অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

প্রজাপতির মৃত্যু (দ্বিতীয় পর্ব)


 


প্রজাপতির মৃত্যু

মন প্রজাপতি

প্রথম অধ্যায়
সাথী দাস

দ্বিতীয় পর্ব




একরত্তি অনির্ণেয়কে কোলে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল দীপমালা। বাড়ির পাশের ফাঁকা জমিতে যেন মহোৎসব শুরু হয়ে গেছে। রাজমিস্ত্রীর কোলাহল, ঠাকুরমশাইয়ের মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খ ও ঘন্টাধ্বনি, সব মিলিয়ে আজ ডাক্তারের বাড়িতে সাজো-সাজো রব উঠেছে। মালা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,

-বাবা, এসব কী?

অনির্ণেয়কে কোলে নিয়ে হাসিমুখে দিগম্বর বললেন,

-এদিকে আয়।

ঠাকুরমশাইয়ের হাতের ওপর হাত রেখে একসঙ্গে একটা ইঁট গাঁথল মালা। অনির্ণেয় এবং মালার কপালে চন্দনের ফোঁটা এঁকে তাদের দীর্ঘায়ু কামনা করলেন ঠাকুরমশাই। আজ ভিতপুজোর সঙ্গে একমাত্র নাতির শুভাগমন উপলক্ষ্যে, দিগম্বর গৃহে পুজোর আয়োজন করেছিলেন। মহাসমারোহে ভিতপুজো সম্পন্ন হওয়ার পর বিকেলে রাজমিস্ত্রীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দিগম্বর যখন কথা বলছিলেন; মালা তাকে ডাকল,

-বাবা?
-বল! আমার নাতি কোথায়?
-ফিড করিয়ে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি। এসব তুমি কী করছ বলো তো বাবা? এত প্ল্যানিং, মিস্ত্রী-মজুর। আমি হাসপাতালে যাওয়ার আগে এই প্ল্যান পাস করার জন্য তুমি দৌড়াদৌড়ি করছিলে? অথচ আমাকে জানতেও দাওনি! জিজ্ঞাসা করলে বারবার এড়িয়ে গেছ! এই কী তোমার সেই স্বপ্নের হাসপাতাল?

দিগম্বর একটু হাসলেন। তারপর বললেন,

-না মা। আমার স্বপ্ন দেখার দিন শেষ। এবার তোর আর আমার নাতির দিন শুরু। আমার নাতির যেন কোন অযত্ন না হয় মালা। ওকে মেইডের ভরসায় বাড়িতে ফেলে রেখে, তোকে বাইরে কোথাও চাকরি করতে কোনদিনই যেতে হবে না। এটা তোর স্কুল। আমি যতটা পারছি করে দিয়ে যাচ্ছি। আপাতত সারাদিনে দু'হাজার ছাত্র পড়ানোর মতো ক্লাসরুম হবে। ওদিকে পাশাপাশি স্টুডেন্টদের জন্য পাঁচটা ওয়াশরুম। এদিকে স্টাফ ও টিচারদের ওয়াশরুম। দোতলা বিল্ডিং হবে। কিন্তু ভিত করা রইল চার তলার। এরপর আমি না থাকলে তুই ইঁটের ওপর ইঁট গেঁথে নিতে পারবি না মা? তুই না পারলেও, আমার নাতি ঠিক পারবে। আমি ওর ভবিষ্যৎ গুছিয়ে দিয়ে গেলাম। তোকে আর আমার নাতিকে কোথাও চাকরির জন্য ঘুরতে হবে না। বরং তোরা এই স্কুলে মানুষকে চাকরি দিবি, তাদের অন্নের সংস্থান করবি। আর একদম ছোট দুঃস্থ বাচ্চাদের জন্য প্রতিদিন দুপুরে ওই ফাঁকা জায়গায় ক্যাম্প করে অবৈতনিক স্কুল হবে। যারা পয়সার জন্য স্কুল চত্বর থেকে সাত হাত দূরে থাকে, তাদের প্রাথমিক শিক্ষাদান করবি তুই। প্রকৃতির মাঝে ক্লাস হবে, শরীরচর্চা হবে। আমি মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কিছু করতে চেয়েছিলাম মালা। সুস্বাস্থ্য বল কিংবা শিক্ষা, জীবনে তো দুটোরই প্রয়োজন আছে। তুই এইদিকে করবি, আর আমি যে ক'টা দিন বাঁচব, হসপিটালে ডিউটি করব। চেম্বারে ছুটব। পারবি না মা! আমার রঞ্জককে সামলে এই নতুন সংসারের দায়িত্ব নিতে?

সুবিস্তৃত ভিতের ওপর সারি-সারি ইঁট গাঁথা হচ্ছে। মিস্ত্রীদের মধ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতা। কিন্তু মালা আর কিছুই দেখতে পেল না। মুহূর্তেই ওর চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। বাবাকে জড়িয়ে স্বপ্নের স্কুলবাড়ির দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল ও। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় দিগম্বরের ম্লান হয়ে যাওয়া মুখটা তখন উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যখন বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে মালা মৃদুস্বরে বলল,

-আমি পারব বাবা!

অবিলম্বে দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রীর মর্মরমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হল স্কুলবাড়ির চত্বরে। বাড়ির সামনে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করা হল 'বসুধা শিক্ষা নিকেতন'। একরত্তি অনির্ণেয়কে সামলে উচ্চশিক্ষার জন্য জোরকদমে পড়াশোনা শুরু করল মালা। রামধনুর মতো রংবেরংয়ের প্রচারপত্র বিতরণ করা হল শহরের প্রত্যেকটি জনবহুল জায়গায়। দূর দূরান্ত পর্যন্ত বিদ্যুতের খুঁটিগুলো ঢাকা পড়ল স্কুলবাড়ির সুবৃহৎ ছবির আড়ালে। বছর পাঁচেক পর প্রথম প্রভাতের নরম রোদ্দুর গায়ে মেখে অসংখ্য ক্ষুদ্র বৃহৎ রঙিন প্রজাপতি প্রথম পাখা মেলে অভিভাবকদের হাত ধরে, কোলে চেপে যখন স্কুলের বড় গেটের সামনে উপস্থিত হল, তখন প্রিন্সিপালের চেয়ার আগলে চোখে চশমা এঁটে বসে রয়েছেন ব্যক্তিত্বময়ী দীপমালা চট্টোপাধ্যায়।

*******

রাস্তার টাইমের কল থেকে তিন বালতি জামাকাপড় কেচে ধুয়ে উঠোনে পা রেখেই বারান্দায় শুয়ে পড়ল পদ্মাবতী। এতবড় পেটটা নিয়ে ও আর চলতে ফিরতে পারে না। ঘর থেকে পিসি শাশুড়ির মুখনিঃসৃত অমৃতের মতো সুমিষ্ট বাণী ভেসে এলো,

-ও বউ, এলি? ও বউ!
-কী হয়েছে কী!
-বলি তোর গতরে কী পোকা ধরল নাকি রে! খেতে দিবিনে? কতখানি বেলা হল। ওই যে, মজ্জিদে সুর করে আযান দেয়। খিদা লাগে রে বউ! এরপর কী সুয্যি ডুবলে ভাত দিবি? দুটো ভাতের জন্য এই আবাগির কাছে দু'বেলা মুখ ঝামটা শুনতে হয়! তাও খাই নিজের ভাই ব্যাটার ভাত। পোড়া কপাল আমার! ও বউ! কোথায় মরলি রে তুই?
-এই দাঁড়াও তো! নিজের শরীরের জ্বালায় জ্বলে মরে যাচ্ছি, এই বুড়ি খাওনের জন্য চারবেলা হা হা করছে। বলি ভাই ব্যাটার ভাত খাও যখন, ঐ ভাই ব্যাটাকেই তো বলতে পারো, সে তিন বেলা তোমার মুখে রান্না করা ভাত তুলে দেবে।
-হ্যাঁ তাই বলব। তোর যত বড় বড় কথা! চোখ খুলে উঠেই ছেনালি করতে বেরিয়ে যাস! সাত বাড়ি চরে না বেড়ালে তোর পেটের ভাত হজম হয় না, সে কী আর আমি জানি না! ঢলানী মেয়েছেলে কোথাকার! কী দেখে যে আমার দুলাল গলেছিল! ওই গতর গতর! তোর গতরের এত জ্বালা, এখনো পেট করে বসে আছিস! ঘরের দিকে নজর আছে? একটা বুড়ি যে এত বেলা পর্যন্ত না খেয়ে শুকিয়ে গেল...

দুর্বলদেহী পদ্মাবতীর মাথা এতটাই ঘুরছে, ও আর সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতেই পারছে না। কিন্তু বাক্যবাণের জ্বালায় উঠতেই হল, ভেজা জামাকাপড়গুলো থেকে একটু জল ঝরলে তবেই ঘরে ঢোকানো যাবে। এদিকে সন্ধ্যা আসন্ন। কাপড়গুলো উঠোনের দড়িতে মেলতে মেলতেই বকবক শুরু করল পদ্মাবতী,

-খালি খাওন আর খাওন! পেট তো নয়, যেন কুয়ো! কত তোমার ভাই ব্যাটার টাকায় খাও তুমি, সে আমার জানা আছে। এবার থেকে একবার বলে দেখো, এ বউ! খিচুড়ির সঙ্গে একটা ডিম ভেজে দিবি? যা না, নাড়ুর দোকান থেকে চারটে ডিম নে আয়। তোর ছেলেপিলেরাও খাক! আমার ভাই ব্যাটা পরে পয়সা দে দেবে। দেখো বলে একবার! জন্মের শোধ খাওয়াব ডিমভাজা! বুড়ি ঘাটে উঠতে চলল, তাও দেখো নোলা একেবারে লকলক করছে। কোনদিন দিয়েছে তোমার ভাই ব্যাটা ঐ ধারের পয়সা? সারাদিন কাজ করবে, বিকেলে কলাটা-মূলোটা নিয়ে রাস্তার কোণে বসবে, আর রাতে ঠেকে মদ গিলে পকেট খালি করে ঘরে ঢুকবে! কী দিয়ে যে সংসার চলে বিছানায় শুয়ে তুমি বুঝবে কী করে বুড়ি! রোজ চোখ খুলে উঠে এই ছিনাল মেয়েছেলে সাত বাড়ি ঐ ছেনালি করতে না বেরোলে, দু'দিনেই শখের খাওন ঘুচে যাবে বুঝলে! আমার কী ইচ্ছা করে না, একটু ঘরে থেকে শুয়ে বসে আরাম করি! গতরে বেশি তেল হয়েছে যেন আমার! যে চোখ খুলে উঠেই লোকের বাড়ি ছুটব! পেটটা নিয়ে নড়তে পারি না। কিন্তু বাবুর বাড়ির কাজগুলো আজ ছাড়লে কালই তারা নতুন লোক রাখবে। বাবুদের সব ননীর শরীল। একবেলা লোক ছাড়া চলে না। একটা দিন কাজে কামাই করলেই মুখের রং ঢং বদলে যায়। টাকা দিয়ে কাজ করায়, মাগনা তো আর না.... আমার শরীলের ভালোমন্দ দেখবে কেন তারা! টাকা ফেললে কাজ করার জন্য লোক বসে আছে। কিন্তু কাজ গেলে আমার ঘরের এতগুলো পেট চলবে কোথা থেকে শুনি! তার ওপর ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা.... কী মরতে যে এই হাড় হাভাতে ঘরে এসে পড়েছিলাম মা গো! শরীল ভেঙে খেটে মরো, আবার কথা শুনেও মরো! এর চেয়ে বাপের ঘরে বসে থাকতাম, গতরে খাটতাম পেটে খেতাম, ওই ভালো হতো। একটা পেটের আবার চিন্তা কী? গুচ্ছের ছেলেমেয়ে তো আর বিয়োতে হতো না। শরীলটা আমার একেবারে শেষ হয়ে গেল গো। এতগুলো বছর হয়ে গেল নিজে একটা ভালো কাপড় একটা বেলাউজ কিনে পরতে পারি না, বাবুদের বাড়ি থেকে পাওয়া জামাকাপড় জোড়াতাড়া দিয়ে গোটা জেবনটাই কাটিয়ে দিলাম। ভালোমন্দ কিছু খাবার খেতে ইচ্ছে করলেও জোটে না, সব সংসারেই যায়! শালা সংসার তো নয়, যেন রাবণের চিতে! দিনরাত জ্বলছে! কিছুতেই আর অভাব নেভে না। যত দাও, ততই হাঁ করে আছে! মরণ মরণ! আমার মরণও হয় না ঠাকুর! ওঃ মা গো...

ঘরের ভিতরে মাদুরে বসে থাকা চলৎশক্তিহীন বৃদ্ধা বহুপূর্বেই চুপ করে গেছে একনাগাড়ে উগড়ে যাওয়া পদ্মাবতীর বাক্যবাণের জ্বালায়। পেটের ছেলেটা আজ বেঁচে থাকলে হয়তো দুটো ভাতের জন্য ভাই ব্যাটার বউয়ের এত গঞ্জনা সহ্য করতে হতো না। নিজের মা'কে কী আর ছেলে ফেলে দিতে পারত? সধবা কালে মাত্র একটাই ব্যাটা বিইয়েছিল সে। তাকেও আঁতুর ওঠার আগেই ভগবান কোল থেকে কেড়ে নিলেন। তারপর একদিন বরটাও মরে গেলে গাড়ি চাপা পড়ে। তিন ভাসুরঠাকুর আর তাকে শ্বশুরঘরের অন্ন ধ্বংস করার জন্য রাখতে চাইলেন না। অগত্যা দাদার বোঝা হয়ে বাপের ঘরে এসে উঠল সে। দাদা-বৌদি গত হয়েছেন বহু বছর হয়ে গেল। কিন্তু এই পোড়ারমুখী বিধবা বোনটাকে ফেলে গেছে শেষ বয়সে অথর্ব অবস্থায় লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করার জন্য। দাদার মৃত্যুর পর তার ছোট ছেলের হাতে এসে পড়েছে বৃদ্ধা। দাদার বড় ছেলেটা একবারও পিসির খোঁজ রাখে না। অথচ তার ঘরে লক্ষ্মী বাঁধা আছে। বুড়ো পিসিকে একবেলা দুটো ভাত দিলে কী তার অগাধ ঐশ্বর্য কিছু কমে যেত! খিদের জ্বালায় বিছানায় শুয়ে বৃদ্ধা চোখের জল ফেলছিল। চোখের সামনে একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে ক'টা মুড়ি আর বাতাসা দিয়ে বাবুর বাড়ির কাজে বেরিয়ে গিয়েছিল পদ্ম। সেই মুড়ি জলে ভিজিয়ে খিদের জ্বালায় বারকয়েক খেয়েছে বৃদ্ধা। তবুও সব মুড়ি সকালেই শেষ হয়ে গেছে। দন্তহীন বৃদ্ধা একটা বাতাসা চুষে চুষে খাচ্ছিল। তাও পেটের জ্বালা নেভে না। সে এই ঘরের মধ্যে সারাদিন একা পড়ে থাকে। জনমনিষ্যির দেখা পাওয়া যায় না। বুড়ো বয়সে অপ্রাসঙ্গিক আর অতিরিক্ত কথা বলার জন্য তাকে সকলেই সযত্নে এড়িয়ে যায়। জীর্ণ কাঁথার ওপরে দীর্ঘ সময়ব্যাপী একা শুয়ে থাকতে থাকতে খিদের তাড়নায় গুঙিয়ে কেঁদে ফেলে বৃদ্ধা। বিছানায় মল-মূত্র ত্যাগ করলেও, ঐ পদ্মর মুখের দিকে চেয়েই বসে থাকতে হয়, কখন সে বিছানা পরিষ্কার করে দেবে! দুলাল আর পদ্ম সারাদিন পেটের দায়ে দুটো পয়সার জন্য ঘুরে বেড়ায়। ছেলেমেয়েরা সব পড়াশোনা করে। পাড়া বেড়াতে বেরোয়। এর ঘর ওর ঘরে ঘুরে খায়। একমাত্র বৃদ্ধা বাঁধা পড়েছে জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। একাকীত্বের জ্বালা, আর সেই সঙ্গে এই পেটের জ্বালা বড় কষ্ট দেয়। সময়ে-অসময়ে খিদের জ্বালায় অনেক কুকথা বেরিয়ে পড়ে বৃদ্ধার মুখ থেকে। কিন্তু এই মুহূর্তে ধাতব বালতির ঝনঝনানির শব্দের সঙ্গেই তীব্র এক আর্তনাদ, আর তারপরই বন্ধ হয়ে গেল বউয়ের বাক্যবাণ! শশব্যস্ত বৃদ্ধা বিছানায় শুয়েই দরজা পিটিয়ে গলা ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল,

-ও বউ তোর কী হল? পড়ে গেলি নাকি? ও ঠাকুর! আমার পদ্মর কী হল গো! কেউ শিগগির এসো। ভরা মাস! বালতি নিয়ে বউটা পড়ে গেল মনে হয়! ও পদ্ম! রা কাড়িস না কেন রে? ও বউ!

আজ এক বাড়ির বৌদি তাড়াতাড়ি কাজে যেতে বলেছিল। ঐ বাড়ির বাচ্চাটার পাঁচ বছরের জন্মদিন। অগুনতি বাসন মেজে, দোতলা বাড়ির এতগুলো ঘরদোর মুছতে মুছতে অনেক বেলা হয়ে গেছে। ঘরে শুয়ে থাকা মানুষটার খিদে পাওয়ারই কথা! কিন্তু সাত বাড়ির এঁটো-কাঁটা ঘেঁটে, লোকের পাত কাচিয়ে চিরকালই গা কাপড় ধুয়ে স্নান করার অভ্যাস পদ্মাবতীর। নইলে ঘরে পা রাখতে মন চায় না। আজ ঐ বৌদি বাড়ির সকলের জন্য বিরিয়ানি আর মাংস দিয়েছে। সকলে একসঙ্গে বসে খাবে বলে, তাড়াতাড়ি হাতের কাজ গুছোতে চাইছিল পদ্ম। পরনের জামাকাপড়ের সঙ্গে আরও কয়েকটা জামাকাপড় কেচে স্নান করে ঘরে ঢোকার সময় পিসি শাশুড়ির কথায় মনটা এত খারাপ হয়ে গেল, যে আর সহ্য হল না। খিদেয় ওর নিজেরও পেট জ্বলছিল। বৌদি ওখানে বসেই ওকে খেতে বলেছিল। জানে বাড়িতে নিয়ে এলে ওর কপালে আর কিছুই জুটবে না! কিন্তু ঘরের বুড়িটাকে আর বাচ্ছাগুলোকে ফেলে, বাইরে কোন ভালো খাবার খেতে পদ্মর মন চায় না। স্নান সেরে উঠোনে পা রেখেই বাক্যবাণের জ্বালায় রাগে মাথা ঠিক রাখতে না পেরে, পিসি শাশুড়ির কথার প্রত্যুত্তরে কথা বলতে ব্যস্ত থাকা পদ্ম অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। আর তার ফলেই ঘটে গেল এক চরম দুর্ঘটনা। বালতিটা বারান্দা থেকে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ল উঠোনে। ভিজে কাপড়ে পা জড়িয়ে আছাড় খেয়ে অচৈতন্য পদ্ম পড়ে রইল সিঁড়ির ওপরে। প্রতিবেশীর ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো পদ্মর মেয়ে পূর্ণা। সাইকেল নিয়ে ঠিক তখনই টিউশন থেকে ফিরে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে কৈশোরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে। সে পদ্মর জ্যেষ্ঠ পুত্র টুকাই। সাইকেলটা কোনরকমে উঠোনে শুইয়ে রেখে মায়ের কাছে এসে, মাকে টেনে তুলল ছেলে...

কন্যা জন্মের পর কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন। হাসপাতালের শয্যায় প্রায় মিশেছিল পদ্ম। একজন নার্সদিদি এসে ওকে জিজ্ঞাসা করল,

-এই আজও তোমার বাড়ি থেকে কেউ এলো না? কাল তো ছুটি। তোমায় নিতে না এলে বাচ্চা নিয়ে তুমি যাবে কী করে?

সরকারি হাসপাতালের একটা শয্যা আঁকড়ে পদ্ম শুয়েছিল। আশেপাশের সবার বাড়ির লোক আসে, গল্প করে। সদ্যোজাত বাচ্চাকে নিয়ে হাসি-মজা করে। বাচ্চা না হলে বাড়ির লোক গর্ভবতী ভীতু মেয়েটার মাথার সামনে বসে থাকে। সাহস জোগায়। কত স্বামীদের পদ্ম দেখল, বউয়ের হাত ধরে বসে আছে। কত সোহাগ করছে! ও কেবল চেয়ে চেয়ে দেখে। এত যত্ন পদ্ম স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না। কিন্তু ঘরের মানুষটা যে একবারও ওকে দেখতে আসবে না, পদ্ম এটা ভাবতেও পারেনি! হয়তো ওকে ছাড়া ঘরে-বাইরে সামলাতে লোকটা অস্থির হচ্ছে! তাই হবে নিশ্চয়ই! একটা হাত আবার অকেজো। কোনদিকে করবে মানুষটা! বিছানায় শুয়ে কেঁদে ফেলল পদ্ম। বলে উঠল,

-এই মেয়েটারে কাউরে দিয়ে দেওয়া যায় দিদি? ওই যাদের বাচ্চাকাচ্চা হয় না, এমন কাউরে? আমি এরে বাড়ি নে যেতে চাই না। কোন টাকাপয়সা লাগবে না। বিককিরি করব না। কেউ নে গেলে মেয়েটা পেটপুরে দুটো খেতে পাবে! যেখানেই থাক, খেয়ে-পরে ভালো থাকলেই হল!
-কী বলছ তুমি?
-আমি আর পারছি না দিদি! আমি ওকে চাইনি। কেউ চায়নি ওকে। কত ওষুধপত্তর করেছি, কত শেকড় বাকড় বেটে খেয়েছি। জানোয়ারের মতো খেটেছি। ভারী জামাকাপড় কেচেছি। পেট চেপে ধরে বাবুদের ঘর মুছেছি। একদিনও বাবুর বাড়ির কাজে কামাই দিইনি। ভেবেছিলাম আপদ এইভাবেই বিদেয় হবে। কিন্তু কোন ওষুধ কাজ করল না। ডাক্তারবাবুর কাছে সে সময় নষ্ট করতে এলাম। দেখে ধমক দিয়ে বলল, এতদিন ঘুমুচ্ছিলে? সময় পেরিয়ে গেছে। আর হবে না। যাও যাও! আসলে আমার শরীল খারাপ ঠিকমতো হত না দিদি। আমি হবে হবে করে বসে আছি। এদিকে যে ভিতরে এসব হয়ে আছে, বুজব কী করে বলো? সবাই বলতে ঘরে টেস করে দেখি এই অবস্তা! শরীল নিয়ে আহা-উহু করলে আমার সংসার চলবে বলো? আর কী করি? নিজের শরীলের ওপর জোর করতাম যাতে বেরিয়ে যায়! কিন্তু এ আবাগি কিছুতেই বেরোল না। সবকিছুর সঙ্গে যুদ্ধ করে পোড়ারমুখী ঠিক বেঁচে গেল। তখনই আমি বুঝেছি, এ মেয়েমানুষ না হয়ে যায় না! হতভাগীর কই মাছের পেরান!
-বর্ন ফাইটার!
-সে আবার কী দিদি?
-কিছু না! তুমি মা না কী বলো তো? নিজের বাচ্চা বিলিয়ে দেওয়ার কথা একদম বলবে না। আগে ক'টা বাচ্চা?
-তিন ছেলে-মেয়ে। দুই ছেলে এক মেয়ে! টুকাই, ছোটু আর পূর্ণা।
-বর মেয়ে চায় না নাকি? একবারও বাচ্চার মুখ দেখতে এলো না যে!
-না চেয়েছিল। দুই ছেলের পর একটা মেয়েই চেয়েছিল। ওর একটা মেয়ের খুব শখ দিদি।
-শখেরও বলিহারি! তা মেয়ে যখন হয়েই গিয়েছিল, অপারেশন হয়ে যাওনি কেন?
-সেবার পূর্ণার সময় আমার শরীলটা খুব খারাপ হয়েছিল দিদি। ফোরসে করে ডাক্তারবাবু ওকে বের করে। তারপর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমার ছোটু সে সময় মিত্তিরদের বাড়ি আম চুরি করতে গে, আমগাছ থেকে পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলে। ক'দিন ওকে নে খুব ঝক্কি গেছে। তখনো আমার লোকটা আসতে পারেনি। অপারেশনের কাগজে কে সই করবে বলো! ছেলেটার কথা ভেবে সেবার আমিও তাড়াতাড়ি ঘরে চলে যাই। তারপর কাজকম্ম শুরু হল। আর আসা হয়নি গো।
-তাই আবার কাজ সেরে একেবারে গুছিয়েই এসেছ? তা অপারেশন হয়েছ এবার? নাকি আসছে বছর আবার...
-না দিদি। এবার মঙ্গলার মা টিপছাপ দিয়েছে। হয়ে গেছি।
-তাও ভালো! দেরিতে হলেও বোধোদয় হয়েছে।
-ও দিদি, তুমি আমার একটা উপকার করবে? ও দিদি!
-কী? কী করব? ঘ্যানঘ্যান করছ কেন?
-তুমি আমারে ক'টা টাকা ধার দেবে? আমাদের কেউ নিতে আসবে না। মায়ে-ঝিয়ে নিজেই ঘরে যাব। আমার কাছে একটাও টাকা নেই। রিসকা ভাড়াটা দেবে? এখান থেকে আমার ঘর চল্লিশ টাকা ভাড়া। এতদিন আমি ঘরে নেই, ঘরে খাবার কী আছে না আছে! গিয়ে বাজার করতে হবে। তুমি আমারে ওই একশো টাকাই দিও। ও দিদি, আমি ঘরে গিয়ে এক সপ্তা পর থেকেই আবার বাবুর বাড়িতে কাজ শুরু করব। বেশি ছুটি নিয়ে শুয়ে থাকলে আমার সংসারটাও আমার মুখের দিকে চেয়ে শুয়ে থাকবে গো। তুমি বিশ্বাস করে টাকাটা দাও দিদি, এই মেয়ের দিব্যি বলছি, মাইনে হাতে পেলেই তোমার টাকা তোমারে ফেরত দে যাব।
-যে মেয়েকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলে, একটু আগে দান করার কথা বলছিলে, এখন টাকার জন্য তার দিব্যি কেটে কথা বলছ? লজ্জা করে না?

চুপ করে গেল পদ্মাবতী। নার্সদিদি হেলেদুলে চলে গেল অন্য শয্যার দিকে। মায়ের কোলের মধ্যে কেঁদে উঠল একরত্তি শিশুকন্যা। শুষ্ক স্তনবৃন্তটা জোর করে তার মুখে গুঁজে দিল পদ্ম। কিন্তু কন্যার কান্না আর থামে না। নার্সদিদি এসে ছোঁ মেরে পদ্মর কোল থেকে মেয়েকে তুলে, আর এক মায়ের কোলে দিল। সেই মায়ের স্তন্যপান করে একটু শান্ত হল অভাগিনী।

পরের দিন কতগুলো কাপড়চোপড়ে পুঁটুলি করে মেয়েকে জড়িয়ে হাসপাতাল থেকে বাইরে বেরিয়ে রিক্সাস্ট্যান্ডে এসে পদ্ম বলল,

-মোছলমান পাড়ার আগের মোড়ে যাবে ভাই? ঘরে গে টাকা দেব। একটু দাঁড়াতে হবে।

রিক্সা চালক ইতস্তত করছে দেখে পদ্ম বলল,

-চলো না ভাই। সবেমাত্তর বাচ্চা হয়েছে। শরীলটা কাঁচা। ঘরের লোকটা নিতে আসেনি। বাচ্চা নিয়ে এত পথ হাঁটতে খুব কষ্ট হবে। চলো না একটু!
-নাও ওঠো ওঠো! হাঁ করে দাঁড়িয়ে না থেকে রিক্সায় ওঠো।

ঘাড় ফিরিয়ে পদ্ম দেখল ওর পিছনে সেই নার্সদিদি দাঁড়িয়ে আছে। ধমক দিয়ে উঠল সে,

-আরে ওঠো তাড়াতাড়ি। আমার মুখের দিকে কী দেখছ?

মেয়েকে কোলে নিয়ে রিক্সায় উঠে বসল পদ্ম। ওর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে দিদি মৃদুস্বরে বলল,

-দুধ হবে বলে তো মনে হয় না। নিজেরই খাওয়াদাওয়া নেই, তো হবে কী করে! শোন, বাচ্চাকে দুধ কিনে খাওয়াবে। আর নিজেও একটু ভালোমন্দ খাবে। গোটা জীবনটা সংসারের জন্য ঢেলে দিও না। কত দেখলাম তোমার মতো মেয়েমানুষ! একটা কথা মাথায় রাখো, তুমি ভালো না থাকলে, তোমার ঐ সাধের সংসার ভেসে যাবে। তুমি চোখ বুজলে বর আবার বিয়ে করে ঘরে বউ নিয়ে আসবে। তখন তোমার বাচ্চাগুলোর দুর্গতির শেষ থাকবে না। আগে নিজে একটু ভালো থেকে, তারপর সবাইকে ভালো রেখো। বুঝলে? আর এই টাকা ফেরত দিতে এলে তোমার খবর আছে। যাও যাও! এই ভাই, তোমার ভাড়াটা রাখো। রিক্সা একটু আস্তে আস্তে চালাবে বুঝলে! রাস্তার যা অবস্থা! নতুন মা! কষ্ট হবে।

কান্নায় পদ্মর গলা বুজে এসেছিল। রিক্সা চলতে শুরু করামাত্রই তাড়াতাড়ি প্লাস্টিকটা সরিয়ে পদ্ম দেখল নার্সদিদিকে। সে হাসপাতালের দিকে ছুটছে। চিৎকার করে ডেকে উঠল পদ্ম,

-ও দিদি?
-কী? ও টাকা আর ফেরত চাই না। তুমি যাও। নিজের যত্ন নিও। বাচ্চার কার্ড করিয়ে সময়মতো সব ভ্যাকসিনগুলো নিয়ে নেবে। মনে করে পোলিও খাওয়াবে!
-টাকার জন্য না দিদি। ওর মা বেঁচে থাকতে, তুমি আমার মেয়ের দুধের টাকা দিলে। শুধু তোমার নামটা বলো গো দিদি? মরণ পর্যন্ত আমি তোমারে ভুলব না গো!

অমায়িক হাসি হেসে নার্স বলে উঠল,

-সুরঞ্জনা!

তারপরই সে ছুটল হাসপাতালের দিকে। রিক্সা পূর্ণ গতি পেয়ে গেছে। অশ্রুসজল পদ্মর দু'চোখ। দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে আগলে রিক্সায় চেপে বসে অঝোরে কাঁদল ও। হাতের মুঠো খুলে দেখল, পাঁচশত টাকা মুঠোবন্দি হয়ে ঘামে ভিজে উঠছে। কোনরকমে ওই টাকাটা আঁচলে মুড়ে মেয়েকে বুকের ভিতর জড়িয়ে রাখল পদ্ম। মায়ের বুকের উষ্ণতায় ঘুমিয়ে রয়েছে মেয়েটা। যেন কত নিশ্চিন্ত আশ্রয়! অথচ পেটে থাকতে এই জন্মদাত্রী ওকে হত্যা করার জন্য কত যুদ্ধই না করেছে! কিন্তু নিজের গর্ভধারিণীকে পরাস্ত করে একজন যোদ্ধার মতো এই অসম যুদ্ধে জয়লাভ করেছে মেয়েটা। কাপড়ের আঁচলে বাঁধা টাকাটা মুঠো করে ধরল পদ্ম। ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে ধীরকণ্ঠে বলে উঠল,

-সুরঞ্জনা!

রিক্সা এগিয়ে চলল আপন গতিতে। গতরাতে বোধহয় এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তার দু'পাশে শুকিয়ে আসা কাদার দিকে অন্যমনস্কভাবে চেয়ে রইল পদ্ম। রাস্তার কোণে অযত্নে বেড়ে ওঠা রংবেরংয়ের বুনোফুলগুলো বুঝি এখনো সিক্ত। গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে বিন্দু বিন্দু জল খসে পড়ছে রুক্ষ মাটিতে। অযত্নে ও অবহেলায় প্রস্ফুটিত বুনোফুলগুলোর ওপর কয়েকটা চঞ্চল প্রজাপতি মহানন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

প্রজাপতির মৃত্যু (প্রথম পর্ব)


 

প্রজাপতির মৃত্যু

মন প্রজাপতি

প্রথম অধ্যায়
সাথী দাস
প্রথম পর্ব


বাবার সামনে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়েছিল দীপমালা। শৈশবেই মাতৃহারা সে। বাবা দিগম্বর চাটুজ্যে বর্তমানে মালার জীবনের একমাত্র অবলম্বন। এই কন্যার কারণে অকালে স্ত্রীবিয়োগের পর দ্বিতীয়বার নতুনভাবে জীবন শুরু করার কথা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি। হাসপাতাল, রোগী, ঘরকন্না সব একা সামলে মালার যাবতীয় স্বপ্নকে স্বহস্তে রূপদান করেছেন ডক্টর দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বড় সাধ ছিল, দুই কামরার ছোট চেম্বারটা ছাড়িয়ে চিকিৎসার পরিধি আরও বৃদ্ধি করবেন। একমাত্র কন্যার হাত ধরে অদূর ভবিষ্যতে বাড়ির পার্শ্ববর্তী জমিতে বড় একটা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন। যেখানে সপ্তাহে একদিন সমস্ত দুঃস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করবেন বাবা ও মেয়ে। নিখরচায় তাদের রক্ত-মল-মূত্র পরীক্ষা করা হবে। ধীরে ধীরে অনেক বড় হবে সেই হাসপাতাল। একাধিক ডাক্তার ও দরিদ্র রোগীর কোলাহলে মুখরিত হবে পাড়া। নিজের স্ত্রী-র নামে ওই হাসপাতালের নামকরণ করবেন তিনি। আর দিগম্বর চাটুজ্যের পরবর্তী উত্তরসূরী হবে তাঁরই সুযোগ্যা কন্যা ডক্টর দীপমালা চট্টোপাধ্যায়! কিন্তু এই স্বপ্নপূরণের জন্য নূন্যতম উৎসাহটুকুও, মেয়ের মধ্যে কোনদিন দিগম্বর দেখতে পাননি। সাহিত্যকে ভালোবেসে কলা বিভাগে যখন মালা ভর্তি হতে চাইল, দিগম্বর বিন্দুমাত্র আপত্তি করেননি। মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাধীনতাকে সর্বদাই প্রাধান্য দিয়েছেন তিনি। কিন্তু আজ তিনি মালার মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন। স্নাতকোত্তর বিবাহযোগ্যা মালার ভবিষ্যৎ চিন্তা করে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে দিগম্বর বলে উঠলেন,

-তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে এই কথাটা উচ্চারণ করলে কী করে মালা? এই বাড়ি, গাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, তোমার মা আর ঠাম্মির এত গয়না.... এইসব দিয়ে বিয়ে দেওয়ার পর একটা বেকার ছেলেকে নিজের জামাই...
-এসব আমার চাই না বাবা।
-তুমি উচ্চশিক্ষিতা মালা। নিজের ভালোমন্দ বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এটা বোঝার পরই আমি তোমাকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার করেছ। তুমি ভাবলে কী করে একটা ভিখারি ভ্যাগাবন্ড বেকার ছেলের সঙ্গে আমি আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেব? নিজের শিক্ষা, বংশপরিচয়, ক্লাস.... সব ভুলে তুমি একটা রাস্তার ছেলের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছ!
-ও রাস্তার ছেলে নয় বাবা! উচ্চবংশের ছেলে। বাবা নেই। মা ওকে জন্ম দিয়েই মারা গেছেন। কাকার সংসারে আশ্রিত। পরিমিত টাকার অভাবে এত বছর ধরে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। অর্থাভাবে এখনো ছাত্র পড়ায়। একটা চাকরির জন্য দিনরাত হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
-বিয়ের পর ও কোথায় রাখবে তোমাকে? মেসে? নাকি ওই কানাগলি পেরিয়ে অন্ধকার বস্তির ঘরে? যেখানে সাক্ষরতার নামে সে সারারাত সমাজসেবা করে বেড়ায়!
-ও ঐ নিষিদ্ধ পল্লীতে যায় ওদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে পড়াতে, অন্ধকার গলিতে একটু শিক্ষার আলো জ্বালাতে যায়। নিষিদ্ধ পল্লীর অস্পৃশ্য মানুষগুলো ওকে দেবতার মতো পুজো করে বাবা। মাস্টারদা বলে ডাকে। ওর সামনে কোনরকম কটুকথা উচ্চারণ পর্যন্ত করতে পারে না, ওকে এতটাই সম্মান করে। আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি। আমি তোমার মেয়ে বাবা। আমি কী কোন ভুল করতে পারি? তুমিই বলো!
-তুমি ওইসব জায়গায় গেছ? এত অবনতি তোমার!
-হ্যাঁ গেছি। তো কী হয়েছে? মানুষের রোগ হলে তুমি কী চিকিৎসা করার আগে রোগীর পরিচয় জেনে চিকিৎসা করো? রোগিনীর অবস্থান যদি নিষিদ্ধ পল্লীতে হয়, তার প্রাণ বাঁচাতে তুমি ওই অন্ধকার গলিতে যাবে না?
-এতদিনের শিক্ষা তোমাকে বাবার মুখের ওপর কথা বলতে শিখিয়েছে? এতখানি ঔদ্ধত্য!
-না। তুমি আমাকে এতদিন ধরে যে শিক্ষা দিয়েছ, সেই শিক্ষা আমাকে শিরদাঁড়া সোজা রেখে সঠিক কথা বলতে শিখিয়েছে। সেটা আলাদা বিষয়, যে তুমি আমার স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে আজ ঔদ্ধত্য খুঁজে পাচ্ছ.... অথচ, এটা তোমারই শিক্ষা!
-আমি ঐ ছেলেকে মানব না।
-আমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
-বেশ। তবে সিদ্ধান্ত নাও, আমি.... নাকি ওই ছেলে? দু'জনকে একসঙ্গে তুমি নিজের জীবনে রাখতে পারবে না। কোন ভদ্রসমাজে আমি তাকে নিজের জামাই বলে পরিচয় দেব না।

মালা আর মাথা তুলতে পারল না। অশ্রুভারে অবনত ওর দু'চোখ। শৈশব হতে এ যাবৎকাল পর্যন্ত পিতৃগৃহে যাপন করা সুখ-দুঃখের সকল মুহূর্তগুলো ছায়াছবির মতো ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু যৌবনে প্রেমের দাবিও বড় কম নয়। মালার দেহ আড়ষ্ট হয়ে এলো। কম্পিত শীতল হাতটা সে বাবার পায়ের ওপর রেখে মাথায় ছুঁয়ে নিল। দিগম্বর স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখলেন, সর্বক্ষণের ব্যবহৃত দুটি সোনার আংটি, কানের দুল ও গলার সরু চেনটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে, শিক্ষাজীবনের যাবতীয় শংসাপত্রের ফাইলগুলো সম্বল করে, তাঁর একমাত্র মেয়ে এক কাপড়ে বিনা বাক্যব্যয়ে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে গেল। বাবার দিকে আর ফিরেও চাইল না। অসহায় প্রৌঢ় তীব্র মনোকষ্টকে সঙ্গী করে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন খোলা দরজার দিকে।

পাড়ার সর্বাধিক প্রাচীন ও অভিজাত পরিবারের একমাত্র ঠিকানা এই চাটুজ্যে আবাসন। বড় সাধ করে দীপমালার ঠাকুরদা বাড়ির নামকরণ করেছিলেন 'স্মৃতিমেদুর'। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রভাবশালী দিগম্বর চাটুজ্যের অসামান্য প্রতিভা ও পসারের কারণে বর্তমানে এই বাড়ি 'ডাক্তারের বাড়ি' নামেই পরিচিত। বাড়ির পার্শ্ববর্তী স্থানে কয়েক বিঘা জমি পড়ে রয়েছে নিতান্তই অযত্নে। জংলী ঘাস আর হাতেগোনা কয়েকটা গাছগাছালি নিয়ে দিগম্বর বাবুর সংসার। বুনো ফুলের রূপ ও গন্ধে অসংখ্য প্রজাপতির দেখা পাওয়া যায়। দিনের বেলা বাড়িতে থাকলে স্টাডি টেবিলে বসে, ওই রঙিন প্রজাপতিগুলোর দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকেন তিনি। যেন উড়ন্ত রামধনু! অজস্র রঙের সমাহার তার চোখের সামনে। কিন্তু তাঁর নিজের জীবন বড়ই বিবর্ণ। যেদিন সন্ধেবেলা চেম্বার থেকে ডাক্তারবাবু একটু তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন, সেদিন মনটা বড় ব্যাকুল হয়। মালা চলে গেছে প্রায় তিন মাস সময় অতিক্রান্ত। প্রতিদিন সকালে দুধ দেয় যে ছেলেটি, ডাক্তারবাবু তার কাছ থেকে উড়ো খবর পেয়েছেন, যে মালা ঐ ছেলেকেই বিয়ে করে একটা এক কামরার ঘরে ভাড়া আছে। পরদিনই ওই ছেলেটির প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে, তাকে বিদায় করেন তিনি। শৈশব ও আপনজনের সকল স্মৃতি আঁকড়ে বাড়ির এককোণে একাকী পড়ে রইলেন ডক্টর দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়। সুবিশাল তিনতলা বাড়ি প্রায় জনমানবহীন। হাসপাতাল, চেম্বার আর বাড়ি, এই তিন জায়গায় দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন ডাক্তারবাবু। কথা বলার মতো একটা মানুষও তাঁর জীবনে নেই। প্রেতপুরীর মতো খাঁ খাঁ করে তাঁর জগৎ। আজ সকালে তিনি একটা লোককে ডেকেছেন। বাড়ির চতুর্দিকের আগাছাগুলো পরিষ্কার করতে হবে। তাছাড়া বাড়ির আরও কিছু কাজের জন্য সকাল থেকে একজন মানুষ ঝুড়ি-কোদাল নিয়ে নেমে পড়েছে বাড়ির প্রাঙ্গনে। তাকে এক কাপ চা দিয়ে, জানালার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেও চা পান করছিলেন ডাক্তারবাবু। এমন সময় ড্রইংরুমের ফোনটা বেজে উঠল। ডাক্তার আজ ছুটির মেজাজে রয়েছেন। তাঁকে আর অসময়ে কে ফোন করবে? বড়জোর চেম্বার অথবা হাসপাতাল থেকে। আজ কোন ফোনই ধরতে ইচ্ছে করল না। কিন্তু একবার লাইনটা কেটে যাওয়ার পরেও গৃহকর্তার ইচ্ছে-অনিচ্ছের পরোয়া না করে বেয়াড়া ফোনটা আবার বেজে উঠল। চায়ের ব্যাপারে বরাবরই শৌখিন ডাক্তারবাবু। আয়েশ করে তিনি চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। অবেলায় চায়ের সুগন্ধে আবিষ্ট হতে বেশ ভালো লাগছিল তাঁর। কিন্তু সেই আমেজে ছেদ পড়ল ফোনের কারণে। একরাশ বিরক্তির উদ্রেক হল। একটি বিরক্তিসূচক শব্দ বের হল তার মুখ থেকে। চায়ের কাপ প্লেট টেবিলে নামিয়ে রেখে ফোন ধরলেন তিনি। ডাক্তারবাবুর কানের পার্শ্ববর্তী পক্ককেশ বেয়ে স্বেদবিন্দু নেমে এলো। কপালে একাধিক ভাঁজ! উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি ক্রমে ঝাপসা হয়ে গেল। শরীরটা হঠাৎই খুব খারাপ লাগতে শুরু করেছে। ফোন রেখে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বাড়ির দরজা আটকে বেরিয়ে পড়লেন তিনি। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি, এলো গায়ে ঘর্মাক্ত লোকটা কোদাল কাস্তে আর একমুঠো ঘাস হাতে উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে ডাক্তারবাবুর গাড়িটা তীব্র গতিতে বড় গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়েছে।

সতীর্থর ফোনটা পেয়েই সরকারি হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছেন ডাক্তারবাবু। তাঁর সমগ্র দেহ কাঁপছিল। বন্ধু তাঁর কাঁধের ওপর হাত রাখার পর একটু শান্ত হলেন তিনি। একটা নির্দিষ্ট শয্যার সামনে পৌঁছে ডাক্তারবাবু আর চোখে জল ধরে রাখতে পারলেন না। রুগ্নকায় দীপমালা হাসপাতালের শয্যার সঙ্গে প্রায় মিশে গেছে। সুন্দরী বিদূষী মালার দেহ প্রায় কঙ্কালসার। নারীদেহ বহু পূর্বেই স্বাভাবিক জৌলুস হারিয়েছে। দেহে অজস্র ক্ষতচিহ্ন। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে মুখের বিভিন্ন জায়গায়। রোগ জর্জরিত ক্লান্ত দেহে চোখ বন্ধ করে পড়ে রয়েছে ডাক্তারবাবুর একমাত্র কন্যা। দিগম্বরের বন্ধু কন্যাস্নেহে মালার মাথায় হাত রাখল। কোটরাগত দুটি চোখ ধীরে ধীরে মেলল মালা। মাত্র এক হাত দূরে ভেঙেচুরে যাওয়া একজন শীর্ণকায় মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মানুষটা আজন্মকালের পরিচিত হলেও, তাঁর এইপ্রকার ভগ্নস্বাস্থ্য, কঙ্কালসদৃশ দেহ মালার কাছে অচেনা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মালা। দিগম্বর বাবু মালার কাছে দাঁড়ানোমাত্রই নীরব কান্নায় ভেসে গেল সে।

ছাত্রজীবন হতেই কুসঙ্গে পড়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে যাতায়াত সূত্রে এক মধ্যবয়সী নারীর সঙ্গে বহু বছর যাবৎ গোপন সম্পর্কে আবদ্ধ দীপমালার স্বামী। কিন্তু প্রবল অর্থাভাবের কারণে ওই অন্ধকার গলি পরিত্যাগ করে নিজের মনের মানুষের সঙ্গে বেরিয়ে আসা মহিলাটির পক্ষে সম্ভব হয়নি। ঐ মহিলার দুই সন্তানসহ নিষিদ্ধ পল্লীর আরও কয়েকটি বাচ্চাকে পড়াতে শুরু করে সে। সেই সঙ্গে সকলের অগোচরে চলতে থাকে ঐ নারীর সঙ্গে প্রগাঢ় প্রেম। ইতিমধ্যেই কিছু সমাজ সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত দীপমালা ঐ পুরুষের প্রখর ব্যক্তিত্ব ও কথার জালে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে উন্মাদিনী হয়ে পড়ে। পুরুষটি মালার সেই দুর্বলতা অবগত হওয়ামাত্রই জানান দেয় আপন প্রেমিকাকে। সেই মধ্যবয়সী মহিলার পরামর্শে মালাকে প্রেম নিবেদন করে ঐ পুরুষ। তারপর কয়েক মাস ব্যাপী চলে তাদের প্রগাঢ় প্রেম এবং সবশেষে বিবাহের প্রস্তুতি! কিন্তু প্রবলভাবে বাধা আসে দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষ হতে। এখানেই ঐ মধ্যবয়স্কা প্রেমিকার সকল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। দীপমালাকে বিয়ে করে তার যাবতীয় ঐশ্বর্য হস্তগত করার পর তাকে কোন অনামী অন্ধকার গলিতে ছুঁড়ে ফেলার যে পরিকল্পনা তারা যৌথভাবে করেছিল, ডাক্তারবাবুর কঠিন বাক্যের প্রভাবে মালার হঠকারী সিদ্ধান্তে সকল পরিকল্পনা তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে। মালা কপর্দকহীন অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসায়, সেই মুহূর্ত হতে নিজের অজান্তেই প্রেমিকের গলার কাঁটা হয়ে যায় সে। কিন্তু পূর্ব প্রেমিকার পরামর্শে নিতান্তই অনাড়ম্বর এক বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকেই অবর্ণনীয় মানসিক নির্যাতন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় দীপমালা। ততদিনে স্বামীর কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মনোবল হারিয়েছে সে। অবিলম্বে মালা জানতে পারে, তার স্বামী সম্প্রতি কিছু অসামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং বহু টাকার দেনা তার মাথায় রয়েছে। সেই দেনা শোধের জন্য দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা আদায়ের প্রস্তাব মাত্রই, মালা সেই প্রস্তাব তীব্রভাবে অস্বীকার করে। ততদিনে স্বামীর পূর্ব প্রেমিকা ও তার পিতৃ পরিচয়হীন দুই সন্তান সম্পর্কে অবগত হয়েছে মালা। অশান্তি যখন চরমে ওঠে, একদিন রাতে মালাকে তুমুল প্রহার করে তার স্বামী। অত্যাচারে জর্জরিত মালা জ্ঞান হারালে তাকে মৃত ভেবে গা ঢাকা দেয় সেই পুরুষ। আট ঘণ্টা পর জনাকয়েক সহৃদয় প্রতিবেশীর কল্যাণে ঘরের দরজা ভেঙে প্রায় অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় ডাক্তারবাবুর একমাত্র কন্যাকে। সেই সময় হাসপাতালের ওয়ার্ডে কর্তব্যরত ডাক্তার দিগম্বর ও দীপমালার পূর্বপরিচিত হওয়ায়, সহজেই বাবার কাছে মেয়ের এই দুরবস্থার সংবাদ পৌঁছয়। হতভাগ্য কঙ্কালসার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ডাক্তারবাবু।

মালার অবনত দৃষ্টি বাড়ির চৌকাঠের ওপর নিবদ্ধ। নিজের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা করে, একবুক বিশ্বাস নিয়ে একদিন এই চৌকাঠ পেরিয়েছিল সে। আজ বাবার হাতের ওপর দুর্বলদেহের সকল ভার অর্পণ করে, আবার ফিরে আসতে হল সেই চৌকাঠেই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিল মালা। দিগম্বর মেয়ের মনোকষ্ট অনুভব করে বলে উঠলেন,

-বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের ফেরার রাস্তা কোনদিন বন্ধ হয় না মা! সারা পৃথিবী তোকে ছেড়ে দিলেও, তুই জানবি বাবা সবসময় তোর পাশে আছে। পিছন ফিরলেই আমাকে দেখতে পাবি তুই! ঘরে আয়। আমার লক্ষ্মী মাকে ছাড়া বাড়িটা এতদিন শ্মশান হয়ে গিয়েছিল।

সেই কান্না বাবার সান্ত্বনাবাক্যে বন্ধ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মাঝরাত থেকে তীব্র অসুস্থতা ও বমির প্রভাবে মালা প্রায় মরতে বসল। গ্রানাইট পাথরে মোড়া ঝকঝকে বাথরুমের সুবৃহৎ আয়নাটাও যেন বিদ্রুপ করছে ওকে। আয়নার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই বমি করে বেসিন ভাসিয়ে দিল মালা। সারা শরীর কেঁপে উঠল ওর। আয়নায় যে নারীর প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে, তার পেটের দিকে মালা একদৃষ্টে চেয়ে রইল।

একটা অচেনা লোক বাগানের আগাছাগুলো পরিষ্কার করছে। কত প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে তার আশেপাশে। অন্যমনস্কভাবে ওদিকে চেয়েছিল মালা। চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরছে। বাবা আজ বাড়িতেই আছেন। মাথায় বাবার স্নেহস্পর্শ অনুভব করামাত্রই মালা চোখের জলটুকু মুছে ফেলল। দিগম্বর সস্নেহে বললেন,

-এভাবে একা একা ঘরে বসে আছিস কেন মা? কাজকর্ম কিছু কর। কাজ করলে মন ভালো থাকবে। সব ভুলে থাকতে পারবি। তুই যে বলেছিলি, তোর স্কুলে চাকরি করার খুব শখ। দেখ না একটু চেষ্টা করে.... আমি দেখব? আমার চেনা পরিচিতর মধ্যে...
-ভুলতে পারব না বাবা। এখন তো আর চাইলেও ভুলতে পারব না। মানুষ চিনতে কী করে এতবড় ভুল করলাম আমি? ভদ্র-সভ্য, কত মার্জিত, শিক্ষিত, লেখাপড়া জানা একটা মানুষ.... সে কিনা ক্রিমিনাল! নূন্যতম মনুষ্যত্ববোধটুকুও নেই তার! গায়ে হাত তোলে...
-একটা কথা সারাজীবন মনে রাখিস মালা, শিক্ষার সঙ্গে মনুষ্যত্বের কোন বিবাদ নেই। মনুষ্যত্বের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু দু'পাতা বই পড়ে ফেলা কোন শিক্ষিত মানুষ যদি একবার মনুষ্যত্ব হারায়, তখন সে ঠান্ডা মাথায় মানুষও খুন করে ফেলতে পারে। শিক্ষার এমনই মহিমা! মনুষ্যত্ববোধ আছে এমন মানুষ শিক্ষিত না হয়ে, যে কেউ দু-চার পাতা পড়ে ফেলে যদি নিজেকে শিক্ষিত ভাবতে শুরু করে, তবে ঐ ক্ষেত্রে শিক্ষারও অপব্যবহার হয়। আর তার মূল্য তোদের মতো নির্বোধ মেয়েদের গোটা জীবন দিয়ে শোধ করতে হয় মা!

বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল মালা।

-বাবা এবার কী করব আমি?
-চাকরি কর। ছাত্র পড়াবি তোর কতদিনের ইচ্ছা। নিজের সেই স্বপ্নগুলো পূরণ কর। জীবনে বিয়েটাই কী সব নাকি! আমার কথা একবারও ভাববি না তুই? তোকে এভাবে দেখতে পারি না আমি! বুঝিস না কেন তুই! ওসব দুর্ঘটনা ভেবে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দে দেখি...
-পারব না বাবা! আর পারব না। কী করব আমি এবার! আমি বোধহয় ঐ জানোয়ারের একটা অংশ নিজের মধ্যে বহন করে চলেছি। জীবনে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি বাবা। কী করব আমি?

বাক্যহারা হয়ে গেলেন দিগম্বর। মালা বাবার বুকের ওপর দাপাতে শুরু করল। মেয়েকে চেয়ারের ওপর জোর করে বসিয়ে দিলেন ডাক্তারবাবু। ধীরকণ্ঠে বললেন,

-যদি সত্যিই তাই হয়, তবে এ সিদ্ধান্ত তোমার মালা। তাকে রাখবে না ত্যাগ করবে, এ ব্যাপারে তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমি সব ক্ষেত্রেই তোমার পাশে আছি। কিন্তু এই কঠিন সিদ্ধান্তের নির্ণায়ক আমি হতে পারব না। তুমি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। আমি আর কত বছর বাঁচব মা? দশ বছর! বড়জোর কুড়ি বছর! তারপর এই সন্তানকে তোমাকে একাই সারাজীবন ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। সুতরাং ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নাও! তার ভবিতব্য নির্ণয় করার দায়িত্ব আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।
-আমার পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয় বাবা! আমি ঐ মানুষের কোন কিছুই নিজের জীবনের সঙ্গে নতুন করে জড়াতে চাই না।
-বেশ। ভালো কথা। নতুন করে জড়াতে হবে না। কিন্তু যে ইতিমধ্যে জড়িয়ে গেছে, তাকে তুই কী করে অস্বীকার করবি মা?
-বাবা তুমি সত্যিই চাও আমি এই সন্তানকে জন্ম দিই?
-আমি ডাক্তার! মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি রোগীর জীবনের জন্যই লড়াই করি। সেখানে নিজের মেয়েকে খুন করার পরামর্শ দিতে বিবেকে বাধছে। আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। তুমি মা। নিজের সন্তানের ভাগ্য নির্ধারণ তুমিই করবে!

বাবা নিজের ঘরে চলে গেছে দীর্ঘক্ষণ আগে। কিন্তু বাবার ঐ একটা কথার অনুরণন মালার মনের মধ্যে এখনো অব্যাহত। বমি করতে করতে অস্থির হয়ে গেল মালা। বমন ইচ্ছা দমন করার প্রবল চেষ্টায় ওর বুক-পেট ব্যথা হয়ে গেল, তবুও ভুলতে পারল না ওই একটা ক্ষুদ্র বাক্য "তুমি মা!" ঐ ক্ষুদ্র বাক্যের মধ্যেই যেন পৃথিবীর সকল মায়া একত্রে জড়িয়ে রয়েছে। সমগ্র রাত্রিব্যাপী অজস্র চোখের জল বিসর্জন দিয়ে, নিজের পেটের ওপর পরম স্নেহে হাত রাখল দীপমালা।

হাসিমুখে মালার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দিগম্বর চট্টোপাধ্যায়। নরম তোয়ালে জড়ানো সদ্যোজাত শিশুটি গভীর ঘুমে মগ্ন। ক্লান্ত মালার চোখেমুখে পরম প্রশান্তির স্পর্শ। এক সময় এই সন্তানকে পৃথিবীতে আনার সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে মনস্থির করতে পারেনি সে। তবে আজ মনের সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে মালা বিজয়িনী।

দিগম্বর বাবু নিজের নাতিকে খুব সাবধানে কোলে তুলে নিলেন। যে মানসিক দোলচালের মধ্যে দিয়ে এই পথ মালা অতিক্রম করেছে, সেই সময়কালের যন্ত্রণা মাথায় রেখে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করল সে,

-অনির্ণেয়!
-রঞ্জক!

বাবার মুখে নবজাতকের নাম শুনে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মালা ক্ষীণস্বরে বলল,

-রঞ্জক! ভারী সুন্দর নাম বাবা।
-অনির্ণেয় কেন? সিদ্ধান্ত নিতে তার গর্ভধারিণী বড় বেশি মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছে, সেইজন্য?

নিরুত্তর দীপমালা। মায়ের কোলের কাছে শিশুটিকে রেখে দিগম্বর বললেন,

-তোর জীবনের সমস্ত রং দিয়ে তোর অনির্ণেয়, আর আমার রঞ্জককে তুই বড় করবি মা। মনুষ্যত্ববোধ আছে, এমন মানুষ তৈরি করবি। আমি আশীর্বাদ করছি, অনির্ণেয় অনেক বড় হবে। সবার থেকে আলাদা হবে ঠিকই, কিন্তু সবার ভালোবাসার মানুষ হয়ে ও ভালোবাসা আদায় করে নেবে...

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে জানালার বাইরের দিকে চাইল দীপমালা। প্রায় শুকিয়ে আসা গুল্মজাতীয় গাছগুলোতে অগুনতি গোলাপ ফুল ফুটেছে। আর তাতে মহানন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে কতগুলো রঙিন প্রজাপতি...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

সোমবার, ১৮ জুলাই, ২০২২

রাখালডিহির রেললাইনে (প্রথম পর্ব)


 

রাখালডিহির রেললাইনে

সাথী দাস

প্রথম পর্ব






                                                                           ।। ১।।

শহুরে যানজট আর জনসমুদ্র পেরিয়ে দোতলা বাড়িটার সামনে পলাশের হাত ধরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল মল্লিকা। বাদলদা ততক্ষণে ওই ভদ্রমহিলাকে কিছু একটা বুঝিয়ে বলেছে। সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে সন্ধিহান দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে মাসিমা হেঁড়ে গলায় বলে উঠলেন,

-দেখিস বাপু! আমি তোকে চিনি, তাই ঘর দিচ্ছি! পরে আবার উটকো ঝামেলা আমার ঘাড়ে এসে জুটবে না তো? মেয়ে তাহলে আমার ঘাড়ে আর মাথাটি আস্ত রাখবে না!
-কিছু হবে না মাসিমা। এ তো আমারই ভাই আর ভাইয়ের বউ। কোন ঝঞ্ঝাট নেই। ওদের এই শহরে আমিই ডেকে এনেছি, ছেলেটার একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য।
-মেয়েটা তো একদম কচি খুকি রে বাদল! তা এই কাঁচা বয়সে মেয়ের বাড়ি থেকে বিয়ে দিল?

শক্ত করে পলাশের শার্ট খামচে ধরে ওর পিছনে মুখ লুকোল মল্লিকা। ওর হাতে সদ্য পরা সস্তার শাঁখা-পলা আর নকল সোনালী চুড়ির রিনিরিনি শব্দ, সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদুর, কাঁধে একটা শতছিন্ন কাপড়ের ব্যাগে সামান্য মুড়কি আর বাতাসা। পলাশের ঘামে ভিজে যাওয়া শার্টটা নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে মল্লিকা নিজের একমাত্র আশ্রয় খুঁজে নিল। ইতস্তত করে বাদলদা বলল,

-আমাদের গ্রামের দিকে এইরকমই হয় মাসিমা! এই দেখো না, ছেলে ভালো বলে একটা চালচুলোহীন বেকার মানুষের হাতে মেয়েটাকে তুলে দিয়ে দায় সেরেছে ওর বাপ-মা! বিয়ের পর সংসার চলবে কী করে, দুটো পেট কীভাবে ভরবে, তার ঠিক নেই। আমাকে পলাশ বলল, দাদা সদরে একটা কাজকম্মের ব্যবস্থা করে দিতে পারো? যদি অভয় দাও, তবে তোমার ভরসায় আসব। তখন আমিই বললাম, চলে আয়। কিছু একটা ঠিক জুটিয়ে দেব।

গুমোট গরম। কৃষ্ণপক্ষের জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে আকাশে আবার বজ্রগর্ভ মেঘের আনাগোনা। বারকয়েক মেঘের গর্জনমাত্র কপালে একরাশ বক্ররেখা অঙ্কন করে বর্ষীয়ান ভদ্রমহিলা বললেন,

-বলি বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন বউটাকে ঝড়ে-জলে ভেজাবে নাকি গো ছেলে? ওই তো হাড় জিরজিরে চেহারা বাছা। গতরে মাংস বলতে কিছু নাই। হাড় ক'খানাই সার! এরপর ঠান্ডা লেগে বুকে সর্দি বসে গেলে বউকে খাওয়াবে কী, আর বউয়ের চিকিৎসাই বা করাবে কী দিয়ে? এসো, ঘরে ঢোকো। এ বাদল, তুই ওদের ওপরে নিয়ে যা। ওই যে চাবি ঝুলছে। আমি হাঁটুর ব্যথায় আর সিঁড়ি ভাঙতে পারি না বাবা!

দুটো কাপড়ের ব্যাগ আর একটা পুঁটুলি নিয়ে বাদল তড়িঘড়ি বারান্দায় উঠে এসে হাঁক দিল,

-ওই! আয় আয়!

পলাশের পিঠের সঙ্গে প্রায় লেপ্টে থাকা ভীতু মেয়েটাকে এক নজর দেখে ভদ্রমহিলা বললেন,

-বলি ঝাড়া হাত-পায়ে চলে এসেছ তো! বউ নিয়ে থাকার জন্য খাট-বিছানা আমি কিন্তু কিছু দিতে পারব না ছেলে! ওপরে একটাই ঘর, ছাদের কোণে আধখানা দেওয়াল তোলা আছে, ছাউনি দেওয়া, ওখানেই আপাতত রান্না সারতে হবে। পাশে বাথরুম। ছাদ পুরো ন্যাড়া। জলের লাইন একসাথে। দিনে মাত্র একবারই মোটর চালাব। জল বুঝে খরচ করবে। সাব মিটার আছে। আলো পাখার জন্য যেমন কারেন্ট পোড়াবে, তেমনই টাকা দেবে। চলবে তো? না চললে এই বেলা মানে মানে...
-আরে চলবে মানে? দৌড়বে মাসিমা! এই পলাশ, আয় আয়! ওপরে উঠে আয়!
-যাও বাছা! এ বাদল, একটু শোন এদিকে?
-বলো মাসিমা?
-আমি এখন একটু আরতির বাড়ি যাব। কাল ওদের কালীপুজো গেছে। আজও আমাকে যেতে বলেছে। রাতে ওখানেই খাওয়া দাওয়া! এদিকে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি আসছে। এদের তো রান্নার কোন জোগাড় নেই। ঝড় বৃষ্টির মধ্যে বাইরে খেতে যাবেই বা কী করে? তা তোর ভাই আর ভাইয়ের বউ আজ রাতে খাবে কী?
-ওরা দুটো মুড়ি বাতাসা চিবিয়ে...
-ও মা! ছেলের কথা শোনো! একরত্তি মেয়েটার মুখটা শুকিয়ে একদম দড়ি হয়ে গেছে। সারাটা রাত আমার ঘরে দুটো ছোট মানুষ ওই মুড়ি বাতাসা চিবিয়ে থাকবে? আর আমি লোকের বাড়ি পেটপুরে নেমন্তন্ন খেতে যাব? আমার ভিটেতে এইসব অনাসৃষ্টি কাজকম্ম চলে না। ফ্রিজে দুপুরের ভাত-ডাল, ভোগের একটু খিচুড়ি আর আলুর দম আছে। আরতি দিয়েছিল। তোর নবাবপুত্তুর ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের মুখে রুচবে কিনা দেখ দেখি বাবা!

মাথা চুলকিয়ে একগাল হেসে বাদল বলে উঠল,

-রুচবে মানে? দৌড়বে মাসিমা! মায়ের ভোগ, সে তো অমৃত! ওদের কপালে মায়ের ভোগ খাওয়া লেখা থাকলে, তুমি-আমি আটকাতে পারব মনে করেছ! তুমি রান্নাঘরের ওই মেশিন চালিয়ে গরম করে দাও। আমি ওদের খেতে দিয়েই বেরোই তবে!

একদৌড়ে দুটো থালা নিয়ে ওপরে উঠে এলো বাদল। সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি, আলুর দম, সাদা ভাত আর একবাটি ডাল। ঘরে ঢুকে বাদল দেখল মল্লিকা কোমরে কাপড় গুঁজে দ্রুতহাতে একটা কাপড় বিছিয়ে দিয়েছে মেঝের ওপর। গোটা ঘরে একটা আসবাবের চিহ্নমাত্র নেই। থালা দুটো নিয়ে দরজার সামনে বাদলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের কাপড়ের আঁচলটা কোমর থেকে খুলে তাড়াতাড়ি গায়ে টেনে নিল মল্লিকা। তখনই বাথরুম থেকে পলাশ বেরিয়ে এলো। বাদল গম্ভীর গলায় বলে উঠল,

-এখানে এসব চলে না। আমি পলাশের দাদা, তোমারও দাদাভাই। আমাকে দেখে এক গলা ঘোমটার আড়ালে লুকোতে হবে না। খেতে বসো। সারাদিন তো এক দানা ভাতও পেটে পড়েনি।
-আপনিও বসুন! আমাদের সঙ্গে খাবেন।
-না। এতটুকু খাবার, তোমরাই খাও। এটা কালীপুজোর ভোগ।
-মায়ের ভোগ ভাগ করে খেতে হয় দাদাভাই। একজন পেটপুরে খেলে, আর একজন চেয়ে দেখলে, ঠাকুর পাপ দেয়।
-মলি তো ঠিকই বলেছে বাদলদা। আর ও যখন একবার মুখ থেকে বলেছে, তোমাকে না খাইয়ে ছাড়বে ভেবেছ? বসো বসো। দাদা একটু খেলে ভাইয়ের কম পড়বে না!

খিদে যে শরীরকে এতখানি কাতর করে দেয়, পলাশ প্রায় ভুলতে বসেছিল। তার অভাব থাকলেও, খিদের জ্বালা বহুকাল বোঝেনি সে। দিনরাত গাধার মতো খাটে পলাশ। একটা পেট ভরার মতো অন্নের সংস্থান করা, ওর কাছে কোন বড় ব্যাপারই না। গ্রামে থাকতে ভাতের হোটেলে একবেলা কাজ করত সে। হাত চালাতে চালাতে চুরি করে মুখে পুরে দিত কত কিছুই। আর একবেলা রেললাইনের ধারে একটা গ্যারেজে কাজ করত। গ্যারেজের পাশেই ছাউনি ঢাকা বড় একটা পরিসরে সারাদিন যাবৎ নিত্যযাত্রীদের সাইকেল আর বাইক জমা পড়ত। সেইসবের হিসেব রাখা আর গ্যারেজে কাজের মাঝে জুটে যেত পাউরুটি চা, কিংবা চা বিস্কুট। মেজাজ খুব ভালো থাকলে গ্যারেজের মালিক কোনদিন হয়তো নিরামিষ ভাত খাওয়ার টাকা দিতেন, নিদেনপক্ষে কচুরি সাদা আলুর তরকারি আর আমের আচার। অপূর্ব সে স্বাদ! গতকাল বিকেল থেকে পলাশের পেটে বারকয়েক চা বিস্কুট ছাড়া আর কিছুই পড়েনি। ভাতের পাতে বসে ক্ষুধার্ত পলাশকে সশব্দে খেতে দেখে মল্লিকার চোখ ভিজে গেল। খিদে সহ্য করার ওর ঢের অভ্যাস আছে। খিদে নেই বলে নিজের ভাগের ভাতটুকু পলাশের দিকে এগিয়ে দিতেই ওর খেয়াল হল, এখন পলাশের ওপর আরও একজন মানুষের দায়িত্ব আছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল পলাশ। খানিক জোরাজুরির পর ধমকে উঠল সে,

-তুমি না খেলে আমিও খাব না মলি!

মল্লিকার কথার মান রাখতে একবার মাত্র একটু ভোগের খিচুড়ি মুখে দিয়ে উঠে পড়ল বাদল। বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। যখন বাথরুম থেকে ফিরল, তখন দেখল পলাশ নিজের হাতে তার মল্লিকাকে খাইয়ে দিচ্ছে।

ঘরের দিকে দৃষ্টি ফেরাল বাদল। ইতস্তত করে বলল,

-একটা মাদুরও নেই। মাসিমার থেকে চেয়ে আনব পলাশ?
-না দাদা। মাসিমা এমনিতেই আমাদের জন্য এত করলেন, তাকে আর বিরক্ত কোরো না।
-এই ঠান্ডা মেঝেতে শুবি তোরা?
-আমার অভ্যাস আছে!

মৃদুস্বরে বলল মল্লিকা। প্রত্যুত্তরে বাদল বলল,

-আজকের দিনটা একটু কষ্ট করে নে ভাই। কালই একটা দড়ির খাটিয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। দুটো বালিশ, চাদর, মশারি, একটা জনতা, কেরোসিন, আর গুটিকয়েক বাসনপত্তর হলেই আপাতত কাজ চালিয়ে নিতে পারবি না?

খাবারটা পুরো খেতে পারল না পলাশ। ও বসে থাকলে মলি কিছুতেই খাবে না। পেট ভরে গেছে বলে উঠে পড়ল ও। বাথরুম থেকে হাত ধুয়ে বেরিয়ে পকেট হাতড়ে হাজার পাঁচেক টাকা বের করে চার হাজার টাকা বাদলের হাতে ধরিয়ে বলল,

-দুই মালিকের কাছে যা জমা ছিল, আসার আগে সব তুলে নিয়ে এসেছি। সাইকেলটাও বিক্রি করে দিয়েছি। এমনিতেই দুটো মাস বাড়িভাড়াটা তুমি দেবে বললে। তার ওপর এতকিছু কেনাকাটা.... এটা তুমি রাখো দাদা। জানি এতে কিছুই হয় না! কিন্তু এর বেশি আমি আর কোথায় পাব?
-তোকে পাকামি করতে বলেছি আমি?
-না তুমি এটা রাখো।

শূন্য থালাদুটো নিয়ে মাথা নামিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল মল্লিকা। বাদল পলাশের হাত চেপে ধরে গলা নামিয়ে বলল,

-এতদিন একা মানুষ ফাঁকা পকেটে ঘুরেছিস, বেশ করেছিস। কিন্তু এখন বিয়ে করেছিস পলাশ, বউ সঙ্গে রয়েছে। এখন টাকা পয়সা লাগে। মেয়েমানুষের শরীর-স্বাস্থ্য! বিয়ে করেছিস, বুঝবি! কখন কী প্রয়োজন হয়, অচেনা শহর! আমি গাড়ি নিয়ে কোথায় বেরিয়ে যাব, কখন কোথায় থাকব তার ঠিক নেই। এতবড় শহর! অচেনা অজানা জায়গা, মানুষজন! কোথায় কার কাছে হাত পাততে যাবি? তুই এখন নিজের কাছে টাকা রাখ। আগে তোর একটা কাজ জুটিয়ে দিই, তারপর এই টাকা সুদে আসলে তোর পকেট কেটে বের করে নিয়ে যাব।

হেসে উঠল পলাশ। ওই টাকা আবার পলাশের প্যান্টের পকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বাদল বলল,

-রাত হয়েছে। সারাদিন যা ধকল গেছে। নে নে, তোরা শুয়ে পড়। আমি চলি! একটু দাঁড়া! আমি আসছি। আসল জিনিসটাই তো গাড়িতে রয়ে গেছে।

একদৌড়ে রাস্তায় নেমে আবার দোতলায় উঠে এলো বাদল। ওর হাতে একটা কালো পলিথিনের প্যাকেট।

-কী আছে এতে?
-তখন মন্দিরের বাইরে কিনেছিলাম। তোদের মালা বদলের মালাদুটো। আজ তোদের প্রথম রাত। বিশেষ কিছু করতে পারলাম না ভাই। এই রজনীগন্ধার মালাদুটো রাখ। এগুলো কোন কাজে লাগবে তোরা জানিস!

পলাশ লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল। পিছু ফিরে দেখল, মল্লিকা বাথরুমের দিকে সেই যে গেল, আর ফিরল না। বাদল বলল,

-ভাই শোন, মাসিমার কাছে এই বিয়ের ব্যাপারটা একদম চেপে যেতে হবে। মনে থাকবে তো? আমি যেটা বলেছি, তোরাও সেটাই বলবি।
-হু!
-মাসিমার মনটা খুব ভালো পলাশ। কিন্তু মুখ ভালো না। কিছু বললে একটু মানিয়ে নিস। কোন কথার উত্তর করবি না। চুপ করে শুনে নিবি। যে স্নেহ করে, সে তো একটু শাসনও করতে পারে বল! মাথা গরম করিস না ভাই!
-সে আর বলতে! মাথার ওপর ছাদ আর পায়ের তলার মাটি দিয়েছে মাসিমা, পেটে ভাত দিয়েছে, নইলে মলিকে নিয়ে আজ সারাটা রাত রাস্তায় কাটাতে হতো। তার জন্য মাসিমা বেগার খাটতে বললেও আমি খেটে দেব। দু'কথা বললেও শুনে নেব। তুমি এই মাসিমার মেয়ের গাড়ি চালাও দাদা?
-হ্যাঁ রে, পিহু দিদি মস্ত বড় কলেজে পড়ায়। কতবড় বিল্ডিং! কত ছাত্রছাত্রী। বাড়িতেও ছাত্র পড়তে আসে। দিদি অনেক পড়ালেখা জানে। খুব রাগী। মাসিমাও দিদিকে খুব ভয় পায়। দিদির বর চোখের ডাক্তার। খুব নামডাক। বাড়ির একতলায় চেম্বার আছে। আবার বাইরেও পেশেন্ট দেখতে যায়। কত লোক আসে। আমিই তো গাড়ি করে ডাক্তারবাবুকে নিয়ে যাই।
-মাসিমা কী এখানে একাই থাকেন?
-হ্যাঁ, মেসোমশাই মারা গেছেন নাকি বহুকাল আগে। তখন পিহু দিদি খুব ছোট। মাসিমা একাই দিদিকে মানুষ করেছে। পিহু দিদি বিয়ে করে চলে যাওয়ার পর তো একাই থাকে। ওপরটা সবসময় ভাড়া দেওয়া থাকত। তোর কপাল ভালো, আগের ভাড়াটেকে তুলতে বিশাল ঝামেলা হওয়ায় দিদি আর ভাড়া বসাতে দেয়নি। আমিই বলে কয়ে তোর থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম। আমি এই দুই বাড়ির ঘরের ছেলে বলতে পারিস। সারাদিন দুই বাড়ি করতে করতেই সময় কেটে যায়। বাজারে যাই, মাসিমাকে নিয়ে মন্দিরে যাই। আর সারাদিন ভাড়ায় খাটি। এই তুই যা, আমি বকতে শুরু করলে তোকে সারারাত এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখব। ওদিকে মল্লিকা অপেক্ষা করছে, আমি পালাই! সংসারটা একটু গুছিয়ে নে। তারপর তোদের একদিন আমার ঘরেও নিয়ে যাব। তোর বৌদি বলেছে।
-অবশ্যই যাব দাদা। এই শহরে তুমি আর বৌদি ছাড়া আমাদের আর আছে'টা কে!

বাদলদা বেরিয়ে যাওয়ার পরেই বৃষ্টি শুরু হল। আসবাবহীন ঘরে সংসারিক সামগ্রী বলতে শীতল মেঝেতে একটা কাপড় পেতে রেখেছে মল্লিকা। বাথরুমের দরজায় টোকা দিতেই মলি বেরিয়ে এলো বাইরে। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল পলাশের বুকে। পলাশ ওর হাতে পলিথিনের প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বলল,

-আজ আমাদের ফুলশয্যা!

লজ্জায় পলাশের বুকের মধ্যে মিশে যেতে চাইল মল্লিকা। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো তখন কাঁচের জানালায় রকমারি অবয়ব সৃষ্টিতে ব্যস্ত। অদূরে আলোর ঝাপসা জলছবি। পলাশ আর মল্লিকার গলায় দুটো রজনীগন্ধার মালা, সেই সৌরভে পরস্পর আবিষ্ট হয়ে রয়েছে। পলাশের বুকের ওপর মাথা রেখে বাইরের আবছা আলোর দিকে চেয়ে মল্লিকা বলল,

-ওই উল্টোদিকের বাড়িতে এত আলো কেন গো?
-মাসিমা বললেন যে কালীপুজো। ওই বাড়িতেই মনে হয়।
-ওহ!
-মন খারাপ মলি? ঘরের জন্য মন কেমন করছে?
-না! ঘরে আমার জন্য কে কাঁদবে? শুধু আমার মেনিটা মনে হয় না খেতে পেয়ে মরে যাবে জানো! মা দিনরাত ওর গায়ে জল ছুঁড়ে মারে। ভাত পুকুরে ফেলে দেয়, তবুও ওকে এক দানা ভাত দেয় না!
-ওকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতে!
-নিজেদেরই থাকা খাওয়ার ঠিক নেই, ওকে এনে কোথায় রাখতাম?

চুপ করে গেল পলাশ। নিজের অক্ষমতা যেন বড় বেশি করে ওর বুকে বাজল। মল্লিকার প্রিয় পোষ্যর জন্য দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন সংস্থানের ক্ষমতাও কী ওর নেই! কাছে থাকলে তবুও ওদের এঁটো-কাঁটা খেয়েই না হয় বাঁচত! মলি ওকে নিয়ে একটু ভালো থাকতে পারত। কিন্তু যেখানে নিজেদেরই কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই, একটা অবলা জীবকে সঙ্গে নিয়ে কতক্ষণ আর ঘোরা যায়! আবার যদি বিড়াল সঙ্গে থাকলে ঘর না পাওয়া যায়, তখন? পলাশ মৃদুস্বরে বলল,

-প্রথম রাত ঘিরে মেয়েদের অনেক স্বপ্ন থাকে, তাই না? পেট ভরে দুটো ভাত, অন্তত একটা বিছানা, কিছুই পারলাম না.... আমার তো কিছুই নেই মলি। তোমাকে কিছুই দেওয়া হল না।
-কে বলেছে কিছু দাওনি? এই যে!

পলাশের হাতটা নিজের তলপেটের ওপর রাখল মল্লিকা। নতুন প্রাণের আগমনবার্তায় আনন্দিত ওই দম্পতি পরস্পরকে দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গন করে রইল। আবেগতাড়িত কণ্ঠে মল্লিকা বলল,

-কত সুন্দর ছাদ আঁটা বাড়ি, বাড়িটায় কত বড় বড় জানলা, কলঘরে তো কল খুললেই ঝরঝর করে জল পড়ে। পুকুর থেকে বালতি করে জল টেনে শ্যাওলা ধরা পিছল উঠোন পেরিয়ে চানঘরে যেতে হবে না বলো?
-না। কল খুললেই জল। বোতাম টিপলেই আলো জ্বলবে, পাখাও চলবে। আমার গ্যারেজের মতো, হোটেলের মতো।
-তবে তো ওকে পেটে নিয়ে আমায় পুকুর ঘাটে যেতে হবে না। রাস্তার কল থেকে জল বইতেও হবে না। হ্যাঁ গো, মাসিমা আবার উঠিয়ে দেবে না তো? ওকে আমার কোলে আসার সময়টুকু দেবে তো? পরের বাড়ি! যদি হঠাৎ চলে যেতে বলে, কোথায় যাব আমরা?
-ঘর ছাড়ার আগে এসব ভাবতে ইচ্ছে করেনি?

দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল মল্লিকা। ওর সর্বাঙ্গে রজনীগন্ধার সুবাস। পলাশের গলায়ও একটা রজনীগন্ধার মালা। অন্যমনস্কভাবে ওই মালা থেকে কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে পলাশের মুখের ওপর ছুঁড়ে মল্লিকা বলল,

-না ভাবিনি। আমি জানি, তুমি ঠিক কিছু একটা করে নেবে। তাই ওর কথা ভেবে, তোমার হাত ধরে বেরিয়ে এসেছি। তোমাকে বিশ্বাস করেছি আমি। ভুল করিনি তো?

শ্যামাঙ্গিনী মল্লিকার শুষ্ক ঠোঁটে আদর এঁকে দিল পলাশ। ওর রুগ্ন শরীরটাকে নিজের বুকে চেপে ধরল। নারীসুলভ কোমলতা স্পর্শ করেনি মল্লিকার দেহ। হৃদয়ের স্থানে কেবল যেন পাঁজরের হাড় ক'খানাই সার। ওই শরীরটাকেই আপন দেহের সঙ্গে মিশিয়ে নিতে উন্মুখ পলাশ। নবদম্পতির শরীরী উষ্ণতায় পিষ্ট হতে লাগল কোমল রজনীগন্ধা। মল্লিকার সুবৃহৎ খোঁপা ভেঙে পড়েছে বহু আগেই। ওর খোলা চুলে মুখ ডুবিয়ে পলাশ বলে উঠল,

-কী মনে হয়?
-জানি না যাও!

রজনীগন্ধার মালার প্রাচীর মুহূর্তেই অদৃশ্য হল। পলাশ দুটো মালা ছিঁড়ে সরিয়ে রাখল মেঝেতে। অজস্র রজনীগন্ধার দ্বারা সজ্জিত শীতল শয্যার মাঝে পলাশের কণ্ঠলগ্না হয়ে নবরূপে প্রস্ফুটিত হল মল্লিকা। সলজ্জে বলে উঠল,

-এত সুন্দর ঘর, এত আরাম, এমন সুখ, আমার মধ্যে বেড়ে ওঠা আমাদের ছোট্ট ছেলে.... সব দিয়েছ তুমি আমায়। তবে কেন বললে, কিছু দিতে পারোনি!

মৃদু হেসে পলাশ মল্লিকার ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে বলল,

-মেয়ে!

বাড়িটা স্বর্গীয় দেবপ্রসাদ সান্যালের। প্রাচীন বাড়ির একাংশ প্রায় ভগ্নস্তূপ। শহরের মধ্যে থেকেও যেন শহরবর্জিত এই বাড়ি। আশেপাশের হাল ফ্যাশনের কারুকার্যময় রংবেরংয়ের সুউচ্চ বাড়ির পাশে এই ইঁট বেরিয়ে পড়া পলেস্তরা খসে যাওয়া পুরনো বাড়িটা বড় বেমানান। বিঘেখানেক জমির এককোণে ঐতিহ্যবাহী কঙ্কালের মতো কড়িবরগাসহ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বসতবাড়িখানা। একাধিক শরিক থাকা সত্ত্বেও বাড়ির একাংশ আগলে একা পড়ে রয়েছেন মৃণালিনী দেবী। অন্য অংশে কাঠের দরজায় মরচে পড়া তালা ঝুলছে। বাড়ির চতুর্দিকে আম, কাঁঠাল, নারকেল ও একাধিক সুপারি গাছের কারণে জায়গাটা দিনের বেলাও বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। অদূরে একটা বুজে আসা ডোবা। প্রতিবেশীর ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা হতে নির্গত দুর্গন্ধ আর মশার অত্যাচার হতে অব্যাহতি পেতে, দিনের বেশিরভাগ সময়ই ঘরের পিছন দিকের জানালাটা বন্ধ রাখেন মৃণালিনী দেবী। নিজের দুই দেওর প্রবাসী। ওই জায়গা তাদের। সুতরাং বাড়ির পিছন দিকে মৃণালিনী দেবীর যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শরিকি মতানৈক্যের কারণে এককালে ভাইদের মনের ভিতর ও জমির ওপর দেওয়াল তোলা হলেও, এখন সেই দেওয়াল ডোবার গ্রাসে অনেকাংশে ভেঙে পড়েছে। একমাত্র মেয়ে পিহুর বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর যক্ষের মতো এই বাড়ি আগলে একা পড়ে রয়েছেন মৃণালিনী দেবী। পিহু সুপারি গাছগুলো লিজে দিয়েছে। ওরা নিজেদের সময়মতো আসে, সুপারি পেড়ে নিয়ে যায়। বারান্দায় বঁটি নিয়ে বসে নারকেল পাতার কাঠি বের করতে করতেই মৃণালিনী দেবীর ক্লান্ত দুপুরগুলো নিঃসঙ্গভাবে কাটে। বিকেলের খানিকটা সময় ধনেপাতার চারা আর লংকাগাছগুলোর জন্য ব্যয় হয়। নিজের হাতে টমেটো গাছগুলোর পরিচর্যা করেন মৃণালিনী দেবী। এবার লেবু গাছটায় অজস্র লেবু ধরেছে। খেয়ে, ঝরে, পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লেবুপাতার গন্ধ মৃণালিনী দেবীর বড্ড প্রিয়। গাছের ফলমূল বিক্রি করে, প্রতিবেশীদের দান করে মনের আনন্দেই তিনি আছেন। তাঁর এই বার্ধক্যবেলার সঙ্গী বলতে উল্টোদিকের বাড়ির আরতি ও তার এক বছরের দুরন্ত এক শিশু, নাম তার গোগোল। আরতির শ্বশুর শাশুড়ি গত হয়েছেন বহুদিন। বাড়ির ছেলেটা কাজে বেরিয়ে যাওয়ার পর, আরতি ওই একরত্তি ছেলের দস্যিপনা একা হাতে সামলাতে অস্থির হয়ে যেত। ছেলেটার কান্না যেন মৃণালিনী দেবীর হৃদপিণ্ড ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। এ নারীজীবনে মাতৃত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু একটা কুসুমকোমল প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরতে মন চায়। অবিলম্বে আরতির সঙ্গে এই বৃদ্ধার ভাব হয় এবং গোগোলের ক্ষুদ্র বৃহৎ যাবতীয় দায়িত্ব মৃণালিনী দেবীর ওপর ছেড়ে একটু নিশ্চিন্ত হয় আরতি। এছাড়াও মৃণালিনী দেবীর অবসর যাপনের আরো একজন সঙ্গী আছে, তার নাম আলো। দুই বেলা ঘড়ির কাঁটা ধরে নিয়ম করে আসে সে। সকালের ঘর ঝাঁট দেওয়া থেকে রান্না করা এবং বিকেলে গোপালের বাসনপত্র তেঁতুল ঘষে ঝকঝকে করে মেজে দেওয়া থেকে শুরু করে, রাতের রুটি করার পর মৃণালিনী দেবীর চুল আঁচড়ে বেঁধে দিয়ে তবে তার ছুটি! পেশায় কেরানি দেবপ্রসাদ সান্যাল বাড়ির ওপর তলায় একটামাত্র ঘর করতে পেরেছিলেন। তারপরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বড় অকালে স্বর্গবাসী হয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর পিহুর উচ্চশিক্ষার কারণে বাড়িঘরের কথা আর ভাবেননি মৃণালিনী। একরত্তি মেয়েটাকে বুকে আগলে রেখেছেন। পরবর্তীকালে পিহু এই ধ্বংসস্তুপে অর্থ জলাঞ্জলি দিতে রাজি হয়নি। মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নিজের কাছে। পিহু নিজে দেখেশুনে পছন্দ করলেও, মৃণালিনীর জামাই একেবারে হিরের টুকরো। সে একাধিকবার শাশুড়ি মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বামীর ভিটে পরিত্যাগ করতে মৃণালিনী দেবী অসম্মত হওয়ায়, পিহু অপেক্ষা করছে দুই কাকার দেশে প্রত্যাবর্তনের শুভ মুহূর্তের জন্য। আগামী বছর সকলের উপস্থিতিতে এই সম্পত্তির একটা গতি করা হবে। প্রোমোটারের হাতে এই আবর্জনা তুলে দিয়ে মাকে সুদৃশ্য ফ্ল্যাটের আরামে না রাখা পর্যন্ত পিহুর মনে স্বস্তি নেই। অপেক্ষা আর মাত্র একটা বছরের।

আরতির বাড়ি থেকে ফিরতে সেদিন বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে ব্যস্ত থাকা দম্পতির ওপর ভরসা করতে পারেননি তিনি। গোগোলকে নিজের হাতে খাইয়ে একেবারে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছেন। ঝিরঝির করে অবিরাম বৃষ্টি হয়েই চলেছে। বেশ একটা শীতল অনুভূতি যেন ঘিরে ধরছিল মৃণালিনীকে। বারান্দায় উঠে ওপর দিকে একবার চেয়েছিলেন মৃণালিনী দেবী। নতুন ভাড়াটের ঘরের দরজা বন্ধ। বারান্দার আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন তিনি।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় পলাশের। মল্লিকা গুটিশুটি মেরে শুয়ে রয়েছে পলাশের বুকের ভিতরে। ওর গায়ে হাত দিয়ে পলাশ দেখল, একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে মল্লিকার শরীর। গায়ের ওপর ঢাকা দেওয়ার মতো একটা চাদরও ওদের কাছে নেই। মল্লিকাকে নিজের বুকের ওপর থেকে নামিয়ে উঠে পড়ল পলাশ। আলো জ্বেলে তাড়াতাড়ি পাখাটা বন্ধ করে দিল। একটু বৃষ্টি হতেই গুমোট গরমটা একদম কমে গেছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন মল্লিকা। ওর অবিন্যস্ত পোশাকের মধ্যে যত্রতত্র ছড়িয়ে রয়েছে রজনীগন্ধার পাপড়ি। মল্লিকার খোলা চুলের মধ্যে থেকে কয়েকটা পাপড়ি তুলে আনলো পলাশ। দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল ওর ঘুমন্ত মুখটার দিকে। জীবনের সব শান্তি এই মুখটাতেই লুকিয়ে আছে। আঁচল সরিয়ে মল্লিকার উন্মুক্ত নাভিতে নিজের অনাগত সন্তানের জন্য খানিকটা আদর এঁকে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল পলাশ।

অদ্ভুত একটা অনুভূতি! মল্লিকা জেগে রয়েছে না ঘুমিয়ে পড়েছে, ও বুঝতেই পারল না। কেবল একটা আর্ত গোঙানি ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। চোখের সামনে ঠাকুরথান ভেসে উঠল। দোলপূর্ণিমার পুজো, প্রসাদ বিতরণ.... একমুঠো প্রসাদ নিজের শতছিন্ন কাপড়ের আঁচলে গিঁট পাকিয়ে মল্লিকা ছুটেছিল স্টিমার ঘাটে। প্রেমের লাল আবির দিয়ে সেইদিন মল্লিকার সর্বদেহ রাঙিয়ে দিয়েছিল পলাশ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে আসার পরেও পলাশ বাড়ি ফিরতে দেয়নি ওকে। যখন ঘরের চৌকাঠে পা রেখেছিল, তখন নিজের গর্ভে পলাশেরই ক্ষুদ্র অংশ ধারণ করে ফিরেছিল ও। কিন্তু গত কয়েক মাসে মল্লিকার বিয়ের তাগিদে মায়ের অত্যাচারের পরিমাণ তখন এতখানি বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, পলাশের সন্তানের কথা মল্লিকা নিজমুখে বাবাকে জানাতেই পারেনি। সকলের অলক্ষ্যে পলাশের হাত ধরে আঁধার রাতে ঘর ছেড়েছিল সে। নতুন সংসার বাঁধার আশায় পালিয়ে আসতে চেয়েছিল শহরে। পলাশের হাত ধরে রেললাইন বরাবর ছুটছে মল্লিকা। কাঁধে একটা ব্যাগ। তাতে রয়েছে মুড়কি আর বাতাসা। ছুটতে ছুটতে মল্লিকা ক্লান্ত। কিন্তু এই রেললাইনের শেষ কোথায়? হঠাৎ ও দেখল আশেপাশে পলাশ নেই। কেউ নেই। ও একা রেললাইন ধরে বিরামহীনভাবে ছুটেই চলেছে। কান মাথা কেঁপে উঠল রেলগাড়ির আগমনবার্তায়। ব্যাগ রইল লাইনের ওপর পড়ে। মুড়কি বাতাসা ছড়িয়ে পড়ল ধুলোর ওপর। জোরালো এক আলোকরশ্মি! সেই সঙ্গে বুক কাঁপানো তীব্র বাঁশির শব্দ! মল্লিকার মুখ থেকে গ্যাজলা বেরিয়ে এলো। আধো ঘুম আধো জাগরণে কেবল অস্ফুটে গোঙানি নির্গত হল ওর কন্ঠনালী হতে। হাত পা অসাড়! ছুটতে ছুটতে মুখ ঘুরিয়ে মল্লিকা দেখল, রেলগাড়িটা ওর একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে। জোরালো আলোর প্রভাবে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। প্রাণভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল মল্লিকা। ওকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দিল পলাশ,

-এই মলি! মলি! এইরকম করছ কেন? কী হয়েছে তোমার?

আরতির ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা গোগোল হঠাৎই চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ঘড়িতে রাত তিনটে বেজে তিন মিনিট...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত


ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট