অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

প্রজাপতির মৃত্যু (প্রথম পর্ব)


 

প্রজাপতির মৃত্যু

মন প্রজাপতি

প্রথম অধ্যায়
সাথী দাস
প্রথম পর্ব


বাবার সামনে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়েছিল দীপমালা। শৈশবেই মাতৃহারা সে। বাবা দিগম্বর চাটুজ্যে বর্তমানে মালার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। এই কন্যার কারণে অকালে স্ত্রীবিয়োগের পর দ্বিতীয়বার নতুনভাবে জীবন শুরু করার কথা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি। হাসপাতাল, রোগী, ঘরকন্না সব একা সামলে মালার যাবতীয় স্বপ্নকে স্বহস্তে রূপদান করেছেন ডক্টর দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বড় সাধ ছিল, দুই কামরার ছোট চেম্বারটা ছাড়িয়ে চিকিৎসার পরিধি আরও বৃদ্ধি করবেন। একমাত্র কন্যার হাত ধরে অদূর ভবিষ্যতে বাড়ির পার্শ্ববর্তী জমিতে বড় একটা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন। যেখানে সপ্তাহে একদিন সমস্ত দুঃস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করবেন বাবা ও মেয়ে। নিখরচায় তাদের রক্ত-মল-মূত্র পরীক্ষা করা হবে। ধীরে ধীরে অনেক বড় হবে সেই হাসপাতাল। একাধিক ডাক্তার ও দরিদ্র রোগীর কোলাহলে মুখরিত হবে পাড়া। নিজের স্ত্রী-র নামে ওই হাসপাতালের নামকরণ করবেন তিনি। আর দিগম্বর চাটুজ্যের পরবর্তী উত্তরসূরী হবে তাঁরই সুযোগ্যা কন্যা ডক্টর দীপমালা চট্টোপাধ্যায়! কিন্তু এই স্বপ্নপূরণের জন্য নূন্যতম উৎসাহটুকুও, মেয়ের মধ্যে কোনদিন দিগম্বর দেখতে পাননি। সাহিত্যকে ভালোবেসে কলা বিভাগে যখন মালা ভর্তি হতে চাইল, দিগম্বর বিন্দুমাত্র আপত্তি করেননি। মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাধীনতাকে সর্বদাই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। কিন্তু আজ তিনি মালার মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। স্নাতকোত্তর বিবাহযোগ্যা মালার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে দিগম্বর বলে উঠলেন,

-তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাটা উচ্চারণ করলে কী করে মালা? এই বাড়ি, গাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, তোমার মা আর ঠাম্মির এত গয়না.... এইসব দিয়ে বিয়ে দেওয়ার পর একটা বেকার ছেলেকে নিজের জামাই...
-এসব আমার চাই না বাবা।
-তুমি উচ্চশিক্ষিতা মালা। নিজের ভালোমন্দ বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এটা বোঝার পরই আমি তোমাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার করেছ। তুমি ভাবলে কী করে একটা ভিখারি ভ্যাগাবন্ড বেকার ছেলের সঙ্গে আমি আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেব? নিজের শিক্ষা, বংশপরিচয়, ক্লাস.... সব ভুলে তুমি একটা রাস্তার ছেলের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছ!
-ও রাস্তার ছেলে নয় বাবা! উচ্চবংশের ছেলে। বাবা নেই। মা ওকে জন্ম দিয়েই মারা গেছেন। কাকার সংসারে আশ্রিত। পরিমিত টাকার অভাবে এত বছর ধরে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। অর্থাভাবে এখনো ছাত্র পড়ায়। একটা চাকরির জন্য দিনরাত হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
-বিয়ের পর ও কোথায় রাখবে তোমাকে? মেসে? নাকি ওই কানাগলি পেরিয়ে অন্ধকার বস্তির ঘরে? যেখানে সাক্ষরতার নামে সে সারারাত সমাজসেবা করে বেড়ায়!
-ও ঐ নিষিদ্ধ পল্লীতে যায় ওদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে পড়াতে, অন্ধকার গলিতে একটু শিক্ষার আলো জ্বালাতে যায়। নিষিদ্ধ পল্লীর অস্পৃশ্য মানুষগুলো ওকে দেবতার মতো পুজো করে বাবা। মাস্টারদা বলে ডাকে। ওর সামনে কোনরকম কটুকথা উচ্চারণ পর্যন্ত করতে পারে না, ওকে এতটাই সম্মান করে। আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি। আমি তোমার মেয়ে বাবা। আমি কী কোন ভুল করতে পারি? তুমিই বলো!
-তুমি ওইসব জায়গায় গেছ? এত অবনতি তোমার!
-হ্যাঁ গেছি। তো কী হয়েছে? মানুষের রোগ হলে তুমি কী চিকিৎসা করার আগে রোগীর পরিচয় জেনে চিকিৎসা করো? রোগিনীর অবস্থান যদি নিষিদ্ধ পল্লীতে হয়, তার প্রাণ বাঁচাতে তুমি ওই অন্ধকার গলিতে যাবে না?
-এতদিনের শিক্ষা তোমাকে বাবার মুখের ওপর কথা বলতে শিখিয়েছে? এতখানি ঔদ্ধত্য!
-না। তুমি আমাকে এতদিন ধরে যে শিক্ষা দিয়েছ, সেই শিক্ষা আমাকে শিরদাঁড়া সোজা রেখে সঠিক কথা বলতে শিখিয়েছে। সেটা আলাদা বিষয়, যে তুমি আমার স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে আজ ঔদ্ধত্য খুঁজে পাচ্ছ.... অথচ, এটা তোমারই শিক্ষা!
-আমি ঐ ছেলেকে মানব না।
-আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
-বেশ। তবে সিদ্ধান্ত নাও, আমি.... নাকি ওই ছেলে? দু'জনকে একসঙ্গে তুমি নিজের জীবনে রাখতে পারবে না। কোন ভদ্রসমাজে আমি তাকে নিজের জামাই বলে পরিচয় দেব না।

মালা আর মাথা তুলতে পারল না। অশ্রুভারে অবনত ওর দু'চোখ। শৈশব হতে এ যাবৎকাল পর্যন্ত পিতৃগৃহে যাপন করা সুখ-দুঃখের সকল মুহূর্তগুলো ছায়াছবির মতো ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু যৌবনে প্রেমের দাবিও বড় কম নয়। মালার দেহ আড়ষ্ট হয়ে এলো। কম্পিত শীতল হাতটা সে বাবার পায়ের ওপর রেখে মাথায় ছুঁয়ে নিল। দিগম্বর স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলেন, সর্বক্ষণের ব্যবহৃত দুটি সোনার আংটি, কানের দুল ও গলার সরু চেনটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে, শিক্ষাজীবনের যাবতীয় শংসাপত্রের ফাইলগুলো সম্বল করে, তাঁর একমাত্র মেয়ে এক কাপড়ে বিনা বাক্যব্যয়ে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে গেল। বাবার দিকে আর ফিরেও চাইল না। অসহায় প্রৌঢ় তীব্র মনোকষ্টকে সঙ্গী করে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন খোলা দরজার দিকে।

পাড়ার সর্বাধিক প্রাচীন ও অভিজাত পরিবারের একমাত্র ঠিকানা এই চাটুজ্যে আবাসন। বড় সাধ করে দীপমালার ঠাকুরদা বাড়ির নামকরণ করেছিলেন 'স্মৃতিমেদুর'। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রভাবশালী দিগম্বর চাটুজ্যের অসামান্য প্রতিভা ও পসারের কারণে বর্তমানে এই বাড়ি 'ডাক্তারের বাড়ি' নামেই পরিচিত। বাড়ির পার্শ্ববর্তী স্থানে কয়েক বিঘা জমি পড়ে রয়েছে নিতান্তই অযত্নে। জংলী ঘাস আর হাতেগোনা কয়েকটা গাছগাছালি নিয়ে দিগম্বর বাবুর সংসার। বুনো ফুলের রূপ ও গন্ধে অসংখ্য প্রজাপতির দেখা পাওয়া যায়। দিনের বেলা বাড়িতে থাকলে স্টাডি টেবিলে বসে, ওই রঙিন প্রজাপতিগুলোর দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকেন তিনি। যেন উড়ন্ত রামধনু! অজস্র রঙের সমাহার তার চোখের সামনে। কিন্তু তাঁর নিজের জীবন বড়ই বিবর্ণ। যেদিন সন্ধেবেলা চেম্বার থেকে ডাক্তারবাবু একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন, সেদিন মনটা বড় ব্যাকুল হয়। মালা চলে গেছে প্রায় তিন মাস সময় অতিক্রান্ত। প্রতিদিন সকালে দুধ দেয় যে ছেলেটি, ডাক্তারবাবু তার কাছ থেকে উড়ো খবর পেয়েছেন, যে মালা ঐ ছেলেকেই বিয়ে করে একটা এক কামরার ঘরে ভাড়া আছে। পরদিনই ওই ছেলেটির প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে, তাকে বিদায় করেন তিনি। শৈশব ও আপনজনের সকল স্মৃতি আঁকড়ে বাড়ির এককোণে একাকী পড়ে রইলেন ডক্টর দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়। সুবিশাল তিনতলা বাড়ি প্রায় জনমানবহীন। হাসপাতাল, চেম্বার আর বাড়ি, এই তিন জায়গায় দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন ডাক্তারবাবু। কথা বলার মতো একটা মানুষও তাঁর জীবনে নেই। প্রেতপুরীর মতো খাঁ খাঁ করে তাঁর জগৎ। আজ সকালে তিনি একটা লোককে ডেকেছেন। বাড়ির চতুর্দিকের আগাছাগুলো পরিষ্কার করতে হবে। তাছাড়া বাড়ির আরও কিছু কাজের জন্য সকাল থেকে একজন মানুষ ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে নেমে পড়েছে বাড়ির প্রাঙ্গনে। তাকে এক কাপ চা দিয়ে, জানালার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেও চা পান করছিলেন ডাক্তারবাবু। এমন সময় ড্রইংরুমের ফোনটা বেজে উঠল। ডাক্তার আজ ছুটির মেজাজে রয়েছেন। তাঁকে আর অসময়ে কে ফোন করবে? বড়জোর চেম্বার অথবা হাসপাতাল থেকে। আজ কোন ফোনই ধরতে ইচ্ছে করল না। কিন্তু একবার লাইনটা কেটে যাওয়ার পরেও গৃহকর্তার ইচ্ছে-অনিচ্ছের পরোয়া না করে বেয়াড়া ফোনটা আবার বেজে উঠল। চায়ের ব্যাপারে বরাবরই শৌখিন ডাক্তারবাবু। আয়েশ করে তিনি চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। অবেলায় চায়ের সুগন্ধে আবিষ্ট হতে বেশ ভালো লাগছিল তাঁর। কিন্তু সেই আমেজে ছেদ পড়ল ফোনের কারণে। একরাশ বিরক্তির উদ্রেক হল। একটি বিরক্তিসূচক শব্দ বের হল তার মুখ থেকে। চায়ের কাপ প্লেট টেবিলে নামিয়ে রেখে ফোন ধরলেন তিনি। ডাক্তারবাবুর কানের পার্শ্ববর্তী পক্ককেশ বেয়ে স্বেদবিন্দু নেমে এলো। কপালে একাধিক ভাঁজ! উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি ক্রমে ঝাপসা হয়ে গেল। শরীরটা হঠাৎই খুব খারাপ লাগতে শুরু করেছে। ফোন রেখে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বাড়ির দরজা আটকে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি, এলো গায়ে ঘর্মাক্ত লোকটা কোদাল কাস্তে আর একমুঠো ঘাস হাতে উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে ডাক্তারবাবুর গাড়িটা তীব্র গতিতে বড় গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়েছে।

সতীর্থর ফোনটা পেয়েই সরকারি হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছেন ডাক্তারবাবু। তাঁর সমগ্র দেহ কাঁপছিল। বন্ধু তাঁর কাঁধের ওপর হাত রাখার পর একটু শান্ত হলেন তিনি। একটা নির্দিষ্ট শয্যার সামনে পৌঁছে ডাক্তারবাবু আর চোখে জল ধরে রাখতে পারলেন না। রুগ্নকায় দীপমালা হাসপাতালের শয্যার সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে। সুন্দরী বিদূষী মালার দেহ প্রায় কঙ্কালসার। নারীদেহ বহু পূর্বেই স্বাভাবিক জৌলুস হারিয়েছে। দেহে অজস্র ক্ষতচিহ্ন। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে মুখের বিভিন্ন জায়গায়। রোগ জর্জরিত ক্লান্ত দেহে চোখ বন্ধ করে পড়ে রয়েছে ডাক্তারবাবুর একমাত্র কন্যা। দিগম্বরের বন্ধু কন্যাস্নেহে মালার মাথায় হাত রাখল। কোটরাগত দুটি চোখ ধীরে ধীরে মেলল মালা। মাত্র এক হাত দূরে ভেঙেচুরে যাওয়া একজন শীর্ণকায় মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মানুষটা আজন্মকালের পরিচিত হলেও, তাঁর এইপ্রকার ভগ্নস্বাস্থ্য, কঙ্কালসদৃশ দেহ মালার কাছে অচেনা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মালা। দিগম্বর বাবু মালার কাছে দাঁড়ানোমাত্রই নীরব কান্নায় ভেসে গেল সে।

ছাত্রজীবন হতেই কুসঙ্গে পড়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে যাতায়াত সূত্রে এক মধ্যবয়সী নারীর সঙ্গে বহু বছর যাবৎ গোপন সম্পর্কে আবদ্ধ দীপমালার স্বামী। কিন্তু প্রবল অর্থাভাবের কারণে ওই অন্ধকার গলি পরিত্যাগ করে নিজের মনের মানুষের সঙ্গে বেরিয়ে আসা মহিলাটির পক্ষে সম্ভব হয়নি। ঐ মহিলার দুই সন্তানসহ নিষিদ্ধ পল্লীর আরও কয়েকটি বাচ্চাকে পড়াতে শুরু করে সে। সেই সঙ্গে সকলের অগোচরে চলতে থাকে ঐ নারীর সঙ্গে প্রগাঢ় প্রেম। ইতিমধ্যেই কিছু সমাজ সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত দীপমালা ঐ পুরুষের প্রখর ব্যক্তিত্ব ও কথার জালে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে উন্মাদিনী হয়ে পড়ে। পুরুষটি মালার সেই দুর্বলতা অবগত হওয়ামাত্রই জানান দেয় আপন প্রেমিকাকে। সেই মধ্যবয়সী মহিলার পরামর্শে মালাকে প্রেম নিবেদন করে ঐ পুরুষ। তারপর কয়েক মাস ব্যাপী চলে তাদের প্রগাঢ় প্রেম এবং সবশেষে বিবাহের প্রস্তুতি! কিন্তু প্রবলভাবে বাধা আসে দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ হতে। এখানেই ঐ মধ্যবয়স্কা প্রেমিকার সকল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। দীপমালাকে বিয়ে করে তার যাবতীয় ঐশ্বর্য হস্তগত করার পর তাকে কোন অনামী অন্ধকার গলিতে ছুঁড়ে ফেলার যে পরিকল্পনা তারা যৌথভাবে করেছিল, ডাক্তারবাবুর কঠিন বাক্যের প্রভাবে মালার হঠকারী সিদ্ধান্তে সকল পরিকল্পনা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। মালা কপর্দকহীন অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসায়, সেই মুহূর্ত হতে নিজের অজান্তেই প্রেমিকের গলার কাঁটা হয়ে যায় সে। কিন্তু পূর্ব প্রেমিকার পরামর্শে নিতান্তই অনাড়ম্বর এক বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকেই অবর্ণনীয় মানসিক নির্যাতন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় দীপমালা। ততদিনে স্বামীর কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মনোবল হারিয়েছে সে। অবিলম্বে মালা জানতে পারে, তার স্বামী সম্প্রতি কিছু অসামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং বহু টাকার দেনা তার মাথায় রয়েছে। সেই দেনা শোধের জন্য দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা আদায়ের প্রস্তাব মাত্রই, মালা সেই প্রস্তাব তীব্রভাবে অস্বীকার করে। ততদিনে স্বামীর পূর্ব প্রেমিকা ও তার পিতৃ পরিচয়হীন দুই সন্তান সম্পর্কে অবগত হয়েছে মালা। অশান্তি যখন চরমে ওঠে, একদিন রাতে মালাকে তুমুল প্রহার করে তার স্বামী। অত্যাচারে জর্জরিত মালা জ্ঞান হারালে তাকে মৃত ভেবে গা ঢাকা দেয় সেই পুরুষ। আট ঘণ্টা পর জনাকয়েক সহৃদয় প্রতিবেশীর কল্যাণে ঘরের দরজা ভেঙে প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় ডাক্তারবাবুর একমাত্র কন্যাকে। সেই সময় হাসপাতালের ওয়ার্ডে কর্তব্যরত ডাক্তার দিগম্বর ও দীপমালার পূর্বপরিচিত হওয়ায়, সহজেই বাবার কাছে মেয়ের এই দুরবস্থার সংবাদ পৌঁছয়। হতভাগ্য কঙ্কালসার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ডাক্তারবাবু।

মালার অবনত দৃষ্টি বাড়ির চৌকাঠের ওপর নিবদ্ধ। নিজের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা করে, একবুক বিশ্বাস নিয়ে একদিন এই চৌকাঠ পেরিয়েছিল সে। আজ বাবার হাতের ওপর দুর্বলদেহের সকল ভার অর্পণ করে, আবার ফিরে আসতে হল সেই চৌকাঠেই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিল মালা। দিগম্বর মেয়ের মনোকষ্ট অনুভব করে বলে উঠলেন,

-বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের ফেরার রাস্তা কোনদিন বন্ধ হয় না মা! সারা পৃথিবী তোকে ছেড়ে দিলেও, তুই জানবি বাবা সবসময় তোর পাশে আছে। পিছন ফিরলেই আমাকে দেখতে পাবি তুই! ঘরে আয়। আমার লক্ষ্মী মাকে ছাড়া বাড়িটা এতদিন শ্মশান হয়ে গিয়েছিল।

সেই কান্না বাবার সান্ত্বনাবাক্যে বন্ধ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মাঝরাত থেকে তীব্র অসুস্থতা ও বমির প্রভাবে মালা প্রায় মরতে বসল। গ্রানাইট পাথরে মোড়া ঝকঝকে বাথরুমের সুবৃহৎ আয়নাটাও যেন বিদ্রুপ করছে ওকে। আয়নার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই বমি করে বেসিন ভাসিয়ে দিল মালা। সারা শরীর কেঁপে উঠল ওর। আয়নায় যে নারীর প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে, তার পেটের দিকে মালা একদৃষ্টে চেয়ে রইল।

একটা অচেনা লোক বাগানের আগাছাগুলো পরিষ্কার করছে। কত প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে তার আশেপাশে। অন্যমনস্কভাবে ওদিকে চেয়েছিল মালা। চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরছে। বাবা আজ বাড়িতেই আছেন। মাথায় বাবার স্নেহস্পর্শ অনুভব করামাত্রই মালা চোখের জলটুকু মুছে ফেলল। দিগম্বর সস্নেহে বললেন,

-এভাবে একা একা ঘরে বসে আছিস কেন মা? কাজকর্ম কিছু কর। কাজ করলে মন ভালো থাকবে। সব ভুলে থাকতে পারবি। তুই যে বলেছিলি, তোর স্কুলে চাকরি করার খুব শখ। দেখ না একটু চেষ্টা করে.... আমি দেখব? আমার চেনা পরিচিতর মধ্যে...
-ভুলতে পারব না বাবা। এখন তো আর চাইলেও ভুলতে পারব না। মানুষ চিনতে কী করে এতবড় ভুল করলাম আমি? ভদ্র-সভ্য, কত মার্জিত, শিক্ষিত, লেখাপড়া জানা একটা মানুষ.... সে কিনা ক্রিমিনাল! নূন্যতম মনুষ্যত্ববোধটুকুও নেই তার! গায়ে হাত তোলে...
-একটা কথা সারাজীবন মনে রাখিস মালা, শিক্ষার সঙ্গে মনুষ্যত্বের কোন বিবাদ নেই। মনুষ্যত্বের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু দু'পাতা বই পড়ে ফেলা কোন শিক্ষিত মানুষ যদি একবার মনুষ্যত্ব হারায়, তখন সে ঠান্ডা মাথায় মানুষও খুন করে ফেলতে পারে। শিক্ষার এমনই মহিমা! মনুষ্যত্ববোধ আছে এমন মানুষ শিক্ষিত না হয়ে, যে কেউ দু-চার পাতা পড়ে ফেলে যদি নিজেকে শিক্ষিত ভাবতে শুরু করে, তবে ঐ ক্ষেত্রে শিক্ষারও অপব্যবহার হয়। আর তার মূল্য তোদের মতো নির্বোধ মেয়েদের গোটা জীবন দিয়ে শোধ করতে হয় মা!

বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল মালা।

-বাবা এবার কী করব আমি?
-চাকরি কর। ছাত্র পড়াবি তোর কতদিনের ইচ্ছা। নিজের সেই স্বপ্নগুলো পূরণ কর। জীবনে বিয়েটাই কী সব নাকি! আমার কথা একবারও ভাববি না তুই? তোকে এভাবে দেখতে পারি না আমি! বুঝিস না কেন তুই! ওসব দুর্ঘটনা ভেবে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দে দেখি...
-পারব না বাবা! আর পারব না। কী করব আমি এবার! আমি বোধহয় ঐ জানোয়ারের একটা অংশ নিজের মধ্যে বহন করে চলেছি। জীবনে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি বাবা। কী করব আমি?

বাক্যহারা হয়ে গেলেন দিগম্বর। মালা বাবার বুকের ওপর দাপাতে শুরু করল। মেয়েকে চেয়ারের ওপর জোর করে বসিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু। ধীরকণ্ঠে বললেন,

-যদি সত্যিই তাই হয়, তবে এ সিদ্ধান্ত তোমার মালা। তাকে রাখবে না ত্যাগ করবে, এ ব্যাপারে তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি সব ক্ষেত্রেই তোমার পাশে আছি। কিন্তু এই কঠিন সিদ্ধান্তের নির্ণায়ক আমি হতে পারব না। তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। আমি আর কত বছর বাঁচব মা? দশ বছর! বড়জোর কুড়ি বছর! তারপর এই সন্তানকে তোমাকে একাই সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। সুতরাং ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও! তার ভবিতব্য নির্ণয় করার দায়িত্ব আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।
-আমার পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয় বাবা! আমি ঐ মানুষের কোন কিছুই নিজের জীবনের সঙ্গে নতুন করে জড়াতে চাই না।
-বেশ। ভালো কথা। নতুন করে জড়াতে হবে না। কিন্তু যে ইতিমধ্যে জড়িয়ে গেছে, তাকে তুই কী করে অস্বীকার করবি মা?
-বাবা তুমি সত্যিই চাও আমি এই সন্তানকে জন্ম দিই?
-আমি ডাক্তার! মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি রোগীর জীবনের জন্যই লড়াই করি। সেখানে নিজের মেয়েকে খুন করার পরামর্শ দিতে বিবেকে বাধছে। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। তুমি মা। নিজের সন্তানের ভাগ্য নির্ধারণ তুমিই করবে!

বাবা নিজের ঘরে চলে গেছে দীর্ঘক্ষণ আগে। কিন্তু বাবার ঐ একটা কথার অনুরণন মালার মনের মধ্যে এখনো অব্যাহত। বমি করতে করতে অস্থির হয়ে গেল মালা। বমন ইচ্ছা দমন করার প্রবল চেষ্টায় ওর বুক-পেট ব্যথা হয়ে গেল, তবুও ভুলতে পারল না ওই একটা ক্ষুদ্র বাক্য "তুমি মা!" ঐ ক্ষুদ্র বাক্যের মধ্যেই যেন পৃথিবীর সকল মায়া একত্রে জড়িয়ে রয়েছে। সমগ্র রাত্রিব্যাপী অজস্র চোখের জল বিসর্জন দিয়ে, নিজের পেটের ওপর পরম স্নেহে হাত রাখল দীপমালা।

হাসিমুখে মালার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়। নরম তোয়ালে জড়ানো সদ্যোজাত শিশুটি গভীর ঘুমে মগ্ন। ক্লান্ত মালার চোখেমুখে পরম প্রশান্তির স্পর্শ। এক সময় এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে মনস্থির করতে পারেনি সে। তবে আজ মনের সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে মালা বিজয়িনী।

দিগম্বর বাবু নিজের নাতিকে খুব সাবধানে কোলে তুলে নিলেন। যে মানসিক দোলচালের মধ্যে দিয়ে এই পথ মালা অতিক্রম করেছে, সেই সময়কালের যন্ত্রণা মাথায় রেখে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করল সে,

-অনির্ণেয়!
-রঞ্জক!

বাবার মুখে নবজাতকের নাম শুনে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মালা ক্ষীণস্বরে বলল,

-রঞ্জক! ভারী সুন্দর নাম বাবা।
-অনির্ণেয় কেন? সিদ্ধান্ত নিতে তার গর্ভধারিণী বড় বেশি মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে, সেইজন্য?

নিরুত্তর দীপমালা। মায়ের কোলের কাছে শিশুটিকে রেখে দিগম্বর বললেন,

-তোর জীবনের সমস্ত রং দিয়ে তোর অনির্ণেয়, আর আমার রঞ্জককে তুই বড় করবি মা। মনুষ্যত্ববোধ আছে, এমন মানুষ তৈরি করবি। আমি আশীর্বাদ করছি, অনির্ণেয় অনেক বড় হবে। সবার থেকে আলাদা হবে ঠিকই, কিন্তু সবার ভালোবাসার মানুষ হয়ে ও ভালোবাসা আদায় করে নেবে...

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে জানালার বাইরের দিকে চাইল দীপমালা। প্রায় শুকিয়ে আসা গুল্মজাতীয় গাছগুলোতে অগুনতি গোলাপ ফুল ফুটেছে। আর তাতে মহানন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে কতগুলো রঙিন প্রজাপতি...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০২২

রাখালডিহির রেললাইনে (প্রথম পর্ব)


 

রাখালডিহির রেললাইনে

সাথী দাস

প্রথম পর্ব






                                                                           ।। ১।।

শহুরে যানজট আর জনসমুদ্র পেরিয়ে দোতলা বাড়িটার সামনে পলাশের হাত ধরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল মল্লিকা। বাদলদা ততক্ষণে ওই ভদ্রমহিলাকে কিছু একটা বুঝিয়ে বলেছে। সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সন্ধিহান দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে মাসিমা হেঁড়ে গলায় বলে উঠলেন,

-দেখিস বাপু! আমি তোকে চিনি, তাই ঘর দিচ্ছি! পরে আবার উটকো ঝামেলা আমার ঘাড়ে এসে জুটবে না তো? মেয়ে তাহলে আমার ঘাড়ে আর মাথাটি আস্ত রাখবে না!
-কিছু হবে না মাসিমা। এ তো আমারই ভাই আর ভাইয়ের বউ। কোন ঝঞ্ঝাট নেই। ওদের এই শহরে আমিই ডেকে এনেছি, ছেলেটার একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য।
-মেয়েটা তো একদম কচি খুকি রে বাদল! তা এই কাঁচা বয়সে মেয়ের বাড়ি থেকে বিয়ে দিল?

শক্ত করে পলাশের শার্ট খামচে ধরে ওর পিছনে মুখ লুকোল মল্লিকা। ওর হাতে সদ্য পরা সস্তার শাঁখা-পলা আর নকল সোনালী চুড়ির রিনিরিনি শব্দ, সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদুর, কাঁধে একটা শতছিন্ন কাপড়ের ব্যাগে সামান্য মুড়কি আর বাতাসা। পলাশের ঘামে ভিজে যাওয়া শার্টটা নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে মল্লিকা নিজের একমাত্র আশ্রয় খুঁজে নিল। ইতস্তত করে বাদলদা বলল,

-আমাদের গ্রামের দিকে এইরকমই হয় মাসিমা! এই দেখো না, ছেলে ভালো বলে একটা চালচুলোহীন বেকার মানুষের হাতে মেয়েটাকে তুলে দিয়ে দায় সেরেছে ওর বাপ-মা! বিয়ের পর সংসার চলবে কী করে, দুটো পেট কীভাবে ভরবে, তার ঠিক নেই। আমাকে পলাশ বলল, দাদা সদরে একটা কাজকম্মের ব্যবস্থা করে দিতে পারো? যদি অভয় দাও, তবে তোমার ভরসায় আসব। তখন আমিই বললাম, চলে আয়। কিছু একটা ঠিক জুটিয়ে দেব।

গুমোট গরম। কৃষ্ণপক্ষের জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে আকাশে আবার বজ্রগর্ভ মেঘের আনাগোনা। বারকয়েক মেঘের গর্জনমাত্র কপালে একরাশ বক্ররেখা অঙ্কন করে বর্ষীয়ান ভদ্রমহিলা বললেন,

-বলি বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন বউটাকে ঝড়ে-জলে ভেজাবে নাকি গো ছেলে? ওই তো হাড় জিরজিরে চেহারা বাছা। গতরে মাংস বলতে কিছু নাই। হাড় ক'খানাই সার! এরপর ঠান্ডা লেগে বুকে সর্দি বসে গেলে বউকে খাওয়াবে কী, আর বউয়ের চিকিৎসাই বা করাবে কী দিয়ে? এসো, ঘরে ঢোকো। এ বাদল, তুই ওদের ওপরে নিয়ে যা। ওই যে চাবি ঝুলছে। আমি হাঁটুর ব্যথায় আর সিঁড়ি ভাঙতে পারি না বাবা!

দুটো কাপড়ের ব্যাগ আর একটা পুঁটুলি নিয়ে বাদল তড়িঘড়ি বারান্দায় উঠে এসে হাঁক দিল,

-ওই! আয় আয়!

পলাশের পিঠের সঙ্গে প্রায় লেপ্টে থাকা ভীতু মেয়েটাকে এক নজর দেখে ভদ্রমহিলা বললেন,

-বলি ঝাড়া হাত-পায়ে চলে এসেছ তো! বউ নিয়ে থাকার জন্য খাট-বিছানা আমি কিন্তু কিছু দিতে পারব না ছেলে! ওপরে একটাই ঘর, ছাদের কোণে আধখানা দেওয়াল তোলা আছে, ছাউনি দেওয়া, ওখানেই আপাতত রান্না সারতে হবে। পাশে বাথরুম। ছাদ পুরো ন্যাড়া। জলের লাইন একসাথে। দিনে মাত্র একবারই মোটর চালাব। জল বুঝে খরচ করবে। সাব মিটার আছে। আলো পাখার জন্য যেমন কারেন্ট পোড়াবে, তেমনই টাকা দেবে। চলবে তো? না চললে এই বেলা মানে মানে...
-আরে চলবে মানে? দৌড়বে মাসিমা! এই পলাশ, আয় আয়! ওপরে উঠে আয়!
-যাও বাছা! এ বাদল, একটু শোন এদিকে?
-বলো মাসিমা?
-আমি এখন একটু আরতির বাড়ি যাব। কাল ওদের কালীপুজো গেছে। আজও আমাকে যেতে বলেছে। রাতে ওখানেই খাওয়া দাওয়া! এদিকে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসছে। এদের তো রান্নার কোন জোগাড় নেই। ঝড় বৃষ্টির মধ্যে বাইরে খেতে যাবেই বা কী করে? তা তোর ভাই আর ভাইয়ের বউ আজ রাতে খাবে কী?
-ওরা দুটো মুড়ি বাতাসা চিবিয়ে...
-ও মা! ছেলের কথা শোনো! একরত্তি মেয়েটার মুখটা শুকিয়ে একদম দড়ি হয়ে গেছে। সারাটা রাত আমার ঘরে দুটো ছোট মানুষ ওই মুড়ি বাতাসা চিবিয়ে থাকবে? আর আমি লোকের বাড়ি পেটপুরে নেমন্তন্ন খেতে যাব? আমার ভিটেতে এইসব অনাসৃষ্টি কাজকম্ম চলে না। ফ্রিজে দুপুরের ভাত-ডাল, ভোগের একটু খিচুড়ি আর আলুর দম আছে। আরতি দিয়েছিল। তোর নবাবপুত্তুর ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের মুখে রুচবে কিনা দেখ দেখি বাবা!

মাথা চুলকিয়ে একগাল হেসে বাদল বলে উঠল,

-রুচবে মানে? দৌড়বে মাসিমা! মায়ের ভোগ, সে তো অমৃত! ওদের কপালে মায়ের ভোগ খাওয়া লেখা থাকলে, তুমি-আমি আটকাতে পারব মনে করেছ! তুমি রান্নাঘরের ওই মেশিন চালিয়ে গরম করে দাও। আমি ওদের খেতে দিয়েই বেরোই তবে!

একদৌড়ে দুটো থালা নিয়ে ওপরে উঠে এলো বাদল। সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি, আলুর দম, সাদা ভাত আর একবাটি ডাল। ঘরে ঢুকে বাদল দেখল মল্লিকা কোমরে কাপড় গুঁজে দ্রুতহাতে একটা কাপড় বিছিয়ে দিয়েছে মেঝের ওপর। গোটা ঘরে একটা আসবাবের চিহ্নমাত্র নেই। থালা দুটো নিয়ে দরজার সামনে বাদলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের কাপড়ের আঁচলটা কোমর থেকে খুলে তাড়াতাড়ি গায়ে টেনে নিল মল্লিকা। তখনই বাথরুম থেকে পলাশ বেরিয়ে এলো। বাদল গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

-এখানে এসব চলে না। আমি পলাশের দাদা, তোমারও দাদাভাই। আমাকে দেখে এক গলা ঘোমটার আড়ালে লুকোতে হবে না। খেতে বসো। সারাদিন তো এক দানা ভাতও পেটে পড়েনি।
-আপনিও বসুন! আমাদের সঙ্গে খাবেন।
-না। এতটুকু খাবার, তোমরাই খাও। এটা কালীপুজোর ভোগ।
-মায়ের ভোগ ভাগ করে খেতে হয় দাদাভাই। একজন পেটপুরে খেলে, আর একজন চেয়ে দেখলে, ঠাকুর পাপ দেয়।
-মলি তো ঠিকই বলেছে বাদলদা। আর ও যখন একবার মুখ থেকে বলেছে, তোমাকে না খাইয়ে ছাড়বে ভেবেছ? বসো বসো। দাদা একটু খেলে ভাইয়ের কম পড়বে না!

খিদে যে শরীরকে এতখানি কাতর করে দেয়, পলাশ প্রায় ভুলতে বসেছিল। তার অভাব থাকলেও, খিদের জ্বালা বহুকাল বোঝেনি সে। দিনরাত গাধার মতো খাটে পলাশ। একটা পেট ভরার মতো অন্নের সংস্থান করা, ওর কাছে কোন বড় ব্যাপারই না। গ্রামে থাকতে ভাতের হোটেলে একবেলা কাজ করত সে। হাত চালাতে চালাতে চুরি করে মুখে পুরে দিত কত কিছুই। আর একবেলা রেললাইনের ধারে একটা গ্যারেজে কাজ করত। গ্যারেজের পাশেই ছাউনি ঢাকা বড় একটা পরিসরে সারাদিন যাবৎ নিত্যযাত্রীদের সাইকেল আর বাইক জমা পড়ত। সেইসবের হিসেব রাখা আর গ্যারেজে কাজের মাঝে জুটে যেত পাউরুটি চা, কিংবা চা বিস্কুট। মেজাজ খুব ভালো থাকলে গ্যারেজের মালিক কোনদিন হয়তো নিরামিষ ভাত খাওয়ার টাকা দিতেন, নিদেনপক্ষে কচুরি সাদা আলুর তরকারি আর আমের আচার। অপূর্ব সে স্বাদ! গতকাল বিকেল থেকে পলাশের পেটে বারকয়েক চা বিস্কুট ছাড়া আর কিছুই পড়েনি। ভাতের পাতে বসে ক্ষুধার্ত পলাশকে সশব্দে খেতে দেখে মল্লিকার চোখ ভিজে গেল। খিদে সহ্য করার ওর ঢের অভ্যাস আছে। খিদে নেই বলে নিজের ভাগের ভাতটুকু পলাশের দিকে এগিয়ে দিতেই ওর খেয়াল হল, এখন পলাশের ওপর আরও একজন মানুষের দায়িত্ব আছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল পলাশ। খানিক জোরাজুরির পর ধমকে উঠল সে,

-তুমি না খেলে আমিও খাব না মলি!

মল্লিকার কথার মান রাখতে একবার মাত্র একটু ভোগের খিচুড়ি মুখে দিয়ে উঠে পড়ল বাদল। বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। যখন বাথরুম থেকে ফিরল, তখন দেখল পলাশ নিজের হাতে তার মল্লিকাকে খাইয়ে দিচ্ছে।

ঘরের দিকে দৃষ্টি ফেরাল বাদল। ইতস্তত করে বলল,

-একটা মাদুরও নেই। মাসিমার থেকে চেয়ে আনব পলাশ?
-না দাদা। মাসিমা এমনিতেই আমাদের জন্য এত করলেন, তাকে আর বিরক্ত কোরো না।
-এই ঠান্ডা মেঝেতে শুবি তোরা?
-আমার অভ্যাস আছে!

মৃদুস্বরে বলল মল্লিকা। প্রত্যুত্তরে বাদল বলল,

-আজকের দিনটা একটু কষ্ট করে নে ভাই। কালই একটা দড়ির খাটিয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। দুটো বালিশ, চাদর, মশারি, একটা জনতা, কেরোসিন, আর গুটিকয়েক বাসনপত্তর হলেই আপাতত কাজ চালিয়ে নিতে পারবি না?

খাবারটা পুরো খেতে পারল না পলাশ। ও বসে থাকলে মলি কিছুতেই খাবে না। পেট ভরে গেছে বলে উঠে পড়ল ও। বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে বেরিয়ে পকেট হাতড়ে হাজার পাঁচেক টাকা বের করে চার হাজার টাকা বাদলের হাতে ধরিয়ে বলল,

-দুই মালিকের কাছে যা জমা ছিল, আসার আগে সব তুলে নিয়ে এসেছি। সাইকেলটাও বিক্রি করে দিয়েছি। এমনিতেই দুটো মাস বাড়িভাড়াটা তুমি দেবে বললে। তার ওপর এতকিছু কেনাকাটা.... এটা তুমি রাখো দাদা। জানি এতে কিছুই হয় না! কিন্তু এর বেশি আমি আর কোথায় পাব?
-তোকে পাকামি করতে বলেছি আমি?
-না তুমি এটা রাখো।

শূন্য থালাদুটো নিয়ে মাথা নামিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল মল্লিকা। বাদল পলাশের হাত চেপে ধরে গলা নামিয়ে বলল,

-এতদিন একা মানুষ ফাঁকা পকেটে ঘুরেছিস, বেশ করেছিস। কিন্তু এখন বিয়ে করেছিস পলাশ, বউ সঙ্গে রয়েছে। এখন টাকা পয়সা লাগে। মেয়েমানুষের শরীর-স্বাস্থ্য! বিয়ে করেছিস, বুঝবি! কখন কী প্রয়োজন হয়, অচেনা শহর! আমি গাড়ি নিয়ে কোথায় বেরিয়ে যাব, কখন কোথায় থাকব তার ঠিক নেই। এতবড় শহর! অচেনা অজানা জায়গা, মানুষজন! কোথায় কার কাছে হাত পাততে যাবি? তুই এখন নিজের কাছে টাকা রাখ। আগে তোর একটা কাজ জুটিয়ে দিই, তারপর এই টাকা সুদে আসলে তোর পকেট কেটে বের করে নিয়ে যাব।

হেসে উঠল পলাশ। ওই টাকা আবার পলাশের প্যান্টের পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বাদল বলল,

-রাত হয়েছে। সারাদিন যা ধকল গেছে। নে নে, তোরা শুয়ে পড়। আমি চলি! একটু দাঁড়া! আমি আসছি। আসল জিনিসটাই তো গাড়িতে রয়ে গেছে।

একদৌড়ে রাস্তায় নেমে আবার দোতলায় উঠে এলো বাদল। ওর হাতে একটা কালো পলিথিনের প্যাকেট।

-কী আছে এতে?
-তখন মন্দিরের বাইরে কিনেছিলাম। তোদের মালা বদলের মালাদুটো। আজ তোদের প্রথম রাত। বিশেষ কিছু করতে পারলাম না ভাই। এই রজনীগন্ধার মালাদুটো রাখ। এগুলো কোন কাজে লাগবে তোরা জানিস!

পলাশ লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল। পিছু ফিরে দেখল, মল্লিকা বাথরুমের দিকে সেই যে গেল, আর ফিরল না। বাদল বলল,

-ভাই শোন, মাসিমার কাছে এই বিয়ের ব্যাপারটা একদম চেপে যেতে হবে। মনে থাকবে তো? আমি যেটা বলেছি, তোরাও সেটাই বলবি।
-হু!
-মাসিমার মনটা খুব ভালো পলাশ। কিন্তু মুখ ভালো না। কিছু বললে একটু মানিয়ে নিস। কোন কথার উত্তর করবি না। চুপ করে শুনে নিবি। যে স্নেহ করে, সে তো একটু শাসনও করতে পারে বল! মাথা গরম করিস না ভাই!
-সে আর বলতে! মাথার ওপর ছাদ আর পায়ের তলার মাটি দিয়েছে মাসিমা, পেটে ভাত দিয়েছে, নইলে মলিকে নিয়ে আজ সারাটা রাত রাস্তায় কাটাতে হতো। তার জন্য মাসিমা বেগার খাটতে বললেও আমি খেটে দেব। দু'কথা বললেও শুনে নেব। তুমি এই মাসিমার মেয়ের গাড়ি চালাও দাদা?
-হ্যাঁ রে, পিহু দিদি মস্ত বড় কলেজে পড়ায়। কতবড় বিল্ডিং! কত ছাত্রছাত্রী। বাড়িতেও ছাত্র পড়তে আসে। দিদি অনেক পড়ালেখা জানে। খুব রাগী। মাসিমাও দিদিকে খুব ভয় পায়। দিদির বর চোখের ডাক্তার। খুব নামডাক। বাড়ির একতলায় চেম্বার আছে। আবার বাইরেও পেশেন্ট দেখতে যায়। কত লোক আসে। আমিই তো গাড়ি করে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে যাই।
-মাসিমা কী এখানে একাই থাকেন?
-হ্যাঁ, মেসোমশাই মারা গেছেন নাকি বহুকাল আগে। তখন পিহু দিদি খুব ছোট। মাসিমা একাই দিদিকে মানুষ করেছে। পিহু দিদি বিয়ে করে চলে যাওয়ার পর তো একাই থাকে। ওপরটা সবসময় ভাড়া দেওয়া থাকত। তোর কপাল ভালো, আগের ভাড়াটেকে তুলতে বিশাল ঝামেলা হওয়ায় দিদি আর ভাড়া বসাতে দেয়নি। আমিই বলে কয়ে তোর থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম। আমি এই দুই বাড়ির ঘরের ছেলে বলতে পারিস। সারাদিন দুই বাড়ি করতে করতেই সময় কেটে যায়। বাজারে যাই, মাসিমাকে নিয়ে মন্দিরে যাই। আর সারাদিন ভাড়ায় খাটি। এই তুই যা, আমি বকতে শুরু করলে তোকে সারারাত এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখব। ওদিকে মল্লিকা অপেক্ষা করছে, আমি পালাই! সংসারটা একটু গুছিয়ে নে। তারপর তোদের একদিন আমার ঘরেও নিয়ে যাব। তোর বৌদি বলেছে।
-অবশ্যই যাব দাদা। এই শহরে তুমি আর বৌদি ছাড়া আমাদের আর আছে'টা কে!

বাদলদা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই বৃষ্টি শুরু হল। আসবাবহীন ঘরে সংসারিক সামগ্রী বলতে শীতল মেঝেতে একটা কাপড় পেতে রেখেছে মল্লিকা। বাথরুমের দরজায় টোকা দিতেই মলি বেরিয়ে এলো বাইরে। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল পলাশের বুকে। পলাশ ওর হাতে পলিথিনের প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

-আজ আমাদের ফুলশয্যা!

লজ্জায় পলাশের বুকের মধ্যে মিশে যেতে চাইল মল্লিকা। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো তখন কাঁচের জানালায় রকমারি অবয়ব সৃষ্টিতে ব্যস্ত। অদূরে আলোর ঝাপসা জলছবি। পলাশ আর মল্লিকার গলায় দুটো রজনীগন্ধার মালা, সেই সৌরভে পরস্পর আবিষ্ট হয়ে রয়েছে। পলাশের বুকের ওপর মাথা রেখে বাইরের আবছা আলোর দিকে চেয়ে মল্লিকা বলল,

-ওই উল্টোদিকের বাড়িতে এত আলো কেন গো?
-মাসিমা বললেন যে কালীপুজো। ওই বাড়িতেই মনে হয়।
-ওহ!
-মন খারাপ মলি? ঘরের জন্য মন কেমন করছে?
-না! ঘরে আমার জন্য কে কাঁদবে? শুধু আমার মেনিটা মনে হয় না খেতে পেয়ে মরে যাবে জানো! মা দিনরাত ওর গায়ে জল ছুঁড়ে মারে। ভাত পুকুরে ফেলে দেয়, তবুও ওকে এক দানা ভাত দেয় না!
-ওকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতে!
-নিজেদেরই থাকা খাওয়ার ঠিক নেই, ওকে এনে কোথায় রাখতাম?

চুপ করে গেল পলাশ। নিজের অক্ষমতা যেন বড় বেশি করে ওর বুকে বাজল। মল্লিকার প্রিয় পোষ্যর জন্য দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন সংস্থানের ক্ষমতাও কী ওর নেই! কাছে থাকলে তবুও ওদের এঁটো-কাঁটা খেয়েই না হয় বাঁচত! মলি ওকে নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারত। কিন্তু যেখানে নিজেদেরই কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, একটা অবলা জীবকে সঙ্গে নিয়ে কতক্ষণ আর ঘোরা যায়! আবার যদি বিড়াল সঙ্গে থাকলে ঘর না পাওয়া যায়, তখন? পলাশ মৃদুস্বরে বলল,

-প্রথম রাত ঘিরে মেয়েদের অনেক স্বপ্ন থাকে, তাই না? পেট ভরে দুটো ভাত, অন্তত একটা বিছানা, কিছুই পারলাম না.... আমার তো কিছুই নেই মলি। তোমাকে কিছুই দেওয়া হল না।
-কে বলেছে কিছু দাওনি? এই যে!

পলাশের হাতটা নিজের তলপেটের ওপর রাখল মল্লিকা। নতুন প্রাণের আগমনবার্তায় আনন্দিত ওই দম্পতি পরস্পরকে দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গন করে রইল। আবেগতাড়িত কণ্ঠে মল্লিকা বলল,

-কত সুন্দর ছাদ আঁটা বাড়ি, বাড়িটায় কত বড় বড় জানলা, কলঘরে তো কল খুললেই ঝরঝর করে জল পড়ে। পুকুর থেকে বালতি করে জল টেনে শ্যাওলা ধরা পিছল উঠোন পেরিয়ে চানঘরে যেতে হবে না বলো?
-না। কল খুললেই জল। বোতাম টিপলেই আলো জ্বলবে, পাখাও চলবে। আমার গ্যারেজের মতো, হোটেলের মতো।
-তবে তো ওকে পেটে নিয়ে আমায় পুকুর ঘাটে যেতে হবে না। রাস্তার কল থেকে জল বইতেও হবে না। হ্যাঁ গো, মাসিমা আবার উঠিয়ে দেবে না তো? ওকে আমার কোলে আসার সময়টুকু দেবে তো? পরের বাড়ি! যদি হঠাৎ চলে যেতে বলে, কোথায় যাব আমরা?
-ঘর ছাড়ার আগে এসব ভাবতে ইচ্ছে করেনি?

দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল মল্লিকা। ওর সর্বাঙ্গে রজনীগন্ধার সুবাস। পলাশের গলায়ও একটা রজনীগন্ধার মালা। অন্যমনস্কভাবে ওই মালা থেকে কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে পলাশের মুখের ওপর ছুঁড়ে মল্লিকা বলল,

-না ভাবিনি। আমি জানি, তুমি ঠিক কিছু একটা করে নেবে। তাই ওর কথা ভেবে, তোমার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছি। তোমাকে বিশ্বাস করেছি আমি। ভুল করিনি তো?

শ্যামাঙ্গিনী মল্লিকার শুষ্ক ঠোঁটে আদর এঁকে দিল পলাশ। ওর রুগ্ন শরীরটাকে নিজের বুকে চেপে ধরল। নারীসুলভ কোমলতা স্পর্শ করেনি মল্লিকার দেহ। হৃদয়ের স্থানে কেবল যেন পাঁজরের হাড় ক'খানাই সার। ওই শরীরটাকেই আপন দেহের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে উন্মুখ পলাশ। নবদম্পতির শরীরী উষ্ণতায় পিষ্ট হতে লাগল কোমল রজনীগন্ধা। মল্লিকার সুবৃহৎ খোঁপা ভেঙে পড়েছে বহু আগেই। ওর খোলা চুলে মুখ ডুবিয়ে পলাশ বলে উঠল,

-কী মনে হয়?
-জানি না যাও!

রজনীগন্ধার মালার প্রাচীর মুহূর্তেই অদৃশ্য হল। পলাশ দুটো মালা ছিঁড়ে সরিয়ে রাখল মেঝেতে। অজস্র রজনীগন্ধার দ্বারা সজ্জিত শীতল শয্যার মাঝে পলাশের কণ্ঠলগ্না হয়ে নবরূপে প্রস্ফুটিত হল মল্লিকা। সলজ্জে বলে উঠল,

-এত সুন্দর ঘর, এত আরাম, এমন সুখ, আমার মধ্যে বেড়ে ওঠা আমাদের ছোট্ট ছেলে.... সব দিয়েছ তুমি আমায়। তবে কেন বললে, কিছু দিতে পারোনি!

মৃদু হেসে পলাশ মল্লিকার ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে বলল,

-মেয়ে!

বাড়িটা স্বর্গীয় দেবপ্রসাদ সান্যালের। প্রাচীন বাড়ির একাংশ প্রায় ভগ্নস্তূপ। শহরের মধ্যে থেকেও যেন শহরবর্জিত এই বাড়ি। আশেপাশের হাল ফ্যাশনের কারুকার্যময় রংবেরংয়ের সুউচ্চ বাড়ির পাশে এই ইঁট বেরিয়ে পড়া পলেস্তরা খসে যাওয়া পুরনো বাড়িটা বড় বেমানান। বিঘেখানেক জমির এককোণে ঐতিহ্যবাহী কঙ্কালের মতো কড়িবরগাসহ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বসতবাড়িখানা। একাধিক শরিক থাকা সত্ত্বেও বাড়ির একাংশ আগলে একা পড়ে রয়েছেন মৃণালিনী দেবী। অন্য অংশে কাঠের দরজায় মরচে পড়া তালা ঝুলছে। বাড়ির চতুর্দিকে আম, কাঁঠাল, নারকেল ও একাধিক সুপারি গাছের কারণে জায়গাটা দিনের বেলাও বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। অদূরে একটা বুজে আসা ডোবা। প্রতিবেশীর ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা হতে নির্গত দুর্গন্ধ আর মশার অত্যাচার হতে অব্যাহতি পেতে, দিনের বেশিরভাগ সময়ই ঘরের পিছন দিকের জানালাটা বন্ধ রাখেন মৃণালিনী দেবী। নিজের দুই দেওর প্রবাসী। ওই জায়গা তাদের। সুতরাং বাড়ির পিছন দিকে মৃণালিনী দেবীর যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শরিকি মতানৈক্যের কারণে এককালে ভাইদের মনের ভিতর ও জমির ওপর দেওয়াল তোলা হলেও, এখন সেই দেওয়াল ডোবার গ্রাসে অনেকাংশে ভেঙে পড়েছে। একমাত্র মেয়ে পিহুর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর যক্ষের মতো এই বাড়ি আগলে একা পড়ে রয়েছেন মৃণালিনী দেবী। পিহু সুপারি গাছগুলো লিজে দিয়েছে। ওরা নিজেদের সময়মতো আসে, সুপারি পেড়ে নিয়ে যায়। বারান্দায় বঁটি নিয়ে বসে নারকেল পাতার কাঠি বের করতে করতেই মৃণালিনী দেবীর ক্লান্ত দুপুরগুলো নিঃসঙ্গভাবে কাটে। বিকেলের খানিকটা সময় ধনেপাতার চারা আর লংকাগাছগুলোর জন্য ব্যয় হয়। নিজের হাতে টমেটো গাছগুলোর পরিচর্যা করেন মৃণালিনী দেবী। এবার লেবু গাছটায় অজস্র লেবু ধরেছে। খেয়ে, ঝরে, পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লেবুপাতার গন্ধ মৃণালিনী দেবীর বড্ড প্রিয়। গাছের ফলমূল বিক্রি করে, প্রতিবেশীদের দান করে মনের আনন্দেই তিনি আছেন। তাঁর এই বার্ধক্যবেলার সঙ্গী বলতে উল্টোদিকের বাড়ির আরতি ও তার এক বছরের দুরন্ত এক শিশু, নাম তার গোগোল। আরতির শ্বশুর শাশুড়ি গত হয়েছেন বহুদিন। বাড়ির ছেলেটা কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর, আরতি ওই একরত্তি ছেলের দস্যিপনা একা হাতে সামলাতে অস্থির হয়ে যেত। ছেলেটার কান্না যেন মৃণালিনী দেবীর হৃদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। এ নারীজীবনে মাতৃত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু একটা কুসুমকোমল প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরতে মন চায়। অবিলম্বে আরতির সঙ্গে এই বৃদ্ধার ভাব হয় এবং গোগোলের ক্ষুদ্র বৃহৎ যাবতীয় দায়িত্ব মৃণালিনী দেবীর ওপর ছেড়ে একটু নিশ্চিন্ত হয় আরতি। এছাড়াও মৃণালিনী দেবীর অবসর যাপনের আরো একজন সঙ্গী আছে, তার নাম আলো। দুই বেলা ঘড়ির কাঁটা ধরে নিয়ম করে আসে সে। সকালের ঘর ঝাঁট দেওয়া থেকে রান্না করা এবং বিকেলে গোপালের বাসনপত্র তেঁতুল ঘষে ঝকঝকে করে মেজে দেওয়া থেকে শুরু করে, রাতের রুটি করার পর মৃণালিনী দেবীর চুল আঁচড়ে বেঁধে দিয়ে তবে তার ছুটি! পেশায় কেরানি দেবপ্রসাদ সান্যাল বাড়ির ওপর তলায় একটামাত্র ঘর করতে পেরেছিলেন। তারপরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বড় অকালে স্বর্গবাসী হয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর পিহুর উচ্চশিক্ষার কারণে বাড়িঘরের কথা আর ভাবেননি মৃণালিনী। একরত্তি মেয়েটাকে বুকে আগলে রেখেছেন। পরবর্তীকালে পিহু এই ধ্বংসস্তুপে অর্থ জলাঞ্জলি দিতে রাজি হয়নি। মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নিজের কাছে। পিহু নিজে দেখেশুনে পছন্দ করলেও, মৃণালিনীর জামাই একেবারে হিরের টুকরো। সে একাধিকবার শাশুড়ি মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বামীর ভিটে পরিত্যাগ করতে মৃণালিনী দেবী অসম্মত হওয়ায়, পিহু অপেক্ষা করছে দুই কাকার দেশে প্রত্যাবর্তনের শুভ মুহূর্তের জন্য। আগামী বছর সকলের উপস্থিতিতে এই সম্পত্তির একটা গতি করা হবে। প্রোমোটারের হাতে এই আবর্জনা তুলে দিয়ে মাকে সুদৃশ্য ফ্ল্যাটের আরামে না রাখা পর্যন্ত পিহুর মনে স্বস্তি নেই। অপেক্ষা আর মাত্র একটা বছরের।

আরতির বাড়ি থেকে ফিরতে সেদিন বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত থাকা দম্পতির ওপর ভরসা করতে পারেননি তিনি। গোগোলকে নিজের হাতে খাইয়ে একেবারে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছেন। ঝিরঝির করে অবিরাম বৃষ্টি হয়েই চলেছে। বেশ একটা শীতল অনুভূতি যেন ঘিরে ধরছিল মৃণালিনীকে। বারান্দায় উঠে ওপর দিকে একবার চেয়েছিলেন মৃণালিনী দেবী। নতুন ভাড়াটের ঘরের দরজা বন্ধ। বারান্দার আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন তিনি।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় পলাশের। মল্লিকা গুটিশুটি মেরে শুয়ে রয়েছে পলাশের বুকের ভিতরে। ওর গায়ে হাত দিয়ে পলাশ দেখল, একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে মল্লিকার শরীর। গায়ের ওপর ঢাকা দেওয়ার মতো একটা চাদরও ওদের কাছে নেই। মল্লিকাকে নিজের বুকের ওপর থেকে নামিয়ে উঠে পড়ল পলাশ। আলো জ্বেলে তাড়াতাড়ি পাখাটা বন্ধ করে দিল। একটু বৃষ্টি হতেই গুমোট গরমটা একদম কমে গেছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মল্লিকা। ওর অবিন্যস্ত পোশাকের মধ্যে যত্রতত্র ছড়িয়ে রয়েছে রজনীগন্ধার পাপড়ি। মল্লিকার খোলা চুলের মধ্যে থেকে কয়েকটা পাপড়ি তুলে আনলো পলাশ। দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে। জীবনের সব শান্তি এই মুখটাতেই লুকিয়ে আছে। আঁচল সরিয়ে মল্লিকার উন্মুক্ত নাভিতে নিজের অনাগত সন্তানের জন্য খানিকটা আদর এঁকে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল পলাশ।

অদ্ভুত একটা অনুভূতি! মল্লিকা জেগে রয়েছে না ঘুমিয়ে পড়েছে, ও বুঝতেই পারল না। কেবল একটা আর্ত গোঙানি ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। চোখের সামনে ঠাকুরথান ভেসে উঠল। দোলপূর্ণিমার পুজো, প্রসাদ বিতরণ.... একমুঠো প্রসাদ নিজের শতছিন্ন কাপড়ের আঁচলে গিঁট পাকিয়ে মল্লিকা ছুটেছিল স্টিমার ঘাটে। প্রেমের লাল আবির দিয়ে সেইদিন মল্লিকার সর্বদেহ রাঙিয়ে দিয়েছিল পলাশ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে আসার পরেও পলাশ বাড়ি ফিরতে দেয়নি ওকে। যখন ঘরের চৌকাঠে পা রেখেছিল, তখন নিজের গর্ভে পলাশেরই ক্ষুদ্র অংশ ধারণ করে ফিরেছিল ও। কিন্তু গত কয়েক মাসে মল্লিকার বিয়ের তাগিদে মায়ের অত্যাচারের পরিমাণ তখন এতখানি বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, পলাশের সন্তানের কথা মল্লিকা নিজমুখে বাবাকে জানাতেই পারেনি। সকলের অলক্ষ্যে পলাশের হাত ধরে আঁধার রাতে ঘর ছেড়েছিল সে। নতুন সংসার বাঁধার আশায় পালিয়ে আসতে চেয়েছিল শহরে। পলাশের হাত ধরে রেললাইন বরাবর ছুটছে মল্লিকা। কাঁধে একটা ব্যাগ। তাতে রয়েছে মুড়কি আর বাতাসা। ছুটতে ছুটতে মল্লিকা ক্লান্ত। কিন্তু এই রেললাইনের শেষ কোথায়? হঠাৎ ও দেখল আশেপাশে পলাশ নেই। কেউ নেই। ও একা রেললাইন ধরে বিরামহীনভাবে ছুটেই চলেছে। কান মাথা কেঁপে উঠল রেলগাড়ির আগমনবার্তায়। ব্যাগ রইল লাইনের ওপর পড়ে। মুড়কি বাতাসা ছড়িয়ে পড়ল ধুলোর ওপর। জোরালো এক আলোকরশ্মি! সেই সঙ্গে বুক কাঁপানো তীব্র বাঁশির শব্দ! মল্লিকার মুখ থেকে গ্যাজলা বেরিয়ে এলো। আধো ঘুম আধো জাগরণে কেবল অস্ফুটে গোঙানি নির্গত হল ওর কন্ঠনালী হতে। হাত পা অসাড়! ছুটতে ছুটতে মুখ ঘুরিয়ে মল্লিকা দেখল, রেলগাড়িটা ওর একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। জোরালো আলোর প্রভাবে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। প্রাণভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল মল্লিকা। ওকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিল পলাশ,

-এই মলি! মলি! এইরকম করছ কেন? কী হয়েছে তোমার?

আরতির ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা গোগোল হঠাৎই চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ঘড়িতে রাত তিনটে বেজে তিন মিনিট...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত


বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

সপ্তপর্ণী (দ্বিতীয় খণ্ড) (তৃতীয় পর্ব)




সপ্তপর্ণী

সাথী দাস

দ্বিতীয় খণ্ড

তৃতীয় পর্ব




মৃদুহাস্যে পর্ণা বললেন,
-মহাভৈরবীর নিকট পূজার্চনা হেতু এই পথ ধরে মন্দিরে যাওয়ার কালে রথ হতে প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখলাম, শৈল ও বীরদত্ত প্রশিক্ষণকার্যে ব্যস্ত, চিত্রার অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে...
-মহারানি! অস্ত্রশিক্ষা ও অনুশীলনে রাজকুমারী বড় অমনোযোগী। কোনরূপ অনুশাসনের পরোয়া তিনি করেন না। বড়ই অবাধ্য। তুলনামূলকভাবে শৈল সুনিপুণ তিরন্দাজ। তার তরবারি চালনা, বর্শা নিক্ষেপের কৌশল ও রণকৌশলে আমি যারপরনাই অভিভূত রানি।
পরিশ্রমী শৈলজা হাসিমুখে সামান্য উৎসাহব্যঞ্জক বাক্যের আশায় পর্ণার মুখপানে চাইলেন। কিন্তু চিত্রার অমনোযোগ এবং অনুশীলনকার্যে উদাসীনতার বৃত্তান্ত বীরদত্ত কর্তৃক শ্রবণমাত্র পর্ণা বললেন,
-অমরাবতীর ভবিষ্যৎ রানির এমন অমনোযোগ ক্ষমার অযোগ্য চিত্রা।
মুহূর্তেই শৈলজার মুখমণ্ডল হতে সকল হাসি অদৃশ্য হল। তুমুল গাত্রদাহ সহ্যপূর্বক পর্ণার সম্মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল সে। আপনাকে রক্ষার্থে রাজকন্যা চিত্রা সোহাগী কণ্ঠে পর্ণাকে আলিঙ্গন করে বললেন,
-মা! বীরদত্ত সঠিক কথা বলছে না! মাত্র আজই নিদ্রাভঙ্গে আমার সামান্য বিলম্ব...
-এক পক্ষকাল পূর্বে আপনি দুইদিন বিলম্ব ছিলেন রাজকুমারী। প্রহরী ও পরিচারিকা কর্তৃক আহ্বানপূর্বক আপনার সুখনিদ্রাভঙ্গ...
-না মা! সকল বাক্য মিথ্যা, মনগড়া!
মৃদুহাস্যে পর্ণা চিত্রার ললাটে স্নেহচুম্বন অঙ্কনপূর্বক বললেন,
-বীরদত্ত তোমার শিক্ষাগুরু চিত্রা। সে কোন অভিপ্রায়ে মিথ্যার আশ্রয় নেবে? যে ক্ষণে তুমি তাকে পরাজিত করতে সমর্থ হবে, সেই ক্ষণে তোমার সকল অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হবে। প্রতিক্ষণে আমার শিক্ষাগুরু রামেশ্বরের স্মৃতি আমার মনকে বড় পীড়া দেয়। আমার সুকোমল দেহের উপর প্রতিনিয়ত অত্যাচারপূর্বক, চরম মানসিক নিপীড়নের মাধ্যমে একদা সে আমার মন এবং সম্মানকেও ছিন্নভিন্ন করেছিল। এক সামান্য কিশোরী জ্বলন্ত অঙ্গারে পরিণত হয়েছিল শুধুমাত্র তাঁরই শিক্ষায়। তোমাকেও অনুরূপভাবে নিজেকে তৈরি করতে হবে চিত্রা। পৃথিবী বড় রূঢ় ও নির্দয়। সর্বক্ষেত্রে, সবস্থানে অস্ত্র তোমার সহায়তা করবে না। নিজেকেই সর্বাপেক্ষা কঠিনতম অস্ত্ররূপে প্রস্তুত করতে হবে। আর নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর পরিশ্রম এবং অনুশীলন ব্যতীত তা সম্ভব নয়। অযথা বাক্যালাপে কালবিলম্ব অনভিপ্রেত। বীর?
-আজ্ঞা করুন রানি?
-লজ্জা নারীর ভূষণ নয়, অহংকার! সেই অহংকারের উপর সামান্যতম অসন্তোষজনক দৃষ্টিও কাঙ্খিত নয়। চিত্রা প্রয়োজনে ওই অহংকারকেই আপন অস্ত্রজ্ঞানে ব্যবহার করবে। এই শিক্ষা চিত্রাকে সঠিক সময়ে তুমি প্রদান করবে।
-যথা আজ্ঞা রানি।
-চিত্রাকে ভবিষ্যতের পর্ণারূপে প্রস্তুত করো। অগ্নিস্ফুলিঙ্গরূপে সে ধরা দেবে আপন ও বহির্বিশ্বের সকল প্রজার দৃষ্টিতে। যে দৃষ্টিতে ভীতি ও সম্ভ্রম একই সময়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করবে।
-আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হবে। কেবল রাজকুমারী পাঠাভ্যাস ও অনুশীলনে যদি সামান্য একটু মনোযোগী হয়...
-অবশ্য হবে। চিত্রা?
-মা?
-তুমি কে?
-অমরাবতী, কাঞ্চনগড় এবং মায়াকাননের ভবিষ্যৎ অধিশ্বরী, পৃথ্বীশবর্মন এবং মহারানি সপ্তপর্ণীর একমাত্র কন্যা...
-চিত্রা! আমার রাজ্যে নির্বোধ পথশিশুও আপন পরিচয়ের পূর্বে পিতার নাম স্মরণ ও উচ্চারণ করে না। তুমি এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজ্যেশ্বরী হয়ে এমনতর ভুল...
-ক্ষমাপ্রার্থী মা। আমি মহারানি সপ্তপর্ণীর একমাত্র কন্যাসন্তান চিত্রাঙ্গদা।
-তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?
-প্রজার কল্যানসাধন, দুষ্টের দমন এবং রাজ্যবিস্তারপূর্বক একাধিক রাজ্যব্যাপী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
-আর...
-মা?!
পর্ণার অক্ষিকোটর হতে একবিন্দু অবাধ্য লবণাক্ত বারিধারা বিনা বাধায় গন্ডদেশে নেমে এলো। শশব্যস্ত চিত্রা পর্ণাকে বারংবার আহ্বানে উত্যক্ত করে তোলার পূর্বেই কম্পিত স্বরে অবনত দৃষ্টিতে পর্ণা কন্যার উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন,
-বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কী চিত্রা?
-মৃত্যু মা!
-যথার্থই...
-মা তোমাকে এমনতর বিবর্ণ দেখাচ্ছে কেন? আপন কক্ষে...
-রানি আমি আপনাকে কক্ষে পৌঁছে...
-না বীর! আমি এই ক্ষণে চিত্রার মঙ্গল কামনা হেতু মহাভৈরবীর নিকট প্রার্থনা করতে আগ্রহী। কক্ষে গমন সম্ভব নয়। চিত্রা?
-মা?
-আপন অনুশীলনে মনোযোগী হও। অবিলম্বে তোমার রাজ্যাভিষেকের আয়োজন করা হবে। প্রজার সম্মুখে সকল ক্ষেত্রে সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়া আবশ্যক। তবেই তোমাকে তিন রাজ্যের রাজসিংহাসনের যোগ্য উত্তরাধিকারিণীরূপে গণ্য করা হবে। অন্যথায়...
-অন্যথায়?
-অনুশীলনে মনোযোগী হও। আমি পূজার্চনা সমাধাপূর্বক রাজকার্যে কিঞ্চিৎ ব্যস্ত থাকব। আগামী এক পক্ষকাল পশ্চাতে পুনরায় এই প্রশিক্ষণক্ষেত্রে আমি সশরীরে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা আপন মনে পোষণ করি। আশা রাখি, সেই ক্ষণে তুমি বীরদত্তকে অভিযোগের কোনপ্রকার সুযোগ দেবে না! মহাভৈরবী তোমার মঙ্গল করুন রাজকন্যা।
-মায়াকানন, কাঞ্চনগড় ও পবিত্র অমরাবতী শত্রুমুক্ত থাকুক মা!
আপন কন্যাকে আলিঙ্গনপূর্বক, শৈলজার মস্তকে হস্তখানি মাত্র স্পর্শ করলেন পর্ণা। অতঃপর পূজার রৌপ্যনির্মিত রেকাবি, মঙ্গলঘট এবং উপাচারসহ পুনরায় আপন রথে চড়লেন। দুইটি অশ্ব সগৌরবে অমরাবতীর রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন অঞ্চল ও নগর পেরিয়ে মহাভৈরবীর মন্দির পানে অগ্রসর হল। পর্ণার প্রস্থানের পরই চিত্রা অবিলম্বে আপন কোমরবন্ধনী হতে তরবারি মুক্ত করে বীরদত্তকে আক্রমণ করলেন। সহসা ধেয়ে আসা কিশোরীর সেই আক্রমণ আপন তরবারি কর্তৃক অট্টহাস্যে প্রতিরোধ করল বীরদত্ত,
-আরে রাজকুমারী! প্রাণে মারবেন নাকি!
-আমি অমনোযোগী? মায়ের নিকট অভিযোগ জানানো হচ্ছে! এই তুমি আমার পরম মিত্র? মিত্রসুলভ কোন কর্তব্য পালন করলে তুমি?
-আপনি অবশ্যই অমনোযোগী। আপনার শিক্ষাগুরুর দায়িত্বজ্ঞানে সেই সংবাদ আপনার মাকে জানানো আমার অবশ্য কর্তব্য। আর আমি অবশ্যই আপনার পরম বিশ্বস্ত মিত্র! আপনি আমাকে এই ক্ষণে ধন্যবাদ জানাবেন এই মর্মে যে, সারঙ্গীর পৃষ্ঠদেশে চেপে গতরাত্রির তৃতীয় প্রহরে আপনি মায়াকাননের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন, সেই কারণে আজ প্রাতকালে আপনার নিদ্রাভঙ্গ সম্ভব হয়নি, আপনার সঙ্গে গভীর সখ্যতা হেতু এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ আমি মহারানির নিকট গোপন রেখেছি! ধন্যবাদের পরিবর্তে আপনি আমার কন্ঠনালী তরবারি দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করার প্রচেষ্টায় মগ্ন হয়েছেন কন্যা?
-তুমি এ সংবাদ অবগত হলে কীরূপে?
চমৎকৃত চিত্রার হস্ত হতে তরবারি খসে পড়ল। দরাজ হাসি উপহারস্বরূপ আপন ওষ্ঠ ও অধরে অঙ্কনপূর্বক বীরদত্ত ধূলিধূসরিত ভূমি হতে তরবারিটি তুলে চিত্রার হাতে দিয়ে বলল,
-এই অমরাবতী রাজ্যে একটি মৃগশাবকও আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গোপনে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে অসমর্থ কন্যা। আপনি পারবেন, কোনকালেই এমন আশা করবেন না।
-আমি একদিন তোমার ঐ সতর্ক দৃষ্টিপথ পেরিয়ে মায়াকাননে পাড়ি দেব। মা-ও আমাকে নিষেধ করার সুযোগ পাবে না।
-এই ক্ষণে নিজেকে প্রস্তুত করুন রাজকন্যা। এই অমূল্য সময় হেলায় হারালে রাজসিংহাসন ও রাজ্যভার হতে চিরতরে বঞ্চিত হবেন। আমার শিক্ষা, মহারানির এতকালের আশা-ভরসা সকলই বিফলে যাবে। দেশভ্রমণের হেতু সমগ্র জীবনকালব্যাপী বিস্তর সময় পাবেন। এই ক্ষণে সর্বাগ্রে নিজেকে প্রস্তুত করুন। অস্ত্রশিক্ষার পূর্বে মনসংযোগ অত্যন্ত প্রয়োজন। আসুন, আপনি ওই প্রান্তে যোগাভ্যাস করুন, আমি শৈলকে তির ও ধনুকের... শৈল?
পিতৃসম রাজসেনাধ্যক্ষ তথা পরমপ্রিয় মিত্র বীরদত্তের সঙ্গে অম্লমধুর বাক্যালাপকালে চিত্রা শৈলর অবস্থান বিস্মৃত হয়েছিল। তরবারিটিকে কোমরবন্ধনীর মধ্যে স্থান দিয়ে চিত্রা বললেন,
-শৈল কোথায়?
-আমি দেখছি রাজকন্যা। আপনি আপন কার্যে মনোনিবেশ করুন। যোগাভ্যাস করুন।
-বেশ!
আপন তরবারি কোমরবন্ধনীতে রেখে বীরদত্ত প্রশিক্ষণক্ষেত্র হতে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে ঘোড়াশালে পৌঁছল। শৈলজার অশ্ব মহানন্দে সবুজ উদ্যানে ভ্রমণপূর্বক আপন প্রাতরাশ সম্পন্নকার্যে মগ্ন। উদ্যান পেরিয়ে সেনা ছাউনির অগভীর দীঘির কাছে পৌঁছল বীরদত্ত। একেবারে অন্তিম সোপানে অবনত মস্তকে বসে রয়েছে একাকিনী শৈলজা। স্থির জলের উপরিভাগে তার মনমরা প্রতিবিম্ব তাকে রূঢ়ভাবে উপহাস করছে। মৃদুস্বরে আহ্বান করল বীরদত্ত,
-শৈল?
আপনার মাঝে হারিয়ে যাওয়া শৈলজা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পশ্চাতে মুখ ফেরাল।
-বীরদত্ত, আপনি! এই স্থানে?
-তোমাকে অন্বেষণ হেতু...
-কী প্রয়োজন?
-প্রশিক্ষণের সময় বয়ে যায় কন্যা...
স্নেহ ঝরে পড়ল বীরদত্তর দরাজ কন্ঠ হতে। কিন্তু অভিমানী শৈলজা দৃঢ়কন্ঠে বলল,
-যাক!
-এ শিশুসুলভ অভিমান নিতান্তই অযৌক্তিক মা!
-বীরদত্ত, আপনিও এ বিষয় অবগত আছেন, চিত্রা অপেক্ষা আমি অধিকতর জ্ঞানী, পরিশ্রমী ও মনোযোগী। কিন্তু পর্ণা-মা কোনকালেই আমাকে বিন্দুমাত্র স্নেহের যোগ্য মনে করল না! কেন?
অন্তিম সোপানে শৈলজার নিকটে এসে বসল বীরদত্ত। ধীরকণ্ঠে বলল,
-চিত্রা তাঁর আপন গর্ভজাত সন্তান শৈল।
-আর আমি পালিতা কন্যা, সেই কারণে আমার প্রতি এ হেন বিরূপ মনোভাব? সেই ক্ষণে মৃত্যুবরণ করার জন্য, পর্ণা-মা আমাকেও ওই রক্তাক্ত ক্ষেত্রে একাকী রেখে আসতে পারত! কেন কন্যাজ্ঞানে গ্রহণ করল! এই মাতৃতান্ত্রিক রাজ্যের রাজ সংবিধান আমিও অবগত আছি বীরদত্ত! সংবিধান কেবলমাত্র যোগ্য নারীকেই রাজ সিংহাসনে স্থান দেয়। সেইক্ষেত্রে নারীকে রাজ ঘরানার ক্ষত্রিয় কন্যা হতেই হবে, এইরূপ কোন বাধ্যবাধকতা সংবিধানে লিখিত নেই। চিত্রার ন্যায় অবোধ, অমনোযোগী, মূর্খ নারীর স্থান আমার পদতলে, রাজ সিংহাসনে নয়!
-শৈল! তুমি আমারই সম্মুখে অসহনীয় অপশব্দের মাধ্যমে পবিত্র অমরাবতীর মহারানি ও রাজকন্যার অসম্মান করছ। এমন অবমাননার কারণে আমি এই ক্ষণে তোমার দেহ দ্বিখণ্ডিত করলেও, মহারানির নিকট কোনরূপ জবাবদিহি নিষ্প্রয়োজন...
-আপনি তো কেবলমাত্র রাজভৃত্য বীরদত্ত! পর্ণা-মায়ের প্রত্যেকটি অন্যায় আচরণকে আড়াল করার প্রচেষ্টায় প্রাণপাত করেন কোন গোপন উদ্দেশ্যে? আপনি তো প্রতিপদে আমার প্রতি তার উদাসীনতার জ্বলন্ত সাক্ষী! তা সত্ত্বেও তাকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন? নতমস্তকে কেবলমাত্র ভৃত্যের ন্যায় তার প্রত্যেকটি আদেশ পালনের পূর্বে, তার প্রতিটি অপকর্মের সমালোচনা করুন। আপনি রাজভৃত্য, এ বাক্য সত্য। সেই সঙ্গে আপনি এই মহান অমরাবতী রাজ্যের একজন দায়িত্বশীল প্রজা। অন্তত সেই দায়িত্বের কথা স্মরণপূর্বক মহারানির কর্মকাণ্ডের যথাযথ সমালোচনা করুন। সেই কার্যে যে কিঞ্চিৎ পৌরুষ প্রয়োজন, বোধ করি তা এখনো আপনি আপনার মহামান্য রানির পদতলে বিসর্জন...
-শৈলজা! আমি তোমার শিক্ষাগুরু! এমন তোমার স্পর্ধা! আমার সঙ্গে বার্তালাভকালে তোমার এমন নিম্নরুচিকর বাচনভঙ্গি...
-চিত্রা রানি হওয়ার যোগ্য নয় বীরদত্ত। এ সত্য বাক্য স্বীকার করার সৎ সাহস আপনার নেই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সে এই মহান অমরাবতীর রাজসিংহাসন লাভ করতে পারবে না। আমার সঙ্গে তাকে সম্মুখ সমরে উপনীত হতেই হবে।
-যদি তাও হয়, চিত্রা জয়লাভ করবেই! আমি তোমার শুভাকাঙ্খী শৈল। এ অন্যায় চিন্তা মন হতে পরিত্যাগ করো...
তীক্ষ্ণ হাসি গোপন করে শৈলজা বলল,
-রাজপরিবারের নিকট আপন মস্তক আপনি বহুকাল পূর্বেই বিসর্জন দিয়েছেন, এ বাক্য আমি বহুপূর্বেই অবগত। তবে সেই সঙ্গে আপন মেরুদণ্ডখানিই যে রাজদরবারে গচ্ছিত রেখেছেন, এ সত্য আজ উপলব্ধি করলাম বীরদত্ত! শুভ্রকে শুভ্র এবং ধূসরকে ধূসর চিহ্নিত করার ন্যায় সৎ সাহসও আপনি হারিয়েছেন দেখছি। জীবন হতে ষোল বৎসরকাল হেলায় হারিয়েছে ওই নারী। আমিই এই রাজসিংহাসনের যোগ্য। নিজেকে সেইরূপে এ যাবৎকাল প্রস্তুত করেছি আমি। রাজসিংহাসন লাভের জন্য আমি আপন প্রাণত্যাগ করতে পারি, আবার একইরূপে নৃশংসভাবে মৃত্যুলীলায় মেতে উঠতে পারি। যথাসময়ে আপনিও তার প্রমাণ পাবেন বীরদত্ত। আপনি যথার্থই বলেছেন। আপনি কেবলমাত্র আমার শিক্ষাগুরু। তবে পরম মিত্র এবং হিতৈষী চিত্রার। তাই আমি কেবলমাত্র শিক্ষাপ্রদানের জন্যই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। আপনি আমার জীবনের ন্যায়-অন্যায়ের পথপ্রদর্শক হওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবেন না। করলেও, আপনার সকল প্রকার প্রচেষ্টা বিফলে যাবে। এক অবোধ বালিকার ন্যায় সরল চিত্রার মন। তার মনে রাজনীতি, কূটনীতি ও প্রখর রণনীতির কোন স্থান নেই। রাজ অন্দরমহলে সংগীতচর্চা ও নৃত্যকলা পরিবেশনপূর্বক সকলের মনোরঞ্জনের কার্য রূপসী চিত্রা কর্তৃক সম্পন্ন হতে পারে, তবে রাজতন্ত্র পরিচালনা একপ্রকার অসম্ভব! সেইরূপ দূরদৃষ্টিলাভের শিক্ষা ও প্রচেষ্টা, দুটির কোনোটিই তার নেই। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ রাজ্য আমার!
-তোমার মনে মহারানি ও রাজকন্যার প্রতি যে বিদ্বেষ, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এমতাবস্থায় যদি রানি ও রাজকন্যার কোনরূপ বিপদ তোমার দিক হতে ধেয়ে আসে, তবে সর্বাগ্রে আমার তরবারির সঙ্গেই তোমার সাক্ষাৎ ও তীব্র সংঘাত ঘটবে শৈল।
-অসম্ভব নয়, আর আপনিও এ সত্য জানেন বীরদত্ত, প্রশিক্ষণকালে আপনার রণকৌশল সম্পর্কে আমি উত্তমরূপে অবগত হয়েছি। পর্ণা মায়ের বক্তব্য কি আপনি অনুধাবনে অক্ষম? আপনাকে পরাস্তপূর্বক আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হবে।
-রাজপরিবার তোমাকে নবজীবন প্রদান করেছে শৈল। তোমার অভিধান হতে কি কৃতজ্ঞতা নামক শব্দ চিরতরে অদৃশ্য হয়েছে? আপন মনে এতখানি বিদ্বেষ...
-মৃত্যুর যে করাল থাবা শৈশবেই আমার সুকোমল দেহকে ছিন্নভিন্ন করেছে, যে মরণ যাতনা আমি সহ্য করেছি, পারবে আপনার সুখী রাজকন্যা তেমন যন্ত্রণা সহ্য করতে?
প্রবল তেজে আপন দেহের উপরিভাগ হতে বস্ত্র টেনে নামিয়ে ফেলল শৈল। তার দক্ষিণ হস্তে জ্বলজ্বল করছে তরবারির গভীর আঘাতের চিহ্ন। ক্ষত উপশমের পর দীর্ঘকাল অতীত হলেও, ক্ষতচিহ্ন আজও একইভাবে বিরাজ করছে ওই নারীর দেহে। অবনত মস্তকে শৈলজার দেহ বস্ত্র দ্বারা আবৃতপূর্বক, ওই স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হল বীরদত্ত। শৈলজার দুই চক্ষু হতে অবিরাম বারিধারা নিঃসৃত হল। কম্পিত কণ্ঠে শৈলজা বলল,
-কঠিন সত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বীরদত্ত?
-তোমাকে দর্শনপূর্বক ইতিপূর্বে আমার মনে স্নেহের যে গোপন ফল্গুধারা প্রবাহিত হত, এখন সেই স্থানে ভীতির সঞ্চার হয় শৈল। আমি ভীত মহারানি পর্ণা ও রাজকন্যা চিত্রার কারণে। যে বিষবৃক্ষ মহারানি আপন হস্তে লালন করেছেন, সে তাঁরই পশ্চাতে ও অজান্তে বিষ উদ্গীরণকার্য শুরু করেছে। কিন্তু তোমার প্রতি স্নেহ ও ভরসার কারণে, তিনি আমার একটিও বাক্য বিশ্বাস করবেন না। এ রাজপরিবারের ভাঙ্গন অনভিপ্রেত শৈল, সকল অভিমান মন হতে দূর করো। চিত্রার রাজ্যাভিষেকের জন্য মনের অন্তঃস্থল হতে আনন্দ করো কন্যা!
-চিত্রা রাজপরিবারের যোগ্য উত্তরাধিকারিণী নয়, এই সহজ সত্য আপনিও রানির কর্ণকুহরে প্রবেশপূর্বক, আমার প্রসঙ্গ উত্থাপন করুন বীরদত্ত। কেবলমাত্র চিত্রা রানির আপন গর্ভজাত সন্তান, সেই কারণে কোন অযোগ্যের ছায়া ও স্পর্শ পবিত্র অমরাবতীর রাজসিংহাসনের উপর কাম্য নয়।
বীরদত্ত কোন কঠিন বাক্য প্রকাশের কারণে আপন ওষ্ঠ ও অধর চালনার পূর্বেই দূর হতে অত্যন্ত সোহাগী ও মধুর কন্ঠ ভেসে এলো,
-শৈল! ও সই লো! বীরদত্ত? এই প্রকাশ্য দিবালোকে কোন স্থানে আত্মগোপন করলে তোমরা?
চিত্রার আন্তরিক আহ্বানে সিক্ত হল বীরদত্তর হৃদয়। মুখাবয়বের ক্রুর হাসি গোপনপূর্বক শৈলজা বলল,
-সই! আমি এই স্থানে! বীরদত্ত আপন অতীতের স্মৃতিচারণায় কিঞ্চিৎ ব্যস্ত ছিলেন সই। তার সঙ্গে আমিও গল্পকথায় মগ্ন হয়ে, এই ক্ষণে বেলা বয়ে যায়। আমাদের স্নানঘরে প্রবেশের সময় হল, আসছি সই!
মুখে মৃদুহাসি অঙ্কনপূর্বক প্রতিটি সোপান দ্রুতগতিতে পেরিয়ে বীরের দৃষ্টিপথ হতে অদৃশ্য হয়ে গেল শৈলজা। দুই অভিন্নহৃদয় সখীর নির্ভেজাল হাস্যরস ও আলাপচারিতা বীরদত্তের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও, মনে বিন্দুমাত্র আনন্দের উদ্রেক করল না। সহজাত ও সদাহস্যময় বীরদত্ত এই ক্ষণে অমরাবতীর ভবিষ্যৎ কল্পনাপূর্বক দুশ্চিন্তা ও গাম্ভীর্যের আবরণে বিলীন হয়ে গেল।
সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে আপন কক্ষমধ্যে রক্তিম তরল দ্বারা একাগ্রচিত্তে আপনার পদযুগল রাঙিয়ে তুলতে ব্যস্ত ছিলেন চিত্রা। পূর্ব পরিকল্পনানুসারে প্রহরী ও শৈলর গোপন অভিসন্ধি কর্তৃক শৈল আচম্বিতে প্রবেশ করল চিত্রার কক্ষে।
-সই লো?
-মা মহাভৈরবী!! শৈল তুমি? উফ! আমার কম্পিত হস্তের আকস্মিক স্পর্শে পাত্র বুঝি এই ক্ষণে ভূমিতে গড়িয়ে যায়!
-এতখানি একাগ্রতা কোন কার্য হেতু?
-এসো এসো। প্রহরী তোমার আগমনবার্তা জানান দিল না যে! নিদ্রামগ্ন বুঝি?
-তাকে আমিই নিষেধ করেছি। তোমার এই ভীত মুখখানি দেখার বাসনা চরিতার্থ করার স্বার্থেই... বিপদকালে রাজকুমারীর হস্তমধ্যে সর্বাগ্রে অস্ত্র শোভা পায় সই, এইসকল সাধারণ প্রসাধনী নয়!
-তুমি বড়ই দুষ্ট শৈল! তোমার হাতে তো সর্বদা তরবারি প্রস্তুত! তুমি-আমি পৃথক নই। আমরা এক এবং অভিন্ন! তুমি সর্বদা আমাকে সকল বিপদ হতে রক্ষা করবে, এ আমি ঠিক জানি। আমি অন্ধভাবে তোমাকে ভরসা করি। ও... সই লো, আমার রাঙা পা দু'খানি দেখ! সুন্দর?
-অতীব সুন্দর! কোন সুদর্শন রাজপুত্তুরের জন্য সন্ধ্যাকালে এমন শৃঙ্গার সই?
-মা মহাভৈরবীই জানেন, সে কোন রাজ্যের রাজপুত্তুর! কোন শুভলগ্নে এ রাজ্যে পদার্পন করবেন! মন বড় ব্যাকুল তার দর্শন হেতু!
চিত্রার একঢাল অবিন্যস্ত কেশরাশি পরিচর্যাপূর্বক শৈল বলল,
-রাজ্যাভিষেকের অব্যবহিত পরই কোন সুদর্শন রাজপুত্তুর এসে তোমাকে বিবাহপূর্বক এ রাজ্যে আশ্রয় নেবে। তোমার এই মনোলোভা রূপের কাহিনি দিকে-দিকে প্রসারিত। সকল রাজপুত্তুর তোমাকে বিবাহের স্বার্থে কেবল আপন রাজ্য-রাজপাটই নয়, আপনার প্রাণও জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত হবেন।
-তা হবেন!
-তোমার রূপের বড় অহংকার সই!
-যে মানুষের যা আছে, সে তো তার উপর অহংকার করবেই। এ তো অনায্য কিছু নয়। তুমি এমন রূপের অধিকারিণী হলে, তবে বুঝতে!
রাজকন্যার পদযুগল বড় যত্ন ও আন্তরিকতার সঙ্গে সুসজ্জিত করে দিল শৈল। স্বর্ণনির্মিত নূপুর ও রক্তিম তরলের স্পর্শে ওই দু'খানি চরণ সত্যই মনোলোভা হয়ে উঠেছে। এই চরণে না জানি কতশত রাজপুত্র আপনাকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হবেন! পর্ণা কর্তৃক প্রেরিত যাবতীয় স্বর্ণালংকারের সিংহভাগ আপন দেহে ধারণ করার পর, উচ্ছিষ্টের কিয়দংশ শৈলর পানে এগিয়ে দিলেন চিত্রা। আপন হস্তে প্রাণপ্রিয় সখীকে মনের মতো করে চিত্রা সাজালেন। অতঃপর শৈলজার চিবুক আপন হস্তদ্বারা স্পর্শপূর্বক বললেন,
-কে বলেছে তোমার রূপ নেই? এমন দু'খানি চক্ষু, পেলব গন্ডদেশ...
-আমি কোনকালেই এমন চিন্তা মনে ঠাঁই দিই না চিত্রা, যে আমার রূপ নেই! আমার বাহ্যিক রূপ নেই, আমি শ্রীহীন! এ বাক্য অবশ্যই সত্য! তবে আমার শিক্ষাদীক্ষা প্রতিনিয়ত আমার অন্তরের রূপকে জাগ্রত করে। কেবলমাত্র হৃদয়ের অন্তঃস্থল দর্শন হেতু, সত্য অনুসন্ধানের ন্যায় দৃষ্টি আবশ্যক।
-এ বড় সহজ সত্য কথা! তুমি বড় সুন্দর! আমার মন পূর্বরাত হতে বড় উদাস শৈল! তুমি জানো, আমি পূর্বরাতের তৃতীয় প্রহরে মায়াকাননের পথে পাড়ি দিয়েছিলাম।
আপন কক্ষ হতে অন্ধকারের আবরণে নিমজ্জিত মায়াকাননের পানে দৃষ্টিপাত করলেন চিত্রা। ভীত শৈল সেই স্থানে পৌঁছে চমৎকৃত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
-পর্ণা-মা জানেন এ সংবাদ?
-না। তবে বীরদত্ত সকলই অবগত। আমার মন মায়াকাননের গভীর সৌন্দর্যে বারংবার অবগাহন করতে চায় শৈল। কিন্তু মা আপন রাজ্যে কেন যে আমাকে প্রবেশাধিকার দিতে চরমতম আপত্তি করেন, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি আজও অসমর্থ। বীরদত্ত হতে কত গল্পকথা শুনেছি। ওই মায়াকাননের শ্বাপদসংকুল চিরহরিৎ বনানীর কথা, অসংখ্য অপরিচিত বৃক্ষরাজির মাঝে জলে পরিপূর্ণ টলটলে চিত্রের ন্যায় সুন্দর এক দীঘির কথা। দীঘির উপরিভাগে অজস্র শতদল কি আজও প্রস্ফুটিত হয় শৈল? আমি ঐ দৃশ্য চর্মচক্ষে অবলোকন করতে ইচ্ছুক! আমার এ সমগ্র জীবনকাল বুঝি অসূর্যম্পশ্যারূপে অতিবাহিত হত। তবে যে কয় বৎসরকাল যাবৎ আমি সূর্যালোক ব্যতীত জীবনযাপন করেছি, সেই সময়কালের কথা সময়ে-অসময়ে স্মৃতিতে ভিড় করে শৈল। বৃন্দা-মা, উত্তরা-মা, ফাল্গুনী-মা, সকলের সঙ্গে পুনর্মিলনের বড় সাধ জাগে মনে। তোমার স্মৃতিপটে মায়াকাননের সৌন্দর্যের ছবি ভেসে ওঠে না শৈল?
-শৈশবের সকল স্মৃতি বড় অস্পষ্ট চিত্রা। সূর্যালোকের ভয়ে ভীত তুমি তখন মায়াকাননের রাজপ্রাসাদে বন্দিনি। আমি উত্তরা-মায়ের কোলে চেপে শম্বর দম্পতি পরিদর্শনে সেনা ছাউনি প্রান্তে পৌঁছে যেতাম। ফাল্গুনী-মা সেই ক্ষণে তোমার ক্রন্দনধ্বনি নিয়ন্ত্রণ হেতু, সুগন্ধী পুষ্পমাল্য দ্বারা তোমাকে নবরূপে সজ্জিত করে তুলতেন। ফাল্গুনী-মা সমস্ত দিবস ব্যাপী আমাদের সঙ্গেই অবসর যাপন করতেন। কাঞ্চনগড় হতে বৃন্দা-মায়ের আগমনে আমরা খেলার সঙ্গী পেয়ে, সীমাহীন আনন্দে মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় অন্দরমহলের সবস্থানে অবাধ বিচরণ করতাম।
-যথার্থই শৈল! সই লো, আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের সর্বাপেক্ষা সুন্দর সময় ওই দশ বৎসরকাল, যা আমি মায়াকাননে যাপন করেছি। কিন্তু পূর্বশ্রুত মায়াকাননের ওই অপার্থিব সৌন্দর্যে আকণ্ঠ অবগাহন করা হল না যে! এই ক্ষণে আমার নিকট পার্শ্ববর্তী রাজ্য মায়াকাননও যে দুরতিক্রম্য সই...
প্রহরী কর্তৃক বীরদত্তের আগমনের সংবাদ ভেসে এলো চিত্রার কক্ষদ্বার হতে। দুই সখীর সান্ধ্য বার্তালাভ ওই ক্ষণে স্থগিত রইল। তারা পরস্পরের হাত ধরে ফিরলেন কক্ষমধ্যে।
-বলো বীরদত্ত? কী সংবাদ?
-মহারানি পর্ণার নির্দেশ, রাজ্যাভিষেকের পুণ্যলগ্নের পূর্বে আপনি এই ক্ষণে আপনার তরবারি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতে পারেন। সেই পুণ্যকার্য হেতু...
-বীরদত্ত?
-বলুন চিত্রা?
-আমি পিতার তরবারিকে আপন ব্যক্তিগত ব্যবহার হেতু গ্রহণ করতে পারি না? ওই যে, মায়ের কক্ষে পিতার সুবৃহৎ তৈলচিত্রের সম্মুখে রক্তিম মখমলের উপর সিঁদুর-চন্দনচর্চিত যে সুবিশাল তরবারি মায়ের কক্ষের শোভা বহুলাংশে বর্ধন করছে, অসংখ্য রাত্রি মা ওই তরবারির পানে চেয়ে বিনিদ্র নিশিযাপন করছে... ওই তরবারিটিকে আমি আপন ললাটে স্পর্শপূর্বক আপনার নিকটে রাখার ইচ্ছা পোষণ করি বীরদত্ত। ওই তরবারিই আমার চাই।
-না কন্যা! আমি যদি মহারানি পর্ণা ও তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ অবগত হয়ে থাকি, আর আমার ধারণার মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র সত্যতা থাকে, তবে এই অমরাবতী রাজ্য এবং ওই প্রাণপ্রিয় তরবারিটি, রানি আপন জীবদ্দশায় দান করবেন না। রাজ্যের উত্তরসূরী আপনি। সেই হেতু রাজসিংহাসন ভবিষ্যতে আপনার নিকটেই আসবে। তবে ওই তরবারি?
মৃদুহাস্যে বীরদত্ত বলল,
-না! আপনাকেও না। এমন অসম্ভব ইচ্ছা এই ক্ষণে পরিত্যাগ করুন কন্যা!
কপট অভিমান প্রদর্শনকালে বীরদত্ত হতে মুখ ফেরালেন চিত্রা। বললেন,
-শৈলর ন্যায় তুমিও বড় দুষ্ট বীরদত্ত! তোমার সঙ্গে তিন দিবসকালব্যাপী বার্তালাভ বন্ধ! আমার দৃষ্টির সম্মুখ হতে দূর হয়ে যাও!
-বেশ! এই পরম প্রিয় মিত্রের কিঞ্চিৎ বেয়াদপি মার্জনা করবেন। বার্তালাভের বড় বিশেষ প্রয়োজন নেই, তবে মহারানির নির্দেশ যে পালন করতেই হবে কন্যা!
-কী নির্দেশ?
-এই ক্ষণে আপনি আমার সঙ্গে মায়াকানন ও অমরাবতীর সীমান্তে অস্ত্রাগারের যে বিপুল সম্ভার রয়েছে, সেই স্থান হতে সর্বসেরা তরবারিটি নিজের জন্য পছন্দ করবেন। আর ক্ষত্রিয় কন্যার তরবারি নির্বাচনের ন্যায় সেই পবিত্র কার্যে আমি আপনার সহায়তা করব। এ আমার পরম সৌভাগ্য! আপনি প্রস্তুত হয়ে নিন কন্যা। আমি কিছু সময় পরে...
-মায়াকাননের সীমান্তে? অর্থাৎ যে স্থানে সকল যাযাবর গোষ্ঠী, স্থানীয় প্রজা, পরিযায়ী শ্রমিক এবং উদ্বাস্তুদের মেলা বসে! ওই সুবিশাল প্রাঙ্গনে?
-আমাদের গন্তব্য ওই প্রাঙ্গন পেরিয়ে। তবে ওই প্রাঙ্গনের মধ্য হতেই আমাদের পথ।
-আমি মৃত্তিকা নির্মিত অলংকার ক্রয়ের ইচ্ছা রাখি। সই চলো...
-না! শৈল যাবে না। কেবল আপনি ও আমি। তরবারি নির্বাচনকালে কেবলমাত্র সেনানায়ক আপনার সঙ্গে থাকবে, মহারানির এমনই ইচ্ছা!
চিত্রার সকল উৎসাহ মুহূর্তে অস্তমিত হল মলিন মুখাবয়বের অন্তরালে। মৃদুস্বরে ও আহ্বান করল,
-সই লো! মায়ের আদেশ!
-তুমি সানন্দে যাও চিত্রা। আমি এই স্থানে তোমার নূতন তরবারি দর্শন হেতু অপেক্ষায় রইলাম। সম্ভব হলে ওই মিলনমেলা প্রাঙ্গন হতে আমার জন্য একখানি ঝুটো গজমোতির অলংকার উপহারস্বরূপ অবশ্যই এনো। আমার বড় ভালো লাগবে।
-কিঞ্চিৎ উপহারেই তুমি সন্তুষ্ট! এই কারণেই তোমাকে আমি এত ভালোবাসি সই।
-তুমি প্রস্তুত হও, আমি এই ক্ষণে আপন কক্ষে প্রস্থান করি।
চিত্রার কক্ষ হতে শৈলজার প্রস্থানের পর বীরদত্ত মৃদুহাস্যে চিত্রাকে অভিবাদন জানিয়ে বিদায় গ্রহণ করল। দেহ হতে কিছু স্বর্ণালংকারের ভার লাঘবপূর্বক, সামান্য প্রসাধন ও অলংকারে নিজেকে সজ্জিত করে, একটি উত্তরীয় হতে কিছু অংশ ছিন্ন করে আপন মুখমণ্ডলের কিয়দংশ আবৃত করলেন চিত্রা। কেবল দীঘল দুই চক্ষু রইল অবগুণ্ঠনমুক্ত। বীরদত্ত চিত্রার কক্ষ হতে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর মৃদু নারীকণ্ঠের আহ্বানে থমকে দাঁড়াল। অন্দরমহলের আলো-ছায়াঘেরা পরিবেশে বীরদত্ত দেখল, শৈলজা একটি প্রস্তরমূর্তির আড়াল হতে বেরিয়ে বীরদত্তর সম্মুখে উপস্থিত হল। প্রবল শ্লেষমিশ্রিত বাক্য নির্গত হল শৈলজার কন্ঠ হতে,
-আপনি মিথ্যা বলছেন বীরদত্ত। পর্ণা-মা আমাকে চিত্রার সহগামিনী হতে কখনোই নিষেধ করেননি। এ সকলই আপনার মনগড়া মিথ্যা বাক্য! আপনি চিত্রা হতে আমার দূরত্ব বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে এই মিথ্যা কথার আশ্রয় নিয়েছেন। এইরূপে আপনি আমার ষড়যন্ত্র হতে চিত্রাকে রক্ষা করবেন!!
-আমরণ!
বীরদত্ত দ্বিতীয় কোন কটু বাক্যের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। আপন মনে অন্দরমহল হতে প্রস্থান করে চিত্রাঙ্গদার প্রাণপ্রিয় অশ্ব সারঙ্গীকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করল।
(ক্রমশ....)
চিত্র : সংগৃহীত



 

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট