ফ্রেমের বাইরে কেউ
সাথী দাস
অষ্টম পর্ব
।। লাস্ট আপলোড ।।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে সাম্পান নিজের ফোনটা ফেরত পেয়েছে। ওর ফোনে তেমন আপত্তিজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। এমনকি অবন্তীর সঙ্গে কোনও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের এক টুকরো ছবি পর্যন্ত ছিল না। অবন্তীকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ দু-চারটে ছবি, যা কোনোভাবেই ওকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে না।
থানা-পুলিশ নিয়ে জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। সাম্পান হোটেল কিংবা সমুদ্র সৈকত ছেড়ে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়নি। তবে নিজের বাড়িতে ফোন করে জানানো হয়েছে, সাম্পান সমুদ্র ভ্রমণের মেয়াদ খানিক বাড়িয়ে নিয়েছে। সেই দিক থেকে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে। কিন্তু সে আর কতদিনের জন্য! দুশ্চিন্তায় সাম্পানের কপালে ভাঁজ পড়েছে। এই দুশ্চিন্তা কেবল ওর নিজের জন্য নয়। জলজ্যান্ত মেয়েটা হঠাৎ এভাবে উধাও হয়ে গেল কোথায়!
অবন্তীর মায়ের কান্নার তীব্রতা খানিক কমে এসেছে। তবে অবন্তীর বাবা ভীষণ রকম চুপ করে গেছে। তাকে দেখলে হঠাৎ মনে হয়, পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কোনও আতঙ্ক প্রতি মুহূর্তে মানুষটাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
অবন্তীর প্রোফাইলে ঢুকে বসেছিল সাম্পান। ফোন ঘেঁটে ওর সর্বশেষ পোস্টটা দেখছিল। সমস্ত দিন অবন্তী সঙ্গে থাকায় ফোন খুলে ওর পোস্টগুলো দেখা হয়নি। এখন খুব খুঁটিয়ে সাম্পান দেখল, শেষ কয়েকটা ভিডিওতে অবন্তীর কথাবার্তা এমনকি চোখের দৃষ্টিও যেন একটু অসংলগ্ন ছিল।
বালিশে মাথা রাখতেই সাম্পানের চোখদুটো কালঘুমে ভেঙে আসতে চাইল। কিন্তু ও একের পর এক ভিডিও দেখে চলল। ভিডিওতে কোথাও কিছু নেই। তবে অবন্তীর দু'চোখে জেগে রয়েছে কেমন এক আতঙ্ক, নীরব অস্থিরতা। কিংবা বলা যায়, কারও আদেশ একমনে পালন করে চলেছে সে। অবন্তীর ফোন পুলিশের কাছে জমা রয়েছে। ওটা ঘেঁটে যদি কোনও সূত্র পাওয়া যেত, তবে হয়তো ওর এই আকস্মিক অন্তর্ধান রহস্যের কিছু কিনারা করা সম্ভব হত।
চোখ বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে ছিল সাম্পান, ভাবছিল একের পর এক কথা। প্রত্যেকটা সূত্রকে এক জায়গায় রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হিসেব মেলেনি। অবন্তীর বাবার দৃষ্টিতে উদ্বেগ যথেষ্টই রয়েছে, তবে সেই সঙ্গে তার অস্থির দৃষ্টি যেন পথেঘাটে কিছু খুঁজছে। ওই ভদ্রলোকের মধ্যে সমস্ত দিন ধরে একটা অস্থিরতা দেখেছে সাম্পান।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ভিডিওতে অবন্তী হাসছে, কখনও আবার গম্ভীর হয়ে পিছু ফিরে দেখছে। অবন্তী বলেছিল, ওকে যেন এখানে টেনে আনা হয়েছে। ও নিজে আসতে চায়নি। এই কথার অর্থ কী? বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও কিছু নেশার ঘোরে বকে যাওয়া প্রলাপ ভেবে এত সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দরজা খুলে হোটেলের বারান্দায় পৌঁছতেই মুখোমুখি দেখা হল অবন্তীর বাবার সঙ্গে। বিপরীত দিকের হোটেলে যে ঘরে অবন্তী ছিল, ঠিক তার পাশের ঘরেই ওরা রয়েছে। অবন্তীর ঘরের মধ্যে যে বৃত্ত দেখা গিয়েছিল, তা কে এঁকেছে? ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চুলগুলোই বা কার?
রহস্য ঘনীভূত হতে হতে সাম্পানের উত্তেজনা অস্থিরতা একেবারে চরম সীমায় পৌঁছেছে। একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগের আশায় সাম্পান বারান্দায় এসেছিল। কিন্তু অবন্তীর বাবার ইশারা ওর কপালে গভীর ভাঁজের জন্ম দিল। ভদ্রলোক ডাকছেন ওকে। ধূমপানের আশা বিসর্জন দিয়ে হোটেল ছেড়ে রাস্তায় নেমে এল সাম্পান। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় একটা। ঘুমে ঢলে পড়া দারোয়ান সাম্পানের দিকে একটু অদ্ভুত দৃষ্টিতে চাইলেও বিশেষ হৈ-হল্লা বা আপত্তি করেনি।
-আমার মেয়ের সঙ্গে যদি তোমার কোনও সম্পর্ক থাকে, তবে তুমি আমায় বলতে পারো।
-আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার সামান্য বন্ধুত্বও নেই। সম্পর্ক তো দূরের কথা। আলাপ হয়েছে এখানে এসে। আপনি বিশ্বাস না করলে আমার সত্যিই কিছু করার নেই।
-একটা কথা ওর মাকে আমি বলতে পারছি না। পৃথিবীর কাউকে কখনও বলতে পারিনি।
-কী কথা? কী হয়েছে?
অবন্তীর বাবার দিকে চেয়ে সাম্পানের মনে হল, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র অসহায় মানুষটার সামনে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দু'চোখে ভয় আর অবিশ্বাসের মিশেল স্পষ্ট। হঠাৎ সাম্পানের হাত ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগল অবন্তীর বাবা।
-পুলিশকে আমি সব কথা বলতে পারিনি বাবা।
-আপনি আগে বসুন এখানে। পড়ে যাবেন।
-আমার মেয়ে নিজে এখানে আসেনি। তাকে আনা হয়েছে। ওই মেয়ে আমার সব, ওকে তুমি বাঁচাও। ওকে খুঁজে বের করো। আমার ভুলের শাস্তি ও পেতে পারে না।
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সাম্পান। এই একই কথা ও অবন্তীর মুখেও শুনেছে। সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে গেল। কার্য-কারণ খুঁজে পেতে বেশি কষ্ট করতে হল না। এ যেন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনও গভীর অথচ গোপন রহস্যের উদঘাটন হতে চলেছে।
-একটু খুলে বলুন তো, কী বলতে চাইছেন!
ঘড়িতে রাত দুটো। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে অবন্তীর বাবা বলল, 'তার গালে একটা কাটা দাগ ছিল। ওই মুখ আমি কখনও ভুলব না বাবা, কোনও দিনও না.... আমি ইচ্ছে করে তার মেয়েকে ছেড়ে দিইনি। আমি বুঝতে পারিনি। নিজের মেয়ের কাছে পৌঁছনোর জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম.... আমার মেয়ে আমাকে না জানিয়ে কিছুতেই সমুদ্রে বেড়াতে আসবে না। নিশ্চয়ই এসব তার কীর্তি।'
জনবহুল শহরের বুকে বসে এসব গল্পকথা শুনলে সাম্পান হয়তো হেসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু বাতাসে নোনা গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন, সেই সঙ্গে গা ছমছমে অন্ধকার। হঠাৎ দূরে চাইলে মনে হয় শত-শত প্রেত অট্টহাসি হেসে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। এই অবস্থায় মন দুর্বল হয়, ফেলে আসা অতীতকে এত সহজে অস্বীকারের সাহস হয় না।
সমুদ্রের শব্দ যেদিক থেকে ভেসে আসছে সেদিকে চেয়ে সাম্পান বলল, 'আপনিই বলুন, কোথা থেকে শুরু করব আমরা?'
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন