অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ১ জুন, ২০২১

মুহূর্তেরা বন্দী (দ্বিতীয় পর্ব)


 


মুহূর্তেরা বন্দী


সাথী দাস


দ্বিতীয় পর্ব






কতটা সময় পেরিয়ে গেছে খেয়াল করেনি উজ্জয়িনী। ট্যাক্সি চালকের ডাকে ওর তন্দ্রা উবে গেল। ধড়মড় করে উঠে চোখ মেলে উজ্জয়িনী দেখলো ট্যাক্সিটা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও কাঁদতে-কাঁদতে একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলো বুঝি। ব্যাগটা বুকে আঁকড়ে ধরে উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো,

-এটা কোন জায়গা? কতদূর এলাম আমি?
-আধঘন্টা ধরে ঘুরছি দিদি। কোথায় যাবেন না বললে তো এভাবে সারারাত ট্যাক্সি নিয়ে ঘোরা সম্ভব না। আপনি ভাড়া মিটিয়ে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার অন্য কাজ আছে। আমার ট্যাক্সিটা আপনার ঘুমোনোর জায়গা না।
-চলুন না দাদা! 
-আরে কোথায় যাবো? মহা ঝামেলা তো। নামুন আপনি! আমার গাড়ি ফাঁকা করুন। দিনকাল ভালো না। রাতদুপুরে গাড়ির মধ্যে মেয়েছেলে নিয়ে এভাবে ঘুরতে পারবো না। কোন সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে আপনি কি বলে ফাঁসিয়ে দেবেন, তারপর আমাকে জেলের ভাত খেতে হবে! বাড়িতে আমার বউ-বাচ্চা আছে দিদি। আপনার মাথাটা মনে হয় একটু খারাপ আছে। আপনি আমার ট্যাক্সি থেকে নেমে যেদিকে যেতে ইচ্ছে হয়, হেঁটে যান। অন্য ট্যাক্সি নিয়ে যান। নামুন! নইলে আমিই টেনে নামিয়ে দেব। টাকা দিন আমার!

ভাড়াটা মিটিয়ে দিতেই ট্যাক্সি থেকে উজ্জয়িনীকে একপ্রকার জোর করে রাস্তায় নামিয়ে দিলো ওই চালক। উদ্দেশ্যহীনভাবে ব্যাগটুকু সম্বল করে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করলো উজ্জয়িনী। ঈশ্বর বেশ কয়েকটি ক্ষমতা উজ্জয়িনীকে দুহাতে উজাড় করে দিয়েছেন। সহ্যশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর ঈগলের মতো ক্ষুরধার দৃষ্টি। সহ্য করতে-করতেই ভবিতব্য আজ ওকে এই পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। আর চর্মচক্ষে নিজের আশেপাশে ও যা দেখে, যতটুকু দেখে, সবটুকু নিখুঁতভাবে ওর অবচেতন মনে অনেকখানি জায়গা করে নেয় চুপিসাড়েই। ঝাপসা দৃষ্টিতে উজ্জয়িনী দেখলো, গোটা শহর আলোকমালায় সজ্জিত। সারি-সারি ছোট-বড় দোকান, প্রতিপদে রাস্তার পাশে স্ট্রীট-ফুডের দোকানগুলো খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছে।দৈহিক পরিশ্রম ও শত ব্যস্ততার মধ্যেও, ঘর্মাক্ত বিক্রেতাদের চোখে অর্থলাভের প্রশান্তি সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়লো উজ্জয়িনীর অনুভবে। প্রায় প্রত্যেকটা দোকানের সামনে অসংখ্য যুগল খাবার খেতে-খেতে খুনসুটিতে মগ্ন। কত প্রাণবন্ত এই শহর! একমাত্র উজ্জয়িনী এই প্রাণের শহরে মৃতদেহের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতি জোড়া কপোত-কপোতীর মধ্যে সদাহাস্য কোনো পুরুষের মুখমন্ডল চোখে পড়লে, তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই উজ্জয়িনী শৌনককে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। অনেকদিন পর আজ একটু কেঁদে বুকটা যেন আরও ভারী হয়ে গেছে। বড় রাস্তা বরাবর মাম্মামের বয়সী একটি মেয়ে, তার বাবার হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। মাম্মামকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো উজ্জয়িনীর। নিজে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সবটুকু বুক দিয়ে আগলে ধরতে ইচ্ছে করলো। কান্না সামলাতে না পেরে অন্ধকারে নিজেকে মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু অন্ধকার মানেই তো একাকীত্ব! উজ্জয়িনী একাকীত্বকে বড় ভয় পায়। সবাইকে নিয়ে আনন্দ করে বাঁচতে ভালোবাসে ও। ছোটবেলা থেকেই অন্ধকারকে ওর খুব ভয় করে। বাবা জানতো এটা। তাই বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেই নিজের বুকের মধ্যে পেখমরানিকে জড়িয়ে ধরে রাখতো। বাবাকে জড়িয়ে বাবার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকলে, পেখমের আর একটুও ভয় করতো না। কিন্তু বটের ছায়ার মতো সেই আশ্রয়টাই হঠাৎ করে হারিয়ে গেছে। আজ উজ্জয়িনীর নিজেকেও হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করলো।নিজেকে হারিয়ে ফেলার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো উজ্জ্বল আলোকবৃত্ত। যেখানে অনেক আলো, সেখানে নিশ্চয়ই কোনো একাকীত্ব নেই। উজ্জ্বল আলো চোখের ওপর এসে পড়লে, আপনা হতেই বন্ধ হয়ে আসে চোখ। তারপর চোখ বন্ধ করে থাকতে-থাকতে এক সময় জগৎ ভুলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া যায়। সদ্যোজাত শিশুর মতো নিশ্চিন্ত ঘুম। বড় শান্তির ঘুম। উজ্জ্বল আলোকবৃত্তে আবৃত একটা শপিং মলের দরজা ঠেলে, উদভ্রান্তের মতো ভিতরে প্রবেশ করলো উজ্জয়িনী। তারপর সোজা পৌঁছে গেলো ওয়াশরুমে। হাতঘড়িতে তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বেজে গেছে....

লেডিজ বাথরুমে ঢুকে চশমা খুলে নিজেকে দেখে অবাক হয়ে গেলো উজ্জয়িনী। কিছুক্ষণ আগে কান্নার কারণে দুচোখের কাজল সম্পূর্ণ ঘেঁটে, গালে কালি লেপ্টে গিয়ে ওকে এখন বীভৎস দেখাচ্ছে। সযত্নে মূল্যবান প্রসাধনের আড়ালে, বরাবরই নিজেকে লুকিয়ে রাখতো উজ্জয়িনী। কিন্তু আজ সমস্ত আলগা প্রসাধন লবণাক্ত চোখের জলে নষ্ট হয়ে, ওর নগ্ন দগ্ধ রূপটা বেরিয়ে পড়ছে জনসমক্ষে। নিজের স্বরূপ প্রকাশ্যে উন্মুক্ত হওয়ার ভয়ে, ও ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করলো। নিষিদ্ধ ওই খোপে ভুলেও হাত দিলো না। অন্য জায়গা থেকে টিস্যু পেপার টেনে বের করে, পাগলের মতো মুখে-চোখে-ঠোঁটে ঘষতে শুরু করলো। আলগা প্রসাধনী আবছা হয়ে গেলো মুহূর্তেই। কল খুলে মুখে ভালো করে জল ছিটিয়ে, নিজের আসল চেহারাটা নিজে একবার ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলো। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে বছর দুয়েক আগেই। আর তিন মাস পর বিয়াল্লিশ পেরিয়ে তেতাল্লিশে পা রাখবে উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। আলগা প্রসাধনী জলে ধুয়ে যেতেই বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠলো। দীর্ঘদিন ধরে লেখার কারণে বিনিদ্র রাত্রিযাপনের ফলে চোখের তলায় সময়ের আগেই মৃদু ভাঁজ পড়েছে। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা ও ত্বকের পরিচর্যার ফলে, চামড়া এখনও টানটান রয়েছে। ভালোভাবে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে, ও পেপারটা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ব্যাগ নিয়ে একছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে। যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। কোনোভাবেই যেন ওর বর্তমান মানসিক অবস্থা প্রকাশ্যে বেরিয়ে না পড়ে, সেই চেষ্টায় উজ্জয়িনী মগ্ন হলো। এত বছর ধরে উপন্যাসের পাতায় একাধিক চরিত্রের হয়ে অভিনয় করতে করতে, এখন এই অভিনয় ব্যাপারটা উজ্জয়িনী খুব ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেছে। যন্ত্রণায় বুক ফেটে গেলেও, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে চোখ থেকে এক ফোঁটা জল বেরোয় না। এমনকি মুখের একটা রেখাও কাঁপে না! তবে আজ উজ্জয়িনী একটু কাঁদতেই চেয়েছিলো। তাই এখনও চোখের কোল সিক্ত! ওই ভিজে অক্ষিপল্লব মেলেই উজ্জয়িনী দেখলো, রংবেরঙের জামাকাপড়ের হাট বসেছে গোটা শপিং মল জুড়ে। একটা প্রাণহীন মূর্তিকে কি সুন্দর হাতকাটা জামা আর স্কার্ট পরিয়ে, চোখে চশমা দিয়ে এরা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ও প্রাণহীন বলেই মানুষের এত অত্যাচার সহ্য করছে। আর যদি ওর প্রাণ থাকতো, পছন্দ-অপছন্দ থাকতো, তবে কি সারাদিন ধরে ওই জামাটা পরে ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকতো?! মূর্তির জামাটায় একটু হাত রাখলো উজ্জয়িনী। ফ্লোর প্রায় ফাঁকা। আটটা বাজতে যায়। একটু পরেই হয়তো বন্ধও হয়ে যাবে এই শপিং মল। সুন্দর-সুন্দর জামাকাপড় কিনলে নাকি মন ভালো হয়!! মা আর মাসিমণি সবসময় বলে মেয়েদের এই করতে নেই, ওই করতে নেই! আর মা হয়ে যাওয়ার পর তো, কোনো নারীকে নিজের জন্য বাঁচতেই নেই। তখন সবটাই স্বামী-সংসার আর সন্তানের জন্য! তাই বুঝি? তেমনটা আবার হয় নাকি! আচ্ছা কয়েকটা মুহূর্ত যদি উজ্জয়িনী চুরি করে একটু নিজের জন্য বেঁচে নেয়, কেউ কি জানতে পারবে!! কেউ কি দুয়ো দেবে? ওর এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, লোকচক্ষুর কাছে নিখুঁত হয়ে থাকার প্রবল প্রয়াস, ঝকঝকে এই ইমেজটা কি চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে?! ও চুরিই তো করবে। একটু মুহূর্ত চুরি করবে, শুধু নিজের জন্য। ওই মুহূর্তে ওর বৃত্তে আর কেউ থাকবে না। নিজের সঙ্গে ও একাই থাকবে। ওকে কেউ চিনবে না। কেউ জানবে না। নিজের মতো করে নিজের জন্য একটু বাঁচলে কি খুব বড় অন্যায় হয়ে যাবে!! নিজেকে একটু অন্যরকমভাবে দেখতে ইচ্ছে করলো উজ্জয়িনীর। গোটা শপিং মল ঘুরে, ও এমন কিছু পোশাক তুলে নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকলো, যা ও মাম্মামের জন্মের পর বিগত দশ বছরে দেহে তোলেনি! 

ট্রায়াল রুমে ঢুকেই উজ্জয়িনী পরনের শাড়িটা খুলে,  মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। নিজের এই একঘেয়ে শরীরটা প্রতিদিনই ও দেখে। এখনও ঋতুমতী হওয়ার সুখ প্রতিমাসে সহ্য করতে হয় ওকে। কৈশোর ও প্রথম যৌবনে ওই রক্তপাত অত্যন্ত যন্ত্রণার হলেও, যখন একজন নারী জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে উপলব্ধি করতে পারে, যতদিন ওই যন্ত্রণা, ততদিনই যৌবন! তখন ওই যন্ত্রণাও পরিণত হয় সুখে। মনে হয়, ওই যন্ত্রণা যেন আর এই নারীদেহ ছেড়ে না যায়। যতদিন তাকে ধরে রাখা যায়, ততদিনই জীবনের সুখ। উজ্জয়িনী এখনও মুক্তি পায়নি ওই রক্তাক্ত আবহ থেকে। মুক্তি চায়ও না। প্রতিমাসে যেন ওইটুকু রক্তস্রোত এসে ওকে জানান দিয়ে যায়, এখনও ওর যৌবন অটুট! জীবন থেকে বসন্ত এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ওইটুকু রক্তধারার কারণেই হয়তো দৈহিক ইচ্ছে-অনিচ্ছে, সর্বোপরি যৌবন ওকে এখনও বিদায় জানায়নি। তার ওপর নিজেকে নিখুঁত সুন্দর রাখার ওর অদম্য প্রয়াস একেবারে বিফলে যায়নি। ট্রায়াল রুমের বড় আয়নাটার একেবারে সামনে এগিয়ে গেলো উজ্জয়িনী। নাভির নিচে শাড়িটা পরা ছিলো। শাড়ি সরে যেতেই আত্মপ্রকাশ করেছে মাম্মামের অসংখ্য আদরের চিহ্ন। গর্ভাবস্থায় পেটের চামড়া প্রসারিত হয়ে আবারও সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। কুঁকড়ে যাওয়া অসমান পেটের ওপর পরম মমতায় হাত রাখলো উজ্জয়িনী। এত কষ্ট করে মেয়েটাকে জন্ম দিয়ে, আজ ওর মা নিজেই ওকে কতদূরে সরিয়ে রেখেছে। চিৎকার করে কাঁদতে গিয়ে আয়নার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো ও। মুখের পেলব চামড়ায় ঘেঁটে যাওয়া কাজলের আলগা দাগ। অবিন্যস্ত একরাশ চুল, আর উন্মাদের মতো দৃষ্টি দেখে ওর মনে হলো, সদ্য মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা একজন মানসিক রোগী ও। ওকে দেখতে আর একটুও স্বাভাবিক লাগছে না। ব্যাগ থেকে টিস্যু পেপার বের করে নির্মমভাবে নিজের মুখে-চোখে-গালে ঘষতে ঘষতে, উজ্জয়িনী মুখের ছাল-চামড়া প্রায় ছিঁড়ে ফেললো। আবার আয়নার দিকে চেয়ে দেখলো, সেই একইরকম উন্মাদিনীর মতো প্রতিবিম্ব। আর নিজেকে সামলাতে পারলো না উজ্জয়িনী। অতিকষ্টে বললো, এক-দুই-তিন! ও বরাবরই এভাবে সংখ্যা গুনে গুনে নিজের অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ পারলো না। নিজের হাতদুটো মুঠো করে, দেহটাকে শক্ত রেখেও কান্নাটাকে আটকাতেই পারলো না ও। সামনের আয়নাটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো ট্রায়াল রুমের মেঝেতে। দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললো। দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে চমকে উঠে তাড়াতাড়িই উঠে পড়লো ও। বোধহয় অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। এখনও একটাও জামা পরে দেখা হয়নি। একটানে নিজের ব্লাউজটা শরীর থেকে টেনে নামিয়ে নামিয়ে দরজাটা একটুখানি খুললো উজ্জয়িনী। শপিং মলের কর্মরতা একটি মেয়ে এসে প্রথমে ওকে সামান্য দেখেই থমকে গেলো। কোনোমতে বললো,

-সো সরি ম্যাম! অনেকটা দেরি করছিলেন আপনি। আর আমাদের কাউন্টারও বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে, তাই....
-আমাকে মিনিট পাঁচেক সময় দিন প্লিজ।

একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে উজ্জয়িনী বললো। 

-শিওর ম্যাম। 

প্রথম পোশাকটা গায়ে চাপিয়ে আয়নার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো উজ্জয়িনী। পূর্ণযৌবনা না হলেও, একেবারে বিগতযৌবনা নয়। তাকে এখনও তন্বী বলাই যায়। শরীরের প্রতিটা ভাঁজের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই জামাটা বসে গেছে। একেবারে বেমানান লাগছে না। প্রতিটা জামাতে নিজেকে নতুন-নতুনভাবে আবিষ্কার করলো উজ্জয়িনী। আয়নার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। বহুকাল আগের হারিয়ে যাওয়া রূপটা, আয়নার প্রতিবিম্বের মধ্যে দেখে ওর বেশ ভালোই লাগলো। সবকটা জামা গুছিয়ে নিয়ে, আবার শাড়িটা পরে নিলো উজ্জয়িনী। কাউন্টারে পৌঁছে কার্ড পেমেন্ট করে বেরোনোর সময়, ও বেশ কিছু হার-চুড়ি এমনকি পছন্দ করে একটা সানগ্লাসও কিনে ফেললো। সমস্ত পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে শপিং মল থেকে বেরোনোর সময় উজ্জয়িনীর মনে হলো, ও এবার যাবে কোথায়? কার কাছে যাবে এত রাতে! মুহূর্তেই মনস্থির করে ফেললো উজ্জয়িনী। ওই শপিং মল থেকেই ছোট একটা ট্রলি কিনে, নতুন কেনা যাবতীয় জামাকাপড় ওতে ভরে একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়লো....

-দিদিভাই কোথায় যাবেন?
-কাছাকাছি কোনো হোটেল। যেখানে রাতে থাকা যাবে। আর একটু ভদ্রস্থ কোনো জায়গায় নিয়ে যাবেন। রাতে পুলিশ রেড করবে, এমন কোনো সস্তার হোটেল না। বুঝেছেন?
-হুম!

ট্যাক্সি চলতে শুরু করলে ফোন অন করে নিজের মাকে একটা ফোন করলো উজ্জয়িনী। ফোনের ওপার থেকে মায়ের চিৎকার ভেসে এলো,

-আমাকে কি মরার আগে তুই একটুও শান্তি দিবিনা পেখম? কোথায় যাচ্ছিস তুই এই রাতদুপুরে?
-মুহূর্ত চুরি করতে।
-কি? 
-বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি মা। রাতে থাকবো। কোন বন্ধুর বাড়ি জানতে চেয়ো না। আমি বলবো না। বাচ্চা মেয়ে নই। তাই হারিয়েও যাবো না। আমাকে আর ফোন করবে না। করলেও পাবে না। আমার জন্য চিন্তা করবে না। আমি একটু ভালো থাকতে যাচ্ছি। আর থাকবোও। রাখছি। 

মায়ের চিৎকারের মধ্যেই লাইন কেটে ফোনটা আবার বন্ধ করে দিলো উজ্জয়িনী। ট্যাক্সি ততক্ষণে থেমে গেছে। ট্যাক্সির ভিতর থেকেই উজ্জয়িনী দেখলো আলোয়মালায় জ্বলজ্বল করছে ইংরেজি হরফে লেখা তিনটে শব্দ। OYO....

কাঁধের ব্যাগ, হাতের ছোট ট্রলি আর আলুথালু আঁচল সামলে উজ্জয়িনী এগিয়ে গেলো রিসেপশনের দিকে। প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলে নিলো। ওর খিদের অনুভূতিটাই যেন মরে গেছে চিরতরে। অভুক্ত অবস্থায় চাবি হাতে নির্দিষ্ট ঘরে যখন উজ্জয়িনী পৌঁছলো, তখন বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই ট্রলিটা একপাশে সরিয়ে রেখে, ধবধবে সাদা বিছানার ওপর ক্লান্ত দেহটাকে এলিয়ে দিলো। ব্যাগটা পড়ে রইলো বেশ খানিকটা দূরে। ওটাতে হাত দিতে গিয়েও মানসিক যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলো উজ্জয়িনী। চুপ করে শুয়ে থাকতে থাকতে, একসময় ঘুমিয়েই পড়লো। ঘুম ভাঙলো প্রায় শেষরাতে। চোখদুটো খুলেই বিছানার ওপর বেশ কিছুক্ষণ চুপটি করে শুয়েছিলো ও। তারপর আবার উঠে গিয়ে নিজের ঘরের জানলার পর্দা সরিয়ে অন্ধকার শহরের দিকে চেয়ে রইলো অনেকক্ষণ। থমথমে নিস্তব্ধ গোটা শহর। হাতেগোনা দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। শহর ঘুমোচ্ছে। অন্ধকার আর একাকীত্বে বড় ভয় উজ্জয়িনীর। তাই ও আর বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়াতে পারলো না। আবার এসে শুয়ে পড়লো বিছানায়। বন্ধ করে ফেললো চোখ। নরম বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই, ওকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরলো শৌনক। গলায় আলতো করে আদুরে কামড় বসিয়ে দিলো। নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে, হেরে যাওয়ার ভয়ে, প্রতিনিয়ত নিজের কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে উজ্জয়িনী। ভয়ের কারণে ও তাড়াতাড়ি চোখ খুলে ফেললো। হাতঘড়ির দিকে চেয়ে একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। শাড়িটা বিছানার ওপর ফেলে রেখে ছুটলো বাথরুমে....

হাঁটু পর্যন্ত আঁটোসাঁটো নতুন পোশাকের সঙ্গে হালকা গয়না, আর সঙ্গে সামান্য প্রসাধনের আড়ালে নিজেকে আবারও লুকিয়ে ফেললো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। দিনের আলো ফুটে ওঠার পর নিজের সমস্ত জামাকাপড় ট্রলিতে গুছিয়ে নিয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে যখন ও প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে বসলো, তখন আটটা বেজে গেছে। উজ্জয়িনীকে নিয়ে গাড়ি ছুটে চললো। খোশমেজাজে গাড়ির চালকের সঙ্গে সামান্য কিছু কথা বলতে-বলতে রোদ-চশমার আড়ালে নিজের চোখদুটোকে ঢেকে, রাস্তার দুপাশের প্রকৃতির অকৃত্রিম সবুজ সৌন্দর্য উজ্জয়িনী উপভোগ করছিলো। কলকাতা থেকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্বে যে এমন সবুজ একটা পৃথিবী নাগালের মধ্যেই রয়েছে, এটা ওর তেমনভাবে জানা ছিলো না। গতকাল রাতে হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো নিজেকে নিয়ে নিজের সঙ্গে হারিয়ে যেতে। জীবন থেকে কিছু মুহূর্ত চুরি করে নিজের নামে লিখে রাখতে। সেইমতো সব আয়োজন করে, উজ্জয়িনী আজই বেরিয়ে পড়েছে সবুজের হাতছানিতে সাড়া দেওয়ার জন্য। কটেজ আগে থেকে বুকিং করাই ছিল। তাই বিন্দুমাত্র অসুবিধে হলো না। গাড়ি থেকে নেমে রিসোর্টে ঢুকে বেশ ভালো লাগলো উজ্জয়িনীর। ছিমছাম, শান্ত-নিরিবিলি একটা রিসোর্ট। বাড়তি পাওনা হিসেবে একটা ছোট সুইমিং পুলও রয়েছে। গাড়ির চালক ট্রলিটা রিসেপশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে টাকা ও বকশিশ নিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন। রোদ চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে যা ফর্মালিটি ছিল, সবটুকু পূরণ করে নিজের কটেজের দিকে এগোলো উজ্জয়িনী। গাড়িতে বসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময়ই উজ্জয়িনী বুঝেছে, ফলতা নামক জায়গাটি শীতকালে চড়ুইভাতির জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও, মরশুমের সকল সময়েই মন পরিবর্তনের জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা। শহুরে কোলাহলের বাইরে সপ্তাহান্তে ঝটিতি সফরে পাড়ি দেওয়ার মতো জায়গা খুঁজলে, প্রকৃতির সবুজের মাঝে পৌঁছে নিজের সঙ্গে একাকী একটু কথা বলতে চাইলে, হুগলী নদীর বুকে প্রবাহিত পাক খেয়ে ওঠা বাতাসে সমস্ত মনখারাপ উজাড় করে দিতে চাইলে, এভাবেই পালিয়ে আসতে হয় প্রকৃতির আহ্বানে। এখানে দর্শনীয় স্থানের অতিরিক্ত প্রাচুর্য না থাকলেও শান্তি আছে। বুকভরে শ্বাস নেওয়া যায়, আবার ছেড়েও দেওয়া যায় নিশ্চিন্তে। ব্যাগপত্র, ট্রলি সব নিজের ঘরে রেখে পোশাক পরিবর্তন করে ফুরফুরে মনে সুইমিং পুলে নামলো উজ্জয়িনী। হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র রয়েছেন গুটিকয় কটেজে। দু-চারজন শিশু দৌড়াদৌড়ি করে খেলা করছে অদূরে। সুইমিং পুলের জল স্থির। উজ্জয়িনী ডুব দিতেই জলের উপরিভাগে তরঙ্গের সৃষ্টি হলো। বার দুয়েক সাঁতরে বাঁধানো পাড়ের ওপর দুটো হাত তুলে, হাতের উপর মাথা রেখে চুপ করে খানিকক্ষণ পড়ে রইলো উজ্জয়িনী। চোখ বন্ধ করতেই ওই পুরুষ চিৎকার করে উঠলো, "মানুষ এই মন্দার বাজারে চাকরী পায় না। তুমি চাকরী ছাড়বে মানে!! তুমি কিছুতেই চাকরী ছাড়বে না! আমি ছাড়তে দেবোই না।" ওই চিৎকারের ভয়ে কেঁপে উঠে চোখ খুলে ফেললো উজ্জয়িনী। নোনতা জল ভিড় করেছে চোখের কোণে। জলের ওপর শৌনকের আদুরে আবছা প্রতিবিম্ব। চোখের জল ধুয়ে ফেলতে আবার পুলের জলে ডুব দিলো উজ্জয়িনী। সূর্যের আলোয় পুলের নীচের অংশ সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। উজ্জয়িনী দেখলো, দূর থেকে শৌনক তরতর করে সাঁতার কেটে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। তক্ষুণি ও জল থেকে মাথা উঁচু করে একবুক বাতাস ফুসফুসে ভরে নিলো। জল থেকে মাথা তুলতেই উজ্জয়িনী দেখলো, এই রিসোর্টেই কর্মরত দুজন পুরুষ রিসেপশনের দিক থেকে দৌড়ে দরজার দিকে যাচ্ছে। হয়তো কোনো বিশেষ অতিথিকে আপ্যায়নের জন্য হঠাৎ এত ব্যস্ততা। পুল থেকে উঠে পড়লো উজ্জয়িনী। ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার সময় দেখলো, ওই দুজন কর্মী একটা ঢাউস ট্রলি নিয়ে আসছে, অদূরেই একজন পুরুষ। রোদ চশমায় ঢাকা তার দুচোখ। নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো উজ্জয়িনী। চোখ থেকে রোদ চশমা নামিয়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে উজ্জয়িনীর হেঁটে পার হয়ে যাওয়া শূন্য পথের দিকে চেয়ে রইলো সে....

-স্যার! কি হলো? দাঁড়িয়ে পড়লেন যে?! আসুন আসুন! 
-হ্যাঁ....চলুন। 

রোদ চশমাটা আবার চোখে পরে নিলো সে। রিসেপশনে নিজের নামটুকু সই করার সময় তার কানে ভেসে এলো ব্যক্তিত্বময়ী সেই বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর....

-আমার চাবিটা প্লিজ? 

হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে এলো তার। হাতের কলমটাও যেন একটু কেঁপে উঠলো। তবুও কিছুতেই মাথা তোলার সাহস হয় না। 

-থ্যাঙ্কস! লাঞ্চ ঠিক দুটোয়, আমার কটেজে....
-শিওর ম্যাম। 

উজ্জয়িনী চাবিটা নিয়ে ভিজে চুলগুলো কিঞ্চিৎ নেড়েচেড়ে নিজের ঘরের দিকে এগোলে, কলমটা খাতার ওপর ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে ওইদিকেই চেয়ে রইলো সৌজন্য রায়....দারুণ উত্তেজনায় ওর হৃদপিন্ড তখন তিরতির করে কাঁপছে....

(চলবে....)

ছবি : সংগৃহীত


রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

মুহূর্তেরা বন্দী (প্রথম পর্ব)


 




মুহূর্তেরা বন্দী


সাথী দাস


প্রথম পর্ব




প্রথম প্রভাতের সূর্যদেব আত্মপ্রকাশ করেছেন বহুক্ষণ আগেই। বেলা গড়িয়ে প্রায় দশটা বাজতে যায়। বাঁকা রোদ্দুর চুপিসাড়ে প্রবেশ করেছে ফ্ল্যাটের খোলা জানলা দিয়ে। স্পর্শ করেছে বিছানা। ছোট টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা সদাহাস্যময় বুদ্ধমূর্তি। ল্যাপটপের পাশে চশমা, ফোন, ফোনের চার্জার, ল্যাপটপের চার্জার, কলম, ট্যাব, জলের বোতল, সেই সঙ্গে ঘুমের ওষুধের পাতাটাও উল্টে পড়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটা ঘুমের ওষুধ টেবিলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। বিছানায় শুয়ে থাকা রমণীর আজকের প্রভাত দর্শনের বুঝি কোনো সদিচ্ছা ছিল না। সেই কারণে টেবিলে ছড়িয়ে থাকা সবকটা ঘুমের ওষুধ গলাধঃকরণ করার, তার ইচ্ছে ছিল প্রবল। কিন্তু মানসিক টানাপোড়েনের কারণে গতকাল রাতে সেই কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। নিত্যদিনের মতোই ওষুধ সেবন করে ঘুমের জগতে হারিয়ে গিয়েছিলেন উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। ফোনটা একনাগাড়ে বেজে গেলো। কোনো উত্তর না পেয়ে একটু পরেই থমকে গেলো গানের সুমিষ্ট কন্ঠস্বর। দ্বিতীয়বার আবার ফোনটা বেজে উঠতেই, চোখ টেনে খুললো উজ্জয়িনী। বিছানা ছেড়ে উঠতেই ও বুঝলো, মাথা ভারী হয়ে রয়েছে। কোনোক্রমে হাতড়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে দেখলো পরিচিত নম্বর। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,

-মর্নিং দাদা! বলুন?
-আরে উজ্জয়িনী, তুমি তো সেভাবে কিছু জানালেই না, আজকের বিকেলের অনুষ্ঠানে তুমি থাকছো কিনা! আমাকে তো সেভাবে সব আয়োজন করতে হবে। প্লিজ চলে এসো, আমার বিনীত অনুরোধ!
-শরীরটা ভালো নেই দাদা। আমি বোধহয়....
-আরে খারাপ থাকা শরীরকে চাঙ্গা করে তুলতে হবে মন দিয়ে। চলে এসো। অনেক গুণীজনের সমাহার। চাঁদের হাট বসবে তো! আর সবটাই তোমাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। তোমার-আমার কত বছরের সম্পর্ক বলো তো! প্লিজ আর না কোরো না। চলে এসো। আমি কিন্তু ওদের বলে দিচ্ছি, তোমার হাতেই বইটার শুভ উদ্বোধন হবে। তুমি আসছো! জয়ী?
-আচ্ছা দাদা। আমি থাকবো। তবে ওই আধঘন্টাখানেকের জন্য। একটু মুখটা দেখিয়েই চলে আসব। কিছু বক্তব্য রাখতে আমাকে বলবেন না প্লিজ!
-বেশ তাই হবে। তুমি এসে একটু এখানে দাঁড়াও, তাহলেই হবে। 
-হুম! সাড়ে চারটে নাগাদ যাচ্ছি। 
-ওকে ওকে!

ঘুমের রেশ কাটতেই জানালার বাইরের দিকে চাইলো উজ্জয়িনী। বাইরে ঝকঝক করছে রোদ্দুর। কোথাও কোন বিষণ্ণতা নেই। শুধুমাত্র ওর মনের ভিতরে ছাড়া। মা জানে, ও প্রায় প্রতিটা রাত জেগে লেখালিখির কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই সকালে আর ডাকেনি। কিন্তু ফোনটা এসে বড় অসময়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো উজ্জয়িনী। ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে রয়েছে। বিছানা থেকে কুশনগুলো কাল রাতে আছড়ে ফেলেছিলো মেঝেতে। সারাটা ঘর নিজের হাতেই তছনছ করে ফেলেছে। উজ্জয়িনীর মনের ভিতর বয়ে যাওয়া ঝড়, অস্থিরতা, চঞ্চলতার সাক্ষী ঘরের এই জড় বস্তুগুলো। খুব কষ্ট হওয়াতে কাল রাতে ও কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েই পড়েছিলো। এক-একটা অভিশপ্ত একাকী রাত কেটে যাওয়ার পর নিজের মানসিক অবস্থার কিছুমাত্র উন্নতি না হলেও, নিজের হাতে ঘরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কবলে পড়ে থাকা ওই জড় বস্তুগুলোকে, স্বহস্তে উদ্ধার করে আবার জায়গামতো সাজিয়ে রাখতে হয়। গত কয়েকদিন ধরে এটাই ওর প্রতিরাতের রুটিন হয়ে গেছে। ঘরটা নিজের হাতে গুছিয়ে, বিছানা ঠিক করে যখন উজ্জয়িনী ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরোলো, তখন মা ঠাকুরপুজো দিয়ে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র মেয়েকে পূর্ব নির্ধারিত সময়ের আগেই ঘুম ভেঙে উঠতে দেখে, বৃদ্ধা মা জিজ্ঞেস করলেন,

-কিরে? আজ তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে! কাল রাত জাগিসনি বুঝি! 

মায়ের কথার উত্তরে উজ্জয়িনী বললো,

-না। ভোররাতেই শুয়েছিলাম। কিন্তু সকাল সকাল একটা ফোন এসে ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলো।
-কে রে? কার ফোন?  

একমাত্র মেয়ের ভয়ে ওই নির্দিষ্ট নামটা মা আর উচ্চারণ পর্যন্ত করতে পারলো না। মায়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো উজ্জয়িনী। তারপর মুখ ফিরিয়ে মায়ের একবুক আশায় জল ঢেলে বাথরুমে ঢুকতে-ঢুকতে বললো,

-অসীমদা ফোন করেছিলো! আমাকে বিকেলে ঘন্টাখানেকের জন্য একটু বেরোতে হবে মা। এক নতুন লেখিকার প্রথম বইপ্রকাশ অনুষ্ঠান। দাদার ইচ্ছে আমার হাতেই হোক। অন্য কেউ বললে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু দাদা আমার প্রথম প্রকাশক। পরে অনেক প্রকাশনীর সঙ্গে কাজ করলেও, অসীমদার সঙ্গে একটা অন্যরকম স্নেহের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। মুখের ওপর না বলা যায় না। বিকেলে একটু বেরোতে হবে। 
-হ্যাঁ রে মা! ও আর একবারও ফোন করেনি?
-আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে চা করছি মা। তুমি ঠাকুরের বাসনগুলো মেজে নাও। তোমাকে আর কিচেনে ঢুকতে হবে না। আমি আজ যখন তাড়াতাড়ি উঠেই গেছি, আমিই রান্নাটা করবো। 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেখমের মা মেয়েকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে আত্মগোপন করে একপ্রকার বাঁচলো উজ্জয়িনী। বাথরুম থেকেই ও শুনতে পেল, মা কারোর সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ব্রাশ করে উজ্জয়িনী শাওয়ারের নীচে দাঁড়ালো। সকালে ওঠার অভ্যেস ওর বরাবরই ছিল। মর্নিং স্কুল, পরবর্তীকালে সকালে টিউশন, তাছাড়া উজ্জয়িনী যখন বি. এড করছিল, সেই সময় খাতা-বইয়ের মাঝে মুখ গুঁজে হোস্টেলের প্রতিটা রাত পেরিয়ে কখন যে সকাল হয়ে যেত, ও বুঝতেই পারতো না। কখনও রুমমেট কেতকীদি, আবার কখনও বা শ্রাবণীদি এক মগ কফি এনে মুখের সামনে ধরতো। ওরা ঘুমিয়ে থাকলে উজ্জয়িনী নিজেই তিনমগ কফি করে আনতো। নিজের রাতজাগার ক্লান্তি দূর করার সঙ্গে সঙ্গে, কফির ছুতোয় খাতা-পেন সরিয়ে রেখে তিনমাথা একজায়গায় হয়ে মিনিট দশেকের ওই মেয়েলি আড্ডাটুকু বড় ভালো লাগতো উজ্জয়িনীর। সেসব আজ শুধুই ধূসর স্মৃতি। প্রথম সকালের সুন্দর মুহূর্তগুলো হারিয়ে গেছে অতীতের কালগর্ভে। পরিচিতা বান্ধবীরা কথা দিয়েও কথা রাখেনি। কেউ তেমনভাবে আর যোগযোগ রাখেনা। কেতকীদি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে, এতখানি পরিশ্রমের ফলে প্রাপ্ত চাকরীর মায়া কাটিয়ে, গর্ভে দুমাসের একটি ছোট্ট প্রাণকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছে না ফেরার দেশে। বাকিরা সুখে-দুঃখে সংসারী, সরকারী বা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরতা। সংসার, স্বামী-সন্তান-সন্ততি, চাকরী, পরিবারের প্রতি সকল দায়-দায়িত্বগুলো সামলে, রাতজাগা বান্ধবীদের দেওয়া কথাগুলো আর রাখা হয়না। কারোর সঙ্গেই তেমনভাবে যোগাযোগ নেই আর। এখন উজ্জয়িনী একপ্রকার বন্ধুহীন জীবন কাটায়। জলের প্রতিটা ফোঁটা ওর দেহ স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই নগ্ন শৌনক সিক্তদেহে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো উজ্জয়িনীকে। শৌনকের সঙ্গে কাটানো বেশ কিছু সুন্দর মুহূর্ত ওর মানসপটে ভেসে উঠলো। সারারাত অক্লান্ত শরীরী খেলায় মেতে থাকার পর, পরদিন ভোরবেলা স্নানের সময়ও পেখমকে কাছছাড়া করতো না শৌনক। কতদিন স্কুলে বেরোতে দেরি হয়ে যেত। তাও শৌনকের পাগলপারা আদরের উন্মাদনা থেকে অব্যাহতি পেতো না উজ্জয়িনী। ও স্কুলে গিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো। ক্লাসগুলো নিয়ে কোনোমতে টিচার্স রুমে গিয়েই এলিয়ে পড়তো চেয়ারে। ওকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে, মহিলা সহকর্মীদের কিছু অম্লমধুর বাণী ভেসে আসতো। লজ্জায় মরে গিয়েও সেসব কথা বেশ উপভোগ করতো উজ্জয়িনী। আজও শাওয়ারের তলায় দাঁড়ালে, শৌনক ওকে বরাবরের মতো চারপাশ থেকে এসে ঘিরে রাখে। চোখদুটো বন্ধ করলো উজ্জয়িনী। শৌনকের দেহের উষ্ণতার সঙ্গে, শাওয়ারের জলের শীতলতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। আর কান্না আসে না এখন। সব সয়ে গেছে। মনটাও হয়তো পাথর হয়ে গেছে। স্নান সেরে জামাকাপড় পরে বাইরে বেরিয়েই ও দেখলো, মা তাড়াতাড়ি করে ফোনটা রেখে দিলো। একটু সন্ধিহান হয়েই পেখম জিজ্ঞেস করলো,

-কার ফোন মা?
-মাম্মামের হোস্টেল থেকে।
-সেকি! রেখে দিলে কেন? কি হয়েছে মাম্মামের?
-ও আজ প্রথম ড্রামা ক্লাসে যাচ্ছে। তাই তোর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলো। 
-ওহ!

সদ্যস্নাতা উজ্জয়িনীর উন্মুক্ত ভিজে চুল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মাথায় তোয়ালে জড়ানোর সময়টুকুও পেলো না ও। ছুটলো নিজের ঘরে। ফোন হাতে নিয়েই দেখলো, দুটো মিসড কল হয়ে রয়েছে। মাম্মামের প্রিন্সিপালের ওই নম্বরে ফোন করেই উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো, মাম্মামের সঙ্গে এখন একটু কথা বলা যাবে কিনা! উনি জানালেন, মিনিট দশেক আগেই ও ক্লাসে চলে গেছে। ক্লাস শেষ হওয়ার পর প্রিন্সিপাল ম্যাডাম অবশ্যই ফোন করবেন। তখন মায়ের সঙ্গে মাম্মাম কথা বলবে। একটু হতাশ হয়ে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রাখলো উজ্জয়িনী। একরত্তি মেয়েটা আজ ওর বহু প্রতীক্ষিত ড্রামা ক্লাসে যাওয়ার আগে, একটু মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। সেটাও পারলো না। উজ্জয়িনীর বুকের ভিতরটা একেবারে খালি হয়ে গেল। সেই সঙ্গে মনে উঁকি দিলো আরও একটা সন্দেহ। চুপচাপ মাথায় একটা তোয়ালে জড়িয়ে ঘর ছেড়ে বেরোল ও। মা তখন ডাইনিং টেবিলে বসে ছুরি হাতে সবজি কাটছে। রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের জল বসিয়ে উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো,

-ওটা কার ফোন ছিলো মা? প্রিন্সিপাল ম্যাডাম আমার ফোনে আগে ফোন করেছিলেন। তারপর না পেয়ে প্রায় দশ মিনিট আগে ল্যান্ডফোনে কল করেছিলেন। মাম্মাম ক্লাসে ঢুকে গেছে অনেক আগেই। তাহলে তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? আমি বাথরুম থেকে বেরোতেই ফোন রেখে দিলে! 
-না মানে...
-সত্যিটাই বলো? বেশি ভাবতে হবে না।

নিজের গরম জলটুকু কাপে নামিয়ে নিয়ে, সসপ্যানে দুধ দিয়ে চিনি আর চা পাতা ঢেলে দিলো উজ্জয়িনী। নিজের কাপে একটা সবুজ চায়ের টি-ব্যাগ চুবিয়ে নিয়ে মাথা থেকে তোয়ালেটা নামিয়ে ফেলে পেখম আবার জিজ্ঞেস করলো,

-বলো মা?
-আজ তোর মাসিমণি একটু আসবে বলছিলো। আমি বলিনি। ও নিজেই আসবে বললো!

রান্নাঘর থেকে একলাফে বেরিয়ে এলো উজ্জয়িনী। 

-কেন? আবার কেন? 
-তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে!
-কথা বলতে? না আমার মাথাটা চিবিয়ে খেতে?
-কিসব বলছিস পেখম? ও তোর মাসিমণি। আমার নিজের বোন। ও তোর খারাপ চাইবে?
-মা আমার এত ভালো আর চাইতে হবে না প্লিজ! মাসিমণি এসে আমাকে পাগল করে দেয়। মাসি এলে আমি এই এখানে থাকতে পারি না আর। তুমি কি চাইছ, আমি এই ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাই?
-পাগলের মতো কথা বলবে না পেখম। সেটা চাইলে প্রথম দিনই তোমার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ঘর থেকে দূর করে দিতাম। 
-দূর করে যখন দাওনি, তাহলে এখন একটু শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে। কি বোঝাবে মাসিমণি আমাকে? আমি কি বাচ্চা মেয়ে? যাহোক বুঝিয়ে দিলেই বুঝে যাবো? আমি যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, মাসিমণি বুঝবে সেটা? কিছু না বুঝেই ওর এত ভাষণ, এত জ্ঞানের কথা কে শুনবে মা? তোমরা প্লিজ আমাকে নিজেরটা বুঝে নিতে দাও! 
-দিয়েছিলাম তো! খুব বোদ্ধা হয়েছিলে না তুমি! ফল কি হলো? এত যখন নিজেরটা নিজে বুঝে-গুছিয়ে নেওয়ার শখ, তাহলে ওই অবুঝ মেয়েটাকে কোলছাড়া করে হোস্টেলে ফেলে রেখেছিস কেন? এত বুঝিস, আর ওর কষ্টটা বুঝিস না? মা বাবা থাকতেও হোস্টেলে অনাথের মতো মেয়েটা বড় হচ্ছে!! আজ প্রথম ড্রামা ক্লাসে যাবে, মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলবে, তাও বলতে পারলো না। কেমন মা রে তুই? নিজের পেটে ধরেই তো জন্ম দিয়েছিস ওকে। ওর কথা একটুও মনে পড়ে না? আমার হয়েছে যত জ্বালা! ব্যাস গেলো! ওদিকে চা উথলে সব পড়ে গ্যাস নিভে গেলো বোধহয়। সকালে একটু শান্তিতে এককাপ চা মুখে দেব, তারও উপায় নেই। তুই কি বুঝবি মায়ের জ্বালা! কিছু বলতে গেলেই কথার ফুলঝুরি! তুই একাই সব বুঝিস পেখম। আমার বয়সটা তো হাওয়ায় বেড়েছে! সব বুঝে বুঝেই তো আজ এখানে এসে পৌঁছেছিস!

প্রতিদিনের এই অশান্তি উজ্জয়িনীর এখন সয়ে গেছে। সত্যিই ও কাউকে সুখী করতে পারলো না। নিজের বাবাকেও ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর দোরগোড়ায়। মাকেও বেঁচে থাকতে কোনো সন্তানসুখ দিতে পারছে না। একরত্তি মেয়ে মাম্মাম, তাকেও সরিয়ে রেখেছে নিজের থেকে অনেকটা দূরে। মাতৃসুখ হতে বঞ্চিত ওই সেও। আর শৌনক? দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে ঢুকলো উজ্জয়িনী। এদিকে মায়ের ওপর বকবক করতে এসে, সত্যিই সবটুকু চা উথলে পড়ে গেছে। মা আবার চায়ের জল চাপিয়েছে। নিজের সবুজ চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে ধীরকণ্ঠে উজ্জয়িনী বললো,

-ড্রামা ক্লাসের ড্রামা, ডায়লগ, ও আনন্দ করে শিখুক মা। স্টেজে উঠে আমার মাম্মাম পারফর্ম করবে। আমি বেশ দেখতে যাবো। কিন্তু ঘরের এই রোজকার ড্রামা যেন আমার মাম্মামের শিশুমনে আঘাত করতে না পারে! সেইজন্যই ওকে হোস্টেলে রেখে মানুষ করছি। 

মা কোনো কথার আর উত্তর দিলো না। রান্নাঘরে বাসনের শব্দ অনাবশ্যক রকম বৃদ্ধি পাওয়াতে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো বর্তমান প্রজন্মের একজন প্রোথিতযশা লেখিকা উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। ডাকনাম পেখম। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চাকুরীরত পেখমের বাবা, অবসর নেওয়ার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পারিবারিক চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকলেও, পেখমের জীবনের একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত সহসাই সুখী গৃহকোণের পরিচিত চিত্রটা একেবারে বদলে দেয়। সেদিন বাড়িতে তুমুল অশান্তি হওয়ার পর বাবা সেই যে বাড়ি থেকে বেরোলেন, আর বাড়িতে ফিরলেন না। রাস্তায় একটা যমদূতের মতো সুবিশাল গাড়ি, বাবার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনার পর থেকে মা একেবারে চুপ করে গিয়েছিল। আত্মীয়রা কেউ পেখমের দিকে সরাসরি আঙুল না তুললেও, বিবেক দংশনে মরে যাচ্ছিল শোকে পাথর হয়ে যাওয়া পেখম। সবার নিস্তব্ধ ইঙ্গিত যেন ওর বুকের মধ্যে তীরের ফলার মতো বিঁধেছিলো। তবে কি ওর জীবনের ওই সিদ্ধান্তটাই বাবার মৃত্যুর কারণ? বাবা কি ওর কথা ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো? মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও হারিয়েছিল পেখম। আজও মা-মেয়ের মধ্যে বাবাকে নিয়ে কোনো কথা উঠলে, মা একেবারে চুপ করে যায়। মা-ও কি তবে এটাই ভাবে, বাবার মৃত্যুর সকল দায় পেখমের?! সুর করে আদরমিশ্রিত কণ্ঠে বাবার ওই ডাকটা, আজ বড় শুনতে ইচ্ছে করছে, "আমার পেখমরানী কোথায় গেলি রে? ময়ূরের মতো পেখম মেলে আমার কাছে একটু আয় দেখি মা!" একাকীত্বের মুহূর্তে আপনজনের কথা বড় বেশিই মনে পড়ে। কিন্তু পেখমের জীবনে সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর সঙ্গেই ওর সম্পর্ক এতটাই তিক্ত, যে তাদের কোলে মাথা রেখে কেঁদে একটু হালকা হওয়ারও উপায় নেই। জীবন বড় দুঃসহ! বড় জটিল! আর যখন চিরপরিচিত মানুষগুলোই চোখের সামনে একটু একটু করে বদলে যায়, তখন আত্মবিশ্বাসটুকুও কোথায় যেন হারিয়ে যায়। পরিবারের মধ্যে থেকে, পরিচিতের মধ্যে থেকেও একাকীত্বের অসহনীয় জ্বালা সহ্য করা বড় সহজ কথা নয়। পরিবারের মধ্যেও প্রতিমুহূর্তে শুধু নিজেকে প্রমাণ করেই যেতে হয়। পেখম যখন নিজের ক্ষমতায় স্কুলের চাকরীটা পেলো, তখন ওর বেতনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবারে ও নিকট আত্মীয় মহলে হঠাৎ করেই ওর দর বেশ খানিকটা বেড়ে গেলো। বাবা-মাও কি ভীষণ খুশি হয়েছিল সেদিন। কিন্তু সকলের আদরের সেই পেখম যখন নিজের ইচ্ছেয় লেখালিখির কারণে চাকরীটা ছাড়লো, তখন ওর সিদ্ধান্তকে কেউ আর সাদরে গ্রহণ করলো না। ওই সিদ্ধান্তে বাবা-মাকেও আর পাশে পেলো না পেখম। মুহূর্তেই সকলের চোখে যোগ্য-আদর্শ সন্তান থেকে, অযোগ্য হয়ে উঠলো উজ্জয়িনী। যোগ্য সন্তান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে-করতে জীবন থেকে চল্লিশটা বসন্ত যে কিভাবে পেরিয়ে গেলো, উজ্জয়িনী আজ আর সঠিকভাবে তার হিসেব দিতে পারবে না। প্রায় প্রতিদিন সকালে মায়ের সঙ্গে এমনই কিছু আলাপচারিতায় বারংবার প্রমাণিত হয়, উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত জীবনের প্রতিপদে ব্যর্থ একজন নারী! সেদিন যখন মা দুপুরে খাওয়ার টেবিলে বলেই বসলো, "ওই ছাইপাঁশ কথাবার্তা যা সব বইতে লিখিস, তার সিকিভাগও যদি তুই নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারতিস, তাহলে তোর জীবনটা এভাবে ছারখার হয়ে যেত না। বড়-বড় কথা শুধু বইতেই মানায়। বুঝলি তো? বাস্তব অন্য কথা বলে!" সেদিন আর মাকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়নি, "তাহলে আমাকে ছোটবেলা থেকে এত-এত বই পড়তে শেখালে কেন? কঠিন বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে, কল্পনার জগতে ভাসিয়ে অনাবশ্যক আবেগী করে তুললে কেন? সবরকম আঘাত থেকে আগলে রাখলেই বা কেন? কেন এতদিন পরিস্থিতির চাপে পড়ে শিখতে দাওনি? কোনো কিছুর সঙ্গে আপোষ না করার শিক্ষাটাই বা দিলে কেন? দিলেই যখন আজ সেইসব শিক্ষা কোথায় গেল? তোমার দেওয়া সেইসব মহান শিক্ষার প্রয়োগ যখন নিজের জীবনে করছি, তখন তোমাকে পাশে পাচ্ছি না কেন মা?" এসব আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। আজকাল শুধু শুনেই যায় পেখম। কোনো কথার আর উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না। ধৈর্য হারিয়েছে ও। আর নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে ও তৎপর হয়ে ওঠে না। পেখম বুঝে গেছে, ও যতই যাই করুক না কেন, সংসারে ওকে নিয়ে কোনো একজনের সমস্যা থাকবেই। তাই এত ভেবে লাভ নেই। শুধু সময়ে-অসময়ে নিজের বছর দশেকের মেয়েটাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে। কিন্তু এসব পারিবারিক অশান্তি ওর শিশুমনে যাতে কোনো বিরূপ প্রভাব না ফেলে, সেই জন্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই বুকে পাথর চাপা দিয়ে ওকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কাঁচটা মুছে চোখে চশমাটা পরে নিলো উজ্জয়িনী। দৃষ্টিটাও গত বছর থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করছে। চোখদুটোতে টানতে হয়েছে কাঁচের আলগা পর্দা। চশমা পরেই উজ্জয়িনী দেখলো, মেঘ করে আসছে। দূরে আকাশে একটা সুবৃহৎ পাখি উড়ছে। বাবা অবসর নেওয়ার পর পেখম নিজের হাতে বাবার জন্য ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে এই ছোট্ট বাগানটা তৈরি করে দিয়েছিল। রকমারি পাতাবাহার গাছ, নাম না জানা গাছগাছালির পরিচর্যা করতে করতে, রঙবেরঙয়ের বাহারি ফুল ফোটার অপেক্ষায় বাবার জীবনের বাকি দিনগুলো কেটে যাবে এটা ভাবতেই, পেখমের মনে দারুণ উত্তেজনা কাজ করতো। তাই বাবার অবসরের দিনই, নার্সারী থেকে একগাদা সবুজ গাছের চারা উপহারস্বরূপ পেখম কিনে নিয়ে এসেছিল। তারপর বাবারও গাছের নেশা হয়ে গিয়েছিল। একরত্তি বারান্দাটাকে কিভাবে সাজাবে, কতরকমভাবে গাছ দিয়ে সাজাবে, সেইসব আলাপ-আলোচনা দিনরাত ফোনের মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে চলতো। বাবার উন্মাদনা দেখে পেখমও একের পর এক গাছের চারা এনে মহানন্দে ভরিয়ে ফেলতো ওই এক টুকরো বারান্দা। আজ বাবা সাধের এই ছোট্ট বাগানটা ফেলে রেখে চলে গেছে অনেক দূরে। কিন্তু পেখম এই বাগানটার মায়া কাটাতে পারেনি। নিজের হাতে প্রতিদিন বিকেলে এই গাছগুলোর পরিচর্যা করে ও। আর সন্ধ্যেবেলা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে শহরের বিষাক্ত আকাশের দিকে চেয়ে বলে, "বাবা দেখছো তো তুমি? আমি আজও তোমার বাগানের অযত্ন হতে দিইনি। এই কংক্রিটের শহরটা যতই বিষিয়ে উঠুক না কেন, এখানে অক্সিজেনের ঘাটতি হবে না কোনোদিনও। ওই দূরে তারাদের দেশে ঘুমিয়ে, শ্বাস নিতে তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে নাতো বাবা? আচ্ছা বাবা, বলো না! সেদিন রাস্তা পার হওয়ার সময় সত্যিই কি আমার কথাই তুমি ভাবছিলে? আমিই কি তোমায় শেষ করে দিলাম বাবা? মায়ের সিঁথির সিঁদুর মুছিয়ে দিলাম? কেউ উত্তর দেয় না। তুমি বলবে বাবা?" উজ্জয়িনীর এই সকল প্রশ্নের কোনো উত্তর আসে না। হঠাৎ বয়ে আসা দমকা বাতাস, বারান্দার গাছের পাতাগুলো দুলিয়ে দিয়ে যায় কেবল। কোনো একটা গাছে নতুন ফুল ফুটলেই সেই গাছটাকে জড়িয়ে ধরে সেদিন উজ্জয়িনী কাঁদে নীরব কান্না। আজ গোটা বারান্দাটা লাল-হলুদ ফুলে আগুনরঙা সাজে সেজে উঠেছে। এই গাছগুলো উজ্জয়িনীর সঙ্গে একটুও বিশ্বাসঘাতকতা করে না। ওর অক্লান্ত পরিচর্যার ফসল হিসেবে, প্রতিবারই অগুনতি ফুলেল সৌন্দর্য উপহার দিয়ে যায়। হাতের চায়ের কাপটা সরিয়ে রেখে ঝুলন্ত টবটাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো উজ্জয়িনী। তারপর ভেঙে পড়লো নিঃশব্দ কান্নায়! ঘরে ফোন বাজছে। নিশ্চয়ই মাম্মাম! ওর প্রথমদিন ড্রামা ক্লাসের গল্প শুনতে হবে। ওকে অনেকটা আদরও করতে হবে। আবেগে বাষ্পীভূত হয়ে আবছা হয়েছে পেখমের চশমার কাঁচ। চশমা নামিয়ে চোখ মুছে ও ছুটলো নিজের ঘরে। স্বচ্ছ চায়ের কাপে সবুজ চা ধীরে-ধীরে উষ্ণতা হারিয়ে পানের অযোগ্য হয়ে উঠলো...

-শোন না রে মা! এইরকম জেদ করলে হয়? 
-মাসিমণি, দেখছো তো আমি রেডি হচ্ছি। বিশেষ প্রয়োজনে আমাকে একটু বেরোতেই হবে। বাড়ি ফিরে তোমার সঙ্গে কথা বলছি। 
-তুই আমাকে এড়িয়ে যাস। এখনও তাই যাচ্ছিস। ফোন করলেও ফোন ধরিস না পেখম। কি শুরু করেছিস নিজের জীবনটা নিয়ে? ঝোঁকের মাথায় চাকরীটা ছাড়লি, ওটাও মানা যায় না। আর এখন তো....
-চাকরী করি না বলে আমার খাওয়া-পরার চিন্তা তোমাকে করতে হচ্ছে কি? আমি কি এক সন্ধ্যে তোমার বাড়িতে ভাত চাইতে যাচ্ছি? না থাকতে যাচ্ছি? নাকি গা ঢাকার কাপড় চাইছি? আমার নীচের ফ্ল্যাটের ভাড়ার টাকা, বাবা যা রেখে গেছে, আমার যা আছে, এখনও যা রোজগার করে চলেছি, সব মিলিয়ে আমার পুরো পরিবারের চাহিদা ভরণপোষণ বাদ দাও, প্রয়োজনে তোমার সংসারও আমি টেনে নিতে পারবো। আমি চাকরী ছেড়েছি, আমি বুঝবো। আমার জীবন, আমি বুঝবো। তোমাকে এত ভাবনা না ভাবলেও চলবে। 
-দিদি তোর মেয়ের কথাবার্তা এত খারাপ হয়ে গেছে?
-তাহলেই ভাব, কি নিয়ে সারাটা দিন থাকি আমি? সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে থাকে, আর আমার সঙ্গে এইরকম যুদ্ধ করে! মেয়ের এত মুখ চলে!
-মা!!
-কি মা? মাসিমণি কি তোর খারাপ চাইবে? 
-মা! আমার এত ভালো, এত শুভচিন্তক, এতসব শুভাকাঙ্খীর চাপ আর নিতে পারছি না আমি! মাসিমণি আমি বেরোলাম।

ঘড়িটা হাতে পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো উজ্জয়িনী। কিন্তু তার আগেই তুমূলভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হলো মাসির কাছে,

-এই মেয়ে! শোন! নিজের বয়সটা একটু দেখ। এই বয়সে এসে এসব কি ভূত চেপেছে তোর মাথায়? হ্যাঁ রে! জীবনটা কি তোর ওই ল্যাপটপের গল্প নাকি? যার সঙ্গে যাকে ইচ্ছে, যখন ইচ্ছে জুড়ে দিবি! আবার যখন চাইবি ভেঙে দিবি। এরকম হয় না মা। কি শুরু করেছিস মা তুই এসব? তোর মায়ের তো বয়স হচ্ছে। তোর জন্য কমপ্লেক্সে মাকে কত খারাপ-খারাপ কথা শুনতে হচ্ছে মা! কতরকম জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দে মা। অন্তত নিজের পেটের মেয়েটার কথা ভাব। ও যদি বড় হয়ে জানতে পারে, ওর মায়ের চরিত্র এমন, মন এত অস্থির, সামান্য একটু মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও নেই, তাহলে তুই তোর নিজের মেয়ের চোখেই কতটা নেমে যাবি, সেটা একবারও ভেবে দেখেছিস? একটা বাচ্চাকে সুস্থভাবে মানুষ করতে বাবা-মা দুজনকেই প্রয়োজন হয়। বাবার ভালোবাসা বাবা ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারে না পেখম। মেয়েদের সংসার জীবনে অনেককিছুই সহ্য করতে হয়। আর মায়েদের তো এত ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা ভাবলে চলেই না। তারা কি আর নিজের জন্য বাঁচে রে? তারা তো বাঁচে সন্তানের জন্য। তোর অমন সুন্দর সাজানো-গোছানো সংসার! এই বয়সে এসে এসব তোকে মানায় বল? অন্তত সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে...
-মাসিমণি! 
-বল মা? 
-আমার বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি একটা অনুষ্ঠানে যাবো। সেখানে সময়মতো পৌঁছতে না পারলে, অনুষ্ঠানটাই শুরু হবে না। প্লিজ! সব এসে শুনছি। প্রমিস! তুমি আজ সারারাত ধরে বলবে, আমি শুনবো। এখন বেরোতে দাও। মা এলাম। 

ছিটকে ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে একপ্রকার পালিয়েই বাঁচলো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। বেরোনোর সময় মায়ের চাপা কান্নার শব্দ ওর কানে ভেসে এলো। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েই বাড়ির বাইরে পা রাখলো উজ্জয়িনী। ওলা বুক করে ফ্ল্যাটের নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর হ্যান্ডব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে উঠে বসলো। ব্যাগের ওই নির্দিষ্ট চেনটা খুলতে গিয়েও খুলতে পারলো না আর। কাঁচের ভিতর দিয়ে জানালার বাইরের দিকে চেয়ে অস্ফুটে একটাই নাম উচ্চারণ করলো, "শৌনক!" ফেসবুকে ঢুকেই খুলে বসলো একজন পুরুষের প্রোফাইল। শৌনক চট্টোপাধ্যায়! তার একের পর এক ছবি স্ক্রোল করে, ফোনের স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে যেতে লাগলো উজ্জয়িনী....

অনুষ্ঠানের পর সভাগৃহে উপস্থিত অগণিত পাঠকবৃন্দের জমায়েত ও সামান্য জলযোগের ব্যবস্থা নিপুণহাতে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অসীমদা। জনসমাগমের মধ্যেই এককোণে একটা চেয়ারে বসেছিলো উজ্জয়িনী। অনিচ্ছাসত্ত্বেও অজস্র গুণীজনের মধ্যে কিছু বক্তব্য ওকেও রাখতে হয়। কন্ঠ হতে উত্তরীয় নামিয়ে রেখে অস্থির হাতে কয়েকটি বইতে স্বাক্ষর করছিলো ও। মাথা নীচু করেই স্বাক্ষরকার্যে ব্যস্ত থাকায়, কোনো পাঠকের মুখ দেখা সম্ভব ছিল না। অদূরে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে যে ওই লাইন শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিল, সেটা প্রথমে উজ্জয়িনীর দৃষ্টিগোচর হয়নি। সকল পাঠকের বইতে স্বাক্ষর, মুঠোফোনে ফ্রেমবন্দী ছবির আবদার মিটিয়ে তখন উজ্জয়িনী প্রায় বিধ্বস্ত। সভাগৃহ অপেক্ষাকৃত ফাঁকা হওয়ার পর উজ্জয়িনী দেখলো, একটি ছেলে ওর দিকে চেয়েই দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির হাতে অন্য দু-তিনটি বইয়ের সঙ্গে, ওর সর্বশেষ প্রকাশিত বইয়ের একটা কপি রয়েছে। কিন্তু সে নিজে থেকে এগিয়ে আসছে না দেখে, মুখে মৃদু হাসি এঁকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চাইলো উজ্জয়িনী। এবার ছেলেটি এগিয়ে এলো উজ্জয়িনীর দিকে। ছেলেটির বয়স বড় বেশি নয়। কলেজ পড়ুয়া হয়তো। গালে সদ্য গজিয়ে ওঠা দাড়ির আভাস। ক্লান্ত রাতজাগা দুটি চোখ। বর্তমান প্রজন্ম মুঠোফোনের দাসত্ব বরণ করেছে। তাই স্বাস্থ্যের প্রতি বড়ই অমনোযোগী। এই ছেলেটিও তার ব্যতিক্রম নয়। রাতজাগা ক্লান্তির ছাপ গোটা মুখমন্ডল জুড়ে। পরনে সুতির পাঞ্জাবী। হাতা গুটিয়ে রেখেছে। এক নজরে ছেলেটির আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে উজ্জয়িনী বললো,

-কোনো অভিযোগ?
-না তো ম্যাম।
-তাহলে দূরে দাঁড়িয়েছিলে যে! আমি ভাবলাম, আমার কোনো বই পড়ে মনে হয়েছে অপাঠ্য, তাই একান্তে অভিযোগ জানাবে বলে দূরে দাঁড়িয়ে আছো। 
-কি যে বলেন ম্যাম! আপনার কোনো বই বাদ দিইনি। সব সংগ্রহে আছে। শুধু এটাই ছিলো না। এটাতে একটা সই ম্যাম?
-নিশ্চয়ই!
-ম্যাম আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?
-আমরা তো কথাই বলছি, কি নাম তোমার?
-দীপ্ত বর্মন।
-আচ্ছা। "দীপ্তকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসাসহ....উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত"। হ্যাঁ দীপ্ত, আমরা তো কথাই বলছিলাম। বলো কি বলবে?

বইটা ফিরিয়ে দিলো উজ্জয়িনী। ছেলেটি কথা শুরু করার আগেই সশব্দে উজ্জয়িনীর ফোনটা বেজে উঠলো। ও ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়েই বিরক্ত হয়ে গেলো। মাসিমণি ফোন করছে। যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওর বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই সময়সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বার দুয়েক মায়ের ফোন এসে গেছে। মায়ের সঙ্গে কথা বললেও, মাসির ফোনটা উজ্জয়িনী কেটে দিলো। তারপর হাসিমুখে দীপ্তর দিকে চেয়ে বললো,

-বলো দীপ্ত? কি বলবে?
-ম্যাম একটু আলাদাভাবে কথা বলা যাবে আপনার সঙ্গে?
-কেন বলো তো?
-প্লিজ ম্যাম!
-শুনছে না কেউ। সবাই অনেকটা দূরে আছে। বলো!
-ম্যাম! আমি আঁকতে খুব ভালোবাসি। ডিজিটাল, ওয়াটার কালার, যেমনটা বলবেন করবো। আপনার মনের মতো করে। একবার আপনার বইতে ইলাস্ট্রেশনের সুযোগ দেবেন ম্যাম? আপনার মনের মতো করে আমি চরিত্রদের সাজিয়ে দেব। আপনার কলমে ওরা যদি প্রাণ পায়, আমার ছবিতে পাবে অবয়ব। 
-দেখো দীপ্ত....
-নতুনদের কেউ কাজ দেয় না ম্যাম। আবার কাজ করিয়ে অনেকে পয়সাও দেয় না। ছোটখাটো কয়েকটা প্রকাশনী থেকে কাজ করেছি ম্যাম। খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাঠক যখন একটা বই উল্টে পাতার পর পাতা পড়ে যায়, তখন তার পিছনের অক্লান্ত পরিশ্রমটা সেভাবে বোঝে না। নতুন বইয়ের গন্ধে, বলিষ্ঠ লেখনীতে হারিয়ে যায় তারা। কিন্তু ওই একটা বই বাজারে আনতে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে কি পরিমাণ পলিটিক্স চলে, সেটা আমি এই কদিনেই বুঝে গেছি। আপনি তো অনেক সিনিয়র রাইটার ম্যাম। আপনি আমার থেকে এসব খবর আরও ভালো জানেন। আপনি আমাকে একটা সুযোগ করে দিন না, আপনার বইতে কাজ করার। আমি জানি নতুনদের নিজের জায়গা করে নিতে কতটা পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়! আগে অনেকবার চেষ্টা করেছি ম্যাম কাজ পাওয়ার। নামী প্রকাশকরা কেউ কাজ দেয় না। আমাকে দেখা করতে বলেও তারা আসে না। আসলে আমি অনামী তো! কেউ চেনেই না। একটা কাজ পেলে নিজেকে প্রমাণ করে দেখিয়ে দেব। একটা সুযোগ আপনি করে দেবেন ম্যাম? আপনার বইয়ের যা কাটতি আছে, আপনার সঙ্গে একটা কাজ করলে, আপনার নামের সঙ্গে নিজের নামটা একবার জড়িয়ে ফেলতে পারলেই....
-দীপ্ত?
-বলুন ম্যাম?
-একটা বইয়ের পিছনের রাজনীতি আমার অজানা নয়। তবে স্তাবকতা আমার অপছন্দ। আলোকবৃত্তে থাকা মানুষরা দিনরাত পরিশ্রম করে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। তাদের সঙ্গে একবার কাজ করলে, তোমার হয়তো খানিকটা শ্রীবৃদ্ধি হবে ঠিকই! কিন্তু টিকে থাকার জন্য নিজের লড়াইটা নিজেকেই লড়তে হয়। শূন্য থেকে একদিন আমিও শুরু করেছিলাম। তোমার সঙ্গে আমার পার্থক্য হলো, আমি কোনদিন কারোর দরজায় পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘুরিনি। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে শুধু কাজ করে গেছি। এভাবে সুযোগের জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকিনি। কাজ করো। সুযোগ তোমার দরজায় নিজেই কড়া নাড়বে। 
-আর না নাড়লে? 
-তখন না হয় এসব দ্বিতীয় পথগুলো ভেবো। তোমার বয়সটা তো খুবই কম। এখনই এত ভেঙে পড়লে চলবে? অনেকদূর যেতে হবে তো!
-আমাকে তবে সুযোগের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে বলছেন? আচ্ছা! তাই করবো তবে। কিন্তু আর কত অপেক্ষা করবো ম্যাম? আর কি করলে....

ছেলেটির মুখ দেখে বড় মায়া হলো উজ্জয়িনীর। ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। কিন্তু বইবাজারের লবিবাজি আর রাজনীতির চাপে পড়ে কাজের উৎসাহ হারাচ্ছে। কাজ খারাপ হলে তাকে বকে-ধমকে দুটো উপদেশ দেওয়া যায়। কিন্তু একজন মানুষ যে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে কাজের উৎসাহটুকুই হারিয়ে ফেলে, সেটা উপলব্ধি করতে পারলো উজ্জয়িনী। হয়তো কাজের অভাবে ছেলেটি কিছুদিনের মধ্যেই জলাঞ্জলি দেবে আপন শিল্পীসত্তা। এটা তো হতে দেওয়া যায় না। অসহায় ছেলেটির অবনত চোখের দিকে চেয়ে উজ্জয়িনী বললো, 

-তোমার কাজ দেখানো সম্ভব?
-আপনি দেখবেন ম্যাম!
-এই মুহূর্তে সম্ভব না। তুমি আমাকে মেইল করবে। আমার অফিসিয়াল পেজে মেইল আইডি পেয়ে যাবে। 
-আমার পেজ লিঙ্ক দিয়ে দেব ম্যাম। সব কাজ ওখানেই শো-কেস করে রাখি।
-তাই দিও।
-থ্যাঙ্কু ম্যাম!
-কথা দিলাম না কিন্তু। কাজ পছন্দ হলে ভেবে দেখবো। আমারও তো পেশাদারী ক্ষেত্রে কিছু দায়বদ্ধতা আছে। আমার কথাই শেষ কথা নয়। সবদিক ঠিক থাকলে তুমি আমার দিক থেকে নয়, সরাসরি প্রকাশকের পক্ষ থেকে ডাক পাবে। তখন যেন আমার নাম ডুবিও না!
-প্রাণ দিয়ে সাজাবো ম্যাম আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ!
-আচ্ছা। আর ডাক না পেলে মনে রাখবে....
-আমাকে আরও খাটতে হবে। আরও নিখুঁত হওয়ার জন্য। কম্পিটিশনে টিকে থাকার জন্য।
-হুম! কিন্তু উৎসাহ হারাবে না। আগামী কোনো এক বইমেলায় তোমাকে হয়তো পকেটের পয়সা খরচ করে, আমার বই কিনতে হবে না। নিজের কাজের কপি হিসেবে একটা বই বিনামূল্যেই পেয়ে যাবে। 
-আমি আজই বেশ কয়েকটা কাজ করে, পেজে আপলোড দিয়ে তারপর আপনাকে লিঙ্ক পাঠাবো ম্যাম। আজ আমি সারারাত জাগবো। আপনার পরবর্তী লেখা কবে নাগাদ আসার কথা? 
-দেখি। এখন তেমন কিছু লেখা হচ্ছে না! 
-লিখুন ম্যাম। আমিই করবো আপনার আগামী বইয়ের প্রচ্ছদ। কালই সব ডিটেলস আপনি পেয়ে যাবেন।

উজ্জয়িনীর মনে হলো, হঠাৎ করেই যেন ছেলেটির দীপ্ত নামটা সার্থক হয়ে উঠলো। কাজ পাওয়ার আশায়, আনন্দে ঝলমল করে উঠলো ছেলেটির মুখ। 

-বেশ! তাই পাঠিও। তবে রাতে ঘুমাও একটু। 
-আপনার চরিত্ররা তো সবাই নিশাচর ম্যাম। তাদের শান্তিতে ঘুমোতে দেন আপনি? পাঠকরাও না হয় রাত জাগবে। প্রচ্ছদশিল্পীও। আপনি নিজে রাতে ঘুমান তো ম্যাম?! 

স্বল্পপরিচিত এই ছেলেটি হঠাৎ করেই যেন একটা আয়না এনে উজ্জয়িনীর সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। কাল্পনিক সেই আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শিউরে উঠলো উজ্জয়িনী। তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,

-তুমি চা খাবে দীপ্ত? 
-না ম্যাম। টিউশনি আছে। যেতে হবে। ভিড় একটু ফাঁকা হলে আপনার সঙ্গে কথা বলবো বলে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করলে মাসের মাঝখানেই টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে স্টুডেন্টের বাবা বলবে, কাল থেকে আর আসতে হবে না! আসলে দুবছর আগে বইমেলায় আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম আমি। আমার দুটো বইতে আপনার সইও আছে। তবুও আপনি আমায় চিনবেন না। আপনি তো বইতে সই করার সময় কারোর দিকে মুখ তুলে তাকান না। ছবি তুললেও হয়তো ভুলে যান। মেলার ওই ভিড়ের মধ্যে তো এত কথা বলা যায় না। তাই গত বছর থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, একদিন আপনার সঙ্গে একা কথা বলবোই। সমস্ত ভিড় পেরিয়ে পৌঁছব আপনার কাছে। একটা সেলফি ম্যাম?
-নাও!
-থ্যাঙ্কু! আসছি ম্যাম! আমি কালই আপনাকে মেইল করছি!
-হুম! সাবধানে এসো....

প্রকাশক অসীমদা ও অন্যান্য প্রতিভাবান লেখক-লেখিকার সান্নিধ্যে সেদিন সন্ধ্যেটা উজ্জয়িনীর বেশ ভালোই কাটলো। অসীমদার কাছ থেকে অনুমতি চাইতে গেলে বাইরে বেরিয়ে এসে উজ্জয়িনীর কাঁধে হাত রেখে অসীমদা বললেন,

-মেয়ে কেমন আছে জয়ী?
-ভালো দাদা! 
-আর তুমি?
-আমিও ভালোই।
-কি করছো নিজের জীবনটা নিয়ে?
-বাড়িতে তো সারাদিন চলছেই দাদা। এসব কথা আর না বললেই কি নয়?
-সবাই তোমার ভালো চায়। তাই বলছে! জীবনটা কোনো উপন্যাস নয় জয়ী। যে তোমার ইচ্ছেমতো তুমি উপসংহার সাজাবে!
-তবে কি দাদা? ছোটগল্প? যা শেষ হয়েও হবে না শেষ? প্রতি পাতায় থাকবে নতুন আঙ্গিকে কোনো শুরুর রেশ?
-এসব কাব্য করে বইয়ের ব্যবসা চলে। প্রকাশকের- লেখিকার দুটো পয়সা আসে। কিন্তু জীবন চলে না জয়ী। আবেগতাড়িত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। নিয়ন্ত্রণ রাখো নিজের ওপর। মেয়েটার কথা একটু ভাবো। তুমি আমার বোনের মতো। দীর্ঘ কয়েক বছরের সুসম্পর্ক আমাদের। সেই জায়গা থেকে অন্তত দাদার কথাটা শোনো! আমি তোমার ভালো ভেবেই...

সশব্দে বেজে উঠলো উজ্জয়িনীর ফোনটা। স্ক্রিনের দিকে চেয়ে ও হেসে বললো,

-এই যে! আমার ভালো চাওয়ার আর একজন মানুষ! কতবার ফোন করছে! এক মিনিট দাদা?

উজ্জয়িনীর কাঁধের ওপর থেকে স্নেহের আলিঙ্গন সরিয়ে নিলেন অসীমদা। উজ্জয়িনী বলে উঠলো,

-হ্যাঁ মাসিমণি!
-আর কত রাত করবি? নাকি আমি আছি বলেই বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করছে না? আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের কৃতকর্মের হিসেব শুনতে ভালো লাগে না? তাই না?

নিরুত্তর উজ্জয়িনী। 

-মা চিন্তা করছে তোর জন্য! বাবাটাকে তো শেষ করলি, এবার মাকে অন্তত শেষ কটাদিন একটু শান্তিতে বাঁচতে দে!
-কি বললে মাসি!! আমি বাবাকে শেষ করেছি!?
-বাড়ি আয়। বাড়ি আয়। মা চিন্তা করছে।
-আসবো না আমি। তুমি যতক্ষণ ওই ফ্ল্যাটে থাকবে, আমি ঢুকবই না। কিছুতেই যাবো না আমি! আমি আজ ফিরবোই না। কি করবে তুমি?

-জয়ী!!

লাইনটা কেটে দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো উজ্জয়িনী। 

-দাদা, আজ আর কিচ্ছু শুনতে ভালো লাগছে না। আমি আসছি। আপনি আর ফোন করবেন না প্লিজ। করলেও আমি ধরবো না।

উদভ্রান্তের মতো বড় রাস্তায় নেমে একটা সাদা রঙের নো রিফিউজাল ট্যাক্সি দেখেই হাত নেড়ে ওটাকে থামালো উজ্জয়িনী। 

-কোথায় যাবেন দিদি?
-যতই বিল হোক, আপনি ভাড়া পেয়ে যাবেন। আমার কাছে টাকা আছে। চিন্তা নেই। আপনার যেদিকে ইচ্ছে হয়, যেদিকে দুচোখ যায়, আপনি শুধু চলুন। আমি এই শহরের বুকে হারিয়ে যাব। আর ফিরবো না! 

ট্যাক্সিতে উঠে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। ট্যাক্সিওলা পিছন ফিরে হাঁ করে ওর মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে দেখে উজ্জয়িনী ধমকে উঠলো,

-কি হলো! চলুন! 

ট্যাক্সিতে বসেই উজ্জয়িনী ভেঙে পড়লো নিঃশব্দ কান্নায়। বাবার একচিলতে বাগানের গাছগুলোতে সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলগুলো হাতছানি দিয়ে ওকে যেন পিছু ডাকছে। ওর বুকফাটা যন্ত্রণায় পাতাগুলোও কাঁপছে তিরতির করে। কিন্তু উজ্জয়িনী আর কিছুতেই ফিরবেই না ওই বারান্দায়। হ্যান্ডব্যাগটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলো উজ্জয়িনী। ব্যাগের একটা চেন নিষিদ্ধ। ওটা খুলতে নেই! ওতে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে উজ্জয়িনীর প্রাণ ভোমরা। আর অপর পাশে সর্বক্ষণের সঙ্গী ট্যাব। ল্যাপটপটা বিছানার ওপরেই রয়ে গেলো। পাওয়ার ব্যাঙ্কটাও সঙ্গে নেই। না থাকুক! এবার মা ফোন করছে। ও ফোনটা বন্ধই করে দিলো। উজ্জয়িনী সেনগুপ্তর বাড়ির সম্পূৰ্ণ বিপরীতদিকে চলতে শুরু করলো ট্যাক্সি। অজানার উদ্দেশ্যে....

(চলবে....)

ছবি : সংগৃহীত

বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১

PRE - BOOK










 



শুরু হয়ে গেলো "নির্বাক"-এর প্রিবুকিং। প্রিবুকিং এর এই নির্দিষ্ট সময়ে মুদ্রিত মূল্যের ওপর থাকবে ২৫% ছাড়।
আপনার কপিটি প্রিবুক করতে এখনই ফোন অথবা হোয়াটসঅ্যাপ করুন এই নম্বরে,
পাঠকবন্ধু : +917439112665

অথবা লিংক এ ক্লীক করে বুক করুন
লিংক - BOOK NOW

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইন্দোবাংলার ফোনে ফোন করুন/হোয়াটসঅ্যাপ করুন—+880 1674-121221





মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

সপ্তপর্ণী (প্রথম খণ্ড) চতুর্থ পর্ব


 



সপ্তপর্ণী


সাথী দাস


প্রথম খণ্ড


চতুর্থ পর্ব








মর্মাহত ত্রিদিব বললেন,

-আমাকে অবিশ্বাসের কোনো কারণ নেই ত্রিযামা।ছুরিকাঘাতে মনুষ্যশরীরে আঘাত সম্ভব,তবে বাহির হতে অদৃশ্য হৃদয়ে নয়।এ তোমার নিষ্ফল প্রচেষ্টা।ছুরি যথাস্থানে রাখো।
-বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের মতো কোনো বক্তব্য এখনও আপনি রাখেননি রাজা।
-এ বাক্যও সত্য!
-রাত্রি জাগরণের কারণে আপনি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত।বিশ্রাম গ্রহণ করুন।

কোমরবন্ধনীর মধ্যে অস্ত্রকে আশ্রয় দিয়ে,আপন গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো ত্রিযামা।তবে তার চরণযুগল পুনরায় স্থির হলো।উদ্বেলিত হৃদয়ে ত্রিদিবের মুখনিঃসৃত বাক্য হৃদয়ঙ্গম করলো ত্রিযামা,

-আগামী কয়েক দিবস আমি মায়ের অতিথি।রাজা আপন রাজ্যেই অতিথি!এ নিতান্তই হাস্যকর হলেও,মাকে সম্মানপূর্বক এই আতিথেয়তা আমি গ্রহণ করেছি।সেই সঙ্গে আমার মনের গোপন ইচ্ছা এটুকুই ত্রিযামা,জীবনকালে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের মতো সময় ও সুযোগ তো সকল নরাধমেরই প্রাপ্য।তবে ত্রিদিবাচার্য এ অধিকার হতে বঞ্চিত হবে কেন?সেই সুযোগটুকু অন্তত তাকে প্রদান আবশ্যক....

নিরুত্তর ত্রিযামা মুহূর্তেই পরিত্যাগ করেছিলো সেই স্থান।সমগ্র দিবস কেটেছিলো এক মানসিক অস্থিরতার মধ্যে।পরিশেষে সূর্যদেব যখন আপন ম্লান হয়ে আসা নয়নাভিরাম আলোকোজ্জ্বল রূপসহ প্রায় অদৃশ্য হয়েছেন মায়াকাননের সবুজ অরণ্যশিখরের প্রান্তরে,তখন ক্ষীণ বাতি নিয়ে ত্রিদিবের কক্ষে প্রবেশ করেছিলো ত্রিযামা।তবে দর্শন পায়নি নৃপতির।কুটির শূন্য।উদভ্রান্তের মতো কুটির হতে বাইরে বেরিয়ে সেই নির্দিষ্ট স্থানের দিকে ধেয়ে যায় ত্রিযামা।অদৃশ্য হয়নি বৈশ্বানর।অন্ধকার নিমজ্জিত বৃক্ষপদতলে দুই চক্ষু বুজে দন্ডায়মান ত্রিদিবের প্রাণের অশ্ব।তবে সেই ক্ষণে নিরুদ্দেশ অশ্বারোহী।আকুলচিত্তে দুর্ভেদ্য বনানীর ভিতর পায়ে হাঁটা পথ অনুসরণ করে মায়াকাননের গভীরে প্রবেশ করলো ত্রিযামা।কিছুদূর অগ্রসর হতেই চন্দ্রালোকে দেখা মিললো তার।পূর্ণচন্দ্রের আলোকছটায় নবরূপে সজ্জিত মায়াকাননের প্রতিটি বৃক্ষ।সম্মুখে টলটলে দীঘি।এই দীঘির জল যাযাবর গোষ্ঠীর তৃষ্ণা নিবারণের হেতু ব্যবহার করা হয়।প্রতি প্রভাতে সূর্যের প্রথম কিরণের উপস্থিতিতে সবুজ জলজ উদ্ভিদে আবৃত এই দীঘির জলে অবগাহন করে ত্রিযামা।এর প্রভাতী রূপের সঙ্গে পরিচিতা এই বন্য নারী।তবে রাতে চন্দ্রপ্রভার সৌজন্যে দীঘির মোহময়ী রূপ হতে অকস্মাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া বড়ই কঠিন।ত্রিদিব ওই দীঘির এক প্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন।ধীর পায়ে ত্রিদিবের পশ্চাতে গিয়ে দাঁড়ালেন ত্রিযামা....

-এসো!
-আপনি বুঝতে পেরেছেন?আমি নেহাৎই ধীরগতিতে....
-আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অতিশয় সজাগ।সে বুঝিয়ে দিয়েছে আমায় কেউ অনুসরণ করছে।তবে আমি বিপদগ্রস্ত নই।সে আমার শত্রু নয়!এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
-মাকে সংবাদ প্রেরণের প্রয়োজন বোধ করেননি।এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো নিরুদ্দেশ হওয়ার অর্থ?
-প্রকৃতি বড় সুন্দর ত্রিযামা।রাজকোষের স্বর্ণচ্ছটা হতে দীঘির উপরিভাগের চন্দ্রকিরণের ওই আভা,চোখকে অধিক আরাম প্রদান করে।আমি সুখী!
-দীর্ঘকাল যাবৎ মায়াকাননের এই অংশে যাতায়াতের কারণে,জঙ্গলের সকল পথ,সকল সৌন্দর্য আমার দৃষ্টিপথে ধরা পড়েছে।তবে মায়াকাননের এমন রাত্রিকালীন সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পূর্বে হয়নি।সত্যিই পৃথিবী বড় বিচিত্র রাজা!একই অঙ্গে সময়বিশেষে তার অজস্র রূপ!
-শুধু সময়কালে সে রূপে অবগাহনের প্রয়োজন!
-আসুন।আপনাকে অপূর্ব সুন্দর এক দৃশ্য দেখাই।জীবদ্দশায় এমন সুযোগ বুঝি দ্বিতীয়বার পাবেন না!

ত্রিযামার হাত ধরে মায়াকাননের সুদীর্ঘ ছায়াঘেরা নিবিড় অরণ্যে হারিয়ে গেলেন ত্রিদিব।দীঘির অদূরেই ঝর্ণার মৃদু শব্দ।সুদূরপ্রসারী হিমশৈলর কোনো এক অনামী চূড়া বুঝি আত্মগোপন করেছে এই দুর্ভেদ্য অরণ্যের আড়ালে।যা চিরকালই থেকে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।ক্ষুদ্র গুল্ম হতে বৃহৎ মহীরূহ,সকলেই আলোআঁধারির খেলায় মত্ত।মৃদুমন্দ বাতাসে শীতল হয় মায়াকাননের অধীশ্বরের অস্থির মন।অপরূপ নৈঃশব্দের মধ্যে অকস্মাৎ বৃক্ষরাজির মর্মরধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশপূর্বক,মনে এক অলৌকিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়।রাতচরা বিহঙ্গ-দম্পতি কর্কশ আলাপনে আপন অস্তিত্ব জানান দেয়।ঝর্ণার সম্মুখভাগে পৌঁছে স্তব্ধতার শুভ্র চাদরে আপনাকে আবৃত করলেন ত্রিদিব।চন্দ্রালোকের স্পর্শে সেই ঝর্ণা সদ্য যুবতীর মতই প্রাণোচ্ছল।ধীরে ধীরে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বনপূর্বক,সেই ঝর্ণার পিচ্ছিল পাড়ে আপন পদযুগল জলে ভিজিয়ে সিক্ত পাথরের ওপর বসলো ত্রিযামা।ত্রিদিব বসলেন অদূরেই।প্রকৃতির এমন অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্যের রসাস্বাদন হেতু,ত্রিদিব ও ত্রিযামা ব্যতিরেকে বুঝি তৃতীয় কেউ এই ত্রিভুবনে জাগ্রত নেই।সামান্য উচ্চৈঃস্বরে বুঝিবা বনদেবী রুষ্ট হবেন।অত্যন্ত ধীরকণ্ঠে ত্রিদিব বললেন,

-শুক্লপক্ষ!
-হুম!
-অপূর্ব!তবে কৃষ্ণপক্ষের অধিক সুন্দর নয়।কৃষ্ণপক্ষকালে এই স্থানে পৌঁছে,ত্রিযামার কমনীয় রূপ দেখতে মনে বড় সাধ জাগে।

নিরুত্তর ত্রিযামা।ঝর্ণার জল নাতিদীর্ঘ দীঘির অন্তরে বিলীন হয়ে গেলো।জলের উপরিভাগে ক্ষুদ্র তরঙ্গ।ক্রমশ অন্ধকার অরণ্য সজ্জিত হলো আলোকমালায়।মস্তকের ঊর্ধ্বপানে সুউচ্চ তরুদল হতে,সন্নিকটের লতানো পরজীবী বৃক্ষপল্লবে জ্বলে উঠলো অজস্র আলো।স্থির নয় সেই আলোকিত পতঙ্গ।জ্বলতে-নিভতে থাকা দীপ্তিময় সেই পতঙ্গ এসে বসলো ত্রিযামার উল্কি দ্বারা সজ্জিত উন্মুক্ত রুক্ষ বাহুতে।অদূরেই বসেছিলেন ত্রিদিব।উঠে এসে বসলেন ত্রিযামার সন্নিকটে।ত্রিযামার রুক্ষ বাহু হতে সেই আলোকোজ্জ্বল পতঙ্গকে অতি সাবধানে উঠিয়ে আপন হস্তের মধ্যে স্থান দিলেন।হতবাক খদ্যোত বুঝি আকস্মিক স্থান পরিবর্তনে বিচলিত হয়ে আপন দেহ হতে অস্থির আলোকবিন্দু বিচ্ছুরণ পূর্বক,ত্রিদিবের হস্তমধ্যে ইতস্তত বিচরণ করতে লাগলো।দুজনের মুখমণ্ডলের কিয়দংশ আলোকিত হলো সেই প্রাণীর কারণে।প্রকৃতির মায়াবিনী রূপে বিভোর হয়ে ভীত দৃষ্টিতে ত্রিদিবের পানে চাইলো ত্রিযামা।একাধিক জোনাক তখন ত্রিদিবের সর্বাঙ্গে জ্বলছে-নিভছে....

-ত্রিযামা!প্রথম দর্শনেই মনপ্রাণ সঁপেছি তোমায়।এ অরণ্য তোমার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদানে অপারগ।তুমি আমার সঙ্গে প্রাসাদে চলো।প্রিয় রানি করে আমার অন্দরমহলে রাজকীয় বিলাসিতায় রাখবো তোমায়।তোমার কোনরূপ অসম্মান হবে না।এই গোষ্ঠীর যাবতীয় দায়িত্ব নিতে আমি প্রস্তুত।নগরে স্থান দেবো সকলকে।গৃহ প্রদান করবো।জীবিকার পথ প্রশস্ত হবে।অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে এভাবে হিংস্র জন্তুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই অনাবশ্যক ত্রিযামা।আমার সঙ্গে চলো তুমি!দয়া করো আমায়।আমি মোহরকুঞ্জে ফিরতে চাই।উপযুক্ত ক্ষত্রিয়রূপে রাজধর্ম পালন করতে চাই।তবে সে দায়িত্ব কর্তব্য পালন,তোমা বিনে কদাচ নয় ত্রিযামা!

চঞ্চল জোনাক আপন ক্ষুদ্র পাখা মেলে অদৃশ্য হলো প্রকৃতি মাঝে।সহস্র পতঙ্গের মধ্য হতে ওই বিশেষ জোনাককে চেনা আর সম্ভব হলো না।শিহরিত ত্রিযামার প্রাণ।ঝর্ণার হিমশীতল জল হতে উঠে দ্রুততার সঙ্গে সেই স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হলো সে।প্রবলভাবে বাধাপ্রাপ্ত হলো ত্রিদিবের নিকট।

-ত্রিযামা!আমার প্রস্তাবের উত্তর চাই।এই মুহূর্তে!
-নগরের উপকণ্ঠে কোনোকালেই মা আর ফিরবে না।সভ্য নগরী হতে এ অসভ্য অরণ্য অধিক বিশ্বস্ত!আমিও এ বাক্য ধ্রুব সত্য বলেই জানি এবং এই সত্য পালনে ব্রতী রাজা।
-এভাবে প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঁচা সম্ভব?জীবনধারণের উপযোগী কোনো সুবিধাই তো এখানে নেই ত্রিযামা।তোমার গোষ্ঠীতে ওই জনাকয়েক পুরুষ জীবিত।কেউ কাতর বৃদ্ধ,কেউ অত্যন্ত অসুস্থ,কেউ আবার অঙ্গহানির যন্ত্রণায় অসহায়।এভাবে তোমার গোষ্ঠী অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবে।নগরে এসো আমার সঙ্গে।সুস্থ জীবনধারণ ব্যতীত তোমার গোষ্ঠীর রমণীরা নগরের পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে,এই গোষ্ঠী আগামী দিনে বিলুপ্ত হবে না।বংশানুক্রমে জীবিত থাকবে তোমার গোষ্ঠীর বংশধররা।মাকে বোঝানোর সকল দায়িত্ব আমার।শুধু তুমি আমায় গ্রহণ করো।
-অধিক রাত পর্যন্ত এই দীঘির পাড়ে থাকা অনুচিত রাজা।অনেক হিংস্র তৃষ্ণার্ত জন্তু জলের সন্ধানে....

অতর্কিতে বৃক্ষপল্লবের মৃদু খসখসানি শব্দ অনুধাবন করে,কোমরবন্ধনী হতে উন্মুক্ত ছুরিকা হস্তে পশ্চাতে ফিরলো ত্রিযামা।কৌতূহলী নেত্রে ত্রিদিব দেখলেন,একজোড়া চপল মৃগ দম্পতি ওই দীঘির পাড়ে উপস্থিত হয়েছে।তবে ত্রিদিব ও ত্রিযামাকে দেখে,তারা অতিশয় ভীত।আপন সুতীক্ষ্ণ ছুরি বন্ধনীর মধ্যে রেখে ত্রিদিবের সঙ্গে অরণ্যের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন ত্রিযামা।ওই স্থান হতেই দেখলেন,জ্যোৎস্নালোকে দুটি ভীত প্রাণীর তৃষ্ণার জলগ্রহণের মনোরম দৃশ্য।অতঃপর ওই দম্পতি আশ্রয় নিলো তমসাবৃত অরণ্যে....

-চলুন!অধিক বিলম্ব অনুচিত রাজা।রাত্রিকালে এ মায়াকানন হিংস্র প্রাণীর অবাধ বিচরণক্ষেত্র।তাদের এই পৃথিবীতে আমরাই অতিথি।অসময়ে তাদের রাজ্যে অনধিকার প্রবেশের জন্য প্রাণ সংশয়....
-আমি এই স্থান পরিত্যাগ করবো না।তুমি রাজ্যে ফিরবে তো আমার সঙ্গে?আমার প্রাসাদে তুমি তোমার যোগ্য সম্মান....
-সম্ভব নয় রাজা!এই গোষ্ঠী আমার মুখাপেক্ষী।মা আমাকে অনেকখানি ভরসা করেন!তার নির্দেশ উপেক্ষা করে,আপন স্বার্থরক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠতে পারবো না।গোষ্ঠীর সকল সিদ্ধান্ত ডাকিনী মা নিয়ে থাকেন।আর আমি সামান্য এক যাযাবর কন্যা।কোনো রাজ্যের রাজকন্যা নই।আমি আপনার উপযুক্ত নই রাজা।কি পরিচয়ে আপনি আমাকে প্রাসাদে স্থান দেবেন?সকলের উপহাসের পাত্রী হয়ে দিন যাপন করা,আমার পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব।আমি মায়াকাননকে বড় ভালোবাসি।
প্রতি মুহূর্তের বিদ্রুপ হতে,অনিরাপদ আশ্রয় অধিক সম্মানের।

বন্ধনী হতে তরবারি মুক্ত করলেন ত্রিদিবাচার্য।তীব্র আক্রোশে বললেন,

-মায়াকাননের অধীশ্বর আমি!আমি এই অরণ্য থেকে যদি তোমাদের বিতাড়িত....

তীব্র ধাতব শব্দে আপন ছুরির ফলায় সেই তরবারির আঘাতের প্রত্যাঘাতপূর্বক শীতল কণ্ঠে উত্তর দিলো ত্রিযামা,

-করতেই পারেন।সম্মানহানির কারণে পূর্ব রাজার রাজ্য পরিত্যাগ করেছি।প্রাণ,মান,সম্পত্তি,প্রিয়জন সকলই হারিয়ে এই অরণ্যে জীবিত থাকার তাগিদে প্রতিনিয়ত লড়াই করছি।তবে হেরে যায়নি এই গোষ্ঠীর কেউই।স্বল্পসংখ্যক হলেও আমরা জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।আপনার লোকবল প্রচুর,বুদ্ধিবল,অস্ত্রবলও।আপনি আমাদের নিমেষেই ধূলিসাৎ করতে পারেন রাজা।তবে এই অসম যুদ্ধশেষে,রণক্ষেত্রের প্রতিটা দেহই হবে নিষ্প্রাণ।মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই আমার সামান্য কয়েকজন সঙ্গীনি আপনার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করবে।এই গোষ্ঠীর কেউই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না বলেই আমার স্থির বিশ্বাস।ত্রিযামার কাছে বিশ্বাসঘাতকতার একটিমাত্র শাস্তি,মৃত্যু!!মৃত্যু তো অবশ্যম্ভাবী!আপনার সৈন্যের অস্ত্রের আঘাতে,নতুবা আমার ছুরিকাঘাতে।তবে তারা আমার সহযোদ্ধা হয়ে শত্রুর সঙ্গে রণক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ,অধিকতর সম্মানের মনে করবে।তরবারির কারণে ভীত আমি নই।আমার গোষ্ঠীর কেউই নয়।

তরবারি নামিয়ে নিলেন ত্রিদিব।

-তোমার সাহস ও আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ আমি!তরবারি ত্যাগ করলাম।প্রণয় ভিক্ষা করছি ত্রিযামা।আমি বিপথগামী।দীর্ঘকাল যাবৎ সন্তানহীনতার জ্বালা,আমার পৌরুষের চরম লজ্জা!সেই লজ্জা হতে মুক্তি পেতে,নিজেকে সকল দুঃখ হতে বিস্মৃত করতে,আমি একাধিক নারীসঙ্গে আসক্ত হয়ে পড়ি।আমি এক লজ্জিত ক্ষত্রিয়,যে রাজধর্ম বিস্মৃত হয়।এভাবেই অত্যাচারী রাজার পরিচয়ে বেঁচে,অযথা ভীতিপ্রদান করে প্রজাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলাম।কয়েক বৎসর এমন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলস্বরূপ রাজকোষ প্রায় শূন্য।গুপ্তচর সূত্রে এমন সংবাদও আমি পেয়েছি,অবিলম্বেই রাজধানীতে শত্রুর আক্রমণের সম্ভবনা রয়েছে।কিন্তু আমি মনে স্থির রাখতে পারিনি।ব্যর্থ রাজা আমি।বর্তমানে রাজ্যের আমাকে প্রয়োজন ত্রিযামা।রাজসিংহাসনের আমাকে প্রয়োজন।আর আমার প্রয়োজন তোমার মত নির্ভীক,স্পষ্টবক্তা,সহযোদ্ধা এক নারীসঙ্গ।তোমার সন্ধানেই বুঝি আমি সংসার ছেড়েছি!তুমিই আমার ভবিতব্য!আমার পূর্ব রানিদের সঙ্গে,আমি সকল সংস্রব ত্যাগ করবো।তারা আমাকে নূন্যতম মানসিক সুখ দিতেও অক্ষম ত্রিযামা।তুমি আমার সঙ্গে চলো!তুমি আমাকে পরিপূর্ণ করো....

অতর্কিতে একাধিক খুরের শব্দে অরণ্যের স্বাভাবিক নৈঃশব্দ ভঙ্গ হলো।ডানা মেলে ত্রিদিব ও ত্রিযামার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো কয়েকটি ভীত সন্ত্রস্ত বিহঙ্গ।

-অরণ্যের এতখানি গভীরে,এই রাত্রিকালে খুরের শব্দ?
-এ শব্দ,এই ছন্দ আমার অতি পরিচিত ত্রিযামা।এ আমারই সৈন্যদল!রাজ্য বিপদগ্রস্ত।তাই বুঝি আমার অন্বেষণ হেতু তাদের এই আগমন!
-আমার গোষ্ঠীও কি তবে বিপদের সম্মুখীন?আমাকে এই মুহুর্তেই....

উল্কিতে সজ্জিত ত্রিযামার বাহু আপন দেহ অভিমুখে টেনে গভীর কণ্ঠে ত্রিদিব বললেন,

-আমার জীবদ্দশায় আমি বা আমার সৈন্য দ্বারা তোমার গোষ্ঠীর কোনো ক্ষতিসাধন অসম্ভব!

অপলক দৃষ্টিতে ত্রিদিবের পানে চেয়ে রইলো ত্রিযামা।ওর হরিণীর মতো ভ্রু-যুগলের মাঝে একটি ক্ষুদ্র সর্পিল উল্কির ওপর আপন ওষ্ঠ ও অধর ছুঁইয়ে দিলো ত্রিদিব।কম্পিত ললনার উপাঙ্গ।গাত্রবর্ণ রক্তিম।ইতিপূর্বে এক কামুক পুরুষের অত্যাচারের সঙ্গে পরিচিত সে,তবে ত্রিদিবের স্পর্শে যথেষ্টই প্রেম বর্তমান।সন্ধিহান নারীমন পূর্বের নির্মম অত্যাচারের পর,পুরুষ জাতির ওপর নির্ভর করার দুঃসাহস অর্জনে অক্ষম।তদুপরি নৃপতি নিজমুখে আপন চরিত্রের অন্ধকার দিকের কথা বর্ণনা করেছেন।

-আমাকে ফিরতেই হবে ত্রিযামা।রাজধানীতে,রাজধর্ম পালনে।যুদ্ধ আসন্ন।সৈন্যদলের প্রস্তুতি ও যুদ্ধ পরিচালনা আবশ্যক।তবে আমার আত্ম অনুসন্ধান সম্পূর্ণ।আমি মতি স্থির করেছি।যুদ্ধ পরবর্তী জীবনে আমি জীবিত থাকলে,তোমার কাছেই ফিরবো।এই মায়াকাননে।সেদিন আমায় শূন্য হাতে,বিদগ্ধ হৃদয়ে ফিরতে হবে নাতো!
-আপনার কিছু হবে না রাজা!আপনি যুদ্ধে জয়লাভ করবেন।মায়াকানন হবে শত্রুমুক্ত।মহাভৈরবী আপনার সহায় হন।
-আমি কালভৈরবের উপাসক।তবে তোমার ইচ্ছেপূরণ করতে অদূর ভবিষ্যতে মহাভৈরবীর মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত হবে মোহরকুঞ্জে।অপচয় করার মতো সময় নেই ত্রিযামা!

বৃক্ষতলে রাজঘোটক বৈশ্বানর সৈন্যদলের দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্রই,শিঙায় ফুৎকারপূর্বক আপন রাজাকে আহ্বানের প্রচেষ্টায় মগ্ন হলেন সেনাপতি।একাধিক ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ও সৈন্যের কোলাহলে ভয়ে তটস্থ সমগ্র গোষ্ঠী।কয়েকজন যাযাবর রমণী তরবারি হাতে সৈন্যের সঙ্গে আলাপচারিতায় উদ্যত হলেন....

শিঙাধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশমাত্র আপন দুই হস্ত মুখের সম্মুখে এনে অদ্ভুত শব্দ দ্বারা সংকেত প্রেরণপূর্বক,আপন উপস্থিতি জানান দিলেন ত্রিদিবাচার্য।তারপরই ফিরলেন ত্রিযামার কাছে।

-ত্রিযামা?
-আমি আপনার রাজ্যের জন্য,আপনার জন্য মহাভৈরবীর কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করবো।মা অবশ্য আপনার সহায় হবেন।শত্রুদের পরাস্ত করে আপন রাজ্যের ভবিষ্যৎ,স্বর্ণাক্ষরে লিখবেন আপনি।
-যুদ্ধ পরবর্তী শান্তি বা সন্ধির পরই,আমি ফিরবো তোমার কাছে।আগামী কৃষ্ণপক্ষের পূর্বেই।আগামী কৃষ্ণপক্ষে এই দীঘির জলের আরশিতে আমি ত্রিযামার রূপ অবলোকন করতে বদ্ধপরিকর।তুমি সেদিন আর ফেরাবে না আমায়!আমি আসবো।এক পক্ষকালের ভিতর।

ত্রিযামা আপন মনের ঘরের গোপন সংবাদ জানে না।আকুল হৃদয় কাতর দৃষ্টিতে খানিক প্রেমের আবেদন জানালো ত্রিদিবের উদ্দেশ্যে।দীর্ঘদেহী সেই পুরুষের দৃষ্টি ওই আবেদনে সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ সিক্ত করলো ত্রিযামার অধর।মৃদুমন্দ গতিতে শীতল সমীরণ প্রবাহিত হচ্ছে।কম্পিত ওষ্ঠে ত্রিযামা বললো,

-আপন রাজ্যের রাজার সঙ্গে এক অভিশপ্ত রাত্রি যাপনের পর,রাজ্যের সকলে আমাকে বারাঙ্গনার সম্মানে ভূষিত করেছে রাজা।ওই একটিমাত্র রাত্রির কারণে,আমি কোনো পুরুষের সহগামিনী হওয়ার সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত।রাজার কক্ষের অন্দরে একাধিক দ্বারপ্রহরীর সম্মুখে,সর্বসমক্ষে নগ্নিকা আমি।একটিমাত্র রাতে একাধিকবার একাধিক পুরুষের স্পর্শে পাপবিদ্ধা এই অবয়ব।আপনার মত মহান ক্ষত্রিয়কে উৎসর্গ করার মতো পবিত্র আমি নই।এ দেহ কলুষিত!আমি অপারগ।

পুনর্বার শিঙাধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশমাত্রই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ত্রিদিব।গাঢ় কণ্ঠে ত্রিযামাকে জিজ্ঞেস করলেন,

-ত্রিযামা কি পূর্বেই কোনো পুরুষ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত?
-সে ছিল একজন।আমাদের গোষ্ঠীরই এক সুঠাম পুরুষ।আমাদের আসন্ন বিবাহ ছিল সর্বজনবিদিত।কিন্তু ওই রাতের পর সে ত্যাগ করে আমায়।আমরা প্রাণ ও মান বাঁচানোর তাগিদে রাজ্য হতে পলায়ন করি।কিন্তু সে বিশ্বাসঘাতক আপন চাটুকারিতায় হয়ে ওঠে,ওই রাজার বিশ্বস্ত।
-তোমায় প্রত্যাখ্যান করে মেরুদন্ডহীন সেই পুরুষ আপন পুরুষালি অহং চরিতার্থ করেছে মাত্র।নিজেকে মানুষ প্রমাণ করতে পারেনি।আমিও একাধিকবার বিবাহ সূত্রে একাধিক নারীর সঙ্গে সহবাস করেছি ত্রিযামা।সকল রানির মুখশ্রী আমার স্মরণেও নেই।সর্বোপরি,বিবাহ বন্ধন ব্যতীত আমি একাধিক নারীতে আসক্ত।কিন্তু আমার জন্য তোমার পূর্বরাজ্যে কোনো নির্দিষ্ট বিশেষণ পাওয়া যাবে না।সকলের দৃষ্টিতে,আমি এক মহান ক্ষত্রিয়।তবে এবার আমি মুক্তি চাই।আর তা তোমার মাধ্যমেই।সময় বড় কম।ফিরতে হবে আমায়....আমি আবার আসবো!

ডাকিনী মায়ের কাছে আতিথেয়তা রক্ষায় অক্ষম ত্রিদিব ক্ষমা চেয়ে,ত্রিযামার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে,বৈশ্বানরের পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করেন।লাগাম হাতে উল্কার বেগে রাজধানী অভিমুখে ধেয়ে যায় ত্রিদিব....

-তারপর?তারপর কি হলো?

উত্তেজিত সপ্তপর্ণীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মায়াকাননের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নলিনীদেবী বললেন,

-দিন কাটে,রাত যায়।কিন্তু ত্রিদিবের আর কোনো খবর আসে না।
-উনি আর ফেরেননি?তবে কি যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন?

লোকমুখে শোনা রাজপরিবারের গল্পকথা,সভয়ে আউড়ে গেলেন নলিনীদেবী।

বিরহের প্রতিটি নিশিকাল একাকিনী কাটে ত্রিযামার।মায়ের অগোচরে আপন গোষ্ঠীর সীমানা পেরিয়ে রাজ্যের সংবাদ অন্বেষণের দুঃসাহসকে,মনে স্থান দিতে সাহস হয় না।কিন্তু অন্তরে ব্যাকুল হয়ে ওঠে নারীমন।ত্রিযামা উপলব্ধি করতে পারে,এই বিরহবেদনা বুঝি পূর্বরাগের লক্ষণ।এক পক্ষকালের নির্দিষ্ট সময়সীমা আসন্ন।আজ রাতই কৃষ্ণপক্ষের সেই রাত।কিন্তু সেই কান্তিময় পুরুষের সুশোভন মুখখানি দেখার সৌভাগ্য বুঝি,ত্রিযামার এ জীবনকালে আর হবে না।সমরবিজয়ী রাজাধিরাজ আপন অন্দরমহলে পূর্ব রানিদের সঙ্গে সুখশয্যায় বড়ই আনন্দিত।মায়াকাননের এই অভাগিনীর কথা বিস্মৃত হয়েছেন তিনি।দীঘির পাড়ে কৃষ্ণপক্ষের চোখজুড়ানো অপরূপ দৃশ্য অবলোকনপূর্বক,একজোড়া সারঙ্গ দম্পতির নিভৃত সঙ্গম উপভোগ করছিলো ত্রিযামা।হঠাৎই নিকষ কালো রাতের অন্ধকারময় নৈঃশব্দকে ছিন্ন করে অশ্বখুরের শব্দ ধেয়ে এলো।সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সেই মুহূর্তেই ত্রিযামা ওই শব্দের অভিমুখে চঞ্চল পদচারণা শুরু করে।অনতিদূরেই সে দেখে,ঘনঘোর অমানিশা ভেদ করে বৈশ্বানরের পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করে রাজা আসছেন।বনানী একটু অগভীর হতেই ঘোড়ার পৃষ্ঠদেশ হতে নেমে পড়েন ত্রিদিব।তমসাবৃত রাতেও আপন প্রেমাস্পদকে চিনে নিতে এতটুকু অসুবিধে হয়না ত্রিযামার।ত্রিদিবের বুকের ওপর আপনাকে বিসর্জন দিয়ে,অশ্রুজলে ভেসে যায় ত্রিযামার দুটি চক্ষু....

-ভেবেছিলাম সবই আমার অদৃষ্ট!ক্ষণিক সুখ।আপনাকে কোনোকালেই আর দেখতে পাবো না।কিন্তু আমার ললাটলিখনে যে আপনার সঙ্গে পুনর্মিলনও খোদাই করা ছিলো,এ আশাতীত।আপনি সত্যিই ফিরেছেন?!
-মন বলছিলো যে স্থানে তোমায় রেখে গিয়েছিলাম,সেই স্থানেই ফিরে পাবো।তাই সর্বাগ্রে এখানে এসেছি।মায়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়নি।
-যুদ্ধ?
-আমি জয়লাভ করেছি।রাজ্য বিপদমুক্ত।দুপক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সন্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে শর্তসাপেক্ষে মিলনচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।রাজধানীতে শান্তি বিরাজ করছে।এবার আমি তোমাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাবো।গ্রহণ করো আমায়!রাজ্যে ফিরেই আমি তোমায় বিবাহ....
-মা?
-সকলেই যাবেন।আমি তোমার সম্মতির অপেক্ষা করছি।

শান্ত দীঘির পানে চাইলো নিরুত্তর ত্রিযামা।আপন হৃদয়ের প্রেমমাধুরীর সহিত গোপন অভিলাষ মিশ্রিত উষ্ণতা,চুম্বনরূপে ত্রিদিব এঁকে দিলেন ত্রিযামার ওষ্ঠে।

-ত্রিযামা?

ময়ূরের কর্কশ কেকাধ্বনি রাতের নৈঃশব্দ ভঙ্গ করলো।অপরিচিত নিশাচর প্রাণীর আপন সঙ্গীকে আহ্বানের সুমধুর শব্দে প্রকৃতি মুখরিত।ত্রিদিবের ন্যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়াকাননের প্রতিটি বৃক্ষতলের অজস্র দীপ্তিময় পতঙ্গ অপেক্ষা করছে,ত্রিযামার সম্মতির।ক্রন্দনরতা ত্রিযামা ত্রিদিবের কন্ঠলগ্না হয়ে আপন ওষ্ঠ দ্বারা স্পর্শ করলেন ত্রিদিবের অধর।দীঘির পাড়ে কৃষ্ণপক্ষের ওই অন্ধকার রাত্রিকালে,ত্রিযামার দেহপল্লবের প্রতিটি সোপান সফলভাবে উত্তরণ করলেন কর্দমাক্ত রাজাধিরাজ ত্রিদিবাচার্য।বৈশ্বানর বনানীর অন্ধকারময় স্থানের এক বৃক্ষতলে চক্ষু মুদে দাঁড়িয়ে রইলো।সঙ্গমরত শম্বর দম্পতি বহু পূর্বেই অদৃশ্য হয়েছে দুর্ভেদ্য অরণ্যের গভীরে।ত্রিযামার নগ্ন কোমল কটিদেশ ও পৃষ্ঠদেশ পাথুরে মৃত্তিকার ঘর্ষণে ছিন্নভিন্ন হতে লাগলো।সঙ্গিনীর করুণ আর্তনাদেও ত্রিদিব কর্ণপাত করলেন না।মানবীর দেহনিঃসৃত বন্য সৌরভে অবগাহন করলেন ত্রিদিব।ত্রিযামার নাতিদীর্ঘ কেশরাশির অগ্রভাগ দীঘির শীতল জলস্তর স্পর্শ করলো।সঙ্গমরত ওই নারী-পুরুষের ঈষদুষ্ণ কায়া স্পর্শপূর্বক,অরণ্য অভিমুখ হতে উন্মত্ত প্রভঞ্জন প্রবাহিত হতে লাগলো।সঙ্গমসুখে পরিশ্রান্ত প্রেমাস্পদ যখন পরস্পরকে অব্যাহতি দিলো প্রেমের উষ্ণতা হতে,ত্রিযামা আপন ঘর্মাক্ত গাত্র কিঞ্চিৎ শীতল করার অভিপ্রায়ে শান্ত দীঘির অতলে বিলীন হলো।অতঃপর সেই কৃষ্ণকায় জলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন ত্রিদিব নিজেও।দুই ক্লান্ত নরনারীর ভালোবাসা ও জলকেলির সাক্ষী রইলো মায়াকাননের সমগ্র প্রাণীজগৎ ও ঘনঘোর অমানিশা....

-তারপর ত্রিযামা মোহরকুঞ্জে এলেন?মা!?

লবণাক্ত জলে নলিনীদেবীর দুই চক্ষু ভরে উঠেছিলো।কম্পিত কণ্ঠে তিনি বললেন,

-হ্যাঁ!আর ওই মূর্খ ত্রিযামার হাত ধরেই দুঃস্বপ্নের মতো এলো মোহরকুঞ্জের সমাপ্তিকাল।
-ত্রিযামা মূর্খ!!অর্থাৎ?
-ত্রিযামার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ত্রিদিব,ডাকিনী মা সহ গোষ্ঠীর সকলকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদানপূর্বক আপন রাজ্যে আশ্রয় দেন।এক অতি সামান্য যাযাবর বন্য নারীকে রানিরূপে,রাজপরিবার উদারচিত্তে গ্রহণ করতে পারে না।পূর্বের সকল রানির চক্ষুশুল হয়ে দিনের সিংহভাগ মুহূর্ত যাপন করতো নববিবাহিতা ত্রিযামা।সকল উপহাসের যথাযোগ্য উত্তর প্রদানের পূর্বেই,বিধাতাপুরুষ আপন হস্তে রচনা করে ফেললেন মোহরকুঞ্জের দুর্ভাগ্যের মানচিত্র।প্রাসাদের আনাচে-কানাচে মৃদু গুঞ্জন,অন্তঃসত্ত্বা কনিষ্ঠা রানি ত্রিযামা।পূর্বের সকল রানির সমস্ত দর্প এই একটিমাত্র সংবাদেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।আনন্দে দিশেহারা হয়ে এতকাল পর একটি সুস্থ পুত্রসন্তান লাভের আশায় বুক বাঁধলেন ত্রিদিব।সিংহাসনের উত্তরাধিকারী,রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজার শুভাগমনের জন্য রাজ্যবাসী অপেক্ষা করতে লাগলো প্রতিনিয়ত।অতঃপর ত্রিযামার গর্ভযন্ত্রণাকালীন কালরাত্রি আগমনের মাধ্যমেই শুরু হলো মোহরকুঞ্জের অবশ্যম্ভাবী পতন।জন্ম হলো ভুবন আলো করা এক কন্যাসন্তানের।ত্রিদিব তার মুখদর্শন করলেন না।নাড়ি হতে সদ্য পৃথক করা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে মূর্খ ত্রিযামা এতকাল পর বুঝলেন,ত্রিদিবের সকল ভালোবাসা ভ্রান্ত,ছলনা মাত্র!আত্ম অনুসন্ধান নয়,রাজার স্বাদবদলের নবনবীন নারীশরীরের সন্ধান সম্পূর্ণ হয়েছিলো ত্রিযামাকে পেয়ে।যাকে প্রেমরূপে ভ্রম হয়েছিলো ত্রিযামার।ত্রিদিবের উপরি পাওনা ছিলো সন্তানলাভ।কিন্তু সেই সন্তান কন্যা হতেই,মুখ ফিরিয়েছেন ত্রিদিব।রাত্রি শেষের প্রভাতে আপন প্রথম সন্তানকে আর বুকের উষ্ণতায় ফিরে পায়নি ত্রিযামা।পরম বিশ্বস্ত দাসী হতে প্রাপ্ত সংবাদে ত্রিযামা পরবর্তীতে জানতে পেরেছিলো,সেই কন্যার ললাটলিখনে অঙ্কিত হয়েছিলো পর্ণশয্যা ও মৃত্তিকার অতলে চিরনিদ্রা।ওই সংবাদ শ্রবণমাত্রই জ্ঞান হারিয়েছিলেন ত্রিযামা।ধীরে ধীরে ত্রিদিবের কঠোর,নৃশংস ও নির্মম দিকের সঙ্গে ত্রিযামা পরিচয় লাভ করেছিলো।দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রতিবাদী বিদ্রোহী ত্রিযামার স্থান হয়েছিলো মোহরকুঞ্জের কারাগৃহে।চরিত্রহীন কামুক রাজা পূর্বের ন্যায় একাধিক নারীসঙ্গে ব্যস্ত হলেও,বিশেষ কিছু সময় কারাগারে বন্দিনী ত্রিযামার সঙ্গে যাপন করতেন।উত্তরসূরী প্রাপ্তির আশায়,ত্রিযামাকে মুক্তি দেননি তিনি।দীর্ঘকাল যাবৎ শারীরিক অত্যাচার সয়ে
একে-একে সাতটি নিষ্পাপ কন্যাসন্তানকে জন্ম দেয় ত্রিযামা।কারাগারে ত্রিদিবের বলপূর্বক ধর্ষণের ফলে ত্রিযামা আপন গর্ভে অষ্টমবার সন্তান ধারণ করে।সপ্তম গর্ভের কন্যাসন্তানটি জন্ম দেওয়ার পর,তাকেও একই পন্থায় হত্যা করা হলে,কারাগার থেকে পলায়নের উপায় ভাবতে শুরু করে পাগলিনী ত্রিযামা।মুক্তির জন্য কাতর সে।অতঃপর অষ্টম গর্ভের সন্তান আপন উপস্থিতি জানান দিতেই,ওই ক্ষুদ্র একরত্তি প্রাণকে বাঁচাতে ত্রিযামা বদ্ধপরিকর হয়।প্রহরীর নিকট ডাকিনী মায়ের কাল্পনিক গল্পকথা,মিথ্যে স্বপ্নাদেশ ও অভিশাপের ভয় দেখিয়ে,ডাকিনী মাকে কারাগৃহে একটিবার আনতে সমর্থ হয় সে।অতঃপর দ্বিতীয়বার ত্রিযামার মঙ্গল কামনায় পুজোর ফুল ও প্রসাদের দোহাই দিয়ে পুনরায় কারাগৃহে প্রবেশ করেন ডাকিনী মা।প্রবেশকালে দুই প্রহরীকে আশীর্বাদপূর্বক প্রসাদ বিতরণ করলে,স্বল্পক্ষণের মধ্যেই বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় ওই দুই দ্বাররক্ষীর।পূর্ণ গর্ভবতী ত্রিযামাকে সঙ্গে নিয়ে যখন ডাকিনী মা কারাগার পরিত্যাগ করেন,তখন প্রকৃতি অকালে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে।রাজ্যের রাজার পাপের ঘড়া সেই ক্ষণে পরিপূর্ণ।এইসকল ঘটনাপ্রবাহ হতে বহুদূরে অবস্থিত ত্রিদিবাচার্য সেই মুহূর্তে আপন শয়নকক্ষে,মদিরা সহযোগে একাধিক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত যাপনে অতিশয় ব্যস্ত...

-তারপর?কি ছিলো রানির গর্ভে?পুত্র?
-তারপর?!

অচিরেই ত্রিযামার সন্ধানে রাজার সৈন্যদল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।নগরের উপকন্ঠে ওই যাযাবর গোষ্ঠীর ক্ষুদ্র গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।বন্দী করা হয় গোষ্ঠীর সকল সদস্যকে।কিন্তু সন্ধান পাওয়া যায় না ত্রিযামার,এমনকি নিরুদ্দেশ বৃদ্ধা ডাকিনী মাও....

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে।ঘনঘন বিদ্যুতের ঝলকানি ও মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন।খরস্রোতা নদীর দুকূল প্লাবিত।সেই কালরাত্রিতে প্রকৃতির তীব্র রোষের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে সিক্ত ত্রিযামার গর্ভযন্ত্রণাও।তুমুল ঝড়-বাদলের মধ্যে চকিতেই আঁধার কাটিয়ে আলোকিত হয়ে উঠলো চতুর্দিকের পৃথিবী।রুদ্রদেব কৃপাদৃষ্টি দান করলেন অদূরেই একটি সুউচ্চ বৃক্ষের উপর।বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে ভেঙে পড়লো সেই সুবিশাল বনস্পতির একটি বৃহৎ শাখা।অজস্র অসহায় খেচর প্রজাতি হলো গৃহহারা।ত্রিযামার মস্তকের একেবারে সম্মুখেই ভেঙে পড়েছে ওই শাখা।মৃত্যুভয়ে ত্রিযামা অন্তিম ক্ষণে দুটি চক্ষু বন্ধ করে ফেলেছিলো।চক্ষুদ্বয় উন্মোচনের পরই পারিপার্শ্বিক দৃশ্য দেখে,সভয়ে চিৎকার করে উঠলো ত্রিযামা।অদূরেই বৃক্ষশাখার মধ্যে ডাকিনী মায়ের নিথর রক্তাক্ত দেহ পড়ে রয়েছে।পৃষ্ঠদেশের ওপর ওই বৃহৎ শাখা ভেঙে পড়ায়,মুহূর্তেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন মা।শোকে কাতর হয়ে একাকিনী ত্রিযামা মায়াকাননের গভীরে শিউরে উঠলো ভয়ে।আপনার অশ্রু বিসর্জন দিয়ে নিঃশব্দে সহ্য করতে লাগলো গর্ভযন্ত্রণা।অত্যধিক কষ্টে আপনার মুখগহ্বর আপনি চেপে ধরলো।হিংস্র জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পেতে ও গর্ভের সন্তানকে রক্ষা করতে নৈঃশব্দের পথ বেছে নিলো ত্রিযামা।অদূরেই পুনরায় বিদ্যুতের ঝলকানি।প্রকৃতির রুদ্ররূপের সঙ্গে বেশিক্ষণ যুঝতে পারলো না সে।আপনার মুখ বন্ধ করলেও,প্রায় জ্ঞান হারানোর সময় উপস্থিত হলে ক্লান্ত ত্রিযামা শুনলো এক সদ্যোজাত শিশুর ক্রন্দনধ্বনি।আপন সন্তানকে বুকে তুলে নিলো ত্রিযামা।বিদ্যুতের আলোয় প্রকৃতির রুদ্ররূপের মাঝেই আপনার অষ্টম গর্ভের কন্যাকে প্রথমবার দেখলো মা।শিশুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ত্রিযামা বলে উঠলো,

-আমার রুদ্রাণী!মা আমার!

ক্রন্দনরতা শিশুর ক্ষুদ্র মুখগহ্বরে আপন স্তনবৃন্ত উজাড় করে দিয়ে,ডাকিনী মায়ের মৃতদেহের পানে চেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু বিসর্জন করলো ত্রিযামা।কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণের পরই ক্লান্ত রক্তাক্ত অবস্থায়,আপন সন্তানের জীবনরক্ষার্থে আপন পদযুগল চালনা করতে শুরু করলো সদ্যোজাতিকার মা।অন্তিমবারের মতো মোহরকুঞ্জের উদ্দেশ্যে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো,

-নারীর অসম্মানের এই মূল্য তোমাকে আপন জীবন,আপন সিংহাসন,আপন রাজ্য দিয়ে পরিশোধ করতে হবে ত্রিদিবাচার্য!!তোমার পুরুষালী অহং,তোমার এই পিতৃতান্ত্রিক শাসনকাল অচিরেই এক নারীর কারণে ধ্বংস হবে!ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় অভিশপ্ত মোহরকুঞ্জের আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না....ইতিহাস তোমার নামের সঙ্গে,নারী অবমাননার নির্মম অধ্যায়কেই স্মরণে রাখবে চিরকাল! 

শিশু রুদ্রাণীকে বুকে জড়িয়ে,আপন শুষ্ক স্তনবৃন্ত তার মুখে রেখে,রক্তাক্ত দেহে নগ্নপদে বনানীর দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মোহরকুঞ্জের সীমানা অতিক্রম করেছিলো একাকিনী ত্রিযামা।ভালোবাসার ভ্রমে মুহূর্তের সামান্য দুর্বলতার মূল্য,আপন জীবন দিয়ে পরিশোধ করেছে ওই মূর্খ নারী....

রাজপরিবারের অতীত ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে অবগত হওয়া মাত্রই,কম্পিত দেহে ডাকলো রাজকুমারী পর্ণা....

-মা?!কি বলছো তুমি?
-এ রাজ্যের অতীত বৃত্তান্ত।নারীর অসম্মান করে কোনো রথী-মহারথী,কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত মহাপুরুষও অব্যাহতি পায়নি পর্ণা।সেক্ষেত্রে এই ত্রিদিবাচার্য তো তুচ্ছ এক দুরাচারী ক্ষত্রিয় পুরুষ!তার পতন ছিলো অবশ্যম্ভাবী।এ ক্ষণে সমস্ত বিষয় অবগত হওয়ার পর,তুমি বুঝেছো আশা করি!এ কাহিনীর সঙ্গে তোমার যোগসূত্র ঠিক কোথায়!
-অষ্টম গর্ভের সন্তান আমি,জন্মকালে প্রকৃতির চরম রুদ্ররূপ,মা.....ত্রিযামা আর রুদ্রাণী?
-ওই রাতের পরই নিরুদ্দেশ হয় তারা।পরবর্তী কয়েক বৎসরকাল যাবৎ তাদের আর কোনরূপ সন্ধান মেলেনি।রাজরক্ত বইছে রুদ্রাণীর শিরা-উপশিরায়।দীর্ঘ অন্বেষণের পর সকল প্রচেষ্টায় অহেতুক বারিবর্ষণ উপলব্ধি করে,স্থগিতাদেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন ত্রিদিবাচার্য।অতঃপর শীঘ্রই মোহরকুঞ্জে নেমে আসে একের পর এক বিপর্যয়।হিমশৈল পর্বতে প্রাকৃতিক কারণে ধস নেমে মোহরকুঞ্জের প্রকৃত মানচিত্রই বদলে যায়।রাজ্যের উত্তরপ্রান্ত পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।অপরদিকে রাজধানীতে অজানা রোগের প্রকোপে শুরু হয় মৃত্যুমিছিল।মহামারীর ত্রাণকার্যে রাজার প্রায় সিংহভাগ রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়।এই দুঃসংবাদ শত্রুরাজ্যে পৌঁছতে অধিক বিলম্ব হয় না।যুদ্ধ পরিচালনার মতো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে, মোহরকুঞ্জের রাজা এই ক্ষণে অপারগ।এই অপারগতার সুযোগ নিয়ে বহির্বিশ্বের কিছু শত্রুরাজ্য একজোট হয়ে আক্রমণ করে মোহরকুঞ্জে।কুটিল রাজনীতি,
কূটনীতি,ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের যোগ্য জবাবদিহি করতে না পারায়,রাজসিংহাসনচ্যুত হন মোহরকুঞ্জের অধীশ্বর ত্রিদিবাচার্য।রাজ্য হয় পরাধীন।অতঃপর শোনা যায়,দীর্ঘকাল রোগভোগের পর আপন রাজ্যের কারাগারের অন্ধকারে,প্রায় অনাহারেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন বৃদ্ধ নৃপতি।
-আর তারা?
-পরবর্তীতে রুদ্রাণী হয়ে উঠেছিলো একজন সেরা তীরন্দাজ।লক্ষ্যভেদে তাকে পরাজিত করা বড় সহজ ছিলো না।লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে,আপন কন্যাকে উপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে তুলেছিলেন ত্রিযামা।শিক্ষায়,যুদ্ধবিদ্যায়,নৃত্যকলায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন রুদ্রাণী।দীর্ঘকাল যাবৎ আপন পিতৃ-পরিচয় জানতে চাওয়া কন্যাকে উপযুক্ত হওয়ার পর,মোহরকুঞ্জের পূর্ব বৃত্তান্ত বলেন ত্রিযামা।অতঃপর গল্পকথায় শোনা যায়,সুদীর্ঘ সময়কাল ব্যাপী রুদ্রাণী এক শক্তিশালী গোষ্ঠী গঠন করেন ও একাধিকবারের প্রচেষ্টায় আপন রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।যুদ্ধজয়ের পর মোহরকুঞ্জের সিংহাসনে আধিপত্য বিস্তার করেন প্রথম মহারানি রুদ্রাণী।ধ্বংস করা হয় মোহরকুঞ্জের আরাধ্য পুরুষদেবতা কালভৈরবের প্রস্তরমূর্তি।দেবী মহাভৈরবীর করালমূর্তি স্থাপন করার মাধ্যমেই পিতৃতান্ত্রিক রাজ্যের পতন ও মাতৃতান্ত্রিক রাজ্যের শুভ সূচনা হয়।ত্রিযামা ও রুদ্রাণী সম্মিলিতভাবে এই রাজ্যের নব নামকরণ করেন মায়াকানন।ইতিহাসের পাতায় এক নব অধ্যায়,নবরূপে সংযোজিত হয়....রচিত হয় নতুন সংবিধান।
-এই খরস্রোতা নদী তবে...
-রুদ্রাণীর স্মৃতি বহন করছে।মৃত্যুকালে মহারানি রুদ্রাণী প্রলাপের ঘোরে বলেন,এই রাজ্যে দ্বিশত বৎসর ভবিষ্যতে,প্রায় অনুরূপ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।সপ্ত পুত্রের তেজরাশি আপন দেহে বহন করবে এক শিশুকন্যা।পর্ণশয্যা পরাজিত হবে তার সম্মুখে।সেই কন্যার নামকরণ করতে হবে সপ্তপর্ণী।একইরূপে প্রকৃতির রুদ্ররূপ জানান দেবে তার আগমনবার্তা।মহারানি পর্ণার সিংহাসনে আরোহণের পরবর্তী সময়ে,তার শাসনকালে মায়াকাননের মানচিত্রে আসবে সুবিশাল পরিবর্তন।তবে সেই কন্যার সুষ্ঠুভাবে জন্মানোর পথ প্রশস্ত করতে ও সিংহাসন লাভের সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর করতে,এ রাজপরিবারে কোনো পুরুষ সন্তানকে জন্মের পর অধিকসময় জীবিত রাখা হবে না।সকলের ভবিতব্যে থাকবে অভিশপ্ত পর্ণশয্যা।নতুবা সেই পুরুষই হবে মায়াকাননের ধ্বংসের কারণ।এ রাজ্যের সিংহাসন ভবিষ্যতে আর কোনোদিনই কোনো পুরুষের অধীনে যাবে না।এই বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সকল ক্রুরতম পথ অবলম্বন করতে হবে।

অশ্রুজলে ভেসে গেলো পর্ণার দুই চক্ষু।মায়াকাননের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা....

-আমি!কিভাবে মা?
-তোমার সকল প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে পর্ণা,তা এই ক্ষণে আমারও অজানা।আমি শুধু এই বিষয়ে অবগত,দুই শতাব্দীরও অধিক সময়কাল ধরে মায়াকানন তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে।তোমার সিদ্ধান্তের ওপরেই নির্ভর করবে মায়াকাননের ভবিষ্যৎ।আজ রাজমুকুট তোমার মস্তকে সমর্পণ না করার কারণ কি তুমি,কিছুমাত্র অনুধাবন করতে পারছো পর্ণা?
-আমি এখনও এ গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নই।
-যথার্থই।তুমি শুধুমাত্র রানি নও পর্ণা,তুমি এই মায়াকাননের পরিত্রাতা।সর্বাগ্রে নিজেকে প্রস্তুত করো।তোমার একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত রাজ্যের জন্য ক্ষতিকর।প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটছে।বৃষ্টি আসবে বুঝি!উন্মুক্ত স্থানে থাকা নিরাপদ নয়।ভিতরে এসো!
-সকল প্রশ্নের উত্তর তবে আমি?
-রাজ্যবিস্তার?সপ্তপর্ণী।পরিত্রাতা?সপ্তপর্ণী।সন্তানসম সকল প্রজার মা?সপ্তপর্ণী।বিপদকালে উদ্ধারকর্ত্রী?সপ্তপর্ণী....সকল প্রশ্নের উত্তর তুমিই পর্ণা।তাই তোমাকে শুধুমাত্র আত্মরক্ষা নয়,কঠিন সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধবিগ্রহের সম্মুখীন হতে হবে।নিজেকে বজ্রকঠিন রূপে প্রস্তুত করতে হবে।তারপর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা।আমার আশীর্বাদ সর্বদা তোমার সঙ্গেই থাকবে পর্ণা।মহাভৈরবী তোমার সহায় হোন।মায়াকানন থাকুক শত্রুমুক্ত।

অবনত মস্তকে মাকে অভিবাদন জানালেন রাজকুমারী পর্ণা।নলিনীদেবী আপন কক্ষ অভিমুখে প্রস্থান করলে,তমসাবৃত নভোমন্ডল পানে দৃষ্টিপাত করলেন রাজকুমারী সপ্তপর্ণী।সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য উজ্জ্বল নিশাপতি।বৃষ্টি নামলো মায়াকাননের আকাশ ভেঙে।উন্মুক্ত আকাশের নীচে আপনাকে এলিয়ে দিয়ে,বৃষ্টির জলে আপন দেহপল্লব পর্ণা সিক্ত করলেন।আবছা দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে রইলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন নিষিদ্ধ মায়াকাননের পানে।সকল প্রকার অভিশপ্ত ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত ওই মায়াকাননের অন্দরমহলেই।দুর্ভেদ্য মায়াকাননের প্রতি এক তীব্র অদৃশ্য টান অনুভব করলেন পর্ণা।রাজপরিবারের দায়িত্ব ও কর্তব্য নামক স্বর্ণ-শৃঙ্খলে আবদ্ধ পর্ণা,উদ্বেলিত হৃদয়ে উপভোগ করতে লাগলেন বারিধারার শীতল স্পর্শ....তবে নারীহৃদয় হতে নির্গত দীর্ঘশ্বাস স্পর্শ করতে পারলো না ওই অরণ্যকে....

অদূরেই মায়াকাননের নীরব হাতছানি....

(চলবে)

ছবি : সংগৃহীত

বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

সপ্তপর্ণী (প্রথম খণ্ড) তৃতীয় পর্ব


 


সপ্তপর্ণী


সাথী দাস


প্রথম খণ্ড


তৃতীয় পর্ব





-আমাদের রাজপরিবারেই এক পূর্বপুরুষ ছিলেন,যার নাম ত্রিদিবাচার্য।সেই রাজা ছিলেন নিঃসন্তান।অধিক নারীর সঙ্গদোষে দুষ্ট,একাধিক বিবাহ,প্রজার ওপর অকথ্য অত্যাচার,আপন রাজ্যের রমণীদের অসম্মান,অকারণ মৃগয়ার নামে মায়াকাননের লুপ্তপ্রায় বন্যজন্তুর প্রাণ হরণ,কর আদায়ের অজুহাতে প্রজার ওপর নির্মম অত্যাচার ও রক্তক্ষরণ,এইসব কারণ ব্যতীত,অতিরিক্ত ভোগবিলাসে রাজকোষ প্রায় শূন্য হতে বসেছিলো।অত্যাচারিত রাজার কারণে ভীত হয়ে,বিনিদ্র রজনী অতিবাহিত করতেন নগরের প্রজাবৃন্দ।মোহরকুঞ্জ যখন একাধিক বহিরাগত শত্রু কবলিত,তখন সেই মদ্যপ ভোগবিলাসী রাজা রাজ্যপাট ত্যাগ করে হঠাৎই হারিয়ে যান মায়াকাননের অভ্যন্তরে।তার এমন অকস্মাৎ অন্তর্ধানে রানিরা বিশেষ বিচলিত হননি।পূর্বে একাধিকবার তার এমন হঠকারি সিদ্ধান্তে রাজপরিবার ও সমগ্র রাজসভা অত্যন্ত বিরক্ত।কিছুকালের মধ্যে বা এক পক্ষকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই,আপন আস্তানায় ফিরে আসতেন উনি।তবে মোহরকুঞ্জের পতন শুরু হলো সেই সময় হতে,যখন প্রায় দুই পক্ষকাল সময় অপেক্ষার পরও দেখা মিললো না ত্রিদিবাচার্যের।অন্বেষণ শুরু হলো দিকে-দিকে.....
-কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন উনি?
-উনি হারিয়ে যাননি পর্ণা।উনি ফিরতে গিয়েছিলেন,জীবনের পথে।এক নারীসঙ্গ ওই নিঃসন্তান রাজাকে জীবনমুখী করেছিলো।
-ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানতে মন বড়ই ব্যাকুল মা!
-নিজেকে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও রাজ সিংহাসনের অযোগ্য মনে হওয়ার কারণে,মায়াকাননের অনাবিষ্কৃত ও দুর্গমতম দিকের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি।হয়তো অস্থির মস্তিষ্কে পরিত্যাগ করতে চেয়েছিলেন রাজসংসার ও রাজ্যপাট।তার মানসিক অবস্থার সঠিক বর্ণনা এই ক্ষণে আর সম্ভব নয়।তবে লোকমুখে প্রচারিত,সন্তানহীনতার শোকে বিদ্ধ ছিলেন তিনি।সেই সময় অজানা পথ ধরে তিনি পৌঁছেছিলেন এক যাযাবর জাতির কাছে,সাহচর্য পেয়েছিলেন সেই নারীর....

তমসাবৃত মায়াকাননের পানে দৃষ্টিপাত করলেন নলিনীদেবী।সপ্তপর্ণী বুঝলেন,অভিশপ্ত অতীতের প্রতিটি শিকড় প্রোথিত রয়েছে মায়াকাননের অন্তরেই।ওই নিষিদ্ধ অরণ্যে পাড়ি দেওয়ার পর্ণার যে অদম্য ইচ্ছা,তা আরও সহস্রগুণ বৃদ্ধি পেলো।বিভোর হয়ে রাজকুমারী পর্ণা আত্মস্থ করতে লাগলেন,মায়ের মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ....

দীর্ঘপথ অশ্বারোহণের পরিশ্রমে অতিশয় ক্লান্ত মোহরকুঞ্জের রাজা ত্রিদিবাচার্য।গত কয়েক দিবসকাল রাজা অতিক্রম করেছেন গাছের সুমিষ্ট ফলাহার ও ঝর্ণা সংলগ্ন শান্ত দীঘির শীতল জলের দ্বারা।কিন্তু আজ দ্বিপহরের সূর্যতাপ স্তিমিত হয়ে,সূর্যদেব পশ্চিম আকাশে যাত্রা করলেও,একটিও জলাশয়ের দেখা মিললো না।সঙ্গের সামান্য ফলমূল দ্বারা আহারাদি সম্ভব।কিন্তু তৃষ্ণা নিবারণ হেতু জলের আশায় ইতস্ততভাবে মায়াকাননে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন তৃষ্ণার্ত ত্রিদিব।নিবিড় বনানীর যতটুকু অংশ দৃষ্টিপথে ধরা পড়ে,তার সর্বত্রই অজানা সুবিশাল বনস্পতির হেঁয়ালি!ক্ষুধাতুর অবস্থায় এই হেঁয়ালির সমাধান বর্তমানে তার পক্ষে অসম্ভব।ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় কাতর রাজা জলাশয়ের সন্ধানে প্রবেশ করলেন গভীর জঙ্গলে।কিন্তু ভাগ্য বিরূপ।একমাত্র সঙ্গী বৈশ্বানর তখন খাদ্যের অভাবে অবসন্ন।আরোহীকে পৃষ্ঠদেশে বহন করে,আর অগ্রসর হতে চাইলো না অশ্ব।ঘোড়ার পৃষ্ঠদেশ হতে অবতরণপূর্বক,লাগাম ধরে উনি অগ্রসর হতে লাগলেন অজানার উদ্দেশ্যে।সূর্যদেবের বিদায়লগ্নে
সমগ্র মহাশূন্য জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করলেন উজ্জ্বল নিশাপতি।সময় গড়িয়ে প্রায় মধ্যরাত অতিক্রান্ত।তা সত্ত্বেও রাত্রি যাপনের উপযুক্ত আশ্রয়স্থল অন্বেষণে ব্যর্থ হলেন ত্রিদিবাচার্য।বন্য জন্তুর আক্রমণ হতে আত্মরক্ষার্থে অগ্নিকুন্ড সম্মুখে তরবারি হস্তে প্রহর গুনতে লাগলেন রাজা।নিদ্রাদেবী দুটি ক্লান্ত চক্ষুর ওপর সেই কালরাত্রে বিশেষ কৃপাদৃষ্টি প্রদান করলেন।অদূরেই জ্বলছে কয়েক জোড়া নির্দয় নেত্র।ক্ষুধার্ত শ্বাপদের আক্রমণ হতে আপন অশ্বকে রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর রাজা উন্মাদের মতো তরবারি চালিয়ে বৃথা আস্ফালন করে চললেন।অগ্নিকুণ্ডের অগ্নি কিঞ্চিৎ স্তিমিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রগাঢ় হতেই,সহসা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে ধূর্ত শ্বাপদের দল।সমস্ত নিরালোক রাত্রি বলপূর্বক দুই চক্ষু সজাগ রাখার পরও,সূর্যোদয়ের কিছু পূর্বে অত্যন্তই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন ত্রিদিব।কন্ঠ হলো শুষ্ক।ক্ষীণতর কন্ঠ থেকে নির্গত হলো অসংলগ্ন কিছু কাতর প্রলাপ বার্তা।তৃষ্ণায় অবসন্ন দেহে সামান্য জলের অভাবে,রাজার প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম হলো।শ্বাপদের ভয়ে ভীত অশ্বের তীব্র আর্তনাদ রাজার কর্ণকুহরে আর প্রবেশ করলো না।অগ্নিবলয় নিভে আসতেই অত্যুৎসাহী হিংস্র জন্তুসকল অগ্রসর হতে শুরু করলো অশ্ব ও রাজার অভিমুখে।জ্ঞান হারানোর পূর্ব মুহুর্তে দিনের প্রথম মৃদু আলোয় ত্রিদিব দেখলেন,অদ্ভুতদর্শন কয়েকজন দু-পেয়ে প্রাণী এসে হাজির হলো ওই হিংস্র শ্বাপদের সম্মুখে।এক নারীর ছায়াশরীর দুই হস্তের নির্মম ছুরিকাঘাতে,অতর্কিতে হত্যা করলো এক শ্বাপদকে।তার পৃষ্ঠদেশের শৈল্পিক উল্কির প্রতি ঘোলাটে দৃষ্টিপাত করলেন ত্রিদিব।অতঃপর অস্ত্রের ধাতব শব্দ ও ভীত জন্তুর আর্তনাদ সঠিকরূপে হৃদয়ঙ্গম করার পূর্বেই,জ্ঞান হারালেন মোহরকুঞ্জের রাজা....

দুটি চক্ষু উন্মোচনের পর ত্রিদিব নিজেকে আবিষ্কার করলেন অত্যন্ত সাধারণ এক পর্ণশয্যায়।চক্ষু মেলার পরই ক্ষুধার জ্বালা অসহ্য হয়ে উঠলো।ঘরের দক্ষিণপ্রান্তে একটি কাঠের চৌকির ওপর সামান্য ফলমূল ও পানীয় জল প্রস্তুত রয়েছে।দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য রাজা সর্বাগ্রে আপন উদরপূর্তির কার্যে মনোনিবেশ করলেন।খাদ্যদ্রব্য গ্রহণকালে জনমনিষ্যির কোলাহল তার কানে পৌঁছনো মাত্রই,সামান্য জল পান করে দুর্বল দেহে পর্ণকুটির হতে বাইরে বেরোলেন রাজা।
যারপরনাই হতবাক হলেন তিনি।সভ্যসমাজের বাইরে লোকচক্ষুর অন্তরালে এমন গহীন অরণ্যে মনুষ্যবসতি!এ তার কল্পনারও অতীত।প্রতিটি পর্ণকুটিরের চতুর্দিকে যত্নের চিহ্ন সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত।অদূরে একটি বৃক্ষের সঙ্গে সখ্যতা লাভ করে,সেই বৃক্ষছায়ায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে মনের উল্লাসে লেজ নেড়ে আপন আহার্য ও জল গ্রহণে ব্যস্ত বৈশ্বানর।কুটিরের বাইরে বেরিয়ে আসতেই,কয়েকজন খর্বকায় নারী অগ্রসর হলেন তার দিকে।চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভীত হলেন ত্রিদিব।শ্বাপদের হাত থেকে উদ্ধারকারী এই খর্বকায় নারীসকল কি তবে কোনো মানুষখেকো অসভ্য জাতি!এদের দ্বারা কি রাজার ক্ষতিসাধন সম্ভব!সামান্য কয়েকজন স্ত্রীলোক তার কিই বা ক্ষতি করতে পারে!তরবারির এক-একটি আঘাতে সকলকে একসঙ্গে হত্যা করতে ত্রিদিব সক্ষম।স্থিরভাবে শীতল মস্তিষ্কে ত্রিদিব বললেন,

-আমি আপনাদের রাজা,রানি বা দলপতির সঙ্গে বার্তালাপে আগ্রহী।আমি এই মোহরকুঞ্জের রাজা ত্রিদিবাচার্য।জঙ্গলে পথ হারিয়ে পূর্ব রাতে আমাকে ওইরূপ বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়!দলপতি বা নেত্রীকে এ সংবাদ প্রেরণের আর্জি জানাই,যে আমি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় এই গোষ্ঠী-দলপতির সাক্ষাৎপ্রার্থী।তোমরা আমার উদ্ধারকারী।সেই বিষয় অবগত হয়েই,আমার দ্বারা তোমাদের কারোর ক্ষতিসাধন সম্ভব নয়।আমার মুখনিঃসৃত এ বাক্য নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাসযোগ্য।

বিস্ময়ের চাদরে আবৃত মুখাবয়বগুলির মধ্যে,রাজার কথাগুলি শেষ হওয়ার পরেও,কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো না।ত্রিদিব হতাশ হয়ে বুঝলেন,এরা বুঝি সভ্য সমাজের ভাষা বুঝতে সমর্থ নয়।কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে,একটি সুসজ্জিত কুটির হতে বেরিয়ে এলেন এক তন্বী রমণী।তার সঙ্গে কয়েকজন পুরুষও।বিস্ফারিত নেত্রে ত্রিদিব দেখলেন,যুবক হতে বৃদ্ধ,হাতেগোনা প্রায় প্রত্যেক পুরুষদেহই বহন করছে অঙ্গহানির সুস্পষ্ট চিহ্ন।শিউরে উঠলেন ত্রিদিব।ওই কৃষ্ণকায় নারীর উপস্থিতিতে,
সমবেত জমায়েতের মধ্যে বেশ কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো।ত্রিদিব বুঝলেন,এই নারীই বুঝি অসভ্য গোষ্ঠীর নেত্রী।অদ্ভুতদর্শন ওই নারীর পরনে লজ্জা নিবারণ হেতু সামান্যই বস্ত্র।কপালে রক্ততিলক,দৃষ্টি ইষৎ ক্রুর!মাথায় সুবৃহৎ জটা।সেই নারী ত্রিদিবের সম্মুখে এসে দাঁড়ালে,ত্রিদিব অবনত মস্তকে নৃপতিসুলভ সৌজন্য জানালেন তাকে।জমায়েতের মধ্য হতে এক নারীকণ্ঠ স্পষ্ট উচ্চারণ ও দীপ্তকণ্ঠে বলে উঠলো,

-ডাকিনী মা!এই সেই পুরুষ।পূর্বরাতের আগন্তুক!এনার দাবী,ইনি মোহরকুঞ্জের রাজা!

বিস্ময়ের এক একটি পর্যায় অতিক্রম করছেন ত্রিদিব।এরা সভ্য সমাজের ভাষা বুঝতে ও বলতে সক্ষম।বুঝি দলনেত্রীর উপস্থিতি বা অনুমতি ব্যতীত,এরা কথা বলতে অনিচ্ছুক।ত্রিদিব দৃষ্টি ফেরালেন ওই ডাকিনী মায়ের দিকে।অপেক্ষা করতে লাগলেন,তার পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য....

-তোমার কথার স্বপক্ষে প্রমাণ দিতে হবে।

অদ্ভুত স্বরে সেই ডাকিনী মা বললেন।আপন দুই ভ্রু-যুগলের মাঝে রাজটিকার দিকে নির্দেশ করে ত্রিদিব বললেন,

-এই রাজটিকাই কি যথেষ্ট নয় মা?!
-ওই রাজটিকার কারণেই তোমার শিরচ্ছেদ করা হয়নি!
-একজন নারীর এতদূর স্পর্ধা!!
-জঙ্গলের এই অংশ বর্তমানে আমাদের অধীনে রাজ্যেশ্বর।যদিও আপনার রাজকীয় মেজাজ আপনার পরিচয় বহন করে,তা সত্ত্বেও....
-আমারই রাজ্যের সীমানায়,এমন দুর্ভেদ্য অরণ্যে কোনো মনুষ্যসৃষ্ট কুটির বা মানুষের বাস চোখে পড়বে,এ আমার কল্পনারও অতীত ছিলো।আমার অজান্তে এমন বাসস্থানের আয়োজন কিভাবে সম্ভব?আপনারা কারা!আমার ভাষা বুঝতেও আপনারা সক্ষম!স্বল্প আলাপে আমি এও অবগত,আপনিই এদের দলনেত্রী।তাই আপনার কাছেই এই সকল প্রশ্নের উত্তর আশা করি।কোন রাজ্যের বাসিন্দা আপনারা...
-আমার মনের সংশয় পুরোপুরি কাটেনি।তুমি যে কোনো গুপ্তচর নও,তার প্রমাণ কি?!
-আমি!গুপ্তচর!!আমি রাজা এ রাজ্যের।রাজা ত্রিদিবাচার্য!!রত্নখচিত রাজমুকুট আমারই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।এ রাজ্যের ভাগ্যবিধাতা আমি!

রাগান্বিত ত্রিদিবের প্রবল হুঙ্কারে স্তব্ধ হয়ে গেলো উপস্থিত জনগণ।বিদ্রুপ ঝরে পড়লো ডাকিনী মায়ের কণ্ঠে,

-ক্ষমতার এমন দম্ভ প্রকৃত রাজাকে শোভা পায় না ক্ষত্রিয়!তা ভাগ্যবিধাতা আপনার জন্য নির্মিত ভগবানের আসন পরিত্যাগ করে,এমন বনবাসে কেন?
-আত্ম-অনুসন্ধানে।রাজসংসার,রাজনীতি,রাজ্যপাট মানসিক শান্তি প্রদানের কারণ হয়ে উঠতে পারছিলো না।সাময়িক বিশ্রামপূর্বক,মনের ভিতর সকল মোহ পরিত্যাগের বাসনা প্রতিপালন করি!
-তোমার দম্ভ হতেই সে বিষয় স্পষ্ট,রাজপরিবারের মোহ ত্যাগ করা তোমার পক্ষে সম্ভব নয়।আপন সংসারে ফিরে যাও।যেথায় তোমার কর্ম,সেথায় সুখের সন্ধান পাবে তুমি!সন্ন্যাসীর জীবন তোমার জন্য নয়।গৃহে ফিরে যাও!ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত-পীড়িত ও বিপদগ্রস্তকে জীবনদান করাই আমার অনুগামীদের কর্তব্য।তারা পূর্বরাতে তাই করেছে।উদ্ধার করেছে তোমায়।এবার তুমি আপন পথে ফিরে যাও।আমার শিষ্যের পথনির্দেশ তোমাকে এই মায়াকাননের গোলকধাঁধা হতে বাইরে বেরোতে সাহায্য করবে।অতঃপর আশা করি,তুমি কয়েক প্রহরের এই সকল ঘটনা বিস্মৃত হবে।রাজধর্ম পালন করো রাজা!
-যথার্থই।তবে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে সমর্থ,এমন কোনো উত্তর এখনও আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি।আমার রাজ্যে বসবাসকারী এই উদ্বাস্তু গোষ্ঠীর সম্পর্কে সকল বিষয় জানতে আমি আগ্রহী।আপনার গুপ্তচর সম্পর্কিত ভীতি জানান দিচ্ছে,আপনারা অজ্ঞাতবাসে রয়েছেন।আমার রাজ্যে এমন অজ্ঞাতবাসের কারণ সম্পর্কে আমি জানতে ইচ্ছুক।কারণ যুক্তিযুক্ত মনে হলে,আমি আপন সামর্থ্যে সসম্মানে প্রতিপালন করবো আপনাদের।নগরে আশ্রয় দেবো।অন্যথায় এ অরণ্য থেকে আপনাদের উৎখাত করবো।পরিত্যাগ করতে হবে এই মায়াকানন।
-উপকারীর প্রতি এই তোমার কৃতজ্ঞতা?
-আমি রাজধর্ম পালনে ব্রতী।
-খানিক পূর্বেই রাজ্যপাট পরিত্যাগের কথা শুনেছিলাম!

মস্তক অবনত হলো ত্রিদিবের।

-লজ্জার বিষয় নয়।তুমি ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করো রাজা।রাজধর্ম পালনেই তুমি মনের শান্তি পাবে!
-আমার প্রশ্নের উত্তর?এই অরণ্যে আপনাদের আগমনের কারণ...

ওই কুটির হতে এক রমণী এসে অনতিদূরে দাঁড়িয়ে ডাকিনী মাকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে বললো,

-আপনার পূজার উপাচার প্রস্তুত মা!আসন গ্রহণ করার সময় উপস্থিত।

ত্রিদিবের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ডাকিনী মা বললেন,

-তুমি আমার স্নেহভাজন পুত্র।স্নানাদি ও আহারাদিপূর্বক বিশ্রাম গ্রহণ করো।আমার সাধনার সময় উপস্থিত।আগামী দুই দিন আমি মহাভৈরবীর যোগসাধনায় ব্যস্ত থাকবো।এ রাজ্য তোমারই।তবে তোমার রাজ্যের এই সামান্য কিছু দুর্ভেদ্য অঞ্চলে বর্তমানে আমার রাজত্ব চলে।আমি অনুরোধ করবো,দিন দুই নিঃসংকোচে আমার আতিথ্য গ্রহণ করো।অতঃপর আমি এই গোষ্ঠীর অতীত সম্পর্কিত সকল বিষয় তোমার সম্মুখে উদঘাটন করবো,এমন কথাই রইলো।মহাভৈরবী তোমার সহায় হোন!

দ্বিরুক্তি করলেন না ত্রিদিব।অসামান্য ভাবে সম্মোহন করার ক্ষমতা রাখেন ডাকিনী মায়ের মুখনিঃসৃত শব্দ।সম্মোহিতের মতো অবনত মস্তকে মাতৃআজ্ঞা পালনে সম্মত হলেন নৃপতি।ডাকিনী মায়ের অনুমতি ব্যতীত আরও একটি বিষয় তীব্রভাবে আকর্ষণ করছে রাজাকে।তার দৃষ্টি তখন বাধা পড়েছে ওই খর্বকায় নারীর দীঘল দুটি চোখে।ডাকিনী মায়ের মতোই ওই নারীর পরনে কঞ্চুলিকা ও কটিদেশে সামান্য বস্ত্র মাত্র।লজ্জা নিবারণের সামান্য কিছু পরিধেয় ব্যতীত,দেহপল্লবের অটুট যৌবন আড়ালের কোনো প্রয়াসই ওই নারীর দেহে পরিলক্ষিত নয়।গ্রীবা,দুই বাহু ও নাভিমূলের কিঞ্চিৎ পার্শ্ববর্তী স্থানে,কটিবস্ত্রের উপর আপন অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে অজস্র উল্কি।শিল্পীর শিল্পকর্ম অপরূপ বটে!তবে তা ম্লান করতে পারেনি নারীদেহের অপরূপ বন্য সৌন্দর্য।নৃপতির পানে চকিত দৃষ্টিপাত করেই,আপন দৃষ্টি অবনত করলো সেই উদ্বাস্তু নারী।ডাকিনী মা বললেন,

-অনতিবিলম্বে আসছি ত্রিযামা!রাজা?
-আমি আপনার আমন্ত্রণ সসম্মানে গ্রহণ করলাম মা!

ত্রিদিবের মস্তক স্পর্শ করে আপন পর্ণকুটিরে প্রবেশ করলেন ডাকিনী মা।মায়ের আশীর্বাদ গ্রহণপূর্বক জমায়েত কিছুটা শিথিল হলো।সেই নারী এগোলেন অদূরেই বিশ্রামরত কয়েকটি শান্ত অশ্বতর অভিমুখে।মন্ত্রমুগ্ধের মতো ত্রিদিব অনুসরণ করলেন সেই নারীকে....

-ত্রিযামা?তোমার নাম?
-মহারাজ!
-তুমি জানো আমি কে?
-সকলেই জানেন।আমিও এই গোষ্ঠীর অন্তর্গত।আমার অজানা কিছুই নয়।
-তোমাদের গোষ্ঠীর যে উদ্ধারকারী দল পূর্বরাতে আমাকে ও বৈশ্বানরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত হতে উদ্ধার করেছে,আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় অবসন্ন দেহের ক্ষমতা,অধিক ছিলো না।বিপদকালে আমার বাহ্যজ্ঞান বিলুপ্ত হয়েছিলো।আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম বুঝিবা।না জানি কত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে,তারা আমার জীবন রক্ষা করেছেন!!
-অধিক নয়।এই সামান্যই!

ত্রিযামা দক্ষিণ হস্ত সম্মুখভাগে প্রসারিত করার পর ত্রিদিব হতবাক দৃষ্টিতে দেখলেন,উল্কির কারুকার্যের আড়ালে,কোমল নারীদেহের একাংশ শ্বাপদের আঁচড়ে রক্তাক্ত।কিছু বনজ লতাপাতা নিঃসৃত তরল ওই ক্ষতস্থানে দেওয়ায়,রক্তপাত বন্ধ।তবে ক্ষত যে সদ্যই তা সুস্পষ্ট।স্বল্পবসনা নারীর মধ্যে লজ্জা নামক অনুভূতির কিঞ্চিৎ অভাব রয়েছে।নিঃসংকোচে ত্রিযামা দাঁড়িয়ে রইলেন রাজার সম্মুখে।

-বড় গভীর ক্ষত!তুমি ছিলে গতকাল?
-না আমি একাকী নই।সঙ্গী ছিলো জনাকয়েক।তবে প্রথম আঘাতটা আমার ওপরেই হানে।বর্শার ফলা গেঁথেছি তার হৃদয়ে।ওই যে!

ত্রিদিব দেখলেন,মৃতদেহ হতে সদ্য পৃথক করা একটি চামড়া কুটিরের বেড়ার আড়ালে রৌদ্রে শায়িত।

-তোমার ভয় করলো না!!

 রমণী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

-ভয়!আমার?
-কেন?

অশ্বতরগুলিকে পর্যাপ্ত খাদ্যজল সরবরাহ করে ত্রিযামা চাইলেন দূরে অরণ্যের পানে।ত্রিদিব ও ত্রিযামার মধ্যে বিরাজ করছে কেবল অপার নৈঃশব্দ।দ্রুত পদচারণাপূর্বক সেই স্থান পরিত্যাগে সচেষ্ট হলেন ত্রিযামা।তবে নিস্তার পেলেন না ত্রিদিবের দৃষ্টি হতে।

-কোথায় চললে তুমি?
-মহারাজ!কেন অনুসরণ করছেন আমায়?
-তুমি ভীত ত্রিযামা!
-না!
-মিথ্যা!!

ত্রিদিব স্পষ্টতই লক্ষ্য করেছেন,শঙ্কার প্রসঙ্গ উত্থাপনের মুহূর্তেই ত্রিযামার ওই দুটি চক্ষু প্রাণভয়ে কাতর হরিণীর ন্যায় শঙ্কিত হয়ে ওঠে।হৃদয়স্থলে তীব্র ক্লেশ অনুভব করেন ত্রিদিব।ত্রিযামার স্তব্ধতার মাঝেই তার সম্মুখে গিয়ে বলেন,

-কি কারণে তোমার গোষ্ঠী বনবাসী?কি তোমাদের অতীত?তোমার অতীত কি ত্রিযামা?!এ অপেক্ষা বড় দীর্ঘ।প্রবল কৌতূহলের কারণে আমি আত্ম সংবরণ করতে অক্ষম।আমি জানতে আগ্রহী ত্রিযামা!তোমার অতীত!কিসের শঙ্কা তোমার ওই দুটি চোখে?অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে প্রতি মুহূর্তে হিংস্র প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ করে কেন বেঁচে থাকা?কেন এই অজ্ঞাতবাস?
-সভ্য সমাজের হিংস্রতার তুলনায়,বনের এই পশুপাখি অধিক হিংস্র নয় রাজা।এ সংগ্রাম তুলনামূলক সম্মানের।
-ত্রিযামা!বলো আমায়!আমি তোমার সকল কষ্ট,সকল ব্যাধি দূর করবো!

অতঃপর মনুষ্যবসতির উপযুক্ত ওই গোষ্ঠীর অন্তর্গত,মায়াকাননের স্বল্প পরিসরের ভূমিতে পদচারণাপূর্বক ত্রিযামার নিকট হতে এই গোষ্ঠী এবং ওই নারীর দুর্ভাগ্যজনিত অতীতের সমস্ত বিবরণ জানতে পারলেন ত্রিদিব।ত্রিযামার আপন রাজ্যের রাজা দয়াপরবশত সামান্য ভূমি প্রদান করেন এই যাযাবর গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষকে।এই গোষ্ঠী বৃহৎ রাজ্যের রাজনীতি কূটনীতি বুঝতে অক্ষম।প্রতিপালক রাজার কৃপায় সামান্য কৃষিকাজ ও গবাদি পশুর প্রতিপালনে নিশ্চিন্তে জীবন ও জীবিকা অতিবাহিত হতো গোষ্ঠীর সদস্যদের।তবে আপন রাজ্যকে বহিরাগত শত্রুর দৃষ্টি হতে প্রতিরক্ষায় মগ্ন প্রজাবৎসল রাজাকে,তার আপন ভ্রাতা কুটিল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করেন।ওই নির্মম হত্যাকান্ডের পরই নতুন রাজা প্রজার উপর শুরু করেন নির্মম অত্যাচার।রাজধানী,নগর,এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও কোনো রমণী রাজপথে দ্বিধাহীনভাবে পদব্রজে বেরোতে অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়তেন।কেবলমাত্র বারবনিতা নয়,একাধিক গৃহবধূ,অবিবাহিতা রমণী ও কুমারী বালিকাকেও আপন ইচ্ছের বিরুদ্ধে শয্যাসঙ্গিনী হতে বাধ্য করেন ওই নৃপতি।যাযাবর গোষ্ঠীর স্ত্রীদেহ হতে নিঃসৃত বন্য সুগন্ধ,রাজাকে মুগ্ধ করে বারংবার।রাজা ক্ষমতায় আসার পর,প্রতি রাতেই ওই গোষ্ঠীর একজন রমণী গৃহহারা হতে শুরু করেন।কোনো নারী আপন সম্মান খুইয়ে আত্মহত্যার পথ অবলম্বন করতেন,আবার কোনো রমণীর অর্ধমৃত বা মৃতদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে যাওয়া হতো তার নির্দিষ্ট কুটির সম্মুখে।

ত্রিদিবের পক্ষে দীর্ঘ সময় এ অতীত সহ্য করা অসহনীয় হয়ে উঠছিলো।সেই একই প্রকার চরিত্রদোষে দুষ্ট সে নিজেও।মদিরা সহযোগে প্রতিরাতে কোনো ত্রয়োদশী বা ষোড়শীর দেহ নিঃসৃত সৌরভে মগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন নেশাতুর ত্রিদিব।তবে বর্তমানে এইসকল আসক্তি তার মনে বড় আত্মগ্লানির জন্ম দেয়।সেই হেতু সকল পিছুটান পরিত্যাগ করতে বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন রাজা।ত্রিযামার মুখনিঃসৃত বাক্য অনুধাবন করে ত্রিদিব জানতে পারলেন,একমাত্র ত্রিযামাই সেই নারী,যে ওই কামুক রাজাকে প্রত্যাখানের স্পর্ধা প্রদর্শন করেছিলেন।সৈন্যবাহিনী দ্বারা বলপূর্বক রাজার শয়নকক্ষে প্রবেশের পরই,তার কাছে ওই রাজার জঙ্ঘায় উপবিষ্ট হওয়ার অশালীন প্রস্তাব আসে।ত্রিযামা কর্তৃক তীব্রভাবে ঘৃণিত ওই রাজা বলপূর্বক সঙ্গম স্থাপন করেন ওর কুমারী নারীদেহের সঙ্গে।দেহযন্ত্রণায় কাতর ত্রিযামা যে মুহূর্তে মরণ চিৎকার দ্বারা সাহায্যপ্রার্থী,সেই মুহূর্তে তার কুমারীত্ব ছিন্নভিন্ন করে আপন কামজ্বালা পূরণ করতে লিপ্ত ওই রাজা।অভিশপ্ত রাত্রি প্রভাত হলে,ত্রিযামার অচৈতন্য দেহটা ঘোড়ার পৃষ্ঠদেশ হতে তারই কুটিরের সম্মুখে ছুঁড়ে ফেলে যায় রাজার সৈন্য।জনরোষ সেই সেনাকে বাধা দেওয়ায়,অগ্নিসংযোগ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় গোষ্ঠীর কয়েকটি গৃহ।রাজ্যের চরম অরাজক অবস্থায়,সকল রাজ্যবাসী একত্রে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।তবে রাজ্যে থেকে রাজার বিরুদ্ধাচরণ করে জয়লাভ সম্ভব ছিলো না।সেনাবাহিনীর ক্রমাগত অত্যাচারে রাজ্যের এবং ঐ যাযাবর গোষ্ঠীর সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়ে,ধনসম্পত্তি খুইয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিকে-দিকে।তীব্র অত্যাচারে গৃহহারা বিদ্রোহী মানুষগুলো প্রতিবাদে সোচ্চার হলে জোটে চরমতম শারীরিক অত্যাচার।ত্রিযামার সঙ্গে কয়েকটি পর্ণকুটিরের সম্মুখে উপনীত হয়ে ত্রিদিবাচার্য দেখলেন,সেই সকল দুঃস্বপ্নের পরিচয় বহন করছেন অঙ্গহারা বহু মানুষ।এই যাযাবর গোষ্ঠীর মাত্র চল্লিশ জন আপন রাজ্য ছেড়ে,বনপথে পলায়নে সমর্থ হয়েছিলো।তবে যাত্রাপথেই অতিরিক্ত রক্তপাতে মৃত্যু হয় মাতৃহারা ত্রিযামার পিতৃদেবের।ক্ষুধায় তৃষ্ণায় অপমৃত্যু হয় জনাকয়েকের।হিংস্র জন্তুর আক্রমণে ক্ষতস্থান বিষিয়ে,অজানা অসুখে ও প্রকৃতির রোষে প্রাণ হারান বেশ কিছু মানুষ।বর্তমানে বাইশ জনের এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠী প্রকৃতির সঙ্গে অসম লড়াইতে জয়লাভ করে মায়াকাননের গভীরে আপন আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়।মাত্র ছয়জন অথর্ব,বৃদ্ধ ও অঙ্গহারা পুরুষ ওদের গোষ্ঠীর মধ্যে জীবিত রয়েছেন।অবশিষ্ট সকলেই মহিলা ও শিশু।এমতাবস্থায় জীবনধারণের প্রয়োজনে পুরুষের সহযোগিতা কামনা একপ্রকার অসম্ভব।রাজ্যে থাকাকালীন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গোষ্ঠীর সকলে ডাকিনী মা-কে অত্যন্ত সমীহ করে চলতো।গোষ্ঠীর আরাধ্যা দেবী মহাভৈরবীর আরাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন ডাকিনী মা।নিদ্রাহীন দীর্ঘ রাত্রি পূজার পর তার রক্তচক্ষু অনুধাবন করে গোষ্ঠীর সকল শিশুমনে অত্যন্ত ভীতির সঞ্চার হতো।আপন চঞ্চল শিশুকে সামলে,কিঞ্চিৎ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অভিপ্রায়ে প্রতি মা আপন শিশুকে ডাকিনীর রক্তচক্ষুর গল্পকথা শোনাত।লোকমুখে প্রচারিত ওই গল্পগাথার ন্যায় রক্তচক্ষুর সাদৃশ্যগত কারণে পরবর্তীতে পূজারিণী মা আপন পরিচয় হারিয়ে ডাকিনী মা সম্বোধনে উন্নীত হয়।গোষ্ঠীর চরম দুরবস্থায় সকলের ইচ্ছেকে সম্মান জানিয়ে,ডাকিনী মা আপনার কাঁধে গোষ্ঠী পরিচালনার গুরুদায়িত্ব তুলে নেন।অতঃপর হিংস্র জন্তুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে টিকে থাকার লড়াই,খাদ্য অন্বেষণে যুদ্ধ,প্রকৃতির রোষের সঙ্গে অসম লড়াই...বর্তমানে এইভাবেই ত্রিযামার জীবনের প্রতিটি দিন অতিবাহিত হয়।

-তোমার মনোবেদনা সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে আমি অক্ষম ত্রিযামা।আপনজনের বিয়োগব্যথায় কাতর তুমি!
-জানেন মহারাজ!অদূরেই আমার পিতার দেহ অগভীর মাটির তলে শায়িত।অগ্নিদান সম্ভব হয়নি।পাছে অগ্নির কুণ্ডলীপাকানো ধূম্র,অনুসরণকারীদের নিকট আমাদের গুপ্ত ঠিকানা প্রেরণে সহায়তা করে!তবে এ বন্য জীবনে আমার কোনো আক্ষেপ নেই রাজা।এখানে হিংস্র জন্তু ও মানুষের একটিমাত্র সম্পর্ক।খাদ্য ও খাদক।তবে কোনো জন্তুই নারীখাদক নয়।
-ত্রিযামা!যে কারণে তুমি রক্তাক্ত,অপমানিতা,নিগৃহীতা, সম্ভবত প্রহৃতাও....সেই একই দোষে এ রাজ্যের রাজাও দুষ্ট!আমার কারণে এ রাজ্যের বহু নারীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত।আমার সঙ্গে এক রাত্রিকাল যাপনের জন্য,আপন সমাজে পরিত্যক্তা বহু নারী।সাময়িক সুখ অনুসন্ধানের পর,তাদের আর কোনো সংবাদ সম্পর্কে আমার কোনো কৌতূহল থাকতো না।তাদের জীবন বুঝি তোমার মতোই বিপন্ন হয়ে থাকবে....

আপন অতীতের স্মৃতিচারণে মগ্ন হয়েছিলো ত্রিযামা।রাজার এমন বাক্যে আচম্বিতে সম্বিৎ ফিরে পেলো সে।রাজার পানে হরিণীর ন্যায় ভীত দৃষ্টিপাত করলো ত্রিযামা।ত্রিদিবের মনে হলো,তীরবিদ্ধ এক ভীত হরিণী,ব্যাধের দিকে চেয়ে আপন প্রাণভিক্ষা চাইছে।অবনত মস্তকে অনুতপ্ত কণ্ঠে ত্রিদিব বললেন,

-চিরদুঃখভোগের অগ্নিতে আপনাকে সমর্পণ করে তুমি আজ স্বর্ণকন্যা ত্রিযামা!যে সকল অপরিচিতা নারী আমার কারণে অপমানিতা,তাদের সকলের মুখমন্ডল আমার অজানা।ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক সকলের কাছে ফেরাও সম্ভব নয়।সেই সকল নারীর ওপর করা অপমানের কারণে আমার হৃদয় আজ বড়ই উদ্বেলিত।মানসিক অস্থিরতার কারণে আমি আমার রাজ্য,সিংহাসন পরিত্যাগ করে,উদ্দেশ্যহীনভাবে এ মায়াকাননের পথে এগোতে শুরু করেছিলাম।সন্ধান শুরু করেছিলাম আপনার মনকে স্থির রাখার প্রভূত উপায়।তবে আমার সেই অন্বেষণ সমাপ্ত হলো তোমাকে পেয়ে....ত্রিযামা?

ভীত সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে রাজার পানে চেয়ে কোমরবন্ধনী হতে সর্বক্ষণের সঙ্গী,আপন সুতীক্ষ্ণ ছুরি মুক্ত করলো ত্রিযামা...

(চলবে)

ছবি : সংগৃহীত


ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট