অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২২

ত্রিভুজ (তৃতীয় পর্ব)


 


ত্রিভুজ

সাথী দাস

তৃতীয় পর্ব



-জানো রমা,আমার চিন্তায়-চিন্তায় সেই যে আমার মা একটু-একটু করে বিছানা নিলো,আর মা-কে টেনে তুলতে পারলাম না!কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলাম।শ্রাদ্ধের পর তো কতদিন রণ-র ছবির দিকে একটিবার তাকাতে পর্যন্ত সময় পাইনি!নিজেই অবাক হয়ে যেতাম।একদিকে অসুস্থ মা-কে সামলানো,আর একদিকে একরত্তি মেয়ে,আর সেই সঙ্গে চরম আর্থিক অনটন!দারিদ্র্য মানুষকে পাথর করে দেয় জানো তো!কোনো আবেগ-অনুভূতি তখন আর কাজ করে না!সেই মুহূর্তে রণর মৃত্যু আমায় ততটাও চিন্তায় ফেললো না,যতটা ফেললো মায়ের চিকিৎসা আর মেয়ের ভবিষ্যৎ।কোথায় যেন হারিয়ে গেলো সব দুঃখ,তার জায়গায় এসে জড়ো হলো একরাশ দুশ্চিন্তা।ওই অসুস্থ মায়ের ওপর ভরসা করেই মেয়েটাকে ফেলে রেখে,পুরোনো চাকরিটা আবার করতে শুরু করলাম।জানো রমা,ঘরে মেয়েটা আমার একটু দুধের জন্য চিৎকার করে দাপিয়ে মরছে,আর অফিসে আমি বুকে ব্যথায় পাগল হয়ে যাচ্ছি।শাড়ি-ব্লাউজ ভিজে যাচ্ছে।বুক ভারী হয়ে গিয়ে টনটন করছে,তবু মেয়েকে দুধ দেবার উপায় নেই।চাকরি যে আমায় করতেই হবে।বেরোতে আমাকে হবেই।দুটো বছর যে আমার কিভাবে,কোথা দিয়ে কেটেছে রমা,আমি বুঝতেও পারিনি!দু-বছর পর মা আমার অনেকটা খরচ কমিয়ে দিয়ে গেলো।মুক্তি দিয়ে গেলো আমায়!বাড়ি ফিরে যাও বা ওই বুড়িটার সঙ্গে একটু দু-চারটে কথা বলে একটু হালকা হতাম,মা চলে যাওয়ার পর যেন বোবা হয়ে গেলাম!আমার আর এই পৃথিবীতে নিজের বলতে কেউ রইলো না রমা,একমাত্র মেয়েটা ছাড়া!আমি না থাকলে ওর যে কি হবে,ভাবলেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় গো...
-এসব কি বলছো নীলিমা!কিন্তু তোমার দিকের আত্মীয়-স্বজন?
-ওই দু-বছরে আমার সব আত্মীয়-স্বজনকে চেনা হয়ে গেছে রমা,মা যতদিন মাথার ওপর ছিল,টুকটাক খোঁজ-খবর যাও বা নিতো,মা মারা যাবার পর সব এক-এক করে কোথায় যেন হারিয়ে গেলো!আমি একা একটা বিধবা মেয়ে,কিভাবে মেয়েটাকে নিয়ে বাঁচবো,সেটা আর তলিয়ে ভেবে দেখার মতো অত সময় কারো কাছে নেই গো!প্রথম-প্রথম কড়া নেড়েছি ওদের দরজায়,কেউ হয়তো নিতান্ত অনিচ্ছাসত্বে এগিয়ে এসেছে,কেউ বা নানা অছিলায় এড়িয়ে গেছে।আমার অভাব সহ্য হয় রমা,কিন্তু অপমান নয়!তাই আমিও সরে এসেছি আস্তে-আস্তে!নিজেকে বুঝিয়েছি,মাথা গোঁজার জায়গাটা যখন আছে,মাস গেলে তো আর বাড়িওয়ালা দরজার সামনে এসে দাঁড়াবে না,তখন বাকিটা ঠিক একটু-একটু করে সামলে নেবো!খুব কষ্ট হয়েছে গো রমা,কিন্তু পেরেছিও ওই সময়টা কাটিয়ে উঠতে!সামনের ফ্ল্যাটের দাদা-বৌদি খুব করেছে আমার মেয়ের জন্য,এখনও করে।বৌদির শাশুড়িটা ভীষণ যাতনা দেয় ওকে,কিন্তু তাও ঘরে অশান্তি করে ও আমার মেয়েটাকে রাখে।আমি আগে তো বেশিক্ষণ অফিস করতে পারতাম না মেয়ের জন্য,বাড়িতে যে মেয়েকে দেখাশোনার জন্য একটা লোক রাখবো,সে ক্ষমতা কোথায়!আগে পার্ট-টাইম করতাম,এখন একটু-একটু করে সময় বাড়িয়েছি,টাকাও বেড়েছে!মেয়েটাকে শুধু একটু মানুষ করতে পারলে,আর কিছু চাওয়ার থাকবে নাগো আমার...শুধু এখন মাঝে-মধ্যে বড্ড একা লাগে,আগে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে-করতে অনুভূতিগুলো মরে গিয়েছিলো।এখন রণ-কে ভীষণ মনে পড়ে।আর থাকতে পারি না ওকে ছাড়া!খুব কষ্ট হয় গো....আর থাকতে পারি না গো!!
রমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নীলিমা....
রমা বুঝতে পারলো ফাঁকটা কোথায়!মনে তো অবশ্যই,সেই সঙ্গে শরীরেও।অস্বাভাবিক কিছু না!কিন্তু কি করবে ও,ব্যথিত হৃদয়!আচ্ছা,জীবনটা নতুন করে শুরু করার কথা কি নীলিমা ভাবতে পারে না!কিই বা বয়স ওর!কিন্তু এই মুহূর্তে রমা এ প্রসঙ্গে,আর কোনো কথা বলবে না।ভীষণ ভেঙে পড়েছে নীলিমা!ওকে এর আগে কোনোদিনও এত কথা বলতে দেখেনি রমা।আজ যেন একটু ভালোবাসার,ভরসার আভাস পেয়ে ওর বুকের মধ্যেকার জমে থাকা ব্যথার বাঁধ ভেঙে পড়েছে!কলকল করে বেরিয়ে আসছে এতদিনের বুকের গহীনে চেপে রাখা কথারা!রমাকে এখনও আঁকড়ে ধরে রয়েছে নীলিমা।ওর বুকে মাথা রেখে ও চুপ করে বসে আছে।রমা নিজের শাঁখা-পলা-বালা পড়া হাতটা সযত্নে নীলিমার মাথায় রাখলো।তারপর ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো..
-নীলিমা?
-উম?
-রাতে কি খাবে?
-দেখি!ওবেলা তো মেয়েটার জন্য চাল-ডাল দিয়ে গলাভাত করেছিলাম,তাই একদলা..
-আজ আমি রান্না করবো তোমার বাড়িতে?আমায় ভরসা করে ছাড়বে তোমার রান্নাঘর?
রমার আন্তরিকতায় চমকে উঠলো নীলিমা।ওর কণ্ঠের মধ্যে এমন কিছু ছিল,যে ভিজে গেলো নীলিমার পাথরের মত মন।
-কি রান্না করবে বলো?আমি এক্ষুণি বাজারে যাচ্ছি!
-তুমি!!মৃদু হাসলো রমা..দেখি আমার দিয়া মার কি খেতে ইচ্ছে করে!ও যা বলবে,তাই রান্না হবে আজ!দিয়া..
বার দুয়েক ডাকার পর সৈকত দিয়াকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকলো।দিয়া সৈকতের কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরলো।নীলিমা কোনোরকমে চোখ মুছে,শাড়ির আঁচল সামলে বুকে জড়িয়ে ধরলো দিয়াকে...
-এদিকে আয় তো মা!বল তো,তোর কি খেতে ইচ্ছে করছে এখন?
-মাংস!
-ও বাবা,মাংস খাবে?আচ্ছা দাঁড়া মা...এই শোনো... সৈকতের দিকে এগোয় রমা...
হুড়োহুড়ি করে এগিয়ে আসে নীলিমা।
-এই নানা,ওনাকে বলছো কেন!আমি কাপড়টা বদলে যাচ্ছি!
-চুপ,একটাও কথা না,তোমার রান্নাঘর এখন আমার দখলে..শোনো..একটু মাংস নিয়ে এসো তো,আমি রান্না করবো,তুমি আর আমি এখানেই খেয়ে যাবো।নীলিমা,তোমার ফোন থেকে একটা ফোন...
-হ্যাঁ,হ্যাঁ!করো না!ওই তো ল্যান্ডফোন!
-হুম,বাড়িতে একটু ফোন করে দিই,ঝর্ণাদি আমার ছেলেদুটোকে খাইয়ে,ঘুম পাড়িয়ে দেবে।তুমি যাও...
-হুম!নীলিমা দেবী,দরজাটা একটু....সৈকত নীলিমার দিকে চেয়ে বলে...
-হুম,চলুন!
রমা এগিয়ে যায় নীলিমার ল্যান্ডফোনটার দিকে...
-রমা আপনাকে খুব বিপদে ফেললো বুঝতে পারছি।কি যে বলি...নীলিমা সৈকতকে বললো।
-ও আমার অভ্যাস আছে,আমার রমাকে তো আপনি এখনও ঠিকমতো চেনেন না,তাই একথা বলছেন....বলেই চমকে উঠলো সৈকত।ওর মুখ থেকে সবসময় বেরিয়েই যায় এই কথাটা"আমার রমা"!কিন্তু সেটা যে একজন একাকী নারীকে কতটা আঘাত করতে পারে,তা একটু আগেই সৈকত বুঝেছে!একটু থেমে সৈকত আবার বললো,
-আমি অজান্তে যদি আপনাকে কোনোভাবে আঘাত করে থাকি নীলিমাদেবী,আপনি আমায় প্লিজ ক্ষমা করে দেবেন!
সবটুকু বুঝতে পারলো নীলিমা।ও বললো,
-হ্যাঁ,এটা ঠিক,আপনার ওই কথাটুকু আমাকে রণ-র কথা মনে করিয়ে দেয় বারবার।কিন্তু আপনি না বললে কি আমার ওর কথা মনে পড়বে না সৈকত বাবু!!আমি কি ওকে ভুলে থাকবো,বলুন?তা তো হয় না,হবারও নয়!আমার ভালোবাসাকে আমি এমন একটা সময়ে,এমন একটা বয়সে চিতায় জ্বলতে দেখেছি,সেই আগুনে আমি আজও পর্যন্ত প্রতিনিয়ত জ্বলে শেষ হচ্ছি!এ এমন একটা জ্বালা,যার আমরণ কোনো শেষ নেই।আপনি এ নিয়ে বেশি ভাববেন না সৈকত বাবু,আমি ভালো থাকতে জানি!আগে জানতাম না,এখন শিখেছি!আপনিও আপনার রমাকে নিয়ে খুব ভালো থাকুন....
ভাষা হারিয়ে ফেললো সৈকত।বড় সহজ নয় এ নারী!নীলিমার চোখের দিকে আর চেয়ে থাকতে পারলো না সৈকত।মাথা নামিয়ে মৃদুস্বরে বললো,
-যদি কিছু মনে না করেন,যদি নিতান্তই অনধিকার চর্চা মনে না করেন,আর যদি অনুমতি দেন,তবে একটা কথা বলতে পারি?
-বলুন না....
-শহরের বুকেই,কাছাকাছির মধ্যে আমাদের অনেকগুলো শো-রুম আছে,আপনি চাইলেই যেকোনো একটায় জয়েন করতে পারেন।না মানে,ঘরের মধ্যে থেকে আপনার আর রমার কিছু-কিছু টুকরো কথা আমার কানে ভেসে এসেছে,তাই বলছিলাম,দিয়াকে ছেড়ে বেশি সময় থাকাটা...
-আপনি বলেছেন,আমার জন্য এতটা ভেবেছেন,এটাই অনেক সৈকত বাবু,যখন সত্যিই ভীষণ প্রয়োজন ছিল,তখন এতটুকুও আমার জন্য কেউ করেনি।আজ নিজেকে বেশ কিছুটা গুছিয়ে নিয়েছি।আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি সৈকত বাবু,যদি কোনোদিনও তেমন প্রয়োজন পড়ে,আমি সবার আগে বিনা সংকোচে আপনার সামনে গিয়েই দাঁড়াবো,আপনার সামনেই হাত পাতবো!সাবধানে যাবেন,তাড়াতাড়ি ফিরবেন,ততক্ষণ আমি রমার সঙ্গে হাতে-হাতে রান্নার কিছুটা কাজ এগিয়ে রাখি...আসুন!
দৃপ্ত কণ্ঠের প্রত্যেকটা স্পষ্ট-সাবলীল কথায় বারংবার খেই হারাচ্ছিলো সৈকত।নীলিমার শেষ কথাটুকুতে ঘোর কাটলো ওর।নীলিমা ততক্ষণে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিয়েছে।শ্যামাঙ্গিনীর উজ্জ্বল মুখাবয়বের ওপর থেকে দৃষ্টি নামিয়ে সৈকত।একটু হেসে বেরিয়ে গেলো ও...পিছনে দরজা বন্ধ হওয়ার মৃদু শব্দ হলো...
নীলিমাকে যত দেখছে,তত অবাক হয়ে যাচ্ছে সৈকত।রমা প্রথম দিনই ওকে বলেছিলো,নীলিমা আর পাঁচজনের থেকে একদম আলাদা!ভুল বলেছিলো রমা!নীলিমার সঙ্গে আর পাঁচজনের কোনো তুলনাই চলে না।ওনার তুলনা উনি নিজেই...নিজের চারদিকে অদ্ভুত একটা গণ্ডী এঁকে রেখেছেন উনি।কারোর সাধ্য নেই সেই গণ্ডী পেরিয়ে ওনাকে স্পর্শ করে!!যদিও কিছুটা কালই বুঝেছিলো ও,বৃথাই সাহায্যের চেষ্টা করছে সৈকত।উনি নিজের লড়াইটা নিজেই লড়তে জানেন,জীবনযুদ্ধে কোনো সহযোদ্ধার প্রয়োজন,ওনার মতো নারীর নেই...
নিজের মনেই বলে উঠলো সৈকত,
"এই কঠিন জীবনযুদ্ধে আপনি জয়ী হোন নীলিমা দেবী!আজ আপনাকে একাকিনী জিততে দেখলে,সমাজের শত-সহস্র নারী একা পথ চলার সাহস পাবে...আপনার অসম সাহসিকতা,অদম্য মনের জোরের কাছে আমি,সৈকত কুমার চৌধুরীও রিক্ত-নিঃস্ব।আমার কাছে কিছুই নেই আপনাকে দেওয়ার মতো,শুধু শুভেচ্ছা বার্তাটুকু ছাড়া...আপনার শারদীয়া অনেক বড় হোক!ওর সাফল্যের মধ্যে দিয়েই পূর্ণতা পাক আপনার কঠোর অধ্যবসায়!"
আজ ভীষণ ভালো লাগছে সৈকতের,এক অসামান্য নারীর সম্মুখীন হতে পেরে।এক সধবা নারীর অফুরন্ত পরিপূর্ণতার সামনে-সুখের সামনে,এক বিধবা নারী,নিজের বুকের মধ্যেকার অপার শুন্যতাকে অনুভব করে,সাময়িক দুর্বলতায় বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়েছিলো।কয়েক মুহূর্তের জন্য বাইরের কঠিন আবরণ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলো,ভিতরের প্রতি রাতের একাকিনী নীলিমা।কিন্তু পরক্ষনেই কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত সে।সুন্দর ভাবে আবার ঢেকে নিয়েছে নিজেকে,প্রকৃত নীলিমাকে আবারও আড়াল করে রেখেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।আজ যদি রমার সঙ্গে সৈকত না আসতো,তবে নীলিমার একাকীত্বকে হয়তো কোনোদিন উপলব্ধিই করতো পারতো না!সবার মতো সৈকতও ভাবতো,নিতান্তই প্রাণহীন-কঠিন নারী সে!কিন্তু সৈকতের ওই একটা কথাই "আমার রমা",এক মুহূর্তেই অনাবৃত করে দিয়েছে নীলিমাকে।মেকি গাম্ভীর্যের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে ওনার সংবেদনশীল কোমল মনটা।সৈকত বুঝতে পারলো,এক আকাশ ভালোবাসা প্রোথিত রয়েছে নীলিমার মনের গভীরে....
গাড়িটা মাংসের দোকানের সামনে থামালো সৈকত...সারাটা রাস্তা ওর মন-মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু একটাই নাম বিরাজ করছিলো,"নীলিমা"..
সারাটা সন্ধ্যে কিভাবে কেটে গেলো,ওরা বুঝতেও পারলো না।রমা কোলে করে দিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে,কাল আবার স্কুল আছে,নীলিমারও অফিস।সৈকত আর রমা খেতে বসেছিলো।নীলিমা পরিবেশন করতে চাইলো,কিন্তু রমা একরকম জোর করেই টেনে বসালো ওকে।তিনজনেই খেতে-খেতে গল্প করছিলো...
-একটা কথা বলবো নীলিমা?রমা জিজ্ঞেস করলো।
-উম,বলো না...খেতে-খেতেই উত্তর দিলো নীলিমা।
-এভাবে গোটা জীবনটা কাটাবে?এভাবে চলে নাকি?নতুন করে শুরু করার কথা ভাবনি?
খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো নীলিমার।একবার মুখ তুলে সোজাসুজি সৈকতের দিকে তাকালো ও।সৈকতও তখন একভাবে নীলিমার মুখের দিকেই চেয়ে আছে।রমা বুঝতে পেরে বললো,
-ও,ওর কথা বাদ দাও!তুমি আমার মতো,ওর সামনেও সহজ হতে পারো নীলিমা...
নীলিমা পাতের ভাতের ওপর অন্যমনস্ক ভাবে আঙুল চালাতে-চালাতে বললো,
-একেবারেই ভাবিনি,এমনটা নয় রমা।কিন্তু পারিনি জানো!কিছুতেই পারছি না তো!রণ-কে ভুলতেই পারি না এক মুহূর্তের জন্যও।এবার যাকে আমি নিজের জীবনের সঙ্গে জড়াবো,তার মধ্যে আমি রণ-কেই খুঁজে বেড়াবো।আর সেটা তাকে অসম্মান করা হবে।আর এখন তো দিয়া বড়ো হয়ে যাচ্ছে,আর খুব একটা এসব নিয়ে ভাবি না...
সৈকত আর থাকতে না পেরে,এবার বলেই ফেললো,
-এভাবেই একা থাকবেন তাই বলে?সারাটা জীবন?সেটা সম্ভব নীলিমা দেবী?আচ্ছা রণ-র বাড়ি থেকে ওনার মৃত্যুর পর কেউ একবারও এসে দাঁড়ায়নি?
-হ্যাঁ,ওর বাবা নেই।আমার শাশুড়িমা আমায় অনেকবার নিতে এসেছিলেন।আমিই যাইনি...
-কেন??সৈকত আর রমা দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলো।
-রণ-র দেওয়া সিঁদুর মাথায় নিয়ে,ওর বিবাহিতা স্ত্রী হয়ে যে বাড়িতে আমার জায়গা হয়নি,ওর বিধবা হয়ে সে বাড়িতে আমি কি করে যেতাম বলো!আমাকে বিয়ে করে ও নিজেই বাড়িছাড়া হয়েছিল,সেই আমি ওকে ছাড়া ড্যাং-ড্যাং করে ওই রাজপ্রাসাদে গিয়ে উঠতে পারিনি।ওর ভালোবাসাকে এতোটাও অপমান,আমি করতে পারিনি গো...প্রথম-প্রথম খুব তোয়াজ করে ওর মা আমায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন,কিন্তু যখন পারেননি,তখন সবাইকে বলে বেড়ালেন,বউয়ের চরিত্রদোষ!তাই শ্বশুরবাড়িতে থাকতে চায় না।একাই থাকবে ওই নষ্টা-কালি মেয়েছেলে!!একা থাকলে নষ্টামি করতে সুবিধে হবে...
মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো সৈকত।মাথাটা গরম হয়ে গেলো ওর।কোনোরকমে নিজের রাগকে সংযত করলো ও....কিন্তু রমা পারলো না,
-নীলিমা!!ছিঃ!!
শিউরে উঠলো রমা..
মৃদু হেসে নীলিমা বললো,
-ভয় পেয়ো না রমা,আমি অনেক সয়েছি।এইজন্য দুঃখ-কষ্ট এই অনুভূতিগুলো আজকাল মরে গেছে গো!এতটা কঠিন ছিলাম না গো,খুব সহজ-সরল ছিলাম,রণ-র "নীলু" ছিলাম।কিন্তু সত্যি বলতে রমা,সেদিন রণ একা চিতায় জ্বলেনি গো,ওর সঙ্গে-সঙ্গে ওর নীলুও জ্বলে গেছে।আজকের নীলিমার সঙ্গে আগের নীলুর কোনো মিল নেই।আজ আমার একটাই পরিচয়,আমি নীলিমা মজুমদার,শারদীয়ার মা...ব্যাস!
সৈকতের খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিলো।ও আর নীলিমার মুখের সামনে বসে থাকতে পারলো না।উঠে সিঙ্কের দিকে যাচ্ছিলো,নীলিমা ব্যস্ত হয়ে উঠলো,
-একি!আপনি উঠলেন?আর এক টুকরো মাংস...
-নাঃ!থ্যাঙ্কু,দরকার নেই...আমার খাওয়া হয়ে গেছে!উঠে গেলো সৈকত।রমাও আর একটাও কথা বলতে পারলো না।চুপচাপ খেতে লাগলো।মনটা বড্ড ভারী হয়ে গেছে...
-নীলিমা,মেয়েকে নিয়ে একদিন এসো নাগো আমাদের বাড়ি...
-যাবো রমা,আমি সত্যিই যাবো গো।আমার মেয়ের তো কোথাও বেড়াবার জায়গা নেই,তোমায় ও বড্ড ভালোবাসে।তুমি তো জানোই,সারাটা সপ্তাহ আমি অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকি।শনি-রবিবার দেখে আমি যাবো রমা...
-খুব ভালো লাগলো গো,খুব ভালো কাটালাম আজকের সন্ধ্যেটা...
-আবার এসো,সৈকত বাবু,আপনিও আসবেন রমার সঙ্গে....
-হ্যাঁ,অবশ্যই!তবে এবার থেকে এলে রমার সঙ্গেই আসবো!!নইলে আবার বলা তো যায় না,আপনার অতীন্দ্রিয় প্রহরী আবার ঠিক কোন ভাষায় ভাষণ দিয়ে বসবেন...বলে সৈকত সামনের ফ্ল্যাটের দিকে ইশারা করলো....
রমাকে গতকালই বাড়ি গিয়ে সৈকত বলেছিলো বয়স্ক মাসিমার ব্যাপারটা।আজ সৈকতের কথায় ওরা তিনজনেই হেসে উঠলো...
সৈকত হাসি থামিয়ে বললো,
-না সত্যি নীলিমা দেবী,খুব ভালো লাগলো আপনার বাড়িতে এসে।আমি নেহাতই রমাকে আপনার বাড়িটা চেনাতে সঙ্গে এসেছিলাম,রমা চিনে গেলো।এবার থেকে হয়তো ওই আসবে।আমি হয়তো আর আসবো না,বা আমার আসার তেমন কোনো প্রয়োজনও হয়তো পড়বে না।তাই ভীষণ ইচ্ছে করছে আপনার মতো মানুষকে একটু শুভেচ্ছা জানাতে,আপনি আপনার শারদীয়াকে নিয়ে ভীষণ-ভীষণ ভালো থাকুন নীলিমা দেবী।সবসময় মনে রাখবেন,আপনার যেকোনো প্রয়োজনে রমার মতো আমিও সবসময় আপনার পাশে আছি....
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে সৈকত চেয়ে রইলো নীলিমার দিকে,নীলিমা সোজাসুজি সৈকতের চোখের দিকে চেয়ে বললো,
-আপনিও আপনার রমাকে নিয়ে খুব ভালো থাকুন সৈকত বাবু...
ওপর-নীচে দুবার ঘাড় নেড়ে হেসে বেরিয়ে গেলো সৈকত।রমা ততক্ষণে জড়িয়ে ধরেছে নীলিমাকে,
-আসছি নীলিমা!
-এসো!আবার আসবে কিন্তু...
-ও আমাকে বলতে হবে না,আমি সুযোগ পেলেই দিয়াকে দেখতে চলে আসবো..
-একদম...
রমা হাত নেড়ে,শাড়ির আঁচলটা সামলে এগিয়ে গেলো সৈকতের দিকে।ও একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল।বারান্দার মৃদু আলোয় নীলিমা দেখলো,সিঁড়ি দিয়ে নামার ঠিক আগের মুহূর্তে হাসিমুখে রমার কাঁধে হাত রাখলো সৈকত...
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজাটা বন্ধ করে দিলো নীলিমা।ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ও পারলো না সৈকতের শো-রুমে চাকরি করার প্রস্তাবে রাজি হতে।হয়তো সবদিক থেকেই অনেক সুবিধা হতো।মুখে রক্ত তুলে প্রতিমাসে হয়তো এতটা খাটনি খাটতে হতো না ওনার ওখানে।দিয়াকেও আরও একটু বেশি সময় দেওয়া যেত।সামনের ফ্ল্যাটের বৌদির ওপরে এতটাও নির্ভরশীল হতে হতো না।কিন্তু তাও নীলিমা কিছুতেই পারলো না।কারণ,আজ ও সৈকতের চোখে এক মুহূর্তের জন্য যে ছায়া দেখেছে,তা বহুদিন আগে দেখেছিলো অরণ্যর চোখে।আজও অরণ্য ওর জন্য একাকী অপেক্ষা করে আছে।নীলিমা বারংবার বলা সত্ত্বেও,অরণ্য নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে পারেনি।কিন্তু ও অবিবাহিত,নীলিমা ওর জীবনে থাকলো কি গেল,তাতে অরণ্য ছাড়া তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ক্ষতি হবে না।আর বারবার ওকে ফিরিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও যদি অরণ্য ওর জেদ আঁকড়ে ধরে বসে থাকে,সেক্ষেত্রে নীলিমার আর কিছু করার থাকে না।কিন্তু সৈকতের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।কোনোভাবে যদি সৈকত নীলিমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে,রমার সাজানো সংসারটা শেষ হয়ে যাবে।আর সৈকতের দু-চোখে নীলিমা নিজের জন্য অনেকটা শ্রদ্ধা দেখতে পায়,ভবিষ্যতেও ওই শ্রদ্ধার জায়গাটাই নীলিমা ধরে রাখতে চায়।কোনোমতেই চায় না,অপরিসীম শ্রদ্ধাটা ধীরে-ধীরে দুর্বলতায় পরিণত হোক,যেটা অরণ্যর ক্ষেত্রে হয়েছে...
রান্নাঘরে হাতের কাজগুলো সারতে-সারতে নিজের মনেই একটু হেসে উঠলো নীলিমা।রণ চলে যাওয়ার পর এই একটা বড় জ্বালা হয়েছে,বড় সহজেই আজকাল পুরুষের দৃষ্টি পড়তে পারে ও।আগে পারতো না।কিন্তু এখন পারে।কোন দৃষ্টিতে আবেগ,কোন দৃষ্টিতে ভালোবাসা,কোথায় শ্রদ্ধা,আর কোন দৃষ্টিতে ওর শরীরটা ছিঁড়ে খাবার আদিম লালসা কাজ করছে,আজকাল ভীষণ ভালোভাবে বুঝতে পারে নীলিমা।আগে হয়তো ওর হাতের শাঁখা-পলা আর সিঁথির সিঁদুর ওকে সবরকম দৃষ্টি থেকে রক্ষা করতো।তখন হয়তো কোনো নির্দিষ্ট পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভেবে সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হতো ওকে।আজ সেইসব সধবার চিহ্নগুলো ওকে পরিত্যাগ করতে হয়েছে বলে,হয়তো কিছু পুরুষের কাছে সহজলভ্য ও।আচ্ছা,এতটাই কি সহজ সবকিছু!!শরীর থেকে ওইটুকু আলগা প্রসাধন ঝেড়ে ফেললেই কি মনটাকে বদলে ফেলা যায়!অন্তত নীলিমা তো পারেনি।আজও ওর মনের সবটুকু জুড়ে কেবল রণজয়ই আছে...
হাতের কাজটুকু সেরে ঘরে এসে দাঁড়ালো নীলিমা।মশারিটা একটু তুলে দিয়ার কপালে হাত দিল ও,নাঃ!আর জ্বরটা আসেনি।কাল মেয়েটাকে স্কুলে পাঠানো যাবে।নীলিমাকেও তো কাল অফিস যেতেই হবে।মাসের শেষে পরপর দুদিন ছুটি করাই যাবে না।সামনেই পুজো,মাইনে-বোনাসের ব্যাপার আছে আবার।রান্নাঘরের কাজ সারতে-সারতে বেশ রাত হয়ে গেছে আজ।জলের কাজ করতে-করতে শাড়িটাও ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে।শাড়িটা ছেড়ে রেখে বাথরুমে গা ধুতে ঢুকলো ও।সারাটা দিন যেমন-তেমন ভাবে কাটে।কিন্তু রাতে শোওয়ার আগে এই জলের কণাগুলো গায়ে পড়লেই যেন কাঁটার মতো বেঁধে ওর শরীরে।সারা শরীরের চরম অতৃপ্তি এসে গ্রাস করে ওকে।আর তখন বেঁধে রাখা যায় না নিজেকে।মনে হয় সারাটা রাত ওই জলের নীচেই দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেয়।কার জন্য বিছানায় যাবে ও!!এক-একটা মাস যেন এক-একটা জন্মের সমান দীর্ঘ!আজ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না নীলিমা।সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায় ভিজে শরীরেই ডুকরে কেঁদে উঠলো ও।রণ-র শরীরের পুরুষালী গন্ধটা যেন আজও ওকে চারপাশ থেকে আবৃত করে রেখেছে....
বেশ কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো নীলিমা।ভিজে চুলগুলো ওর পিঠের ওপর এলিয়ে পড়েছে।গায়ে একটা তোয়ালে জড়ানো,দুটো চোখ অনেকটা জল ঝরিয়ে রক্তাভ!সোজা এসে রণ-র ছবির সামনে দাঁড়ালো ও।পরম মমতায় একটা হাত রাখলো ওর মুখের ওপরে।সেই মুহূর্তেই নিজের উরুর দিকে দৃষ্টি নামাতে বাধ্য হলো নীলিমা।প্রতিমাসের কাঙ্খিত উষ্ণ রক্তস্রোত তখন ওর উরু বেয়ে নেমে আসছে...জীবনের আরও একটা দীর্ঘ মাস কাটলো।এভাবে আর কতগুলো মাস যে নিজের কামনার সঙ্গে লড়তে হবে,জানা নেই নীলিমার!শুধু জানে লড়াই-লড়াই...প্রতিটা দিনে বাঁচার লড়াই,দিয়াকে আরও একটু সুন্দর জীবন দেওয়ার লড়াই,আর প্রতিটা রাতে নিজের আদিম ইচ্ছের সঙ্গে লড়াই...
রণ চলে যাওয়ার পর এতগুলো বছর যখন ও পেরে গেছে,আর জীবনের বাকি দিনগুলোও ঠিক পেরে যাবে।চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসা জলটুকু বাঁ হাত দিয়ে মুছে নিয়ে একটু হাসলো নীলিমা,তারপর নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসটা নিয়ে আবারও প্রবেশ করলো বাথরুমে...
-উফফ!তাড়াতাড়ি কর ঋক,ভাই কোথায়?
-ঘুমোচ্ছে!
-আমি আর পারি না রে তোদের নিয়ে।কাল কি করছিলি,কখন ঘুমিয়েছিস?
-ভাই কার্টুন দেখছিলো মা!
-হ্যাঁ,সেটা তো এখন তার ঘুমের বহর দেখেই বুঝতে পারছি!উদ্ধার করেছো আমায় তোমরা...এবার তাড়াতাড়ি ব্রাশটা করে খেয়ে আমায় মুক্তি দাও..
ঋক ঘুমচোখে দাঁতে ব্রাশ ঘষতে শুরু করলো...
সকালবেলা দুটো ছেলের সঙ্গে যেন যুদ্ধ করতে হয় রমাকে।বিশেষ করে ছোটটার সঙ্গে!বড়টা তাও যা একটু কথা শোনে,ছোটোটা তো লাটসাহেব!এত জেদ-বায়না-চিৎকার-চেঁচামেচি করে,পাগল হয়ে যায় রমা।কোনোরকমে দুটো ছেলেকে তৈরী করে গোবিন্দদার সঙ্গে বের করে দিয়ে হাঁফাতে-হাঁফাতে সোফায় বসে রমা...তারপর হাঁক দেয়,
-ঝর্ণাদি,বাবাকে চা দিয়েছো?
-হ্যাঁ বৌমনি!
-আচ্ছা!আমার আর দাদার জন্য একটু চা বসাও!ছেলেদুটোর সঙ্গে চেঁচাতে-চেঁচাতে মাথা ধরে গেলো গো...
-আচ্ছা বৌমনি!
ট্রে-তে করে দু-কাপ চা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো রমা।তখনও উপুড় হয়ে ঘুমে বেহুঁশ হয়ে রয়েছে সৈকত।রমা একটু এগিয়ে এসে মাথা রাখলো সৈকতের খোলা পিঠে।ওর ভিজে চুলের আগাটা সৈকতের মুখের ওপর গিয়ে পড়লো।ঘুম ভেঙে গেলো সৈকতের।উঠে রমাকে জড়িয়ে ধরলো ও,
-কি মশাই,ঘুম ভাঙলো?
-সারারাত জাগিয়ে এখন সাতসকালে ঘুম ভাঙিয়ে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে,ঘুম ভাঙলো কিনা!জড়ানো গলায় সৈকত বললো।
-উহ!সারারাত কে কাকে জাগিয়ে রেখেছে,খুব জানা আছে আমার...জংলী একটা...ওঠো,চা খাও...
চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে রমা নিজের চায়ে একবার চুমুক দিলো।তখনই রান্নাঘর থেকে ডাক দিলো ঝর্ণাদি,
-বৌমনি!আজ কি রান্না হবে?বড়দাদাবাবু বলে গেছে মাংস খাবে,আর ছোটদাদাবাবু ডিম!কি করবো?
-তোমার ছেলেদের বায়না সামলাতে-সামলাতে আমি শেষ গো!সৈকতের দিকে চেয়ে রমা বললো।
-হুম!ছেলেরা তো আমার একার!ছেলেদের খেয়াল রাখতে-রাখতে ছেলেদের বাবার দিকেই নজর নেই আর...মিথ্যে রাগ দেখিয়ে সৈকত বললো।
-তাই বুঝি!এগিয়ে এসে রমা সৈকতকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে একটা গভীর চুমু খেলো।সৈকতও চায়ের কাপ-টা রেখে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রমার কোমর!
-ও বৌমনি....
-আসছি ঝর্ণা দি...
সৈকত ছেড়ে দিলো রমাকে।তবে তার আগে ওর গালে আলতো করে একটু চুমু খেলো।চুমু খাবার সময় একটু দীর্ঘনিশ্বাস পড়লো রমার ঘাড়ে!কিন্তু ততক্ষণে রমা সৈকতের হাত ছাড়িয়ে রান্নাঘরে ছুটেছে সংসারের ডাকে...
কাল রাতের পর থেকে একটা প্রচ্ছন্ন অপরাধবোধ কাজ করছিল সৈকতের মধ্যে।সেটা নিজের জায়গা থেকে সাময়িক সরে যাওয়ার জন্য কি!!রমাকে ছাড়া ও মরে যাবে,কিন্তু কাল রাতের পর নীলিমা দেবী বেশ অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে,এবার সৈকত বুঝতে পারছে না সেটা মনে না মস্তিষ্কে...সেই অপরাধবোধ থেকেই সৈকত কাল রাতে আদরে-আদরে ভরিয়ে দিয়েছে ওর রমাকে।রমার দুটো লক্ষীমন্ত পা ধরে চুমু খেতে-খেতে,আদর করতে-করতে অস্ফুটে বারংবার ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে রমার কাছে!রমার সঙ্গে-সঙ্গে নিজের কাছেও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো সৈকত,এমন ভুল আর দ্বিতীয়বার করবে না ও!আসলে রমার পর ও আর এমন কোনো নারীর সম্মুখীন কখনও হয়নি,যে ওকে অবাক করতে পারে!নীলিমা দেবীর প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে সাময়িকভাবে একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিল সৈকত...চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে টেবিলে রাখা রমার ছবিটা হাতে তুলে নিলো ও।তারপর গভীর ভালোবাসার সঙ্গে চুমু খেলো ছবিটায়...
দিনকয়েক পর....
সেদিন শনিবার হওয়ায় ঋক আর ঋদ্ধির একসঙ্গেই স্কুল ছুটি হয়েছে,নীলিমাও আজকাল প্রায়ই রমার সঙ্গে ফেরে।ওদের মধ্যে বেশ একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।কিন্তু স্কুল থেকে সেদিন কাঁদতে-কাঁদতে বেরোলো শারদীয়া।এগিয়ে এসে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো নীলিমা,
-কি হয়েছে দিয়া?
কোনো উত্তর নেই।মেয়ে কেঁদেই যাচ্ছে!
-কিরে দিয়া?কি হয়েছে মা?ব্যস্ত হয়ে উঠলো রমাও...
-এই ঋদ্ধি,তুই আবার দিয়ার সঙ্গে মারামারি করেছিস?
-না মা,আমি তো টিফিন খেয়ে টয়লেটে গিয়েছিলাম,এসে দেখি ও ডেস্কে বসে কাঁদছে...আমি জিজ্ঞেস করলাম,কি হয়েছে!বললোই না...
দিয়া তখনও একটা হাত মুঠো করে রেখেছে,নীলিমা সেটা দেখে বললো,
-তোর হাতে কি রে দিয়া?
হাত খুলে দিয়া দেখালো,তাতে দুটো চকলেট রয়েছে।নীলিমা মাথা ঘামালো না বেশি,স্কুলে কারোর জন্মদিন হয়তো,ম্যাম দিয়েছে।কিন্তু মেয়েটার কি হয়েছে!অনেক কান্নাকাটির পর হেঁচকি তুলতে-তুলতে দিয়া যা বললো,তা কিছুটা এইরকম...
"স্কুলের সবার জন্মদিন হয়,ওর হয়না কেন!ওর মা ওকে খালি পায়েস করে দেয়,কিন্তু ওর জন্মদিনে কোনো ফ্রেন্ডও আসে না গিফ্ট নিয়ে,ঋদ্ধির জন্মদিনেও তো ও গিয়েছিলো,তবে ওর জন্মদিন কেন হবে না!"
নীলিমার বুকের ভিতরটা হু-হু করে উঠলো।আজ ওর আর্থিক অবস্থা এতটাও খারাপ নয় যে,ও দশটা বাচ্চাকে নিমন্ত্রণ করতে পারবে না!খুব ভালোভাবেই পারবে।কিন্তু ও মন থেকে আজও ঠিক মেনে নিতে পারে না!রণ-র চলে যাওয়ার দিনটায় ভীষণ ভেঙে পড়ে ও,সেইদিনে আবার এসব করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না ও...তাই প্রতিবার মেয়ের সামনে একটু পায়েস দিয়েই দায় সারে নীলিমা।কিন্তু আজ মেয়ের অভিমান দেখে নীলিমা বুঝলো,দিয়া এবার বড় হচ্ছে!এবার নিজের আবেগ-অনুভূতিকে লুকিয়ে ওর মতো করে,ওর মন জুগিয়ে বাঁচতে হবে নীলিমাকে....
রমা কিন্তু সবটুকু বুঝতে পারলো,ও শুধু নীলিমার পিঠে হাত রেখে বললো,
-চলো!ওঠো গাড়িতে!মন খারাপ কোরো না নীলিমা,ও তো অবুঝ বলো!ও কি আর অতশত বোঝে!ওর চোখে যা স্বাভাবিক,ও তাই বলেছে...
-হুম!
মুখে একথা বললেও গাড়িতে বসে দিয়ার গলায় ঝোলানো আই-ডি কার্ডটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলো রমা।নীলিমা বলেছিলো বটে,পুজোর মধ্যেই ওর জন্ম হয়েছিলো।আগামীকাল পঞ্চমী,আজই স্কুল হয়ে ওদের পুজোর ছুটি পড়ে গেলো,দিয়ার গলার আই-কার্ড বলছে,পরশুদিনই ওর জন্মদিন!অর্থাৎ ষষ্ঠীর দিন।মৃদু হাসলো রমা।এ বছর জন্মদিনের দিন ও আর মেয়েটাকে কাঁদতে দেবে না,এমনকি নীলিমাকেও না...
ততক্ষণে আবার কান্নাকাটি ভুলে ঋক আর ঋদ্ধির সঙ্গে খেলায় মেতেছে শারদীয়া।সত্যি!কত তাড়াতাড়ি এরা দুঃখ ভুলে যায়!কষ্টও পায় ছোট-ছোট কারণে,আবার ঠিক তেমনিভাবে আনন্দও পায়,খুশিও হয় খুব অল্পতেই।একেই হয়তো বলে নিষ্পাপ শিশুমন...রমা এগিয়ে গিয়ে আদর করে দিয়ার গালটা টিপে দিলো একবার...
নীলিমা তখন গাড়ির বাইরের দিকে চেয়ে আছে অন্যমনস্কভাবে...
(চলবে...)
উপন্যাসটি আংশিকভাবে (প্রথম দশটি পর্ব) পেজে প্রকাশিত হবে। সংগ্রহে রাখতে whatsapp করতে পারো পাঠকবন্ধুর নম্বরে - 7439112665
এছাড়াও পাওয়া যাবে flipkart ও amazon এও।

বাংলাদেশ থেকে পাওয়া যাচ্ছে: Indo Bangla Book Shop - +880 1556-436147 

ত্রিভুজ (দ্বিতীয় পর্ব)


 


ত্রিভুজ

সাথী দাস

দ্বিতীয় পর্ব


রমা আজ ভীষণ ব্যস্ত বাড়ির সব নামী-দামী অতিথিদের একহাতে সামলাতে।নীলিমার সঙ্গে একটু গল্প করেই,শ্বশুরের ডাকে আবার ওপরে দৌড় দিলো ও।খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ওখানেই কিনা!নীলিমা শারদীয়ার খোঁজে একটু-একটু করে সেই ঘরের দিকে গেলো,যেখানে সৈকত শারদীয়াকে নিয়ে গেছে।গিয়ে দেখলো,ঘরের ভিতরে কচিকাঁচার ভিড়ে চাঁদের হাট বসেছে।বেশ কয়েকটা বাচ্চা আর তাদের মা-কে নীলিমা চেনে,শারদীয়ার সঙ্গে তারা একই স্কুলে পড়ে।বাকি কয়েকটা বাচ্চা রমাদের আত্মীয়-পরিজন বোধহয়।সবার সঙ্গেই বেশ ভাব জমিয়ে নিয়েছে শারদীয়া।ও আরও সব বাচ্চাদের মতো মাথায় একটা সুন্দর টুপি পরেছে,কেক খাচ্ছে।সবার সঙ্গে নীলিমাও গিয়ে বসলো।
-আপনারা সবাই বসে একটু কথা বলুন।আমি একটু ওদিকটা দেখে আসি।কেমন!
সৈকত বললো।কথাটা সবার উদ্দেশ্যে হলেও,ওর চোখজোড়া নিবদ্ধ ছিলো শুধুমাত্র নীলিমার দিকেই।নীলিমাও আরও সবার মতোই বললো,
-হ্যাঁ,অবশ্যই!
ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সৈকত।
কিছুক্ষণ গল্প করার পরই যার-যার বাচ্চা নিয়ে তাদের মায়েরা উঠে গেলো।রাতও কম হয়নি।ওরা বলছে,ওরা এসেছেও সেই সন্ধ্যেবেলা।নীলিমাই বেশ অনেকটা দেরি করে ফেলেছে।এবার ওকেও খেতে বসতে হবে।দিয়াকে ও সামান্য একটু খাইয়েই এনেছে।শরীরটা ভালো না তো,বাইরের খাবার খেলে আবার যদি রাতে বমি করতে শুরু করে!সেই ভয়েই নীলিমা ওকে খাইয়ে এনেছে!যার জন্মদিন,সেই প্রতীক অর্থাৎ ঋদ্ধি ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে।প্রান্তিক,অর্থাৎ ঋক তখনও জেগে ছিল।খাটের ওপর ছড়িয়ে থাকা ছোট ভাইয়ের খেলনাগুলো গোছাচ্ছিলো ও,একটু হেসে শারদীয়ার হাত থেকে একটা গাড়ি নিয়ে বাক্সে ভরে রাখতে গেলো ও,তখনই নীলিমাকে ডাকলো ঋক,
-আন্টি,দিয়ার কি জ্বর হয়েছে?
ঋক দিয়ার একটা হাত নিজের হাতে ধরে রয়েছে।
খাটের অন্য কোণায় বসেছিলো নীলিমা।তাড়াতাড়ি করে মেয়ের দিকে এগিয়ে এলো ও,দিয়ার গায়ে হাত দিয়েই নীলিমা বুঝতে পারলো,সত্যিই বেশ জ্বর এসে গেছে ওর।এবার বাড়ি ফিরতেই হবে।ঋকের দিকে চেয়ে বললো,
-হ্যাঁ বাবা!দিয়ার তো দেখছি আবার জ্বর আসছে।তোমার মা কোথায় বাবা?একটু ডাকা যাবে কি?
দিয়াকে কোলে নিলো নীলিমা।
-এক্ষুণি ডাকছি আন্টি!তুমি বসো।দৌড়ে বেরিয়ে গেলো ঋক।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সৈকত এসে ঢুকলো,ওর হাতে একটা প্লেট আর রঙিন পানীয়র গ্লাস।
-নিন,আপনি তো আর সন্ধ্যেবেলা এলেন না!একটু কিছু মুখে দিয়ে নিন।তারপর না হয়...একি!আপনি উঠলেন?
-মেয়ের জ্বরটা আবার আসছে সৈকত বাবু।আমি আর বসবো না।রমা কোথায়?
-সেকি!আপনি ওকে খাটে শুইয়ে দিন!আমি বালিশ-চাদর দিচ্ছি!
-নানা!আপনি এত ব্যস্ত হবেন না।আপনি একটু রমাকে ডেকে দিন...
সেই মুহূর্তেই ঘরে ঢুকলো রমা,সঙ্গে ঋক।
-কি ব্যাপার নীলিমা?ঋক বললো,শারদীয়ার জ্বর এসেছে?
-হ্যাঁ গো!তোমায় বললাম না,ওষুধ খাইয়ে এনেছিলাম।আবার জ্বরটা আসছে!আমি বাড়ি চলে যাবো রমা!
হাঁ-হাঁ করে ওঠে রমা,সঙ্গে সৈকতও।
-নানা নীলিমা,এভাবে একটু কিছু মুখে না দিয়ে তুমি কিছুতেই যাবে না।প্রথমবার এলে আমার বাড়ি?আমি ঋদ্ধির জ্বরের ওষুধ ওকে দিই?একই বয়স তো?
-শোনো রমা,তুমি ব্যস্ত হোয়ো না,মেয়েটার শরীরটা ঠিক হোক,আমি আবার আসবো ওকে নিয়ে।
-অবশ্যই আসবে,একশবার আসবে।কিন্তু তাই বলে আজ তো তোমাকে শুধু মুখে ছাড়বোই না...আজ আমার ছেলেটার জন্মদিন!!এভাবে না খেয়ে অতিথি গেলে...
শারদীয়া ততক্ষণে জ্বরে এলিয়ে পড়েছে নীলিমার কাঁধে।অস্থির লাগছে নীলিমার।ও আবারও অনুরোধ করলো রমাকে।এবার সৈকত বলে উঠলো,
-রমা,ঠিক আছে।জোর কোরো না।অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে ওভাবে উনি খেয়েও শান্তি পাবেন না।আমি বরং ওনার খাবারটা প্যাকিং করিয়ে দিচ্ছি।এটাতে অন্তত আপনি না বলবেন না নীলিমা দেবী,প্লিজ!!
এছাড়া আর কোনো উপায় নেই দেখে অগত্যা রাজি হয় নীলিমা।সৈকত বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।রমা শারদীয়ার কপালে আবার হাত রাখলো,
-ইস!মেয়েটার ভালো জ্বর এসে গেছে গো নীলিমা।কোন ডাক্তার দেখাচ্ছ গো ওকে....
খাবার নিয়ে সৈকত যখন ঘরে এসে দাঁড়ালো,তখন দিয়া নীলিমার কোলে ঘুমিয়ে গেছে।ওকে কোলে নিয়ে খাটের এক কোণে বসে ছিলো নীলিমা।সৈকত এসে যাওয়ায় তাড়াতাড়িই উঠতে গেলো ও।
-রমা আমি আসি গো!
-আসি মানে?কোথায় যাবে এত রাতে অসুস্থ মেয়ে কোলে একা-একা?ও তোমাকে ছেড়ে দিয়ে আসবে।
এটার জন্য সৈকত বা নীলিমা কেউই তৈরি ছিল না।দুজনেই অবাক হয়ে রমার মুখের দিকে চেয়ে রইলো।নীলিমা গলা নামিয়ে বলে উঠলো,
-তার কোনো দরকার নেই রমা,আমি বেরিয়ে রিক্সা...
-কথা কম বলো।এত রাতে তুমি রিক্সা পাবেও না,আর এভাবে দিয়াকে কোলে নিয়ে কোথায় রিক্সার খোঁজে ঘুরবে তুমি?কিগো,শুনছো?
-হুম!
-গাড়িটা নিয়ে বেরোও...
-গোবিন্দদা?
-ও আমার দিদিকে ছাড়তে গেছে।তুমি আর একটা গাড়ি নিয়ে যাও!
-আচ্ছা!রমা দোকানের কর্মচারীরা খেতে বসেছে।তুমি একটু ওপরে যাও।
-হুম,এক্ষুণি যাচ্ছি।ঋদ্ধিও ঘুমিয়ে পড়েছে।ওকেও তুলে খাওয়াতে হবে।
-হুম!আমি নীচে আছি।আপনি আসুন...নীলিমার দিকে চেয়ে মৃদুস্বরে সৈকত বললো।তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো ও।
-রমা,এসবের কোনো প্রয়োজন ছিল না।আমি কিন্তু...
-একদম কথা না।যাও!মেয়ের খেয়াল রেখো!খেয়ে নিও রাতে কিন্তু।
-হুম!আসছি!
-এসো....
নীলিমা বেরিয়ে যাওয়ার পর ঋককে ডাকলো রমা,
-এই ঋক,ভাইকে ডেকে নিয়ে ওপরে আয় বাবা!খেয়ে যা,তাড়াতাড়ি কর!অনেক রাত হয়ে গেলো....
সৈকত দেখলো এক হাতে খাবারের প্যাকেট,আর কোলে মেয়েকে নিয়ে,শাড়ি সামলে খুব কষ্ট করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে নীলিমা।সৈকত গাড়ির দরজা খুলে দৌড়ে এগিয়ে এলো নীলিমার দিকে।আগে খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে ও গাড়িতে রাখলো।তারপর নীলিমার কোল থেকে শারদীয়াকে টেনে নিজের কোলে নিয়ে বললো,
-আপনি আগে গাড়িতে উঠে বসুন।তারপর ওকে কোলে নিন!ইস!প্রচন্ড জ্বর তো মেয়েটার।গা পুড়ে যাচ্ছে...
সৈকত গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিলো।আর কথা বাড়ালো না নীলিমা।তাড়াতাড়ি করে গাড়ির পিছনের সিটে উঠে বসলো ও,সৈকত দিয়াকে আলগা করে নীলিমার কোলে শুইয়ে দিলো।তারপর নিজে গিয়ে বসলো গাড়ির সামনের সিটে।গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে বললো,
-ওকে কি কোনো ডাক্তার দেখাবেন?বলুন তবে,আমি নিয়ে যেতে পারি।তারপর বাড়িতে ছেড়ে দেবো আপনাকে?
-নানা!আপনি সোজা বাড়িই চলুন।বাজারের দিকেই আমার বাড়ি।আমার ঘরে ওষুধ আছে।
-আচ্ছা!!
গাড়িটা স্টার্ট দিলো সৈকত....
মিনিট দশেকের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেলো নীলিমার ফ্ল্যাটে।গাড়ি থেকে নেমে আবারও সৈকত কোলে নিলো শারদীয়াকে।ওদের ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলো সৈকত।নীলিমা তখন নীচু হয়ে ফ্ল্যাটের তালা খুলছে,আর সৈকত শারদীয়াকে কোলে নিয়ে ওর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।কমন বারান্দার মৃদু আলোয় সৈকত দেখলো,পাশাপাশি ওই ফ্লোরে আরও দুটো ফ্ল্যাট।একটা দরজায় বাইরে দিয়ে তালা ঝুলছে,জানলাও বন্ধ।আর একটার দরজা ভেজানো,জানলা খোলা,ঘরে ফ্যান চলছে মনে হয়,কারণ পর্দা উড়ছে,ঘরের ছোট আলো জ্বলছে!দরজার ছিটকিনি খোলার শব্দে পর্দা সরে গেলো,সৈকত সঙ্গে-সঙ্গে মুখটা ফিরিয়ে নিলো।তাই সৈকত খেয়াল করলো না,জানলা দিয়ে উঁকি মারলো একটা মুখ!ততক্ষণে নীলিমা ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়েছে,সৈকতও শারদীয়াকে নিয়ে ঘরের ভিতরে পা রাখলো।খাবারের প্যাকেটটা সৈকতের হাত থেকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখলো নীলিমা।তারপর হাত বাড়িয়ে সৈকতের কোল থেকে শারদীয়াকে নিতে যাবে,এমন সময় ওদের দুজনের কানে এমন কয়েকটা বাক্য ভেসে এলো,যে নীলিমা আর সৈকতের দিকে মাথা তুলে পর্যন্ত তাকাতে পারলো না।ওই জানলা থেকে মুখ বের করে একজন মহিলা হেঁড়ে গলায় বলে উঠলেন,
-তাই তো ভাবি,একা-একা একটা বেধবা মেয়েছেলে এত রাত পর্যন্ত কোথায় থাকে...নিজের স্বামীটাকে খেয়ে এখন পরের ব্যাটা নিয়ে...
আর শুনতে পারলো না নীলিমা।সপাটে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো ও।লজ্জায়-অপমানে ওর তখন চোখে জল এসে গেছে।সৈকতেরও অপমানে কান-মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছে,বনেদি পরিবারের ছেলে হওয়ার সূত্রে ও একেবারেই এইরকম ধরনের কথা শুনতে অভ্যস্ত নয়।রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে অনেকরকম কথাই কানে আসে,কিন্তু এমন অশ্রাব্য কোনো কথা যে ওর উদ্দেশ্যে হতে পারে,এটা সৈকত কল্পনাও করতে পারেনি।একছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে এখান থেকে।কিন্তু নীলিমা ঘরের দরজা হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়ায় সৈকতও এবার আর বেরোতে পারছে না,তাছাড়া শারদীয়া এখনও ওর কোলেই রয়েছে।দরজা বন্ধ করে দিয়াকে সৈকতের কোল থেকে নিলো নীলিমা।তারপর ওকে নিয়ে গিয়ে ভিতরের ঘরে শুইয়ে দিতে গেলো।সৈকত এবার মাথা তুলে ঘরটা দেখতে লাগলো।খুব সাধারণভাবে সাজানো,কোনো আভিজাত্য নেই।দুটো ঘর,একটা বাথরুম,একটা রান্নাঘর,বেশ পুরোনো ফ্ল্যাট বোঝাই যাচ্ছে।আসবাব সামান্যই,একটা ডাইনিং টেবিলে কটা ফল,কিছু ওষুধ রয়েছে।ভীষণ সাধারণ সবকিছু,কিন্তু কি সুন্দরভাবে গোছানো।কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই সংসারের মধ্যে।চারদিকে দেখতে-দেখতে নীলিমা ভিতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।কিন্তু কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটার জন্য এবার ও আর চোখ তুলে সৈকতের দিকে চাইতেই পারছে না।সৈকতই পরিস্থিতি সামলানোর জন্য কথা শুরু করলো,
-নীলিমা দেবী,আমি আসি তাহলে?
-হুম আসুন।নেহাত অনেকটা রাত হয়ে গেছে,নইলে একটু চা-জলখাবার...
-নানা,আপনি ব্যস্ত হবেন না।দিয়ার যত্ন নিন।আর শুনুন,নিজের পকেট থেকে কলম বের করে নীলিমার দিকে তাকায় সৈকত,
-একটু কাগজ হবে?
-হুম,অবশ্যই!
একটা ডায়েরি এনে সৈকতের দিকে এগিয়ে দেয় নীলিমা।
-এই নিন!
-হুম!
খসখস করে কাগজে কিছু একটা লিখছে সৈকত,লেখা শেষ হয়ে গেলে ডায়েরিটা নীলিমার হাতে ফেরত দিয়ে ও বললো,
-কিছু মনে করবেন না নীলিমা দেবী,অসুস্থ মেয়েটাকে নিয়ে রাতে একা থাকবেন।আর আপনার যা সহানুভূতিশীল-দায়িত্ববান প্রতিবেশী দেখলাম,আমার সত্যিই আর কিছু বলার নেই।আমার বাড়ির নম্বর লিখে দিলাম আপনার ডায়েরিতে,রাতে যদি কোনো প্রয়োজন হয়,একটা টেলিফোন করতে দুবার ভাববেন না!আপনার বাড়িতে ফোন আছে তো?
মাথা নেড়ে ছোট্ট করে "হ্যাঁ" বলে নীলিমা।
-বেশ!অবশ্যই জানাবেন আমাকে।যত রাতই হোক আমি আসবো,একটু থেমে সৈকত নীলিমার দিকে সোজাসুজি চেয়ে আবার বললো,রমাকে সঙ্গে নিয়েই আসবো...চিন্তা নেই আপনার...গাঢ় কণ্ঠেই সৈকত বললো।
নীলিমার লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।একটা কথাও বলতে পারলো না ও।সৈকতই বললো,
-আমি আসছি নীলিমা দেবী!
-সৈকত বাবু?
চলে যাচ্ছিলো সৈকত।নীলিমার কাতর ডাকে আবার ঘুরে দাঁড়ালো ও।
-কিছু বলবেন?
গলা ধরে এসেছে নীলিমার।কথা বেরোতে চাইছে না।তবু একরকম জোর করেই ও বললো,
-মাসিমার কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না,বয়স্ক মানুষ তো!!সারাদিন ধরে নিজের ছেলের বউকেও বলছে,ওর সয়ে গেছে।আজকাল একটু সুযোগ পেলে আমাকেও আর কি...দাদা-বৌদি,মানে মাসিমার ছেলে-ছেলের বউ খুব ভালো মানুষ,আমার মেয়েকে ওরা খুব ভালোবাসে।আমি আগে যেতাম ওদের বাড়ি,মাসীমাও তখন খুব ভালোবাসতো আমায়।কিন্তু ও আমায় ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সব কেমন যেন বদলে গেলো।বৌদি একদিন জোর করে আমায় ঘর থেকে বের করে ওদের ঘরে নিয়ে যায়,দাদার সামনেই,দাদার সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে মাসিমা এমন একটা কথা বলে নিজের ছেলের বউকে সাবধান করেন,তারপর থেকে আমি আর ওদের ঘরে যাই না।ওরা ডাকেও না,তবে বৌদি শাশুড়িকে লুকিয়ে প্রায়ই আমায় মেয়েকে রান্না করা খাবার দিয়ে যায়।ওনাদের ছেলেমেয়ে নেই তো,তাই আমার দিয়াকে ওরা খুব ভালোবাসে।শুধু মাসিমার ভয়ে প্রকাশ করতে..
-যাইহোক,তবু আমার কথাটা খুবই খারাপ লেগেছে!কিন্তু আপনি প্লিজ কষ্ট পাবেন না,বা লজ্জিত..
-নাঃ!ওসব কষ্ট-লজ্জা আমার আর হয় না সৈকত বাবু।আগে হতো!এখন সবকিছু সয়ে গেছে।সমাজে আমাদের মতো একাকী বিধবাদের অনেক লড়াই করে বাঁচতে হয়,অদূর-ভবিষ্যৎ প্রজন্মে কি হবে জানিনা,তবে এখনও নারীকে কোনো পুরুষের ছত্রছায়া ছাড়া সমাজ মানতে পারে না।বাবা-দাদা-স্বামী-ছেলে ছাড়া কোনো নারীসত্তা আজও অপূর্ণ সৈকত বাবু!আমি জানি আমার লড়াইটা খুব কঠিন,কিন্তু দিয়ার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি..
একটু আগে যে চোখদুটো লজ্জায় অবনত হয়ে ছিল,সেই চোখদুটোই এখন একমাত্র মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আসন্ন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত,জ্বলজ্বল করছে কাজল-কালো একজোড়া চোখ!ভীষণ অবাক হয়ে গেলো সৈকত।অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী এই নারী!এনার জন্য সৈকতের করার কিছুই নেই,শুধু এনাকে অনেকটা শ্রদ্ধা করা যায়,আর কিছুই হয়তো ইনি গ্রহণ করবেন না..রমা ঠিকই বলেছিলো,সবার থেকে আলাদা নীলিমা।মৃদু হেসে সৈকত বললো,
-হুম!আপনি সত্যিই সব পারবেন নীলিমা দেবী,দেখবেন আপনি,দিয়া একদিন অনেক বড় হবে।আজ আমি,আপনার এই কথাগুলো না শুনে,এ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে,আপনার সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ধারণা নিয়ে যেতাম,হয়তো ভাবতাম,সমাজের চোখরাঙানিতে অসহায় একজন...কিন্তু এই কয়েকটা কথায় আপনি আমার ধারণাটাই বদলে দিলেন।আমি এলাম নীলিমা দেবী...ভালো থাকবেন,দিয়া কেমন থাকে একটু জানাবেন।
-হুম!আসুন!
সৈকত আর দাঁড়ালো না।বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠলো।
গাড়িতে ঢুকেও স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখে কয়েক মুহূর্ত থমকে বসে রইলো ও।তখনও চোখের সামনে ভাসছে বেগুনি রঙের ফুলহাতা ব্লাউজ-শাড়ি,একমাথা চুলকে একজায়গায় করে আলগা করে বেঁধে রাখা একটা খোঁপা,কাজল-কালো একজোড়া প্রখর গভীর চোখ!রাস্তা থেকে আর একবার নীলিমার ঘরের দিকে চেয়ে দেখলো ও,ডাইনিংয়ের আলো নিভে ঘরের আলোটা জ্বলে উঠলো।গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো সৈকত..
স্কুল থেকে ঋদ্ধিকে নিয়ে বেরিয়ে অস্থির লাগছে রমার।আজ দিয়া স্কুলে আসেনি,জ্বরটা কমলো কিনা বোঝাও যাচ্ছে না!সৈকত কাল রাতে বাড়ির নম্বরটা দিয়ে এসেছিলো,কিন্তু নীলিমার নম্বরটা নিয়ে আসেনি।আর নীলিমাও ফোন করেনি,তাই কিচ্ছু জানা যাচ্ছে না।একটু অপেক্ষা করে দুই ছেলেকে নিয়েই বাড়ি ফিরলো রমা।কিন্তু বাড়ির কোনো কাজেই মন বসছে না ওর,শুধু দিয়ার মুখটা মনে পড়ছে।তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসছে প্রায়।ছেলেরা ঘুমিয়ে পড়েছে।রমা বাড়ির ফোন থেকে অন্যমনস্কভাবে দোকানের নম্বরটা ডায়াল করলো।কেউ একজন ফোন ধরে বললো,
-নমস্কার!বি.কে.চৌধুরী এন্ড সন্স জুয়েলারী হাউজ...
-বৌমনি বলছি,দাদা আছে?
-আরে বৌমনি!একটু ধরুন।দাদা ওপরে কাজ দেখছে,একটা বড় অর্ডার আছে তো।আমি এক্ষুণি ডেকে দিচ্ছি...
-হুম...
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোনের ওপারে সৈকতের গলা,
-বলো রমা,বাবার শরীর ঠিক আছে তো?
-হুম!
-তুমি ঠিক আছো?
কোনো উত্তর নেই।
-রমা?
-দিয়ার জন্য খুব মন কেমন করছে।মেয়েটার ওপর বড়ো মায়া পড়ে গেছে গো!কেমন আছে কে জানে!মনটা খুব খারাপ লাগছে!
-হুম!রমা,তোমায় একটা কথা বলি?দিয়া পরের মেয়ে!এত মায়া বাড়িয়ে কি লাভ বলো!তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও বরং...
-শোনো না!
-বলো...
-কাল তো তুমি ওদের ছেড়ে দিয়ে এসেছিলে,আজ আমায় একবার পৌঁছে দেবে ওদের ফ্ল্যাটে?
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সৈকত বললো,
-রমা,সন্তান যার,তারই থাকবে কিন্তু!তুমি যত মায়া বাড়াবে,তত তোমারই কষ্ট বাড়বে!না গেলে হতো না?
চুপ করে গেলো রমা!সৈকত কোনোদিনও ওর কোন ইচ্ছে অপূর্ণ রাখেনি।তাই রমাও কোনোকিছু জোর করে আদায় করতে শেখেনি!কিন্তু সৈকত সবটুকু বুঝতে পারলো,ফোনের ওপাশ থেকে রমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা ওর দ্বিতীয় ইন্দ্রিয়কে স্পর্শ করে গেলো।তাড়াতাড়ি সৈকত বলে উঠলো,
-গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি।তৈরী হয়ে নাও,দোকানে চলে এসো।আমি তোমায় নিয়ে যাবো!
-আচ্ছা!ভীষণ উচ্ছাসের সঙ্গে রমা বললো।
-শুধু একটা কথা রমা,যা করবে ভেবে করবে,আমি তোমাকে কোনোকিছুর জন্য কোনোদিনই বাধা দিইনি।আজও দেবো না,তবে কোনো কারণে যদি পরে তুমি কষ্ট পাও,আমি কিন্তু সহ্য করতে পারবো না!
-আমি জানি তো গো,তুমি আমার কষ্ট সহ্য করতে পারো না,তাই তো নিয়ে যাচ্ছ আমায়...
-আচ্ছা রাখি,হাতের কয়েকটা কাজ গুছিয়ে নিই,কর্মচারীদের কিছু কাজ বোঝানোর আছে!
-আচ্ছা...
ঘণ্টাখাকের মধ্যেই একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো নীলিমার ফ্ল্যাটের নীচে।দিয়ার জ্বরটা কমলেও শরীর ভীষণ দুর্বল,বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেনি আজ,তাই স্কুলেও যায়নি।নীলিমাও আজ আর মেয়েকে ছেড়ে অফিস যায়নি,ছুটি করেছে।দিয়া তখনও ঘুমোচ্ছিলো,নীলিমা তখন সবে গা ধুয়ে একটা ধোয়া কাপড় পরেছে,সন্ধ্যে দেবে,হাতে ধূপকাঠি জ্বালিয়ে সবে ঠাকুরের কাছে বসতে যাবে,এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো।ধূপকাঠিটা ধূপদানিতে গুঁজে দিয়ে ও দরজা খুললো,দরজা খুলেই বেশ চমকে উঠলো নীলিমা,রমা দাঁড়িয়ে রয়েছে,পিছনে সৈকত...
-তুমি?
-মেয়েটা কেমন আছে,একবার জানালে না নীলিমা?আর থাকতে না পেরে,আমিই চলে এলাম দিয়াকে দেখতে!
-এসো-এসো!ভিতরে এসো।আসুন...না আসলে কাল সারারাত প্রায় জেগেই ছিলাম,জ্বরের জন্য ঘুমোতেই পারেনি দিয়া,সকাল থেকে আর জ্বরটা আসেনি গো!তোমার বাড়িতে কাল সবে একটা কাজ গেলো,আজ আবার ছেলেদের স্কুল,তাই আমি আর তোমায় বিব্রত...
চুপ করে চোখ নামিয়ে নীলিমার কথাগুলো শুনছে সৈকত।কাল যদি ও নীলিমা দেবীকে একটুও বুঝে থাকে,তবে উনি মরে গেলেও ওদের কোনো অসুবিধার কথা জানাবেন না।যতদিন পারবেন,নিজেই লড়বেন!কিন্তু মুখে কিছু বললো না ও,কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে অসহায় অবস্থায় থেকেও এতটা আত্মসম্মান বজায় রাখতে কজন পারে!!এই কারণেই সৈকত মনের অন্তঃস্থল থেকে নীলিমা দেবীকে অনেকটা শ্রদ্ধা করে।
সারা ঘরে বেশ একটা জুঁইফুলের গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে,কোনো ধূপকাঠির গন্ধ হবে মনে হয়।গন্ধটায় ঘরের মধ্যে বেশ একটা মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।হালকা নীল রঙের শাড়ি আর ভেজা চুলে নীলিমা দেবীকেও ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে।রমা নীলিমার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে ঘরের ভিতরে ঢুকলো,অগত্যা সৈকতকেও রমার পিছনে-পিছনে যেতে হলো।গতকাল ডাইনিং থেকেই ফিরে গেছিলো সৈকত,এই ঘরে আসার প্রয়োজনই পড়েনি।আজ ঘরে ঢুকে সৈকতের প্রথমেই চোখ চলে গেলো ঘরের দেওয়ালের দিকে।প্রায় প্রতিটা দেওয়ালেই নীলিমা দেবীর ছবি,সঙ্গে একজন ভীষণই সুদর্শন পুরুষ!কোনোটা নীলিমা দেবীর বিয়ের ছবি,সেটায় সিঁথিভর্তি সিঁদুর নীলিমা দেবীর সিঁথিতে,আবার কোনোটা বা পরবর্তীকালের ছবি।প্রতিটা ছবিতেই অসাধারণ সুন্দরী লাগছে নীলিমা দেবীকে।গায়ের রংটা একটু শ্যামলা,কিন্তু মুখে সর্বাগ্রে যেটা চোখে পড়ে সেটা হলো,ভীষণ আকর্ষণীয় একজোড়া চোখ,আর নাক-মুখও একেবারে কাটা-কাটা!এই শ্যামাঙ্গিনীর ঠোঁটের এক চিলতে হাসিই,যেকোনো পুরুষকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট।এই নারীর রূপের বর্ণনা দেওয়া সৈকতের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না।তার জন্য হয়তো কলম নিয়ে কারিকুরি করা কোনো স্বনামধন্য কবি হতে হবে।নীলিমা একাধারে মহীয়সী-মোহময়ী,সেই সঙ্গে ভীষণভাবে আবেদনময়ী এক নারী,অপরদিকে প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী।ওনার প্রখর দৃষ্টির সামনে সরাসরি বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা যায় না।মনে হয়,উনি যেন মনের অন্তঃস্থল পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারবেন!এখনও নীলিমা দেবী রমার সঙ্গে কথা বলে চলেছে একনাগাড়ে।ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।সৈকত চোখ ফিরিয়ে নিলো নীলিমার ওপর থেকে।ঘুমন্ত দিয়ার মুখের দিকে চাইলো ও।দুদিনেই মেয়েটা কাহিল হয়ে পড়েছে।চোখের কোলে গভীর কালি!মেয়েটা চোখ-নাক-মুখ পেয়েছে মায়ের মতো,শুধু গায়ের রংটা বাবার!রমাকে আর সৈকতকে বসতে বলে,সৈকতের পাশ দিয়েই নীলিমা একছুটে চলে গেলো রান্নাঘরের দিকে।রমার কোনো বারণই শুনলো না ও।নীলিমা সরে গেলে আস্তে-আস্তে ঘুমন্ত শারদীয়ার মাথায় একটা হাত রাখলো রমা...ততক্ষণে কথাবার্তার শব্দে ওর ঘুমটা ভেঙে গেছে।ও উঠে বসলো,রমা কোলে টেনে নিলো ওকে।তারপরই সৈকতের দিকে ফিরে বলে উঠলো,
-এই শুনছো,মেয়েটার জন্য একটু ফল-মিষ্টি নিয়ে এসেছি।আমার ব্যাগটার মধ্যে রয়েছে,ওই ডাইনিং টেবিলের ওপরে।একটু বের করে প্যাকেটটা নীলিমাকে দিয়ে এসো না গো!
-আচ্ছা!
উঠে ডাইনিংয়ের দিকে গেলো সৈকত।রমা তখন শারদীয়ার ছোট্ট চিরুনি দিয়ে ওর মাথার এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো যত্ন করে আঁচড়ে দিচ্ছে....
-নীলিমা দেবী?
-বলুন!
-দিয়ার জন্য সামান্য কিছু ফল-মিষ্টি!রমা এনেছে।
-এসবের আবার কি দরকার...
-আমি জানি তো আপনি কি বলবেন,ওই জন্যই আগেই গিন্নির ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজের পিঠ বাঁচালাম...
হেসে ফেললো নীলিমা।সঙ্গে সৈকতও...
-নিন ধরুন!এত ফর্মালিটি করবেন না প্লিজ!আমার রমা কিন্তু একবার যাকে ভালোবাসে,প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে,এই কদিনেই ও শারদীয়াকে আর আপনাকে সত্যিই খুব ভালোবাসে ফেলেছে....
সৈকত কি বলছে,বাকি কথা আর কানে ঢুকছে না নীলিমার।ওর সমস্ত মনটা বাঁধা পড়েছে ওই একটা কথার মধ্যেই,"আমার রমা!"রণজয়ও ওকে আদর করে বলতো,"আমার নীলু!"নীলিমাকে ভালোবেসে নীলু নামেই ডাকতো রণ।আজ এতগুলো বছর পর সৈকতের মুখের ওই "আমার রমা",এই একটা কথাই ওকে এক লহমায় অতীতে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো।মুহুর্তেই ছবির মতো স্থির হয়ে গেলো নীলিমা!কতদিন ওকে কেউ "আমার নীলু" বলে ডাকে না!কতদিন ওকে কেউ আদর করে ছোঁয় না,সারা শরীর কেঁপে উঠলো নীলিমার।রণ-র পরে আর কোনো পুরুষ ওর জায়গাটা নিতে পারেনি।অরণ্য ওর মনের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছেছে ঠিকই,কিন্তু আত্মাকে স্পর্শ করতে পারেনি।প্রতিরাতের মতো হঠাৎই আবার আদিম ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো নীলিমার।রণ-কে ভীষণ মনে পড়ছে...চোখে বোধহয় একটু জলও এসে গিয়েছিলো ওর,গ্যাসে চায়ের জল বসিয়ে ভীষণভাবে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো নীলিমা।ঘোর কাটলো সৈকতের ডাকে,
-নীলিমা দেবী,কি হলো,কি ভাবছেন?আপনার চায়ের জল তো ফুটে শুকিয়ে গেলো প্রায়...আপনি ঠিক আছেন তো?
-হুম!চোখ নামিয়ে ছোট্ট করে নীলিমা বললো।সৈকতের মতো সুপুরুষের চোখের দিকে চাইতে সাহস হচ্ছে না ওর!নীলিমা ভীষণভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখে সমাজের প্রতিটা পুরুষের চোখ থেকে!যদি কেউ ওকে বুঝে যায়,যদি ওর বুকের মধ্যেকার অপূর্ণতাটুকু ধরা পড়ে যায় কোনো পুরুষের চোখে।ও কিছুতেই পারবে না,রণ-র জায়গা অন্য কাউকে দিতে!তাতে যদি আজীবন ওকে লড়াই করে বেড়াতে হয় একাকীত্বের সঙ্গে,তবে তাই হোক....
-দিন সৈকত বাবু,প্যাকেটটা এদিকে দিন!হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা সৈকতের হাত থেকে নিলো নীলিমা,তারপর জিনিসগুলো বের করে গুছিয়ে রাখলো।তখন ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসছে রমার গলা আর দিয়ার খিলখিল করে প্রাণখোলা হাসি....
-ওরা ভিতরে তো দারুণ গল্প জমিয়ে নিয়েছে।আমি ভিতরে আছি নীলিমা দেবী!
-হ্যাঁ,বসুন।আমিও এক্ষুণিই আসছি....
-আচ্ছা!
সত্যিই চায়ের জল প্রায় শুকিয়ে এসেছে।আবার জল চাপিয়ে দুটো প্লেটে মিষ্টি-কুঁচো নিমকি সাজাতে থাকে নীলিমা।দিয়া নারকেল নাড়ু খেতে বড্ড ভালোবাসে,সেদিন সামনের ফ্ল্যাটের বউদি কতগুলো নাড়ু আর আমিত্তি দিয়ে গিয়েছিলো দিয়াকে,তারপরই মেয়েটার শরীরটা খারাপ হওয়ায় সব ধরে রেখে দিয়েছিলো নীলিমা।আজ সে সবই এক-এক করে প্লেটে সাজিয়ে ফেললো ও।সেই সঙ্গে রমার আনা মিষ্টিও কিছু দিলো।কারণ ওর বাড়িতে তো আর তেমন কিছু মিষ্টি ছিল না।চায়ের জল ফুটে গেছে,সসপ্যানে চা-পাতা দিয়ে দিলো নীলিমা....সব ট্রে-তে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকলো ও....
-আরে বাপরে!আপনি করেছেন কি!আঁৎকে ওঠে সৈকত।
-এ কিন্তু তোমার বড্ড বাড়াবাড়ি নীলিমা,আমি এসেছি অসুস্থ মেয়েটাকে দেখতে,পেটপুজো করতে তো আসিনি!রমা খানিক অভিমান করে বলে।
-আজ প্রথমবার আমার বাড়িতে দিয়াকে দেখতে এলে,এটুকু মুখে না দিলে আমার ভালো লাগবে না রমা।প্লিজ,এটুকু তোমরা খাও...আপনিও নিন না...সৈকতের দিকে একটা প্লেট এগিয়ে দিলো নীলিমা।
গল্পে-গল্পে সেদিনের সন্ধ্যেটা নীলিমার খুব ভালো কাটলো।রমা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর দিকে চেয়েছিলো।ঘরে ঢুকেও চোখে পড়েছে,মনে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দিয়ে গেছে,কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারেনি অজানা একটা ভয়ে,যদি ওর প্রশ্ন নীলিমাকে আবার কোনো আঘাত দিয়ে ফেলে।রমার কোলে আধশোয়া হয়ে একটা মিষ্টি খাচ্ছিলো দিয়া।সৈকত কয়েকটা নিমকি মুখে দিয়ে সবে চায়ের কাপে একবার চুমুক দিয়েছে,সেই সময়ই নীলিমা রমাকে প্রশ্নটা করে ফেললো,
-তুমি যদি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাও,করতে পারো রমা...
-না মানে...
-অনেকক্ষণ ধরে তুমি ছবিগুলো দেখছো তো,তাই বললাম।আমি বলবো,তুমি কি ভাবছো?
-কি!
-আমাদের দুজনের সঙ্গে দিয়ার কোনো ছবি নেই কেন?
-আমি সত্যিই এটাই ভাবছিলাম নীলিমা।কিন্তু আমি তো ঠিক জানি না,তোমার মনের কোথায় কি আঘাত লুকিয়ে রয়েছে,আমার কথায় আবার নতুন করে তারা জেগে উঠবে কিনা!তাই আর কি...
-আমার আর কষ্ট হয় না রমা।বিশ্বাস করো,প্রথম-প্রথম খুব হতো!আজকাল কম হয়...দিয়া বড়ো হচ্ছে তো!জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলো একটু-একটু করে বদলে যাচ্ছে...
-হুম,বুঝতে পারছি!
-তোমার মনে যে প্রশ্নটা ঘোরাফেরা করছে,আমার ঘরে কেউ এলে সেটাই আগে জিজ্ঞেস করে।জানো রমা,আমি আর রণ ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম।আমায় ওর বাড়ি থেকে মেনে নেয়নি,আর্থিক দিক থেকে তো আমরা ওদের সমকক্ষ নই!কিন্তু অভিজাত পরিবারের সন্তান রণজয় আমার হাত ছাড়েনি জানো!!আমাকে বিয়ে করে ও ঘর ছাড়ে।ও বড্ড ভালোবাসতো আমায়,সবসময় রণ বলতো,"আমার নীলু"...
আর একটু হলেই বিষম খেতে যাচ্ছিলো সৈকত,রান্নাঘরে নীলিমার অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়ার কারণটা এবার ওর কাছে একদম স্পষ্ট হয়ে গেলো,"আমার রমা" কথাটা বলে,সৈকত ওকে অজান্তেই আঘাত করে ফেলেছে!চায়ের কাপে আরও একবার চুমুক দিয়ে নীলিমার মুখের দিকে চাইলো ও।নীলিমা তখনও বলে চলেছে,
-বাবা মারা গিয়েছিলো আমাদের বিয়ের অনেক আগেই।রণ বলেছিলো,বিয়ের পর বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবে,তখন দুজনেরই নতুন চাকরি।মা বললো,আমার ফ্ল্যাটটা তো ফাঁকাই পড়ে রয়েছে,আমি একাই ঘরগুলো আগলে পড়ে থাকি,তোমরা বরং এখানেই থাকো।আমি ভেবেছিলাম,ও হয়তো রাজি হবে না,কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও এককথায় রাজি হয়ে গেছিলো।বাবা এই ফ্ল্যাটটা করে রেখে গিয়েছিলো,আর আমায় পড়াশোনা করানো,নিজেদের চিকিৎসার পর খুব বেশি কিছু রেখে যেতে পারেননি।রণজয় আমাদের পাশে এসে দাঁড়ালো বিয়ের পর।কোনোদিন ওর মা আর একবারও আমাদের খোঁজ-খবর নেয়নি!!আমিও ওকে আগলে রাখার চেষ্টা করতাম সবসময়!প্রথম থেকেই একটা মেয়ের জন্য পাগল ছিল রণ!যেদিন প্রথম ও জানতে পারলো,ও বাবা হবে,আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলো।ডাক্তার হিসেব করে বললো,আমরা পুজোর মধ্যে হয়তো নতুন অতিথিকে আমাদের মধ্যে আশা করতে পারি।তখনই রণ নাম ঠিক করে ফেললো তার,"শারদীয়া!"যেন ও জানতোই,যে মেয়েই হবে...
রমার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা জল।একটু ঝুঁকে দিয়ার কপালে একবার গভীরভাবে চুমু খেলো ও।নীলিমা বলে চলেছে,
-একটু জটিলতা ছিল আমার,রণ বললো,ও সব সামলে নেবে,এই মেয়ের জন্য আমি এককথায় ছেড়ে দিলাম চাকরি!জানো রমা,অপারেশন করে ওর ডেলিভারি হয়েছিলো,যেদিন ওকে আমার কোলে দিলো,আমি যেন কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।সামান্য মনে আছে,মা আমার বেডের পাশে হাসিমুখে বসেছিলো,আর রণ ঝুঁকে পড়েছিলো পাশের ছোট্ট-বিছানাটার ওপর।আজও ওর ওই আবছা-আবছা হাসিমুখটাই মনে আছে আমার।ব্যাস,ওই ওর সঙ্গে শেষ দেখা,তারপর সব শেষ!
-মানে?!
-ডাক্তার কিছু ওষুধ-ইঞ্জেকশন লিখেছিল,হসপিটালের নীচের ওষুধের দোকানে একটা ওষুধ তখন ছিল না।তাই ও হসপিটালের উল্টোদিকের ওষুধের দোকানটায় ওষুধ আনতে গিয়েছিলো।ওষুধ নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা ট্রাক একেবারে....
নীলিমার আর বলার ক্ষমতা নেই।দমবন্ধ হয়ে আসছে সৈকতেরও।চায়ের কাপটা কাঁপা-কাঁপা হাতে বিছানার পাশের ছোট টেবিলটায় নামিয়ে রাখলো ও।বুকের ভিতর ভীষণ একটা চাপা কষ্ট হচ্ছে।নীলিমা ধরা গলায় বলে উঠলো,
-সেদিন কেন ঘুমিয়ে পড়লাম বলোতো রমা,আর একটু জেগে থাকলে তো রণ-কে আর একটুক্ষণ দেখতে পেতাম বলো!!আর কোনোদিনও পাবো নাগো আমার রণ-কে!জ্ঞান ফেরার পর দেখলাম,মা হাউহাউ করে কাঁদছে!মা-কে সামলাতে গিয়ে,ছোট্ট তুলোর-দলার মতো মেয়েটাকে সামলাতে গিয়ে,আমি নিজের সবটুকু কান্না গিলে ফেললাম জানো রমা!আমি একটুও কাঁদতে পারিনি গো সেদিন!
এবার আর নিজেকে সামলাতেই পারলো না নীলিমা!কথা বলতে-বলতেই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললো ও....
-মা কাঁদছে কেন আন্টি!!বাবার কথা বলতে গেলেই মা শুধু কাঁদে!আমার একটুও ভালো লাগে না মা কাঁদলে....
দিয়া উঠে বসলো রমার কোল থেকে!রমা এগিয়ে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো নীলিমাকে।এতদিন বুঝি নীলিমা কোনো বিশ্বাসযোগ্য অবলম্বন পায়নি আঁকড়ে ধরার মতো।আজ সামান্য একটু ভরসার আশ্বাস পেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁকড়ে ধরলো রমাকে।নিজের মাথাটা ওর বুকে গুঁজে দিয়ে হু-হু করে কেঁদে উঠলো ও....
মৃত্যু সর্বদাই বেদনাদায়ক।কিন্তু মেয়ের জন্মের দিন স্বামীর মৃত্যু!!এত মর্মান্তিক মৃত্যু কি কোনো নারী মেনে নিতে পারে!!মাতৃত্ব আর বৈধব্য যেন একে-অপরের হাত ধরে নীলিমার জীবনে এসেছে।একইসাথে নারীত্বের পূর্ণতা আর শুন্যতা!!এমনটা যেন পৃথিবীর কোনো নারীর সঙ্গে না হয়!সৈকতের আর সহ্য হচ্ছে না নীলিমার এই বুকফাটা আর্তনাদ!ওর নিজের চোখদুটোও জ্বালা করছে।দিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ডাইনিংয়ের দিকে,ও-ঘর থেকে তখনও ভেসে আসছে নীলিমার বুকফাটা হাহাকার....
(চলবে...)
উপন্যাসটি আংশিকভাবে (প্রথম দশটি পর্ব) প্রকাশিত হবে। সংগ্রহে রাখতে whatsapp করতে পারো পাঠকবন্ধুর নম্বরে - 7439112665
এছাড়াও পাবে ফ্লিপকার্ট ও আমাজন-এও। ❤️💙

বাংলাদেশ থেকে পাওয়া যাচ্ছে: Indo Bangla Book Shop - +880 1556-436147 

ত্রিভুজ (প্রথম পর্ব)


 


ত্রিভুজ
সাথী দাস
প্রথম পর্ব


 

-এবার কিন্তু আমার একটা মেয়েই চাই বলে দিলাম!নিজেকে উন্মুক্ত করতে-করতে রমা বললো!
হেসে ফেললো সৈকত।তারপর রমাকে কাছে টেনে নিয়ে বললো,
-আচ্ছা,এটা কি তোমার-আমার হাতে বলো তো!মেয়ে তো আমিও চাই।প্রথম থেকেই চাই!
-না,আমার মেয়েই চাই,তার জন্য যা করার দরকার তুমি করো,প্লিজ...রমা আদুরে গলায় বলতে-বলতে অনাবৃত নিজেকে মিশিয়ে দিলো সৈকতের বুকে....
সৈকত বললো,
-আচ্ছা দেখা যাক!বলেই নিজেই পুরু ঠোঁটদুটো মিশিয়ে দিলো রমার ঠোঁটে...
বি.কে চৌধুরী অর্থাৎ বসন্ত কুমার চৌধুরীর একমাত্র ছেলে সৈকত।শহরের সবচেয়ে প্রাচীন ও অভিজাত পরিবারগুলোর নাম যদি নেওয়া হয়,তবে সর্বপ্রথম চৌধুরী পরিবারের নামই আসবে,আর আসবে ঐতিহ্যবাহী বি.কে.ম্যানশনের নাম।বি.কে সন্স এন্ড জুয়েলারী হাউসের একমাত্র উত্তরসূরী সৈকত।বসন্তবাবুর বাবা এই স্বর্ণ-ব্যবসার সূচনা করেছিলেন,পরবর্তীকালে বসন্তবাবুর হাত ধরে ফুলে-ফেঁপে ওঠে সেই ব্যবসা।বাবা মারা গেছেন অনেক বছর হয়ে গেছে।তিনি এখন বাড়ির ড্রইংরুমে এবং শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তিন-চারটে শো-রুমের দেওয়ালে ফটোর মধ্যে ঝুলে থাকেন,আর সেখান থেকেই নিজের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মকে আশীর্বাদ করেন।একমাত্র ছেলের বিয়ে দেখে যাওয়ার সৌভাগ্যটুকুও বসন্তবাবুর স্ত্রীর হয়নি।ছেলের বিয়ের বছর তিনেক আগেই বসন্তবাবুর স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে।তাই নিজের মনের মতো বৌমা পছন্দ করে,দাঁড়িয়ে থেকে তিনিই ছেলের বিয়ে দিয়ে নিজের কর্তব্য সম্পন্ন করেন।শ্বশুরের মুখে রমা শুনেছে,এ বংশে নাকি কোনো মেয়ে নেই।রমার শ্বশুরও একটিই ছেলে,তবে তার একটি পিসি-শাশুড়ি ছিল,কিন্তু মাত্র ন-বছর বয়সে তিনি কোনো অজ্ঞাত কারণে মারা গেছেন।তারপর থেকে বসন্তবাবু একাই এই পরিবারের উত্তরসূরী,আর ওনার পর এখন সৈকত!
বিয়ের দু-বছর পর রমা আর সৈকতের কোল আলো করে তাদের প্রথম সন্তান আসে,পুত্রসন্তান!অথচ,গর্ভে সন্তান আসার পর থেকেই প্রতিটা দিন রমা ঠাকুরের কাছে মাথা খুঁড়ে মরেছে মেয়ে-সন্তানের জন্য।ও নিজে তো বটেই,সৈকতও পাগল একটা ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্য!কিন্তু বিধি বাম!হসপিটালে ছেলে হয়েছে দেখে প্রথমে চোখে জল এসে গিয়েছিলো রমার।কিন্তু একটু সুস্থ হওয়ায় পর যখন সদ্যজাতটিকে ওরা রমার কোলে দিয়ে গেলো,সে তার গোটা হাতটা দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলো রমার একটা আঙুল!তখন হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিলো রমা,বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলো ছেলেটিকে,তার প্রথম সন্তানকে!কি অদ্ভুত মায়াময় মুখটা,সারা পৃথিবীর সব শান্তি,সব সুখ,সব সারল্য,মাতৃত্বের সব অহংকার যেন ওই একরত্তি মুখটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।ওদের দুজনকে বুকে টেনে জড়িয়ে ধরেছিলো সৈকতও,ওর চোখেও তখন আনন্দের অশ্রু,প্রথমবার পিতৃত্বের গর্বে তখন পরিপূর্ণ পুরুষ সে....
প্রথম সন্তান জন্মাবার বছর দুয়েক পর থেকেই আবার দ্বিতীয় সন্তানধারণের জন্য উদগ্রীব হয়েছে রমা।একাধিক প্রচেষ্টার পর,একাধিকবার মিলনের পর, তৃতীয় মাসের শেষে একদিন সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে মাথাটা টলে গেলো রমার।প্রতিমাসের মতো এবার আর রমাকে মাসিক রক্তপাতের সম্মুখীন হতে হলো না।কম্পিত বুকে প্রতীক্ষার একটা-একটা করে দিন কাটছে,আসবে তো!এবার সে আসবে তো!দিন পনেরো কেটে গেলো,তাও রমার জরায়ুপথ বেয়ে ধেয়ে এলো না প্রতিমাসের কাঙ্খিত রক্তস্রোত!আনন্দের সীমা রইলো না রমার।সৈকতকে গিয়ে জানালো ও!পরদিনই সৈকত ক্লিনিকে নিয়ে গেলো রমাকে।কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তার সুখবর দিলো ওদের।হ্যাঁ,আবারও মা হতে চলেছে রমা।সৈকতের আর আনন্দের সীমা রইলো না...
দুরু-দুরু বুকে একটা-একটা মাস কাটছে।এমন কোনো জায়গা নেই,যেখানে রমা একটা মেয়ের জন্য মানসিক করে রাখেনি!ওর পাগলামি দেখে সৈকতও মাঝে-মাঝে হেসে ফেলে।তারপর ওকে বলে,
-এত উত্তেজিত হয়ো না রমা,সবকিছুর জন্য নিজেকে তৈরী রাখো।ছেলেমেয়ে বাদ দাও,ঠাকুরকে শুধু এটা বলো যে,যেই আসুক,ছেলে বা মেয়ে,সে যেন সুস্থ থাকে!সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসতে পারে,আর সর্বোপরি আমার তুমি যেন সুস্থ থাকো।প্রথম সন্তানের সময় মেয়ে-মেয়ে করে সৈকতের যে পাগলামিটা ছিল,এবার আর সেটা নেই।সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে অনেকটা পরিণত সে।কিন্তু এবার যেন রমার স্বাস্থ্য একটু বেশিই ভাঙছে!চোখের কোলে গভীর কালি!ভীষণ ক্লান্ত দেখায় ওকে।মাঝে-মাঝে ওর দিকে চেয়ে,সৈকতের বুকের ভিতরটা একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে।একটা মেয়ের জন্য মরে যাচ্ছে রমা।ঠাকুর যেন ওর কোলে এবার একটা মেয়েই দেয়....আদর করে রমাকে কাছে টেনে নেয় সৈকত।ওর দেহের খুব কাছাকাছি আর পৌঁছতে পারে না ও,ওদের মাঝে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে ওদের অনাগত সন্তান!আট মাস অতিক্রান্ত,প্রায়ই মাঝে-মাঝে মাতৃগর্ভ থেকে নড়েচড়ে সে জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্বের কথা....তখন অনেক রাত!একদিকে কাত হয়ে শুয়েছিল রমা।আজকাল আর একদম ঘুম আসে না ওর,দিনরাত পেটের মধ্যেকার প্রাণটা দাপাতে থাকে!সৈকত গত কয়েক মাস ওকে ছুঁয়েও দেখেনি।রমা বুঝতে পারে,ভিতরে-ভিতরে ভীষণ চিন্তিত ও।আজ বেশ অনেকদিন পর সৈকতের বুকের ভিতরে ঢুকে শুয়েছিল রমা।কিন্তু এত কষ্ট হচ্ছিলো,ওর অনাগত সন্তান যেন বুকের ওপরে উঠে আসছিলো,দমবন্ধ হয়ে আসছিলো রমার।কোনোরকমে সৈকতের বাহুডোর থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিলো রমা।উঠে গিয়ে একটু দাঁড়ালো জানলার কাছে।জানলাটা খুলে দিলো,ঘরের ভ্যাপসা গরমটা যেন একটু কমলো।প্রাণভরে শ্বাস নিলো রমা।
-ঘুমাবে না?বিছানা ফাঁকা দেখে সৈকতও উঠে এলো।
-তুমি ঘুমোওনি?
-হুম,ঘুমিয়েছিলাম।হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেলো।তুমি এখনও জেগে রয়েছো কেন?
-ঘুম আসছে নাগো!এবার ভীষণ ভয় করছে জানো?
রমার কথা শুনে কেঁপে উঠলো সৈকতের বুকটা।ওকে জড়িয়ে ধরে সৈকত বললো,
-আমি আছি তো,কিসের ভয়?
-শোনো!আমার মেয়ে সুস্থভাবে পৃথিবীতে আসবে তো?
-তোমরা দুজনেই সুস্থ থাকবে রমা!এত ভেবো না,সবসময় ভালো চিন্তা করো!এসো-ঘুমাবে এসো....
সৈকত রমাকে ধরে বিছানায় নিয়ে যায়....
পাশে তখন বছর তিনেকের ছেলেটা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন....
বেশিদিন আর অপেক্ষা করতে হলো না ওদের।সপ্তাহ তিনেক পরই সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সে পৃথিবীতে এলো।মা ও সন্তান দুজনই সম্পূর্ণ সুস্থ!সৈকত ও রমার প্রথম সন্তান,প্রান্তিকের আর একটি খেলার সঙ্গী হলো,ছোট্ট একটি ভাই,প্রতীক!
নবজাতককে হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলো রমা!সৈকত বুঝতে পারছিল ওর মনের অবস্থাটা,একটা মেয়ের জন্য ও এই কটা মাস কি পাগলামিই না করেছে!কিন্তু এতে তো কারোর করণীয় কিছু নেই!সৈকত নিজেই যখন রমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হাতড়ে বেড়াচ্ছে,সেই সময় ওকে অবাক করে দিয়ে রমা বলে উঠলো,
-ঠিক আছে!ভগবান যখন তাই চায়,তবে তাই হবে।আমিও আমার দুই ছেলের বউকে দুই মেয়ে করে রাখবো!উনি মেয়ে না দিয়ে আমার কাছে জিতে যাবে ভেবেছে!!আর চাইবো না,এবার আমার দুই বউই হবে, আমার দুই মেয়ে!এবার বলো তুমি?ঠিক বলেছি না!!
সাংঘাতিক একটা চিন্তা মাথা থেকে নেমে গেল সৈকতের।রমাকে জড়িয়ে ধরে ও বললো,
-একদম ঠিক বলেছো রমা!!
ততক্ষণে বড়ো নাতিকে কোলে নিয়ে ছোট নাতির মুখ দেখতে চলে এসেছেন ঠাকুরদাদা বসন্ত কুমার চৌধুরীও।আগামী কয়েক দিন চৌধুরী পরিবার মেতে রইলো উৎসবের আমেজে...
বছর চারেক পর....
প্রান্তিক অর্থাৎ ঋক,এবং প্রতীক অর্থাৎ ঋদ্ধি,এই দুই ছেলেকে নিয়ে ভরা সংসার রমার।দিনরাত ছেলেদের পিছনে দৌড়োতে-দৌড়োতে বিধ্বস্ত ও।কিছুদিন ধরে রমার শ্বশুরের শরীরটাও বয়সজনিত কারণে ভালো যাচ্ছে না।সৈকত তাই ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তিত।তাছাড়া এতগুলো শো-রুমের চাপ একসঙ্গে এখন সৈকতের ওপরেই এসে পড়েছে।বাবা আর খুব একটা ব্যবসা-সংক্রান্ত কাজকর্ম দেখতে পারেন না।খুব বড় টাকার কোনো লেনদেন থাকলে,তবেই দোকানে যান উনি।বাকিটা সম্পূর্ণ সৈকতই সামলে নেয়।সেই সকালে বেরিয়ে সারাদিন বাইরে কাটায় সৈকত,একেবারে রাতে ঘরে ফেরে।ছেলেদের সব দায়িত্ব রমার ওপরে ফেলে দিয়েই নিশ্চিন্ত ও।সেদিন,সারাটা দিনের শেষে রাতে সৈকত ফেরার পর,বিছানায় ওর বুকে মাথা রেখে রমা বললো,
-বাড়িতে একা-একা আমার আর সময় কাটে না!তুমি যে সেই সকালে বেরিয়ে যাও,আর ফেরো রাতে।বাড়িতেও তেমন কোনো কাজকর্ম নেই।ঝর্ণামাসিই সবটা সামলে নেয়,বাবার জন্যও আলাদা লোক রাখা আছে।আমি কি করি বলো তো,সারাদিন ভূতের মতো ঘরে বসে-বসে?
-তো আমাকে কি করতে বলছো রমা?আমি মানছি,তোমাকে এখন আর একদম সময় দেওয়া হয় না,কিন্তু আমার দিকটাও একটু বোঝার চেষ্টা করো!আমি নিজেও দোকান-কর্মচারীদের ঝামেলায় নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি....রমার চুলে হাত বোলাতে-বোলাতে সৈকত বললো।
-হুম!বুঝতে পারছি!একটা কথা বলবো?
-আমার সাথে কথা বলার জন্য আবার আমার অনুমতি নিতে হচ্ছে?এতটা দূরত্ব এসে গেছে আমাদের মধ্যে?
সৈকতের কথায় একটু আঘাত পেলো রমা।সত্যিই বড্ড চাপ পড়ে গেছে মানুষটার ওপর,ব্যবসার কাজ সবে শিখতে শুরু করতে না করতেই বড় বেশিই দায়িত্ব এসে পড়েছে ওর ওপর।তাড়াতাড়ি রমা বললো,
-নানা,মানে তেমন কিছু নয় গো,আসলে ওই সেদিন ঋকের স্কুলে গিয়েছিলাম না,দেখলাম,সব মায়েরা কি সুন্দর ছেলেমেয়েদের স্কুলে দিয়ে আসে-নিয়ে যায়,কেউ-কেউ তো আবার বসেও থাকে,একটা গাড়ি আমায় ছেড়ে দেবে?আমিও যাবো।স্কুলবাস ছাড়িয়ে দাও।আমিই এখন থেকে যাবো।একটু সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারলে আমারও খুব ভালো লাগবে।
-আচ্ছা এই ব্যাপার!কিন্তু ঋক আর ঋদ্ধির তো ছুটি হয় আলাদা-আলাদা সময়ে।তুমি ততক্ষণ বসে থাকবে রমা?
-হুম,থাকবো!আগে যখন ছেলেরা ছোট ছিল,তখন ওদের নিয়েই সময় কেটে যেত।এখন ওরা স্কুলে বেরিয়ে যাবার পর আমার যেন আর সময় কাটতেই চায় না!আমার ওখানে ভালোই লাগবে।বাড়িতে একা-একা বসে থাকার চেয়ে,ওখানে বরং সবার সঙ্গে বসে গল্প করতে আমার বেশ ভালোই লাগবে।দাও না গো একটা গাড়ি...দেবে??
-তুমি কিছু চেয়েছো,আর আমি দিইনি,এটা হয়েছে কোনোদিন?
একটু হেসে সৈকতের বুকে মাথা রাখলো রমা।
-কাল আমি গোবিন্দ দাকে বলে দেবো,গ্যারেজ থেকে বের করে একটা গাড়ি ও রেডি করে রাখবে।আমাকে একটা সপ্তাহ সময় দাও,আমি স্কুলে গিয়ে আগে স্কুলবাসের ব্যাপারটা ক্যান্সেল করি,তারপর সোমবার থেকে দুই ছেলে নিয়ে তুমিই যাবে।ঠিক আছে?খুশি তো?
-খুব-খুব খুশি!
-আচ্ছা!বেশ অনেকদিন পর সৈকতের উষ্ণ আদরে,ওর বুকের মধ্যে মোমের মতো গলতে থাকে রমা...
বড়ো ভাই ঋক,আর ছোট ভাই ঋদ্ধি,দুই ভাই সম্পূর্ণ একে অপরের বিপরীত।দুজনের মধ্যে বয়সের পার্থক্য মাত্র বছর তিন-চারেক।কিন্তু মারামারি-ধরাধরিতে ছোট ছেলের জুড়ি মেলা ভার।এই চার বছর বয়সেই মাত্র কয়েকদিন স্কুলে গিয়েই,প্রচুর রিপোর্ট এসে গেছে তার নামে।উল্টোদিকে বড় ছেলেটি অর্থাৎ ঋক মাটির দিকে চেয়ে কথা বলে।পড়াশোনায় দুজনেই সমান তুখোড় হলেও,স্বভাবে দুই ভাই-দুই মেরুর বাসিন্দা!বড়ো ছেলেটিকে নিয়ে কোনোদিন রমাকে কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি,কিন্তু এখন এই ছোটটির জন্য দুদিন বাদে-বাদেই স্কুল থেকে ডাক আসছে বাবা-মায়ের।সৈকত আর রমাকে গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছে প্রিন্সিপালের দরজায়....
সেদিন তো সব সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলো।ঋদ্ধি ওর ক্লাসের একটা মেয়ের ব্যাগ নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ক্লাসের বাইরে,আর সেটা গিয়ে পড়েছে খানিকটা জমে থাকা জলের মধ্যে।কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে স্কুলব্যাগ!আর মেয়েটি চিৎকার করে কেঁদে ফাটিয়ে দিচ্ছে।সেইদিন ছুটির পর আবারও রমাকে গিয়ে দাঁড়াতে হলো ঋদ্ধির ক্লাস-টিচারের সামনে।অনেকগুলো অপ্রিয় কথাই সহ্য করতে হলো রমাকে।যেহেতু ও এখন রোজই স্কুলে আসে,তাই ওর সঙ্গেই কথা বলাটা সহজ!আর সন্তান অন্যায় করলে মাকেই শুনতে হবে!!সৈকত সম্পূর্ণ দায়িত্বটাই এখন ওর ওপর ছেড়ে দিয়ে,নিজে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে।রমা দেখছিলো,যখন ও ম্যামের সঙ্গে কথা বলছিল,তখন একটি বাচ্চা মেয়ে তার মায়ের আঁচল ধরে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।এই ভদ্রমহিলার,অর্থাৎ মেয়েটির মায়ের মুখ চেনা,কিন্তু কখনো কথা হয়নি সামনাসামনি!মহিলাটি রুমাল বোতলের জলে ভিজিয়ে ব্যাগটিতে লেগে থাকা কাদা মুছে-মুছে পরিষ্কার করছিলেন।যদিও মুখে রাগের কোনো অভিব্যক্তি নেই...আলগা কাঠিন্যের চাদরে ঢাকা,বেশ ব্যক্তিত্যময়ী মুখাবয়ব...
রাগে থমথমে হয়ে গিয়েছিল রমার মুখ।ঋদ্ধি মায়ের মুখ দেখে বুঝতেই পেরেছে,আজ বাড়িতে গিয়ে ওর খবর আছে।তাই চুপচাপ দাদার হাত ধরে আসছিল ও।ভুলেও মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলো না।আজ শনিবার হওয়ায় দুই ভাইয়েরই একসঙ্গে স্কুল ছুটি হয়েছে।যাক,তাও দাদা আজ বাঁচিয়ে দেবে!ভয়ে-ভয়ে দাদার দিকে চাইলো ও।জীবনেও দাদাকে "দাদা" বলে ডাকে না ঋদ্ধি,ভাই ডাকে!কারণ,ও নিজেই দাদাগিরি করতে ভীষণ ভালোবাসে যে।রমা বলে-বলে হাল ছেড়ে দিয়েছে।যে যেটা ডেকে শান্তি পায়,সেটাই ডাকুক গে!দুই ভাইয়ের ব্যাপার,দুই ভাই বুঝে নেবে!ঋদ্ধি ভয়ে-ভয়ে ঋকের হাত চেপে ধরলো,
-এই ভাই?
-ভাই,আজ তো তুই আমায় কিছু বলবিই না,কতদিন বলেছি,এসব করিসনা।মা মারবে।তুই শুনিস?যা পারিস কর তুই...
দুরু-দুরু বুকে মায়ের পিছন-পিছন স্কুলের গেট থেকে বেরোলো দুই ভাই...রমা থমথমে মুখে বললো,
-আজ তুমি একবার বাড়ি চলো ঋদ্ধি!আজ তোমায় আমি এমন শাস্তি দেবো....
ভয়ের চোটে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো ঋদ্ধি!রমা এতক্ষণ খেয়ালই করেনি,ওদের একটু পিছনেই সেই ভদ্রমহিলা মেয়েটির হাত ধরে আসছিলেন।ওর কথার মাঝেই উনি বলে উঠলেন,
-থাক দিদি,ছেড়ে দিন!কিছু বলবেন না!বাচ্চা মানুষ করে ফেলেছে,আর করবে না!আর করবে না তো বাবা?
ঋদ্ধি তখনও ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কেঁদেই চলেছে!নাক দিয়ে সর্দি বেরিয়ে যাচ্ছে কাঁদতে-কাঁদতে!রমা বলে উঠলো,
-না দিদি!আপনি জানেন না,কি সাংঘাতিক যন্ত্র আমার এই ছোট ছেলে!আমার এই বড়ো ছেলেকে নিয়ে কোনোদিনও কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি,কিন্তু এই ছোটটাকে নিয়ে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি!!আজ একবার বাড়ি যাই,তারপর তোমার খবর আছে!চলো তুমি...
মায়ের রক্তচক্ষু দেখে ঋদ্ধির কান্নার শব্দ বিপদসীমা অতিক্রম করে গেলো...গলা ছেড়ে রাস্তার মধ্যেই চিৎকার শুরু করে দিলো ও...
ওকে এভাবে কাঁদতে দেখে ওদিক থেকে হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে শারদীয়া,অর্থাৎ যে মেয়েটার ব্যাগ ঋদ্ধি জলে ফেলে দিয়েছিলো।ভাইকে এভাবে কাঁদতে দেখে,শারদীয়ার সঙ্গে-সঙ্গে হেসে ফেললো ঋকও...
-থাক!থাক দিদি!আর কিছু বলবেন না।ও বাবু,এদিকে এসো,কি নাম তোমার?
নাক টানতে-টানতে প্রতীক বললো,
-প্রতীক কুমার চৌধুরী!
-ওবাবা!অনেক বড় নাম তো!আমি তো আমার নিজের নামই মনে রাখতে পারি না,তোমার এতবড় নাম কি করে মনে রাখবো?
একটু হেসে ফেললো প্রতীক!
-মা,তুমি ওকে খুব বকো,মারো ওকে,ও আমার ব্যাগ ভিজিয়ে দিয়েছে!
-নানা দিয়া,থাক-থাক!ও না বুঝে ভুল করে ফেলেছে,আর করবে না,তাই না প্রতীক?
-সরি দিয়া!আর হবে না!ফ্রেন্ডস?শারদীয়ার দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিলো প্রতীক।
এক-পা এক-পা করে এগিয়ে এলো শারদীয়াও।
-ওকে!ফ্রেন্ডস!
হাত মেলালো ঋদ্ধি এবং দিয়া...
দুজনে দৌড়াদৌড়ি করে সবে খেলা শুরু করতে যাচ্ছিলো,কিন্তু শারদীয়ার মা ওকে ডেকে নিলো,ওনার দেরি হয়ে যাচ্ছে!
-আপনি কোনদিকে যাবেন দিদি?আমি ছেড়ে দিচ্ছি চলুন...
-নানা!তার কোনো দরকার নেই।আমি অটো নিয়ে নিচ্ছি!
-আচ্ছা,আপনি কোনদিকে যাবেন সেটা তো বলুন?রমা বললো।
-আমি বাজারের দিকেই যাবো।মোড় থেকে আরও একটু ভিতরের দিকে...
-ওমা!আমিও তো তার খানিকটা আগেই নামবো!চলুন,চলুন।আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছি।চিন্তা নেই,আমি আমার বাড়িতেই যাবো।ওটুকু আপনি না হয় হেঁটেই চলে যাবেন।নিন-নিন,উঠুন....
ঋদ্ধি আর দিয়া তখন নিজেদের মধ্যে খেলায় মত্ত,ঋকও যোগদান করেছে ওদের সঙ্গে।ওরা হাততালি দিয়ে খেলতে শুরু করে দিয়েছে।শারদীয়ার মা তখনও যাবেন কিনা ভাবছেন,আবারও রমা বলে,
-ও দিদি!অত ভাবতে হবে না,উঠে আসুন...বলে নিজে আগে গাড়িতে উঠে ওনাকে জায়গা করে দিলো রমা।
তাও উনি ভাবছেন দেখে প্রান্তিক এগিয়ে এসে এবার বলে উঠলো,
-আন্টি!চলো!
-হ্যাঁ!বাবা!কিরে,তোরা দুটোতে আগে ওঠ!খেলা পেলে আমার মেয়েটা আর কিচ্ছু চায় না গো দিদি...কি বলবো আপনাকে,একটুও পড়ার দিকে মন নেই...আমিও সারাদিন পর অফিস থেকে ফিরে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ি...
-ও দিদি,আপনি চাকরি করেন?
-হ্যাঁ দিদি...
-আচ্ছা-আচ্ছা!গোবিন্দদা,চলো!
-হ্যাঁ বৌমনি!দরজা ঠিক করে সব লাগানো তো?
-হ্যাঁ-হ্যাঁ!চলো...
-কোথায় চাকরি করেন দিদি.....
কথায়-কথায় কখন যে ওদের গন্তব্য চলে এলো,ওরা খেয়ালও করতে পারেনি।তার মধ্যে তিনটি ছেলে-মেয়ে গাড়ির ভিতর এমন হুল্লোড় করে চলেছে,যে কান পাতা দায়!ওদের গাড়িটা বাড়ির গেটে ঢুকে যাওয়ার আগে শারদীয়াকে নিয়ে ওর মা নেমে গেলো।রমা মুখ বাড়িয়ে বললো,
-আজ কিন্তু আমার বাড়ির দরজা দিয়ে ফিরে গেলেন দিদি,একদিন কিন্তু ভিতরে এসে চা-জলখাবার খেয়ে যেতেই হবে!
-বেশ-বেশ!সে হবেখন একদিন...আসি দিদি?
-আচ্ছা!আসুন...
-ও দিদি!এতক্ষণ কথা বললাম,আপনার নামটাই তো জানা হলো না!রমা চেঁচিয়ে ডেকে উঠলো নীলিমাকে।
-নীলিমা!নীলিমা মজুমদার!একটু হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে শারদীয়ার মা বললো।
-আচ্ছা দিদি!এর পরের দিন কিন্তু মেয়ে সমেত আপনাকে বাড়িতে নিয়ে আসবো।তখন কিন্তু কোনো কথা শুনবো না।
-আচ্ছা দিদি!আসবোখন!আজ আসি?
-আচ্ছা....
-টাটা!!
গাড়ির জানলা দিয়ে প্রান্তিক আর প্রতীক হাত নেড়ে শারদীয়াকে বাই করে দিলো...
রমার গাড়িটা বি.কে.ম্যানশনের সিংহদুয়ার পেরিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলো।
যতক্ষণ ওদের গাড়ির মধ্যে ছিল,নীলিমার কেমন যেন একটু কুণ্ঠাবোধ হচ্ছিলো,বাধো-বাধো লাগছিলো।আসলে নিজে তো জীবনে অনেক কষ্ট করে,অনেক লড়াই করে একমাত্র মেয়েটাকে বড়ো করে তুলছে,এতটা উচ্চবিত্ত পরিবারের সামনে ও ঠিক খোলামনে দাঁড়াতে পারে না।ভীষণ ছোট মনে হয় নিজেকে।তাই স্কুলেও খুব একটা বেশি কারোর সঙ্গে ও কথা বলে না।সব মায়েদের অনেক বড়-বড় গল্প,নীলিমা ঠিক খাপ খাওয়াতে পারে না ওসবের সঙ্গে।শারদীয়াকে বড়ো ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর জন্য নীলিমাকে দিনরাত এক করে খাটতে হয়,ওর জীবনযুদ্ধটা আর সবার থেকে অনেকটাই আলাদা!কিন্তু এই প্রথম রমার সঙ্গে কথা বলে,ওর খুব ভালো লাগলো।এদের যে কতগুলো সোনার দোকান আর বাজারে আরও কতরকম ব্যবসা আছে,তার হিসেব নেই।কিন্তু এতটুকু অহংকার নেই রমার মধ্যে।নীলিমা একবারও ওকে নিজের গল্প করতে দেখলো না।বাচ্চাদের গল্প নিয়েই অস্থির ও,ভীষণ কথা বলে,আর ভীষণ খোলামেলা মনের মানুষ রমা!শারদীয়াকে তো আদর করে-করে চটকে দিলো একেবারে।বারবার আফসোস করছিলো,বাড়ির দরজা থেকে এভাবে খালি মুখে মেয়েটা চলে যাচ্ছে বলে!আন্তরিকতার অভাব নেই রমার মধ্যে!শারদীয়াকে আদর করার সময় চোখে জল এসে গিয়েছিলো রমার, নীলিমার চোখ এড়ায়নি সেটা।কিন্তু এত সুখী একজন নারীর কিসের কষ্ট থাকতে পারে!!ভেবে পায়না নীলিমা!যাইহোক,শারদীয়াকে একটু বলে দিতে হবে,এরপর ছুটির পর ও যেন একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে।নইলে রমা আবার ওদের গাড়িতে তুলবে,বাড়িতে নিয়ে যাবে।ওদের সঙ্গে নীলিমাদের খাপ খায় না মোটেই।তাই তিক্ততা বাড়ার আগে,সম্পর্ক ভালো থাকতে-থাকতেই,দূরত্ব রেখে চলা ভালো।কারণ কোনোদিক থেকেই নীলিমা,রমার সমকক্ষ নয়।আর যেকোনো সম্পর্ক সবসময় সমানে-সমানে হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়,নইলে নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হয়।রাস্তাঘাটে ওদের সঙ্গে বেরিয়ে,ওদের মতো দু-হাত ভরে খরচ করার করার সামর্থ্য নীলিমার নেই।সেক্ষেত্রে ভীষণ সম্মানহানি হয়!আর নীলিমা জীবনে দুটো জিনিসকেই আঁকড়ে বেঁচে রয়েছে,এক শারদীয়া,আর দ্বিতীয়,নিজের আত্মসম্মানটুকু....তবে রমাকে নীলিমার বেশ লেগেছে।প্রথম আলাপেই ভীষণ ভালো মনের মানুষ মনে হয়েছে ওনাকে....রমার কথা ভাবতে-ভাবতেই ছোট্ট একরত্তি ফ্ল্যাটের তালা খুললো নীলিমা...
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নীলিমা একরকম রমাকে এড়িয়েই চলেছে।শারদীয়া বেরোনোর পরই তাড়াতাড়ি করে নীলিমা ওকে নিয়ে গেটের বাইরে বেরিয়ে এসেছে।কিন্তু সেদিন আর পালাতে পারলো না।একেবারে খপ করে ওকে চেপে ধরলো রমা।নীলিমা চলেই আসছিল,পিছন থেকে চেঁচালো রমা,
-ও দিদি,দাঁড়ান একটু!আপনার সঙ্গে কথা আছে!
এবার শুনেও না দাঁড়ালে ব্যাপারটা ভীষণ দৃষ্টিকটূ হয়ে যায়।অগত্যা দিয়ার হাত ধরে স্কুলের বাইরে রমার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো নীলিমা।
-বাবা!দিদি,কদিন আপনাকে দেখতেই পাইনি।ঋদ্ধিকে আমি প্রতিদিন জিজ্ঞেস করতাম,হ্যাঁরে আজ শারদীয়া স্কুলে আসেনি?ও তো হ্যাঁ বলতো।কিন্তু আপনাকে আর দেখতেই পেতাম না।কখন যে বেরিয়ে যেতেন!
"কেউ ইচ্ছে করে হারিয়ে থাকলে,ভিড়ে মিশে থাকলে, তাকে খুঁজে পাওয়া তো অত সহজ নয় দিদি!"
মনে-মনে নীলিমা বললো।ওদিকে রমা তখন একনাগাড়ে বলেই চলেছে,
-দিদি,আগামী রবিবার আমার ছোট ছেলে ঋদ্ধির পাঁচ বছরের জন্মদিন,আপনি কিন্তু আপনার কর্তাকে নিয়ে,শারদীয়াকে নিয়ে অবশ্যই আসবেন।আমি আপনার বাড়ি গিয়েই বলতাম,কিন্তু আপনার বাড়ি তো চিনিই না!কি করে....কি ব্যাপার দিদি?আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?
-আমি আসি দিদি,পরে কথা হবে!চোখ থেকে জলটা প্রায় বেরিয়েই এসেছিলো,তাই একরকম পালাতেই চাইছিলো নীলিমা!
সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়ালো রমা।
-আপনি আমার সঙ্গে বাড়ি যাবেন!কি হয়েছে দিদি আপনার?
আজ আর কথা বলার ক্ষমতা নেই নীলিমার।সারাটা শরীর অবশ হয়ে গেছে।অন্য সময় নিজেকে ভীষণ কঠিন করে রাখে ও,বাইরের সমাজের কাছে।কিন্তু আজ রমা না জেনেবুঝে এমন একটা জায়গায় আঘাত করে দিয়েছে,ও আর নিজেকে সামলাতেই পারছে না!
রমার সঙ্গে চুপচাপ গিয়ে গাড়িতে উঠলো নীলিমা।
-কি ব্যাপার দিদি?আমার কোনো কথা কি আপনাকে খুব কষ্ট দিয়েছে?রমা বললো।
সর্বদাই ফুলহাতা ব্লাউজ পরে নীলিমা।তাই চট করে চোখে পড়ে না।কপালটাও আলগা উড়ো চুলে ঢাকা থাকে!হাতদুটো বের করে রমার চোখের সামনে আনলো ও।নীলিমার ডানহাতে একটা ঘড়ি পরা,আর বাঁ-হাতটা খালি!চমকে উঠলো রমা।
-দিদি!!
-আমার কর্তা আসতে পারবে না দিদি।উনি নেই....
স্তব্ধ হয়ে গেলো রমা।আর একটাও কথা বলতে পারলো না ও।চমকে উঠলো গোবিন্দদার কথায়...
-বৌমনি!বড়োদাদাবাবুর জন্য অপেক্ষা করবে তো?
-না গোবিন্দদা!তুমি আজ আমাদের নিয়েই বাড়ি চলো।পরে তুমি গাড়ি নিয়ে এসে ঋককে নিয়ে যেও।ও আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বোলো,আমার শরীরটা একটু খারাপ লাগছিলো,তাই আমি চলে গেছি!
-আচ্ছা বৌমনি!
গাড়ি চলতে শুরু করলো।
রমা অবাক হয়ে শারদীয়ার মুখের দিকে চাইলো।ততক্ষণে ও খেলায় মেতেছে ঋদ্ধির সঙ্গে।এতটুকু মেয়েটার বাবা নেই!!বাবার স্নেহ-ভালোবাসা কি বুঝলোও না!চোখে জল এসে গেলো রমারও...
-আমি আজ আর কিচ্ছু জানতে চাইবো না দিদি,কিভাবে কি হয়েছে!আমি অজান্তে আপনাকে যে আঘাত দিয়ে ফেলেছি,তার জন্য....
-রমা!মানে দিদি,আপনি কেন কষ্ট...
-নামটাই থাক না,আপনিতেও বড্ড পর লাগে,তুমিই চলুক নীলিমা...
-হুম!বেশ!
নীলিমার শুন্য হাতের ওপর নিজের শাঁখা-পলা-বালা পরা একটা হাত রাখলো রমা।ব্যথিত হৃদয়ে যতটুকু সান্ত্বনার প্রলেপ দেওয়া যায় আর কি....
গাড়ি থেকে মেয়েকে নিয়ে নেমে যাচ্ছিলো নীলিমা।ওর হাতটা ধরলো রমা,
-নীলিমা,আসবে তো রবিবার সন্ধ্যেবেলায়?শারদীয়া এলে আমার খুব ভালো লাগবে।
-আমি সত্যিই আসবো রমা!আমার মেয়েটার তো তেমন কোথাও যাওয়ারও জায়গা নেই!আমি আসবো ওকে নিয়ে!কথা দিচ্ছি!!
-আমি খুব খুশি হলাম নীলিমা!তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবো...
-আচ্ছা!আসি...
-হুম!
নীলিমা চলে গেল শারদীয়ার হাত ধরে।রমা কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো ওদের চলে যাওয়ার দিকে।ওর বুকের ভিতরটা একটা অজানা কষ্টে মুচড়ে উঠলো।সৈকতের মুখটা মনে পড়ে গেলো ওর,সৈকতকে ছাড়া ও তো নিজেকে কল্পনাও করতে পারে না!না জানি নীলিমা কিভাবে এতবড় জীবনটা একা কাটাবে....
সারাটা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে গা ধুয়ে একটা তোয়ালে পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালো নীলিমা।বিছানায় অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে দিয়া।চুলটা খুলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসলো ও।ভিজে চুলের আগা থেকে জল বেয়ে পড়ছে,ওর সারাটা শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।রাস্তাঘাটে-অফিসে পুরুষের প্রশংসনীয় চোখ বারবার ওকে বলে দিয়েছে,ও যথেষ্ট সুন্দরী!অফিস কলিগ অরণ্য আজও ওর জন্য অপেক্ষা করে আছে।কিন্তু ও যে কিছুতেই রণজয়ের জায়গায় কাউকে বসাতেই পারে না,অরণ্যকেও না।কোনদিন এমন কোনো পুরুষ কি পাওয়া সম্ভব,যে রণ-কে ভুলিয়ে রাখতে পারবে!ও শেষ হয়ে যাচ্ছে ধীরে-ধীরে...মা চলে যাওয়ার পর আরও একা হয়ে গেছে ও।বুকে আগলে এখন মানুষ করছে শারদীয়াকে।কিন্তু দিনের শেষে ও কি করে ভুলবে,ও অবশ্যই শারদীয়ার মা,কিন্তু সেই সঙ্গে-সঙ্গে একজন অসম্পূর্ণ নারীও...
আয়নায় নিজের অর্ধঅনাবৃত প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো নীলিমা।নিজের দু-হাতে আর খোলা উরুতে একটু ক্রীম মাখতে শুরু করলো ও....
রবিবার সকাল থেকেই শারদীয়ার অল্প-অল্প গা-টা গরম!ঋদ্ধির জন্য শনিবারই উপহার কিনে রেখেছিলো নীলিমা।কিন্তু মেয়েটার যা শরীর খারাপ,যেতে পারলে হয়!কিন্তু বিকেল থেকেই দেখা গেলো নীলিমার থেকে শারদীয়ারই যাওয়ার উৎসাহটা বেশি।জ্বরটা একটু ছেড়েছে দেখে নীলিমাও তৈরি হতে লাগলো।ওকে খাবার খাইয়ে,ওষুধ খাইয়ে নিয়ে বেরোতে বেশ খানিকটা রাতই হয়ে গেলো।রমাকে কথা দিয়েছিলো নীলিমা।তাই না গেলে ও খুব কষ্ট পাবে।বেগুনি রঙের একটা শাড়ি পরেছে নীলিমা,সঙ্গে ফুলহাতা ব্লাউজ,আর ডানহাতে ঘড়ি।দু-চোখে গাঢ় করে কাজল,আর চুলটা একটু আলগা করে খোঁপা,ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক!বরাবরই একটু হালকা সাজেই অভ্যস্ত ও।আর রণ চলে যাওয়ার পর তো সাজার ইচ্ছেটুকুও মরে গেছে।এখন সমাজে পাঁচজনের মাঝে চলতে গেলে নিজেকে যেটুকু গুছিয়ে রাখতে হয়,সেটুকুই করা আর কি!একেবারে তৈরী হয়ে বেরোবার সময় একবার আয়নার দিকে তাকালো নীলিমা।নিজেই নিজের রূপ দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো ও।এই শাড়িটা প্রথম বিবাহ-বার্ষিকীতে রণ নিজের হাতে ওকে পছন্দ করে কিনে দিয়েছিলো।রণ-কে ছাড়া নিজের রূপ-যৌবন সব যেন বড্ড ফ্যাকাশে,বড্ড ধূসর মনে হয়!কোনোরকমে চোখের জলটা চেপে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এলো ও।রমার বাড়ির সামনে শারদীয়াকে নিয়ে নীলিমা যখন রিক্সা থেকে নামলো, তখন রাত প্রায় ন-টা!
তিনতলা বাড়ির বাইরেটা বেশ সুন্দর করে বেলুন দিয়ে সাজানো।কিন্তু নীচে কোনো লোকজন নেই।সব বোধহয় ওপরে।দরজা খোলা দেখে সিঁড়ি দিয়ে উঠলো নীলিমা।সবে কয়েকটা ধাপ উঠেছে,এমন সময় দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলো সৈকত!নীলিমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো ও,কয়েক মুহূর্ত অবাক চোখে চেয়ে রইলো।তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে তাড়াতাড়িই বলে উঠলো,
-আপনি নিশ্চয়ই নীলিমা দেবী?
-হ্যাঁ,কিন্তু আপনি আমায়...
-আমি সৈকত,প্রান্তিক-প্রতীকের বাবা!রমার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি।আজ আপনাকে দেখে বুঝলাম,রমার বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে!ওপরে আসুন,এসো শারদীয়া!
শারদীয়া লাফাতে-লাফাতে আঙ্কেলের হাত ধরে ওপরে উঠে গেলো।সৈকত ওপরে উঠেই চিৎকার করে ডাকলো,
-রমা....
রমা কাদের সঙ্গে গল্প করছিলো,ঘুরে নীলিমাকে দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এলো।ওর চোখের পলক পড়ছিলো না নীলিমাকে দেখে।রমা শুধু একবার বললো,
-তোমাকে কি অসাধারণ সুন্দর লাগছে নীলিমা!চোখই তো ফেরানো যাচ্ছে না!
হেসে ফেললো নীলিমা।সৈকত আরও একবার চোখ তুলে নীলিমাকে দেখে সরে গেলো ওখান থেকে,ও শারদীয়ার হাত ধরে এগিয়ে গেলো ঋক আর ঋদ্ধির ঘরের দিকে...ওদের স্কুলের সব বাচ্চারা ওখানেই আছে...
(চলবে.....)
ছবি: সংগৃহীত
সারপ্রাইজ!!!! ত্রিভুজ! ত্রিভুজ! ত্রিভুজ!💙❤️
ফিরে দেখা ত্রিভুজ। 💕
উপন্যাসটি আংশিকভাবে (প্রথম দশটি পর্ব) পেজে প্রকাশিত হবে। সংগ্রহে রাখতে whatsapp করতে পারো পাঠকবন্ধুর নম্বরে - 7439112665
এছাড়াও পাওয়া যাবে flipkart ও amazon এও।
বাংলাদেশ থেকে পাওয়া যাচ্ছে: Indo Bangla Book Shop - +880 1556-436147

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট