অরুণাক্ষ দিতে পারেনি। তার মতো দরিদ্র মানুষ ইহলোকে থাকার অর্থ কেবল পৃথিবীর ভার বৃদ্ধি। এর বেশি কিছু না।

কোনও এক রাতের তুমুল বাকবিতণ্ডার পর অরুণাক্ষ আকুল হয়ে থাকে নতুন সকালের আশায়। সঞ্চারিণী যদি সামান্য অনুতপ্ত হয়, তবে অরুণাক্ষর মনের গোপন ক্ষত সহজেই উপশম হতে পারে। কিন্তু সঞ্চারিণীর দৃষ্টিতে অনুতাপের দেখা মেলে না। সেখানে নীরব ক্ষোভ ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই।

সম্পর্ক যখন প্রতিনিয়ত বিষধর সাপের মতো দংশন করে, তখন বিষক্রিয়ায় নীল হয় মন। ব্যথাতুর হৃদয় আশ্রয় চায়। ভরসা চায়। কিন্তু সঞ্চারিণীর গগনচুম্বী আকাঙ্খার কাছে প্রত্যেকবারই পরাজিত হয়ে মুখ লুকিয়ে পালিয়ে আসে অরুণাক্ষর যাবতীয় প্রার্থনা। অকর্মণ্য নামক বিশেষণে জর্জরিত হয় অরুণাক্ষ। পুরুষের একমাত্র নীরব ঘাতক অর্থনৈতিক অক্ষমতা। সেই ঘাতক দিন-রাত কুরে কুরে খায় অরুণাক্ষকে।

পাশের ঘরে ছাত্র পড়াচ্ছিল সঞ্চারিণী। এই সময় মিলি-মেহুও বইপত্র নিয়ে মায়ের কাছে পড়তে বসে। অতীতের মেধাবী সঞ্চারিণী আজ বড় কঠিন শিক্ষিকা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ডিগ্রি সঞ্চারিণীকে কেবল উচ্চশিক্ষা দেয়নি, সেই সঙ্গে খানিক দম্ভের প্রলেপ লেপে দিয়েছে তার শ্বেতপাথরের মতো মসৃণ গালে। কিন্তু বিয়ের আগে সেই দম্ভ প্রকাশ্যে আসেনি। তখন সঞ্চারিণীর ব্যবহারে কেবল নিখাদ প্রেমেরই প্রকাশ ছিল। নিজের চেয়ে অধিক শিক্ষিতা এবং সুন্দরী সঞ্চারিণী যখন অরুণাক্ষর বিয়ের প্রস্তাবে এককথায় রাজি হয়েছিল, তখন অরুণাক্ষ ভেবেছিল, এ গভীর প্রেম এবং মনের টান ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়। সেই ঘোর কেটেছে বহু পরে।

সঞ্চারিণী যখন রান্নাঘরে প্রবেশ করল, বাসনের ঝনঝনানিতে অরুণাক্ষ চমকে উঠল। বোতল ভরতে গিয়ে খানিক জল চলকে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু অন্যদিনের মতো সঞ্চারিণী রাগতস্বরে কথা শোনাল না। অরুণাক্ষ বুঝল, গতকাল ওর দিদির কানপাশার উজ্জ্বলতার কাছে ম্লান হয়েছে সঞ্চারিণীর যাবতীয় সান্ধ্যসুখ। অমন একজোড়া কানপাশা দিয়ে কান সাজাতে না পারলে নারীজন্ম অর্থহীন। এই লজ্জায় অরুণাক্ষর দু'কান কাটা যাওয়াই কাম্য। গুণবান স্বামীর যাবতীয় ঐশ্বর্য প্রকাশ পায় স্ত্রীর সাজসজ্জায়। আর এ বিষয়ে অরুণাক্ষ এক দারুণ দৈন্যতার পরিচায়ক। মুঠোফোন বের করে সেইদিনের সোনার বাজারদরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল অরুণাক্ষ। এতে স্বর্ণব্যবসায়ীর লাভ-লোকসান বিশেষ হল না। কেবল পুরুষ হৃদয়ের অক্ষমতা এবং দীর্ঘশ্বাস পরষ্পরকে গাঢ়ভাবে আলিঙ্গন করল।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বাইকের দিকে চেয়েছিল অরুণাক্ষ। বাইকটা বিক্রি করে দিলে ওর অনেক অসুবিধা হবে। এই মুহূর্তে স্কুলবাসের জন্য অতিরিক্ত খরচ ওর কাছে বিলাসিতার সমান। অফিস যাওয়ার পথে এই বাইকে চাপিয়েই মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়। ভিড় বাসে চেপে স্কুলে যেতে ওদের ভারি কষ্ট হবে। আর কোনও পথ খুঁজে পায় না অরুণাক্ষ। অস্থির লাগে ভীষণ। দৃষ্টি ঝাপসা হয়। একটা চেনা মুখ ক্রমে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। না না! এসব স্বপ্ন। রাজু এখানে কোথা থেকে আসবে? অসহায়তার মুহূর্তে অরুণাক্ষ নিশ্চয়ই অবচেতন মনে বাড়ির ছাদে পৌঁছে গিয়েছিল! তাই রাজুর দেখা পেল।

"দাদা, কেমন আছিস?"

স্বপ্ন নয়। মনের ভুল নয়। সত্যিই একমাত্র বোন রাজন্যা দেখা করতে এসেছে অরুণাক্ষর সঙ্গে। দাঁড়িয়ে আছে ওর একেবারে সামনে। রাজন্যার সঙ্গী একজন সুদর্শন পুরুষ।

"রাজু তুই!"
"তোর সঙ্গে কথা আছে দাদা।"
"মায়ের শরীর কেমন আছে?"
"ঠিক আছে। মা আমাকে তোর কাছে পাঠাল।"
"আমার কাছে! কী ব্যাপার?"
"ওর নাম প্রত্যূষ। দু'মাস পর আমরা বিয়ে করছি। তোর হাতে আধঘন্টা সময় হবে দাদা? কিছু কথা ছিল।"

অরুণাক্ষর ফোন পেয়ে ঘরের মধ্যে আনন্দে ফেটে পড়ল সঞ্চারিণী। ফোন কানে ধরে মহা উল্লাসে সঞ্চারিণী বলল, "দিদি.... রাজু এসেছে ওর সঙ্গে দেখা করতে। আমার শাশুড়ি বলে পাঠিয়েছে, বাড়ির একমাত্র ছেলেকে ছাড়া বাড়িতে শুভকাজ হয় না। আমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে বলেছে। শাশুড়ি আমার সঙ্গে আজ ফোনে কথা বলবে। ও এখন রাজু আর ওর বরকে সঙ্গে নিয়ে এ বাড়িতে আসছে। এতদিন ঐ মেয়ে একা ব্যবসার সব টাকা লুটেপুটে খাচ্ছিল। এবার আমি ঢুকব ওখানে। ওর বিয়ে হলে গেলেই সব আমার একার হবে। আমার কপাল খুলে গেল রে দিদি! আমার সুখের দিন এলো! এবারও যদি ও মানুষ বাগড়া দেয়, বাড়ি যেতে না চায়.... তুই দেখিস ওর কী অবস্থা আমি করি..."

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

সেই তো এলে ভালোবাসা প্রথম পর্ব




সেই তো এলে ভালোবাসা
সাথী দাস
প্রথম পর্ব


 


দু'কামরার ছোট ফ্ল্যাটের প্ৰতিটি কোণে অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা। জানালা-দরজায় রং-বেরংয়ের বেলুন ঝুলছে। এই ফ্ল্যাট অরুণাক্ষর নিজস্ব নয়। সে কেবল ভাড়াটে। কয়েক বছর আগে সৌভাগ্যক্রমে এক প্রবাসী বন্ধুর ফ্ল্যাট নামমাত্র ভাড়ার বিনিময়ে অরুণাক্ষ পেয়েছিল। ঠিকানা নিজের নয়, তবুও তাকে আপন করে তোলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় অরুণাক্ষর বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ভূমিষ্ঠ হওয়া দুটি কন্যাসন্তানের আজ জন্মদিন। স্ত্রী সঞ্চারিণী ছাড়া অরুণাক্ষর জীবনের অর্থ মৃত্তিকা ও মিহিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সৌভাগ্যের সন্ধানে একনাগাড়ে ছুটে চলেছে অরুণাক্ষ। আর্থিকভাবে খানিক সচ্ছল হতেও কেটে গেছে কয়েক বছর। তবু এখনও মাসের শেষে চিন্তার বক্ররেখা ওর কপালের শোভাবর্ধন করে। দীর্ঘকালীন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে অরুণাক্ষর মনে হয়, ভাগ্যদেবীকে প্রসন্ন করা এত সহজ নয়। পরমুহূর্তেই মৃত্তিকা আর মিহিকা নামক দুই চালিকাশক্তির হাসিমুখের ছবি ভেসে ওঠে ওর মনে। ওদের সঙ্গে যোগদান করে ভালোবাসার প্রতিমূর্তি সঞ্চারিণী। তখন অরুণাক্ষর সকল আক্ষেপ দূর হয়ে যায়। তবে গভীর রাতে স্ত্রী-কন্যা ঘুমিয়ে পড়লে অরুণাক্ষ একাকী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পরিবারের থেকে দূরে বসবাস করার কষ্ট ওর মনে সামান্য। শূন্য থেকে শুরু করার যন্ত্রণাও তেমন জোরালোভাবে নেই। নির্বাসন সেই অর্থে বেদনার নয়। কেবল যদি সেদিন মায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসা যেত.... অন্তত দূর থেকে মায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যটুকু পালন করার অধিকারও যদি পাওয়া যেত...

এই স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে অরুণাক্ষর মনে খেদ নেই। নিজেদের বৃহৎ পারিবারিক ব্যবসা, মা-বোন সকলের থেকেই দূরত্ব বজায় রেখেছে সে। শহর একই হলেও তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব অনতিক্রম্য। আক্ষরিক অর্থে খাতায়-কলমে ত্যাজ্যপুত্র না হলেও, অরুণাক্ষ জানে সঞ্চারিণীকে জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করার অপরাধে নিজের বাড়িতে কোনোদিন ওর ঠাঁই হবে না। তবুও মনের গোপন কোণে মাঝে মধ্যে ভেসে ওঠে বাড়ির ছাদের ছবি। নাকে ভেসে আসে পেট্রোলের গন্ধ। ভাই-বোনের খুনসুটি বাতাসে ভেসে অরুণাক্ষর কান ছুঁয়ে যায়। ভাতৃদ্বিতীয়া নিজস্ব গতিতে আসে, আবার ফিরেও যায়। ঐ একটি দিনে অরুণাক্ষর বড় কষ্ট হয়। কোমল স্পর্শের অভাবে রুক্ষ কপাল চড়চড় করে। শাড়ির দোকানের দিকে চেয়ে রাস্তার ওপরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অরুণাক্ষ ফিরে আসে। একমাত্র বোন রাজন্যার কথা মনে পড়ে।

রংয়ের ডিলারশিপ নিয়ে একটি দোকানের ওপর ভরসা রেখে প্রাথমিকভাবে ব্যবসা শুরু করেছিলেন অরুণাক্ষর ঠাকুর্দা। ভাগ্যদেবী অত্যধিক সুপ্রসন্ন হওয়ায় অরুণাক্ষর বাবার মাধ্যমে সেই ব্যবসার পরিধি বিগত চল্লিশ বছরে আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। ক্রমে স্থানীয় বাজারে রংয়ের দোকান ছাড়াও একটি পেট্রোল পাম্প, একটি উপহার সামগ্রীর দোকান ও বাজার থেকে অদূরবর্তী স্থানে কয়েকটি গোডাউন ভাড়া দেওয়া আছে। তবে সে সকল পিছুটান ছেড়ে বর্তমানে একটি ইলেক্ট্রনিক্সের শোরুমে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতনের বিনিময়ে অরুণাক্ষ শ্রম প্রদান করে। সঞ্চারিণী একাধিকবার শ্বশুরবাড়ি ফিরতে চাইলেও অরুণাক্ষ মাথা নামিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। দূরে সরিয়ে রেখেছে নিজেকে।

মানে-অভিমানে, আদরে-সোহাগে সঞ্চারিণীর সঙ্গে অরুণাক্ষ বড় সুখী ছিল। এই সুখকে চিরস্থায়ী করতে নিজের পরিবার বৃদ্ধির কথা ভেবে দুটি মানুষ কামনার সমুদ্রে একান্তে ভাসিয়েছিল প্রেমের তরী। কিছুদিনের মধ্যে তারা জানতে পারে, নতুন অতিথিরা জোড়ে আসছে। একের অপেক্ষায় দ্বিগুণ প্রাপ্তিতে স্বভাবতই মানুষের মন প্রসন্ন হয়। কিন্তু অরুণাক্ষর চিন্তা বেড়েছিল। সীমিত উপার্জনে এতবড় পরিবার প্রতিপালনের ভয় চেপে বসেছিল ওর মনে। কিন্তু প্রথমবার দুটি শিশুকন্যার মুখ দেখে দারুণ মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিল সে। এমন মায়ার টান প্রত্যেক জন্মদাতা মাত্রই বোঝে। সেদিন থেকে কোনোপ্রকার দুশ্চিন্তাকে মনে আশ্রয় দেয়নি অরুণাক্ষ। প্রাধান্য দিয়েছে কেবল কঠিন পরিশ্রম আর নিজের কর্মক্ষমতাকে।

এত বছর পরেও প্রতি মুহূর্তে একটা অপরাধবোধ অরুণাক্ষ নিজের মনের ভিতরে বয়ে বেড়ায়। মৃত্তিকা-মিহিকাকে জন্ম দেওয়ার সময় শারীরিক জটিলতার কারণে সঞ্চারিণী প্রায় মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে যায়। মৃত্তিকার ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অসুস্থতার কারণে অরুণাক্ষ তখন দিশেহারা। তিনজন মানুষকে সুস্থভাবে বাড়ি ফেরাতে অরুণাক্ষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেই আর্থিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। ছাত্র পড়ানোর মাধ্যমে সংসারের হাল ধরেছে সঞ্চারিণীও। তবে এর মাঝে বয়ে গেছে কিছু মধুর সময়। দারুণ আর্থিক অনটনের কারণে মৃত্তিকা-মিহিকার প্রথম অন্ন গ্রহণের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়নি আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে। উদযাপন করা হয়নি পাঁচ বছরের জন্মদিন। অবশেষে সংসারের টালমাটাল অবস্থা সামলে কন্যাদ্বয়ের আট বছরের জন্মদিন মহাসমারোহে পালিত হতে চলেছে। সেই আনন্দে পূর্বদিন রাত থেকে মুখরিত ছোট্ট ফ্ল্যাটের দুটি কামরা।

হই-হই করে কেটে গেল সমস্ত সন্ধ্যা। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই উৎসব সম্পর্কিত যাবতীয় আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে ফিরে গেল। অরুণাক্ষর মন তখন কানায়-কানায় পরিপূর্ণ। নতুন জামা জুতো পরে কেক কাটার সময় মৃত্তিকা আর মিহিকার আনন্দ উপচে পড়া দৃষ্টি দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য অরুণাক্ষর দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছিল। দুই মেয়ের মাঝে শুয়ে আদর করে ওদের ঘুম পাড়াতে চাইল অরুণাক্ষ। অরুণাক্ষর আদরের ভাগ নিয়ে মৃত্তিকা আর মিহিকার মধ্যে সবসময় এক অদৃশ্য ঠান্ডা লড়াই চলে। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মিহিকা বলল, "বাবি, তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো তো?"
"না, বাবি আমাকেই বেশি ভালোবাসে। তাই না বাবি?"

দুই মেয়েকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে অরুণাক্ষ বলল, "আমি তোদের দু'জনকেই সমান ভালোবাসি। হ্যাঁ রে, সারা সন্ধ্যা হুড়োহুড়ি করেও তোদের চোখে ঘুম নেই?"
"বাবি আমরা গিফটগুলো কখন দেখব?"
"আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল আমি শোরুম থেকে ফিরে সবাই মিলে একসঙ্গে দেখব। এখন তোরা ঘুমিয়ে পড়। কাল স্কুল আছে। রাত জেগে পটর পটর করছিস, সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইবি না। তখন তোদের মা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। একদম চোখ বন্ধ। আর একটাও কথা নয়।"
"গুড নাইট বাবি!"
"তোমরা দু'জন আর একদম ঝগড়া করবে না। আমি যেন কথার আওয়াজ না পাই। গুড নাইট।"

মেয়েদের ঘরের আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে ফিরল অরুণাক্ষ। ব্যস্ত হাতে ঘরের কাজ শেষ করছে সঞ্চারিণী। বিছানার চাদর বদলে ফেলল নিমেষে। সমস্ত সন্ধ্যায় দেহে জড়িয়ে থাকা প্রিয় শাড়িটা ভাঁজ করে ঝুলিয়ে দিল ঘরের দড়িতে। সঞ্চারিণীর মুখ বেশ থমথমে। ঘরের মধ্যে চাপা অস্বস্তি। অন্তত আজকের দিনে এটা অরুণাক্ষ আশা করেনি। অতর্কিতে সঞ্চারিণীকে জড়িয়ে ধরে অরুণাক্ষ বলল, "মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। তোমার অর্ধেক কাজ কমিয়ে দিলাম।"
"ঠিক আছে ছাড়ো। কাজ করছি।"
"কী হয়েছে সঞ্চারী?"
"দিদির কানপাশাটা দেখেছ? এই বছর দিদির জন্মদিনে দাদাভাই ওটা গিফট করেছে। আর আমি? সারা বছর যেটা কানে পরে থাকি, আজকের দিনেও সেটাই পরতে হল। নেহাৎ নিজে টিউশনি করে দু'পয়সা রোজগার করি, তাই একটা দামি শাড়ি পরতে পারলাম। নইলে সারা বছর যেমন শাড়ি পরি, আজও তেমন পরতে হত। মিলি-মেহুর বন্ধুদের মায়েদের সাজ দেখেছ? আমার এত লজ্জা করছিল ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে! তোমাকে পার্টি করতে বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। ভেবেছিলাম আমাকেও একটা ভালো শাড়ি বা একটা দামি গয়না অন্তত কিনে দেবে। সেগুলো পরে সবার সামনে ঘুরে বেড়াতে পারব। সমাজের পাঁচজনের সঙ্গে মিশতে গেলে পাঁচজনের সঙ্গে চলার মতো জিনিস লাগে।
-আমাকে আর একটা বছর সময় দাও সঞ্চারী। আমিও তোমাকে তোমার দিদির চেয়েও ভালো সোনার দুল কিনে দেব। মেয়েদের নতুন স্কুলে এডমিশন, সেশন ফিজ সব মিলিয়ে একটু...
-তুমি কোনোদিনই আমাকে কিছু দিতে পারবে না। সংসারের খরচ তো কমবে না, দিন-দিন বাড়বে। তুমিও আজীবন একই কথা শুনিয়ে যাবে। কী পেলাম আমি এতবড় বাড়ির বউ হয়ে? শখের বয়সে যদি শখ পূরণ করতে না-ই পারি, শেষ বয়সে টাকার বিছানায় শুয়ে কী করব? প্লিজ আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও। তোমার কথা শুনতে আমার একদম ভালো লাগছে না। বাইরে বেরোও। আমি ঘর ঝাঁট দেব। সকালে রেখা এসে এত কাজ করবে না। ঝড়ের বেগে ঘর মুছে বেরিয়ে যাবে। কী হল বেরোও!

ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দাটা অরুণাক্ষর একাকীত্বের সঙ্গী। ওখানে দাঁড়িয়ে কেটে গেল দীর্ঘ সময়। মৃত্তিকা-মিহিকা ঘুমিয়ে পড়ল। ঘর পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে অরুণাক্ষকে কেউ ডাক দিল না। অরুণাক্ষও সে রাতে ঘরে ফিরল না। ছেলে হিসেবে, দাদা হিসেবে অরুণাক্ষ ব্যর্থ। আজ স্বামী হিসেবেও ব্যর্থ হল বুঝি! এক জীবনে কি এত ব্যর্থতার ভার বহন করা সহজ? না বোধহয়...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০২৪

দূরের পাখি দ্বিতীয় পর্ব


 


দূরের পাখি

সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব



মুঠোফোনের দিকে চেয়ে হেমাঙ্গিনীর দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে। রিও প্রয়োজন ছাড়া মাকে ফোন করে না। হিসেব মিলিয়ে নেওয়ার জন্য সপ্তাহে বার দুয়েক দোকান থেকে ডাক আসে। এ ছাড়া হেমাঙ্গিনীর জীবনে তেমন ব্যস্ততা নেই।

ওর দিনের সিংহভাগ সময় কাটে বাতাসীর সঙ্গে গল্প করে, বারান্দার ঝুলন্ত টবে বসবাসকারী গাছগুলোতে জল দিয়ে আর ল্যাপটপে ঠুকঠাক করে।

হেমাঙ্গিনী পেশাগতভাবে শব্দশ্রমিক। এই পেশা ওর দায়বদ্ধতা নয়। এই ক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত অর্থের বিনিময়ে গ্যাসে হাঁড়ি চড়ে না। এ নেহাৎই নেশা। তবে স্কুল-কলেজে শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করে ম্যাগাজিন বা পত্রিকায় দু-চারপাতা লেখার শখ যে এভাবে ওকে মুক্তির পথ দেখাবে, তা হেমাঙ্গিনী কস্মিনকালেও চিন্তা করেনি।

ফ্ল্যাটে উঠে আসার পর হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে প্রতিবেশীদের আলাপ হয়েছিল বটে, তবে সেই আলাপ অন্তরঙ্গতার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। তবে আলাপ হওয়ার কিছুদিন পর হেমাঙ্গিনী বুঝেছিল, মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলার চেয়ে মনের কথা মনে জমিয়ে লিখে ফেলা ভালো। মানুষের সুসময় কিংবা দুঃসময় তিথি-নক্ষত্র মেনে আসে না। সময়ের পরিবর্তন কেবল কথার কথা। আসলে সময় নয়, মানুষ বদলায়। আর বড় দ্রুত বদলায়। যন্ত্র বিকল হলে তাকে সারিয়ে তোলা যায়। কিন্তু মানুষ বদলে গেলে তাকে জীবন থেকে সরিয়ে ফেলা ছাড়া দ্বিতীয় পথ থাকে না।

ঘড়িতে দুপুর দুটো। বারান্দায় দুটো নাইটি আলগা বাতাসে দুলছে। বাতাসী বিকেলে আসবে না। হেমাঙ্গিনীর বিছানা ছেড়ে ওঠার তাড়া নেই। দুপুরের ভাতঘুম সেরে ও আড়মোড়া ভাঙার সময় বুঝল, গায়ে বেশ জ্বর। আনমনে হেসে জানালার ভারী পর্দা টেনে দিল সে। আধো অন্ধকারে ফিকে হল আলো। চোখ বন্ধ করল হেমাঙ্গিনী।

জ্বর বড় সুন্দর অনুভূতি। মানুষ মানুষকে ছেড়ে যাওয়ার আগে দু'বার ভাবে না। যাওয়ার আগে পিছুটানহীন হওয়ার আশায় সে স্মৃতিটুকুও হজম করে যায়। এ বিষয়ে জ্বরজ্বালা অনেক উদার। ছেড়ে যাওয়ার পর স্মৃতি হিসেবে খানিক দুর্বলতা রেখে যায়।

জ্বরের চেয়ে জ্বর পরবর্তী সময়ে মানুষ বড় কাতর হয়। তখন স্পর্শক্ষুধা তীব্র হয়ে ওঠে। এখন সেই দুর্বলতায় কাতর হয়েছে হেমাঙ্গিনী। মনের ভিতর কেমন যেন করে। একাকীত্বের উষ্ণতা বুক ভেদ করে ত্বক ছুঁয়েছে। অজান্তেই নিজের কপালে হাত দিয়ে হেমাঙ্গিনী দেখল, দেহ শীতল।

এ সবই মনগড়া মিথ্যে অসুখ। ওর মনের ভিতর যে মন আছে, সেই মনে ধ্রুবর বাস। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে জুঁইফুলের মালা আনতে গিয়ে ধ্রুব জ্বর বাধিয়ে বসে আছে। ধ্রুবর জ্বর হলে সেই উষ্ণতা হেমাঙ্গিনীকে স্পর্শ করবে না? তা আবার হয় নাকি?

জ্বরের ঘোরে ধ্রুব পড়ে রয়েছে বিছানায়। জুঁইফুল তার সৌন্দর্য এবং সৌরভ হারিয়েছে। ব্যস্ত পাখি জলপট্টি দিতে ব্যস্ত। পাখির ডানার আড়ালে আত্মগোপন করতে চাইল জ্বরতপ্ত ধ্রুব। অনিদ্রার কারণে পাখির চোখের কোলে গভীর কালি পড়েছে। রুগ্ন ধ্রুবর ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারকার্য হেতু পাখি নিজে হয়েছে শীর্ণকায়া। পাখির মলিন মুখ দেখে ধ্রুবর কষ্ট হয়। পাখিকে কষে শাস্তি দেওয়া হল বটে! কিন্তু এমন শাস্তির কথা ধ্রুব ভাবেনি।

রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির সুবাস আসছে। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। এমন বৃষ্টিতে কাদায় মাখামাখি হয়ে কাঁচা পথ বেয়ে পাখির হাত ধরে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ও কি রাজি হবে? জ্বর গায়ে বাইরে যেতে দেবে? একটা ছাতার নীচে দু'জনে ভিজে জবজবে হয়ে গেলে কেমন হয়? সেই সময় যদি কাকভেজা ধ্রুব ঠোঁট রাখতে চায় পাখির তীক্ষ্ণ ঠোঁটে? ও কি বিরক্তি আর ক্ষোভমিশ্রিত দৃষ্টিতে চেয়ে ধ্রুবকে ভস্ম করে দেবে? প্রবল আপত্তিতে নিজের ঠোঁট ছিনিয়ে নেবে ধ্রুবর ঠোঁটের ভিতর থেকে? ফিরিয়ে দেবে ধ্রুবর কামনাকে?

পাখি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও। তুমি বিরক্ত হও। কুকথা বলো। আমাকে শাসন করো। মনের যত ক্ষোভ আছে, যত নীরব অভিমান.... সব উগড়ে দাও নিমেষে। আমি তোমাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। এ আমার গর্হিত অপরাধ। তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না।

পাখি তুমি পাখি হয়ে ডানা মেলে উড়ে যাও দিগন্তে। সংসার নামক খাঁচা তোমার জন্য নয়। আমি যেদিন মুক্তি পেয়ে আকাশ হবো, তুমি সেদিন পাখি হয়ে ডানা ঝটপটিয়ে ফিরে-ফিরে এসো আমার কাছে...

জ্বরের ঘোর আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরে ধ্রুবকে। গোঙানির শব্দ বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে পাখির কানে পৌঁছয় না। সমস্ত অন্ধকার কেন্দ্রীভূত হয়ে একটা উজ্জ্বল আলোর বিন্দু তৈরি হয়েছে। এ কি কেবলই দুর্যোগ? নাকি দৈবযোগ? প্রসন্ন হল পাখি? আমার পাখি! কেমন আছ পাখি? আমি প্রলাপ বকছি না। পৃথিবী ধ্বংসের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই।

ও কি লণ্ঠনের আলো? রান্নাঘর থেকে সে এসে বসেছে শয্যাপ্রান্তে? একটানা কান্নার সুর ভেসে আসছে দূর থেকে। কে কাঁদে? এ তো পাখির কান্না নয়। তবে কি চেনা গানের সুর? বৃষ্টির জলতরঙ্গ?

চেতনার অতলে ঝাঁপ দিচ্ছে স্মৃতি। সুরেলা কণ্ঠে পাখি গান ধরেছে। পাখির পা দুটো আঁকড়ে ধরতে চাইল ধ্রুব। ওর পায়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দেবে। চুমু খাবে। এ ছাড়া ক্ষমাপ্রার্থনা করার দ্বিতীয় কোনও ভাষা ধ্রুবর জানা নেই।

বৃষ্টির বেগ বেড়ে যায়। ঘনায়মান অন্ধকার রহস্যময়ীর মতো গাঢ় হয়। আমগাছের ডালে আটকে থাকা স্বপ্নঘুড়ি ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ হয়ে যায়। ধ্রুব আকুল হয়ে ডাকে, "পাখি.... আমি কেন তোমার মতো নিষ্ঠুর হতে পারলাম না!"

আমি পা মেপে বৃষ্টিসিক্ত পথে হাঁটব না। আমি বৃষ্টির জল চেখে দেখব না। সর্বক্ষণ তোমাকে শাস্তি দিতে চাইব না। তোমার অবাধ্য হবো না...

ধ্রুবর পাঁজরভাঙা আর্তি কেউ শুনল না। লাবণ্যহীন সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপে নির্মিত স্যাঁতসেঁতে একটা ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চৌপায়াতে একলা শুয়ে রয়েছে সে। সঙ্গী তার শুকনো জুঁইফুলের মালা, নিকোটিন আর তিনদিনের বাসি পাঁউরুটি। যে পাঁউরুটির ভাগ নিয়ে আরশোলার সঙ্গে চলে ধ্রুবর নিত্য বচসা। জানালায় দিন-রাত্রি নিয়ম মেনে কড়া নাড়ে। দেওয়ালের ছায়াগুলো দীর্ঘতর হতে হতে প্রেতাত্মার মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়।

ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল হেমাঙ্গিনীর। মাথার মধ্যে ও বয়ে বেড়ায় ধ্রুবর আস্ত সংসার। তার ওজন নেহাৎ কম নয়। মাথাটা ভারী হয়ে আসে। বিনবিনে ঘাম জমে চোখের কোলে। ফোনের রিংটোন আর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের যাতায়াত জানান দেয় কল্পনা ছাড়াও বাস্তবে হেমাঙ্গিনীর অস্তিত্ব আছে। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে। অর্থ, যশ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আছে। নাড়িছেঁড়া ধন রিও আছে। আর আছে প্রাক্তন স্ত্রীর তকমা।

দেবতনু...

বৃষ্টি আসে। বৃষ্টি যায়। রাস্তায় জল জমে কাদায় মাখামাখি হয় পাড়ার কুকুরটা। কেঁউ কেঁউ শব্দে ডেকে উঠলেও বৃষ্টিতে ভিজে হয়ে কেউ ওকে কোলে তুলে নেয় না। ভিজে পাঞ্জাবি আড়াল করে বুকে লুকিয়ে প্রেমিকার কাছে এসে বলে না, "আমার জন্য নয় হেম। এই অবলা প্রাণীটার জন্য এসেছি। ওকে তোমার কাছে রাখবে?"

হেমাঙ্গিনীর ঘরের দেওয়ালে কুকুরটার ছায়া দীর্ঘতর হয়। লালা ঝরে ওর জিভ থেকে। বাঙ্ময় দৃষ্টিতে জিঘাংসা! উফ! কী বীভৎস তার অভিযোগ জানাবার ভঙ্গি। অন্ধকারে নিমজ্জিত অদৃশ্য প্রাণীটা রাগে গরগর করছে। হেমাঙ্গিনীর কপালের কাছে ঝিকমিক করে জ্বলে উঠল শ্বদন্ত।

ফোন বেজে গেল। হেমাঙ্গিনী চোখ মেলল না। ভিজে চোখ মুছল না। আজ বাতাসী আসবে না। হেমাঙ্গিনীর কোনও ব্যস্ততা নেই। সঙ্গীহীন এ জগৎসংসারে হেমাঙ্গিনীর প্রয়োজন নেই।

গোঁ গোঁ করে চিৎকার করতে চাইল হেমাঙ্গিনী। বাতাসী ঘরে থাকলে কেঁদে বলত, "দিদিকে বোবায় ধরেছে গো..."

আসমুদ্রহিমাচল থরথর করে কেঁপে উঠত বাতাসীর আর্তনাদে। বাতাসী! হেমাঙ্গিনীর একমাত্র আপনার জন। জন্ম-জন্মান্তরের সই।

হেমাঙ্গিনীর বুক ধড়ফড় করে ওঠে অব্যক্ত কান্নায়। আশ্রয়ের সন্ধানে। মানুষ তুমি মানুষকে দয়া করো! মানুষ তুমি মুক্তি দাও! ভিক্ষা চাই তোমার অনুকম্পা! মানুষ তুমি করুণা করে হলেও ভালোবাসো.... আমাকে উচ্ছিষ্ট করো...

নিস্তেজ হয়ে বিছানার সঙ্গে মিশে রইল হেমাঙ্গিনী। ল্যাপটপে ভাবনার মালা গাঁথা হল না। অজস্র শব্দ অস্থির মস্তিষ্কের ইতিউতি ছড়িয়ে গেল। শহীদ হল স্নায়ুযুদ্ধের নিত্য সৈনিক। নিহন্তা হেমাঙ্গিনী।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত এবং প্রতীকী

শনিবার, ২৭ জুলাই, ২০২৪

দূরের পাখি প্রথম পর্ব


 


দূরের পাখি

সাথী দাস
প্রথম পর্ব



শহর জুড়ে ট্র্যাফিক জ্যাম। অপেক্ষা সিগন্যালের। সবুজ আলোর ছাড়পত্র পেতে মরিয়া গাড়ির চালক। ঘামে ভেজা জামাকাপড়ে বন্দি হয়ে বাসের ভিতর অপেক্ষা করছে নিত্যযাত্রীরা। কারও পোশাক হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজে জবজব করছে। ছাতা এ সময় অপরিহার্য একটি বস্তু। মিঠেকড়া বা ঝাঁঝালো রোদ্দুর, কিংবা মুষলধারে বৃষ্টি, সব ক্ষেত্রেই তার ভারী আদর। কিন্তু বৃষ্টি শেষ হয়ে যাওয়ার পর বড় অবাঞ্ছিত সে। ভিজে ছাতার বুক নিংড়ানো কান্নায় সহযাত্রী অসন্তুষ্ট হয়। ছাতার মালিকের কাছেও সে হয়ে ওঠে বিরক্ত উদ্রেককারী জড়বস্তু। স্বার্থের পৃথিবীতে প্রয়োজন শেষে প্রিয়জনও হারায় গুরুত্ব...
ব্যস্ত শহর বৃষ্টিতে ভিজেও যেন ভিজছে না। অসহনীয় গরম ব্যারিকেড হয়ে ঘিরে রয়েছে মনুষ্যদেহ। গরমের তীব্র হাঁসফাঁসানির মাঝে কয়েক ফোঁটা শান্তি নামে মেঘের প্রাচীর ভেদ করে। বৃষ্টি ভিজে মানুষের বুকে সর্দি বসে যায়। যাক না! মধ্যরাতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসাও অসম্ভব নয়। সে আসুক। রোগ-শোক-মৃত্যু অবধারিত জেনেও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে হাসিমুখে উদযাপন করতে পারে ক'জন?
ধ্রুব পারে। বাসের ভিড় ঠেলে হাতঘড়ির দিকে চেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল ধ্রুব। রাত বাড়ছে। বিবাহ বার্ষিকীর দিনেও অফিস থেকে ছুটি পাওয়া গেল না। তার ওপর বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। অবধারিত ভাবে মেঘ জমবে পাখির চোখের কোণে। অভিমানী বৃষ্টি নেমে আসাও অসম্ভব নয়।
বাস চলতে শুরু করতেই ধ্রুবর অপেক্ষার পালে বাতাস লাগে। তবুও সে ধৈর্য হারায় না। এ কেবল গাড়ির চাকা সচল হওয়ার অপেক্ষা নয়। এ অপেক্ষা ঘরে ফেরার। পাড়ার ফুলের দোকানটা খোলা থাকবে তো? পাপড়ি ঝরে যাওয়া অবহেলায় নুয়ে পড়া শেষ বাজারের একটা গোলাপ আর খোঁপায় দেওয়ার জন্য জুঁইফুলের মালা নিয়ে যদি ঘরে ফেরা যায়, তবে বোধহয় অর্ধাঙ্গিনীর সমস্ত রাগ গলে জল হয়ে যাবে।
ধ্রুবর ধূমপানের ইচ্ছে প্রবল হল। তারপরই ওর মুখে দেখা দিল চওড়া হাসি। সুখী দাম্পত্যের নিপাট সভ্য হাসি। পরিণয়ের আগে ফোনে যোগাযোগ ছিল ধ্রুব এবং পাখির। ধূমপানের কারণে অনেক অনুযোগ ভেসে আসত ফোনের অপরদিক থেকে। তখন ফোনের এপার থেকে গাঢ় কণ্ঠে ধ্রুব বলত, শাসন আর আদর দূর থেকে করতে নেই। কাছে এসে পাশে বসে হাতের ওপর হাত রেখে করতে হয়...
ধ্রুবর কথা রেখেছে পাখি। কাছে এসেছে সে। পাশে বসে শাসন আর আদর দুই-ই করেছে। তার আদুরে অত্যাচার থেকে ধ্রুবর পরিত্রাণ নেই। তবে আজ ইচ্ছাকৃত ধূমপানকে কেন্দ্র করে পাখির শাসন এবং দাম্পত্য কলহের মাত্রা পূর্বদিনের সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করবে। নোনাজলে ভিজবে পাখির চোখ। রাগারাগি হবে, অভিমানের পারদ চড়বে। শীতল দাম্পত্যের শান্ত দীঘির মাঝে তুমুল জলঘূর্ণি সৃষ্টি হবে। পাখির নরম বুক অভিমানী উষ্ণতায় ফুলে-ফুলে উঠবে। তার পরের দৃশ্য কল্পনা করে বাসের ভিড়ের মধ্যে মিশে ধ্রুবর শিরদাঁড়া বেয়ে সুখী কামনার শিরশিরে কাঁপুনি চুঁইয়ে পড়ে। মধ্যবিত্তের বাসনা...
টিং!
মুঠোফোনের পর্দায় পরিচিত নম্বর থেকে ভেসে এসেছে বার্তা। "শুভ পরিণয়কে আমি সুখী পরিণতি ভেবে ভুল করেছিলাম।" মেসেজ দেখেও ধ্রুব প্রত্যুত্তর করল না। অপেক্ষার চেয়ে বড় শান্তি এবং শাস্তি আর কিছুতে নেই। ধ্রুব আজ পাখিকে খুব শাস্তি দেবে।
ধ্রুবর কল্পনায় পাখি এখন চুপটি করে বসে রয়েছে বিদ্যুতের তারের ওপর। ডানার ঝটপটানি গেছে থেমে। জলভরা মেঘ জমেছে ওর মনের আকাশে। রামধনুর অপেক্ষায়...
ডোরবেলের শব্দে ঘোর কাটে হেমাঙ্গিনীর। কাল্পনিক পৃথিবীর মোহ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে ওর বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে। ততক্ষণে আরও বার দুয়েক ডোরবেল বেজেছে। সন্ধে থেকে রাত লিখতে লিখতে, রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেছে। হেমাঙ্গিনী বুঝতে পারেনি।
ল্যাপটপ থেকে হাত সরিয়ে চশমাটা আলতোভাবে খুলল হেমাঙ্গিনী। তড়িঘড়ি দরজা খুলতেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করল দমকা বাতাস। সেই বাতাসের ঝাপটায় ফ্ল্যাটের নিরিবিলি পরিবেশ দামি পর্দার আড়ালে আলগোছে মুখ লুকোল। ঘরে ঢুকে কোমরে কাপড় গুঁজে কলকল করে বাতাসী বলল,
-কখন থেকে বেল বাজাচ্ছি। কানে কি তুলো গুঁজে রেখেছ দিদি?
-লিখছিলাম।
-অ! লিখছিলে? এত সকালে? তোমার চোখে ঘুম নেই? আবার তুমি না ঘুমিয়ে পড়ালেখা করছ?
-ঐ আর কী!
-রাত জেগে চেহারার কী অবস্থা করেছ! সে খেয়াল আছে? তোমার তো আবার ঐ যন্তরের সামনে বসলে জগতের কোথায় কী ঘটছে, সে হুঁশ থাকে না। সসপ্যানে বসানো দুধ পুড়ে ঝামা হয়। বালতি ভর্তি হয়ে জল উপচে পড়ে মেঝে ভাসে। বৃষ্টিতে শুকনো জামাকাপড় ভিজে সপসপে হয়। এমন তালকানা মানুষ জন্মে দেখিনি বাপু। শোনো, এ বেলা বলে রাখি...
অনিদ্রার কারণে হেমাঙ্গিনীর মাথা টলছিল। চোখ বেশ জ্বালা করছিল। বিছানা হাতড়ে ক্লিপ খুঁজে মাথার অবিন্যস্ত চুলগুলো বাঁধার সময় আচমকা পিছু ফিরল হেমাঙ্গিনী। চোখ পাকিয়ে সন্দেহের দৃষ্টিতে বাতাসীর দিকে চেয়ে বলল, "আবার ছুটি?"
সোফার তলা থেকে ঝাঁটা বের করে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বাতাসী শ্রুতিমধুর কণ্ঠে আবদার করল,
-আজ বিকেলে কাজে আসব না দিদি। নাতি নিয়ে মেয়ে ঘরে আসবে। সিনেমার টিকিট কাটবে বলে রেখেছে। তিনটের শো। যেতি হবে। বোঝোই তো দিদি! মেয়ে আমার শ্বশুরবাড়ির ঘর করে। দজ্জাল শাশুড়ি মেয়েটাকে একেবারে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খেলে গো। মেয়েটা দু'দিনের জন্য বাপের ঘরে আসবে। একটু আমোদ করবে। তারপর আবার নরকে ফিরবে। এই দুটো দিন ওর কাছে না থাকলে হয়? ওকে কী পরাব? কী খাওয়াব...
-ঠিক আছে। কাল তাড়াতাড়ি আসবি।
-সে তোমায় বলতি হবে না দিদি। আমি কাল চোখদুটো মেলে আগে তোমার ফেলাডে...
-চা খাওয়াবি বাতাসী? পরে ঝাঁট দিস। আগে দু'কাপ চা কর।
ব্রাশ হাতে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হেমাঙ্গিনী বাইরের দিকে চাইল। কাচের ওপর এখনো বৃষ্টির ফোঁটা লেগে রয়েছে। আকাশের মুখ ঠিক পাখির বুকের মতোই ভার হয়েছে। সে রাতে পাড়ার মোড়ে ফুলের দোকানটা খোলা ছিল? ধ্রুব জুঁইফুলের মালা নিয়ে পাখির কাছে পৌঁছেছিল? কেমন কাটল তাদের মধুরাত? কিছুই জানা হল না। কিংবা হেমাঙ্গিনী সবই জানে। কেবল মানে না।
উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের বারান্দায় দুটো পাখি একে-অপরের গায়ে ঠোঁট ঘষে দিচ্ছে। দিনের আলোয় এমন ভালোবাসাবাসি মাখামাখি কেন? হেমাঙ্গিনী ঈর্ষাকাতর দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে রইল। ওর বুকের ভিতর একাকীত্বের নিভৃতবাস।
গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বাতাসী জিজ্ঞাসা করল,
-দিদি শুনেছ কিছু? ডাক্তারের বৌটার সঙ্গে একতলার ঐ ব্যায়াম শেখায় ছোকরার ঢলাঢলি চলছে। হবে না? বরটা দিনরাত রুগী দেখে বেড়ায়। একদণ্ড বাড়িতে থাকে নাকো। তা কচি বৌটার বা দোষ...
-মেয়ে বাড়িতে এলে তোর খুব মজা, বল বাতাসী?
-হ্যাঁ গো দিদি। নাতিটা বাড়ি মাথায় করে রাখে।
হেমাঙ্গিনীর মুখের মলিনতা বাতাসীর দৃষ্টি এড়ায়না। বোধহয় সকল শ্রেণির নারীর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে সন্তানস্নেহ ঘুমিয়ে থাকে। মাতৃত্বের মাপকাঠিতে হেমাঙ্গিনী-বাতাসী মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সামাজিক দূরত্ব লঘু হয়। হেমাঙ্গিনীর নিস্পৃহ মুখ দেখে ওর মনের গভীরে ওঠা ঝড়ের আভাস বাতাসী পায় না। তবে হেমাঙ্গিনীর চোখের আয়নায় স্পষ্ট ধরা পড়ে উৎকণ্ঠামিশ্রিত হতাশা। বাতাসীর কণ্ঠে আশ্রয় নেয় সমবেদনা। "রিও কবে আসবে দিদি?"
হেমাঙ্গিনী প্রথমে উত্তর দেয় না। ধূমায়িত চায়ের দিকে চেয়ে কিছুক্ষণ পর বলে, "ছুটি পেলে নিশ্চয়ই আসবে।"
হেমাঙ্গিনীর নিভে আসা কন্ঠস্বরে বাতাসী কথা হারায়। প্রতিবেশী ফ্ল্যাটের হাঁড়ির খবর অতিরিক্ত রঙয়ের প্রলেপ দিয়ে বলা হয় না। মেঝেতে বসে কার্পেটে আঙুল ঘষতে ঘষতে বাতাসীর ঠোঁটের কোণে হঠাৎ হাসি ফুটে ওঠে।
বাতাসী জানে হেমাঙ্গিনীর লেখাপড়ার সে কিছুই বোঝে না। তবুও হেমাঙ্গিনী নিজের লেখা গল্প বাতাসীকে শোনায়। সময়ে-অসময়ে গল্পের বিবিধ সম্ভবনা নিয়ে তার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে। বাতাসীর স্বল্পবুদ্ধিতে যা মনে হয়, ও তাই অনর্গল বকবক করে যায়। বাতাসী বুঝতে পারে, তার পরামর্শ হেমাঙ্গিনীর কোনও কাজে লাগে না। তবে তার বাক্যের প্রাবল্যে মুখরিত হয়ে থাকা সময়টুকু নিঃসঙ্গ হেমাঙ্গিনীর একমাত্র সঙ্গী। বাতাসী জিজ্ঞাসা করে, "কাল রাত জেগে কী লিখলে? দু'চার পাতা শোনাও দেখি।"
বাতাসীর মনোভাব বুঝে হেমাঙ্গিনী রহস্য করে বলে,
-রাত জেগে রাত লিখেছি। রাতের পর সকাল খুঁজেছি। ভোরের নরম আলোয় পাখির গান শোনার আশায় চোখ মেলে, দিগন্তরেখায় মিলিয়ে যাওয়া দূরের পাখি দেখেছি...
-তোমার বাপু যতসব গোলমেলে কথা! কিছুই বুঝি না।
-থাক। আর বুঝে কাজ নেই। এবার নিজের কাজে হাত দে। বাড়ি ফিরে তোর আবার রান্না আছে না? যাওয়ার সময় টাকা নিয়ে যাস। নাতিকে কিছু কিনে দিবি। বলবি, দিদিমণি দিয়েছে।
আজ যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে গগনচুম্বী বহুতল, বছর দশেক আগে একাধিক বাড়ির সঙ্গে সেখানে ছিল একটি বিশেষ বহুতল এবং আভিজাত্যপূর্ণ বাড়ি। হেমেন্দ্রনারায়ণ নন্দীর নাম স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতিতে আজও স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা রয়েছে। বাজারে তিনটি শাড়ির দোকান ছাড়াও নামে এবং বেনামে একাধিক দোকানের মালিক ছিল সে। স্বাভাবিকভাবে তার প্রতি সমিতির নীরব পক্ষপাতিত্ব ছিল। ফলস্বরূপ সে ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি পদ অলংকৃত করে বসেছিল। তবে তার কর্তৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর হেমাঙ্গিনী অথৈ জলে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সমিতির সাহায্যে সহজেই ব্যবসার মালিকানা লাভ করে হেমাঙ্গিনী নন্দী।
জন্মের পর অধিক রক্তক্ষরণের ফলে জন্মদাত্রীকে হারিয়েছিল হেমাঙ্গিনী। স্ত্রীর মৃত্যুর পর হেমেন্দ্রনারায়ণ দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করেনি। একমাত্র কন্যার প্রতি অন্ধস্নেহের ফলে দ্বিতীয় কোনও নারীর অস্তিত্ব স্বীকার করতে তার মন সায় দেয়নি। একটি কন্যাসন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও, শুধুমাত্র বৈষয়িক কারণে পাত্র হিসেবে হেমেন্দ্রনারায়ণের বাজারদর যে সে সময় তুঙ্গে ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের মাঝে দেখা গিয়েছিল তুমুল উৎসাহ। কিছু আত্মীয়-স্বজন দ্বিতীয় বিবাহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে হেমেন্দ্রনারায়ণের চক্ষুশূল হয়েছে। মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া দেবাঙ্গিনীর অপূর্ব সৃষ্টি হেমাঙ্গিনীকে বুকে আগলে সমগ্র জীবনকাল অতিবাহিত করে গেছে হেমেন্দ্রনারায়ণ।
সময় বদলেছে। পরিবর্তিত সময়কে সাদরে গ্রহণ করে জনমানবহীন পৈতৃক ভিটে প্রোমোটারের হাতে তুলে কয়েক বছর আগে হেমাঙ্গিনী উঠে এসেছে দু'কামরার এক টুকরো ফ্ল্যাটে। এই একই টাওয়ারে ওর আরও দুটি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া আছে। অর্থের অভাব হেমাঙ্গিনীর অতীতে ছিল না, বর্তমানে নেই। ভবিষ্যতে হওয়ার তেমন জোরালো সম্ভবনা নেই। তা সত্ত্বেও ওর যে কী নেই, তা হেমাঙ্গিনী নিজের মনের ভিতর খুঁজে বেড়ায়...
ভালোবাসার উষ্ণতা ফুরিয়ে যাওয়ার পর যেমন স্মৃতির জেদি সর এঁটো মনে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকে, তেমন সর পড়েছে কাপের গায়ে। চক্ষুলজ্জার খাতিরে সেই সর আস্বাদন করা হয় না। যদি কেউ হা-ঘরে বলে বিদ্রুপ করে! যদি হ্যাংলামির প্রভাবে নষ্ট হয় উচ্চবিত্তের আভিজাত্য! সেই দুঃসাহস থাকলে হেমাঙ্গিনী কি কাপের সরটুকু চেটেপুটে খেয়ে ফেলত না?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দা থেকে বাইরের দিকে চাইল হেমাঙ্গিনী। পাখিদুটো উড়ে গেছে। হয়তো ওরা লোকচক্ষুর আড়ালে পরস্পরকে এঁটো করতে গেছে। বাতাসী ডাকছে। রান্নার জোগাড় করবে। কী রান্না করবে, তাও হেমাঙ্গিনীকেই বলে দিতে হবে। উদর বড় বিড়ম্বনা!
হেমাঙ্গিনীর মন প্রাণপণে এঁটো হতে চায়। অজ্ঞাতবাসে যেতে চায়। কাপের সর পড়া চা হয়ে ঘুম ভাঙাতে চায় কোনও একজনের। জানালায় ফুড়ুৎ করে উড়ে বেড়ানো পাখির গান শুনতে চায়। কিন্তু সে কথা মুখ ফুটে প্রকাশ্যে বলা যায় না। বাতাসীকেও জানানো যায় না। ওকে কেবল রহস্য করে বলা যায়.... রাত জেগে রাত লিখি। বাতাসীকে যদি ভুলক্রমে বলে; হেমাঙ্গিনী এঁটো হয়ে বাঁচতে চায়, তবে ও নির্ঘাৎ এঁটো বাসন সিঙ্কে ফেলে পালাবে।
আপনমনে হেসে ওঠে হেমাঙ্গিনী। মধ্যরাতের বৃষ্টিসিক্ত বাসনা সকালের প্রখর তাপে ভস্মীভূত হয়ে যায়। জগতের যা কিছু নিষিদ্ধ, তা রাতের অন্ধকারে মান্যতা পায়। দিনের আলোয় তার বৈধতা নেই। দিনের বেলা হেমাঙ্গিনী হল হেমেন্দ্রনারায়ণের মতো একজন তুখোড় ব্যবসায়ীর উপযুক্ত কন্যা। দেবতনুর প্রাক্তন স্ত্রী, বাতাসীর দিদিমণি এবং রিওর মা। সর্বোপরি সে একজন চল্লিশোর্ধা নারী। এই তার একমাত্র পরিচয়।
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

ফ্রেমের বাইরে কেউ অন্তিম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস অন্তিম  পর্ব                                                           ।। স্ক্রিনে যে মুখ ফিরে আসে না।।  অবন্তী...

পপুলার পোস্ট