অনুসরণকারী

শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

ফ্রেমের বাইরে কেউ অন্তিম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

অন্তিম পর্ব



                                                          ।। স্ক্রিনে যে মুখ ফিরে আসে না।। 


অবন্তীর বাবার সঙ্গে কথা বলে সাম্পান জানতে পারল, তার স্মৃতিতে লোকটার মুখের আদল ঝাপসা হয়ে এলেও, গালের কাটা দাগটা আজও ভদ্রলোককে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায়। গালে একটা কাটা দাগের ওপর ভিত্তি করে কি একজন আস্ত মানুষকে খুঁজে বের করা আদৌ সম্ভব? এছাড়া আর উপায়ই বা কী! পুলিশের কাছে গিয়ে এ কথা বললে বিষয় আরও জটিল, অবিশ্বাস্য এবং হাস্যকর হয়ে যাবে। 


সাম্পানের কাছেও যে এই অতীতের স্মৃতি খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নয়। তবে অবন্তীর শেষ কয়েকটা ভিডিওতে ওর অসংলগ্ন কথাবার্তা সাম্পানকে ভাবিয়েছে। একটা গোটা দিন ওর সঙ্গে কাটিয়েছে সাম্পান। মেয়েটা হয়ত সাহায্যও চেয়েছিল। সাম্পান বুঝতে পারেনি। সেই অপরাধবোধ থেকে অন্তত একটা দিন নিজেরা চেষ্টা করে দেখাই যায়। 


দুশ্চিন্তাকে সঙ্গী করে রাত কাটল কোনোক্রমে। পরদিন ভোরবেলা কোন এক অজ্ঞাত কারণে অবন্তীর বাবা এবং সাম্পান সমস্ত দিন হোটেলের বাইরে সময় কাটিয়ে এল। দু-একবার কান্নায় বুক ভাসানো ছাড়া একাকী অবন্তীর মায়ের আর কোনও কাজ ছিল না। দুপুর গড়িয়ে যখন প্রায় বিকেল হয়ে আসছে, তখন ওরা হোটেলে ফিরল। সাম্পানের মুখে নেমে এসেছে অন্ধকার। অবন্তীর বাবার মুখেও আলো জ্বলে ওঠার মতো কোনও কারণ দেখা যায়নি। 


দু'দিনব্যাপী সমুদ্র সৈকতসহ সমুদ্র সংলগ্ন এলাকায় হন্যে হয়ে খোঁজার পর তখন সাম্পান হতাশ হয়ে আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গেলে কেবল বাঁকা কথা শুনতে পাওয়া যায়। তবুও হাল ছাড়েনি অবন্তীর বাবা। মেয়েকে জীবন্ত কিংবা মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করাই তখন তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। 


ঘোর অমানিশায় সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে সাম্পানের মনে হল, ওটা পৃথিবীর কোনও জায়গা নয়। অন্য কোনও অচেনা জগতের দোরগোড়ায় সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আকাশে চাঁদ নেই, তারা নেই। যতদূর চোখ যায়, কেবল ঘন কালো অন্ধকার। 


যেন কেউ ইচ্ছে করেই আকাশের যাবতীয় আলো নিভিয়ে দিয়েছে। অন্ধকারেই রাত্রির যত সৌন্দর্য। কিন্তু এমন নিকষকালো রাত্রি সাম্পান এর আগে কখনও দেখেনি। যেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে যত রাজ্যের অশুভ ইঙ্গিত ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। 


সমুদ্রের একটানা গর্জন শোনা যাচ্ছে। ভারী, শ্বাসরোধ করা একটা শব্দ। মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোনও দানব সমুদ্রের অতল থেকে উঠে আসতে চাইছে। 


ভেজা বালির ওপর পা রাখলে কেমন একটা সোঁ সোঁ ঠান্ডা অনুভূতি উঠে আসে। যেন বালি নয়, কারও জমাট বাঁধা নিশ্বাস। মানুষের বুকের ওঠানামার মতো জলে ভিজে বালুতট বসে যায়। তারপর আবার রোদ পেয়ে জেগে ওঠে। ঢেউ ভেঙে আসে আর ফিরে যায়। প্রতিবারই আগের চেয়ে একটু বেশি রাগ নিয়ে, একটু বেশি শব্দ করে। মাঝে-মাঝে ফেনার ভেতর অদ্ভুত সব ছায়া নড়েচড়ে ওঠে। সে কি কেবল সাম্পানের চোখের ভুল? নাকি সত্যিই কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অস্থিরচিত্তে তাদের অস্তিত্ব বোঝা যায় না।


হাওয়ার সঙ্গে নোনা গন্ধ মিশে আছে। তার ভিতরে কেমন একটা পচা পুরোনো গন্ধ। রক্তের গন্ধ, মাছের আঁশটে গন্ধ। বুঝি বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা কোনও রহস্য হঠাৎ জেগে উঠেছে। দূরের গাছগুলো অন্ধকারে বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে, অনেকটা হাত ছড়িয়ে ডাকার ভঙ্গিতে। 


ভয়ের কোনও কারণ নেই। তবু বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা শিহরণ জেগে উঠতেই সাম্পান মুখটা ফিরিয়ে নিল। এরই নাম কি ভয়? সাম্পানও কি তবে ভয় পাচ্ছে! পুরো সৈকত জুড়ে অস্বস্তিকর নীরবতা, যেটা সমুদ্রের শব্দ সত্ত্বেও ভাঙে না। বরং আরও চেপে বসে বুকের ওপর। 


এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন সৈকতে দাঁড়িয়ে সাম্পানের মনে হল, ও একা নয়। অবন্তীর বাবা ছাড়াও ওর আশেপাশে আরও কেউ আছে, কিছু একটা আছে। শুধু সেটা কে বা কী, ওটাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন! যে প্রশ্ন মনে জেগে উঠতেই সাম্পানের প্রাণে বিভীষিকা জন্ম নিল। 


-আমার মেয়েটাকে কি তবে সমুদ্র গিলে খেল? আমি পারলাম না ওকে বাঁচাতে? সেবার সমুদ্রের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলাম ওকে। এবার আর পারলাম না। আমাকে এভাবে একা করে দিয়ে ও...


চাপা কান্নায় হারিয়ে গেল অবন্তীর বাবার শেষ কথাগুলো। হয়তো তার কাছে বলার মতো নতুন কিছু ছিল না। সাম্পানের কাছেই বা নতুন করে শোনার মতো কি থাকতে পারে! একজন মানুষকে তিলে তিলে ভেঙে পড়তে দেখেও সাম্পানের কিছুই করার ছিল না। 


-রুমে চলুন প্লিজ। এভাবে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘুরে বেড়ালেই কি অবন্তীকে খুঁজে পাওয়া যাবে? পুলিশ তো নিজের কাজ...

-কিচ্ছু করবে না পুলিশ। আমি মেয়েকে না নিয়ে কোথাও যাব না। 

-আচ্ছা, এখন ফিরে চলুন। 


সাম্পানের জোরাজুরিতে উঠে দাঁড়াল অবন্তীর বাবা। জীর্ণ দেহটাকে টেনে টেনে নিয়ে চলল কেবল। 


-না না.... না বলতে নেই। খোদার ওপর খোদকারি কেউ করে! ও ডাইনি যাকে নেবে ঠিক করে, তাকে নিয়েই ছাড়ে। দু'দিন আগে আর পরে... 

-কে! 


সমুদ্র সৈকত থেকে কিছু দূরে লোহার বেঞ্চের এককোণে বস্তা গায়ে জড়িয়ে বসে রয়েছে একজন পাগলের মতো ভিখারি। কিন্তু তার কথাবার্তা বিকৃত মস্তিষ্কসুলভ নয়। অবন্তীর বাবার আগেও সাম্পান পিছু ফিরল। লোকটাকে মাটি থেকে টেনে বেঞ্চের ওপর ফেলে চেপে ধরল। 


-মানে! কে ডাইনি? 

-দুটো ভাত দিবি আমায়? তিনদিন খেতে পাইনি রে!

-কে ডাইনি? 

-ওই যে, ও। আমার ব্যাটাকে খেয়েছে। মাছ ধরতে গেল। একেবারেই গেল। ও সমুদ্র না। ও ডাইনি। দে না বাবা! দুটো ভাত! আমার ব্যাটা মরে গেল। কী খাব আমি? 


অবন্তীর বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ডুকরে কাঁদছে। লোকটাকে ছেড়ে পকেট হাতড়ে একটা দশ টাকার নোট বের করে সাম্পান বিরক্ত হয়ে অবন্তীর বাবাকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। ভিখারিটা একনাগাড়ে প্রলাপ করছে। হঠাৎ একদম স্থির হয়ে গেল সাম্পানের দুটো পা। 


-আমার কি তেমন বুকের পাটা আছে রে বাপ! আমি কি নারার মতো মরা বেটি ফেরাতে পারি! যে বেটি আমাকে দুটো ভাত দেবে! 

-কী! কে মেয়ে ফিরিয়েছে? 


ময়লা, ছেঁড়া কাপড়ে মোড়া ভিখারিটা রাস্তার ধারে বসে থাকে। অবন্তীর সঙ্গে সমুদ্র সৈকতে যেদিন সাম্পান এসেছিল, সেদিন ওকে দেখেছে। কিন্তু তেমন গুরুত্ব দেয়নি। অবহেলায় ছুঁড়ে দেয়নি একটা পয়সাও। মুখ ফিরিয়ে চলে গেছে। যেন ওর কোনও অস্তিত্বই নেই এই পৃথিবীতে। আজ ওই ভিখারিটাকেই খুব ভালো করে দেখল সাম্পান। 


যেন শহরের কোলাহলের মধ্যে এক নিঃশব্দ ছায়া। তার চুল ও দাড়ি জট বেঁধে শক্ত হয়ে গেছে। ধুলো আর ঘামের স্তরে গায়ের আসল রঙ হারিয়েছে। মুখের চামড়া রোদে পুড়ে খসখসে। চোখ দুটো গভীর গর্তের মতো। ক্লান্তি আর দীর্ঘ অভাবের ছাপ সেখানে স্পষ্ট। গায়ে দেওয়া জামাটি বহুদিন ধোয়া হয়নি। কোথাও কোথাও ছিঁড়ে সুতো ঝুলে আছে। পায়ের একপাটি জুতো, সেটাও ছিঁড়ে গেছে। কেবল স্মৃতির মতো টিকে আছে লোকটা। তবু তার বসে থাকার ভঙ্গিতে এক অদ্ভুত স্থিরতা জড়িয়ে রয়েছে। হাতের বাড়িয়ে একই ছন্দে সে ভিক্ষা চায়। কিন্তু দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকে অদম্য সহনশীলতা, যেন প্রতিদিনের অবহেলার মাঝেও সে মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকার দাবিটুকু ধরে রেখেছে। সাম্পান ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর। 


-নারা কে? আরও টাকা দেব। এই নিন। এই যে। সব টাকা আপনার। পেট ভরে ভাত খাওয়াব। বলুন না! নারা কে? তার মেয়ের কী হয়েছিল? 

-নারু পাগলা। বেশি লোভ করতে গিয়ে মাছ ধরা ছেড়ে লোক নে নৌকো বাইত। মেয়েটা ওর সঙ্গেই থাকত। নৌকো ডুবে আমার ব্যাটার মতো নারুর বেটিকেও ডাইনি খেয়েছে। ওই ডাইনির দিব্যি, আমি পোড়াকপাল মেনে নিয়েছি বাবু। কিন্তু নারু নাকি শয়তানকে বশ করে নিজের মেয়েকে ফিরিয়েছে। আমি বলি না, লোকে বলে। সেই বেটিকে নিজের কাছে রাখার জন্য এখন নাকি তার একটা শরীল চাই। 

-এই.... এই নারু পাগলা দেখতে কেমন? 


অবন্তীর বাবার বিস্ফারিত দৃষ্টির দিকে সাম্পান চাইতে পারল না। কন্যাস্নেহে অন্ধ দুই জন্মদাতার অদৃশ্য লড়াইটা অনুভব করে ওর চোখ ঝাপসা হয়ে গেছে। ভিখারি বলল, 'আলখাল্লার মতো জামা পরে ঘোরে। চোখ দুটো কটা। আর.... নারুর গালে একটা কাটা দাগ আছে।' 


ধপ করে বেঞ্চে বসে পড়ল অবন্তীর বাবা। সাম্পান আর বেশি প্রশ্ন করার সাহস পেল না। শুষ্ককণ্ঠে জানতে চাইল, 'নারুর বাড়ি কোথায়?' 


ভিখারিটা হেসে উঠল ফ্যাসফ্যাস করে। সর্দি বসে যাওয়া ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে ঘোৎঘোৎ করে বলল, 'সে আমি কী জানি বাবু! সে পাগলা কখন কোন শ্মশানে পড়ে থাকে! জ্যান্ত মানুষ ছেড়ে মড়া নিয়ে কারবার তার। ও বাবু! পেট ভরে ভাত দেবে বললে যে!' 


সাম্পান ছুটে এগিয়ে গিয়েছিল। আবার ফিরল। দুটো পাঁচশো টাকার নোট লোকটার হাতে গুঁজে অবন্তীর বাবাকে নিয়ে একটা অটোতে চেপে বসল। 


দুর্ঘটনার পর প্রায় দিন সাতেক সময় পেরিয়ে গেছে। সাম্পান সমস্ত অভিযোগের আগুনে জল ঢেলে নির্বিঘ্নে ফিরে গেছে নিজের বাড়িতে। অবন্তীও ফিরেছে নিজের ফ্ল্যাটে। তবে তার বাবা যেন একটা জীবন্ত লাশ ফিরিয়ে এনেছে। অবন্তীর মধ্যে সেই প্রাণোচ্ছল ব্যাপারটাই আর নেই। জ্বরে ভুগে কাহিল হয়ে পড়েছে সে। 


সেই অমাবস্যায় প্রায় শেষরাতে শ্মশান চত্বরে অবন্তীকে তন্নতন্ন করে খুঁজে হয়রান হয়েছে ওর বাবা আর সাম্পান। নারু পাগলার পরিচয় সকলে জানলেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। লোকটা যেন রাতারাতি হাওয়ায় মিশে গেছে। শ্মশান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটা পরিত্যক্ত ডাস্টবিনের পাশে তেল-সিঁদুরচর্চিত অবন্তীকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। ওকে ঘিরে গুটিকয়েক কুকুর গলা ছেড়ে ডাকছিল, ওর গা শুঁকে দেখছিল। তারপর কেঁউ কেঁউ করে ছিটকে সরে যাচ্ছিল দূরে। 


আজ সকালের পর থেকে অবন্তীর ধুম জ্বর ঘাম দিয়ে ছেড়েছে। ওর সঙ্গে ফ্ল্যাটেই ওর বাবা-মা রয়েছে। অসুস্থ মেয়েকে দেখাশোনার জন্য, সেই সঙ্গে প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের অহেতুক প্রশ্নবাণ এড়িয়ে যাওয়াটাও ছিল উদ্দেশ্য। বর্তমান পরিস্থিতিতে অবন্তীর বাবার একমাত্র ভরসা সাম্পান। অচেনা জায়গায় হাসপাতাল ও থানা-পুলিশের বিষয়টা ও একা হাতে এত সুন্দরভাবে সামলে নিয়েছে, যে কৃতজ্ঞতার খাতিরে অবন্তী একটু সুস্থ হতেই ওর বাবা সাম্পানকে নিজেদের ফ্ল্যাটে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসেছে। 


বৈঠকখানার সান্ধ্য আড্ডা ছেড়ে চায়ের কাপ নিয়ে ব্যালকনিতে উঠে এল সাম্পান। রান্নাঘর থেকে কী যেন ভাজার গন্ধ আসছে। চনমনে খিদেটা একটু সইয়ে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সাম্পান বলল, 'সে রাতের কথা বহুবার জানতে চেয়েও কোনও উত্তর পাইনি। ফোন করলেও ধরো না। তোমাকে এভাবে দেখতে ভালো লাগে না। ভিডিও বানানো কবে থেকে শুরু করবে? সেটা অন্তত বলো.... অবন্তী! কী দেখছ ওভাবে? তুমি চিনতে পারছ না আমায়?' 


দুটো জোনাকি যেন দপ করে জ্বলে উঠল অবন্তীর দু'চোখে। মুহূর্তের জন্য। তারপরই আলোটা হারিয়ে গেল। আধো অন্ধকারে মিশে জমাট অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল অবন্তী। সাম্পানের খুব অদ্ভুত লাগল। মৃদু ডাকেও মুখ ফেরাল না অবন্তী। 


চায়ের কাপ আর প্লেটটা দেওয়ালের ওপর রেখে অবন্তীর হাতটা সাম্পান ধরার চেষ্টা করেই ছিটকে গেল একহাত দূরে। কোনও জীবন্ত মানুষের দেহে এত ঠান্ডা হতে পারে! অবন্তীর হাতটা বরফের মতো শীতল। সরাসরি সাম্পানের দিকে চেয়ে রয়েছে অবন্তী। ওর চোখের মণির কালগর্ভ থেকে দুটো জোনাকি উঁকি দিয়েই হারিয়ে গেল। অবন্তীর অমন হিংস্র দৃষ্টির সঙ্গে সাম্পান পূর্বপরিচিত নয়। তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করতেই হাত লেগে অসাবধানতার কারণে চায়ের কাপ-প্লেটটা মেঝেতে আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে গেল। ব্যস্ত হয়ে ছুটে এল অবন্তীর বাবা। ততক্ষণে অবন্তীর মা গরম-গরম চাউমিন তৈরি করে টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। 


টেবিলের দিকে একবার চেয়েই মুখ ফিরিয়ে নিল সাম্পান। বড় বড় বাহারি বাটির মধ্যে ধোঁয়া ওঠা চাউমিন, পাশেই কাঁটা চামচ আর চপস্টিক। আতঙ্কে তখন সাম্পানের খিদে মরে গেছে। খুব জরুরি কোনও কাজ মনে পড়ে যাওয়ায় তখনই অবন্তীর ফ্ল্যাট ছেড়ে সাম্পান বেরিয়ে গেল।


সমস্ত রাত সাম্পান দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি। মন ভালো করার জন্য সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে ও  যেভাবে নাজেহাল হয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি সাম্পান চায় না। কিন্তু এভাবে নিজের পিঠ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসার জন্য অনুশোচনা যে একেবারেই ছিল না, তা নয়। তবে পরোপকারের মূল্য যদি নিজের জীবন ও পরিবারের সম্মান দিয়ে পরিশোধ করতে হয়, তবে তেমন উদারতা থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। 


নিজেকে অনেকরকম ভাবে সান্ত্বনা দিয়ে ভোররাতে সাম্পান একটু চোখ বন্ধ করেছে। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন না হলেও, তন্দ্রা নেমে এসেছে ওর দু'চোখের পাতায়। 


নেটদুনিয়ায় খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ। ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়ে সাম্পানের হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হল। কম্পিত হাতে প্রতিবেদনের লিঙ্কে ক্লিক করতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কতগুলো নির্মম অক্ষর... 


আরবান কুইন খ্যাত জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং মডেল অবন্তী নিখোঁজ হয়ে গেছে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট থেকে। ঘরের মধ্যে অবন্তীর বাবা এবং মাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পৈশাচিকভাবে খুন করা হয়েছে তাদের। অবন্তীর বাবা এবং মায়ের গলায় আমূল বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে চপস্টিক। ঘরের একটা জিনিসও স্থান পরিবর্তন করেনি। সুতরাং আন্দাজ করা যায় ডাকাতি এই খুনের উদ্দেশ্য নয়। 


প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, রাত আটটা নাগাদ অবন্তীকে ফ্ল্যাটের নিচে উদ্দেশ্যহীনের মতো ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। প্রতিবেশীরা প্রশ্ন করলেও কোনও সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। রাত আটটার পর অবন্তীর সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল? নেই উত্তর। পুলিশ এবং প্রশাসন কী বলছে? এ রাজ্যে মানুষের নিরাপত্তা কতটা? অবন্তী অন্তর্ধান রহস্যের নেপথ্যে কি রয়েছে আরও গূঢ় কোনও চক্রান্ত? অবন্তী কি আবার হাসিমুখে ধরা দেবে মুঠোফোনের ফ্রেমে? উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে অবন্তীর অগুনতি অনুরাগী এবং রাজ্যবাসী। 


সাম্পানের মাথা ভোঁ-ভোঁ করে ঘুরছে। হাত থেকে ফোন নামিয়ে রেখে টলতে-টলতে বাথরুমে প্রবেশ করল ও। নির্ঘুম রাত আর দুর্ভাবনার কারণে ওর মাথা ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়। সিঙ্কে হড়হড় করে খানিকটা বমি করে চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দেওয়ার সময় গত রাতে দেখা অবন্তীর সেই বীভৎস মুখটা মনে পড়ছিল। 


সেই ক্রুর মুখে ফুটে ওঠা অভিব্যক্তি যেন এতক্ষণে স্পষ্ট উচ্চারণ পেল, প্রতিশোধ! প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এত আয়োজন। সহজে ফিরে আসা.... তারপর আবারও হারিয়ে যাওয়া... 


ঝকঝকে রোদ্দুরে মোড়া কাঠফাটা দুপুরে এই কোলাহলপূর্ণ শহরের বুকে বসে সাম্পানের গল্প শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু কেউ না জানলেও সাম্পান জানে, অবন্তী ফিরবে না। ওর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। ও ফিরে গেছে নিজের জায়গায়। নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে, জন্মদাতার কোলের উষ্ণতায়...


ফোনের স্ক্রিনে অবন্তীর হাসিমুখ আর কোনোদিনও দেখা যাবে না। ওর জায়গা দখল করে নিয়েছে ফ্রেমের বাইরে জেগে ওঠা অন্য কেউ। সে এখন অবন্তীর শরীরে ধিকিধিকি বাড়ছে। 


একদিন গেল। দু'দিন গেল। ক্রমে শোরগোল স্তিমিত হয়ে এল। ধীরে ধীরে মানুষের সময়সরণী থেকেও হারিয়ে গেল অবন্তী অন্তর্ধান রহস্য। স্থানীয় থানায় জমা পড়ল নতুন অভিযোগ। সমাধান না হওয়া একটা সাধারণ কেস হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেল আরবান কুইন। 


মানুষও তাকে মনে রাখল না। অবন্তীর লক্ষ লক্ষ অনুসরণকারী কিছুদিনের মধ্যেই খুঁজে নিল মনোরঞ্জনের নতুন মানুষ। দলে-দলে সকলে ভিড়ল সেখানে। কারণ এই জনবহুল এবং ঘটনাবহুল দুনিয়ায় মানুষের স্মৃতিতে মানুষের স্থায়িত্বের মেয়াদ দু'দিন। মাত্র দু'দিন! 


(সমাপ্ত)

ছবি : সংগৃহীত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ফ্রেমের বাইরে কেউ অন্তিম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস অন্তিম  পর্ব                                                           ।। স্ক্রিনে যে মুখ ফিরে আসে না।।  অবন্তী...

পপুলার পোস্ট