অনুসরণকারী

রবিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৪

খিল নবম পর্ব


 


খিল
সাথী দাস
নবম পর্ব


নাগের বাড়ির অন্দরমহলের বর্তমান উত্থান-পতন তিনজন মানুষকে একেবারেই স্পর্শ করতে পারে না। প্রথমজন হল টুয়া। সে মহানন্দে স্কুলে যায়-আসে, ছবি আঁকার ক্লাসে যায়। জীবনের যত রঙ সব ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে খাতায় আঁকা রামধনু কিংবা আকাশের গায়ে। ছাত্রজীবনের যত ব্যস্ততা সব অতিক্রম করার পর, টুয়ার অবসর সময় কাটে আহ্লাদী আর কাম্মার সঙ্গে। সোনাপিসির বিয়ে ভেঙে যাওয়াতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে টুয়া। পিসি যে আরও কিছুদিনের জন্য নাগের বাড়ির সদস্যা হয়ে থাকতে চলেছে, এটা ভেবেই সে মহা পুলকিত চিত্তে বাড়িময় আস্ফালন করে বেড়ায়। নিভৃতে উত্তরার গলা জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করে, "সোনাপিসির বিয়ে দিতেই হবে কাম্মা?" উত্তরা এ প্রশ্নের কোনো জুতসই উত্তর দিতে পারে না। প্রতিরাতে অঙ্কনের দেহের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সময় ও অনুভব করতে পারে বিবাহের নিদারুণ সুখ।
ভাতৃবিবাদ ও সাংসারিক ডামাডোলের থেকে বহুদূরে উত্তরার অবস্থান। সময়কালে বাক্যের অগ্নিশলাকায় মানুষকে ক্রমাগত বিদ্ধ করার পর, নিতান্তই মূক ও বধির হয়ে যাওয়ার মতো ঐশ্বরিক ক্ষমতা তার মধ্যে বিদ্যমান। শশাঙ্ক উপযাচক হয়ে উত্তরার যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও, নিতান্ত ঠান্ডা লড়াইতে অঙ্কনের সহযোদ্ধা হয়েছিল। মৃগাঙ্কর সঙ্গে দুই ভাইয়ের বাক্যালাপ ও বাদানুবাদ বন্ধ। রান্নাঘরে তৃণার বাক্য নিষ্পেশন বাসনপত্রের ঘর্ষণের চেয়েও অধিক শব্দের জন্ম দেয়। কেবল নিধির মুখে কোনও কথা নেই। মন অত্যন্ত আহ্লাদিত হলে পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রাণকে ছুঁতে পারে না। একনিষ্ঠভাবে সংসারের যাবতীয় কাজ সেরে টুয়াকে নিয়ে ঘরের দোরে খিল এঁটে সে বসে থাকে।
তবে যাকে নিয়ে সংসারে এত গোলযোগ, সেই আহ্লাদীর মতো সুখী মানুষ পৃথিবীতে দুটি নেই। চিলেকোঠার ঘরের খাটের তলায় একটা ছোট পাটের ব্যাগে দুটো চুড়িদার ভাঁজ করে রাখা আছে। সেই সঙ্গে প্রতিবার আয়না দেখার সময় কানের দুলজোড়া, গলার ভারি চেন, হিরের নাকফুল আর আঙুলের তিনটে আংটির দিকে জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে সে নিশ্চিন্ত হয়।
বাড়ির লোক নাকি আহ্লাদীর বিয়ে দেবে! নেহাৎ ছোট বৌদিদি এই বিয়ে ভেঙে দিল। অবশ্য বিয়ে ভেঙে না গেলেও আহ্লাদীর বিশেষ দুশ্চিন্তা ছিল না। এই পাত্রের সঙ্গে হোক, অথবা অন্য কোনও পাত্র.... সবাই মনের আনন্দে করুক না বিয়ের আয়োজন! কিন্তু কনে ছাড়া কি বিয়ে হয়! সময়কালে আহ্লাদীকে কেউ খুঁজে পেলে তো বিয়েটা হবে! বাড়ির লোক যখন সুসজ্জিত পিঁড়ি নিয়ে ওর ঘরে ঢুকবে, তখন উপহার পাবে একগাল মাছি! পরনের শাড়ি-গয়না নিয়ে আহ্লাদী ততক্ষণে বর্তমান প্রেমিকের হাত ধরে পাড়ি দিয়েছে তেপান্তরে। চিলেকোঠার অন্ধকার ঘরে একা শুয়ে বহুবার এই দৃশ্য কল্পনা করে আহ্লাদী অফুরন্ত আনন্দ পেয়ে হেসে উঠেছে নিঃশব্দে।
সময়টা সন্ধেবেলা, নিধির মন বেশ খারাপ। উত্তরার ফিরে যাওয়ার সময় হল। অফিস থেকে আর ছুটি পাওয়া যাবে না। অঙ্কনও ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিকেলবেলা উত্তরা একাই বেরিয়ে পড়েছিল রেলগেট সংলগ্ন বাজারের দিকে। ঘুরে-ঘুরে বাড়ির সকলের জন্য নিজ হাতে অল্পবিস্তর কেনাকাটা করেছে। টুয়াকে আদর করে নতুন জামা ও চকোলেট উপহার দিয়ে খুব খানিক আদর করে দিল উত্তরা। নিধি ধুনুচি হাতে নিয়ে হাসিমুখে ঘরে ঢুকে বলল,
-ও মা ছোট! তুই কখন এলি?
-এই তো মেজদিভাই! সবে এলাম।
-মা দেখো.... কাম্মা আমার জন্য কত খেলনা, নতুন জামা, ক্যাডবেরি এনেছে। এই দেখো ছবি আঁকার নতুন খাতা আর রঙ পেন্সিল.... দেখবে এসো না মা...
-দাঁড়া টুয়া, বিছানায় বসে আমাকে ছুঁয়ে দিস না। সন্ধে দিচ্ছি দেখতে পাচ্ছিস না? তুই করেছিস কী ছোট! সারা খাটের ওপর জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখেছিস! এত টাকা নষ্ট করলি!
-ও কিছু না দিদি। সব তোমাদের না। বাড়ির সবার জন্যই কমবেশি জিনিস আছে। তুমি তাড়াতাড়ি সন্ধে দিয়ে এসো। তোমার জন্যও একটা জিনিস আছে। দেখো দেখি, পছন্দ হয় কিনা!
ঘরময় ঘুরে বাতাসে ভাসমান ধোঁয়ার যাত্রাপথ হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে করতে নিধি বলল,
-হ্যাঁ রে, ঠাকুরপো তোর সঙ্গে যায়নি? দেখলাম বাইকে চেপে ও বাড়ির অবন দাদাভাইয়ের সঙ্গে ঘুরছে। ভাবলাম তুই মাইমা'র বাড়ি গেছিস বুঝি।
-না, ও যায়নি। আমি একাই গেছি। ও কোথায় গেছে আমি জানি না।
-এ কী কথা!
-কেন একা যেতে পারি না? আমি কি বাচ্চা মেয়ে নাকি? সবসময় সঙ্গ না হলে চলতে পারব না! হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দিতে হবে?
-নাঃ! বাচ্চা না, তুই একেবারে বুড়ি। তা বুড়ি হয়ে যাচ্ছিস ব'লে কি নিজের বুড়োটা কোথায় যাচ্ছে, সেই খবরটুকুও রাখবি না? সে দেখি তোকে একেবারে চোখে হারায়! তা ছোট ঠাকুরপোর দোষ দিই কী করে বল! হাজার হোক পুরুষ মানুষ তো! বৌয়ের অমন মাথা ঘুরোনো রূপ থাকলে, সে বেচারা আর কী করবে!
মুখ ফিরিয়ে ফিক করে মৃদু হাসল উত্তরা। নিধিও হাসিমুখে বলল,
-আচ্ছা তুই বোস। ঘর ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে। আমি মায়ের ঘর আর বারান্দায় ধোঁয়া দেখিয়ে শঙ্খতে একটু ফুঁ মেরে আসছি।
-মেজদিভাই চা খাওয়াবে একটু? মাথাটা ধরে আছে। সেই বিকেলে বেরিয়েছি।
-আনছি...
নতুন খাতার ওপর নতুন রঙ পেন্সিল নিয়ে উপুড় হয়ে পড়েছে টুয়া। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উত্তরা জিজ্ঞাসা করল,
-মাকে চা দিয়েছ মেজদিভাই?
-হ্যাঁ রে, দিয়েই ঘরে এলাম। চা নিয়ে বড়দির ঘরের দোরে ধাক্কা দিলাম। খুলল না। এখন সে দরকার ছাড়া নিচে নামে না। কথাও বলে না। দাদাভাই আপিসে যাওয়ার সময় আমাদের মুখ দেখলে ভাবখানা এমন করে, যেন আমরা অযাত্রা! মুখে একটা কথা পর্যন্ত নেই।
-ছাড়ো না.... ক'দিন পর এসব ঠিক হয়ে যাবে। আহ্লাদীর জীবন তো বাঁচল। মেয়েটার জীবন নষ্ট হওয়ার থেকে, এ অনেক ভালো। তুমি চা খাও! এত বেশি ভেবো না।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নিধি বলল,
-ভেবো না বললে কি আর ভাবনা আমাকে ছাড়ে রে? এতদিন একরকম ছিল। এবার তুই চলে যাবি, তারপর আবার কোন মূর্তি ধারণ করবে কে জানে বাপু! তুই কিছু মনে করিস না ভাই!
-কী ব্যাপারে বলো তো?
-এই যে, আহ্লাদীর বিয়ে ভাঙার ব্যাপারে তোকে কত অপমানিত হতে হল! নেহাৎ মা এসে সেদিন কেঁদেকেটে পড়ল ব'লে তাই রক্ষে.... ছোট ঠাকুরপো চিৎকার করে বড়দাভাইয়ের হাত টেনে না ধরলে, বড়দাভাই তো তোর গায়ে হাত তোলার জন্য সিঁড়ি পর্যন্ত দৌড়ে গিয়েছিল। কতবড় সাহস একবার চিন্তা করে দেখ!
-তোমরা বৃথাই এত চিৎকার করলে! আমাকে একবারও ভয় পেতে দেখেছ? আমি তো সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ঐ হাত একটিবার শুধু আমার গালে এসে পড়ত, তারপর বধূ নির্যাতনের দায়ে বাড়িতে পুলিশ ডেকে এনে কোমরে দড়ি পরিয়ে কিভাবে ঘর থেকে টেনে বের করতে হয়, সে আমিও জানি। তাঁকে দাদাভাই ডাকতাম। সেই জায়গা তিনি নিজেই নষ্ট করেছেন। এখন আমারও তাঁকে সম্মান করার কোনও দায় নেই। ভাইয়ের বৌয়ের গায়ে হাত তোলা! তাঁর সরকারি চাকরি কিভাবে খেতে হয়, সে আমিও খুব ভালো জানি। আমার বাবা যে সে মানুষ নয়! তাঁর মেয়ের গায়ে হাত তুলে কেউ পার পাবে না।
-তোর ভাই নিজের টাকার জোর আছে, বাপের ঘরের জোর আছে। তার ওপর তোরা এখানে থাকিসও না। ছোট ঠাকুরপোর পায়ের তলার মাটি শক্ত। তোরা কারও পরোয়া করিস না। তাও তোদের সঙ্গে কেমনধারা ব্যবহারখানা করল দেখলি! তবেই বুঝে দ্যাখ, আমাদের সঙ্গে কী করে! ঘরে ওঁর বৌ করে আমার সঙ্গে। বাইরে ওঁর বর আমাদের ঘরের লোকটার মাথার ওপর পা তুলে চলে! ভয়ে আমি দিনরাত সিঁটিয়ে থাকি। মেয়েটাকে তো মানুষ করতে হবে বল! সে তার মেজ ভাইকে তাড়িয়ে দিলে মেয়েকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব আমি?
-উঁহ.... বললেই হল নাকি! তাড়িয়ে দেবে? দেশে আইন-কানুন কিছু নেই? নাগের বাড়িতে বড়দাভাইয়ের যা অধিকার, মেজদাভাইয়ের যা অধিকার, আমার বরেরও তাই অধিকার। চূর্ণী দি আর আহ্লাদীও সেই একই অধিকার দাবি করবে। তাঁর একার কথায় কিছু হবে নাকি? তেমন কিছু বললে আমাকে একটা ফোন করবে। উকিল নিয়ে এসে সব ভাগ করে দেব উঠোনের মধ্যিখানে দেওয়াল তুলে। উচিত কথা ব'লে ছোট বৌ এমনিতেই খারাপ! এবার উচিত কাজ করে সারাজীবনের মতো খারাপ হোক!
-ও বাবা! একবার ঝগড়ার সময় বিষয় ভিন্ন করার কথা উঠতেই বড়দাভাই বলে কিনা, সম্পত্তি তার হাতে রয়েছে বলেই চোখে দেখা যাচ্ছে। ভাগ করলে নাকি বারো ভূতে লুটে খাবে! সবাই সম্পত্তি নষ্ট করে ফেলবে।
-হ্যাঁ সেই। আপন ভালো পাগলেও বোঝে। একবার ভাগ করেই দেখুক না! কে রাখে আর কে নষ্ট করে! আসলে ভাগ করে দিলে তাঁর দাপট কমে যাবে তো! কেউ তখন এত মান দেবে না! যে যারটা বুঝে নিয়ে সরে পড়বে। সবকিছুর সর্বেসর্বা হয়ে বসে থাকার ফিকির ওসব। আমাকে বোকা বানাবে! মানুষ চেনা হয়ে গেছে এই ক'দিনে। আগে খুব ভালো ভাবতাম! এখন দেখি ও বাবা! নামেই নাগের বাড়ি! নামেই বনেদি বাড়ি! ঐ ওপরেই খালি আভিজাত্যের চাকন-চিকন! ভিতরে সবই আস্তাকুঁড়ের ছুঁচোর কেত্তন!
-এই নিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলতে হয় ভাই। আমার বাপের ঘরের অবস্থা তুই সবই জানিস।
তাদেরই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়! হঠাৎ মাথা গরম করে চারটে ছোট-বড় কথা শুনিয়ে তাড়িয়ে দিলে, আমি তিনটে বাড়তি পেট নিয়ে কোথায় ঠেলে উঠব বল দেখি! সেই ভয়ে মুখ খুলি না। জলে থেকে কি আর কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যায় রে বোন? তুই আজ বাদে কাল চলে যাবি। ওর কথা শুনতেও আসবি না। কিন্তু আমাকে এখানে থাকতে হবে। তোদের হয়ে আমি আর আমাদের ঘরের লোকটা সেভাবে জোর দিয়ে কিছু বলতে পারলাম না। তুই যেন রাগ করিস না ভাই।
-কী যে বলো তুমি! সেদিন রাতে আমি বলার আগেও তুমি আমার ঘরে এসে বলেছ। এই বা কম কী? উত্তরার জিভে এখনো মরচে ধরেনি। সে নিজের কথা গুছিয়ে খুব ভালোভাবে বলতে পারে। তুমি বলো দেখি, শাড়িখানা পছন্দ হল? পাঞ্জাবিটা মেজদাভাইয়ের হবে তো? আমি আন্দাজে আনলাম।
-খুব হবে। কী সুন্দর শাড়ির রঙটা। এ আমি এখন তুলে রাখব। ঠাকুর থানে মনসা পুজোর দিন এই নতুন শাড়িখানা ভেঙে পরব।
-আচ্ছা মেজদিভাই, আমি এখন উঠি। রাতে সুটকেস গোছাতে হবে। তার আগে একবার মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি।
-ও ছোট...
খাট থেকে উঠেও আবার বসে পড়ল উত্তরা। কারণ নিধি স্নেহপূর্ণ বাঁধনে ওর হাত টেনে রেখেছে।
-কী বলো?
-কতদিন আর দেবা-দেবী থাকবি? অনেকদিন হল বিয়ে হয়েছে। ঢের আনন্দ-ফূর্তি হয়েছে। এবার একটা কিছু ভাব। সামনের বার যখন আসবি, তখন যেন শুনি নতুন খবর আছে। আমার টুয়ার খেলার সঙ্গী আসছে। একটা বাচ্চার জন্ম দিলে তোর রূপ-যৌবন একটুও টসকাবে না। ছোট ঠাকুরপো তখনো তোর আঁচলেই বাঁধা থাকবে। তোরা এত দেরি করছিস কেন ছোট? কিছু সমস্যা আছে?
কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে মাথা নামিয়ে উত্তরা বসে রইল। নিধি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
-কিছু মনে করিস না বোন। দিদি হয়েই বললাম। নিজের বোন থাকলে তাকেও এভাবে বলতাম। তোদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নাক গলাচ্ছি না। কিন্তু দেখতেও তো ভালো লাগে বল! ঘরের মধ্যে একটা বাচ্চার কান্না, আধো আধো কথা না থাকলে কি ঘরে মন বসে? ছোট ঠাকুরপো দেখবি তখন আরও বেশি করে তোদের জড়িয়ে থাকবে। এদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে হয়। নইলে এরা সংসারী হয় না। উড়ে উড়ে বেড়ায়। তাছাড়া ওখানে কাছাকাছি তোর মা থাকেন। তিনি এসে বাচ্চাকে দেখবেন। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই বড় হয়ে যাবে। এবার নিয়ে নে ছোট।
-হুম...
-রাগ করলি ভাই?
-রাগ করলে রাগ উগড়ে দেওয়ার জন্য দু-চার কথা শুনিয়ে দিতাম। চুপ করে ভালোমানুষ সেজে মনের ভিতর রাগ পুষে রাখতাম না। তুমি উত্তরাকে চেনো না?
নিশ্চিন্ত হয়ে নিধি বলল,
-তা চিনি। সেই জন্যই তো বললাম। কী ভাবছিস এত?
-ভাবছি আহ্লাদীর কথা। এই মেজদিভাই.... একটা কাজ করব ভাবছি।
-কী কাজ রে?
-দাঁড়াও.... মায়ের ঘর থেকে ঘুরে এসে বলছি। আগে মা কী বলেন দেখি...
মাধবীলতার উপহারখানা বগলদাবা করে উত্তরা যেন চোখের নিমেষে উধাও হয়ে মাধবীলতার ঘরের দরজায় উপস্থিত হল।
-মা আসব?
-কে?
-আমি উত্তরা।
-তা এই ভর সন্ধেবেলা চায়ের আসরের খোশগপ্পো ছেড়ে এই বুড়ির দোরে কী মনে ক'রে?
-কাল চলে যাচ্ছি কিনা! তাই আপনার সঙ্গে একটু গল্প করতে এলাম।
-আর ক'টাদিন থেকে গেলে হয় না?
-আপনার ছেলের ছুটি শেষ। আমারও দু'দিন অফিস কামাই হল। এবার না গেলে একেবারে ছুটি দিয়ে দেবে।
-হুহ! এখানে এতসব জমি-জিরেত, তারা ভিটেছাড়া হয়ে পরের আপিসে চাকরি করছে! উদ্ধার করছে আমায়। সংসার-ধম্ম আর হবে না। মরার আগে বোধহয় ছোট ব্যাটার ঘরে একটা নাতি-পুতির মুখও দেখতে পাব না! কপাল আর কী! মেয়েমানুষের চাকরি করার বাই থাকলে যা হয়! একবার বাইরে বেরিয়ে রঙচঙে দুনিয়ার সোয়াদ পেয়ে গেলে, তার কী আর ঘরে মন বসে! তা ঘরের মধ্যে অমন ঠাকুরের মতো সটান দাঁড়িয়ে রইলে কেন বাছা? বসার জন্য আলতা সিঁদুর পান সুপুরি দিয়ে তোমাকে নেমন্তন্ন করতে হবে নাকি?
-তা নয়। আপনার কথা হজম করছিলাম। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি পেটে নেমে যাবে কিনা! বসে পড়লে কথা এসে বুকে আটকে গিয়ে মনে ব্যাথা দিতে পারে। আবার বিষমও লাগতে পারে। তাই দাঁড়িয়েছিলাম। সংসারের সব কথা মনে লাগতে দিতে নেই। যেসব কথা ঝটপট হজম করতে হবে, সেগুলো আমি দাঁড়িয়েই শুনি। শক্ত কথা বুকের ভাঁজে জমে গেলে মনখারাপ হতে পারে। তাই...
-উফ! কথার ঝড়ে যেন সংসার উড়ে যাবে...
উত্তরা ধপাস করে খাটে বসে মাধবীলতার গা ঘেঁষে বলল,
-এটা আপনার জন্য এনেছি মা। দেখুন তো, পছন্দ হয়?
-পানের ডিবে? ও মা! কী সুন্দর ঝকঝক করছে গো!
মাধবীলতাকে শিশুর মতো আনন্দ করতে দেখে উত্তরা বলল,
-হ্যাঁ। আগেরটা বহুদিন হয়ে গেল। চুন লেগে কেমন যেন খারাপ হয়ে গেছে। তাই আপনার জন্য নতুন কিনে আনলাম। আর এই রূপোর বেলপাতা প্যাঁচানো সাপ শিব ঠাকুরের জন্য।
-এতসব তুমি কখন কিনলে?
-এই একটু আগে বেরিয়েছিলাম। আপনার পছন্দ হয়েছে?
-এতগুলো টাকা খসিয়ে কিনেছ। পছন্দ হয়নি বললে তো মুখখানা আবার হাঁড়ি হয়ে যাবে! পছন্দ না হয়ে উপায় আছে?
-তা কেন? পছন্দ না হতেই পারে। কিন্তু পছন্দ না হলেও বলবেন, পছন্দ হয়েছে।
-না হলেও হ্যাঁ বলব?
-হ্যাঁ বলবেন। যে জিনিস আনে, সে তার নিজের পছন্দমতো আনে। যার জন্য আনে, তার পছন্দ না-ও হতে পারে। সব মানুষের পছন্দ সমান নয়। মানুষের পছন্দ খারাপ হতেই পারে, কিন্তু উপহারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসাটা মিথ্যে নয়। একটা জিনিস দিয়ে একটা মানুষের কি সারাজীবন চলে? কিন্তু মানুষের ব্যবহার আর কথাটা আজীবন থেকে যায়। আপনি যদি উপহারের জিনিসটা হাতে নিয়ে একবার মিষ্টি করে হেসে বলেন খুব সুন্দর হয়েছে, তবে দ্বিতীয়বার-তৃতীয়বার উপহার পাওয়ার সুযোগ আরও বেড়ে যায়। বারবার সে যখন আনন্দ করে জিনিস কিনবে, উপহার দেবে, কোনও একবার নিশ্চয়ই আপনার পছন্দ হয়ে যাবে। তখন আর মিথ্যে কথা বলতে হবে না। কিন্তু আপনি যদি তাকে একবার বলে দেন পছন্দ হয়নি, তবে দ্বিতীয়বার হাতে ধরে কিছু কেনার আগে তার মন খুঁতখুঁত করবে। হয়তো সে আর কিছু কিনবেই না। কিংবা হয়তো কিনবে, তা নেহাৎই দায়িত্ব আর কর্তব্য পালন করতে। ভালোবেসে নয়। টাকা খরচ করলে কতরকম জিনিস বাজারে কিনতে পাওয়া যায়, কিন্তু ভালোবাসা পাওয়া যায় কি?
বিস্ফারিত দৃষ্টিতে উত্তরার দিকে চেয়ে মাধবীলতা বলল,
-আমার ব্যাটা হাতে হ্যারিকেন নিয়ে একটা মেয়েমানুষ খুঁজে বের করেছিল সত্যি! ঠোঁটের আগা সবসময় কথা বলার জন্য সুড়সুড় করে! এরপর তোমার আনা জিনিসকে খারাপ বলে কার বাবার সাধ্যি আছে! খুব সুন্দর হয়েছে গো! শিবশম্ভু! শিব শিব...
কপালে হাত ঠেকিয়ে চোখ বুজে শিবালয়ের শিবের উদ্দেশে প্রণাম করে মাধবীলতা বলল,
-কালই আমি নিজের হাতে শিবকে স্নান করিয়ে এই সাপ আর বেলপাতা দিয়ে পুজো দেব। যাওয়ার আগে তোমরা একটু প্রসাদ মুখে দিয়ে যেও। খুশি তো?
চোখে একরাশ দুষ্টুমি এঁকে মিটমিট করে হেসে উত্তরা বলল,
-খুব খুশি। আরও একটা কথা আপনাকে বলার জন্য আমার মুখ সুড়সুড় করছে মা। আপনি না বলতে পারবেন না। আমি চাইব, আপনি দেবেন। কোনও কথা শুনব না।
-তোমার আবার কী চাই? আমার ব্যাটাকেই তো নিয়ে বসে আছ।
-আহ্লাদীকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।
-কী বললে! আহ্লাদীকে?
-হ্যাঁ.... এ বাড়ির যা অবস্থা, ওকে এখন এখানে রাখা ঠিক হবে না। যে মেয়ের বিয়ে ভাঙে, তার ওপরেই মানুষের সবচেয়ে বেশি রাগ থাকে! এমনিতেই সংসারের নিয়ম হল, যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা! এখন ওকে আরও কথা শুনতে হবে। তার চেয়ে আমার সঙ্গে যাক। কিছুদিন দাদার বাড়ি থেকে ঘুরে আসুক। আহ্লাদী সেই যে আমাদের বিয়ের সময় গিয়েছিল, তারপর আর ফ্ল্যাটে যায়নি। আমি আহ্লাদীকে নিয়ে যাই মা? দিনকতক পর আপনার ছেলে এসে ওকে দিয়ে যাবে। আহ্লাদীর যতদিন ইচ্ছে, ততদিন থাকতে পারে। আপনি ভয় পাবেন না। আমার ঘরে আপনার মেয়ের কোনও অযত্ন হবে না। ও খুব আদরেই থাকবে। আমার ওপরে ভরসা রাখুন।
মাথা নামিয়ে চুপ করে বসেছিল মাধবীলতা। উত্তরা মাধবীলতার হাতের ওপর হাত রেখে ডাকল,
-মা?
-ভরসার কথা বলছ তুমি? এ কথা কোন মুখে বলি বলো, পরের মেয়ের ওপর যে ভরসা আছে, নিজের পেটের মেয়ের ওপর তা নেই! আমি জানি তুমি ওর অনাদর করবে না। কিন্তু গৃহপ্রবেশের দিন নারায়ণ পুজোর সময় তোমার ফ্ল্যাট দেখে এসেছিলাম মা। কত বড় জায়গা! আশেপাশে কত বড় বড় ফ্ল্যাট! কত নামী-দামি মানুষের বাস সেখানে! তুমি আমার ঘরের মানুষ। তোমার কাছে আর কী লুকোব? আমার মেয়েটার স্বভাব তোমার অজানা নয়। ওখানে গিয়ে যদি আবার কারও সঙ্গে কিছু করে বসে, লজ্জায় তোমাদের নাক কাটা যাবে! লোকে ছি ছি করবে। আমি আহ্লাদীকে একদম ভরসা করতে পারি না ছোট বৌ...
পাড়া বেরিয়ে টুয়ার খাতায় খোলা আকাশ এঁকে ঘরের বাইরে তখনই পৌঁছেছিল আহ্লাদী। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চুড়িদারের ওড়নাটা হাতের আঙুলের মধ্যে জড়িয়ে দাঁত দিয়ে সুতো কাটতে কাটতে একমনে শুনছিল ঘরের ভিতরের নিভৃত আলাপচারিতা। উত্তরা হেসে বলল,
-কিছুক্ষণ আগে মেজদিভাই আমাকে দায়িত্বের পাঠ পড়াল। সে বলল, দায়িত্ব চাপিয়ে না দিলে ঘরের পুরুষ মানুষরা নাকি উড়ে বেড়ায়। কিন্তু মিথ্যে বলব না মা, আপনার ছোট ছেলের লুকোনো ডানা আমি কোনোকালেও চোখে দেখিনি। তবে মেজদি আমার চেয়ে বেশিদিন সংসার করেছে। তার অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে খানিক বেশি। হয়তো সে ঠিকই বলে থাকবে। তার কথার জের টেনেই বলি, বড় মুখ করে ভরসা না করলে, কেউ ভরসার মর্যাদা দেবে কেন? ভরসার মর্যাদা চাইলে আগে ভরসা করতে হবে। আপনার ইচ্ছে না হলে ভরসা করবেন না। কিন্তু আমি আহ্লাদীর ওপর একবার ভরসা করবই। দেখিই না, সে কেমন তার ছোট বৌদিদির মুখে চুনকালি মাখায়! আবার এমনটাও তো হতে পারে, আমার ওখান থেকে ফেরার পর আপনি আহ্লাদীর মধ্যে একজন নতুন মানুষকে খুঁজে পেলেন, যাকে আগে কোনোদিন দেখেননি.... চেষ্টা করতে ক্ষতি কিছু নেই। ঠিক কিনা বলুন! আপনি আহ্লাদীকে আমার সঙ্গে যেতে দেবেন তো? বড়দাভাইকে আমি জিজ্ঞাসা করতে যাব না। আপনিই আমাদের সকলের অভিভাবক, আহ্লাদীরও মা। আপনি হ্যাঁ বললে, আমি কারও নিষেধ শুনব না।
মাধবীলতার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো কান্নায়। উত্তরার হাত চেপে ধরে সে বলল,
-এখানে দিনরাত টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওখানে যাওয়া মানে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকা। তোমরা অফিসে বেরিয়ে যাবে। ওকে সারাদিন দমবন্ধ করে ঘরের মধ্যে একা থাকতে হবে। ও কি যেতে রাজি হবে ছোট বৌ?
ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে এক পায়ের আঙুল দিয়ে আর এক পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ একমনে খুঁটতে লাগল আহ্লাদী।
পরের দিন ভোরে ঘটা করে নিজ হাতে শিবালয়ের শিবলিঙ্গকে স্নান করাল মাধবীলতা। প্রসাদ খেয়ে মাধবীলতাকে প্রণাম করে ঘোমটা সামলে উত্তরা হাসিমুখে দাঁড়াল নাগের বাড়ির সামনে। নিজেদের সুটকেস ও আহ্লাদীর ব্যাগ গাড়ির ডিক্কিতে ঢুকিয়ে দিল অঙ্কন। আহ্লাদীর পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে খুন হয়ে গেল টুয়া। নিধি চোখের জল মুছে বলল,
-সারারাত মেয়ে ঘুমায়নি। একটু চোখ বুজলেও ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। যখন থেকে শুনেছে, কাম্মার সঙ্গে সোনাপিসিও চলে যাচ্ছে, একনাগাড়ে কেঁদে ভাসাচ্ছে...
টুয়ার দু'গালে অনেক আদর এঁকে দিয়ে আহ্লাদী রুদ্ধকণ্ঠে বলল,
-আমি আবার আসব তো। তুই এত কাঁদছিস কেন? আমি কি জন্মের মতো চলে যাচ্ছি?
-তোমার বিয়ে হয়ে গেল পিসি? বর কই? তুমি আমাকে ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাচ্ছ?
টুয়ার কথা শুনে উপস্থিত সকলে হেসে উঠল সমস্বরে। কেবল আহ্লাদী টুয়াকে বুকের ভিতর মিশিয়ে কান্নায় ভেসে বলল,
-তোকে ছেড়ে কোথায় যাব মা আমার? আমি আবার আসব।
-ঠিক তো সোনাপিসি? তুমি আবার আসবে তো?
-ঠিক ঠিক ঠিক! একটু ভরসা রাখ আমার ওপর! আমি ঠিক আসব.... তোকে একা রেখে কোথাও পালাব না।
ঘরের জানলার পর্দা একটু ফাঁকা করে দোতলা থেকে উঁকি মারছিল তৃণা। মুখ বেঁকিয়ে বলল,
-ঢং দেখে গা জ্বলে যায়। যা না, আদর করে নিয়ে যা! রাখ কয়েকটা দিন। তারপর বুঝবি ও কী বিষ! আবার দু'দিন পর ঘাড় থেকে নামানোর জন্য এখানেই ফিরিয়ে দিয়ে যেতে হবে। কত দেখলাম অমন আলগা পিরিত! মায়েরও বলিহারি! যত বয়স বাড়ছে, বুদ্দিসুদ্দি যেন লোপ পাচ্ছে। ঐ বেহায়া মেয়েমানুষটাকে নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নেই! বাপ-মা দেখেশুনে বিয়ে দেবে, সেই অপেক্ষাও তো করতে পারিসনি হতভাগী! এমনই গতরের জ্বালা, আমার দেওরের গায়ে ঢলাঢলি করে একেবারে নাগের বাড়ির ভিতরে উঠে এসেছিস! তাও যদি একটা ব্যাটা পেটে ধরতিস, না হয় এত দেমাকের কারণ বুঝতাম! বিয়ে হয়েছে কম দিন তো হল না। এখনো কচি সেজে হেলে-দুলে ঘুরে বেড়ায়! একটা বাচ্চা পেটে এলো না। বাঁজা মেয়েছেলে কোথাকার! তাকে নিয়ে ঘর-গুষ্টি সবার ন্যাকামি দেখলে মনে হয় সংসারের মুখে নুড়ো জ্বেলে দিই।
ঘরের কোণে টেবিলের ওপর রাখা রূপোর সিঁদুরের কৌটোর দিকে চেয়ে মুখ বেঁকিয়ে হাতের চুড়ি ঝনঝনিয়ে তৃণা বলে উঠল,
-বুদ্ধির বলিহারি যাই! শাড়ি দিল না। দিল সিঁদুরের কৌটো! জানে এয়োস্ত্রী মানুষ, এ জিনিস প্রাণে ধরে কাজের লোককে বিলিয়ে দিতে পারবে না। আবার ব্যবহার না করে শুকনো কৌটো ফেলেও রাখবে না...
উত্তরার দেওয়া শূন্য সিঁদুরের কৌটোতে তৃণা খানিক গুঁড়ো সিঁদুর রাখল। তারপর আয়নার দিকে চেয়ে নিজের সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর দিয়ে বলল,
-আমার সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় করো। ঠাকুর ঠাকুর...
হাতের নোয়ায় একফোঁটা সিঁদুরবিন্দু এঁকে কৌটোটাকে কপালে ছুঁইয়ে প্রণাম করে তৃণা মৃগাঙ্কর দীর্ঘায়ু কামনা করল।
গ্রামের পথের আলগা ধুলো উড়িয়ে অঙ্কনের গাড়ি এগিয়ে গেল শহরের পথে...
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

শনিবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৩

খিল অষ্টম পর্ব


 


খিল
সাথী দাস
অষ্টম পর্ব



নাগের বাড়ির সর্বকনিষ্ঠা কন্যার বিয়েতে কোনোপ্রকার ত্রুটি রাখা চলে না। সুতরাং রাজকীয় আয়োজনের যাবতীয় প্রস্তুতির জন্য মৃগাঙ্ক সর্বদা নিজের মাথার মধ্যে রাজ্যের হিসেব কষে চলেছে। শশাঙ্ক অসহায় হয়ে একবার তৃণার দিকে আর একবার নিধির মুখের দিকে চাইল। রান্নাঘরের বারান্দায় বারংবার পায়চারি করে সে ফিরে গেল নিজের ঘরে। আহ্লাদীর বিবাহের প্রসঙ্গ উত্থাপনের সাহস শশাঙ্ক পাচ্ছে না। রন্ধনকার্যে তৃণার সঙ্গে সহযোগিতা করছিল নিধি। সে আপন পূজনীয় স্বামীর কার্যকলাপ দেখে নিজের কপালে নীরবে করাঘাত করল। এ সংসারে যে পুরুষের মেরুদন্ড নেই, সেই পুরুষের ঘরণী হওয়ার লজ্জায় আগুনের তাপে আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়ার সময় রক্তবর্ণ ধারণ করল নিধির মুখ। এমনকি অঙ্কন পর্যন্ত একতলা থেকে একবার ঘুরে উত্তরাকে খুঁজে না পেয়ে সাহসের অভাবে ফিরে গেছে দোতলায়।
প্রাত্যহিক গতানুগতিক রুটিন মেনে দিন শুরু হয়েছিল। স্নান সেরে পরিপাটি হয়ে শিবালয়ে গিয়েছিল উত্তরা। শহুরে জীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে এ বাড়িতে আসলে, স্নানের পর পুজোর দায়িত্বটা সে নিজের কাঁধে তুলে নিতে পছন্দ করে। দ্বিতীয়বার চায়ের জন্য তাগাদা দিতে একতলায় নেমে এসেছে মৃগাঙ্ক। রান্নাঘরের গ্যাসের ওপর যুদ্ধকালীন তৎপরতায় হাঁড়ি-কড়াই জাঁকিয়ে বসছে। গৃহকর্ম সহায়িকা চাঁপা ঘর মুছতে মুছতে কোমরে কাপড়ের আঁচল পেঁচিয়ে বলল,
-বড়দাবাবু একটু সরে দাঁড়াও গো। সিঁড়ি মুছে উঠোনখানা ধুয়ে বেরিয়ে যাব। সাবধানে পা ফেলো। ভিজে মেঝে!
-হ্যাঁ সেই.... চা খেতে এসে আবার আছাড় খেয়ে কোমর ভেঙে ফেলো না বাপু.... সামনে বোনের বিয়ে বলে কথা!
রান্নাঘরের ভিতর থেকে তৃণার গলা শুনে মৃগাঙ্ক বলল,
-লাস্ট রাউন্ড চা কি পাব না?
পুজোর থালা হাতে নিয়ে মাথার ঘোমটা সামলে মৃগাঙ্কর সামনে এসে দাঁড়াল উত্তরা।
-বড়দাভাই প্রসাদ নিন। আর প্রসাদী ফুল-বেলপাতা। চাইলে সঙ্গে রাখতে পারেন।
অতর্কিতে ভাতৃবধূ একেবারে মুখোমুখি এসে উপস্থিত হওয়ায় খানিক অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়ে অনভ্যস্ত মৃগাঙ্ক বলল,
-ঠিক আছে, ঠিক আছে। বয়স বাড়ছে। এখন অনেক বুঝে খেতে হয় ছোটবৌ। দায়িত্ব-কর্তব্য মেলা আছে। আরও কিছুদিন বাঁচতে হবে। তুমি বরং সন্দেশটা ভেঙে দাও। গোটা খাব না।
-তাই নিন দাদাভাই। প্রসঙ্গ যখন স্বাস্থ্য, তখন জোর করব না। আমি চায়ের জল চাপিয়ে দিচ্ছি। দিদিভাইরা রান্না নিয়ে ব্যস্ত। আপনি অফিসে যাবেন। বাচ্চাদের টিউশন-স্কুল আছে। ওরা কতদিকে করবে? আমি ঢুকছি রান্নাঘরে।
একতলায় উত্তরার কন্ঠ শুনে গুটিগুটি পায়ে সিঁড়িতে নেমে এসেছে অঙ্কন। হাতে দৈনিক মুদি বাজারের ফর্দ আর কলম নিয়ে মৃগাঙ্ক রান্নাঘরের সিঁড়ির সামনে বসে হাঁক দিল,
-শশী, এই শশী।
ঘর থেকে তড়িঘড়ি বেরিয়ে শশাঙ্ক বলল,
-হ্যাঁ দাদা, বলো।
-থাকিস কোথায় সব? জানিস আমার অফিস আছে। সকালের এই সময়টাতেই একটু ফাঁকা থাকি। সামনে মাথার ওপর এতবড় কাজ। একসঙ্গে বসে একটা আলাপ-আলোচনা সেরে নিতে হবে তো! তা ছেলের বাড়িতে সামনের সপ্তাহেই যাওয়া যাক? ওরা সব দেখেশুনে গেছে। এককথায় রাজি। আমাদের মেয়ে ওদের খুব পছন্দ হয়েছে। আমরাও আর দেরি করতে চাই না। এবার সবাই মিলে গিয়ে পাকাকথা বলে পঞ্জিকা দেখে একটা ভালো দিন ধরে সব ঠিক করে ফেলি। মিস্ত্রী-মজুর লাগিয়ে বাড়ির কাজও তো শুরু করতে হবে। বাড়ি আর বিয়ে, দুটোই বড় কাজ। এই তো, ছোটও এসে গেছে। বোস অঙ্কন। তা বোনের বিয়েতে তোরা কে কোন দায়িত্ব নিবি, আমাকে জানা। সেইমতো আমি এগোব। আমার পক্ষে তো অফিস করে সবটা একার হাতে সামলানো সম্ভব নয়।
ফুটন্ত চায়ের জলের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেও উত্তরার মন পড়ে রয়েছে বাইরের বারান্দার দিকে। অঙ্কন এখনো কিছু বলছে না কেন! চায়ের কাপ বের করে উত্তরার হাতে দিয়ে তৃণা বলল,
-শোন ছোট, ভাসুরের থেকে একহাত দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হয়। নইলে বৌয়ের নিন্দে হয়। তুই প্রসাদ নিয়ে তার এত সামনে গিয়েছিলি কেন? আর তোর ঘোমটা মাথা থেকে খালি খসে যায় দেখি! আঁচল আর ঘোমটা ঠিক করে সামলে রাখ ভাই। নিজেরা মেয়েমানুষরা থাকলে একরকম। তখন কেউ ডাক নেবে না। এখন ঘরের ভিতর তোর ভাসুর ঠাকুর রয়েছে না!
উত্তরা কোনও উত্তর দিল না। মাথা নামিয়ে ঘোমটা ঠিক করে গায়ে কাপড়ের আঁচল টেনে নিল। নিধি মৃদুস্বরে বলল,
-ছোট'র কি শাড়ি পরার অভ্যাস আছে দিদি? এখানে এলে আমাদের মান রাখতে পরে। তাই ওসব ঘোমটা তেমনভাবে সামলে চলতে পারে না। তা কী আছে! বাড়ির মধ্যেই তো...
-মাছের ঝোলের আলুটা কেটে দে মেজ। পাতলা আর লম্বা করে কাটিস। বেশি ধ্যাবড়া করে কাটলে সহজে সেদ্ধ হতে চায় না, অনেক সময় যায়। বুঝলি!
-বুঝলাম, হাতের কাজটা সেরেই দিচ্ছি।
চায়ের কাপগুলো সাজিয়ে নিয়ে দূর থেকে চোখের ইশারায় অঙ্কনকে ডেকে ট্রে ধরিয়ে অগ্নিদৃষ্টিতে শাসন করল উত্তরা। চায়ে চুমুক দিয়ে অঙ্কন অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
-বড়দা, বলছিলাম যে.... এ বিয়েতে আহ্লাদীর মত আছে কিনা.... একবার কথা বলে নিলে...
মৃগাঙ্ক ভ্রু কুঁচকে হতবাক দৃষ্টিতে অঙ্কনের দিকে চাইল। তারপর মৃদু ভর্ৎসনার স্বরে বলল,
-এটা নাগের বাড়ির মেয়ের বিয়ে হচ্ছে অঙ্কন, ছেলের বিয়ে নয়। এতদিন ছেলেরাও বিয়ের ব্যাপারে ব্যক্তিগত মতামত জানাতে পারত না। এ বাড়িতে ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই। সবটাই পারিবারিক। গুরুজনরা যা ঠিক মনে করত, সেই সিদ্ধান্তই সকলে মেনে নিত। এটাই এ বাড়ির ঐতিহ্য, নিয়ম। যদিও আজকাল সেই নিয়মেরও হেরফের হচ্ছে বৈকি! ছেলেরা নিজের ইচ্ছে জানাচ্ছে, ইচ্ছেপূরণ করতে বাধ্য করছে। কিন্তু একজন একবার নিজের ইচ্ছে জাহির করেছে বলে তো বারবার সেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলে না। তুমি যার মতামত নিতে চাইছ, সে নিজের এবং পরিবারের অন্যান্যদের ভালোমন্দ বুঝতে পারলে, এই বংশের গায়ে কলঙ্কের কালি লেপে দিতে পারত না। এখন তার বোধ-বুদ্ধির ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখে আমাকে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে বলছ?
-ঠিক আছে বড়দা, বুঝেছি। সরাসরি কাজের কথায় আসি। আহ্লাদীর জন্য এই ছেলে আমার পছন্দ নয়। এই বিয়েতে কে কোন দায়িত্ব নেবে, তুমি একটু আগে জানতে চাইছিলে। তাই আমি আমার মতামত জানিয়ে দিলাম। এই ছেলেকে আমি আহ্লাদীর বর হিসাবে মানতে পারছি না। পাত্রপক্ষের পছন্দ শেষ কথা হতে পারে না। মেয়ের বাড়িরও একটা মতামত আছে। এ বিয়েতে আমার মত নেই। মেজদা তোমার ভয়ে কিছু বলবে না। তবে আমার মনে হয়, তারও একই বক্তব্য।
সকাল থেকে একাধিকবার অভ্যাস করা কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে উগড়ে মাথা নামিয়ে কম্পিত বুকে মোড়ার ওপর বসে রইল অঙ্কন। জুড়িয়ে যাওয়া চায়ের স্বাদ তখন ফিকে হয়ে গেছে। মৃগাঙ্ক একবার রান্নাঘরের দরজার দিকে চাইল। মাথায় ঘোমটা টেনে চৌকাঠের ওপর চুপটি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে উত্তরা। বারান্দায় পিনপতন নীরবতা। রান্নাঘরের ভিতর বাসনপত্রের ঝনঝনানি কোন এক অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। মৃগাঙ্ক ধীরকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল,
-শশী, তুইও একই কথা বলবি?
শশাঙ্ক যেমন নেতিবাচক উত্তর দিল না, তেমন ওর পক্ষ থেকে কোনও ইতিবাচক ইঙ্গিতও মিলল না। চুপ করে বসে রইল ও। হাত থেকে খুন্তি নামিয়ে তৃণা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বলে উঠল,
-এ পাত্র যখন পছন্দ না, তা তোমরাই দেখেশুনে ও মেয়ের বিয়ে দাও না ঠাকুরপো। কেউ তো মানা করছে না। বোন তো কারও একার নয়। সবারই। বোনের বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও সবার। আমরাও দেখি, ওর জন্য তোমরা কেমন ঘর আলো করা রাজপুত্র ধরে আনো! কার বুদ্ধিতে ছোট ঠাকুরপো এসব কথা বলছে, সে কি আর আমি বুঝি না!
-ভুল বুঝো না বড়দিভাই, তোমাকে একটা কথা বলি। বিয়ে ভালো হওয়া কিংবা মন্দ হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। যা ভাগ্যে আছে, তাই হবে। যার হাঁড়িতে আহ্লাদীর জন্য চাল বরাদ্দ আছে, তার ঘরে যাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু আমরা বড়রা যখন দেখেশুনেই বিয়েটা দিচ্ছি, তখন মেয়েটাকে একেবারে জলে ফেলে দিতে পারি না। বাড়ি-ঘর বিষয়-সম্পত্তির জন্য পাত্রপক্ষ পুরোপুরি আমাদের ওপরেই নির্ভর করছে। সে ঠিক আছে। না হয় সবই আমরা সাজিয়ে গুছিয়ে দেব। অন্তত মানুষটাকে দেখে তো মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে.... এখানে তো সেই শান্তিটুকুও নেই। ঠিক কী দেখে একে তোমার মনে ধরল দিদি?
-তা তোর আদরের ছোট ননদ যতজনের সঙ্গে শুয়ে এসেছে, তাদের মধ্যেই যদি কাউকে মনে ধরে, তবে ঝুলিয়ে দে তার গলায়। ঐ তো গুণবতী মেয়ে! একজন বিয়ে করতে রাজি হয়েছে, এই ঢের! আবার মনকে সান্ত্বনাও দেওয়া চাই, কত চাহিদা.... এ পাত্র হাতছাড়া হলে ও মেয়েকে আজীবন আইবুড়ো অবস্থায় ঘরে বসিয়ে রাখতে হবে বলে দিলাম। মনের মতো চাই.... হুহ! এ পৃথিবীতে কোনও কিছু কি মনের মতো পাওয়া যায় রে ছোট?
-তা যায় না ঠিকই! মনের মতো পাওয়া গেলে তো আমিও পেতে পারতাম! সংসার করতে গিয়ে দেখলাম, কত কিছুর অবস্থান মনের ঊর্ধ্বে! মানিয়ে গুছিয়ে চলছি। কী করব? অপছন্দ বলে কাউকে তো আর ফেলে দিতে পারি না। রক্ত দিয়ে গড়া সম্পর্কের শাখা-প্রশাখা সব। হাতের পাঁচটা আঙুল কি আর সমান হয়? এখন এসব নিয়ে বিশেষ ভাবি না। যাকে দিয়ে সম্পর্ক, সে ঠিক থাকলেই হল।
-তুই কি ছোট ঠাকুরপোকে সামনে রেখে আমাকে ঠেস মেরে কথা বললি ছোট?! তোর এতবড় আস্পদ্দা! হ্যাঁ গো, শুনলে তুমি? ছোটবৌয়ের কথাটা শুনলে? দু'দিন হয়েছে এ বাড়িতে এসেছে। ভিন্ন থাকে। ফোন করে ডাকলে কুটুমের মতো বেড়াতে আসে। আমি একা এতবড় সংসারের জোয়াল টেনে মরি। তুমি ঘরে বাইরে গাধার মতো খেটে মরো। তা সত্ত্বেও ওর কথার দৌড় দেখলে? ছোট-বড় কিছু মানে না। মেয়েমানুষের এত তেজ ভালো না ছোট!
-যা পারো করো তোমরা। এ বাড়ির কোনও কিছুতে আমি আর নেই।
মৃগাঙ্ক খাতাপত্র ছুঁড়ে ফেলে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। অঙ্কন একছুটে মৃগাঙ্কর পথরোধ করে বলল,
-দাদা প্লিজ তুমি অপরাধ নিও না। উত্তরা, এক্ষুণি দাদা-বৌদির কাছে ক্ষমা চাও। উত্তরা!
রান্নাঘরের চৌকাঠে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল উত্তরা। নিধি ওর কাছে এগিয়ে উত্তরার খসে পড়া শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
-কাল রাতে তোর ঘরে যাওয়াটাই আমার ভুল হয়েছে। ক্ষমা চেয়ে নে ছোট। অশান্তি করিস না। আহ্লাদীর কপালে যা আছে, তাই হবে। তুই দাদাভাইয়ের ছোট বোনের মতো। দাদার সামনে মাথা নত করলে কেউ ছোট হয়ে যায় না। যা সোনা, লক্ষ্মী বোন আমার। দাদাভাইয়ের কাছে গিয়ে একবার বল, ভুল হয়ে গেছে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
-উত্তরা...
-দেখলে ঠাকুরপো? মেয়ের তেজ দেখলে! তোমারও ভাই দোষ আছে। আশকারা দিয়ে বৌকে একেবারে মাথায় তুলে দিয়েছ। এখন তোমার কথাকেই মান দেয় না। শ্বশুরবাড়ির ঘর না করলে, তোমার বৌ বুঝবে কিভাবে এখানে কেমনভাবে চলতে হয়! ও থাকে এখানে? কোন অধিকারে এত কথা বলে ও? পেটে তো শুনেছি মেলা বিদ্যে আছে। তা এরপর থেকে তোমার বৌকে একটু বুঝেশুনে বুদ্ধি রেখে মুখ খুলতে ব'লো ভাই। কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, সেটা যেন মাথায় রাখে...
-বুঝেশুনে কথা বলার দায় তো আমার একার নয় বড়দিভাই। বোন যেমন কারও একার নয়, শ্বশুরবাড়িও কারও একার নয়। শ্বশুরবাড়ির ঘর করার সময় মানিয়ে গুছিয়ে বুঝে চলতে গেলে সবাইকেই চলতে হবে। নাগের বাড়ি আমার না হলে, তোমার হবে কী করে? যে সম্পর্কের জোরে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছ, আমিও তাই আছি।
হাতের কাজ ফেলে নাগের বাড়ির গৃহকর্ম সহায়িকা চাঁপা কলতলা থেকে হাঁ করে চেয়ে রয়েছে বারান্দার দিকে। অঙ্কন চিৎকার করে উঠল,
-উত্তরা! বড়দার কাছে ক্ষমা চেয়ে এক্ষুণি ওপরে যাও। তুমি আর একটাও কথা বলবে না।
-কেন বলব না অঙ্কন? বড়দিভাইয়ের কথা মেনে চললে মা-ও এ বাড়িকে নিজের ব'লে দাবি করতে পারেন না। কারণ এটা তাঁরও শ্বশুরবাড়ি। ধমকে তুমি বৌকে চুপ করাতে পারবে। কিন্তু এদিকে মায়ের অধিকারকেও যে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, ছেলে হয়ে তার প্রতিবাদ করবে না? যতদূর মনে পড়ে বিয়ের পর তুমি আমাকে বরণ করে একটা কথা বলেছিলে বড়দিভাই। আজ থেকে এটাই তোর বাড়ি ছোট। আমিও হাসিমুখে তাই মেনে মানুষগুলোকে আপন করে নিয়েছিলাম। আমি আমার বাবা-মায়ের একটাই সন্তান। ভেবেছিলাম, বিয়ের পর অনেকগুলো দিদি-দাদা পেলাম। নিজের বাড়িতে কাজিন দাদা কিংবা ভাইদের দেখে কখনো এক গলা ঘোমটা দিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে হয়নি। বড়দাভাই মেজদাভাইকে আমি নিজের দাদার মতোই সম্মান করতাম। যে মুখে তুমি বলেছিলে এটা আমার বাড়ি, সেই মুখেই এক মুহূর্তে আমাকে পর করে বুঝিয়ে দিলে এটা আমার শ্বশুরবাড়ি, আর তাঁরাও আমার দাদা নয়, ভাসুর ঠাকুর। এ আমি মনে রাখব।
কয়েক পা হেঁটে মৃগাঙ্কর সামনে দাঁড়িয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে উত্তরা বলল,
-আপনাকে বা বড়দিভাইকে ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার জন্য আমি কিছু বলিনি।
-ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি কিছু মনে করিনি। তুমি নিজের ঘরে যাও ছোটবৌ।
-আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আমি আজ পরিবারের মানুষগুলোর সামনে নিজের মতামত রেখেছি। কারণ আমি নিজেকে এই পরিবারেরই একজন মনে করতাম। এগুলো তো বাইরের কাউকে বলতে যাব না। নিজের জনকেই বলব। এসব কথা বলে কোনও পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা আমি করিনি। এ নেহাৎই মানুষের ইচ্ছে-অনিচ্ছের মূল্যায়ন, বাক স্বাধীনতা আর নিজস্ব মত প্রকাশের সংগ্রাম ছিল, যেখানে আমি হেরে গেলাম। আপনারা রক্ষণশীল গোঁড়া পরিবারের মেকি আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য যে সমস্ত নিয়মকানুন নিজের কাঁধে আজ পর্যন্ত বয়ে চলেছেন, তা সমস্তই সঠিক। কেবল বেঠিক আমিই এই পরিবারের অনুপযুক্ত। আমাকে তো বটেই, একটা ভুল মেয়েকে বিয়ে করার জন্য পারলে অঙ্কনকেও ক্ষমা করে দেবেন। কথার পৃষ্ঠে কথা বাড়ে। সেই কথা বলতে বলতে আমরা সবাই মূল প্রসঙ্গ থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছি। দাদা হয়ে বোনের ওপর অধিকার ফলাতে গিয়ে ভুলে যাওয়া হচ্ছে, সেই অধিকার সবার হাতে কে তুলে দিয়েছিল! আহ্লাদী আগে তার মায়ের মেয়ে, তারপর আপনাদের তিন ভাইয়ের বোন। সকলের মাথার ওপরে মা এখনো বেঁচে রয়েছেন। মাকে কি একবারও জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, এই বিয়ের ব্যাপারে তাঁর মত কী? তিনি রাজি থাকলে আমি আর একটাও শব্দ খরচ করব না। কিন্তু তাঁর কথা না শুনে শুধু বাড়ির দোতলায় কেন, এ বাড়ি থেকে কেউ বেরিয়ে যেতে বললেও বেরোব না। এমনকি যার হাত ধরে এ বাড়িতে এসেছি, সে বললেও না.... বিয়েটা সারাজীবনের ব্যাপার। এসব নিয়ে ছেলেখেলা করা যায় না। মা...
অঙ্কনের গলা প্রায় বুজে এলো কান্নায়। ভয়ের গতিপথ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। এতক্ষণ মৃগাঙ্ককে ভয় লাগছিল। এবার নিজের ঘরের ভিতরে পা রাখতে হবে ভেবেই আতঙ্কে অঙ্কনের সর্বশরীর কাঁপছে। বন্ধ দরজার ভিতরে উত্তরা যে ঠিক কতরকমভাবে এর শোধ তুলে অতিষ্ট করে দেবে, তা ভেবেই অঙ্কনের মূর্ছা যেতে ইচ্ছে করল। প্রিয় নারীর মানভঞ্জনের জন্য আজ যে আবারও নিভৃত রাত্রি জাগরণ কালে নাকাল হতে হবে, সে বিষয়ে অঙ্কনের মনে কোনও দ্বিধা রইল না।
-মা, আহ্লাদী কোথায়?
-সে তো আজ পরিষ্কার হয়ে পুকুরঘাটে স্নানে গেছে। জামাকাপড় কেচে মাথা ঘষে ঘরে আসবে। তাকে দিয়ে কী দরকার বাছা?
-দরকারটা তার সঙ্গে নয়, আপনার সঙ্গে। ভালোই হয়েছে ও ঘরে নেই। আপনার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে মা।
-কী হয়েছে? সকাল সকাল গেরস্ত ঘরে এত গোলমাল কিসের? তোমার গলা শুনতে পাচ্ছিলাম ছোটবৌ। কার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি অমন গলা তুলে কথা বলছিলে?
-বড়দাভাই।
-সেকি! ছোটবৌ! বড় ভাসুরের সামনে তুমি...
-সামনে নয়, সঙ্গে। আমি বড়দাভাইয়ের সঙ্গেই কথা বলছিলাম। আপনি বলুন তো মা, এ বিয়েতে আপনার মত আছে? আহ্লাদীর জন্য আনা পাত্র আপনার পছন্দ হয়েছে তো?
বহু বছর আগের এক দৃশ্য ভেসে উঠল মাধবীলতার স্মৃতিপটে। তার ঠাকুমা ঘরের ভিতর থেকে কেঁদে বলেছিল, "নিজের মেয়ে তো নয়। তাই মেয়েটাকে এমন জলে জঙ্গলে ফেলে দিতে চাইছে। নিজের মেয়ে হলে পারত..."
বিছানার ওপর পরিষ্কার চাদর পেতেছে মাধবীলতা। ঘরের জানলায় ঝুলতে থাকা কাচা-ধোয়া পর্দার আড়াল পেরিয়ে সকালের নরম রোদ্দুর উঁকি দিচ্ছে। আজ থেকে আবার আহ্লাদীর সঙ্গে ঘুমোবে সে। মেয়ের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকবে অপলক দৃষ্টিতে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত মেয়ের বিয়ের জন্য দুর্ভাবনার কারণে তার রাতের ঘুম বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু এখন পাকাপাকিভাবে বিয়ের কথা উঠতেই মাধবীলতার বুকের মধ্যে চেপে বসেছে শিরশিরে ভয়। মাধবীলতার বেশি বয়সের সন্তান আহ্লাদী। পড়ন্ত যৌবনের যত স্নেহ, সমস্তই ঐ একজনকে উজাড় করে দিয়েছিল সে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় অকালে মাতৃত্বের স্বাদ পেয়ে সেই অপার্থিব অনুভূতি পুরোপুরি উপভোগ করেছিল সে। কোনোপ্রকার জড়তা অবাঞ্চিত মাতৃত্বের মাঝে বাধা হতে পারেনি। খুদে প্রাণটাকে কোলে নিয়ে মাধবীলতা ভুলে ছিল লোকলজ্জা, সংসারের যত গঞ্জনা...
আহ্লাদীর বিয়ের পর ঐ চিলেকোঠার ঘরের আর প্রয়োজন পড়বে না। কোথাও কোনও মাসিক অসুবিধা থাকবে না। থাকবে না কোনও দৈনিক দুশ্চিন্তা। থাকবে কেবল একরাশ শূন্যতা। ঘর অন্ধকার করে মাতৃজঠরের পিদিম নিভিয়ে, সর্বকনিষ্ঠা সন্তানও নাড়ি ছিঁড়ে ঘরের উঠোনের ওপর দিয়ে আলতা রাঙা পায়ে হেঁটে চিরতরে পর হয়ে যাবে। শয্যাপ্রান্তে বসে ছলছল করে উঠল মাধবীলতার দু'চোখ। কেঁপে উঠল ঠোঁট। মাধবীলতার হাতের ওপর হাত রেখে উত্তরা জিজ্ঞাসা করল,
-মা কাঁদবেন না। আমরা সবাই আছি। আপনি বলুন, আপনার মন কী চায়?
-আমার মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় চলছে বাছা, অথচ আমাকেই কেউ ডাকে-খোঁজে না। একবারও বলে না, যে মা আসুন। দেখুন.... মেয়ের বিয়েতে কী দিয়ে কী হবে! আমি এই বাড়ির জঞ্জাল ছোট বৌ। ঘরের এককোণে পড়ে থাকি। সারাদিন একাই বকবক করি। কে আর শোনে বলো এই বুড়ির কথা! তিনবেলা পেটে ভাত পাচ্ছি, ব্যাটারা ভাত দিচ্ছে.... এই না অনেক! ঐ ছেলেকে আমি চিনি। বড় বৌয়ের কুটুমের মধ্যে সম্বন্ধ এনেছে। অনেক শুনেছি ওর গল্প। মেয়েমানুষের মতো আবভাব ব'লে গ্রামের যাত্রাপালায় মনসার গানে বেউলা সাজত ঐ ছেলে। পরে শুনি ঘরের মধ্যেও নাকি মায়ের বৌদিদিদের শাড়ি বেলাউজ পরে ঠোঁটে রঙ মেখে ঘুরে বেড়াত। নিজেকে ও বাড়ির ব্যাটা নয়, মেয়ে বলত। তারপরই তো ওকে ওর বাড়ির লোক একঘরে করেছে। অমন একটা মানুষকে ধরে এনেছে আমার মেয়ের জন্য। আমি আর কী বলব? মেয়ের হয়ে জোর করে যে চারটে কথা বলব, সে রাস্তা কি খোলা আছে? মুখপুড়ি মেয়ে তার ডাগর গতরের সঙ্গে চরিত্তিরও খেয়ে বসে আছে। কিছু বলতে গেলেই কথা শুনতে হয়। মন করে মা-মেয়ে দড়ি-কলসী নিয়ে মাঝপুকুরে ডুবে মরি! জুড়িয়ে যাক বুকের জ্বালা! আর পারি না ছোট বৌ! বাঁচাও মা, তুমি আহ্লাদীকে বাঁচাও.... আর কেউ পারবে না। পারলে একমাত্র তুমিই রুখে দাঁড়াতে পারবে। নিজের মেয়ে নয়, তাই আহ্লাদীকে ওরা ভাসিয়ে দিচ্ছে। পেটে ধরলে পারত অমন একটা ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে?
অনভ্যাসের শাড়িতে নিজেকে জড়িয়ে ঘেমে অস্থির হয়ে উঠেছিল উত্তরা। কপালের ওপর জ্বলজ্বলে সিঁদুরের ফোঁটা স্বেদবিন্দুর স্পর্শে ঘেঁটে গিয়েছিল। মাধবীলতা তার কম্পমান হাত দুটো দিয়ে উত্তরার অবিন্যস্ত চুল ঠিক করে মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে বলল,
-লক্ষ্মীমন্ত বৌ আমার! কিছু একটা করো মা। মেয়েটা আমার মরেই আছে। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দিয়ে আর কী লাভ! ওকে সংসারী করতে গিয়ে সবাই এমন একটা ব্যাটার ঘাড়ে ওকে চাপিয়ে দিচ্ছে, এবার বিয়ের পর ও মেয়ে কুলত্যাগী না হয়ে যায়! তখন এ কুলেও ওর ঠাঁই থাকবে না! কী হবে আমার মেয়েটার? যত লড়াই করতে হয় করো মা, শুধু আমার মেয়েটাকে রক্ষে করো।
মৃদু হেসে মাথায় ঘোমটা টেনে মাধবীলতার ঘর ছেড়ে বেরোল উত্তরা।
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

খিল সপ্তম পর্ব


 


খিল
সাথী দাস
সপ্তম পর্ব




-তা তোমার বোনের যা মতিগতি, বিয়ে না দিলে ও মেয়েকে ঘরে আটকানো যাবে না। বোনের বিয়ে নিয়ে ভাবলে কিছু?
কিছুক্ষণ আগে বাঁশি বাজিয়ে নাগের বাড়ির দরজা-জানালা কাঁপিয়ে শেষ রেলগাড়িটা চলে গেছে। তারপরই গোটা পাড়া ডুব দিয়েছে অন্ধকারে। অতীতে মাধবীলতাকে প্রদীপের মতো টিমটিম করে জ্বলতে থাকা বিদ্যুতের আলো ও বিদ্যুৎচালিত পাখার গতিবিধি লক্ষ্য করতে হতো কুপির আলো কিংবা টর্চ হাতে নিয়ে। বর্তমানে পাড়ায় বিদ্যুতের ঘাটতি তেমনভাবে দেখা না গেলেও, বিদ্যুৎ বিভ্রাটজনিত সমস্যা থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া যায়নি। ঘরের দরজা বন্ধ করে গায়ের গয়না ঝনঝনিয়ে পরনের কাপড় আলগা করল তৃণা। চোখে চশমা এঁটে খাতার ওপর মৃগাঙ্ক একমনে ঝুঁকে পড়েছিল। লণ্ঠনের আলোয় ওর মুখের ওপর জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম জ্বলজ্বল করছিল। ঘামে ভিজে উঠেছিল সর্বাঙ্গ। বিছানায় বসে তৃণা কাপড়ের আঁচলখানা দেহের ওপর থেকে পুরোপুরি সরিয়ে হাতপাখা দিয়ে নিজের মাথায় বাতাস করতে করতে বলল,
-মা গো! ভ্যাপসা গরমে মরলাম আমি। গায়ে কাপড়চোপড় কিছু রাখা যাচ্ছে না।
-তা রাখতে কে বলেছে? খুলে ফেললেই হয়।
ঘাড় ঘুরিয়ে চশমার ফ্রেমের ওপর দিয়ে বাঁকা দৃষ্টি মেলে মৃগাঙ্ক একবার চাইল তৃণার দিকে। তারপর হেসে আবার কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ল। হাতপাখার দাপটে তৃণার হাতের সোনার চুড়ি রিনরিন শব্দে বেজে উঠল। মুখ বেঁকিয়ে তৃণা বলল,
-মস্করা রাখো। বুড়ো বয়সে যত্তসব ভীমরতি। যত বয়স বাড়ছে, বুড়োর যেন ইচ্ছেনদীতে একেবারে বান ডাকছে। ঢেউ একেবারে উথলে উথলে উঠছে। আমি মরছি আমার জ্বালায়। উনি এলেন রঙ্গ-রসিকতা করতে। সারাদিন পর বিছানায় একটু গা দেব, অমনি মরাখেকো কারেন্টটা যমের বাড়ি গেল। কখন আসবে তা ঠিক নেই। বলি কথাটা কি কানে যাচ্ছে না? কী বলছি আমি? দিনরাত ঐ হিসেবপত্তরের খাতায় মুখ গুঁজে থাকো। এদিকে বোন যে নেচে নেচে সাত ঘাটের জল খেয়ে বেড়াচ্ছে, সেই হিসেব আর কে রাখে! বলেছিলাম টাকা-পয়সা গয়না নিয়ে একদিন পালাবে, ঠিক তাই হয়েছে। বৌয়ের কথা তো বাসি হলে ফলে। এবার কোনদিন পেট বাধিয়ে আসবে, তখন বুঝবে ঠ্যালা! লজ্জায় আমি নিজের বাপেরবাড়িতে যেতে পারি না গো। গেলেই ওর কথা লোকে আগে জিজ্ঞাসা করে। আড়ালে মুখ টিপে হাসে। বলিহারি তোমার মায়ের আক্কেল! শেষ বয়সে একটা বেশ্যা পেটে ধরেছে!
-বাবাই টুবাই ঘুমোল?
-হ্যাঁ। ছেলেদের ঘরের দোর বন্ধ দেখে এলাম।
-কাল অফিস থেকে ফেরার পথে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
-আয়ুর্বেদ নাকি হোমিওপ্যাথি?
-হোমিওপ্যাথি, বসু ডাক্তার গো।
-হ্যাঁ তো কী হয়েছে?
-বলছিল, ছেলেদের দিকে একটু নজর দিতে।
-কেন? আমার ছেলেরা তার কোন পাকা ধানে মই দিয়েছে শুনি? তার বাড়ির উঠোনে হালকা হতে গেছে, নাকি তার মেয়ের হাত ধরে রাস্তাঘাটে টানাটানি করেছে? আমার ছেলেদের দিকে লোকের এত নজর কেন বাপু? অমন সোনার টুকরো ছেলে এ তল্লাটে আর কারও আছে?
-আমাদের বড় ছেলে, বাবাই.... কাল বিকেলে নাকি রেল কোয়ার্টারের ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল! বসু ডাক্তার নিজের চোখে দেখেছে। তাই সাবধান করল।
-সে তো আমি ওর বালিশের তলাতেও সিগারেটের বাক্স পেয়েছি। ওর ঘরেও গন্ধ পেয়েছি। ছেলে আমাকে কত মান দেয় জানো? আমাকে দেখেই জানলা দিয়ে সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। বাবাই বড় হচ্ছে বুঝলে! ছেলের সব ব্যাপারে এত নাক গলাতে এসো না। ও আর আমাদের ছোট ছেলেটি নেই। পুরুষ মানুষ হয়ে গেছে। এখন সবসময় এত ডাক নিলে চলে না।
-আমাদের কাছে ওরা আজীবন ছোটই থাকবে। দিনরাত আহ্লাদীর কথা না ভেবে, তার সিকিভাগ সময় যদি নিজের ছেলেদের পিছনে দাও, তবে ভালো হয়। ওরা কখন কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে, একটু খোঁজখবর রাখতে পারো তো। এখনো বাইরে পড়তে যায়নি। হোস্টেল লাইফের সঙ্গে পরিচয় হয়নি। পরিবারের সঙ্গে রয়েছে। এর মধ্যেই এসব নেশা করতে শুরু করেছে। তুমি সব জেনেও আমাকে জানাওনি। এ মোটেও ভালো কথা নয়। ছেলেকে ভালোবাসা একরকম। কিন্তু ওর খারাপ অভ্যাসগুলোকে প্রশ্রয় দিও না। আহ্লাদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি ভাবিও না। ওর বিয়ে হলে হবে। না হলে না হবে। এতবড় বাড়ির এককোণে পড়ে থাকবে। আমার সংসারে একটা পেট বেশি হবে না। কিন্তু ছেলেরা আমাদের স্বপ্ন। সেখানে যদি কিছু ভুল হয়ে যায়, ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। ওরা ভালো না থাকলে আমরা ভালো থাকতে পারব বলো তো? ছেলেদের যত আবদার, যত প্রয়োজন, সব তোমার কাছেই জানায়। তুমি একটু বোঝাতে পারো তো। বাবাইয়ের সঙ্গে কথা বলো...
-আসল কথাটা বলো না! বোনের কথা বলতে গায়ে জ্বালা ধরছে। তাই আমার ছেলের কথা তুলেছ। যাও নিজের মা-ভাই-বোনকে গলার মালা করে নিয়ে থাকো। আমি আর আমার ছেলেরা খারাপ তো? থাকতে হবে না আমাদের সঙ্গে। আমি খুব জানি.... তোমার মনে কী চলে.... শুধু আমার মতো মেয়েমানুষ ব'লে সারাজীবন মুখ বুজে ঘর করে গেল.... রাবণের গুষ্টির দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে নিজের সমস্ত শখ-রঙ বিসর্জন দিয়ে গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিল। ঐ ছোট'র মতো মেয়েমানুষ হওয়া দরকার ছিল। কত বুদ্ধি! আগেই পাকাপাকিভাবে বাড়ি-হাঁড়ি ভিন্ন করার পথ বাতলে, তবে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। নামেই নাগের বাড়ির ছোটবৌ! অথচ দেখো, একটা কাজে-কর্মে দায়িত্বে কর্তব্যে পায় না। শ্বশুরবাড়ির ঘর করা কাকে বলে, সে তো জানলোই না। এত পুজো-আচ্চা যায়, সে অতিথির মতো ঘুরতে আসে, আর সুযোগ পেলেই চুলবুল করে তার মুখের বুলি ছোটে। ও মেয়েমানুষের যুক্তির ঠেলায় জগৎ অন্ধকার। প্রথম থেকেই ভিন্ন হয়ে কেমন সুন্দর বরের কোলে চড়ে চুটিয়ে সংসার করছে দ্যাখো। আর আমি? এখানে হেঁশেল ঠেলে মরছি। গতর পুড়িয়ে সবার জন্য করেও মরো, আবার মানুষের কথা শুনেও মরো। সব কপাল গো! পোড়া কপাল! যতই করো, এদের মন আর পাবে না.... সময় থাকতে থাকতে বেহায়া মেয়েটার একটা গতি করতে চাইছি। তা কেউ আমার কথার মান দিলে তো! এরপর লোকে বলবে, তিন-তিনটে দাদা মাথার ওপর থাকতে বয়সকালে মেয়েটার বিয়ের চেষ্টা কেউ করেনি। মেজজনের সাত চড়ে রা নেই। কোনও মান-অপমান বোধ নেই। ছোটজন শুনতেও আসবে না। যত দায় আমার একার...
তৃণার বুজে আসা কান্নাভেজা কণ্ঠে মৃগাঙ্কর হাত থেকে কলম নেমে গেল। হিসেবের খাতায় অনিচ্ছাকৃত গরমিল হয়ে গেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বিছানায় বসে অভিমানী তৃণার হাত থেকে হাতপাখা কেড়ে নিয়ে বাতাস করতে করতে মৃগাঙ্ক বলল,
-ঠিক আছে, কাল বাবাইয়ের সঙ্গে না হয় আমিই কথা বলব। তুমি কী বলছিলে বলো?
-থাক, আর শুনে কাজ নেই!
-আমার ঘাড়ে ক'টা মাথা, যে তোমার কথা না শুনে যেচে স্কন্ধকাটা হবো!
-কী বললে?
-বলো বলো।
অতি উৎসাহে মৃগাঙ্কর হাত থেকে পাখা কেড়ে জোরে জোরে বাতাস করতে করতে তৃণা বলল,
-সেই সেবার ছোটকার নাতির অন্নপ্রাশনে বাপেরবাড়ি গেলাম.... তখন বিন্তিপিসির ছোট ছেলেটার জন্য কাকিমা একটা মেয়ে দেখে দেওয়ার কথা বলছিল। কাকিমা বলছিল, শ্বশুর ঘরজামাই রাখলেও তাদের কোনও আপত্তি নেই। সেই তো নিজের বাড়িতে তিনবেলা শুয়ে-বসে অন্ন ধ্বংস করছে। তার চেয়ে শ্বশুরবাড়ির ভাত খাক। তবু ছেলেটার একটা গতি হোক। ছেলে কিংবা বৌ নিয়ে ওদের এত মাথাব্যাথা নেই। আমি ঠিক করেছি, ওর সঙ্গেই আহ্লাদীর বিয়ে দেব।
-ঐ ছেলে? কিন্তু ওর চালচলন তো...
-শোনো, তোমার বোনের জন্য ঐ ঠিক আছে। ও মেয়েকে বিয়ে করার জন্য নিশ্চয়ই আকাশ থেকে টুপ করে রাজপুত্তুর খসে পড়বে না.... ভালো ছেলে যে খুঁজতে চাও, নিজের বোনের গুণ বাইরের লোকের কাছে বলতে পারবে?
-তাই বলে ঘরজামাই? ভালোভাবে ভেবে দেখো, বিয়ের পরেও কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে এখানেই থাকবে। সব ঝামেলা তোমার ওপর এসে পড়বে। তখন কিন্তু আমাকে কিছু বলতে পারবে না!
-এতদিনে তুমি আমাকে এই চিনলে হ্যাঁ? ঘরজামাই কে রাখবে? ও মেয়েকে ঘর থেকে বের করার জন্য আমি কিনা বিয়ের কথা বলছি, তার জামাইকে আবার নাকি ঘরে বসিয়ে জামাই আদর করে পাত পেড়ে খাওয়াব! ওটাই বাকি আছে। আমার বুদ্ধিটা শোনো। আমবাগানের কোণে এক টুকরো জমিতে একটা ছয়-ছোট্ট একতলা ঘর তুলে দাও। আর তোমার দোকানে ছেলেটাকে কাজে নিয়ে নাও। এই বাজারে মাগনায় কাজের লোক আর পাবে তুমি? শশী ঠাকুরপোর মতো ওর হাতেও না হয় মাসের প্রথমে কিছু টাকা গুঁজে দেবে। নিজেদের দোকানে থাকলে ওরা বেশি কথা বলতে পারবে না। এদিকে ঘরের সম্পত্তি ঘরেও রইল, আবার সমাজের পাঁচটা মানুষকে দেখানো হল যে বড়দা দাঁড়িয়ে থেকে জমি বাড়ি দিয়ে শাড়ি-গয়নায় গা সাজিয়ে বোনের বিয়ে দিয়ে নিজের কর্তব্য পালন করেছে। এতে সবদিক রক্ষা হবে, আর বিয়ে দিলে ঐ মেয়ের গায়ের গরমও মরবে। বিয়ে দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে দাও। তারপর ঘরে খিল এঁটে বন্ধ দরজার ওপারে যা খুশি করুক.... এই হপ্তাতেই তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলবে, বুঝলে?
-তোমার এত বুদ্ধি গিন্নি!
-আ মরণ! বুড়োর কথা শুনলে গা জ্বলে যায়। এই আমার বুদ্ধি ছিল বলেই তো এখনো বিষয়-সম্পত্তি সব হাতের মুঠোয় রয়েছে। নইলে কবে সব বারো ভূতে লুটেপুটে খেয়ে নিত। হাওয়া করো হাওয়া করো। গরমে আমার গা একেবারে জ্বলে গেল গো...
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গ্রামের সীমানা পর্যন্ত অন্ধকারের শিকড় রাজ্যবিস্তার করেছে। আহ্লাদীর মাসিক অসুবিধার কারণে মাধবীলতা আশ্রয় নিয়েছে চিলেকোঠার ঘরে। শেষরাতে ঘরের দরজা খুলে চুপিচুপি বেরিয়ে গেল আহ্লাদী। অন্ধকারের বেড়া ছিঁড়ে মাঠের প্রান্তে পৌঁছনোর পর, আহ্লাদী সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি শুনতে পেল। ক্ষেতের পাশের সরু রাস্তার ওপর সাইকেলটা পড়ে রইল। গাছের আড়ালে দুটি দেহ পরস্পরের মধ্যে যেন মিশে যেতে চাইছিল। প্রেমিকের অস্থির হাত আপন যোনির প্রান্ত থেকে টেনে সরিয়ে মৃদু আপত্তি জানাল আহ্লাদী। নিদারুণ অসময়ে নারীর উরুসন্ধিতে প্রবেশাধিকার না পেয়ে আহ্লাদীর কোমল ঠোঁট ও উন্নত স্তনযুগলের নীরব নৈবেদ্য গ্রহণ করল কাঙ্খিত পুরুষ।
নাগের বাড়ির অলিখিত কর্ত্রীর দাপটে দিনকয়েকের মধ্যেই এক গোধূলি বিকেলের আলো গায়ে মেখে পাত্রপক্ষের সঙ্গে স্বয়ং পাত্রের আবির্ভাব ঘটল। সেই রাতেই ঘরের দরজা বন্ধ করে চাপা স্বরে অঙ্কনের ওপর ক্ষোভ উগড়ে দিল উত্তরা।
-এই ছেলের সঙ্গে আহ্লাদীর বিয়ে হবে? বড়দিভাই আর ছেলে খুঁজে পায়নি? এটা ছেলে? নাকি মেয়ে! অঙ্কন এ বাড়ির কারও পরোয়া আমি করি না। কাউকে বোঝানোর দায়ও আমার নেই। কিন্তু তুমি? তোমাকে নিশ্চয়ই আলাদা করে বোঝাতে হবে না। প্রকৃতির নিয়মে মুখে খানকতক দাড়ি-গোঁফ গজালেই সে পুরুষমানুষ হয়ে যায় না অঙ্কন। ঐ মানুষটা মনেপ্রাণে পুরুষ তো? তার নিজের ভাইপো তাকে হাফ লেডিজ ছোটকা বলে ডাকছে, হাত পা নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে জিভ ভেংচি কেটে ব্যঙ্গ করছে। বাচ্চার আর কী দোষ? এগুলো বাড়িতে দেখছে বলেই তো এতটুকু বাচ্চা ছেলে শিখছে। তার মানে নিজের বাড়িতে ঐ মানুষের জায়গাটা বুঝতে পারছ? যে নিজের জন্যই স্ট্যান্ড নিতে পারে না, তার বৌয়ের কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ? আহ্লাদীর জন্য বড়দাভাই এটা কী ধরে এনেছে? অঙ্কন এই বিয়ে তোমাকে ভাঙতেই হবে।
-বোঝার চেষ্টা করো উত্তরা, এই সম্বন্ধ বড় বৌদি এনেছে। মা নামেই এই বাড়ির অভিভাবক। বড় বৌদির ইচ্ছে ছাড়া এ বাড়ির উঠোনে একটা পাতাও ঝরে পড়ার সাহস দেখাতে পারে না।
-আমাকে বিয়ে করলে কী করে? পরিবারের সবার বিরুদ্ধে গিয়েই তো? নিজের মায়ের অবাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছ তো? তোমার দুই দাদা বাধ্য হয়েছিল দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের বিয়েটা দিতে। নিজের ভালো বুঝে জেদ করে নিজে বিয়ে করতে পারলে, ঐরকম জেদ দেখিয়ে লড়াই করে বোনের বিয়েও ভাঙতে পারবে। মানছি আমাদের মেয়ের মধ্যে খুঁত আছে। কিন্তু তাই বলে ঐরকম একটা মানুষের গলায় আহ্লাদীকে ঝুলিয়ে তোমরা দায় সারবে? এ বিয়ে আমি ভেঙেই ছাড়ব। এবার তুমি ঠিক করো, কাল সকালে বড়দাভাইয়ের সঙ্গে তুমি কথা বলবে, নাকি আমি!
-আমি বড়দার সঙ্গে কথা বলতে পারব না। তাছাড়া তুমি একা ছেলেকে দেখোনি। সবাই দেখেছে। মেজদা তো কিছু বলছে না। তবে তুমি কেন এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছ? বিয়েটা হলে হয়ে যাক না! বিয়ের পর বোন যদি একটু স্থির হয়! যদি সংসারে মন বসে...
খোলা জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল উত্তরা। বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ছে। অঙ্কন পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে উন্মুক্ত চুলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে বলল,
-আমরা এ সবকিছু থেকে অনেক দূরে থাকি উত্তরা। অতিথির মতো বাড়িতে বেড়াতে আসি। কী দরকার সব বিষয়ে কথা বলার? তারা তো আমাদের মধ্যে কথা বলতে আসে না। যেচে কথা শোনার কী দরকার? পরে তোমাকে যদি কেউ বলে বসে, উত্তরার জন্য আহ্লাদীর সংসার করা হল না.... তখন আমার শুনতে ভালো লাগবে? বড়রা যা করছে, করতে দাও না। টাকা-পয়সা, গয়না যা লাগবে, দিয়ে আমরা চলে যাব। তারপর যারা কাছে থাকবে, যারা দেখেশুনে বিয়ে দিচ্ছে, তারা বুঝে নেবে। কাজকর্ম মিটে গেলে আমরা ট্রেন ধরব। এই সবকিছুর থেকে দূরে নিজেদের পৃথিবীতে হারিয়ে যাব। এবার একটু নিজেদের কথাও তো ভাবতে হবে। কতদিন আর তুমি-আমি থাকব? আমরা হতে হবে না? তোমার-আমার মধ্যে একটা ছোট্ট মানুষ আসবে, ছোট্ট ছোট্ট হাত, ছোট্ট ছোট্ট পা.... নিজের তৈরি করা ছোট্ট একটা প্রাণকে কোলে নেওয়ার জন্য আর কত অপেক্ষা করতে হবে আমাকে?
অঙ্কনের হাতে চুমু খেয়ে উত্তরা আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলল,
-আদর করার সময় বারবার জানতে চাও কেন, আমার ভালো লাগছে কিনা! বিয়ের তো কম দিন হল না, এখনো আমাকে খুশি করতে চাও?
-হুম.... যতদিন আমার শরীরে ক্ষমতা থাকবে, ততদিন তাই চাইব।
-কেন? ভয় হয়? তুমি আমাকে খুশি করতে না পারলে, আমি অন্য কোথাও সুখ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করব? নাকি মেল ইগো! পার্টনারকে সুখ না দিতে পারলে বুকের ভিতরে কোথাও অক্ষমতার আগুন দপ করে জ্বলে ওঠে!
-কেন? আমি কি তোমাকে সুখ দিতে পারি না? আগে কোনোদিন বলোনি তো!
-যা জিজ্ঞাসা করছি, তার উত্তর দাও।
-এতশত জানি না উত্তরা। তোমাকে ভালো রাখতে পারলে, আমি আর কিছু চাই না। তোমাকে তৃপ্ত দেখার পর নিজের ক্লান্তি গায়ে লাগে না। শরীরের থেকেও বেশি মন তৃপ্ত হয়।
-সেটাই স্বাভাবিক! আর কারও যদি সেই ক্ষমতাটাই না থাকে! কেউ যদি স্ত্রীকে খুশি করতে না পারে!
-মানে?
-ঐ ছেলেটি অঙ্কন, যার সঙ্গে আহ্লাদীর বিয়ে দেওয়ার জন্য বড়দিভাই উঠে-পড়ে লেগেছে.... ঐ ছেলেটিকে দেখে আমার ভালো লাগেনি। তুমি একটা জিনিস কেন বোঝার চেষ্টা করছ না? সংসার মানে একটা ঘর। ঘরের ভিতর নিজেদের একটা বিছানা, সম্পূর্ণ নিজেদের কিছু মুহূর্ত। আর সেখানে কোনও অতৃপ্তি মন মানে না। ওখানে ফাঁক থাকলে ঘর বলো কিংবা সংসার, সব উচ্ছন্নে যাবে। আহ্লাদীকে যে কারণে তোমরা বিয়ে দিতে চাইছ, সেটাই হবে না অঙ্কন। মিলিয়ে নিও আমার কথা! ঐ ছেলে ওকে ঘরে আটকাতে পারবে না। এখন এ বাড়িতে আছে। তোমরা টাকা-পয়সা লোকবল দিয়ে সবকিছু চাপা দিয়ে দিচ্ছ। বিয়ের পর যদি ঘরে সুখ না পেয়ে পরপুরুষের সঙ্গে আবার ঘর ছাড়ে, তখন কুৎসা রটবে না? কী করবে তোমরা তখন? ভেবে দেখেছ কিছু?
-দেখো উত্তরা, আমি বড়দার সামনে এসব...
দরজার শব্দ শুনে দাম্পত্য আলাপ মাঝপথেই থেমে গেল। অঙ্কনের আলিঙ্গন থেকে মুক্তিলাভ করে দেওয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে উত্তরা এগিয়ে গেল দরজার দিকে। দরজা খুলে উত্তরা দেখল, বাইরে অপরাধীর মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিধি। চাপা কণ্ঠে নিধি বলল,
-ঘুমিয়ে পড়েছিলি ছোট? এত রাতে বিরক্ত করলাম...
-না না মেজদিভাই, এসো এসো। ভিতরে এসো। এখন তো আমাদের সন্ধেরাত। বাড়িতে থাকলে এই সময় তোমার ঠাকুরপো সোফায় বসে পা দুলিয়ে লাস্ট রাউন্ড চায়ের অর্ডার দেয়। আমাদের ডিনার করতে করতে সেই রাত সাড়ে এগারোটা। তুমি এসো, ভিতরে এসে বসো।
-আমাদের এদিকে তখন মাঝরাত রে। সকাল সকাল উঠে তোর মেজদাকে মাঠে যেতে হয় তো। তোর সঙ্গে খুব দরকার ছোট, তাই এত রাতে একটু কথা বলতে এলাম। জানিসই তো সংসারের পরিস্থিতি। সকালে সবার সামনে মুখ খুলে একটা কথা বলার উপায় নেই।
-তোমরা কথা বলো বৌদি। আমি একটু ছাদ থেকে ঘুরে আসি। উত্তরা আমি আসছি।
-এই মা ছাদের ঘরে ঘুমোচ্ছে। সিগারেট ধরাবে না।
নিধি খাটের ওপর গুছিয়ে বসে ব্যস্ত হয়ে বলল,
-ঠাকুরপো, যেও না। তোমার সঙ্গেও কথা আছে। তুমি একটু থাকো।
-কী হয়েছে বৌদি?
-বলছি ছোট.... বিকেলে ছেলেটাকে দেখলি তো। তা কেমন লাগল তোদের? আমার জানি কেমনধারা লাগল। পুরুষ মানুষের অমনধারা মেয়েমানুষের মতো আচরণ কেন রে? হাঁটাচলা দেখলি? কথাবার্তা কেমন মেয়েলি না? শরীরে শক্তপোক্ত না হলে ঠিক পুরুষ মানুষ ব'লে ঠাওর হয় না। কিন্তু বড়দি এই সম্বন্ধ এনেছে। তার কুটুমের মধ্যে সম্বন্ধ, জোর দিয়ে কিছু বলতেও পারছি না। আমি তোদের মেজদাকে এই কথা বলে তোদের মতামত নিতে এলাম। তোরা কী বলিস ছোট? ছেলে তোদের পছন্দ হয়েছে? এই বিয়েতে তোরা রাজি?
মৃদু হেসে সরাসরি অঙ্কনের দিকে চাইল উত্তরা। স্বামী-স্ত্রীর অর্থপূর্ণ দৃষ্টির বিনিময়ে ঘরের ভারী বাতাস যেন খানিক হালকা হল।
(চলবে....)
ছবি : সংগৃহীত

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট