অনুসরণকারী

বৃহস্পতিবার, ৩ জুন, ২০২১

মুহূর্তেরা বন্দী (তৃতীয় পর্ব)


 



মুহূর্তেরা বন্দী


সাথী দাস


তৃতীয় পর্ব







বহুদিন পর সারাটা দুপুর ভাতঘুম দিয়ে কাটিয়ে দিলো উজ্জয়িনী। ঘুম থেকে উঠে ও কিছুক্ষণের জন্য সকাল না বিকেল, ভোর না সন্ধ্যে, কিছুই বুঝতে পারছিলো না। শেষ পর্যন্ত ঘড়ি দেখে বুঝলো, জীবনের অমূল্য কিছু মুহূর্ত ও ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে। দুপুরে মাম্মামের সঙ্গে একবার কথা হয়েছে। তারপর ফোন অন ছিলো। কাল সারারাত একমাত্র মেয়ে বাড়ি ফেরেনি। মা ফোন করে এত কান্নাকাটি করছিলো, যে নিজের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য উজ্জয়িনীর একটু খারাপই লাগছিলো। মন খারাপ করে শুয়ে থাকতে থাকতে ও সেই যে ঘুমিয়ে গেছে, একেবারে সন্ধ্যে পার করে উঠলো। বিকেলে নদীর পাড়ে ঘুরতে যাওয়া, একটু প্রকৃতির মাঝে বেড়ানো, কিছুই হলো না। রিসিভারটা কানে তুলেও নামিয়ে রাখলো উজ্জয়িনী। চা-স্ন্যাকস আর কটেজে আনিয়ে কাজ নেই। তার চেয়ে বরং বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসা যাক, খেয়েও আসা যাক। ঢিলে পোশাক ছেড়ে, একটা স্কার্ট আর টপ পরলো উজ্জয়িনী। অনেকদিন পর খুব যত্ন সহকারে মনের মতো করে নিজেকে সাজালো। কাজল দিয়ে চোখ আঁকলো বহুক্ষণ ধরে। পছন্দের লিপশেডে রাঙিয়ে নিলো নিজের ঠোঁটদুটো। সবশেষে চুলগুলোতে আর চিরুনিই ছোঁয়ালো না। স্বাধীনভাবে মনের আনন্দে মাথার ওপর বিচরণ করার জন্য ওদের সম্পূর্ণ খুলে এলোমেলো করে দিলো। সবশেষে চোখে চশমা পরে, ভালোভাবে দেখলো আয়নার দিকে। এতটা সাজার পরিশ্রম বিফলে যেতে দেওয়া উচিত নয়। বরাবরের অভ্যেসমত সঙ্গে-সঙ্গে নিজের একটা ছবি তুলে, মন ভালো থাকার বিশেষ মুহূর্তটাকে ক্যামেরাবন্দী করে রাখলো উজ্জয়িনী। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো, বেশ কয়েকটা মেইল এসে জমা হয়েছে। উজ্জয়িনী ঠিক করেছে, এই কটাদিন শুধু নিজের সঙ্গে সময় কাটাবে। আর কোনো কাজ নয়। সমস্ত প্রকাশনীর মেইলগুলো স্ক্রোল করে গিয়ে, একটা মেইলে ও এসে থমকে গেলো। দীপ্ত পাঠিয়েছে। এই ছেলেটার কাজগুলো একটু দেখতে হবে। ফোনটা হাতে নিয়ে কটেজের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেলো উজ্জয়িনী। হলঘরের টেবিলের এককোণে বসে সপ্রশংস দৃষ্টিতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে ও চেয়েছিল। দীপ্তর এক-একটা কাজ দেখে সত্যিই অবাক হয়ে যেতে হয়। ঠিক কতটা যত্ন আর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে একজন শিল্পী এভাবে কল্পনার বাস্তবায়ন ঘটায়, ওই ছেলেটিকে সামনে বসিয়ে একটু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করলো! কফির মগটা ঠোঁটে ছুঁয়ে চশমার ওপর দিয়ে হঠাৎই উজ্জয়িনী দেখলো, রিসেপশন থেকে একজন পুরুষ ওর দিকেই চেয়ে আছে। তাড়াতাড়ি দৃষ্টি নামিয়ে নিলো উজ্জয়িনী। আবার ফোনের স্ক্রিনে মন দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ওর মন বললো, ওই মানুষটা দু-পা এগিয়ে যাবার তিন পা পিছিয়ে গেলো। কিছু কি বলতে চায় ওকে! আশেপাশের টেবিলগুলো বেশিরভাগই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। একেবারে কোণের দিকে দুটো টেবিলে মানুষজন বসে রয়েছে। একটা ছোট বাচ্চা কান্নাকাটিও করছে। হলের ভিতরে প্রবেশ করলো ওই পুরুষটি। স্ক্রিনের ছবিতে দীপ্তর একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট দেখছিলো উজ্জয়িনী। ও মনে-মনে গুনতে শুরু করলো,

"এক-দুই....."

-গুড এভনিং ম্যাম! 

"এসেই গেলো তবে!"

কফি মগটা হাত থেকে নামিয়ে রাখলো উজ্জয়িনী।  একবার চোখ তুলে দেখে নিলো তাকে। বয়স বড়জোর ছাব্বিশ-সাতাশ হবে। মানুষটা শৌখিন ও বিত্তবান। নিজের যে বিশেষ যত্ন নেয় সেটা গালের পরিপাটি করে ট্রিম করা দাড়ি থেকে শুরু করে, হাতের মূল্যবান ঘড়িটা দেখলেই বোঝা যায়। ছেলেটির পরনে একটা টি শার্ট, হাফপ্যান্ট, গলায় মস্ত বড়-বড় কানওলা একটা হেডফোন ঝুলছে। মুখে চাপা উত্তেজনামিশ্রিত একটা হাসি। দৃষ্টি চঞ্চল হলেও বেশ মার্জিত। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উজ্জয়িনী চেয়ে রইলো তার দিকে। সহাস্যবদনে সে বললো,

-আপনি যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমি কি এই চেয়ারে একটু....
-না।

উজ্জয়িনীর শান্ত উত্তর।

-এক্সকিউজ মি?

হতভম্ব হয়ে সেই পুরুষটি বলে ফেললেন।

-না! এত চেয়ার-টেবিল আশেপাশে ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আপনি এই চেয়ারেই কেন বসবেন? না। আমি অনুমতি দিলাম না।

আত্মপ্রত্যয়ী উজ্জয়িনীর দৃঢ় কণ্ঠস্বর। বিন্দুমাত্র না দমে সেই পুরুষ বললেন,

-আপনি জানেন আমি কে?
-জানতে আগ্রহী নই!
-ম্যাম! আমি এই গোটা রিসোর্টের ওনার সৌজন্য রায়। এই রিসোর্ট, প্রত্যেকটা কটেজ, এমনকি এই চেয়ার টেবিলগুলো সব আমার।

ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে হাসিমুখে নিজের হাত বাড়িয়ে দিলো উজ্জয়িনী। সৌজন্য ওর হাতে হাত রাখতেই উজ্জয়িনী বলে উঠলো,

-হ্যালো মিস্টার রয়! আরে আমি তো আপনাকেই খুঁজছিলাম। নাইস টু মিট ইউ! বসুন-বসুন। কয়েকটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি। একবার গিজার চালালে সারাদিন ধরে ফোঁটা-ফোঁটা জল পড়ছে। জল ঠিকমতো গরমও হচ্ছে না। ওয়াশরুমের আলোটা কিছুটা সিসিটিভি ক্যামেরার মতো কাজ করছে। টুয়েন্টিফোর আওয়ার সার্ভেলিয়েন্স! কিন্তু চব্বিশ ঘন্টাই নিভে রয়েছে। সুইচ টিপলেও আলো জ্বলে না। নেহাৎ আমি সোলো ট্রিপে আছি, তাই দরজা বন্ধ করার প্রয়োজন পড়ছে না। কিন্তু আপনি এই বিষয়গুলো একটু দেখে নেবেন। আপনার ব্যবসার উন্নতির স্বার্থেই বলছি!

চেয়ারে হাত রেখে সবে বসতে যাচ্ছিলো সৌজন্য। ভুরি ভুরি অভিযোগের তালিকা শুনে লাফিয়ে উঠে বললো, 

-সরি!! মানে আমি এখানকার কর্মচারী! এগুলো ম্যানেজার বা স্যারকে গিয়ে বলতে হবে!

আলাপ করতে আসা পুরুষটির স্বতঃস্ফূর্ত উজ্জ্বল মুখমন্ডল দপ করে নিভে যাওয়ায়, বেজায় হাসি পেয়ে গেলো উজ্জয়িনীর। ও এবার সত্যিই হেসে ফেললো। 

-আরে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? নিজেকে এত তাড়াতাড়ি তালগাছ থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলতে হবে না। বসুন-বসুন! 
-থ্যাঙ্কু ম্যাম। সত্যিই একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম বৈকি! প্রথম আলাপেই আমার পরিচয় পেয়ে, আপনি যেভাবে বকে-ধমকে অভিযোগ জানাতে শুরু করলেন....

চেয়ারটা টেনে নিয়ে উজ্জয়িনীর মুখোমুখি বসে পড়লো সৌজন্য। 

-ম্যাম আর একটা কফি প্লিজ! আমার সঙ্গে? আমার বাড়িতে আপনি এসেছেন, সামান্য একটু আপ্যায়ন করার সুযোগ দিন!
-বেশি আপ্যায়নের জন্য আবার চড়া মূল্য দাবী করে বসবেন যে!
-আরে নানা, কি যে বলেন! আসছি একটু....

তরতর করে উঠে গিয়ে কিসব যেন অর্ডার দিয়ে আবার ফিরে এলো সৌজন্য। হাসিমুখে বললো,

-এভাবে আপনার মুখোমুখি বসে যে কোনোদিনও কথা বলবো, চা-কফি খাবো, আমি তো ভাবতেই পারিনি। কল্পনায় তো কত কি....
-আপনি আমাকে চেনেন? এমনভাবে কথা বলছেন, যেন....
-উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত! "ফিরে চাই তোমাকে" , "হলুদ পাখিটা হারিয়ে গেছে" , "আবর্ত", "গোধূলিবেলায়"....
-হুম বুঝেছি! থামুন!
-কি হলো ম্যাম?
-কিছু না।
-বলুন না?
-আসলে আমি এইসব কাজ, লেখালেখি, বুক ক্রিটিকস, রিভিউয়ার, প্রোমোশন, পাবলিশারের প্রেশার, রিডার বেস, ফ্যানপেজ, পাইরেটেড পিডিএফ, রয়্যালটি, পার্সেন্টেজ, রাইটার্স ফোরাম, পাবলিশার্স গিল্ড, প্রোডাকশন কপিরাইট, কন্টেন্ট কপিরাইট, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, কন্ট্রাক্ট, গাদাখানেক ক্লজ, এগ্রিমেন্ট...
-এতকিছু? একটা বইয়ের জন্য? ওরে বাপরে!
-হুম! এতকিছুই। একটা বই মানে শুধুমাত্র লেখক বা লেখিকা কতগুলো রাত জেগে পড়াশোনা করে মাথা-ঘাড় যন্ত্রণায় ছিঁড়ে গিয়ে টাইপ করে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা নয়, প্রেসে সেটা ছেপে দেওয়াও নয়, পাতার পর পাতা উল্টানোও নয়। বরং আরও অনেক কিছু। তার অক্ষরবিন্যাস, সম্পাদনা, প্রচ্ছদ! এক একটা বই রিলিজের আগে একটা গোটা টিম দিনরাত এক করে কাজ করে। এসব ছাড়াও বইবাজারের কম্পিটিশন আর পলিটিক্স তো ছেড়েই দিলাম। এসবের স্ট্রেস আপনার হোটেলের ব্যবসার থেকে কোনো অংশে কম নয় সৌজন্য। যদিও এই স্ট্রেসটাই পার্ট অফ মাই প্রফেশন। তবুও, মানুষের তো ছুটি নিতে ইচ্ছে করে। একটু সময় বের করে নিজের জন্যও ভাবতে ইচ্ছে করে। তাই আমি এই সবকিছু থেকে নিজেকে কিছুদিনের জন্য একটু দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। সে যাক গে! তারপর বলুন, আপনি আমার কি কি লেখা পড়েছেন? আর কোন লেখা সবচেয়ে ভালো লাগলো আর কেন? খারাপ লাগলেও কেন?
-এত ফর্মালিটিজের দরকার নেই ম্যাম! আমি বুঝেছি। 
-থ্যাঙ্কু সৌজন্য। আসলে খুবই ভালোলাগে কেউ এসে আমার কাজ সম্পর্কে আমার সঙ্গে কথা বললে! কিন্তু জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত এমন থাকে, এতটাই স্পর্শকাতর....
-যে মুহূর্তে ভালো কিছুও আর ভালো লাগে না। 
-রাইট!
-আপনি অহেতুক মনের ওপর এত চাপ নেবেন না ম্যাম! আমি আপনার অফিসিয়াল পেজের ব্লাইন্ড ফলোয়ার হলেও, আপনার অন্যান্য রিডারের সঙ্গে আমার কিন্তু অনেকটাই পার্থক্য আছে। আমি আপনাকে বুঝবো।
-তাই বুঝি? তা কিরকম পার্থক্য? সবাই চোখ খুলে পড়েন। বই, পিডিএফ যেটাই হোক। আর আপনি বুঝি চোখ বন্ধ করে পড়েন?
-কি যে বলেন না ম্যাম! 
-নয়? তাহলে আপনি লেখা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখিকাকে নিজের সামনে কল্পনা করে, তার সঙ্গে কাল্পনিক কথোপকথন করে থাকেন নিশ্চয়ই। সে কেন এমনটা করলো? তাকে সামনে পেলে খুব করে ঝগড়া করতেন!

মাথা নামিয়ে হেসে ফেললো সৌজন্য....

-সত্যি নাকি এগুলো? এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে আপনি শুধু লেখাই নয়, সঙ্গে লেখিকাকেও অ্যাডমায়ার করেন বলতে হয়। 
-এই রে!! এটা বুঝলেন কি করে? ম্যাডাম! প্লিজ আমার মাইন্ড রিড করা বন্ধ করুন।
-ইচ্ছেও নেই। বড় আবর্জনা সেখানে।
-কি করবো বলুন! আপনার মতো পরিণতমনস্কা তো আর নই। একজন পঁচিশ বছরের যুবকের মাথায় আপনার মত চিন্তাধারা কাজ করবে, এটা তো আশা করাই উচিত না। 
-বয়সের খোঁটা দিচ্ছেন?
-ধুর না! আপনি নিজেকে যেভাবে মেইনটেইন করছেন, কে বলবে আপনি চল্লিশ পেরিয়েছেন!! আপনার প্রশংসাই তো করছি। আপনি এখনো সুইট সিক্সটিন!
-প্রশংসা বা সমালোচনা, দুটোই যৌক্তিক হওয়া প্রয়োজন সৌজন্য। এটা বাড়াবাড়ি রকমের অযৌক্তিক কমপ্লিমেন্ট! একদমই নেওয়া গেলো না।
-সত্যি!
-কিভাবে জানলেন আমি চল্লিশ পেরিয়েছি?
-বিগত পাঁচ বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো জোঁকের মতো স্টক করছি আপনাকে। একটা পোস্টও মিস করি না! কিন্তু কোনোদিনও কোনো পোস্টে আমার রিয়্যাক্ট নেই। এমনকি আপনার জন্মদিনে একটা উইশও করিনি! হা হা হা!! তবে স্বপ্ন দেখতাম জানেন, আপনার মতো লেখিকার মুখোমুখি কোনো একদিন দাঁড়াবোই। তবে সেটা অবশ্যই কোনো বইমেলার ভিড়ে নয়, নিভৃতে... একান্তে! একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে। আমাদের দেখা হবে একদম অন্যরকমভাবে, যেটা সারাজীবন আমার মনে থাকবে। আমি আপনার হাজার হাজার পাঠকের ভিড়ে হারিয়ে যেতে রাজি নই। 

হেসে ফেললো উজ্জয়িনী।

-ম্যাম! প্লিজ প্লিজ! আপনি আমার মাইন্ড রিড করবেন না!! নইলে কিন্তু আমাকে ভীষণ লজ্জায় পড়তে হবে।

কথাবার্তার মধ্যেই একগাদা স্ন্যাকস আর কফি এসে যাওয়াতে উজ্জয়িনী ও সৌজন্য দুজনেই বকবক করতে-করতে, ডান হাতের কাজ শুরু করলো। 

-জানেন ম্যাম, আমি কিন্তু আপনার একটা বইও কিনে পড়িনি। সব বন্ধুদের থেকে ধার করে। 
-তাই নাকি!
-ধার করে পড়ার মজাই আলাদা। তবে প্রতিবারই ফেরত দিয়ে দিয়েছি। বই নিয়েছি আর ফেরত দিইনি, এটা আমার শত্রুও বলতে পারবে না। 
-আচ্ছা আপনি বললেন না তো, অন্যান্য রিডারের সঙ্গে আপনার পার্থক্য কি?
-বড় কিছু ভাবলে, বড় কিছু সত্যিই হয়। যখনই আপনার লেখা পড়ে বাচ্চা ছেলের মতো কেঁদে ফেলতাম, তখনই কল্পনায় আপনার সঙ্গে ঝগড়া করতাম। আর ভাবতাম, আপনি বড় নিষ্ঠুর। কিছুতেই কোনো বইমেলায় আপনার সঙ্গে দেখা করতে ছুটে যাবো না। চাই না আপনার সই। কিনবো না আপনার বই! আপনার সঙ্গে অনেক হিসেব-নিকেশ তুলে রাখা আছে। সেটা একান্তে মিটিয়ে নেব। আর আজ যখন আপনাকে সকালে সুইমিং পুল থেকে....
-থামলেন কেন?
-না মানে সকালে যখন চাবি নিয়ে আপনি রুমে গেলেন, তখন থেকেই আমার হাত-পা কাঁপছিলো।
-সেকি! কেন? 
-আপনার সঙ্গে কথা বলবো কি বলবো না, ভেবেই পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ করে আশাতীত কিছুর সামনে পড়ে গেলে, চট করে নিজেকে সামলানো যায় না। কথা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না ঠিক!
-কিন্তু আমি তো জানতাম আপনি কথা বলবেন। 
-আপনি জানতেন?
-অফ কোর্স! কথা বলার জন্য ছটফট করছিলেন তো আপনি। কিন্তু আমি যে আপনার পূর্বপরিচিতা, এটা জানতাম না।
-আপনি আমাকে নোটিশ করেছেন? আমি মোটেও ছটফট করিনি!

কফির কাপে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে চেয়ারে নিজেকে হেলিয়ে, সৌজন্যর দিকে স্থির দৃষ্টিপাত করে উজ্জয়িনী বললো,

-সে আপনি এখন অস্বীকার করতেই পারেন। 
-সরি! হ্যাঁ। অস্থির লাগছিলো কথা বলার জন্য। আপনি জানলেন কি করে?
-অবজারভেশন পাওয়ার। হেব্বি স্ট্রং বুঝলেন তো! আপনার ভাবনারও ঊর্ধ্বে। 
-মানতেই হবে! 
-নিশ্চয়ই। একজন আমাকে দেখলে আমি জানবো না?
-তাহলে আমাদের ওই অপবাদটা কি ঘুচলো?
-কোনটা?
-শুধুমাত্র ছেলেরাই মেয়ে দেখে!?
-ছেলেদের থেকে অনেক বেশি মেয়েরা ছেলে দেখে। কোন যুগে পড়ে আছেন বলুন তো আপনি? আসলে ওসব ছেলে-মেয়ে কিছু না সৌজন্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সুন্দর কিছু দেখতে সবারই ভালোলাগে। এটাই ভীষণ স্বাভাবিক! সৌন্দর্য দেখে আপনি যদি সাময়িকভাবে মুগ্ধ না হন, তবে ধরে নিতে হবে আপনার অনুভূতির মৃত্যু হয়েছে। কি হলো? কি ভাবছেন? তাকিয়ে আছেন কেন?
-তবে আমার অনুভূতির মৃত্যু হয়নি বলছেন? আমি সুন্দর কিছু দেখে এই মুহূর্তে মুগ্ধ! 
-এই কফি মগটা ঠাঁই করে ছুঁড়ে মারবো!
-সে মারুন। তবে ভাঙলে দাম দিতে হবে। কফি মগের নয়, আমার ভাঙা মাথার দাম! আমার কিছু হলে, আমার পাপা কিন্তু আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না!

সৌজন্য আর উজ্জয়িনীর সম্মিলিত হাসিতে গোটা হলঘর মুখরিত হলো। উজ্জয়িনী অতিকষ্টে নিজের হাসি থামিয়ে বললো,

-সাংঘাতিক বিচ্ছু তো আপনি! এক মুহূর্তের মধ্যে আমার মুখের কথাটা প্রয়োগও করে ফেললেন?
-এই মুহূর্তটুকুই তো সব ম্যাম!
-হুম! ট্রু!!
-আপনাকে দূর থেকে দেখলে খুব রাশভারী, ব্যক্তিত্বময়ী মনে হয়। কিন্তু গাম্ভীর্যের বেড়াজাল টপকে একটু কাছ থেকে দেখলে....
-কি বলছেন? আমার ইমেজের আলগা মুখোশটা আপনার সামনে খুলে গেছে বলছেন? মেন্টেইন করতে পারছি না?
-আমি অন্তত আলাপের প্রথম থেকে কোনো মুখোশ দেখিনি ম্যাম। যতটুকু মুহুর্ত আপনার সঙ্গে কাটিয়েছি, লেখিকা উজ্জয়িনী সেনগুপ্তর চেয়েও, মানুষ উজ্জয়িনী সেনগুপ্তর সান্নিধ্য বেশি উপভোগ করেছি।

কয়েক মুহূর্তের অপার নিস্তব্ধতার পর উজ্জয়িনী বলে উঠলো,

-আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
-ব্যক্তিগত?
-নানা। আপনার একেবারে ব্যক্তিগত পরিসরে আমার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু আপনি একটা বিষয় একটু খোলাখুলি বলুন দেখি। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে এতবড় বিজনেসম্যান? বলি ইনভেস্টমেন্টের জন্য ব্যাঙ্ক ডাকাতি করেছেন নাকি?
-আপনি সৌগত রায়ের নাম শুনেছেন ম্যাম?
-বিজনেস টাইকুন সৌগত রায়? রয় গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের....
-ইয়াপ! ফার্স্ট রয় ইজ সৌগত রায়। সেকেন্ড ওয়ান ইজ...
-কি বলছেন আপনি!!
-ইয়েস! আমি সৌগত রায়ের একমাত্র উত্তরাধিকারী...
-সৌজন্য রায়?!
-হ্যাঁ! এ সবই পাপার ব্যবসা। লোক আছে। তবুও আমি একটু দেখেশুনে রাখি! পাপার জন্য বেরোতেই হয়। পাপার বয়স হচ্ছে। হার্টেও কিছু সমস্যা আছে। তাই দূরে কোনো কাজ থাকলে আমিই বেরিয়ে পড়ি। পড়াশোনা শেষ করে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিলাম। পাপা কান ধরে বিজনেসে ঢুকিয়ে দিলো। এখনও সেভাবে মাথা ঘামাই না। ওই ওপর-ওপর একটু দেখি। সেই কারণে মিডিয়ার চোখে পড়িনি। নইলে এতদিনে পরিচিত মুখ হয়ে যেতাম। যতদিন পালিয়ে থাকা যায় আর কি!
-আরে বাপরে! বিশাল ব্যাপার তো! আমি এত গণ্যমান্য একজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছি, আগে জানলে....
-প্লিজ ম্যাম! আপনার কাছে আমি শুধু একজন পাঠক। এর বেশি আমার নিজের কোনো পরিচয় নেই। বাবার ব্যবসা, বাবার পরিচয় ভাঙিয়েই খাই। আসলে আমার বাড়িতে ঠিক পড়ার পরিবেশ নেই। শুধু টাকা আর টাকা। লক্ষ্মী আর সরস্বতীর চিরকালীন বিবাদ আমার বাড়িতে। বইয়ের পাতা থেকে মনকে টেনে বের করে শেয়ার মার্কেটের খবরে বসাতে হয়, শুধুমাত্র পাপার জন্য। তার মধ্যেও ছোটবেলা থেকেই মাকে একটু আধটু বই পড়তে দেখতাম। সেই থেকেই কেমন যেন একটা নেশা চেপে ধরেছে। এটা মায়ের দিক থেকেই এসেছে। ট্রলিতেও বই নিয়ে ঘুরি এখন। ক্লাসিক লেখা বেশ কিছু পড়েছি। আর এখনকার লেখার মধ্যে আপনার বেস্ট সেলার লেখাগুলোই পড়েছি। সত্যি বলছি ম্যাম, আপনার লেখাও সব পড়া হয়ে ওঠেনি। তাই যেটুকু পড়েছি, সেই সিলেবাসের বাইরে পড়া ধরলে কিচ্ছু পারবো না। কারণ বিশাল কিছু পড়ুয়া নই আমি। সাহিত্যের বেশি কিছু বুঝিও না। সামান্য ভালোলাগা থেকেই পড়ি।
-বাঃ! ভালো তো। তা সৌজন্য, আপনাদের এতরকম ব্যবসা ছেড়ে, শেষ পর্যন্ত হোটেলের ব্যবসাই কেন? তাও এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায়? এটা তো সেরকম কোনো ট্যুরিস্ট স্পটও না। বেসিক রিসোর্সেস....
-দেখুন ম্যাম। পাণ্ডববর্জিত জায়গা বলবেন না। আজ যেটা মরুভূমি, কঠিন পরিশ্রম করলে কাল সেখানেই জনবসতি গড়ে তোলা যাবে। আর এটাই তো আমার প্লাস পয়েন্ট। যে এখানে তেমন কোনো জমকালো হোটেল নেই। তাই কম্পিটিশনও কম। প্রথম থেকে পুরো ব্যবসাটা আমি একাই পেয়ে যাবো। 
-ব্রিলিয়ান্ট! 
-ক্রেডিটটা আমার পাপার ম্যাম! কারণ কথাটা আমার পাপার। আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। আর যদি হোটেলের ব্যবসার কথাই বলেন, আপনি বাঙালির বেড়ানো বন্ধ করতে পারবেন? মরতে মরতে হলেও বছরে একবার বাঙালির ঘুরতে বেরোনো চাই। রিফ্রেশমেন্টের জন্য!
-বা হয়তো জীবনে ফেরার জন্য!
-তাও ঠিক। আসলে মাছ-ভাত আর ভ্রমণ, এই তিনটে না থাকলে, বাঙালির জীবনটাই তেজপাতা!
-আমি ধনেপাতাটাই বেশি শুনেছি।
-আরে না! তেজপাতার ফ্লেভারটুকু পেয়ে যাওয়ার পর, তাকে জাস্ট রান্না থেকে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। চিবিয়ে তো আর খাওয়া হয় না। তাও তো ধনেপাতার আগামুড়ো সবটাই কাজে লাগে। তাই তেজপাতা! 
-পয়েন্ট!
-ম্যাম আপনি এখানে কতদিনের জন্য এসেছেন?

মুখের চওড়া হাসি মিলিয়ে গেলো উজ্জয়িনীর। সামান্য হেসে ও বললো,

-জানিনা। দেখা যাক। যতদিন মন টানবে, ততদিন থেকে যাবো মুহূর্তগুলোকে আঁকড়ে!
-ম্যাম, আপনি কি আপসেট কোনো কারণে?
-উঠলাম!
-এই কেন?
-একি! আপনার সঙ্গে বসে বসে আড্ডা দেবো নাকি? এমনিতেই আজ সারা দুপুর ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। একটু আশেপাশে ঘুরে দেখি, ফলতা আপনাকে ঠিক কতটা ব্যবসা দিতে পারবে! তার সান্ধ্য সৌন্দর্য কেমন!
-ম্যাম একটা আবদার আছে। আপনি না করতে পারবেন না।
-আমি অভ্যস্ত এসবে। সেলফি তো?
-একদমই না। আপনার সঙ্গে কাটানো এত সুন্দর একটা মুহূর্ত, এটাকে ফোনে বন্দী করে রাখলে এই মুহূর্তটাকে অপমান করা হয়। এটাকে তো আমি আমার মনে বন্দী করে রাখবো। সেসব নয়।
-তবে? 
-আসলে আমি ফলতা এসেছি অন্য একটা কাজে। বিজনেসের ব্যাপারেই। তবে আমার ডেস্টিনেশন আলাদা জায়গায়। এখানে একটুখানি এগিয়ে একটা বাড়িতে পাপার পরিচিত এক আঙ্কেল-আন্টি থাকেন। ওনারা এই রিসোর্টের প্রজেক্টটার সময় পাপাকে খুব হেল্প করেছিলেন। তাদের সঙ্গে একটু দেখা করার জন্য আমি আজকের দিনটা এই কটেজে স্টে করলাম। ভালোই হলো, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। লাঞ্চের পরেই আঙ্কেলের বাড়ি থেকে আমি ঘুরে এসেছি। এখানকার কাজ শেষ। কাল সকালে আমি আমার মেইন ডেস্টিনেশনে বেরিয়ে যাবো ম্যাম।
-ওকে। হ্যাপি জার্নি সৌজন্য!
-না। আমার অনুরোধটা হলো, আপনিও আমার সঙ্গে চলুন।
-কোথায় যাবো আমি?
-প্লিজ ম্যাম! চলুন না! এই কটেজটা রিভারসাইড থেকে বেশ অনেকটা দূরে। আর আমাদের রয় গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের ড্রিম প্রজেক্ট "রয় গেস্ট হাউজ" একেবারে রিভারসাইডে ম্যাম। আপনি রুমের জানলা থেকেই নদী দেখতে পাবেন। কাল সন্ধ্যেবেলা ওই হোটেলের ওপেনিং পার্টি আছে। পাপার বিহাফে ওটা অ্যাটেন্ড করতেই আমি ফলতা এসেছি। আপনি তো বেড়াতেই এসেছেন। একাই আছেন। তাহলে এখানে কটেজে থাকুন, বা রয় গেস্ট হাউজে, ব্যাপারটা তো একই। আপনার ঘোরা-বেড়ানো নিয়ে কথা! প্লিজ আমার স্পেশাল গেস্ট হয়ে আমার সঙ্গে ওখানে আসুন। কালকের পার্টি অ্যাটেন্ড করুন।এটা আমার অনুরোধ!
-দেখুন সৌজন্য, আমি একরকম মাইন্ডসেট নিয়ে এখানে এসেছি, এভাবে হঠাৎ করে শেষ মুহূর্তে বললে তো....
-মুহূর্তরা তো হঠাৎ করে শেষ মুহূর্তেই নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে যায় ম্যাম। আমরা আনন্দ করে, সুন্দর মুহূর্তগুলোতে বেঁচে, তাদের আবার ভুলেও যাই! ম্যাম আই প্রমিস ইউ, আপনি এই ট্রিপটা জীবনেও ভুলবেন না। প্লিজ কাম উইথ মি! আমার গেস্ট হয়ে আপনি থাকবেন। প্লিজ!
-লেট মি থিঙ্ক সৌজন্য। আচ্ছা এখন আমাকে উঠতে হবে। একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি! প্লিজ এক্সকিউজ মি!

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো উজ্জয়িনী। ফোনটা হাতে নিয়ে নিলো...

-ম্যাম অন্ধকার হয়ে গেছে অনেক আগেই। অচেনা অজানা জায়গা। আমি আসতে পারি আপনার সঙ্গে?
-না। আমি সোলো ট্রিপে এসেছি। আপনার সঙ্গে তো দেখা হওয়ার কথা ছিলো না সৌজন্য, ওটা জাস্ট হয়ে গেছে। না হলে কি হতো? আমি একাই তো বেড়াতাম। প্লিজ আমার পার্সোনাল স্পেসে ঢোকার চেষ্টা করবেন না।
-এক্সট্রিমলি সরি ম্যাম। আমি এভাবে ব্যাপারটা ভাবিনি। আপনার সিকিউরিটির জন্যই বলছিলাম। একা-একা বেড়াবেন? তাই....সো সরি!
-হুম! বাই....

কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরোনোর আগে চেয়ার ছেড়ে উঠে সৌজন্য বললো,

-ম্যাম আমি কাল সকালে ব্রেকফাস্টের আগেই বেরিয়ে যাবো। আপনি ভাবতে কতটা সময় নেবেন? 

একটু হেসে ফিরলো উজ্জয়িনী। সৌজন্যর সামনে এসে বললো,

-ভাবলাম বুঝলেন তো! ভেবে ভেবে ভাবলাম...
-কি ভাবলেন?
-আপনার মত একজন নামী-দামী বিশিষ্ট মানুষের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করা উচিত হবে কিনা! করলে সেই রাগে যদি আপনি শহরের সবকটা প্রেস কিনে নিয়ে বলে বসেন, বয়কট উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত!! তার কোনো পাণ্ডুলিপি আর ছাপা হবে না। তখন আমার কি হবে? রুজি-রোজগার বলে কথা! চাকরী তো আর করি না। একেবারে না খেতে পেয়ে মারা পড়বো তো! তাই ভাবলাম...
-উফ! আপনি কি যে বলেন না ম্যাম! থ্যাঙ্কু সো মাচ! আমার সত্যি ভীষণ ভালো লাগছে! আমি ভাবতেই পারছি না! উফ! 
-আসছি! 
-ম্যাম রুম সার্ভিসকে বলে আপনার ওয়াশরুমের আলো আর গিজারটা....
-কাল সকালে তো চেক আউট করেই যাচ্ছি। তারপরই সারিয়ে নেবেন না হয়! একটা রাত কোনোমতে কাটিয়ে দিই! 
-ওকে ম্যাম। আসলে এই কটেজগুলো অনেক পুরোনো তো। তাই আর কি....
-এক রাতে ওদের বয়স খুব বেশি বেড়ে যাবে না। আসছি আমি। আচ্ছা কাল কটার সময় বেরোবেন?
-আটটা! আর ম্যাম একটা অনুরোধ আছে। আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট। প্রায় অর্ধেকই বলা চলে। হাঁটুর বয়সী!
-মানে? আমার সঙ্গেই তো আমার হাঁটুজোড়াও পৃথিবীতে এসেছে। নাকি ওদের দশ-বিশ বছর পরে এনেছি? আমার যা বয়স, আমার হাঁটুরও তো একই বয়স। আপনি আমার হাঁটুর বয়সী মানেটা কি? 
-আরে সবাই বলে না?! আমার মায়ের মুখেও তো কথাটা শুনেছি।
-কিন্তু কথাটা তো টেকনিক্যালি ভুল!
-ওকে! হাঁটু ক্যানসেল! আমি যেটা বলতে চাইছিলাম, আমি অনেক ছোট আপনার থেকে। প্লিজ আমাকে আপনি বলবেন না। তুমি বলবেন।
-দিলে তো আমাকে আমার বয়সটা মনে করিয়ে!!
-নানা। তা নয়....
-আমি আমার রুমে ক্যালেন্ডার রাখি না। আমার কোনো তারিখ মনে থাকে না। কেন জানো?
-কেন ম্যাম?
-দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, বয়সের হিসেব, এসব আমি মনে রাখতেই চাই না। আমার বয়স যদি তোমার দ্বিগুণও হয়, সেটা ওই ক্যালেন্ডারে হবে সৌজন্য। কিন্তু মনে নয়। কবি-লেখক-লেখিকাদের, শিল্পীদের কোনোদিন বয়স হয় না। দে আর এভারগ্রিন! শোননি ওই কথাটা? ওকে বাই! কাল সকালে দেখা হবে। 
-কেন আজ রাতে? ডিনার টেবিলে?
-না। আমি কটেজেই ডিনার নিয়ে নেবো। 
-ওকে ম্যাম! তাহলে গুড নাইট!
-গুড নাইট সৌজন্য!

কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পড়লো উজ্জয়িনী। অন্ধকারের চাদরে পৃথিবী নিজেকে ঢেকে নিয়েছে। ওর মনটা হঠাৎ করেই একদম হালকা হয়ে গেছে। ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলো ও। লোকাল মার্কেটের খোঁজ করতে হবে। পাওয়ার ব্যাঙ্ক, চার্জার কিনতে হবে। ফোনের ব্যাটারি বক্স প্রায় ফাঁকা। বড় রাস্তা বরাবর তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলো উজ্জয়িনী। মাথার ওপর অন্ধকার আকাশে, মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে একফালি চাঁদ....

নতুন চার্জারের সাহায্যে ফোনটা ফুল চার্জ হলো। রাতে ডিনারের পর মাম্মামের সঙ্গে ফোনে কথা বলে, মায়ের কান্নাকাটি, বকাঝকা একটু শুনে বিছানায় চুপ করে শুয়েছিলো উজ্জয়িনী। আজ কোন এক অজানা কারণে, ওর মনে কোনো উদ্বেগ নেই। একেবারে যেন নির্লিপ্ত হয়ে গেছে ও। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, ওর আর মনেই নেই। ঘুম ভাঙলো একেবারে ভোরবেলা। উঠেই মনে পড়লো সৌজন্যর মুখটা। তড়িঘড়ি বিছানা ছাড়লো উজ্জয়িনী....

কোল্ড কফিটা হোটেলের ম্যানেজার উজ্জয়িনীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলো। ওটাতেই মনোনিবেশ করে উজ্জয়িনী দেখলো, ড্রাইভার ওর আর সৌজন্যর ট্রলিটা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠিয়ে দিলেন। নিজের হ্যান্ডব্যাগটা কিছুতেই কাছছাড়া করেনি উজ্জয়িনী। ওটা নিজের কাছেই রেখেছে। বিল পেমেন্ট করে ম্যানেজারকে আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে উজ্জয়িনী সৌজন্যর গাড়ির দিকে এগোলো। ওকে রিসোর্ট থেকে বেরোতে দেখেই গাড়ি ছেড়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে এলো সৌজন্য। দুজনেরই চোখ রোদ চশমার আড়ালে থাকায়, পরস্পরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় সম্ভব না হলেও সৌজন্য হাসিমুখে বললো,

-গুড মর্নিং ম্যাম।
-মর্নিং সৌজন্য।

-স্যার। ম্যাডাম তো এসে গেছেন। এবার বেরোবেন তো?
-ওহ ওয়েট! আই উইল ড্রাইভ! আপনাকে আর আসতে হবে না। থ্যাঙ্কু! 

ড্রাইভারের হাতে বকশিশ গুঁজে দিয়ে গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে দিলো সৌজন্য। উজ্জয়িনী উঠে বসলে, গাড়ির দরজা সশব্দে বন্ধ করে নিজে চালকের আসনে বসে ও সিটবেল্ট বেঁধে নিলো। 

-ম্যাম যদিও আমি ভালোই গাড়ি চালাই। তবুও আপনি চাইলে সিটবেল্টটা....
-থাক না! 
-ওকে! লাইট মিউজিক? আমার মনে হয় প্রথম সকালে ধিকচিক ধিকচিক আপনার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে না।
-ধিকচিক ধিকচিক বা মেলোডি, এখন কিছুই ভালো লাগবে না সৌজন্য। লেটস টক! কথা বলতে বলতে যাওয়া যাক?
-শিওর ম্যাম!

গাড়িটা কিছুটা রাস্তা চলার পরই উজ্জয়িনী দেখলো প্রকৃতি কত যত্ন করে নিজের হাতে পৃথিবীকে সাজিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। এত সবুজ দেখে, মনটাই ভালো হয়ে গেলো উজ্জয়িনীর। হঠাৎ ফাঁকা জমিতে একটা ল্যান্ডমার্ক দেখে কৌতূহলী উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো,

-সৌজন্য?
-বলুন ম্যাম?
-ওখানে রয় গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ লেখা কেন? আমরা কি এসে গেছি?
-প্রায় এসে গেছি। এখান থেকেই আমাদের রয় গেস্ট হাউজের সীমানা শুরু ম্যাম। গেস্ট হাউজের প্রজেক্টে অনেক প্ল্যানিং আছে। আসলে পুরোনো রিসোর্টটাকে শুধুমাত্র কটেজ, ট্রি-হাউজ আর টেন্ট হিসেবে রাখা হবে। আর এদিকে এটা থ্রি স্টার হোটেল হবে। ট্যুরিস্টদের যার যেমন সামর্থ্য, যেমন বাজেট, তারা তেমন জায়গাতেই থাকবে। বা কেউ যদি ট্রি-হাউজে বা টেন্টে থাকার এক্সপিরিয়েন্স চায় তো, সবরকম ব্যবস্থাই রাখা হবে। 
-মানে এখানে অন্য কাউকে আর তোমরা করে খেতেই দেবে না? ঢুকতেই দেবে না? পুরোটাই তোমাদের থাকবে। তাই তো?
-পাপার প্ল্যানিং তো সেইরকমই আছে ম্যাম। দেখা যাক! অনেকটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রজেক্ট অনুযায়ী কাজ করতে বছর দুই-তিন লেগে যাবে। পার্ক, পুল, জিম, বার কাম রেস্টুরেন্ট তো থাকছেই, তাছাড়া হোটেলের ব্যাকইয়ার্ডে নদীটাও পেয়ে যাচ্ছি আমরা! তাই হোটেল থেকেই টিকিট কেটে নৌকাবিহারের ব্যবস্থাও থাকবে। ওদিকে একটা জেটিঘাটও করার কথা আছে। রয় গেস্ট হাউজের মধ্যে পাপা একটা অন্যরকম জগৎ তৈরি করে ফেলবে বলেছে। যাতে উইকেন্ডে ফলতা বেড়াতে এসে রিল্যাক্স করার সময়, রিভারসাইডে যাওয়া ছাড়া ট্যুরিস্টকে আর হোটেলের বাইরে বেরোতেই না হয়। ছোট একটা মার্কেট, স্ট্রীট ফুডের দোকান, ম্যাসাজ পার্লার, স্পা, তাছাড়া কেউ যদি সময়ের অভাবে কলকাতা থেকে কাছাকাছি কোথাও ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এর কথা ভাবে, তার জন্যও এখানে একটা এক্সট্রা কমিউনিটি হল করা হবে! রয় গেস্ট হাউজ! বিজ্ঞাপনের ট্যাগলাইন হবে...স্বপ্ন যখন হাতের নাগালের মধ্যে....ভালো না ম্যাম?
-দারুণ!
-এটা আমি বলেছি। 
-বিশাল প্ল্যান তো সৌজন্য! 

গাড়ির গতি একটু কমালো সৌজন্য। উজ্জয়িনীকে নিজেদের জায়গার পরিসর দেখাতে-দেখাতে বললো,

-হ্যাঁ ম্যাম। আগামী পাঁচ বছরে ফলতার চেহারাই পাল্টে দেব আমরা। এখন তো ধূ-ধূ করছে ফাঁকা জমি। আস্তে আস্তে সব হবে। তবে ঘর থেকে টাকা দিয়ে তো আর হবে না। ব্যবসার টাকা দিয়েই ব্যবসা হবে। তাই বাবা আগে হোটেলের একটা অংশ দাঁড় করিয়ে দিলো। বললো, ওটা আপাতত চলুক। তাতেও কিছুটা টাকা উঠে আসবে।
অ্যামিনিটিস পরে হবে। হোটেল রমরম করে চলতে চলতেই ওদিকের কাজগুলো হবে। কিছু ট্র্যাভেল এজেন্সিকে টাকা দেওয়া হয়েছে ম্যাম। সোশ্যাল মিডিয়া তো এখন প্রোমোশনের খুব ভালো একটা প্ল্যাটফর্ম। আমাদের অফিসিয়াল পেজ আর ওয়েবসাইট থেকে ট্র্যাভেল গ্রুপগুলোতে পেইড প্রোমোশন করানোর জন্য বলা আছে। ওপেনিং এর জন্য পাপা কিছু অফারও দেবে শুনেছিলাম। শুনেছিলাম তো বিজ্ঞাপনের ভালো রেসপন্স আসছে। আজ গিয়ে দেখবো কি অবস্থা! যারা আসবে, তারা এখান থেকে ঘুরে গিয়ে পজিটিভ রিভিউ দিলে আমাদের হোটেলেরই তো প্রোমোশন হয়ে যাবে। 
-এই সব জমি তোমাদের সৌজন্য?

গাড়ি চালাতে চালাতে সৌজন্য বললো,

-হ্যাঁ ম্যাম! এসে গেছি আমরা। চলুন! 

গেট থেকে দুজন ওয়াচম্যান দৌড়ে এলো সৌজন্যর গাড়ির দিকে। ওদের একজনের হাতে চাবি দিয়ে গাড়ি থেকে ট্রলিগুলো বের করে গাড়ি পার্কিং জোনে ঢুকিয়ে দিতে বললো সৌজন্য। তারপর উজ্জয়িনীর দিকে চেয়ে বললো,

-ওয়েলকাম টু রয় গেস্ট হাউজ ম্যাম! প্লিজ আসুন!

লনে পা রেখেই হতভম্ব সৌজন্য। এত ট্যুরিস্ট! এই অফ সিজনেও! বেশ খুশিই হলো ও। সকলকে পেরিয়ে উজ্জয়িনীর সঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করলো। হোটেলের সাজসজ্জা, আয়োজন দেখে উজ্জয়িনীর ভীষণই ভালো লাগলো। বাইরে কত রংবেরঙের ফুলের বাগান। কি সুন্দর পরিবেশ। ভিতরেও বেলুন দিয়ে সাজানো হচ্ছে। সন্ধ্যেবেলার পার্টির প্রস্তুতির চিহ্ন দিকে-দিকে....

-ম্যাম আপনি একটু ঘুরে দেখতে পারেন। আমি রিসেপশনে কথা বলে আসছি। 
-ওকে!

সুবৃহৎ হলের মধ্যেই ঘুরতে লাগলো উজ্জয়িনী। একটু দূরে একটা সোফায় গিয়ে বসলো। 

-স্যার! গুড মর্নিং! বস বলেছিলেন, আপনি আজ সকালেই আসবেন।

বয়স বড় বেশি না ম্যানেজারের। তিরিশের আশেপাশেই হবে। মুখে চওড়া হাসি টেনে সৌজন্যকে উনি স্বাগত জানালেন। রোদ চশমা খুলে রিসেপশনে উপস্থিত সকল কর্মচারীর দিকে চেয়ে সৌজন্য বললো,

-ভেরি গুড মর্নিং টু অল অফ ইউ! প্রচুর ট্যুরিস্ট এসেছেন তো! 
-ইয়েস স্যার! আরে আজকের বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে বস তো ব্রেকফাস্ট, ডিনার, লাঞ্চ, ড্রিঙ্কস সব ফ্রি করে দিয়েছেন। 
-পাপা?
-হুম! এটাই তো বসের বিজনেজ স্ট্র্যাটেজি! যত বেশি গ্যাদারিং, তত হোটেলেরই প্রোমোশন স্যার। আজ সবকিছু আমি নিজের হাতে দেখেশুনে করছি। তাও বস সকাল থেকে অনেকবার ফোন করেছেন। আপনি যে পৌঁছে গেছেন, একটা ফোন করে একটু জানিয়ে দেবেন স্যার। তাহলে বস একটু নিশ্চিন্ত হবেন।
-শিওর-শিওর! বলছি শুনুন, আমার রুম রেডি তো?
-একদম স্যার। এই যে চাবি! এখানে একটা সই করে চেক ইন টাইম, মোটামুটি কতক্ষণ থাকবেন অ্যাপ্রক্সিমেট কিছু একটা বসিয়ে রাখুন। আপনি রুলস  জানেনই তো স্যার...আপনারই তো হোটেল, জাস্ট ফর্মালিটিজ। আসলে বস বলেন, রুলস সবার জন্যই এক যেহেতু....
-সেসব পরে হবে। আপনি আগে আমার কথা শুনুন। ঠিক আমার রুমের পাশের রুমটাই আমার চাই। আমার সঙ্গে একজন গেস্ট এসেছেন। উনি থাকবেন। আমার পাশের রুমটাই কিন্তু....
-সরি স্যার! আজ তো টোটাল হোটেলে আর একটাও রুম ফাঁকা নেই!!

স্তম্ভিত হয়ে গেলো সৌজন্য। তারপর বললো,

-হোয়াট! এটা কিভাবে সম্ভব?
-স্যার বসের বিজ্ঞাপনটা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্র্যাভেল গ্রুপগুলোতে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে ট্রেন্ডিংয়ে আছে। আর 'হুজুগে বাঙালি' কথাটা আপনি জানেনই তো! ব্যাস! পুরো হোটেল ভর্তি! আপনার রুমটাও পারলে দিয়ে দিলে ভালো হয় এমন অবস্থা! কেমন ভিড় দেখছেন না! তাও আমরা কাল রাত আটটার পর থেকে আর কোনো ফোন রিসিভ করছি না। কারণ আর রুম দেওয়া সম্ভব নয় স্যার!
-শিট! 
-স্যার?
-দিস ইজ সো এমব্যারাসিং! এবার আমি তাকে কি বলবো? আচ্ছা শুনুন, হোটেলে এমন কোনো রুম আছে, মানে ছোটখাটো, যেমনই হোক। ম্যাডামকে আমার রুমটা দিয়ে আমি ওখানে থেকে যাবো, এমন কোনো রুম? ছোটখাটো....যাহোক কিছু!
-সরি স্যার! ওই গোডাউনে সব মাল স্টোর করা আছে, ওটা ছাড়া তো আর....হোটেলটা তো ছোটই স্যার। রুম তো খুব বেশি না। আন্ডার কনস্ট্রাকশনে আপনি বিজনেস শুরু করলে তো...
-ওয়ার্স্ট ফিলিং এভার! 
-স্যার আপনার রুমের চাবি আর...
-রাখুন তো! দাঁড়ান আমি আসছি....কি বাজে পরিস্থিতি!

উজ্জয়িনীর দিকে এগোলো সৌজন্য....

-ম্যাম! ভেরি অকোয়ার্ড সিচুয়েশন। আই অ্যাম সো সরি!
-কি হয়েছে সৌজন্য?
-কিভাবে বলি?
-মাইক্রোফোন লাগবে?
-মজা নয় ম্যাম। আমার মান-সম্মান সব শেষ। কত বড় মুখ করে আপনাকে কাল ইনভাইট করলাম। কাল আমার একবার অন্তত এখানে ফোন করে নেওয়া উচিত ছিলো!
-কি হয়েছে বলো তো?
-ম্যাম পুরো হোটেলে একটাই রুম ফাঁকা আছে। আই 
অ্যাম সো সরি। আমার বলতে এতটাই বাজে লাগছে...

অসহায়ভাবে সৌজন্য চাইলো উজ্জয়িনীর দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সৌজন্যর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে উজ্জয়িনী বললো,

-হুম! বুঝলাম। তাহলে এখন কি করণীয়?
-আপনি এখানে থেকে যান। আমি রিসোর্টে ফিরে যাচ্ছি। লাঞ্চ করেই চলে আসব। দুপুরের মধ্যেই ঢুকছি। পার্টি তো সন্ধ্যেবেলায়।
-বয়স কত যেন?
-কার ম্যাম?
-তোমার?
-পঁচিশ। কেন?
-তুমি আমার কি যেন, হাঁটুর বয়সী বলছিলে না! তার মানে চিন্তায়-ভাবনায় আমার থেকে তোমার তো আরও আধুনিকমনস্ক হওয়া উচিত!
-বুঝতে পারছি না। কি বলতে চাইছেন ম্যাম?
-এই পরিস্থিতিতে বেশ কিছু অপশন আছে। পরপর বলছি। প্রথম, তোমার কোনো অসুবিধে না থাকলে, নিজের ওপর কনফিডেন্স থাকলে, তুমি-আমি স্বচ্ছন্দেই একটা রুম শেয়ার করতে পারি। 

হাঁ করে সৌজন্য চেয়ে রইলো উজ্জয়িনীর দিকে....

-কি? প্রবলেম আছে কোনো?

সৌজন্য নিরুত্তর।

-বুঝেছি। এই অপশনের আবার কয়েকটা দিক আছে। সেগুলোও বলছি। তুমি এখনই ফোন করো তোমার গার্লফ্রেন্ডকে। তাকে সিচুয়েশন বোঝাও। সে পারমিট করলে তবেই আমার সঙ্গে রুম শেয়ার করো। যদিও না করার চান্সটাই বেশি। আর একটা দিক হলো, গার্লফ্রেন্ডের কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটা বেমালুম চেপে যাও। কারণ এক্ষেত্রে তার তোমাকে ভুল বোঝার সম্ভবনাই বেশি। অ্যান্ড লাস্ট অপশন, রিসোর্টের রুম সার্ভিসকে ফোন করে কটেজের গিজার আর ওয়াশরুমের আলো ঠিক করতে বলো। আমি রিসোর্টে ফিরে যাব। তুমি নও। কারণ আজ এখানে তোমাকে প্রয়োজন। তোমার হোটেল, তোমার পার্টি, ইউ আর দা হোস্ট! অনেককিছু দেখেশুনে রাখতে হবে তোমাকে। এটা তোমার কাজের জায়গা। পাপার অনুপস্থিতিতে তুমিই এদের স্যার। দায়িত্বও অনেক। তাই তুমি এখান থেকে যাবে না! বলো? কোনটা করবে?

সৌজন্য নিরুত্তর।

-বলো সৌজন্য? আমার খিদে পাচ্ছে তো! এখানে কিছু খেতে দেবে না রিসোর্টে ফিরবো আমাকে জানাও...
-ওকে ম্যাম। ডান!
-কি? কোনটা? আরে কোন অপশনটা নিলে সৌজন্য? আমাকেও বলো? 

হলঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা হৃদয় আকৃতির একাধিক লাল বেলুন পেরিয়ে দৌড়ে রিসেপশনের দিকে যেতে যেতে হাসিমুখে সৌজন্য বললো,

-ওই অপশনটা কোনো কাজের না ম্যাম!
-কোনটা?
-আমি একা!
-মানে? তুমি একা থাকছো? আমি কটেজে ফিরছি?
-নানা। ওই গার্লফ্রেন্ডওলা অপশন। আমি সিঙ্গেল! সিঙ্গেল মানুষকেই তো আপনারা একা বলে থাকেন, তাই না? তাহলে আমার চেয়ে একা এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই! একাকীত্ব কি আমি খুব ভালো করে জানি ম্যাম!

সুন্দর একটা হাসি উপহার দিয়ে সৌজন্য রিসেপশনে ছুটলো। উজ্জয়িনীর মন মুহূর্তেই ওই সুন্দর হাসির আড়ালে, এক দারুণ যন্ত্রণার ছায়া দুলতে দেখলো সৌজন্যর দুচোখে। একেবারে চুপ করে গেলো ও। সৌজন্যর শেষ কথাটুকুর অনুরণন তখন ওর কানে,

"তাহলে আমার চেয়ে একা এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই! একাকীত্ব কি আমি খুব ভালো করে জানি ম্যাম!"

"হুম! এজ, স্টেটাস, লুক, ম্যানার্স....পারফেক্ট! যে বয়সে ডানহাতে বাঁ-হাতে গন্ডাখানেক গার্লফ্রেন্ড থাকার কথা, সেই বয়সে জুনিয়র রয়বাবু সিঙ্গেল! কিন্তু হ্যাপিলি কি? ভাবার বিষয় উজ্জয়িনী! মুখে এত সুন্দর হাসি, এত চঞ্চল, প্রাণোচ্ছল, কিন্তু চোখ যে অন্য কথা বলছে!"

সামান্য স্বগোতোক্তির পর মৃদু হেসে বেতের সুদৃশ্য টেবিল থেকে একটা ম্যাগাজিন উঠিয়ে নিলো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত....

-আচ্ছা শুনুন, এক্সট্রা রুম লাগবে না। আমি আমার গেস্টের সঙ্গেই রুম শেয়ার করবো। কোথায় সই করতে হবে, দিন! নিজেদের করা রুল নিজেই ভাঙলে, পাপা আবার ফোন করে চেঁচাবে তো! 
-এই যে স্যার, এখানে সই করুন। ম্যাডামকেও একটা সই করতে হবে, আর মানে এই কলামটা....মানে একসঙ্গে থাকছেন যেহেতু....ম্যাডামের সঙ্গে আপনার রিলেশনটা স্যার...
-ওসব লাগবে না। ম্যাডাম এখানে সই করবে না। আর শুনুন, পাপার কানে যেন এই খবরটা না যায়, যে আমার সঙ্গে আমার রুমে কোনো ফিমেল গেস্ট রয়েছেন। একদম বলবেন না। ওকে? আমি একাই সই করে দিচ্ছি!
-স্যার....না মানে....এটা তো রুলস....কতক্ষণ কি....থাকবেন? কতক্ষণের জন্য বুকিং? একটু ডিটেলস....মানে এটা কি ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড? ম্যাডাম কি একটা রাতই আপনার সঙ্গে....কলাম তো ফাঁকা রাখা যাবে না স্যার....মানে কিছু একটা তো....

ঘাড় নীচু করে সই করে তারিখটা লিখছিলো সৌজন্য। "ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড" কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই, ওর হাতের কলমটা কেঁপে উঠে একদম স্থির হয়ে গেলো। মাথা তুলে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সৌজন্য চাইলো ম্যানেজারের দিকে....

(চলবে....)
ছবি : সংগৃহীত

"ত্রিভুজ" সহ লালমাটি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত "নির্বাক" ও "সূর্যোদয়ের আগে" পাওয়া যাচ্ছে চক্রবর্তী এন্ড সন্স থেকে 26% ছাড়ে। আগ্রহীরা যোগাযোগ করতে পারো এই নম্বরে 6290381169.

এছাড়া পাঠকবন্ধু - 7439112665 থেকেও বিশেষ ছাড়ে উপলব্ধ ,
যোগাযোগ করুন ফোন অথবা Whatsapp এ।






মঙ্গলবার, ১ জুন, ২০২১

মুহূর্তেরা বন্দী (দ্বিতীয় পর্ব)


 


মুহূর্তেরা বন্দী


সাথী দাস


দ্বিতীয় পর্ব






কতটা সময় পেরিয়ে গেছে খেয়াল করেনি উজ্জয়িনী। ট্যাক্সি চালকের ডাকে ওর তন্দ্রা উবে গেল। ধড়মড় করে উঠে চোখ মেলে উজ্জয়িনী দেখলো ট্যাক্সিটা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ও কাঁদতে-কাঁদতে একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলো বুঝি। ব্যাগটা বুকে আঁকড়ে ধরে উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো,

-এটা কোন জায়গা? কতদূর এলাম আমি?
-আধঘন্টা ধরে ঘুরছি দিদি। কোথায় যাবেন না বললে তো এভাবে সারারাত ট্যাক্সি নিয়ে ঘোরা সম্ভব না। আপনি ভাড়া মিটিয়ে আমাকে ছেড়ে দিন। আমার অন্য কাজ আছে। আমার ট্যাক্সিটা আপনার ঘুমোনোর জায়গা না।
-চলুন না দাদা! 
-আরে কোথায় যাবো? মহা ঝামেলা তো। নামুন আপনি! আমার গাড়ি ফাঁকা করুন। দিনকাল ভালো না। রাতদুপুরে গাড়ির মধ্যে মেয়েছেলে নিয়ে এভাবে ঘুরতে পারবো না। কোন সিগন্যালে গাড়ি থামিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে আপনি কি বলে ফাঁসিয়ে দেবেন, তারপর আমাকে জেলের ভাত খেতে হবে! বাড়িতে আমার বউ-বাচ্চা আছে দিদি। আপনার মাথাটা মনে হয় একটু খারাপ আছে। আপনি আমার ট্যাক্সি থেকে নেমে যেদিকে যেতে ইচ্ছে হয়, হেঁটে যান। অন্য ট্যাক্সি নিয়ে যান। নামুন! নইলে আমিই টেনে নামিয়ে দেব। টাকা দিন আমার!

ভাড়াটা মিটিয়ে দিতেই ট্যাক্সি থেকে উজ্জয়িনীকে একপ্রকার জোর করে রাস্তায় নামিয়ে দিলো ওই চালক। উদ্দেশ্যহীনভাবে ব্যাগটুকু সম্বল করে ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করলো উজ্জয়িনী। ঈশ্বর বেশ কয়েকটি ক্ষমতা উজ্জয়িনীকে দুহাতে উজাড় করে দিয়েছেন। সহ্যশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আর ঈগলের মতো ক্ষুরধার দৃষ্টি। সহ্য করতে-করতেই ভবিতব্য আজ ওকে এই পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। আর চর্মচক্ষে নিজের আশেপাশে ও যা দেখে, যতটুকু দেখে, সবটুকু নিখুঁতভাবে ওর অবচেতন মনে অনেকখানি জায়গা করে নেয় চুপিসাড়েই। ঝাপসা দৃষ্টিতে উজ্জয়িনী দেখলো, গোটা শহর আলোকমালায় সজ্জিত। সারি-সারি ছোট-বড় দোকান, প্রতিপদে রাস্তার পাশে স্ট্রীট-ফুডের দোকানগুলো খাবারের পসরা সাজিয়ে বসে আছে।দৈহিক পরিশ্রম ও শত ব্যস্ততার মধ্যেও, ঘর্মাক্ত বিক্রেতাদের চোখে অর্থলাভের প্রশান্তি সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়লো উজ্জয়িনীর অনুভবে। প্রায় প্রত্যেকটা দোকানের সামনে অসংখ্য যুগল খাবার খেতে-খেতে খুনসুটিতে মগ্ন। কত প্রাণবন্ত এই শহর! একমাত্র উজ্জয়িনী এই প্রাণের শহরে মৃতদেহের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতি জোড়া কপোত-কপোতীর মধ্যে সদাহাস্য কোনো পুরুষের মুখমন্ডল চোখে পড়লে, তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই উজ্জয়িনী শৌনককে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। অনেকদিন পর আজ একটু কেঁদে বুকটা যেন আরও ভারী হয়ে গেছে। বড় রাস্তা বরাবর মাম্মামের বয়সী একটি মেয়ে, তার বাবার হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। মাম্মামকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো উজ্জয়িনীর। নিজে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো সবটুকু বুক দিয়ে আগলে ধরতে ইচ্ছে করলো। কান্না সামলাতে না পেরে অন্ধকারে নিজেকে মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু অন্ধকার মানেই তো একাকীত্ব! উজ্জয়িনী একাকীত্বকে বড় ভয় পায়। সবাইকে নিয়ে আনন্দ করে বাঁচতে ভালোবাসে ও। ছোটবেলা থেকেই অন্ধকারকে ওর খুব ভয় করে। বাবা জানতো এটা। তাই বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেই নিজের বুকের মধ্যে পেখমরানিকে জড়িয়ে ধরে রাখতো। বাবাকে জড়িয়ে বাবার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকলে, পেখমের আর একটুও ভয় করতো না। কিন্তু বটের ছায়ার মতো সেই আশ্রয়টাই হঠাৎ করে হারিয়ে গেছে। আজ উজ্জয়িনীর নিজেকেও হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করলো।নিজেকে হারিয়ে ফেলার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো উজ্জ্বল আলোকবৃত্ত। যেখানে অনেক আলো, সেখানে নিশ্চয়ই কোনো একাকীত্ব নেই। উজ্জ্বল আলো চোখের ওপর এসে পড়লে, আপনা হতেই বন্ধ হয়ে আসে চোখ। তারপর চোখ বন্ধ করে থাকতে-থাকতে এক সময় জগৎ ভুলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া যায়। সদ্যোজাত শিশুর মতো নিশ্চিন্ত ঘুম। বড় শান্তির ঘুম। উজ্জ্বল আলোকবৃত্তে আবৃত একটা শপিং মলের দরজা ঠেলে, উদভ্রান্তের মতো ভিতরে প্রবেশ করলো উজ্জয়িনী। তারপর সোজা পৌঁছে গেলো ওয়াশরুমে। হাতঘড়িতে তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বেজে গেছে....

লেডিজ বাথরুমে ঢুকে চশমা খুলে নিজেকে দেখে অবাক হয়ে গেলো উজ্জয়িনী। কিছুক্ষণ আগে কান্নার কারণে দুচোখের কাজল সম্পূর্ণ ঘেঁটে, গালে কালি লেপ্টে গিয়ে ওকে এখন বীভৎস দেখাচ্ছে। সযত্নে মূল্যবান প্রসাধনের আড়ালে, বরাবরই নিজেকে লুকিয়ে রাখতো উজ্জয়িনী। কিন্তু আজ সমস্ত আলগা প্রসাধন লবণাক্ত চোখের জলে নষ্ট হয়ে, ওর নগ্ন দগ্ধ রূপটা বেরিয়ে পড়ছে জনসমক্ষে। নিজের স্বরূপ প্রকাশ্যে উন্মুক্ত হওয়ার ভয়ে, ও ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করলো। নিষিদ্ধ ওই খোপে ভুলেও হাত দিলো না। অন্য জায়গা থেকে টিস্যু পেপার টেনে বের করে, পাগলের মতো মুখে-চোখে-ঠোঁটে ঘষতে শুরু করলো। আলগা প্রসাধনী আবছা হয়ে গেলো মুহূর্তেই। কল খুলে মুখে ভালো করে জল ছিটিয়ে, নিজের আসল চেহারাটা নিজে একবার ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলো। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে বছর দুয়েক আগেই। আর তিন মাস পর বিয়াল্লিশ পেরিয়ে তেতাল্লিশে পা রাখবে উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। আলগা প্রসাধনী জলে ধুয়ে যেতেই বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠলো। দীর্ঘদিন ধরে লেখার কারণে বিনিদ্র রাত্রিযাপনের ফলে চোখের তলায় সময়ের আগেই মৃদু ভাঁজ পড়েছে। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা ও ত্বকের পরিচর্যার ফলে, চামড়া এখনও টানটান রয়েছে। ভালোভাবে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছে, ও পেপারটা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। ব্যাগ নিয়ে একছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে। যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো। কোনোভাবেই যেন ওর বর্তমান মানসিক অবস্থা প্রকাশ্যে বেরিয়ে না পড়ে, সেই চেষ্টায় উজ্জয়িনী মগ্ন হলো। এত বছর ধরে উপন্যাসের পাতায় একাধিক চরিত্রের হয়ে অভিনয় করতে করতে, এখন এই অভিনয় ব্যাপারটা উজ্জয়িনী খুব ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলেছে। যন্ত্রণায় বুক ফেটে গেলেও, নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে চোখ থেকে এক ফোঁটা জল বেরোয় না। এমনকি মুখের একটা রেখাও কাঁপে না! তবে আজ উজ্জয়িনী একটু কাঁদতেই চেয়েছিলো। তাই এখনও চোখের কোল সিক্ত! ওই ভিজে অক্ষিপল্লব মেলেই উজ্জয়িনী দেখলো, রংবেরঙের জামাকাপড়ের হাট বসেছে গোটা শপিং মল জুড়ে। একটা প্রাণহীন মূর্তিকে কি সুন্দর হাতকাটা জামা আর স্কার্ট পরিয়ে, চোখে চশমা দিয়ে এরা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ও প্রাণহীন বলেই মানুষের এত অত্যাচার সহ্য করছে। আর যদি ওর প্রাণ থাকতো, পছন্দ-অপছন্দ থাকতো, তবে কি সারাদিন ধরে ওই জামাটা পরে ওইখানে দাঁড়িয়ে থাকতো?! মূর্তির জামাটায় একটু হাত রাখলো উজ্জয়িনী। ফ্লোর প্রায় ফাঁকা। আটটা বাজতে যায়। একটু পরেই হয়তো বন্ধও হয়ে যাবে এই শপিং মল। সুন্দর-সুন্দর জামাকাপড় কিনলে নাকি মন ভালো হয়!! মা আর মাসিমণি সবসময় বলে মেয়েদের এই করতে নেই, ওই করতে নেই! আর মা হয়ে যাওয়ার পর তো, কোনো নারীকে নিজের জন্য বাঁচতেই নেই। তখন সবটাই স্বামী-সংসার আর সন্তানের জন্য! তাই বুঝি? তেমনটা আবার হয় নাকি! আচ্ছা কয়েকটা মুহূর্ত যদি উজ্জয়িনী চুরি করে একটু নিজের জন্য বেঁচে নেয়, কেউ কি জানতে পারবে!! কেউ কি দুয়ো দেবে? ওর এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, লোকচক্ষুর কাছে নিখুঁত হয়ে থাকার প্রবল প্রয়াস, ঝকঝকে এই ইমেজটা কি চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যাবে?! ও চুরিই তো করবে। একটু মুহূর্ত চুরি করবে, শুধু নিজের জন্য। ওই মুহূর্তে ওর বৃত্তে আর কেউ থাকবে না। নিজের সঙ্গে ও একাই থাকবে। ওকে কেউ চিনবে না। কেউ জানবে না। নিজের মতো করে নিজের জন্য একটু বাঁচলে কি খুব বড় অন্যায় হয়ে যাবে!! নিজেকে একটু অন্যরকমভাবে দেখতে ইচ্ছে করলো উজ্জয়িনীর। গোটা শপিং মল ঘুরে, ও এমন কিছু পোশাক তুলে নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকলো, যা ও মাম্মামের জন্মের পর বিগত দশ বছরে দেহে তোলেনি! 

ট্রায়াল রুমে ঢুকেই উজ্জয়িনী পরনের শাড়িটা খুলে,  মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। নিজের এই একঘেয়ে শরীরটা প্রতিদিনই ও দেখে। এখনও ঋতুমতী হওয়ার সুখ প্রতিমাসে সহ্য করতে হয় ওকে। কৈশোর ও প্রথম যৌবনে ওই রক্তপাত অত্যন্ত যন্ত্রণার হলেও, যখন একজন নারী জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে উপলব্ধি করতে পারে, যতদিন ওই যন্ত্রণা, ততদিনই যৌবন! তখন ওই যন্ত্রণাও পরিণত হয় সুখে। মনে হয়, ওই যন্ত্রণা যেন আর এই নারীদেহ ছেড়ে না যায়। যতদিন তাকে ধরে রাখা যায়, ততদিনই জীবনের সুখ। উজ্জয়িনী এখনও মুক্তি পায়নি ওই রক্তাক্ত আবহ থেকে। মুক্তি চায়ও না। প্রতিমাসে যেন ওইটুকু রক্তস্রোত এসে ওকে জানান দিয়ে যায়, এখনও ওর যৌবন অটুট! জীবন থেকে বসন্ত এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ওইটুকু রক্তধারার কারণেই হয়তো দৈহিক ইচ্ছে-অনিচ্ছে, সর্বোপরি যৌবন ওকে এখনও বিদায় জানায়নি। তার ওপর নিজেকে নিখুঁত সুন্দর রাখার ওর অদম্য প্রয়াস একেবারে বিফলে যায়নি। ট্রায়াল রুমের বড় আয়নাটার একেবারে সামনে এগিয়ে গেলো উজ্জয়িনী। নাভির নিচে শাড়িটা পরা ছিলো। শাড়ি সরে যেতেই আত্মপ্রকাশ করেছে মাম্মামের অসংখ্য আদরের চিহ্ন। গর্ভাবস্থায় পেটের চামড়া প্রসারিত হয়ে আবারও সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। কুঁকড়ে যাওয়া অসমান পেটের ওপর পরম মমতায় হাত রাখলো উজ্জয়িনী। এত কষ্ট করে মেয়েটাকে জন্ম দিয়ে, আজ ওর মা নিজেই ওকে কতদূরে সরিয়ে রেখেছে। চিৎকার করে কাঁদতে গিয়ে আয়নার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলো ও। মুখের পেলব চামড়ায় ঘেঁটে যাওয়া কাজলের আলগা দাগ। অবিন্যস্ত একরাশ চুল, আর উন্মাদের মতো দৃষ্টি দেখে ওর মনে হলো, সদ্য মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা একজন মানসিক রোগী ও। ওকে দেখতে আর একটুও স্বাভাবিক লাগছে না। ব্যাগ থেকে টিস্যু পেপার বের করে নির্মমভাবে নিজের মুখে-চোখে-গালে ঘষতে ঘষতে, উজ্জয়িনী মুখের ছাল-চামড়া প্রায় ছিঁড়ে ফেললো। আবার আয়নার দিকে চেয়ে দেখলো, সেই একইরকম উন্মাদিনীর মতো প্রতিবিম্ব। আর নিজেকে সামলাতে পারলো না উজ্জয়িনী। অতিকষ্টে বললো, এক-দুই-তিন! ও বরাবরই এভাবে সংখ্যা গুনে গুনে নিজের অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ পারলো না। নিজের হাতদুটো মুঠো করে, দেহটাকে শক্ত রেখেও কান্নাটাকে আটকাতেই পারলো না ও। সামনের আয়নাটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো ট্রায়াল রুমের মেঝেতে। দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললো। দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে চমকে উঠে তাড়াতাড়িই উঠে পড়লো ও। বোধহয় অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। এখনও একটাও জামা পরে দেখা হয়নি। একটানে নিজের ব্লাউজটা শরীর থেকে টেনে নামিয়ে নামিয়ে দরজাটা একটুখানি খুললো উজ্জয়িনী। শপিং মলের কর্মরতা একটি মেয়ে এসে প্রথমে ওকে সামান্য দেখেই থমকে গেলো। কোনোমতে বললো,

-সো সরি ম্যাম! অনেকটা দেরি করছিলেন আপনি। আর আমাদের কাউন্টারও বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে, তাই....
-আমাকে মিনিট পাঁচেক সময় দিন প্লিজ।

একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে উজ্জয়িনী বললো। 

-শিওর ম্যাম। 

প্রথম পোশাকটা গায়ে চাপিয়ে আয়নার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো উজ্জয়িনী। পূর্ণযৌবনা না হলেও, একেবারে বিগতযৌবনা নয়। তাকে এখনও তন্বী বলাই যায়। শরীরের প্রতিটা ভাঁজের সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই জামাটা বসে গেছে। একেবারে বেমানান লাগছে না। প্রতিটা জামাতে নিজেকে নতুন-নতুনভাবে আবিষ্কার করলো উজ্জয়িনী। আয়নার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। বহুকাল আগের হারিয়ে যাওয়া রূপটা, আয়নার প্রতিবিম্বের মধ্যে দেখে ওর বেশ ভালোই লাগলো। সবকটা জামা গুছিয়ে নিয়ে, আবার শাড়িটা পরে নিলো উজ্জয়িনী। কাউন্টারে পৌঁছে কার্ড পেমেন্ট করে বেরোনোর সময়, ও বেশ কিছু হার-চুড়ি এমনকি পছন্দ করে একটা সানগ্লাসও কিনে ফেললো। সমস্ত পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে শপিং মল থেকে বেরোনোর সময় উজ্জয়িনীর মনে হলো, ও এবার যাবে কোথায়? কার কাছে যাবে এত রাতে! মুহূর্তেই মনস্থির করে ফেললো উজ্জয়িনী। ওই শপিং মল থেকেই ছোট একটা ট্রলি কিনে, নতুন কেনা যাবতীয় জামাকাপড় ওতে ভরে একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়লো....

-দিদিভাই কোথায় যাবেন?
-কাছাকাছি কোনো হোটেল। যেখানে রাতে থাকা যাবে। আর একটু ভদ্রস্থ কোনো জায়গায় নিয়ে যাবেন। রাতে পুলিশ রেড করবে, এমন কোনো সস্তার হোটেল না। বুঝেছেন?
-হুম!

ট্যাক্সি চলতে শুরু করলে ফোন অন করে নিজের মাকে একটা ফোন করলো উজ্জয়িনী। ফোনের ওপার থেকে মায়ের চিৎকার ভেসে এলো,

-আমাকে কি মরার আগে তুই একটুও শান্তি দিবিনা পেখম? কোথায় যাচ্ছিস তুই এই রাতদুপুরে?
-মুহূর্ত চুরি করতে।
-কি? 
-বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছি মা। রাতে থাকবো। কোন বন্ধুর বাড়ি জানতে চেয়ো না। আমি বলবো না। বাচ্চা মেয়ে নই। তাই হারিয়েও যাবো না। আমাকে আর ফোন করবে না। করলেও পাবে না। আমার জন্য চিন্তা করবে না। আমি একটু ভালো থাকতে যাচ্ছি। আর থাকবোও। রাখছি। 

মায়ের চিৎকারের মধ্যেই লাইন কেটে ফোনটা আবার বন্ধ করে দিলো উজ্জয়িনী। ট্যাক্সি ততক্ষণে থেমে গেছে। ট্যাক্সির ভিতর থেকেই উজ্জয়িনী দেখলো আলোয়মালায় জ্বলজ্বল করছে ইংরেজি হরফে লেখা তিনটে শব্দ। OYO....

কাঁধের ব্যাগ, হাতের ছোট ট্রলি আর আলুথালু আঁচল সামলে উজ্জয়িনী এগিয়ে গেলো রিসেপশনের দিকে। প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলে নিলো। ওর খিদের অনুভূতিটাই যেন মরে গেছে চিরতরে। অভুক্ত অবস্থায় চাবি হাতে নির্দিষ্ট ঘরে যখন উজ্জয়িনী পৌঁছলো, তখন বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই ট্রলিটা একপাশে সরিয়ে রেখে, ধবধবে সাদা বিছানার ওপর ক্লান্ত দেহটাকে এলিয়ে দিলো। ব্যাগটা পড়ে রইলো বেশ খানিকটা দূরে। ওটাতে হাত দিতে গিয়েও মানসিক যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলো উজ্জয়িনী। চুপ করে শুয়ে থাকতে থাকতে, একসময় ঘুমিয়েই পড়লো। ঘুম ভাঙলো প্রায় শেষরাতে। চোখদুটো খুলেই বিছানার ওপর বেশ কিছুক্ষণ চুপটি করে শুয়েছিলো ও। তারপর আবার উঠে গিয়ে নিজের ঘরের জানলার পর্দা সরিয়ে অন্ধকার শহরের দিকে চেয়ে রইলো অনেকক্ষণ। থমথমে নিস্তব্ধ গোটা শহর। হাতেগোনা দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। শহর ঘুমোচ্ছে। অন্ধকার আর একাকীত্বে বড় ভয় উজ্জয়িনীর। তাই ও আর বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়াতে পারলো না। আবার এসে শুয়ে পড়লো বিছানায়। বন্ধ করে ফেললো চোখ। নরম বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই, ওকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরলো শৌনক। গলায় আলতো করে আদুরে কামড় বসিয়ে দিলো। নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে, হেরে যাওয়ার ভয়ে, প্রতিনিয়ত নিজের কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে উজ্জয়িনী। ভয়ের কারণে ও তাড়াতাড়ি চোখ খুলে ফেললো। হাতঘড়ির দিকে চেয়ে একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো। শাড়িটা বিছানার ওপর ফেলে রেখে ছুটলো বাথরুমে....

হাঁটু পর্যন্ত আঁটোসাঁটো নতুন পোশাকের সঙ্গে হালকা গয়না, আর সঙ্গে সামান্য প্রসাধনের আড়ালে নিজেকে আবারও লুকিয়ে ফেললো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। দিনের আলো ফুটে ওঠার পর নিজের সমস্ত জামাকাপড় ট্রলিতে গুছিয়ে নিয়ে, ব্রেকফাস্ট সেরে যখন ও প্রাইভেট গাড়িতে চড়ে বসলো, তখন আটটা বেজে গেছে। উজ্জয়িনীকে নিয়ে গাড়ি ছুটে চললো। খোশমেজাজে গাড়ির চালকের সঙ্গে সামান্য কিছু কথা বলতে-বলতে রোদ-চশমার আড়ালে নিজের চোখদুটোকে ঢেকে, রাস্তার দুপাশের প্রকৃতির অকৃত্রিম সবুজ সৌন্দর্য উজ্জয়িনী উপভোগ করছিলো। কলকাতা থেকে মাত্র পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্বে যে এমন সবুজ একটা পৃথিবী নাগালের মধ্যেই রয়েছে, এটা ওর তেমনভাবে জানা ছিলো না। গতকাল রাতে হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো নিজেকে নিয়ে নিজের সঙ্গে হারিয়ে যেতে। জীবন থেকে কিছু মুহূর্ত চুরি করে নিজের নামে লিখে রাখতে। সেইমতো সব আয়োজন করে, উজ্জয়িনী আজই বেরিয়ে পড়েছে সবুজের হাতছানিতে সাড়া দেওয়ার জন্য। কটেজ আগে থেকে বুকিং করাই ছিল। তাই বিন্দুমাত্র অসুবিধে হলো না। গাড়ি থেকে নেমে রিসোর্টে ঢুকে বেশ ভালো লাগলো উজ্জয়িনীর। ছিমছাম, শান্ত-নিরিবিলি একটা রিসোর্ট। বাড়তি পাওনা হিসেবে একটা ছোট সুইমিং পুলও রয়েছে। গাড়ির চালক ট্রলিটা রিসেপশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে টাকা ও বকশিশ নিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিলেন। রোদ চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে যা ফর্মালিটি ছিল, সবটুকু পূরণ করে নিজের কটেজের দিকে এগোলো উজ্জয়িনী। গাড়িতে বসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সময়ই উজ্জয়িনী বুঝেছে, ফলতা নামক জায়গাটি শীতকালে চড়ুইভাতির জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন করলেও, মরশুমের সকল সময়েই মন পরিবর্তনের জন্য এটি একটি আদর্শ জায়গা। শহুরে কোলাহলের বাইরে সপ্তাহান্তে ঝটিতি সফরে পাড়ি দেওয়ার মতো জায়গা খুঁজলে, প্রকৃতির সবুজের মাঝে পৌঁছে নিজের সঙ্গে একাকী একটু কথা বলতে চাইলে, হুগলী নদীর বুকে প্রবাহিত পাক খেয়ে ওঠা বাতাসে সমস্ত মনখারাপ উজাড় করে দিতে চাইলে, এভাবেই পালিয়ে আসতে হয় প্রকৃতির আহ্বানে। এখানে দর্শনীয় স্থানের অতিরিক্ত প্রাচুর্য না থাকলেও শান্তি আছে। বুকভরে শ্বাস নেওয়া যায়, আবার ছেড়েও দেওয়া যায় নিশ্চিন্তে। ব্যাগপত্র, ট্রলি সব নিজের ঘরে রেখে পোশাক পরিবর্তন করে ফুরফুরে মনে সুইমিং পুলে নামলো উজ্জয়িনী। হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র রয়েছেন গুটিকয় কটেজে। দু-চারজন শিশু দৌড়াদৌড়ি করে খেলা করছে অদূরে। সুইমিং পুলের জল স্থির। উজ্জয়িনী ডুব দিতেই জলের উপরিভাগে তরঙ্গের সৃষ্টি হলো। বার দুয়েক সাঁতরে বাঁধানো পাড়ের ওপর দুটো হাত তুলে, হাতের উপর মাথা রেখে চুপ করে খানিকক্ষণ পড়ে রইলো উজ্জয়িনী। চোখ বন্ধ করতেই ওই পুরুষ চিৎকার করে উঠলো, "মানুষ এই মন্দার বাজারে চাকরী পায় না। তুমি চাকরী ছাড়বে মানে!! তুমি কিছুতেই চাকরী ছাড়বে না! আমি ছাড়তে দেবোই না।" ওই চিৎকারের ভয়ে কেঁপে উঠে চোখ খুলে ফেললো উজ্জয়িনী। নোনতা জল ভিড় করেছে চোখের কোণে। জলের ওপর শৌনকের আদুরে আবছা প্রতিবিম্ব। চোখের জল ধুয়ে ফেলতে আবার পুলের জলে ডুব দিলো উজ্জয়িনী। সূর্যের আলোয় পুলের নীচের অংশ সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। উজ্জয়িনী দেখলো, দূর থেকে শৌনক তরতর করে সাঁতার কেটে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। তক্ষুণি ও জল থেকে মাথা উঁচু করে একবুক বাতাস ফুসফুসে ভরে নিলো। জল থেকে মাথা তুলতেই উজ্জয়িনী দেখলো, এই রিসোর্টেই কর্মরত দুজন পুরুষ রিসেপশনের দিক থেকে দৌড়ে দরজার দিকে যাচ্ছে। হয়তো কোনো বিশেষ অতিথিকে আপ্যায়নের জন্য হঠাৎ এত ব্যস্ততা। পুল থেকে উঠে পড়লো উজ্জয়িনী। ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে যাওয়ার সময় দেখলো, ওই দুজন কর্মী একটা ঢাউস ট্রলি নিয়ে আসছে, অদূরেই একজন পুরুষ। রোদ চশমায় ঢাকা তার দুচোখ। নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো উজ্জয়িনী। চোখ থেকে রোদ চশমা নামিয়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে উজ্জয়িনীর হেঁটে পার হয়ে যাওয়া শূন্য পথের দিকে চেয়ে রইলো সে....

-স্যার! কি হলো? দাঁড়িয়ে পড়লেন যে?! আসুন আসুন! 
-হ্যাঁ....চলুন। 

রোদ চশমাটা আবার চোখে পরে নিলো সে। রিসেপশনে নিজের নামটুকু সই করার সময় তার কানে ভেসে এলো ব্যক্তিত্বময়ী সেই বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর....

-আমার চাবিটা প্লিজ? 

হৃদস্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে এলো তার। হাতের কলমটাও যেন একটু কেঁপে উঠলো। তবুও কিছুতেই মাথা তোলার সাহস হয় না। 

-থ্যাঙ্কস! লাঞ্চ ঠিক দুটোয়, আমার কটেজে....
-শিওর ম্যাম। 

উজ্জয়িনী চাবিটা নিয়ে ভিজে চুলগুলো কিঞ্চিৎ নেড়েচেড়ে নিজের ঘরের দিকে এগোলে, কলমটা খাতার ওপর ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে ওইদিকেই চেয়ে রইলো সৌজন্য রায়....দারুণ উত্তেজনায় ওর হৃদপিন্ড তখন তিরতির করে কাঁপছে....

(চলবে....)

ছবি : সংগৃহীত


রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

মুহূর্তেরা বন্দী (প্রথম পর্ব)


 




মুহূর্তেরা বন্দী


সাথী দাস


প্রথম পর্ব




প্রথম প্রভাতের সূর্যদেব আত্মপ্রকাশ করেছেন বহুক্ষণ আগেই। বেলা গড়িয়ে প্রায় দশটা বাজতে যায়। বাঁকা রোদ্দুর চুপিসাড়ে প্রবেশ করেছে ফ্ল্যাটের খোলা জানলা দিয়ে। স্পর্শ করেছে বিছানা। ছোট টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা সদাহাস্যময় বুদ্ধমূর্তি। ল্যাপটপের পাশে চশমা, ফোন, ফোনের চার্জার, ল্যাপটপের চার্জার, কলম, ট্যাব, জলের বোতল, সেই সঙ্গে ঘুমের ওষুধের পাতাটাও উল্টে পড়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটা ঘুমের ওষুধ টেবিলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। বিছানায় শুয়ে থাকা রমণীর আজকের প্রভাত দর্শনের বুঝি কোনো সদিচ্ছা ছিল না। সেই কারণে টেবিলে ছড়িয়ে থাকা সবকটা ঘুমের ওষুধ গলাধঃকরণ করার, তার ইচ্ছে ছিল প্রবল। কিন্তু মানসিক টানাপোড়েনের কারণে গতকাল রাতে সেই কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। নিত্যদিনের মতোই ওষুধ সেবন করে ঘুমের জগতে হারিয়ে গিয়েছিলেন উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। ফোনটা একনাগাড়ে বেজে গেলো। কোনো উত্তর না পেয়ে একটু পরেই থমকে গেলো গানের সুমিষ্ট কন্ঠস্বর। দ্বিতীয়বার আবার ফোনটা বেজে উঠতেই, চোখ টেনে খুললো উজ্জয়িনী। বিছানা ছেড়ে উঠতেই ও বুঝলো, মাথা ভারী হয়ে রয়েছে। কোনোক্রমে হাতড়ে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে দেখলো পরিচিত নম্বর। গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,

-মর্নিং দাদা! বলুন?
-আরে উজ্জয়িনী, তুমি তো সেভাবে কিছু জানালেই না, আজকের বিকেলের অনুষ্ঠানে তুমি থাকছো কিনা! আমাকে তো সেভাবে সব আয়োজন করতে হবে। প্লিজ চলে এসো, আমার বিনীত অনুরোধ!
-শরীরটা ভালো নেই দাদা। আমি বোধহয়....
-আরে খারাপ থাকা শরীরকে চাঙ্গা করে তুলতে হবে মন দিয়ে। চলে এসো। অনেক গুণীজনের সমাহার। চাঁদের হাট বসবে তো! আর সবটাই তোমাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। তোমার-আমার কত বছরের সম্পর্ক বলো তো! প্লিজ আর না কোরো না। চলে এসো। আমি কিন্তু ওদের বলে দিচ্ছি, তোমার হাতেই বইটার শুভ উদ্বোধন হবে। তুমি আসছো! জয়ী?
-আচ্ছা দাদা। আমি থাকবো। তবে ওই আধঘন্টাখানেকের জন্য। একটু মুখটা দেখিয়েই চলে আসব। কিছু বক্তব্য রাখতে আমাকে বলবেন না প্লিজ!
-বেশ তাই হবে। তুমি এসে একটু এখানে দাঁড়াও, তাহলেই হবে। 
-হুম! সাড়ে চারটে নাগাদ যাচ্ছি। 
-ওকে ওকে!

ঘুমের রেশ কাটতেই জানালার বাইরের দিকে চাইলো উজ্জয়িনী। বাইরে ঝকঝক করছে রোদ্দুর। কোথাও কোন বিষণ্ণতা নেই। শুধুমাত্র ওর মনের ভিতরে ছাড়া। মা জানে, ও প্রায় প্রতিটা রাত জেগে লেখালিখির কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই সকালে আর ডাকেনি। কিন্তু ফোনটা এসে বড় অসময়ে ঘুম ভাঙিয়ে দিলো। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো উজ্জয়িনী। ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে রয়েছে। বিছানা থেকে কুশনগুলো কাল রাতে আছড়ে ফেলেছিলো মেঝেতে। সারাটা ঘর নিজের হাতেই তছনছ করে ফেলেছে। উজ্জয়িনীর মনের ভিতর বয়ে যাওয়া ঝড়, অস্থিরতা, চঞ্চলতার সাক্ষী ঘরের এই জড় বস্তুগুলো। খুব কষ্ট হওয়াতে কাল রাতে ও কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়েই পড়েছিলো। এক-একটা অভিশপ্ত একাকী রাত কেটে যাওয়ার পর নিজের মানসিক অবস্থার কিছুমাত্র উন্নতি না হলেও, নিজের হাতে ঘরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কবলে পড়ে থাকা ওই জড় বস্তুগুলোকে, স্বহস্তে উদ্ধার করে আবার জায়গামতো সাজিয়ে রাখতে হয়। গত কয়েকদিন ধরে এটাই ওর প্রতিরাতের রুটিন হয়ে গেছে। ঘরটা নিজের হাতে গুছিয়ে, বিছানা ঠিক করে যখন উজ্জয়িনী ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরোলো, তখন মা ঠাকুরপুজো দিয়ে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়িয়েছে। একমাত্র মেয়েকে পূর্ব নির্ধারিত সময়ের আগেই ঘুম ভেঙে উঠতে দেখে, বৃদ্ধা মা জিজ্ঞেস করলেন,

-কিরে? আজ তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে! কাল রাত জাগিসনি বুঝি! 

মায়ের কথার উত্তরে উজ্জয়িনী বললো,

-না। ভোররাতেই শুয়েছিলাম। কিন্তু সকাল সকাল একটা ফোন এসে ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলো।
-কে রে? কার ফোন?  

একমাত্র মেয়ের ভয়ে ওই নির্দিষ্ট নামটা মা আর উচ্চারণ পর্যন্ত করতে পারলো না। মায়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো উজ্জয়িনী। তারপর মুখ ফিরিয়ে মায়ের একবুক আশায় জল ঢেলে বাথরুমে ঢুকতে-ঢুকতে বললো,

-অসীমদা ফোন করেছিলো! আমাকে বিকেলে ঘন্টাখানেকের জন্য একটু বেরোতে হবে মা। এক নতুন লেখিকার প্রথম বইপ্রকাশ অনুষ্ঠান। দাদার ইচ্ছে আমার হাতেই হোক। অন্য কেউ বললে এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু দাদা আমার প্রথম প্রকাশক। পরে অনেক প্রকাশনীর সঙ্গে কাজ করলেও, অসীমদার সঙ্গে একটা অন্যরকম স্নেহের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। মুখের ওপর না বলা যায় না। বিকেলে একটু বেরোতে হবে। 
-হ্যাঁ রে মা! ও আর একবারও ফোন করেনি?
-আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে চা করছি মা। তুমি ঠাকুরের বাসনগুলো মেজে নাও। তোমাকে আর কিচেনে ঢুকতে হবে না। আমি আজ যখন তাড়াতাড়ি উঠেই গেছি, আমিই রান্নাটা করবো। 

দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেখমের মা মেয়েকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করে আত্মগোপন করে একপ্রকার বাঁচলো উজ্জয়িনী। বাথরুম থেকেই ও শুনতে পেল, মা কারোর সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ব্রাশ করে উজ্জয়িনী শাওয়ারের নীচে দাঁড়ালো। সকালে ওঠার অভ্যেস ওর বরাবরই ছিল। মর্নিং স্কুল, পরবর্তীকালে সকালে টিউশন, তাছাড়া উজ্জয়িনী যখন বি. এড করছিল, সেই সময় খাতা-বইয়ের মাঝে মুখ গুঁজে হোস্টেলের প্রতিটা রাত পেরিয়ে কখন যে সকাল হয়ে যেত, ও বুঝতেই পারতো না। কখনও রুমমেট কেতকীদি, আবার কখনও বা শ্রাবণীদি এক মগ কফি এনে মুখের সামনে ধরতো। ওরা ঘুমিয়ে থাকলে উজ্জয়িনী নিজেই তিনমগ কফি করে আনতো। নিজের রাতজাগার ক্লান্তি দূর করার সঙ্গে সঙ্গে, কফির ছুতোয় খাতা-পেন সরিয়ে রেখে তিনমাথা একজায়গায় হয়ে মিনিট দশেকের ওই মেয়েলি আড্ডাটুকু বড় ভালো লাগতো উজ্জয়িনীর। সেসব আজ শুধুই ধূসর স্মৃতি। প্রথম সকালের সুন্দর মুহূর্তগুলো হারিয়ে গেছে অতীতের কালগর্ভে। পরিচিতা বান্ধবীরা কথা দিয়েও কথা রাখেনি। কেউ তেমনভাবে আর যোগযোগ রাখেনা। কেতকীদি বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে, এতখানি পরিশ্রমের ফলে প্রাপ্ত চাকরীর মায়া কাটিয়ে, গর্ভে দুমাসের একটি ছোট্ট প্রাণকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছে না ফেরার দেশে। বাকিরা সুখে-দুঃখে সংসারী, সরকারী বা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরতা। সংসার, স্বামী-সন্তান-সন্ততি, চাকরী, পরিবারের প্রতি সকল দায়-দায়িত্বগুলো সামলে, রাতজাগা বান্ধবীদের দেওয়া কথাগুলো আর রাখা হয়না। কারোর সঙ্গেই তেমনভাবে যোগাযোগ নেই আর। এখন উজ্জয়িনী একপ্রকার বন্ধুহীন জীবন কাটায়। জলের প্রতিটা ফোঁটা ওর দেহ স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই নগ্ন শৌনক সিক্তদেহে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরলো উজ্জয়িনীকে। শৌনকের সঙ্গে কাটানো বেশ কিছু সুন্দর মুহূর্ত ওর মানসপটে ভেসে উঠলো। সারারাত অক্লান্ত শরীরী খেলায় মেতে থাকার পর, পরদিন ভোরবেলা স্নানের সময়ও পেখমকে কাছছাড়া করতো না শৌনক। কতদিন স্কুলে বেরোতে দেরি হয়ে যেত। তাও শৌনকের পাগলপারা আদরের উন্মাদনা থেকে অব্যাহতি পেতো না উজ্জয়িনী। ও স্কুলে গিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতো। ক্লাসগুলো নিয়ে কোনোমতে টিচার্স রুমে গিয়েই এলিয়ে পড়তো চেয়ারে। ওকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে, মহিলা সহকর্মীদের কিছু অম্লমধুর বাণী ভেসে আসতো। লজ্জায় মরে গিয়েও সেসব কথা বেশ উপভোগ করতো উজ্জয়িনী। আজও শাওয়ারের তলায় দাঁড়ালে, শৌনক ওকে বরাবরের মতো চারপাশ থেকে এসে ঘিরে রাখে। চোখদুটো বন্ধ করলো উজ্জয়িনী। শৌনকের দেহের উষ্ণতার সঙ্গে, শাওয়ারের জলের শীতলতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। আর কান্না আসে না এখন। সব সয়ে গেছে। মনটাও হয়তো পাথর হয়ে গেছে। স্নান সেরে জামাকাপড় পরে বাইরে বেরিয়েই ও দেখলো, মা তাড়াতাড়ি করে ফোনটা রেখে দিলো। একটু সন্ধিহান হয়েই পেখম জিজ্ঞেস করলো,

-কার ফোন মা?
-মাম্মামের হোস্টেল থেকে।
-সেকি! রেখে দিলে কেন? কি হয়েছে মাম্মামের?
-ও আজ প্রথম ড্রামা ক্লাসে যাচ্ছে। তাই তোর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলো। 
-ওহ!

সদ্যস্নাতা উজ্জয়িনীর উন্মুক্ত ভিজে চুল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মাথায় তোয়ালে জড়ানোর সময়টুকুও পেলো না ও। ছুটলো নিজের ঘরে। ফোন হাতে নিয়েই দেখলো, দুটো মিসড কল হয়ে রয়েছে। মাম্মামের প্রিন্সিপালের ওই নম্বরে ফোন করেই উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো, মাম্মামের সঙ্গে এখন একটু কথা বলা যাবে কিনা! উনি জানালেন, মিনিট দশেক আগেই ও ক্লাসে চলে গেছে। ক্লাস শেষ হওয়ার পর প্রিন্সিপাল ম্যাডাম অবশ্যই ফোন করবেন। তখন মায়ের সঙ্গে মাম্মাম কথা বলবে। একটু হতাশ হয়ে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে রাখলো উজ্জয়িনী। একরত্তি মেয়েটা আজ ওর বহু প্রতীক্ষিত ড্রামা ক্লাসে যাওয়ার আগে, একটু মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। সেটাও পারলো না। উজ্জয়িনীর বুকের ভিতরটা একেবারে খালি হয়ে গেল। সেই সঙ্গে মনে উঁকি দিলো আরও একটা সন্দেহ। চুপচাপ মাথায় একটা তোয়ালে জড়িয়ে ঘর ছেড়ে বেরোল ও। মা তখন ডাইনিং টেবিলে বসে ছুরি হাতে সবজি কাটছে। রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের জল বসিয়ে উজ্জয়িনী জিজ্ঞেস করলো,

-ওটা কার ফোন ছিলো মা? প্রিন্সিপাল ম্যাডাম আমার ফোনে আগে ফোন করেছিলেন। তারপর না পেয়ে প্রায় দশ মিনিট আগে ল্যান্ডফোনে কল করেছিলেন। মাম্মাম ক্লাসে ঢুকে গেছে অনেক আগেই। তাহলে তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? আমি বাথরুম থেকে বেরোতেই ফোন রেখে দিলে! 
-না মানে...
-সত্যিটাই বলো? বেশি ভাবতে হবে না।

নিজের গরম জলটুকু কাপে নামিয়ে নিয়ে, সসপ্যানে দুধ দিয়ে চিনি আর চা পাতা ঢেলে দিলো উজ্জয়িনী। নিজের কাপে একটা সবুজ চায়ের টি-ব্যাগ চুবিয়ে নিয়ে মাথা থেকে তোয়ালেটা নামিয়ে ফেলে পেখম আবার জিজ্ঞেস করলো,

-বলো মা?
-আজ তোর মাসিমণি একটু আসবে বলছিলো। আমি বলিনি। ও নিজেই আসবে বললো!

রান্নাঘর থেকে একলাফে বেরিয়ে এলো উজ্জয়িনী। 

-কেন? আবার কেন? 
-তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে!
-কথা বলতে? না আমার মাথাটা চিবিয়ে খেতে?
-কিসব বলছিস পেখম? ও তোর মাসিমণি। আমার নিজের বোন। ও তোর খারাপ চাইবে?
-মা আমার এত ভালো আর চাইতে হবে না প্লিজ! মাসিমণি এসে আমাকে পাগল করে দেয়। মাসি এলে আমি এই এখানে থাকতে পারি না আর। তুমি কি চাইছ, আমি এই ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাই?
-পাগলের মতো কথা বলবে না পেখম। সেটা চাইলে প্রথম দিনই তোমার স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ঘর থেকে দূর করে দিতাম। 
-দূর করে যখন দাওনি, তাহলে এখন একটু শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে। কি বোঝাবে মাসিমণি আমাকে? আমি কি বাচ্চা মেয়ে? যাহোক বুঝিয়ে দিলেই বুঝে যাবো? আমি যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, মাসিমণি বুঝবে সেটা? কিছু না বুঝেই ওর এত ভাষণ, এত জ্ঞানের কথা কে শুনবে মা? তোমরা প্লিজ আমাকে নিজেরটা বুঝে নিতে দাও! 
-দিয়েছিলাম তো! খুব বোদ্ধা হয়েছিলে না তুমি! ফল কি হলো? এত যখন নিজেরটা নিজে বুঝে-গুছিয়ে নেওয়ার শখ, তাহলে ওই অবুঝ মেয়েটাকে কোলছাড়া করে হোস্টেলে ফেলে রেখেছিস কেন? এত বুঝিস, আর ওর কষ্টটা বুঝিস না? মা বাবা থাকতেও হোস্টেলে অনাথের মতো মেয়েটা বড় হচ্ছে!! আজ প্রথম ড্রামা ক্লাসে যাবে, মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলবে, তাও বলতে পারলো না। কেমন মা রে তুই? নিজের পেটে ধরেই তো জন্ম দিয়েছিস ওকে। ওর কথা একটুও মনে পড়ে না? আমার হয়েছে যত জ্বালা! ব্যাস গেলো! ওদিকে চা উথলে সব পড়ে গ্যাস নিভে গেলো বোধহয়। সকালে একটু শান্তিতে এককাপ চা মুখে দেব, তারও উপায় নেই। তুই কি বুঝবি মায়ের জ্বালা! কিছু বলতে গেলেই কথার ফুলঝুরি! তুই একাই সব বুঝিস পেখম। আমার বয়সটা তো হাওয়ায় বেড়েছে! সব বুঝে বুঝেই তো আজ এখানে এসে পৌঁছেছিস!

প্রতিদিনের এই অশান্তি উজ্জয়িনীর এখন সয়ে গেছে। সত্যিই ও কাউকে সুখী করতে পারলো না। নিজের বাবাকেও ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর দোরগোড়ায়। মাকেও বেঁচে থাকতে কোনো সন্তানসুখ দিতে পারছে না। একরত্তি মেয়ে মাম্মাম, তাকেও সরিয়ে রেখেছে নিজের থেকে অনেকটা দূরে। মাতৃসুখ হতে বঞ্চিত ওই সেও। আর শৌনক? দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে ঢুকলো উজ্জয়িনী। এদিকে মায়ের ওপর বকবক করতে এসে, সত্যিই সবটুকু চা উথলে পড়ে গেছে। মা আবার চায়ের জল চাপিয়েছে। নিজের সবুজ চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে ধীরকণ্ঠে উজ্জয়িনী বললো,

-ড্রামা ক্লাসের ড্রামা, ডায়লগ, ও আনন্দ করে শিখুক মা। স্টেজে উঠে আমার মাম্মাম পারফর্ম করবে। আমি বেশ দেখতে যাবো। কিন্তু ঘরের এই রোজকার ড্রামা যেন আমার মাম্মামের শিশুমনে আঘাত করতে না পারে! সেইজন্যই ওকে হোস্টেলে রেখে মানুষ করছি। 

মা কোনো কথার আর উত্তর দিলো না। রান্নাঘরে বাসনের শব্দ অনাবশ্যক রকম বৃদ্ধি পাওয়াতে রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো বর্তমান প্রজন্মের একজন প্রোথিতযশা লেখিকা উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। ডাকনাম পেখম। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চাকুরীরত পেখমের বাবা, অবসর নেওয়ার পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পারিবারিক চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকলেও, পেখমের জীবনের একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত সহসাই সুখী গৃহকোণের পরিচিত চিত্রটা একেবারে বদলে দেয়। সেদিন বাড়িতে তুমুল অশান্তি হওয়ার পর বাবা সেই যে বাড়ি থেকে বেরোলেন, আর বাড়িতে ফিরলেন না। রাস্তায় একটা যমদূতের মতো সুবিশাল গাড়ি, বাবার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনার পর থেকে মা একেবারে চুপ করে গিয়েছিল। আত্মীয়রা কেউ পেখমের দিকে সরাসরি আঙুল না তুললেও, বিবেক দংশনে মরে যাচ্ছিল শোকে পাথর হয়ে যাওয়া পেখম। সবার নিস্তব্ধ ইঙ্গিত যেন ওর বুকের মধ্যে তীরের ফলার মতো বিঁধেছিলো। তবে কি ওর জীবনের ওই সিদ্ধান্তটাই বাবার মৃত্যুর কারণ? বাবা কি ওর কথা ভাবতে ভাবতেই অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলো? মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও হারিয়েছিল পেখম। আজও মা-মেয়ের মধ্যে বাবাকে নিয়ে কোনো কথা উঠলে, মা একেবারে চুপ করে যায়। মা-ও কি তবে এটাই ভাবে, বাবার মৃত্যুর সকল দায় পেখমের?! সুর করে আদরমিশ্রিত কণ্ঠে বাবার ওই ডাকটা, আজ বড় শুনতে ইচ্ছে করছে, "আমার পেখমরানী কোথায় গেলি রে? ময়ূরের মতো পেখম মেলে আমার কাছে একটু আয় দেখি মা!" একাকীত্বের মুহূর্তে আপনজনের কথা বড় বেশিই মনে পড়ে। কিন্তু পেখমের জীবনে সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর সঙ্গেই ওর সম্পর্ক এতটাই তিক্ত, যে তাদের কোলে মাথা রেখে কেঁদে একটু হালকা হওয়ারও উপায় নেই। জীবন বড় দুঃসহ! বড় জটিল! আর যখন চিরপরিচিত মানুষগুলোই চোখের সামনে একটু একটু করে বদলে যায়, তখন আত্মবিশ্বাসটুকুও কোথায় যেন হারিয়ে যায়। পরিবারের মধ্যে থেকে, পরিচিতের মধ্যে থেকেও একাকীত্বের অসহনীয় জ্বালা সহ্য করা বড় সহজ কথা নয়। পরিবারের মধ্যেও প্রতিমুহূর্তে শুধু নিজেকে প্রমাণ করেই যেতে হয়। পেখম যখন নিজের ক্ষমতায় স্কুলের চাকরীটা পেলো, তখন ওর বেতনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবারে ও নিকট আত্মীয় মহলে হঠাৎ করেই ওর দর বেশ খানিকটা বেড়ে গেলো। বাবা-মাও কি ভীষণ খুশি হয়েছিল সেদিন। কিন্তু সকলের আদরের সেই পেখম যখন নিজের ইচ্ছেয় লেখালিখির কারণে চাকরীটা ছাড়লো, তখন ওর সিদ্ধান্তকে কেউ আর সাদরে গ্রহণ করলো না। ওই সিদ্ধান্তে বাবা-মাকেও আর পাশে পেলো না পেখম। মুহূর্তেই সকলের চোখে যোগ্য-আদর্শ সন্তান থেকে, অযোগ্য হয়ে উঠলো উজ্জয়িনী। যোগ্য সন্তান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে-করতে জীবন থেকে চল্লিশটা বসন্ত যে কিভাবে পেরিয়ে গেলো, উজ্জয়িনী আজ আর সঠিকভাবে তার হিসেব দিতে পারবে না। প্রায় প্রতিদিন সকালে মায়ের সঙ্গে এমনই কিছু আলাপচারিতায় বারংবার প্রমাণিত হয়, উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত জীবনের প্রতিপদে ব্যর্থ একজন নারী! সেদিন যখন মা দুপুরে খাওয়ার টেবিলে বলেই বসলো, "ওই ছাইপাঁশ কথাবার্তা যা সব বইতে লিখিস, তার সিকিভাগও যদি তুই নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারতিস, তাহলে তোর জীবনটা এভাবে ছারখার হয়ে যেত না। বড়-বড় কথা শুধু বইতেই মানায়। বুঝলি তো? বাস্তব অন্য কথা বলে!" সেদিন আর মাকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়নি, "তাহলে আমাকে ছোটবেলা থেকে এত-এত বই পড়তে শেখালে কেন? কঠিন বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে, কল্পনার জগতে ভাসিয়ে অনাবশ্যক আবেগী করে তুললে কেন? সবরকম আঘাত থেকে আগলে রাখলেই বা কেন? কেন এতদিন পরিস্থিতির চাপে পড়ে শিখতে দাওনি? কোনো কিছুর সঙ্গে আপোষ না করার শিক্ষাটাই বা দিলে কেন? দিলেই যখন আজ সেইসব শিক্ষা কোথায় গেল? তোমার দেওয়া সেইসব মহান শিক্ষার প্রয়োগ যখন নিজের জীবনে করছি, তখন তোমাকে পাশে পাচ্ছি না কেন মা?" এসব আর জিজ্ঞেস করা হয়নি। আজকাল শুধু শুনেই যায় পেখম। কোনো কথার আর উত্তর দিতে ইচ্ছে করে না। ধৈর্য হারিয়েছে ও। আর নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে ও তৎপর হয়ে ওঠে না। পেখম বুঝে গেছে, ও যতই যাই করুক না কেন, সংসারে ওকে নিয়ে কোনো একজনের সমস্যা থাকবেই। তাই এত ভেবে লাভ নেই। শুধু সময়ে-অসময়ে নিজের বছর দশেকের মেয়েটাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে। কিন্তু এসব পারিবারিক অশান্তি ওর শিশুমনে যাতে কোনো বিরূপ প্রভাব না ফেলে, সেই জন্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই বুকে পাথর চাপা দিয়ে ওকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। কাঁচটা মুছে চোখে চশমাটা পরে নিলো উজ্জয়িনী। দৃষ্টিটাও গত বছর থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা করছে। চোখদুটোতে টানতে হয়েছে কাঁচের আলগা পর্দা। চশমা পরেই উজ্জয়িনী দেখলো, মেঘ করে আসছে। দূরে আকাশে একটা সুবৃহৎ পাখি উড়ছে। বাবা অবসর নেওয়ার পর পেখম নিজের হাতে বাবার জন্য ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে এই ছোট্ট বাগানটা তৈরি করে দিয়েছিল। রকমারি পাতাবাহার গাছ, নাম না জানা গাছগাছালির পরিচর্যা করতে করতে, রঙবেরঙয়ের বাহারি ফুল ফোটার অপেক্ষায় বাবার জীবনের বাকি দিনগুলো কেটে যাবে এটা ভাবতেই, পেখমের মনে দারুণ উত্তেজনা কাজ করতো। তাই বাবার অবসরের দিনই, নার্সারী থেকে একগাদা সবুজ গাছের চারা উপহারস্বরূপ পেখম কিনে নিয়ে এসেছিল। তারপর বাবারও গাছের নেশা হয়ে গিয়েছিল। একরত্তি বারান্দাটাকে কিভাবে সাজাবে, কতরকমভাবে গাছ দিয়ে সাজাবে, সেইসব আলাপ-আলোচনা দিনরাত ফোনের মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে চলতো। বাবার উন্মাদনা দেখে পেখমও একের পর এক গাছের চারা এনে মহানন্দে ভরিয়ে ফেলতো ওই এক টুকরো বারান্দা। আজ বাবা সাধের এই ছোট্ট বাগানটা ফেলে রেখে চলে গেছে অনেক দূরে। কিন্তু পেখম এই বাগানটার মায়া কাটাতে পারেনি। নিজের হাতে প্রতিদিন বিকেলে এই গাছগুলোর পরিচর্যা করে ও। আর সন্ধ্যেবেলা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে শহরের বিষাক্ত আকাশের দিকে চেয়ে বলে, "বাবা দেখছো তো তুমি? আমি আজও তোমার বাগানের অযত্ন হতে দিইনি। এই কংক্রিটের শহরটা যতই বিষিয়ে উঠুক না কেন, এখানে অক্সিজেনের ঘাটতি হবে না কোনোদিনও। ওই দূরে তারাদের দেশে ঘুমিয়ে, শ্বাস নিতে তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে নাতো বাবা? আচ্ছা বাবা, বলো না! সেদিন রাস্তা পার হওয়ার সময় সত্যিই কি আমার কথাই তুমি ভাবছিলে? আমিই কি তোমায় শেষ করে দিলাম বাবা? মায়ের সিঁথির সিঁদুর মুছিয়ে দিলাম? কেউ উত্তর দেয় না। তুমি বলবে বাবা?" উজ্জয়িনীর এই সকল প্রশ্নের কোনো উত্তর আসে না। হঠাৎ বয়ে আসা দমকা বাতাস, বারান্দার গাছের পাতাগুলো দুলিয়ে দিয়ে যায় কেবল। কোনো একটা গাছে নতুন ফুল ফুটলেই সেই গাছটাকে জড়িয়ে ধরে সেদিন উজ্জয়িনী কাঁদে নীরব কান্না। আজ গোটা বারান্দাটা লাল-হলুদ ফুলে আগুনরঙা সাজে সেজে উঠেছে। এই গাছগুলো উজ্জয়িনীর সঙ্গে একটুও বিশ্বাসঘাতকতা করে না। ওর অক্লান্ত পরিচর্যার ফসল হিসেবে, প্রতিবারই অগুনতি ফুলেল সৌন্দর্য উপহার দিয়ে যায়। হাতের চায়ের কাপটা সরিয়ে রেখে ঝুলন্ত টবটাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো উজ্জয়িনী। তারপর ভেঙে পড়লো নিঃশব্দ কান্নায়! ঘরে ফোন বাজছে। নিশ্চয়ই মাম্মাম! ওর প্রথমদিন ড্রামা ক্লাসের গল্প শুনতে হবে। ওকে অনেকটা আদরও করতে হবে। আবেগে বাষ্পীভূত হয়ে আবছা হয়েছে পেখমের চশমার কাঁচ। চশমা নামিয়ে চোখ মুছে ও ছুটলো নিজের ঘরে। স্বচ্ছ চায়ের কাপে সবুজ চা ধীরে-ধীরে উষ্ণতা হারিয়ে পানের অযোগ্য হয়ে উঠলো...

-শোন না রে মা! এইরকম জেদ করলে হয়? 
-মাসিমণি, দেখছো তো আমি রেডি হচ্ছি। বিশেষ প্রয়োজনে আমাকে একটু বেরোতেই হবে। বাড়ি ফিরে তোমার সঙ্গে কথা বলছি। 
-তুই আমাকে এড়িয়ে যাস। এখনও তাই যাচ্ছিস। ফোন করলেও ফোন ধরিস না পেখম। কি শুরু করেছিস নিজের জীবনটা নিয়ে? ঝোঁকের মাথায় চাকরীটা ছাড়লি, ওটাও মানা যায় না। আর এখন তো....
-চাকরী করি না বলে আমার খাওয়া-পরার চিন্তা তোমাকে করতে হচ্ছে কি? আমি কি এক সন্ধ্যে তোমার বাড়িতে ভাত চাইতে যাচ্ছি? না থাকতে যাচ্ছি? নাকি গা ঢাকার কাপড় চাইছি? আমার নীচের ফ্ল্যাটের ভাড়ার টাকা, বাবা যা রেখে গেছে, আমার যা আছে, এখনও যা রোজগার করে চলেছি, সব মিলিয়ে আমার পুরো পরিবারের চাহিদা ভরণপোষণ বাদ দাও, প্রয়োজনে তোমার সংসারও আমি টেনে নিতে পারবো। আমি চাকরী ছেড়েছি, আমি বুঝবো। আমার জীবন, আমি বুঝবো। তোমাকে এত ভাবনা না ভাবলেও চলবে। 
-দিদি তোর মেয়ের কথাবার্তা এত খারাপ হয়ে গেছে?
-তাহলেই ভাব, কি নিয়ে সারাটা দিন থাকি আমি? সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে থাকে, আর আমার সঙ্গে এইরকম যুদ্ধ করে! মেয়ের এত মুখ চলে!
-মা!!
-কি মা? মাসিমণি কি তোর খারাপ চাইবে? 
-মা! আমার এত ভালো, এত শুভচিন্তক, এতসব শুভাকাঙ্খীর চাপ আর নিতে পারছি না আমি! মাসিমণি আমি বেরোলাম।

ঘড়িটা হাতে পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো উজ্জয়িনী। কিন্তু তার আগেই তুমূলভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হলো মাসির কাছে,

-এই মেয়ে! শোন! নিজের বয়সটা একটু দেখ। এই বয়সে এসে এসব কি ভূত চেপেছে তোর মাথায়? হ্যাঁ রে! জীবনটা কি তোর ওই ল্যাপটপের গল্প নাকি? যার সঙ্গে যাকে ইচ্ছে, যখন ইচ্ছে জুড়ে দিবি! আবার যখন চাইবি ভেঙে দিবি। এরকম হয় না মা। কি শুরু করেছিস মা তুই এসব? তোর মায়ের তো বয়স হচ্ছে। তোর জন্য কমপ্লেক্সে মাকে কত খারাপ-খারাপ কথা শুনতে হচ্ছে মা! কতরকম জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দে মা। অন্তত নিজের পেটের মেয়েটার কথা ভাব। ও যদি বড় হয়ে জানতে পারে, ওর মায়ের চরিত্র এমন, মন এত অস্থির, সামান্য একটু মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও নেই, তাহলে তুই তোর নিজের মেয়ের চোখেই কতটা নেমে যাবি, সেটা একবারও ভেবে দেখেছিস? একটা বাচ্চাকে সুস্থভাবে মানুষ করতে বাবা-মা দুজনকেই প্রয়োজন হয়। বাবার ভালোবাসা বাবা ছাড়া অন্য কেউ দিতে পারে না পেখম। মেয়েদের সংসার জীবনে অনেককিছুই সহ্য করতে হয়। আর মায়েদের তো এত ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা ভাবলে চলেই না। তারা কি আর নিজের জন্য বাঁচে রে? তারা তো বাঁচে সন্তানের জন্য। তোর অমন সুন্দর সাজানো-গোছানো সংসার! এই বয়সে এসে এসব তোকে মানায় বল? অন্তত সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে...
-মাসিমণি! 
-বল মা? 
-আমার বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে। আমি একটা অনুষ্ঠানে যাবো। সেখানে সময়মতো পৌঁছতে না পারলে, অনুষ্ঠানটাই শুরু হবে না। প্লিজ! সব এসে শুনছি। প্রমিস! তুমি আজ সারারাত ধরে বলবে, আমি শুনবো। এখন বেরোতে দাও। মা এলাম। 

ছিটকে ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে একপ্রকার পালিয়েই বাঁচলো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। বেরোনোর সময় মায়ের চাপা কান্নার শব্দ ওর কানে ভেসে এলো। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েই বাড়ির বাইরে পা রাখলো উজ্জয়িনী। ওলা বুক করে ফ্ল্যাটের নীচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর হ্যান্ডব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ধরে গাড়িতে উঠে বসলো। ব্যাগের ওই নির্দিষ্ট চেনটা খুলতে গিয়েও খুলতে পারলো না আর। কাঁচের ভিতর দিয়ে জানালার বাইরের দিকে চেয়ে অস্ফুটে একটাই নাম উচ্চারণ করলো, "শৌনক!" ফেসবুকে ঢুকেই খুলে বসলো একজন পুরুষের প্রোফাইল। শৌনক চট্টোপাধ্যায়! তার একের পর এক ছবি স্ক্রোল করে, ফোনের স্ক্রিনে হাত বুলিয়ে যেতে লাগলো উজ্জয়িনী....

অনুষ্ঠানের পর সভাগৃহে উপস্থিত অগণিত পাঠকবৃন্দের জমায়েত ও সামান্য জলযোগের ব্যবস্থা নিপুণহাতে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অসীমদা। জনসমাগমের মধ্যেই এককোণে একটা চেয়ারে বসেছিলো উজ্জয়িনী। অনিচ্ছাসত্ত্বেও অজস্র গুণীজনের মধ্যে কিছু বক্তব্য ওকেও রাখতে হয়। কন্ঠ হতে উত্তরীয় নামিয়ে রেখে অস্থির হাতে কয়েকটি বইতে স্বাক্ষর করছিলো ও। মাথা নীচু করেই স্বাক্ষরকার্যে ব্যস্ত থাকায়, কোনো পাঠকের মুখ দেখা সম্ভব ছিল না। অদূরে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে যে ওই লাইন শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিল, সেটা প্রথমে উজ্জয়িনীর দৃষ্টিগোচর হয়নি। সকল পাঠকের বইতে স্বাক্ষর, মুঠোফোনে ফ্রেমবন্দী ছবির আবদার মিটিয়ে তখন উজ্জয়িনী প্রায় বিধ্বস্ত। সভাগৃহ অপেক্ষাকৃত ফাঁকা হওয়ার পর উজ্জয়িনী দেখলো, একটি ছেলে ওর দিকে চেয়েই দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটির হাতে অন্য দু-তিনটি বইয়ের সঙ্গে, ওর সর্বশেষ প্রকাশিত বইয়ের একটা কপি রয়েছে। কিন্তু সে নিজে থেকে এগিয়ে আসছে না দেখে, মুখে মৃদু হাসি এঁকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চাইলো উজ্জয়িনী। এবার ছেলেটি এগিয়ে এলো উজ্জয়িনীর দিকে। ছেলেটির বয়স বড় বেশি নয়। কলেজ পড়ুয়া হয়তো। গালে সদ্য গজিয়ে ওঠা দাড়ির আভাস। ক্লান্ত রাতজাগা দুটি চোখ। বর্তমান প্রজন্ম মুঠোফোনের দাসত্ব বরণ করেছে। তাই স্বাস্থ্যের প্রতি বড়ই অমনোযোগী। এই ছেলেটিও তার ব্যতিক্রম নয়। রাতজাগা ক্লান্তির ছাপ গোটা মুখমন্ডল জুড়ে। পরনে সুতির পাঞ্জাবী। হাতা গুটিয়ে রেখেছে। এক নজরে ছেলেটির আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে উজ্জয়িনী বললো,

-কোনো অভিযোগ?
-না তো ম্যাম।
-তাহলে দূরে দাঁড়িয়েছিলে যে! আমি ভাবলাম, আমার কোনো বই পড়ে মনে হয়েছে অপাঠ্য, তাই একান্তে অভিযোগ জানাবে বলে দূরে দাঁড়িয়ে আছো। 
-কি যে বলেন ম্যাম! আপনার কোনো বই বাদ দিইনি। সব সংগ্রহে আছে। শুধু এটাই ছিলো না। এটাতে একটা সই ম্যাম?
-নিশ্চয়ই!
-ম্যাম আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?
-আমরা তো কথাই বলছি, কি নাম তোমার?
-দীপ্ত বর্মন।
-আচ্ছা। "দীপ্তকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসাসহ....উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত"। হ্যাঁ দীপ্ত, আমরা তো কথাই বলছিলাম। বলো কি বলবে?

বইটা ফিরিয়ে দিলো উজ্জয়িনী। ছেলেটি কথা শুরু করার আগেই সশব্দে উজ্জয়িনীর ফোনটা বেজে উঠলো। ও ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়েই বিরক্ত হয়ে গেলো। মাসিমণি ফোন করছে। যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওর বাড়ি ফেরার কথা ছিল, সেই সময়সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে বার দুয়েক মায়ের ফোন এসে গেছে। মায়ের সঙ্গে কথা বললেও, মাসির ফোনটা উজ্জয়িনী কেটে দিলো। তারপর হাসিমুখে দীপ্তর দিকে চেয়ে বললো,

-বলো দীপ্ত? কি বলবে?
-ম্যাম একটু আলাদাভাবে কথা বলা যাবে আপনার সঙ্গে?
-কেন বলো তো?
-প্লিজ ম্যাম!
-শুনছে না কেউ। সবাই অনেকটা দূরে আছে। বলো!
-ম্যাম! আমি আঁকতে খুব ভালোবাসি। ডিজিটাল, ওয়াটার কালার, যেমনটা বলবেন করবো। আপনার মনের মতো করে। একবার আপনার বইতে ইলাস্ট্রেশনের সুযোগ দেবেন ম্যাম? আপনার মনের মতো করে আমি চরিত্রদের সাজিয়ে দেব। আপনার কলমে ওরা যদি প্রাণ পায়, আমার ছবিতে পাবে অবয়ব। 
-দেখো দীপ্ত....
-নতুনদের কেউ কাজ দেয় না ম্যাম। আবার কাজ করিয়ে অনেকে পয়সাও দেয় না। ছোটখাটো কয়েকটা প্রকাশনী থেকে কাজ করেছি ম্যাম। খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাঠক যখন একটা বই উল্টে পাতার পর পাতা পড়ে যায়, তখন তার পিছনের অক্লান্ত পরিশ্রমটা সেভাবে বোঝে না। নতুন বইয়ের গন্ধে, বলিষ্ঠ লেখনীতে হারিয়ে যায় তারা। কিন্তু ওই একটা বই বাজারে আনতে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে কি পরিমাণ পলিটিক্স চলে, সেটা আমি এই কদিনেই বুঝে গেছি। আপনি তো অনেক সিনিয়র রাইটার ম্যাম। আপনি আমার থেকে এসব খবর আরও ভালো জানেন। আপনি আমাকে একটা সুযোগ করে দিন না, আপনার বইতে কাজ করার। আমি জানি নতুনদের নিজের জায়গা করে নিতে কতটা পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়! আগে অনেকবার চেষ্টা করেছি ম্যাম কাজ পাওয়ার। নামী প্রকাশকরা কেউ কাজ দেয় না। আমাকে দেখা করতে বলেও তারা আসে না। আসলে আমি অনামী তো! কেউ চেনেই না। একটা কাজ পেলে নিজেকে প্রমাণ করে দেখিয়ে দেব। একটা সুযোগ আপনি করে দেবেন ম্যাম? আপনার বইয়ের যা কাটতি আছে, আপনার সঙ্গে একটা কাজ করলে, আপনার নামের সঙ্গে নিজের নামটা একবার জড়িয়ে ফেলতে পারলেই....
-দীপ্ত?
-বলুন ম্যাম?
-একটা বইয়ের পিছনের রাজনীতি আমার অজানা নয়। তবে স্তাবকতা আমার অপছন্দ। আলোকবৃত্তে থাকা মানুষরা দিনরাত পরিশ্রম করে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। তাদের সঙ্গে একবার কাজ করলে, তোমার হয়তো খানিকটা শ্রীবৃদ্ধি হবে ঠিকই! কিন্তু টিকে থাকার জন্য নিজের লড়াইটা নিজেকেই লড়তে হয়। শূন্য থেকে একদিন আমিও শুরু করেছিলাম। তোমার সঙ্গে আমার পার্থক্য হলো, আমি কোনদিন কারোর দরজায় পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘুরিনি। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে শুধু কাজ করে গেছি। এভাবে সুযোগের জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকিনি। কাজ করো। সুযোগ তোমার দরজায় নিজেই কড়া নাড়বে। 
-আর না নাড়লে? 
-তখন না হয় এসব দ্বিতীয় পথগুলো ভেবো। তোমার বয়সটা তো খুবই কম। এখনই এত ভেঙে পড়লে চলবে? অনেকদূর যেতে হবে তো!
-আমাকে তবে সুযোগের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে বলছেন? আচ্ছা! তাই করবো তবে। কিন্তু আর কত অপেক্ষা করবো ম্যাম? আর কি করলে....

ছেলেটির মুখ দেখে বড় মায়া হলো উজ্জয়িনীর। ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। কিন্তু বইবাজারের লবিবাজি আর রাজনীতির চাপে পড়ে কাজের উৎসাহ হারাচ্ছে। কাজ খারাপ হলে তাকে বকে-ধমকে দুটো উপদেশ দেওয়া যায়। কিন্তু একজন মানুষ যে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে কাজের উৎসাহটুকুই হারিয়ে ফেলে, সেটা উপলব্ধি করতে পারলো উজ্জয়িনী। হয়তো কাজের অভাবে ছেলেটি কিছুদিনের মধ্যেই জলাঞ্জলি দেবে আপন শিল্পীসত্তা। এটা তো হতে দেওয়া যায় না। অসহায় ছেলেটির অবনত চোখের দিকে চেয়ে উজ্জয়িনী বললো, 

-তোমার কাজ দেখানো সম্ভব?
-আপনি দেখবেন ম্যাম!
-এই মুহূর্তে সম্ভব না। তুমি আমাকে মেইল করবে। আমার অফিসিয়াল পেজে মেইল আইডি পেয়ে যাবে। 
-আমার পেজ লিঙ্ক দিয়ে দেব ম্যাম। সব কাজ ওখানেই শো-কেস করে রাখি।
-তাই দিও।
-থ্যাঙ্কু ম্যাম!
-কথা দিলাম না কিন্তু। কাজ পছন্দ হলে ভেবে দেখবো। আমারও তো পেশাদারী ক্ষেত্রে কিছু দায়বদ্ধতা আছে। আমার কথাই শেষ কথা নয়। সবদিক ঠিক থাকলে তুমি আমার দিক থেকে নয়, সরাসরি প্রকাশকের পক্ষ থেকে ডাক পাবে। তখন যেন আমার নাম ডুবিও না!
-প্রাণ দিয়ে সাজাবো ম্যাম আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ!
-আচ্ছা। আর ডাক না পেলে মনে রাখবে....
-আমাকে আরও খাটতে হবে। আরও নিখুঁত হওয়ার জন্য। কম্পিটিশনে টিকে থাকার জন্য।
-হুম! কিন্তু উৎসাহ হারাবে না। আগামী কোনো এক বইমেলায় তোমাকে হয়তো পকেটের পয়সা খরচ করে, আমার বই কিনতে হবে না। নিজের কাজের কপি হিসেবে একটা বই বিনামূল্যেই পেয়ে যাবে। 
-আমি আজই বেশ কয়েকটা কাজ করে, পেজে আপলোড দিয়ে তারপর আপনাকে লিঙ্ক পাঠাবো ম্যাম। আজ আমি সারারাত জাগবো। আপনার পরবর্তী লেখা কবে নাগাদ আসার কথা? 
-দেখি। এখন তেমন কিছু লেখা হচ্ছে না! 
-লিখুন ম্যাম। আমিই করবো আপনার আগামী বইয়ের প্রচ্ছদ। কালই সব ডিটেলস আপনি পেয়ে যাবেন।

উজ্জয়িনীর মনে হলো, হঠাৎ করেই যেন ছেলেটির দীপ্ত নামটা সার্থক হয়ে উঠলো। কাজ পাওয়ার আশায়, আনন্দে ঝলমল করে উঠলো ছেলেটির মুখ। 

-বেশ! তাই পাঠিও। তবে রাতে ঘুমাও একটু। 
-আপনার চরিত্ররা তো সবাই নিশাচর ম্যাম। তাদের শান্তিতে ঘুমোতে দেন আপনি? পাঠকরাও না হয় রাত জাগবে। প্রচ্ছদশিল্পীও। আপনি নিজে রাতে ঘুমান তো ম্যাম?! 

স্বল্পপরিচিত এই ছেলেটি হঠাৎ করেই যেন একটা আয়না এনে উজ্জয়িনীর সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। কাল্পনিক সেই আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে শিউরে উঠলো উজ্জয়িনী। তাড়াতাড়ি বলে উঠলো,

-তুমি চা খাবে দীপ্ত? 
-না ম্যাম। টিউশনি আছে। যেতে হবে। ভিড় একটু ফাঁকা হলে আপনার সঙ্গে কথা বলবো বলে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়েছিলাম। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করলে মাসের মাঝখানেই টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে স্টুডেন্টের বাবা বলবে, কাল থেকে আর আসতে হবে না! আসলে দুবছর আগে বইমেলায় আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম আমি। আমার দুটো বইতে আপনার সইও আছে। তবুও আপনি আমায় চিনবেন না। আপনি তো বইতে সই করার সময় কারোর দিকে মুখ তুলে তাকান না। ছবি তুললেও হয়তো ভুলে যান। মেলার ওই ভিড়ের মধ্যে তো এত কথা বলা যায় না। তাই গত বছর থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম, একদিন আপনার সঙ্গে একা কথা বলবোই। সমস্ত ভিড় পেরিয়ে পৌঁছব আপনার কাছে। একটা সেলফি ম্যাম?
-নাও!
-থ্যাঙ্কু! আসছি ম্যাম! আমি কালই আপনাকে মেইল করছি!
-হুম! সাবধানে এসো....

প্রকাশক অসীমদা ও অন্যান্য প্রতিভাবান লেখক-লেখিকার সান্নিধ্যে সেদিন সন্ধ্যেটা উজ্জয়িনীর বেশ ভালোই কাটলো। অসীমদার কাছ থেকে অনুমতি চাইতে গেলে বাইরে বেরিয়ে এসে উজ্জয়িনীর কাঁধে হাত রেখে অসীমদা বললেন,

-মেয়ে কেমন আছে জয়ী?
-ভালো দাদা! 
-আর তুমি?
-আমিও ভালোই।
-কি করছো নিজের জীবনটা নিয়ে?
-বাড়িতে তো সারাদিন চলছেই দাদা। এসব কথা আর না বললেই কি নয়?
-সবাই তোমার ভালো চায়। তাই বলছে! জীবনটা কোনো উপন্যাস নয় জয়ী। যে তোমার ইচ্ছেমতো তুমি উপসংহার সাজাবে!
-তবে কি দাদা? ছোটগল্প? যা শেষ হয়েও হবে না শেষ? প্রতি পাতায় থাকবে নতুন আঙ্গিকে কোনো শুরুর রেশ?
-এসব কাব্য করে বইয়ের ব্যবসা চলে। প্রকাশকের- লেখিকার দুটো পয়সা আসে। কিন্তু জীবন চলে না জয়ী। আবেগতাড়িত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না। নিয়ন্ত্রণ রাখো নিজের ওপর। মেয়েটার কথা একটু ভাবো। তুমি আমার বোনের মতো। দীর্ঘ কয়েক বছরের সুসম্পর্ক আমাদের। সেই জায়গা থেকে অন্তত দাদার কথাটা শোনো! আমি তোমার ভালো ভেবেই...

সশব্দে বেজে উঠলো উজ্জয়িনীর ফোনটা। স্ক্রিনের দিকে চেয়ে ও হেসে বললো,

-এই যে! আমার ভালো চাওয়ার আর একজন মানুষ! কতবার ফোন করছে! এক মিনিট দাদা?

উজ্জয়িনীর কাঁধের ওপর থেকে স্নেহের আলিঙ্গন সরিয়ে নিলেন অসীমদা। উজ্জয়িনী বলে উঠলো,

-হ্যাঁ মাসিমণি!
-আর কত রাত করবি? নাকি আমি আছি বলেই বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করছে না? আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের কৃতকর্মের হিসেব শুনতে ভালো লাগে না? তাই না?

নিরুত্তর উজ্জয়িনী। 

-মা চিন্তা করছে তোর জন্য! বাবাটাকে তো শেষ করলি, এবার মাকে অন্তত শেষ কটাদিন একটু শান্তিতে বাঁচতে দে!
-কি বললে মাসি!! আমি বাবাকে শেষ করেছি!?
-বাড়ি আয়। বাড়ি আয়। মা চিন্তা করছে।
-আসবো না আমি। তুমি যতক্ষণ ওই ফ্ল্যাটে থাকবে, আমি ঢুকবই না। কিছুতেই যাবো না আমি! আমি আজ ফিরবোই না। কি করবে তুমি?

-জয়ী!!

লাইনটা কেটে দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো উজ্জয়িনী। 

-দাদা, আজ আর কিচ্ছু শুনতে ভালো লাগছে না। আমি আসছি। আপনি আর ফোন করবেন না প্লিজ। করলেও আমি ধরবো না।

উদভ্রান্তের মতো বড় রাস্তায় নেমে একটা সাদা রঙের নো রিফিউজাল ট্যাক্সি দেখেই হাত নেড়ে ওটাকে থামালো উজ্জয়িনী। 

-কোথায় যাবেন দিদি?
-যতই বিল হোক, আপনি ভাড়া পেয়ে যাবেন। আমার কাছে টাকা আছে। চিন্তা নেই। আপনার যেদিকে ইচ্ছে হয়, যেদিকে দুচোখ যায়, আপনি শুধু চলুন। আমি এই শহরের বুকে হারিয়ে যাব। আর ফিরবো না! 

ট্যাক্সিতে উঠে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো উজ্জয়িনী সেনগুপ্ত। ট্যাক্সিওলা পিছন ফিরে হাঁ করে ওর মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে দেখে উজ্জয়িনী ধমকে উঠলো,

-কি হলো! চলুন! 

ট্যাক্সিতে বসেই উজ্জয়িনী ভেঙে পড়লো নিঃশব্দ কান্নায়। বাবার একচিলতে বাগানের গাছগুলোতে সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলগুলো হাতছানি দিয়ে ওকে যেন পিছু ডাকছে। ওর বুকফাটা যন্ত্রণায় পাতাগুলোও কাঁপছে তিরতির করে। কিন্তু উজ্জয়িনী আর কিছুতেই ফিরবেই না ওই বারান্দায়। হ্যান্ডব্যাগটা বুকের মধ্যে চেপে ধরলো উজ্জয়িনী। ব্যাগের একটা চেন নিষিদ্ধ। ওটা খুলতে নেই! ওতে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে উজ্জয়িনীর প্রাণ ভোমরা। আর অপর পাশে সর্বক্ষণের সঙ্গী ট্যাব। ল্যাপটপটা বিছানার ওপরেই রয়ে গেলো। পাওয়ার ব্যাঙ্কটাও সঙ্গে নেই। না থাকুক! এবার মা ফোন করছে। ও ফোনটা বন্ধই করে দিলো। উজ্জয়িনী সেনগুপ্তর বাড়ির সম্পূৰ্ণ বিপরীতদিকে চলতে শুরু করলো ট্যাক্সি। অজানার উদ্দেশ্যে....

(চলবে....)

ছবি : সংগৃহীত

বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১

PRE - BOOK










 



শুরু হয়ে গেলো "নির্বাক"-এর প্রিবুকিং। প্রিবুকিং এর এই নির্দিষ্ট সময়ে মুদ্রিত মূল্যের ওপর থাকবে ২৫% ছাড়।
আপনার কপিটি প্রিবুক করতে এখনই ফোন অথবা হোয়াটসঅ্যাপ করুন এই নম্বরে,
পাঠকবন্ধু : +917439112665

অথবা লিংক এ ক্লীক করে বুক করুন
লিংক - BOOK NOW

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইন্দোবাংলার ফোনে ফোন করুন/হোয়াটসঅ্যাপ করুন—+880 1674-121221





মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

সপ্তপর্ণী (প্রথম খণ্ড) চতুর্থ পর্ব


 



সপ্তপর্ণী


সাথী দাস


প্রথম খণ্ড


চতুর্থ পর্ব








মর্মাহত ত্রিদিব বললেন,

-আমাকে অবিশ্বাসের কোনো কারণ নেই ত্রিযামা।ছুরিকাঘাতে মনুষ্যশরীরে আঘাত সম্ভব,তবে বাহির হতে অদৃশ্য হৃদয়ে নয়।এ তোমার নিষ্ফল প্রচেষ্টা।ছুরি যথাস্থানে রাখো।
-বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের মতো কোনো বক্তব্য এখনও আপনি রাখেননি রাজা।
-এ বাক্যও সত্য!
-রাত্রি জাগরণের কারণে আপনি অত্যন্ত পরিশ্রান্ত।বিশ্রাম গ্রহণ করুন।

কোমরবন্ধনীর মধ্যে অস্ত্রকে আশ্রয় দিয়ে,আপন গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো ত্রিযামা।তবে তার চরণযুগল পুনরায় স্থির হলো।উদ্বেলিত হৃদয়ে ত্রিদিবের মুখনিঃসৃত বাক্য হৃদয়ঙ্গম করলো ত্রিযামা,

-আগামী কয়েক দিবস আমি মায়ের অতিথি।রাজা আপন রাজ্যেই অতিথি!এ নিতান্তই হাস্যকর হলেও,মাকে সম্মানপূর্বক এই আতিথেয়তা আমি গ্রহণ করেছি।সেই সঙ্গে আমার মনের গোপন ইচ্ছা এটুকুই ত্রিযামা,জীবনকালে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের মতো সময় ও সুযোগ তো সকল নরাধমেরই প্রাপ্য।তবে ত্রিদিবাচার্য এ অধিকার হতে বঞ্চিত হবে কেন?সেই সুযোগটুকু অন্তত তাকে প্রদান আবশ্যক....

নিরুত্তর ত্রিযামা মুহূর্তেই পরিত্যাগ করেছিলো সেই স্থান।সমগ্র দিবস কেটেছিলো এক মানসিক অস্থিরতার মধ্যে।পরিশেষে সূর্যদেব যখন আপন ম্লান হয়ে আসা নয়নাভিরাম আলোকোজ্জ্বল রূপসহ প্রায় অদৃশ্য হয়েছেন মায়াকাননের সবুজ অরণ্যশিখরের প্রান্তরে,তখন ক্ষীণ বাতি নিয়ে ত্রিদিবের কক্ষে প্রবেশ করেছিলো ত্রিযামা।তবে দর্শন পায়নি নৃপতির।কুটির শূন্য।উদভ্রান্তের মতো কুটির হতে বাইরে বেরিয়ে সেই নির্দিষ্ট স্থানের দিকে ধেয়ে যায় ত্রিযামা।অদৃশ্য হয়নি বৈশ্বানর।অন্ধকার নিমজ্জিত বৃক্ষপদতলে দুই চক্ষু বুজে দন্ডায়মান ত্রিদিবের প্রাণের অশ্ব।তবে সেই ক্ষণে নিরুদ্দেশ অশ্বারোহী।আকুলচিত্তে দুর্ভেদ্য বনানীর ভিতর পায়ে হাঁটা পথ অনুসরণ করে মায়াকাননের গভীরে প্রবেশ করলো ত্রিযামা।কিছুদূর অগ্রসর হতেই চন্দ্রালোকে দেখা মিললো তার।পূর্ণচন্দ্রের আলোকছটায় নবরূপে সজ্জিত মায়াকাননের প্রতিটি বৃক্ষ।সম্মুখে টলটলে দীঘি।এই দীঘির জল যাযাবর গোষ্ঠীর তৃষ্ণা নিবারণের হেতু ব্যবহার করা হয়।প্রতি প্রভাতে সূর্যের প্রথম কিরণের উপস্থিতিতে সবুজ জলজ উদ্ভিদে আবৃত এই দীঘির জলে অবগাহন করে ত্রিযামা।এর প্রভাতী রূপের সঙ্গে পরিচিতা এই বন্য নারী।তবে রাতে চন্দ্রপ্রভার সৌজন্যে দীঘির মোহময়ী রূপ হতে অকস্মাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া বড়ই কঠিন।ত্রিদিব ওই দীঘির এক প্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন।ধীর পায়ে ত্রিদিবের পশ্চাতে গিয়ে দাঁড়ালেন ত্রিযামা....

-এসো!
-আপনি বুঝতে পেরেছেন?আমি নেহাৎই ধীরগতিতে....
-আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অতিশয় সজাগ।সে বুঝিয়ে দিয়েছে আমায় কেউ অনুসরণ করছে।তবে আমি বিপদগ্রস্ত নই।সে আমার শত্রু নয়!এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
-মাকে সংবাদ প্রেরণের প্রয়োজন বোধ করেননি।এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো নিরুদ্দেশ হওয়ার অর্থ?
-প্রকৃতি বড় সুন্দর ত্রিযামা।রাজকোষের স্বর্ণচ্ছটা হতে দীঘির উপরিভাগের চন্দ্রকিরণের ওই আভা,চোখকে অধিক আরাম প্রদান করে।আমি সুখী!
-দীর্ঘকাল যাবৎ মায়াকাননের এই অংশে যাতায়াতের কারণে,জঙ্গলের সকল পথ,সকল সৌন্দর্য আমার দৃষ্টিপথে ধরা পড়েছে।তবে মায়াকাননের এমন রাত্রিকালীন সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পূর্বে হয়নি।সত্যিই পৃথিবী বড় বিচিত্র রাজা!একই অঙ্গে সময়বিশেষে তার অজস্র রূপ!
-শুধু সময়কালে সে রূপে অবগাহনের প্রয়োজন!
-আসুন।আপনাকে অপূর্ব সুন্দর এক দৃশ্য দেখাই।জীবদ্দশায় এমন সুযোগ বুঝি দ্বিতীয়বার পাবেন না!

ত্রিযামার হাত ধরে মায়াকাননের সুদীর্ঘ ছায়াঘেরা নিবিড় অরণ্যে হারিয়ে গেলেন ত্রিদিব।দীঘির অদূরেই ঝর্ণার মৃদু শব্দ।সুদূরপ্রসারী হিমশৈলর কোনো এক অনামী চূড়া বুঝি আত্মগোপন করেছে এই দুর্ভেদ্য অরণ্যের আড়ালে।যা চিরকালই থেকে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে।ক্ষুদ্র গুল্ম হতে বৃহৎ মহীরূহ,সকলেই আলোআঁধারির খেলায় মত্ত।মৃদুমন্দ বাতাসে শীতল হয় মায়াকাননের অধীশ্বরের অস্থির মন।অপরূপ নৈঃশব্দের মধ্যে অকস্মাৎ বৃক্ষরাজির মর্মরধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশপূর্বক,মনে এক অলৌকিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়।রাতচরা বিহঙ্গ-দম্পতি কর্কশ আলাপনে আপন অস্তিত্ব জানান দেয়।ঝর্ণার সম্মুখভাগে পৌঁছে স্তব্ধতার শুভ্র চাদরে আপনাকে আবৃত করলেন ত্রিদিব।চন্দ্রালোকের স্পর্শে সেই ঝর্ণা সদ্য যুবতীর মতই প্রাণোচ্ছল।ধীরে ধীরে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বনপূর্বক,সেই ঝর্ণার পিচ্ছিল পাড়ে আপন পদযুগল জলে ভিজিয়ে সিক্ত পাথরের ওপর বসলো ত্রিযামা।ত্রিদিব বসলেন অদূরেই।প্রকৃতির এমন অনাবিষ্কৃত সৌন্দর্যের রসাস্বাদন হেতু,ত্রিদিব ও ত্রিযামা ব্যতিরেকে বুঝি তৃতীয় কেউ এই ত্রিভুবনে জাগ্রত নেই।সামান্য উচ্চৈঃস্বরে বুঝিবা বনদেবী রুষ্ট হবেন।অত্যন্ত ধীরকণ্ঠে ত্রিদিব বললেন,

-শুক্লপক্ষ!
-হুম!
-অপূর্ব!তবে কৃষ্ণপক্ষের অধিক সুন্দর নয়।কৃষ্ণপক্ষকালে এই স্থানে পৌঁছে,ত্রিযামার কমনীয় রূপ দেখতে মনে বড় সাধ জাগে।

নিরুত্তর ত্রিযামা।ঝর্ণার জল নাতিদীর্ঘ দীঘির অন্তরে বিলীন হয়ে গেলো।জলের উপরিভাগে ক্ষুদ্র তরঙ্গ।ক্রমশ অন্ধকার অরণ্য সজ্জিত হলো আলোকমালায়।মস্তকের ঊর্ধ্বপানে সুউচ্চ তরুদল হতে,সন্নিকটের লতানো পরজীবী বৃক্ষপল্লবে জ্বলে উঠলো অজস্র আলো।স্থির নয় সেই আলোকিত পতঙ্গ।জ্বলতে-নিভতে থাকা দীপ্তিময় সেই পতঙ্গ এসে বসলো ত্রিযামার উল্কি দ্বারা সজ্জিত উন্মুক্ত রুক্ষ বাহুতে।অদূরেই বসেছিলেন ত্রিদিব।উঠে এসে বসলেন ত্রিযামার সন্নিকটে।ত্রিযামার রুক্ষ বাহু হতে সেই আলোকোজ্জ্বল পতঙ্গকে অতি সাবধানে উঠিয়ে আপন হস্তের মধ্যে স্থান দিলেন।হতবাক খদ্যোত বুঝি আকস্মিক স্থান পরিবর্তনে বিচলিত হয়ে আপন দেহ হতে অস্থির আলোকবিন্দু বিচ্ছুরণ পূর্বক,ত্রিদিবের হস্তমধ্যে ইতস্তত বিচরণ করতে লাগলো।দুজনের মুখমণ্ডলের কিয়দংশ আলোকিত হলো সেই প্রাণীর কারণে।প্রকৃতির মায়াবিনী রূপে বিভোর হয়ে ভীত দৃষ্টিতে ত্রিদিবের পানে চাইলো ত্রিযামা।একাধিক জোনাক তখন ত্রিদিবের সর্বাঙ্গে জ্বলছে-নিভছে....

-ত্রিযামা!প্রথম দর্শনেই মনপ্রাণ সঁপেছি তোমায়।এ অরণ্য তোমার যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদানে অপারগ।তুমি আমার সঙ্গে প্রাসাদে চলো।প্রিয় রানি করে আমার অন্দরমহলে রাজকীয় বিলাসিতায় রাখবো তোমায়।তোমার কোনরূপ অসম্মান হবে না।এই গোষ্ঠীর যাবতীয় দায়িত্ব নিতে আমি প্রস্তুত।নগরে স্থান দেবো সকলকে।গৃহ প্রদান করবো।জীবিকার পথ প্রশস্ত হবে।অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে এভাবে হিংস্র জন্তুর সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই অনাবশ্যক ত্রিযামা।আমার সঙ্গে চলো তুমি!দয়া করো আমায়।আমি মোহরকুঞ্জে ফিরতে চাই।উপযুক্ত ক্ষত্রিয়রূপে রাজধর্ম পালন করতে চাই।তবে সে দায়িত্ব কর্তব্য পালন,তোমা বিনে কদাচ নয় ত্রিযামা!

চঞ্চল জোনাক আপন ক্ষুদ্র পাখা মেলে অদৃশ্য হলো প্রকৃতি মাঝে।সহস্র পতঙ্গের মধ্য হতে ওই বিশেষ জোনাককে চেনা আর সম্ভব হলো না।শিহরিত ত্রিযামার প্রাণ।ঝর্ণার হিমশীতল জল হতে উঠে দ্রুততার সঙ্গে সেই স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হলো সে।প্রবলভাবে বাধাপ্রাপ্ত হলো ত্রিদিবের নিকট।

-ত্রিযামা!আমার প্রস্তাবের উত্তর চাই।এই মুহূর্তে!
-নগরের উপকণ্ঠে কোনোকালেই মা আর ফিরবে না।সভ্য নগরী হতে এ অসভ্য অরণ্য অধিক বিশ্বস্ত!আমিও এ বাক্য ধ্রুব সত্য বলেই জানি এবং এই সত্য পালনে ব্রতী রাজা।
-এভাবে প্রতি মুহূর্তে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাঁচা সম্ভব?জীবনধারণের উপযোগী কোনো সুবিধাই তো এখানে নেই ত্রিযামা।তোমার গোষ্ঠীতে ওই জনাকয়েক পুরুষ জীবিত।কেউ কাতর বৃদ্ধ,কেউ অত্যন্ত অসুস্থ,কেউ আবার অঙ্গহানির যন্ত্রণায় অসহায়।এভাবে তোমার গোষ্ঠী অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবে।নগরে এসো আমার সঙ্গে।সুস্থ জীবনধারণ ব্যতীত তোমার গোষ্ঠীর রমণীরা নগরের পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে,এই গোষ্ঠী আগামী দিনে বিলুপ্ত হবে না।বংশানুক্রমে জীবিত থাকবে তোমার গোষ্ঠীর বংশধররা।মাকে বোঝানোর সকল দায়িত্ব আমার।শুধু তুমি আমায় গ্রহণ করো।
-অধিক রাত পর্যন্ত এই দীঘির পাড়ে থাকা অনুচিত রাজা।অনেক হিংস্র তৃষ্ণার্ত জন্তু জলের সন্ধানে....

অতর্কিতে বৃক্ষপল্লবের মৃদু খসখসানি শব্দ অনুধাবন করে,কোমরবন্ধনী হতে উন্মুক্ত ছুরিকা হস্তে পশ্চাতে ফিরলো ত্রিযামা।কৌতূহলী নেত্রে ত্রিদিব দেখলেন,একজোড়া চপল মৃগ দম্পতি ওই দীঘির পাড়ে উপস্থিত হয়েছে।তবে ত্রিদিব ও ত্রিযামাকে দেখে,তারা অতিশয় ভীত।আপন সুতীক্ষ্ণ ছুরি বন্ধনীর মধ্যে রেখে ত্রিদিবের সঙ্গে অরণ্যের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন ত্রিযামা।ওই স্থান হতেই দেখলেন,জ্যোৎস্নালোকে দুটি ভীত প্রাণীর তৃষ্ণার জলগ্রহণের মনোরম দৃশ্য।অতঃপর ওই দম্পতি আশ্রয় নিলো তমসাবৃত অরণ্যে....

-চলুন!অধিক বিলম্ব অনুচিত রাজা।রাত্রিকালে এ মায়াকানন হিংস্র প্রাণীর অবাধ বিচরণক্ষেত্র।তাদের এই পৃথিবীতে আমরাই অতিথি।অসময়ে তাদের রাজ্যে অনধিকার প্রবেশের জন্য প্রাণ সংশয়....
-আমি এই স্থান পরিত্যাগ করবো না।তুমি রাজ্যে ফিরবে তো আমার সঙ্গে?আমার প্রাসাদে তুমি তোমার যোগ্য সম্মান....
-সম্ভব নয় রাজা!এই গোষ্ঠী আমার মুখাপেক্ষী।মা আমাকে অনেকখানি ভরসা করেন!তার নির্দেশ উপেক্ষা করে,আপন স্বার্থরক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠতে পারবো না।গোষ্ঠীর সকল সিদ্ধান্ত ডাকিনী মা নিয়ে থাকেন।আর আমি সামান্য এক যাযাবর কন্যা।কোনো রাজ্যের রাজকন্যা নই।আমি আপনার উপযুক্ত নই রাজা।কি পরিচয়ে আপনি আমাকে প্রাসাদে স্থান দেবেন?সকলের উপহাসের পাত্রী হয়ে দিন যাপন করা,আমার পক্ষে একপ্রকার অসম্ভব।আমি মায়াকাননকে বড় ভালোবাসি।
প্রতি মুহূর্তের বিদ্রুপ হতে,অনিরাপদ আশ্রয় অধিক সম্মানের।

বন্ধনী হতে তরবারি মুক্ত করলেন ত্রিদিবাচার্য।তীব্র আক্রোশে বললেন,

-মায়াকাননের অধীশ্বর আমি!আমি এই অরণ্য থেকে যদি তোমাদের বিতাড়িত....

তীব্র ধাতব শব্দে আপন ছুরির ফলায় সেই তরবারির আঘাতের প্রত্যাঘাতপূর্বক শীতল কণ্ঠে উত্তর দিলো ত্রিযামা,

-করতেই পারেন।সম্মানহানির কারণে পূর্ব রাজার রাজ্য পরিত্যাগ করেছি।প্রাণ,মান,সম্পত্তি,প্রিয়জন সকলই হারিয়ে এই অরণ্যে জীবিত থাকার তাগিদে প্রতিনিয়ত লড়াই করছি।তবে হেরে যায়নি এই গোষ্ঠীর কেউই।স্বল্পসংখ্যক হলেও আমরা জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।আপনার লোকবল প্রচুর,বুদ্ধিবল,অস্ত্রবলও।আপনি আমাদের নিমেষেই ধূলিসাৎ করতে পারেন রাজা।তবে এই অসম যুদ্ধশেষে,রণক্ষেত্রের প্রতিটা দেহই হবে নিষ্প্রাণ।মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই আমার সামান্য কয়েকজন সঙ্গীনি আপনার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করবে।এই গোষ্ঠীর কেউই আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না বলেই আমার স্থির বিশ্বাস।ত্রিযামার কাছে বিশ্বাসঘাতকতার একটিমাত্র শাস্তি,মৃত্যু!!মৃত্যু তো অবশ্যম্ভাবী!আপনার সৈন্যের অস্ত্রের আঘাতে,নতুবা আমার ছুরিকাঘাতে।তবে তারা আমার সহযোদ্ধা হয়ে শত্রুর সঙ্গে রণক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ,অধিকতর সম্মানের মনে করবে।তরবারির কারণে ভীত আমি নই।আমার গোষ্ঠীর কেউই নয়।

তরবারি নামিয়ে নিলেন ত্রিদিব।

-তোমার সাহস ও আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ আমি!তরবারি ত্যাগ করলাম।প্রণয় ভিক্ষা করছি ত্রিযামা।আমি বিপথগামী।দীর্ঘকাল যাবৎ সন্তানহীনতার জ্বালা,আমার পৌরুষের চরম লজ্জা!সেই লজ্জা হতে মুক্তি পেতে,নিজেকে সকল দুঃখ হতে বিস্মৃত করতে,আমি একাধিক নারীসঙ্গে আসক্ত হয়ে পড়ি।আমি এক লজ্জিত ক্ষত্রিয়,যে রাজধর্ম বিস্মৃত হয়।এভাবেই অত্যাচারী রাজার পরিচয়ে বেঁচে,অযথা ভীতিপ্রদান করে প্রজাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলাম।কয়েক বৎসর এমন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলস্বরূপ রাজকোষ প্রায় শূন্য।গুপ্তচর সূত্রে এমন সংবাদও আমি পেয়েছি,অবিলম্বেই রাজধানীতে শত্রুর আক্রমণের সম্ভবনা রয়েছে।কিন্তু আমি মনে স্থির রাখতে পারিনি।ব্যর্থ রাজা আমি।বর্তমানে রাজ্যের আমাকে প্রয়োজন ত্রিযামা।রাজসিংহাসনের আমাকে প্রয়োজন।আর আমার প্রয়োজন তোমার মত নির্ভীক,স্পষ্টবক্তা,সহযোদ্ধা এক নারীসঙ্গ।তোমার সন্ধানেই বুঝি আমি সংসার ছেড়েছি!তুমিই আমার ভবিতব্য!আমার পূর্ব রানিদের সঙ্গে,আমি সকল সংস্রব ত্যাগ করবো।তারা আমাকে নূন্যতম মানসিক সুখ দিতেও অক্ষম ত্রিযামা।তুমি আমার সঙ্গে চলো!তুমি আমাকে পরিপূর্ণ করো....

অতর্কিতে একাধিক খুরের শব্দে অরণ্যের স্বাভাবিক নৈঃশব্দ ভঙ্গ হলো।ডানা মেলে ত্রিদিব ও ত্রিযামার মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো কয়েকটি ভীত সন্ত্রস্ত বিহঙ্গ।

-অরণ্যের এতখানি গভীরে,এই রাত্রিকালে খুরের শব্দ?
-এ শব্দ,এই ছন্দ আমার অতি পরিচিত ত্রিযামা।এ আমারই সৈন্যদল!রাজ্য বিপদগ্রস্ত।তাই বুঝি আমার অন্বেষণ হেতু তাদের এই আগমন!
-আমার গোষ্ঠীও কি তবে বিপদের সম্মুখীন?আমাকে এই মুহুর্তেই....

উল্কিতে সজ্জিত ত্রিযামার বাহু আপন দেহ অভিমুখে টেনে গভীর কণ্ঠে ত্রিদিব বললেন,

-আমার জীবদ্দশায় আমি বা আমার সৈন্য দ্বারা তোমার গোষ্ঠীর কোনো ক্ষতিসাধন অসম্ভব!

অপলক দৃষ্টিতে ত্রিদিবের পানে চেয়ে রইলো ত্রিযামা।ওর হরিণীর মতো ভ্রু-যুগলের মাঝে একটি ক্ষুদ্র সর্পিল উল্কির ওপর আপন ওষ্ঠ ও অধর ছুঁইয়ে দিলো ত্রিদিব।কম্পিত ললনার উপাঙ্গ।গাত্রবর্ণ রক্তিম।ইতিপূর্বে এক কামুক পুরুষের অত্যাচারের সঙ্গে পরিচিত সে,তবে ত্রিদিবের স্পর্শে যথেষ্টই প্রেম বর্তমান।সন্ধিহান নারীমন পূর্বের নির্মম অত্যাচারের পর,পুরুষ জাতির ওপর নির্ভর করার দুঃসাহস অর্জনে অক্ষম।তদুপরি নৃপতি নিজমুখে আপন চরিত্রের অন্ধকার দিকের কথা বর্ণনা করেছেন।

-আমাকে ফিরতেই হবে ত্রিযামা।রাজধানীতে,রাজধর্ম পালনে।যুদ্ধ আসন্ন।সৈন্যদলের প্রস্তুতি ও যুদ্ধ পরিচালনা আবশ্যক।তবে আমার আত্ম অনুসন্ধান সম্পূর্ণ।আমি মতি স্থির করেছি।যুদ্ধ পরবর্তী জীবনে আমি জীবিত থাকলে,তোমার কাছেই ফিরবো।এই মায়াকাননে।সেদিন আমায় শূন্য হাতে,বিদগ্ধ হৃদয়ে ফিরতে হবে নাতো!
-আপনার কিছু হবে না রাজা!আপনি যুদ্ধে জয়লাভ করবেন।মায়াকানন হবে শত্রুমুক্ত।মহাভৈরবী আপনার সহায় হন।
-আমি কালভৈরবের উপাসক।তবে তোমার ইচ্ছেপূরণ করতে অদূর ভবিষ্যতে মহাভৈরবীর মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত হবে মোহরকুঞ্জে।অপচয় করার মতো সময় নেই ত্রিযামা!

বৃক্ষতলে রাজঘোটক বৈশ্বানর সৈন্যদলের দৃষ্টিগোচর হওয়ামাত্রই,শিঙায় ফুৎকারপূর্বক আপন রাজাকে আহ্বানের প্রচেষ্টায় মগ্ন হলেন সেনাপতি।একাধিক ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ও সৈন্যের কোলাহলে ভয়ে তটস্থ সমগ্র গোষ্ঠী।কয়েকজন যাযাবর রমণী তরবারি হাতে সৈন্যের সঙ্গে আলাপচারিতায় উদ্যত হলেন....

শিঙাধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশমাত্র আপন দুই হস্ত মুখের সম্মুখে এনে অদ্ভুত শব্দ দ্বারা সংকেত প্রেরণপূর্বক,আপন উপস্থিতি জানান দিলেন ত্রিদিবাচার্য।তারপরই ফিরলেন ত্রিযামার কাছে।

-ত্রিযামা?
-আমি আপনার রাজ্যের জন্য,আপনার জন্য মহাভৈরবীর কাছে করজোড়ে প্রার্থনা করবো।মা অবশ্য আপনার সহায় হবেন।শত্রুদের পরাস্ত করে আপন রাজ্যের ভবিষ্যৎ,স্বর্ণাক্ষরে লিখবেন আপনি।
-যুদ্ধ পরবর্তী শান্তি বা সন্ধির পরই,আমি ফিরবো তোমার কাছে।আগামী কৃষ্ণপক্ষের পূর্বেই।আগামী কৃষ্ণপক্ষে এই দীঘির জলের আরশিতে আমি ত্রিযামার রূপ অবলোকন করতে বদ্ধপরিকর।তুমি সেদিন আর ফেরাবে না আমায়!আমি আসবো।এক পক্ষকালের ভিতর।

ত্রিযামা আপন মনের ঘরের গোপন সংবাদ জানে না।আকুল হৃদয় কাতর দৃষ্টিতে খানিক প্রেমের আবেদন জানালো ত্রিদিবের উদ্দেশ্যে।দীর্ঘদেহী সেই পুরুষের দৃষ্টি ওই আবেদনে সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ সিক্ত করলো ত্রিযামার অধর।মৃদুমন্দ গতিতে শীতল সমীরণ প্রবাহিত হচ্ছে।কম্পিত ওষ্ঠে ত্রিযামা বললো,

-আপন রাজ্যের রাজার সঙ্গে এক অভিশপ্ত রাত্রি যাপনের পর,রাজ্যের সকলে আমাকে বারাঙ্গনার সম্মানে ভূষিত করেছে রাজা।ওই একটিমাত্র রাত্রির কারণে,আমি কোনো পুরুষের সহগামিনী হওয়ার সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত।রাজার কক্ষের অন্দরে একাধিক দ্বারপ্রহরীর সম্মুখে,সর্বসমক্ষে নগ্নিকা আমি।একটিমাত্র রাতে একাধিকবার একাধিক পুরুষের স্পর্শে পাপবিদ্ধা এই অবয়ব।আপনার মত মহান ক্ষত্রিয়কে উৎসর্গ করার মতো পবিত্র আমি নই।এ দেহ কলুষিত!আমি অপারগ।

পুনর্বার শিঙাধ্বনি কর্ণকুহরে প্রবেশমাত্রই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ত্রিদিব।গাঢ় কণ্ঠে ত্রিযামাকে জিজ্ঞেস করলেন,

-ত্রিযামা কি পূর্বেই কোনো পুরুষ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত?
-সে ছিল একজন।আমাদের গোষ্ঠীরই এক সুঠাম পুরুষ।আমাদের আসন্ন বিবাহ ছিল সর্বজনবিদিত।কিন্তু ওই রাতের পর সে ত্যাগ করে আমায়।আমরা প্রাণ ও মান বাঁচানোর তাগিদে রাজ্য হতে পলায়ন করি।কিন্তু সে বিশ্বাসঘাতক আপন চাটুকারিতায় হয়ে ওঠে,ওই রাজার বিশ্বস্ত।
-তোমায় প্রত্যাখ্যান করে মেরুদন্ডহীন সেই পুরুষ আপন পুরুষালি অহং চরিতার্থ করেছে মাত্র।নিজেকে মানুষ প্রমাণ করতে পারেনি।আমিও একাধিকবার বিবাহ সূত্রে একাধিক নারীর সঙ্গে সহবাস করেছি ত্রিযামা।সকল রানির মুখশ্রী আমার স্মরণেও নেই।সর্বোপরি,বিবাহ বন্ধন ব্যতীত আমি একাধিক নারীতে আসক্ত।কিন্তু আমার জন্য তোমার পূর্বরাজ্যে কোনো নির্দিষ্ট বিশেষণ পাওয়া যাবে না।সকলের দৃষ্টিতে,আমি এক মহান ক্ষত্রিয়।তবে এবার আমি মুক্তি চাই।আর তা তোমার মাধ্যমেই।সময় বড় কম।ফিরতে হবে আমায়....আমি আবার আসবো!

ডাকিনী মায়ের কাছে আতিথেয়তা রক্ষায় অক্ষম ত্রিদিব ক্ষমা চেয়ে,ত্রিযামার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে,বৈশ্বানরের পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করেন।লাগাম হাতে উল্কার বেগে রাজধানী অভিমুখে ধেয়ে যায় ত্রিদিব....

-তারপর?তারপর কি হলো?

উত্তেজিত সপ্তপর্ণীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মায়াকাননের দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নলিনীদেবী বললেন,

-দিন কাটে,রাত যায়।কিন্তু ত্রিদিবের আর কোনো খবর আসে না।
-উনি আর ফেরেননি?তবে কি যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন?

লোকমুখে শোনা রাজপরিবারের গল্পকথা,সভয়ে আউড়ে গেলেন নলিনীদেবী।

বিরহের প্রতিটি নিশিকাল একাকিনী কাটে ত্রিযামার।মায়ের অগোচরে আপন গোষ্ঠীর সীমানা পেরিয়ে রাজ্যের সংবাদ অন্বেষণের দুঃসাহসকে,মনে স্থান দিতে সাহস হয় না।কিন্তু অন্তরে ব্যাকুল হয়ে ওঠে নারীমন।ত্রিযামা উপলব্ধি করতে পারে,এই বিরহবেদনা বুঝি পূর্বরাগের লক্ষণ।এক পক্ষকালের নির্দিষ্ট সময়সীমা আসন্ন।আজ রাতই কৃষ্ণপক্ষের সেই রাত।কিন্তু সেই কান্তিময় পুরুষের সুশোভন মুখখানি দেখার সৌভাগ্য বুঝি,ত্রিযামার এ জীবনকালে আর হবে না।সমরবিজয়ী রাজাধিরাজ আপন অন্দরমহলে পূর্ব রানিদের সঙ্গে সুখশয্যায় বড়ই আনন্দিত।মায়াকাননের এই অভাগিনীর কথা বিস্মৃত হয়েছেন তিনি।দীঘির পাড়ে কৃষ্ণপক্ষের চোখজুড়ানো অপরূপ দৃশ্য অবলোকনপূর্বক,একজোড়া সারঙ্গ দম্পতির নিভৃত সঙ্গম উপভোগ করছিলো ত্রিযামা।হঠাৎই নিকষ কালো রাতের অন্ধকারময় নৈঃশব্দকে ছিন্ন করে অশ্বখুরের শব্দ ধেয়ে এলো।সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সেই মুহূর্তেই ত্রিযামা ওই শব্দের অভিমুখে চঞ্চল পদচারণা শুরু করে।অনতিদূরেই সে দেখে,ঘনঘোর অমানিশা ভেদ করে বৈশ্বানরের পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করে রাজা আসছেন।বনানী একটু অগভীর হতেই ঘোড়ার পৃষ্ঠদেশ হতে নেমে পড়েন ত্রিদিব।তমসাবৃত রাতেও আপন প্রেমাস্পদকে চিনে নিতে এতটুকু অসুবিধে হয়না ত্রিযামার।ত্রিদিবের বুকের ওপর আপনাকে বিসর্জন দিয়ে,অশ্রুজলে ভেসে যায় ত্রিযামার দুটি চক্ষু....

-ভেবেছিলাম সবই আমার অদৃষ্ট!ক্ষণিক সুখ।আপনাকে কোনোকালেই আর দেখতে পাবো না।কিন্তু আমার ললাটলিখনে যে আপনার সঙ্গে পুনর্মিলনও খোদাই করা ছিলো,এ আশাতীত।আপনি সত্যিই ফিরেছেন?!
-মন বলছিলো যে স্থানে তোমায় রেখে গিয়েছিলাম,সেই স্থানেই ফিরে পাবো।তাই সর্বাগ্রে এখানে এসেছি।মায়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়নি।
-যুদ্ধ?
-আমি জয়লাভ করেছি।রাজ্য বিপদমুক্ত।দুপক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সন্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে শর্তসাপেক্ষে মিলনচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।রাজধানীতে শান্তি বিরাজ করছে।এবার আমি তোমাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাবো।গ্রহণ করো আমায়!রাজ্যে ফিরেই আমি তোমায় বিবাহ....
-মা?
-সকলেই যাবেন।আমি তোমার সম্মতির অপেক্ষা করছি।

শান্ত দীঘির পানে চাইলো নিরুত্তর ত্রিযামা।আপন হৃদয়ের প্রেমমাধুরীর সহিত গোপন অভিলাষ মিশ্রিত উষ্ণতা,চুম্বনরূপে ত্রিদিব এঁকে দিলেন ত্রিযামার ওষ্ঠে।

-ত্রিযামা?

ময়ূরের কর্কশ কেকাধ্বনি রাতের নৈঃশব্দ ভঙ্গ করলো।অপরিচিত নিশাচর প্রাণীর আপন সঙ্গীকে আহ্বানের সুমধুর শব্দে প্রকৃতি মুখরিত।ত্রিদিবের ন্যায় অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়াকাননের প্রতিটি বৃক্ষতলের অজস্র দীপ্তিময় পতঙ্গ অপেক্ষা করছে,ত্রিযামার সম্মতির।ক্রন্দনরতা ত্রিযামা ত্রিদিবের কন্ঠলগ্না হয়ে আপন ওষ্ঠ দ্বারা স্পর্শ করলেন ত্রিদিবের অধর।দীঘির পাড়ে কৃষ্ণপক্ষের ওই অন্ধকার রাত্রিকালে,ত্রিযামার দেহপল্লবের প্রতিটি সোপান সফলভাবে উত্তরণ করলেন কর্দমাক্ত রাজাধিরাজ ত্রিদিবাচার্য।বৈশ্বানর বনানীর অন্ধকারময় স্থানের এক বৃক্ষতলে চক্ষু মুদে দাঁড়িয়ে রইলো।সঙ্গমরত শম্বর দম্পতি বহু পূর্বেই অদৃশ্য হয়েছে দুর্ভেদ্য অরণ্যের গভীরে।ত্রিযামার নগ্ন কোমল কটিদেশ ও পৃষ্ঠদেশ পাথুরে মৃত্তিকার ঘর্ষণে ছিন্নভিন্ন হতে লাগলো।সঙ্গিনীর করুণ আর্তনাদেও ত্রিদিব কর্ণপাত করলেন না।মানবীর দেহনিঃসৃত বন্য সৌরভে অবগাহন করলেন ত্রিদিব।ত্রিযামার নাতিদীর্ঘ কেশরাশির অগ্রভাগ দীঘির শীতল জলস্তর স্পর্শ করলো।সঙ্গমরত ওই নারী-পুরুষের ঈষদুষ্ণ কায়া স্পর্শপূর্বক,অরণ্য অভিমুখ হতে উন্মত্ত প্রভঞ্জন প্রবাহিত হতে লাগলো।সঙ্গমসুখে পরিশ্রান্ত প্রেমাস্পদ যখন পরস্পরকে অব্যাহতি দিলো প্রেমের উষ্ণতা হতে,ত্রিযামা আপন ঘর্মাক্ত গাত্র কিঞ্চিৎ শীতল করার অভিপ্রায়ে শান্ত দীঘির অতলে বিলীন হলো।অতঃপর সেই কৃষ্ণকায় জলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন ত্রিদিব নিজেও।দুই ক্লান্ত নরনারীর ভালোবাসা ও জলকেলির সাক্ষী রইলো মায়াকাননের সমগ্র প্রাণীজগৎ ও ঘনঘোর অমানিশা....

-তারপর ত্রিযামা মোহরকুঞ্জে এলেন?মা!?

লবণাক্ত জলে নলিনীদেবীর দুই চক্ষু ভরে উঠেছিলো।কম্পিত কণ্ঠে তিনি বললেন,

-হ্যাঁ!আর ওই মূর্খ ত্রিযামার হাত ধরেই দুঃস্বপ্নের মতো এলো মোহরকুঞ্জের সমাপ্তিকাল।
-ত্রিযামা মূর্খ!!অর্থাৎ?
-ত্রিযামার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ত্রিদিব,ডাকিনী মা সহ গোষ্ঠীর সকলকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদানপূর্বক আপন রাজ্যে আশ্রয় দেন।এক অতি সামান্য যাযাবর বন্য নারীকে রানিরূপে,রাজপরিবার উদারচিত্তে গ্রহণ করতে পারে না।পূর্বের সকল রানির চক্ষুশুল হয়ে দিনের সিংহভাগ মুহূর্ত যাপন করতো নববিবাহিতা ত্রিযামা।সকল উপহাসের যথাযোগ্য উত্তর প্রদানের পূর্বেই,বিধাতাপুরুষ আপন হস্তে রচনা করে ফেললেন মোহরকুঞ্জের দুর্ভাগ্যের মানচিত্র।প্রাসাদের আনাচে-কানাচে মৃদু গুঞ্জন,অন্তঃসত্ত্বা কনিষ্ঠা রানি ত্রিযামা।পূর্বের সকল রানির সমস্ত দর্প এই একটিমাত্র সংবাদেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলো।আনন্দে দিশেহারা হয়ে এতকাল পর একটি সুস্থ পুত্রসন্তান লাভের আশায় বুক বাঁধলেন ত্রিদিব।সিংহাসনের উত্তরাধিকারী,রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজার শুভাগমনের জন্য রাজ্যবাসী অপেক্ষা করতে লাগলো প্রতিনিয়ত।অতঃপর ত্রিযামার গর্ভযন্ত্রণাকালীন কালরাত্রি আগমনের মাধ্যমেই শুরু হলো মোহরকুঞ্জের অবশ্যম্ভাবী পতন।জন্ম হলো ভুবন আলো করা এক কন্যাসন্তানের।ত্রিদিব তার মুখদর্শন করলেন না।নাড়ি হতে সদ্য পৃথক করা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে মূর্খ ত্রিযামা এতকাল পর বুঝলেন,ত্রিদিবের সকল ভালোবাসা ভ্রান্ত,ছলনা মাত্র!আত্ম অনুসন্ধান নয়,রাজার স্বাদবদলের নবনবীন নারীশরীরের সন্ধান সম্পূর্ণ হয়েছিলো ত্রিযামাকে পেয়ে।যাকে প্রেমরূপে ভ্রম হয়েছিলো ত্রিযামার।ত্রিদিবের উপরি পাওনা ছিলো সন্তানলাভ।কিন্তু সেই সন্তান কন্যা হতেই,মুখ ফিরিয়েছেন ত্রিদিব।রাত্রি শেষের প্রভাতে আপন প্রথম সন্তানকে আর বুকের উষ্ণতায় ফিরে পায়নি ত্রিযামা।পরম বিশ্বস্ত দাসী হতে প্রাপ্ত সংবাদে ত্রিযামা পরবর্তীতে জানতে পেরেছিলো,সেই কন্যার ললাটলিখনে অঙ্কিত হয়েছিলো পর্ণশয্যা ও মৃত্তিকার অতলে চিরনিদ্রা।ওই সংবাদ শ্রবণমাত্রই জ্ঞান হারিয়েছিলেন ত্রিযামা।ধীরে ধীরে ত্রিদিবের কঠোর,নৃশংস ও নির্মম দিকের সঙ্গে ত্রিযামা পরিচয় লাভ করেছিলো।দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর প্রতিবাদী বিদ্রোহী ত্রিযামার স্থান হয়েছিলো মোহরকুঞ্জের কারাগৃহে।চরিত্রহীন কামুক রাজা পূর্বের ন্যায় একাধিক নারীসঙ্গে ব্যস্ত হলেও,বিশেষ কিছু সময় কারাগারে বন্দিনী ত্রিযামার সঙ্গে যাপন করতেন।উত্তরসূরী প্রাপ্তির আশায়,ত্রিযামাকে মুক্তি দেননি তিনি।দীর্ঘকাল যাবৎ শারীরিক অত্যাচার সয়ে
একে-একে সাতটি নিষ্পাপ কন্যাসন্তানকে জন্ম দেয় ত্রিযামা।কারাগারে ত্রিদিবের বলপূর্বক ধর্ষণের ফলে ত্রিযামা আপন গর্ভে অষ্টমবার সন্তান ধারণ করে।সপ্তম গর্ভের কন্যাসন্তানটি জন্ম দেওয়ার পর,তাকেও একই পন্থায় হত্যা করা হলে,কারাগার থেকে পলায়নের উপায় ভাবতে শুরু করে পাগলিনী ত্রিযামা।মুক্তির জন্য কাতর সে।অতঃপর অষ্টম গর্ভের সন্তান আপন উপস্থিতি জানান দিতেই,ওই ক্ষুদ্র একরত্তি প্রাণকে বাঁচাতে ত্রিযামা বদ্ধপরিকর হয়।প্রহরীর নিকট ডাকিনী মায়ের কাল্পনিক গল্পকথা,মিথ্যে স্বপ্নাদেশ ও অভিশাপের ভয় দেখিয়ে,ডাকিনী মাকে কারাগৃহে একটিবার আনতে সমর্থ হয় সে।অতঃপর দ্বিতীয়বার ত্রিযামার মঙ্গল কামনায় পুজোর ফুল ও প্রসাদের দোহাই দিয়ে পুনরায় কারাগৃহে প্রবেশ করেন ডাকিনী মা।প্রবেশকালে দুই প্রহরীকে আশীর্বাদপূর্বক প্রসাদ বিতরণ করলে,স্বল্পক্ষণের মধ্যেই বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় ওই দুই দ্বাররক্ষীর।পূর্ণ গর্ভবতী ত্রিযামাকে সঙ্গে নিয়ে যখন ডাকিনী মা কারাগার পরিত্যাগ করেন,তখন প্রকৃতি অকালে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে।রাজ্যের রাজার পাপের ঘড়া সেই ক্ষণে পরিপূর্ণ।এইসকল ঘটনাপ্রবাহ হতে বহুদূরে অবস্থিত ত্রিদিবাচার্য সেই মুহূর্তে আপন শয়নকক্ষে,মদিরা সহযোগে একাধিক নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত যাপনে অতিশয় ব্যস্ত...

-তারপর?কি ছিলো রানির গর্ভে?পুত্র?
-তারপর?!

অচিরেই ত্রিযামার সন্ধানে রাজার সৈন্যদল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।নগরের উপকন্ঠে ওই যাযাবর গোষ্ঠীর ক্ষুদ্র গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।বন্দী করা হয় গোষ্ঠীর সকল সদস্যকে।কিন্তু সন্ধান পাওয়া যায় না ত্রিযামার,এমনকি নিরুদ্দেশ বৃদ্ধা ডাকিনী মাও....

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে।ঘনঘন বিদ্যুতের ঝলকানি ও মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন।খরস্রোতা নদীর দুকূল প্লাবিত।সেই কালরাত্রিতে প্রকৃতির তীব্র রোষের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে সিক্ত ত্রিযামার গর্ভযন্ত্রণাও।তুমুল ঝড়-বাদলের মধ্যে চকিতেই আঁধার কাটিয়ে আলোকিত হয়ে উঠলো চতুর্দিকের পৃথিবী।রুদ্রদেব কৃপাদৃষ্টি দান করলেন অদূরেই একটি সুউচ্চ বৃক্ষের উপর।বিদ্যুৎপিষ্ট হয়ে ভেঙে পড়লো সেই সুবিশাল বনস্পতির একটি বৃহৎ শাখা।অজস্র অসহায় খেচর প্রজাতি হলো গৃহহারা।ত্রিযামার মস্তকের একেবারে সম্মুখেই ভেঙে পড়েছে ওই শাখা।মৃত্যুভয়ে ত্রিযামা অন্তিম ক্ষণে দুটি চক্ষু বন্ধ করে ফেলেছিলো।চক্ষুদ্বয় উন্মোচনের পরই পারিপার্শ্বিক দৃশ্য দেখে,সভয়ে চিৎকার করে উঠলো ত্রিযামা।অদূরেই বৃক্ষশাখার মধ্যে ডাকিনী মায়ের নিথর রক্তাক্ত দেহ পড়ে রয়েছে।পৃষ্ঠদেশের ওপর ওই বৃহৎ শাখা ভেঙে পড়ায়,মুহূর্তেই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন মা।শোকে কাতর হয়ে একাকিনী ত্রিযামা মায়াকাননের গভীরে শিউরে উঠলো ভয়ে।আপনার অশ্রু বিসর্জন দিয়ে নিঃশব্দে সহ্য করতে লাগলো গর্ভযন্ত্রণা।অত্যধিক কষ্টে আপনার মুখগহ্বর আপনি চেপে ধরলো।হিংস্র জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পেতে ও গর্ভের সন্তানকে রক্ষা করতে নৈঃশব্দের পথ বেছে নিলো ত্রিযামা।অদূরেই পুনরায় বিদ্যুতের ঝলকানি।প্রকৃতির রুদ্ররূপের সঙ্গে বেশিক্ষণ যুঝতে পারলো না সে।আপনার মুখ বন্ধ করলেও,প্রায় জ্ঞান হারানোর সময় উপস্থিত হলে ক্লান্ত ত্রিযামা শুনলো এক সদ্যোজাত শিশুর ক্রন্দনধ্বনি।আপন সন্তানকে বুকে তুলে নিলো ত্রিযামা।বিদ্যুতের আলোয় প্রকৃতির রুদ্ররূপের মাঝেই আপনার অষ্টম গর্ভের কন্যাকে প্রথমবার দেখলো মা।শিশুকন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ত্রিযামা বলে উঠলো,

-আমার রুদ্রাণী!মা আমার!

ক্রন্দনরতা শিশুর ক্ষুদ্র মুখগহ্বরে আপন স্তনবৃন্ত উজাড় করে দিয়ে,ডাকিনী মায়ের মৃতদেহের পানে চেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু বিসর্জন করলো ত্রিযামা।কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণের পরই ক্লান্ত রক্তাক্ত অবস্থায়,আপন সন্তানের জীবনরক্ষার্থে আপন পদযুগল চালনা করতে শুরু করলো সদ্যোজাতিকার মা।অন্তিমবারের মতো মোহরকুঞ্জের উদ্দেশ্যে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললো,

-নারীর অসম্মানের এই মূল্য তোমাকে আপন জীবন,আপন সিংহাসন,আপন রাজ্য দিয়ে পরিশোধ করতে হবে ত্রিদিবাচার্য!!তোমার পুরুষালী অহং,তোমার এই পিতৃতান্ত্রিক শাসনকাল অচিরেই এক নারীর কারণে ধ্বংস হবে!ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় অভিশপ্ত মোহরকুঞ্জের আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না....ইতিহাস তোমার নামের সঙ্গে,নারী অবমাননার নির্মম অধ্যায়কেই স্মরণে রাখবে চিরকাল! 

শিশু রুদ্রাণীকে বুকে জড়িয়ে,আপন শুষ্ক স্তনবৃন্ত তার মুখে রেখে,রক্তাক্ত দেহে নগ্নপদে বনানীর দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মোহরকুঞ্জের সীমানা অতিক্রম করেছিলো একাকিনী ত্রিযামা।ভালোবাসার ভ্রমে মুহূর্তের সামান্য দুর্বলতার মূল্য,আপন জীবন দিয়ে পরিশোধ করেছে ওই মূর্খ নারী....

রাজপরিবারের অতীত ইতিহাস সম্পূর্ণরূপে অবগত হওয়া মাত্রই,কম্পিত দেহে ডাকলো রাজকুমারী পর্ণা....

-মা?!কি বলছো তুমি?
-এ রাজ্যের অতীত বৃত্তান্ত।নারীর অসম্মান করে কোনো রথী-মহারথী,কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত মহাপুরুষও অব্যাহতি পায়নি পর্ণা।সেক্ষেত্রে এই ত্রিদিবাচার্য তো তুচ্ছ এক দুরাচারী ক্ষত্রিয় পুরুষ!তার পতন ছিলো অবশ্যম্ভাবী।এ ক্ষণে সমস্ত বিষয় অবগত হওয়ার পর,তুমি বুঝেছো আশা করি!এ কাহিনীর সঙ্গে তোমার যোগসূত্র ঠিক কোথায়!
-অষ্টম গর্ভের সন্তান আমি,জন্মকালে প্রকৃতির চরম রুদ্ররূপ,মা.....ত্রিযামা আর রুদ্রাণী?
-ওই রাতের পরই নিরুদ্দেশ হয় তারা।পরবর্তী কয়েক বৎসরকাল যাবৎ তাদের আর কোনরূপ সন্ধান মেলেনি।রাজরক্ত বইছে রুদ্রাণীর শিরা-উপশিরায়।দীর্ঘ অন্বেষণের পর সকল প্রচেষ্টায় অহেতুক বারিবর্ষণ উপলব্ধি করে,স্থগিতাদেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন ত্রিদিবাচার্য।অতঃপর শীঘ্রই মোহরকুঞ্জে নেমে আসে একের পর এক বিপর্যয়।হিমশৈল পর্বতে প্রাকৃতিক কারণে ধস নেমে মোহরকুঞ্জের প্রকৃত মানচিত্রই বদলে যায়।রাজ্যের উত্তরপ্রান্ত পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।অপরদিকে রাজধানীতে অজানা রোগের প্রকোপে শুরু হয় মৃত্যুমিছিল।মহামারীর ত্রাণকার্যে রাজার প্রায় সিংহভাগ রাজকোষ শূন্য হয়ে যায়।এই দুঃসংবাদ শত্রুরাজ্যে পৌঁছতে অধিক বিলম্ব হয় না।যুদ্ধ পরিচালনার মতো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে, মোহরকুঞ্জের রাজা এই ক্ষণে অপারগ।এই অপারগতার সুযোগ নিয়ে বহির্বিশ্বের কিছু শত্রুরাজ্য একজোট হয়ে আক্রমণ করে মোহরকুঞ্জে।কুটিল রাজনীতি,
কূটনীতি,ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের যোগ্য জবাবদিহি করতে না পারায়,রাজসিংহাসনচ্যুত হন মোহরকুঞ্জের অধীশ্বর ত্রিদিবাচার্য।রাজ্য হয় পরাধীন।অতঃপর শোনা যায়,দীর্ঘকাল রোগভোগের পর আপন রাজ্যের কারাগারের অন্ধকারে,প্রায় অনাহারেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন বৃদ্ধ নৃপতি।
-আর তারা?
-পরবর্তীতে রুদ্রাণী হয়ে উঠেছিলো একজন সেরা তীরন্দাজ।লক্ষ্যভেদে তাকে পরাজিত করা বড় সহজ ছিলো না।লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে,আপন কন্যাকে উপযুক্ত শিক্ষায় গড়ে তুলেছিলেন ত্রিযামা।শিক্ষায়,যুদ্ধবিদ্যায়,নৃত্যকলায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন রুদ্রাণী।দীর্ঘকাল যাবৎ আপন পিতৃ-পরিচয় জানতে চাওয়া কন্যাকে উপযুক্ত হওয়ার পর,মোহরকুঞ্জের পূর্ব বৃত্তান্ত বলেন ত্রিযামা।অতঃপর গল্পকথায় শোনা যায়,সুদীর্ঘ সময়কাল ব্যাপী রুদ্রাণী এক শক্তিশালী গোষ্ঠী গঠন করেন ও একাধিকবারের প্রচেষ্টায় আপন রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন।যুদ্ধজয়ের পর মোহরকুঞ্জের সিংহাসনে আধিপত্য বিস্তার করেন প্রথম মহারানি রুদ্রাণী।ধ্বংস করা হয় মোহরকুঞ্জের আরাধ্য পুরুষদেবতা কালভৈরবের প্রস্তরমূর্তি।দেবী মহাভৈরবীর করালমূর্তি স্থাপন করার মাধ্যমেই পিতৃতান্ত্রিক রাজ্যের পতন ও মাতৃতান্ত্রিক রাজ্যের শুভ সূচনা হয়।ত্রিযামা ও রুদ্রাণী সম্মিলিতভাবে এই রাজ্যের নব নামকরণ করেন মায়াকানন।ইতিহাসের পাতায় এক নব অধ্যায়,নবরূপে সংযোজিত হয়....রচিত হয় নতুন সংবিধান।
-এই খরস্রোতা নদী তবে...
-রুদ্রাণীর স্মৃতি বহন করছে।মৃত্যুকালে মহারানি রুদ্রাণী প্রলাপের ঘোরে বলেন,এই রাজ্যে দ্বিশত বৎসর ভবিষ্যতে,প্রায় অনুরূপ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।সপ্ত পুত্রের তেজরাশি আপন দেহে বহন করবে এক শিশুকন্যা।পর্ণশয্যা পরাজিত হবে তার সম্মুখে।সেই কন্যার নামকরণ করতে হবে সপ্তপর্ণী।একইরূপে প্রকৃতির রুদ্ররূপ জানান দেবে তার আগমনবার্তা।মহারানি পর্ণার সিংহাসনে আরোহণের পরবর্তী সময়ে,তার শাসনকালে মায়াকাননের মানচিত্রে আসবে সুবিশাল পরিবর্তন।তবে সেই কন্যার সুষ্ঠুভাবে জন্মানোর পথ প্রশস্ত করতে ও সিংহাসন লাভের সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর করতে,এ রাজপরিবারে কোনো পুরুষ সন্তানকে জন্মের পর অধিকসময় জীবিত রাখা হবে না।সকলের ভবিতব্যে থাকবে অভিশপ্ত পর্ণশয্যা।নতুবা সেই পুরুষই হবে মায়াকাননের ধ্বংসের কারণ।এ রাজ্যের সিংহাসন ভবিষ্যতে আর কোনোদিনই কোনো পুরুষের অধীনে যাবে না।এই বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সকল ক্রুরতম পথ অবলম্বন করতে হবে।

অশ্রুজলে ভেসে গেলো পর্ণার দুই চক্ষু।মায়াকাননের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা....

-আমি!কিভাবে মা?
-তোমার সকল প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে পর্ণা,তা এই ক্ষণে আমারও অজানা।আমি শুধু এই বিষয়ে অবগত,দুই শতাব্দীরও অধিক সময়কাল ধরে মায়াকানন তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে।তোমার সিদ্ধান্তের ওপরেই নির্ভর করবে মায়াকাননের ভবিষ্যৎ।আজ রাজমুকুট তোমার মস্তকে সমর্পণ না করার কারণ কি তুমি,কিছুমাত্র অনুধাবন করতে পারছো পর্ণা?
-আমি এখনও এ গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নই।
-যথার্থই।তুমি শুধুমাত্র রানি নও পর্ণা,তুমি এই মায়াকাননের পরিত্রাতা।সর্বাগ্রে নিজেকে প্রস্তুত করো।তোমার একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্ত রাজ্যের জন্য ক্ষতিকর।প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটছে।বৃষ্টি আসবে বুঝি!উন্মুক্ত স্থানে থাকা নিরাপদ নয়।ভিতরে এসো!
-সকল প্রশ্নের উত্তর তবে আমি?
-রাজ্যবিস্তার?সপ্তপর্ণী।পরিত্রাতা?সপ্তপর্ণী।সন্তানসম সকল প্রজার মা?সপ্তপর্ণী।বিপদকালে উদ্ধারকর্ত্রী?সপ্তপর্ণী....সকল প্রশ্নের উত্তর তুমিই পর্ণা।তাই তোমাকে শুধুমাত্র আত্মরক্ষা নয়,কঠিন সিদ্ধান্ত ও যুদ্ধবিগ্রহের সম্মুখীন হতে হবে।নিজেকে বজ্রকঠিন রূপে প্রস্তুত করতে হবে।তারপর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা।আমার আশীর্বাদ সর্বদা তোমার সঙ্গেই থাকবে পর্ণা।মহাভৈরবী তোমার সহায় হোন।মায়াকানন থাকুক শত্রুমুক্ত।

অবনত মস্তকে মাকে অভিবাদন জানালেন রাজকুমারী পর্ণা।নলিনীদেবী আপন কক্ষ অভিমুখে প্রস্থান করলে,তমসাবৃত নভোমন্ডল পানে দৃষ্টিপাত করলেন রাজকুমারী সপ্তপর্ণী।সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য উজ্জ্বল নিশাপতি।বৃষ্টি নামলো মায়াকাননের আকাশ ভেঙে।উন্মুক্ত আকাশের নীচে আপনাকে এলিয়ে দিয়ে,বৃষ্টির জলে আপন দেহপল্লব পর্ণা সিক্ত করলেন।আবছা দৃষ্টিতে অপলক চেয়ে রইলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন নিষিদ্ধ মায়াকাননের পানে।সকল প্রকার অভিশপ্ত ঘটনাপ্রবাহের সূত্রপাত ওই মায়াকাননের অন্দরমহলেই।দুর্ভেদ্য মায়াকাননের প্রতি এক তীব্র অদৃশ্য টান অনুভব করলেন পর্ণা।রাজপরিবারের দায়িত্ব ও কর্তব্য নামক স্বর্ণ-শৃঙ্খলে আবদ্ধ পর্ণা,উদ্বেলিত হৃদয়ে উপভোগ করতে লাগলেন বারিধারার শীতল স্পর্শ....তবে নারীহৃদয় হতে নির্গত দীর্ঘশ্বাস স্পর্শ করতে পারলো না ওই অরণ্যকে....

অদূরেই মায়াকাননের নীরব হাতছানি....

(চলবে)

ছবি : সংগৃহীত

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস প্রথম পর্ব ।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।। চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ এ...

পপুলার পোস্ট