অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

প্রথম পর্ব


।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।।

চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ একটানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে ভিডিও এডিট করতে হয়েছে। সন্ধের আগেই পিঠ কোমর জবাব দিয়েছে। চোখ ভেঙে এসেছে ঘুমে। আর বসে থাকতে পারছিল না। তারপরই অবন্তী আশ্রয় নিয়েছে বিছানায়।

মাথায় যেন পর্বত চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। সেই যে সন্ধের মুখে ও ঘুমিয়েছিল, ঘুম ভাঙল এখন। ক'টা বাজে? সময়ের কোনও ধারণা অবন্তীর নেই। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে রইল সে।

অবন্তী নিজেকে কথা দিয়েছে, যতরকম কাজ থাক, যত ব্যস্ততাই ওকে গ্রাস করুক, কোনওভাবে ভিডিও আপলোডের সময় এদিক-ওদিক হবে না। পরিশ্রমের প্রতি প্রকৃত অর্থে সৎ হলে, সাফল্য কখনও উঁকি মেরে টুকি ব'লে পালায় না।

অবন্তী বরাবরই একগুঁয়ে মেয়ে। যদিও জেদ করে আজ পর্যন্ত ও যা করেছে, তাতে ওর ভালোই হয়েছে। অবন্তী বোঝে, যে কোনও কাজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। মাঝে-মাঝে জীবনটা যে একঘেয়ে মনে হয় না, তা নয়।

হতাশা কিংবা আলসেমি চেপে ধরলে তখন আরও বেশি জেদ চেপে যায় অবন্তীর মনে। নিজেকে শাসন করে ও বলে, ভোঁতা লোহাও ক্রমাগত ঘষতে ঘষতে এক সময় ধারালো হয়ে ওঠে। তখন সেই অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন করা যায়। সাফল্যকে এফোঁড়-ওফোঁড় করা তো খুব ছোট ব্যাপার।

অবন্তীর কাজের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা ভীষণ রকম প্রয়োজনীয়। মনোরঞ্জনের আরও একশো এক রকম পথ আজকের মানুষের সামনে খোলা রয়েছে। মাত্র এক ক্লিকেই উধাও হয়ে যাবে দর্শক। মানুষকে টেনে বেঁধে রাখতে হবে স্ক্রিনের সঙ্গে। সর্বক্ষণ ঝাঁ চকচকে বিষয়বস্তু হয়ে মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠতে না পারলে ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ফোন বেজে উঠল মৃদুস্বরে। অবন্তীর আলগা ঘুমে যেন কোনওভাবেই ব্যাঘাত না ঘটে, সেই স্পর্শকাতর বিষয়ে যন্ত্রটাও যেন সচেতন। অবশেষে চোখ টেনে খুলল অবন্তী। মা ফোন করছে।

'উমম.... বলো।'
'এই ভর সন্ধেবেলা পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস? ঘরে কি একটু সন্ধেবাতিও দিতে নেই? বুঝি না বাপু তোদের কাজ-কারবার! সারাদিন চোখ ঘুমে ঢুলঢুল করবে, রাতে পেঁচার মতো জেগে বসে থাকবি।'
'কী বলবে বলো না...'
'হ্যাঁ বলছি বলছি। বেশি কথা বললে তো আবার আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হয়ে যায়! বলছি এবার জন্মদিনে বাড়ি আসবি তো? নাকি ওই ফ্ল্যাটেই একলা পড়ে থাকবি? বাবা জিজ্ঞাসা করছিল। তুই আসতে না পারলে এবার আমরা যাব।'
'পরশু রাতে আমার ট্রেন আছে মা।'
'ও মা! সে কী! আবার ট্রেন!! ক'দিন পরই জন্মদিন। বাপ-মা যে জন্ম দিয়েছে, সেটাও মনে রাখার প্রয়োজন নেই! ও গো শুনছ...'
'আরে মা! আবার শুরু করলে...'
'হ্যালো...'
'বাবা প্লিজ মাকে বোঝাও।'
'সে আমি তোর মাকে সামলে নেব। তা কোথায় যাচ্ছিস এবার?'
'এই জন্য আমি তোমাকে এত্ত ভালোবাসি বাবা। সে তো এখন বলব না। ওখান থেকে ছবি ভিডিও পাঠাব। তুমি গেস করবে।'
'প্রত্যেকবার তোর এই না ব'লে যাওয়াটা আমাদের খুব চিন্তায় ফেলে রে! হঠাৎ রাত নেই, দুপুর নেই.... ফোন করে বলিস, এখানে আছি। ওখানে আছি। বাড়িতে তো একটু বলে যেতে হয়! কোথায় যাচ্ছিস, ক'দিনের জন্য যাচ্ছিস...'
'উঁহু! প্রথম তিন সেকেন্ডে সব রিভিল করে দিলে শেষ পর্যন্ত ভিডিও কেউ দেখবে বাবা? জীবনে ওই থ্রিলটাই হল আসল। এরপর কী হবে? এরপর কী হবে? এটা কোথায়? এখানে যাওয়ার খরচ কেমন.... এসব জানার জন্য সবাই হাঁ করে বসে থাকবে। ভিউজ আমার, টাকা আমার। গাড়ি তোমার।'
'গাড়ি মানে?'
'মানে আমি সব মনে রেখেছি। যারা তোমাকে ন্যায্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিল, তাদের চোখের সামনে তোমাদের বাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। এখানে আমি মাথা গোঁজার মতো একটা ছোট ফ্ল্যাটও করেছি। আর ছ'টা মাস অপেক্ষা করো বাবা। আশা করছি দুটো ট্রিপ মারতে পারলে গাড়িটাও হয়ে যাবে। আমাদের প্রথম গাড়ি বাবা! তুমি শুধু মাকে একটু সামলে রাখো প্লিজ!'

বোধহয় বাবার কন্ঠ বুজে এসেছিল। তবুও অবন্তীর খুব ভালো লাগল। মায়ের সামনে ও কোনওদিনই নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। ওর যত গল্প বাবার সঙ্গে। সেই বাবা গল্প করতে করতে হঠাৎ চুপ করে গেল আজ। অবন্তী জানে, বেশি আনন্দে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আর দুঃখে পাথর...

বিছানা ছেড়ে অবন্তী বাথরুমে গেল। একলা থাকার মতো এক কামরার একটা পুঁচকি ফ্ল্যাট গত বছর অবন্তী কিনেছে। হাত বাড়ালেই সমস্ত কিছু এখন হাতের সামনে পাওয়া যায়। অবন্তীর এই ফ্ল্যাটে অভাব নেই, একাকীত্বও নেই।

নিজেকে পরিপাটি রাখতে অবন্তী বড় পছন্দ করে। ব্রাশ করতে করতে বাথরুমের আয়নার দিকে চেয়ে অবন্তী ভাবল, এমন বিলাসিতার জীবন সত্যিই ওর প্রাপ্য ছিল! মাত্র দু'বছরের মধ্যে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেল ও।

কলেজ ছেড়ে চলে আসার দুঃখটা এখন অবন্তীকে আর কাবু করতে পারে না। রাতারাতি এই গগনচুম্বী সাফল্য ওর সমস্ত দুঃখ ঘুচিয়ে দিয়েছে। অবন্তীর একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে সর্বক্ষণ সজাগ রয়েছে প্রায় আট লক্ষ অনুসরণকারী। ফোনটা হাতে তুলে নিলেই তারা নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে অদৃশ্য শক্তিকে সঙ্গী করে।

এই লোক দেখানো জীবন নিয়ে অবন্তী বেশ খুশি। ক্যামেরার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদেখা ভয় নিয়ে ওর বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ক্যামেরার সামনে ঝকঝকে হাসি আর বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা ওর একমাত্র মূলধন। ক্যামেরার বাইরের অদৃশ্য সন্ত্রাস সম্পর্কে কেউ না জানলেও তেমন ক্ষতি নেই। ডিজিটাল জনপ্রিয়তার অভিশাপ ওকে আজ পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি।

হলদে ফুলওলা সিঙ্কে কুলকুচি করে জল ছুঁড়ে দিল অবন্তী। দেখনদারির স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টগুলো থরে থরে সাজানো রয়েছে বাথরুমের একদিকে। ব্র্যান্ড প্রোমোশনের জন্য এসব জিনিস প্রায় প্রত্যেক মাসে ওর ঠিকানায় আসে। ক্যামেরার সামনে বাধ্য হয়ে কিছুক্ষণের জন্য এগুলো ব্যবহার করে প্রশংসার বন্যায় ভেসে যেতে হয়। তারপর জিনিসগুলো আবর্জনার মতো জমতে থাকে ঘরের এককোণে। সবই যে খারাপ তা নয়। কিছু জিনিস সত্যিই ভালো হয়। সেগুলো অবন্তী রেখে দেয় নিজের ব্যবহারের জন্য।

সময়বিশেষে অবন্তীরও দুঃখ হয়। এখনও ও 'না' বলতে শিখল না। বোল্ড ফটোশুট? আগেপিছে কিছু না ভেবে হ্যাঁ বলে দিল। ব্রাইডাল ফটোশুট? এককথায় হ্যাঁ। অকারণ কোল্যাব? হয়তো এতে অবন্তীর কোনও লাভ নেই। তবুও টাকার জন্য রাজি হয়ে যায় সে। অবন্তীর এখন একটাই পরিচয়, ও হল কন্টেন্ট। সেই অর্থে মানুষ নয়।

মানুষের কিছু অনুভূতি থাকে একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু অবন্তীর হাসি-কান্না, মনখারাপ, ব্যক্তিগত ভাবনা আবেগ সবই বিক্রি হয় খোলা প্ল্যাটফর্মে। বিনিময়ে ড্যাশবোর্ডে বিছিয়ে থাকে ঘন সবুজ গালিচা। হু-হু করে বৃদ্ধি পায় অনুসরণকারীর সংখ্যা।

অবন্তীর কাছে মানুষের পরিচয় মানুষ হিসেবে নয়। তারা কেবল একটা সংখ্যা, এনগেজমেন্ট, রিচ। দর্শকও সেই অর্থে নেটনাগরিক নয়। তারা আসলে অবন্তীর শিকার। অবন্তী গিলে খাচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়। জাগিয়ে দিচ্ছে তাদের লোভ। দর্শকের মনের গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসাপরায়ণতা, প্রতিযোগিতা.... সমস্তই জলের দামে দেদার বিকিয়ে যাচ্ছে। অবন্তীর খাতায় জমা হচ্ছে প্রচুর টাকা। কিন্তু ওর জন্য খরচ হয়ে যাচ্ছে আট লক্ষেরও বেশি মানুষ। অথচ তারা জানতেও পারছে না।

কে কাকে দেখছে? তারা অবন্তীকে দেখছে? না! হাসে অবন্তী। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। অবন্তী প্রতি মুহূর্তে ঈগলের দৃষ্টিতে দেখছে তাদের। মন্তব্য বিভাগ থেকে তাদের ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারে অবন্তী। তাদের রাগ, ঘৃণা, হতাশা, আক্ষেপ.... প্রবল হয়ে ওঠে রিপু। তার দমন অসম্ভব। মানুষকে খেপিয়ে তোলার যে ছলাকলা অবন্তী বিগত কয়েক বছরে রপ্ত করেছে, সেই মোহ থেকে একজন অনুসরণকারীরও নিষ্কৃতি নেই।

অবন্তী যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রাণবন্ত, সুহাসিনী এবং বাকপটু। পরিবেশিত বিষয়বস্তুর মধ্যে দুর্দান্ত উপাদান রয়েছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা চলে না। কিন্তু তার উপস্থাপনা অত্যন্ত ঝকঝকে। যদিও মনের ভিতরে সে একপ্রকার স্বীকৃতির তেষ্টায় আক্রান্ত। সেই সঙ্গে আজকাল জমা হয়েছে নিদারুণ ভয়। হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া কিংবা নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

অবন্তীর ফ্ল্যাটের দরজায় রাত নামল। শহরের আলো একে একে জ্বলছে। যেন অদৃশ্য কোনও হাত আকাশের গা হাতড়ে আলোর সুইচ টিপে দিচ্ছে। রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল অবন্তী। বাতাস যেন ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে। নীরবতার মধ্যে ভেসে আসছে অচেনা শব্দ। ঠিক শব্দও নয়, যেন ফিসফিস করে কেউ ডাকছে। অবন্তীর নাম ধরে...

এসবে অভ্যস্ত অবন্তী। রাতে একা থাকলে মনে হয় ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটা আসবাব এখনই কথা বলে উঠবে। প্রথমে একা থাকতে বেশ অসুবিধা হলেও এখন বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে। স্ক্রিনের নীলচে আলো অবন্তীর মুখে অদ্ভুত ছায়া ফেলে রেখেছে।

ভিডিওতে দ্রুতগতিতে কাটছাঁট চলছে। ফ্রেমের পর ফ্রেম, শব্দের পর শব্দ। রাতই অবন্তীর কাজের সময়। কীবোর্ডে আঙুল চলতে থাকে অবিরাম। কিন্তু মনে হয় যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে হঠাৎ যেন আর একটা ছায়া দুলে উঠে। চমকে তাকায় অবন্তী। কোথাও কিছু নেই।

ফ্ল্যাটের বাইরে অলৌকিক রাত নেমে এসেছে। বাতাসে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল অবন্তী। একটু ফাঁক পেলেই ওখান দিয়ে বেয়াদপ হাওয়া ঢুকে পড়ে। লিফটের দিক থেকে ধাতব শব্দ এল। ডিং! করিডোরের দেওয়ালে আলো-ছায়া কেঁপে ওঠে, যেন দেওয়ালগুলো শ্বাস নিচ্ছে।

কাজে একদম মন বসছে না। বিরক্ত লাগছে। হেডফোন খুলে ছুঁড়ে ফেলতেই নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে আসে। নিজের শ্বাসের শব্দও অবন্তীর কাছে ঘোর অচেনা লাগে। স্ক্রিনে পজ করে রাখা ভিডিওতে থমকে গেছে অবন্তীর মুখ। যেন রক্তশূন্য প্রাণহীন রুক্ষ একটা মুখ। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম স্থির।

অবন্তীর অস্বস্তি বাড়ল। ভিডিওর এফেক্টটা ও বদলে দিল। হ্যাঁ, এবার মানুষের মতো লাগছে। সেই মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে ভাবটা চলে গেছে। প্রত্যেকবার এই একই ফিল্টার ব্যবহার করে অবন্তী। তবে আজ নিজেকে দেখে এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?

ল্যাপটপের ওপর অবন্তীর হাত থেমে যায়। ও বেশ বুঝতে পারে, ওকে গিলে খাচ্ছে ভয়। নাঃ! অনেক কাজ হয়েছে। এবার সত্যিই একটা লম্বা ছুটি দরকার। উল্টোপাল্টা ভাবনারা মাথায় ভিড় করছে।

অবন্তী মনস্থির করে এই ছুটিতে ও কেবল বেড়াবে। ট্রাইপড আর ক্যামেরা নিয়ে বেশি কারসাজি করবে না। আরামদায়ক চেয়ারে বসে আড়মোড়া ভেঙে একবার বাঁই করে ঘুরে যায় অবন্তী।

ঘরের বাইরে নিশুতি রাত হাসে না, কাঁদেও না। শুধু ধীরে ধীরে অবন্তীর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।

।। ফিল্টারের আড়ালে ফাঁদ ।।

নাকের সামনে ম্যাগির বাটিটা নিয়ে বড় করে শ্বাস নিল অবন্তী। জিভে জল এসে গেল। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার ও সাধারণত খায় না। তবে আজ কাজে যখন একটু ঢিলেমি দেওয়া হয়েই গেল, তখন একদিন খাবারেও চিট করাই যায়।

একনাগাড়ে হাবিজাবি স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহারের ফলে অবন্তীর মুখের চামড়াটা বেশ রুক্ষ হয়ে গেছে। শুকনো খোসার মতো মৃত কোষগুলো উঠছে। মা থাকলে চিৎকার করে বলত, অবন্তী সাপের মতো খোলস ছেড়েছে। এখন কিছুদিন ব্র্যান্ড প্রোমোশনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।

চামড়ার ক্ষতি করে শুট করাই যেত, কিন্তু মানুষকে নিজের বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ দেওয়া যেত না। মিথ্যে ব্যাপারটা খানিকটা ফিল্টারের মতো। এমনিতে বেশ ভালো, কিন্তু প্রকৃত রূপটা ধরা পড়ার আগে পর্যন্তই।

মুখের চামড়াটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নিজের কন্টেন্ট বদলে নিয়েছিল অবন্তী। কিন্তু একই ফ্ল্যাটের হোম ট্যুর আর কতদিন মানুষ দেখবে? ঘরের প্রতিটি দরজা-জানালার পর্দা, এমনকি বালিশের কভার থেকে শুরু করে অবন্তীর মেঝের পাপোষের রঙ পর্যন্ত মানুষ জানে। ঘরের প্রত্যেকটা কোণ ছুঁয়ে গেছে যান্ত্রিক ক্যামেরার লেন্স।

অগত্যা অবন্তীর ক্যামেরা ঘুরে গেছে নিজের থালার দিকে। স্বাস্থ্যকর কন্টেন্টের জন্য সমস্ত দিন স্যালাড আর ডালিয়ার খিচুড়ি খাওয়ার পর রাতে একবাটি মশলাদার ম্যাগি যেন অমৃত মনে হচ্ছে। সুড়ুৎ করে খানিকটা ঝোল টেনে নিতেই সরাসরি নাকে উঠে গেল মশলাটা।

খ্যাক-খ্যাক করে কাশি শুরু হল। সেই সঙ্গে নাক জ্বালা করছে। জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সমস্ত ঘর ডুবে গেল অন্ধকারের অতলে। হঠাৎ স্থির হয়ে থাকা ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে চমকে উঠল অবন্তী।

গোটা ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তার মধ্যে স্ক্রিনে ফ্যাকাশে অবন্তী একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তার চোখে কেমন যেন আতঙ্ক বিস্ফারিত শীতল দৃষ্টি। ঘরের অন্ধকারে বিদ্যুতের অভাব স্পষ্ট।

অস্ফুটে একটা আওয়াজ বেরিয়ে গিয়েছিল অবন্তীর কন্ঠ চিরে। কাশির দমকে চোখে জল আসছে। দৃষ্টি ঝাপসা। অবন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। এখনও স্ক্রিন থেকে অবন্তী চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তবে চাউনিটা আগের মতো অস্বস্তিকর নয়।

এই প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে অবন্তী ভিডিও আপলোড করতে পারল না। ও স্পষ্টই বুঝতে পারল, বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না আর। ল্যাপটপ বন্ধ করে অবন্তী বিছানায় উঠল।

ম্যাগির বাটির একটা সাধারণ ছবি তুলে অবন্তী শান্তি পেল না। খাবারের সেই ছবির ওপরে একের পর এক ফিল্টার লাগিয়ে চলল। তারপর খুলল নিজের ইন্সটা। আইডির নাম আরবান কুইন অবন্তী, ঝকঝকে প্রাণোচ্ছল একজন মানুষের ছবি রয়েছে। শতরকম ফিল্টার পেরিয়ে একবাটি ম্যাগির ছবি স্টোরিতে ঝুলিয়ে সেই রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আরবান কুইন।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ফ্রেমের বাইরে কেউ অষ্টম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস অষ্টম  পর্ব                                                                     ।। লাস্ট আপলোড ।।  অনেক কাঠখড় প...

পপুলার পোস্ট