অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

প্রথম পর্ব


।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।।

চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ একটানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে ভিডিও এডিট করতে হয়েছে। সন্ধের আগেই পিঠ কোমর জবাব দিয়েছে। চোখ ভেঙে এসেছে ঘুমে। আর বসে থাকতে পারছিল না। তারপরই অবন্তী আশ্রয় নিয়েছে বিছানায়।

মাথায় যেন পর্বত চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। সেই যে সন্ধের মুখে ও ঘুমিয়েছিল, ঘুম ভাঙল এখন। ক'টা বাজে? সময়ের কোনও ধারণা অবন্তীর নেই। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে রইল সে।

অবন্তী নিজেকে কথা দিয়েছে, যতরকম কাজ থাক, যত ব্যস্ততাই ওকে গ্রাস করুক, কোনওভাবে ভিডিও আপলোডের সময় এদিক-ওদিক হবে না। পরিশ্রমের প্রতি প্রকৃত অর্থে সৎ হলে, সাফল্য কখনও উঁকি মেরে টুকি ব'লে পালায় না।

অবন্তী বরাবরই একগুঁয়ে মেয়ে। যদিও জেদ করে আজ পর্যন্ত ও যা করেছে, তাতে ওর ভালোই হয়েছে। অবন্তী বোঝে, যে কোনও কাজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। মাঝে-মাঝে জীবনটা যে একঘেয়ে মনে হয় না, তা নয়।

হতাশা কিংবা আলসেমি চেপে ধরলে তখন আরও বেশি জেদ চেপে যায় অবন্তীর মনে। নিজেকে শাসন করে ও বলে, ভোঁতা লোহাও ক্রমাগত ঘষতে ঘষতে এক সময় ধারালো হয়ে ওঠে। তখন সেই অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন করা যায়। সাফল্যকে এফোঁড়-ওফোঁড় করা তো খুব ছোট ব্যাপার।

অবন্তীর কাজের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা ভীষণ রকম প্রয়োজনীয়। মনোরঞ্জনের আরও একশো এক রকম পথ আজকের মানুষের সামনে খোলা রয়েছে। মাত্র এক ক্লিকেই উধাও হয়ে যাবে দর্শক। মানুষকে টেনে বেঁধে রাখতে হবে স্ক্রিনের সঙ্গে। সর্বক্ষণ ঝাঁ চকচকে বিষয়বস্তু হয়ে মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠতে না পারলে ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ফোন বেজে উঠল মৃদুস্বরে। অবন্তীর আলগা ঘুমে যেন কোনওভাবেই ব্যাঘাত না ঘটে, সেই স্পর্শকাতর বিষয়ে যন্ত্রটাও যেন সচেতন। অবশেষে চোখ টেনে খুলল অবন্তী। মা ফোন করছে।

'উমম.... বলো।'
'এই ভর সন্ধেবেলা পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস? ঘরে কি একটু সন্ধেবাতিও দিতে নেই? বুঝি না বাপু তোদের কাজ-কারবার! সারাদিন চোখ ঘুমে ঢুলঢুল করবে, রাতে পেঁচার মতো জেগে বসে থাকবি।'
'কী বলবে বলো না...'
'হ্যাঁ বলছি বলছি। বেশি কথা বললে তো আবার আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হয়ে যায়! বলছি এবার জন্মদিনে বাড়ি আসবি তো? নাকি ওই ফ্ল্যাটেই একলা পড়ে থাকবি? বাবা জিজ্ঞাসা করছিল। তুই আসতে না পারলে এবার আমরা যাব।'
'পরশু রাতে আমার ট্রেন আছে মা।'
'ও মা! সে কী! আবার ট্রেন!! ক'দিন পরই জন্মদিন। বাপ-মা যে জন্ম দিয়েছে, সেটাও মনে রাখার প্রয়োজন নেই! ও গো শুনছ...'
'আরে মা! আবার শুরু করলে...'
'হ্যালো...'
'বাবা প্লিজ মাকে বোঝাও।'
'সে আমি তোর মাকে সামলে নেব। তা কোথায় যাচ্ছিস এবার?'
'এই জন্য আমি তোমাকে এত্ত ভালোবাসি বাবা। সে তো এখন বলব না। ওখান থেকে ছবি ভিডিও পাঠাব। তুমি গেস করবে।'
'প্রত্যেকবার তোর এই না ব'লে যাওয়াটা আমাদের খুব চিন্তায় ফেলে রে! হঠাৎ রাত নেই, দুপুর নেই.... ফোন করে বলিস, এখানে আছি। ওখানে আছি। বাড়িতে তো একটু বলে যেতে হয়! কোথায় যাচ্ছিস, ক'দিনের জন্য যাচ্ছিস...'
'উঁহু! প্রথম তিন সেকেন্ডে সব রিভিল করে দিলে শেষ পর্যন্ত ভিডিও কেউ দেখবে বাবা? জীবনে ওই থ্রিলটাই হল আসল। এরপর কী হবে? এরপর কী হবে? এটা কোথায়? এখানে যাওয়ার খরচ কেমন.... এসব জানার জন্য সবাই হাঁ করে বসে থাকবে। ভিউজ আমার, টাকা আমার। গাড়ি তোমার।'
'গাড়ি মানে?'
'মানে আমি সব মনে রেখেছি। যারা তোমাকে ন্যায্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিল, তাদের চোখের সামনে তোমাদের বাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। এখানে আমি মাথা গোঁজার মতো একটা ছোট ফ্ল্যাটও করেছি। আর ছ'টা মাস অপেক্ষা করো বাবা। আশা করছি দুটো ট্রিপ মারতে পারলে গাড়িটাও হয়ে যাবে। আমাদের প্রথম গাড়ি বাবা! তুমি শুধু মাকে একটু সামলে রাখো প্লিজ!'

বোধহয় বাবার কন্ঠ বুজে এসেছিল। তবুও অবন্তীর খুব ভালো লাগল। মায়ের সামনে ও কোনওদিনই নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। ওর যত গল্প বাবার সঙ্গে। সেই বাবা গল্প করতে করতে হঠাৎ চুপ করে গেল আজ। অবন্তী জানে, বেশি আনন্দে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আর দুঃখে পাথর...

বিছানা ছেড়ে অবন্তী বাথরুমে গেল। একলা থাকার মতো এক কামরার একটা পুঁচকি ফ্ল্যাট গত বছর অবন্তী কিনেছে। হাত বাড়ালেই সমস্ত কিছু এখন হাতের সামনে পাওয়া যায়। অবন্তীর এই ফ্ল্যাটে অভাব নেই, একাকীত্বও নেই।

নিজেকে পরিপাটি রাখতে অবন্তী বড় পছন্দ করে। ব্রাশ করতে করতে বাথরুমের আয়নার দিকে চেয়ে অবন্তী ভাবল, এমন বিলাসিতার জীবন সত্যিই ওর প্রাপ্য ছিল! মাত্র দু'বছরের মধ্যে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেল ও।

কলেজ ছেড়ে চলে আসার দুঃখটা এখন অবন্তীকে আর কাবু করতে পারে না। রাতারাতি এই গগনচুম্বী সাফল্য ওর সমস্ত দুঃখ ঘুচিয়ে দিয়েছে। অবন্তীর একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে সর্বক্ষণ সজাগ রয়েছে প্রায় আট লক্ষ অনুসরণকারী। ফোনটা হাতে তুলে নিলেই তারা নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে অদৃশ্য শক্তিকে সঙ্গী করে।

এই লোক দেখানো জীবন নিয়ে অবন্তী বেশ খুশি। ক্যামেরার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদেখা ভয় নিয়ে ওর বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ক্যামেরার সামনে ঝকঝকে হাসি আর বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা ওর একমাত্র মূলধন। ক্যামেরার বাইরের অদৃশ্য সন্ত্রাস সম্পর্কে কেউ না জানলেও তেমন ক্ষতি নেই। ডিজিটাল জনপ্রিয়তার অভিশাপ ওকে আজ পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি।

হলদে ফুলওলা সিঙ্কে কুলকুচি করে জল ছুঁড়ে দিল অবন্তী। দেখনদারির স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টগুলো থরে থরে সাজানো রয়েছে বাথরুমের একদিকে। ব্র্যান্ড প্রোমোশনের জন্য এসব জিনিস প্রায় প্রত্যেক মাসে ওর ঠিকানায় আসে। ক্যামেরার সামনে বাধ্য হয়ে কিছুক্ষণের জন্য এগুলো ব্যবহার করে প্রশংসার বন্যায় ভেসে যেতে হয়। তারপর জিনিসগুলো আবর্জনার মতো জমতে থাকে ঘরের এককোণে। সবই যে খারাপ তা নয়। কিছু জিনিস সত্যিই ভালো হয়। সেগুলো অবন্তী রেখে দেয় নিজের ব্যবহারের জন্য।

সময়বিশেষে অবন্তীরও দুঃখ হয়। এখনও ও 'না' বলতে শিখল না। বোল্ড ফটোশুট? আগেপিছে কিছু না ভেবে হ্যাঁ বলে দিল। ব্রাইডাল ফটোশুট? এককথায় হ্যাঁ। অকারণ কোল্যাব? হয়তো এতে অবন্তীর কোনও লাভ নেই। তবুও টাকার জন্য রাজি হয়ে যায় সে। অবন্তীর এখন একটাই পরিচয়, ও হল কন্টেন্ট। সেই অর্থে মানুষ নয়।

মানুষের কিছু অনুভূতি থাকে একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু অবন্তীর হাসি-কান্না, মনখারাপ, ব্যক্তিগত ভাবনা আবেগ সবই বিক্রি হয় খোলা প্ল্যাটফর্মে। বিনিময়ে ড্যাশবোর্ডে বিছিয়ে থাকে ঘন সবুজ গালিচা। হু-হু করে বৃদ্ধি পায় অনুসরণকারীর সংখ্যা।

অবন্তীর কাছে মানুষের পরিচয় মানুষ হিসেবে নয়। তারা কেবল একটা সংখ্যা, এনগেজমেন্ট, রিচ। দর্শকও সেই অর্থে নেটনাগরিক নয়। তারা আসলে অবন্তীর শিকার। অবন্তী গিলে খাচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়। জাগিয়ে দিচ্ছে তাদের লোভ। দর্শকের মনের গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসাপরায়ণতা, প্রতিযোগিতা.... সমস্তই জলের দামে দেদার বিকিয়ে যাচ্ছে। অবন্তীর খাতায় জমা হচ্ছে প্রচুর টাকা। কিন্তু ওর জন্য খরচ হয়ে যাচ্ছে আট লক্ষেরও বেশি মানুষ। অথচ তারা জানতেও পারছে না।

কে কাকে দেখছে? তারা অবন্তীকে দেখছে? না! হাসে অবন্তী। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। অবন্তী প্রতি মুহূর্তে ঈগলের দৃষ্টিতে দেখছে তাদের। মন্তব্য বিভাগ থেকে তাদের ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারে অবন্তী। তাদের রাগ, ঘৃণা, হতাশা, আক্ষেপ.... প্রবল হয়ে ওঠে রিপু। তার দমন অসম্ভব। মানুষকে খেপিয়ে তোলার যে ছলাকলা অবন্তী বিগত কয়েক বছরে রপ্ত করেছে, সেই মোহ থেকে একজন অনুসরণকারীরও নিষ্কৃতি নেই।

অবন্তী যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রাণবন্ত, সুহাসিনী এবং বাকপটু। পরিবেশিত বিষয়বস্তুর মধ্যে দুর্দান্ত উপাদান রয়েছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা চলে না। কিন্তু তার উপস্থাপনা অত্যন্ত ঝকঝকে। যদিও মনের ভিতরে সে একপ্রকার স্বীকৃতির তেষ্টায় আক্রান্ত। সেই সঙ্গে আজকাল জমা হয়েছে নিদারুণ ভয়। হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া কিংবা নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

অবন্তীর ফ্ল্যাটের দরজায় রাত নামল। শহরের আলো একে একে জ্বলছে। যেন অদৃশ্য কোনও হাত আকাশের গা হাতড়ে আলোর সুইচ টিপে দিচ্ছে। রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল অবন্তী। বাতাস যেন ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে। নীরবতার মধ্যে ভেসে আসছে অচেনা শব্দ। ঠিক শব্দও নয়, যেন ফিসফিস করে কেউ ডাকছে। অবন্তীর নাম ধরে...

এসবে অভ্যস্ত অবন্তী। রাতে একা থাকলে মনে হয় ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটা আসবাব এখনই কথা বলে উঠবে। প্রথমে একা থাকতে বেশ অসুবিধা হলেও এখন বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে। স্ক্রিনের নীলচে আলো অবন্তীর মুখে অদ্ভুত ছায়া ফেলে রেখেছে।

ভিডিওতে দ্রুতগতিতে কাটছাঁট চলছে। ফ্রেমের পর ফ্রেম, শব্দের পর শব্দ। রাতই অবন্তীর কাজের সময়। কীবোর্ডে আঙুল চলতে থাকে অবিরাম। কিন্তু মনে হয় যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে হঠাৎ যেন আর একটা ছায়া দুলে উঠে। চমকে তাকায় অবন্তী। কোথাও কিছু নেই।

ফ্ল্যাটের বাইরে অলৌকিক রাত নেমে এসেছে। বাতাসে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল অবন্তী। একটু ফাঁক পেলেই ওখান দিয়ে বেয়াদপ হাওয়া ঢুকে পড়ে। লিফটের দিক থেকে ধাতব শব্দ এল। ডিং! করিডোরের দেওয়ালে আলো-ছায়া কেঁপে ওঠে, যেন দেওয়ালগুলো শ্বাস নিচ্ছে।

কাজে একদম মন বসছে না। বিরক্ত লাগছে। হেডফোন খুলে ছুঁড়ে ফেলতেই নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে আসে। নিজের শ্বাসের শব্দও অবন্তীর কাছে ঘোর অচেনা লাগে। স্ক্রিনে পজ করে রাখা ভিডিওতে থমকে গেছে অবন্তীর মুখ। যেন রক্তশূন্য প্রাণহীন রুক্ষ একটা মুখ। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম স্থির।

অবন্তীর অস্বস্তি বাড়ল। ভিডিওর এফেক্টটা ও বদলে দিল। হ্যাঁ, এবার মানুষের মতো লাগছে। সেই মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে ভাবটা চলে গেছে। প্রত্যেকবার এই একই ফিল্টার ব্যবহার করে অবন্তী। তবে আজ নিজেকে দেখে এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?

ল্যাপটপের ওপর অবন্তীর হাত থেমে যায়। ও বেশ বুঝতে পারে, ওকে গিলে খাচ্ছে ভয়। নাঃ! অনেক কাজ হয়েছে। এবার সত্যিই একটা লম্বা ছুটি দরকার। উল্টোপাল্টা ভাবনারা মাথায় ভিড় করছে।

অবন্তী মনস্থির করে এই ছুটিতে ও কেবল বেড়াবে। ট্রাইপড আর ক্যামেরা নিয়ে বেশি কারসাজি করবে না। আরামদায়ক চেয়ারে বসে আড়মোড়া ভেঙে একবার বাঁই করে ঘুরে যায় অবন্তী।

ঘরের বাইরে নিশুতি রাত হাসে না, কাঁদেও না। শুধু ধীরে ধীরে অবন্তীর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।

।। ফিল্টারের আড়ালে ফাঁদ ।।

নাকের সামনে ম্যাগির বাটিটা নিয়ে বড় করে শ্বাস নিল অবন্তী। জিভে জল এসে গেল। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার ও সাধারণত খায় না। তবে আজ কাজে যখন একটু ঢিলেমি দেওয়া হয়েই গেল, তখন একদিন খাবারেও চিট করাই যায়।

একনাগাড়ে হাবিজাবি স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহারের ফলে অবন্তীর মুখের চামড়াটা বেশ রুক্ষ হয়ে গেছে। শুকনো খোসার মতো মৃত কোষগুলো উঠছে। মা থাকলে চিৎকার করে বলত, অবন্তী সাপের মতো খোলস ছেড়েছে। এখন কিছুদিন ব্র্যান্ড প্রোমোশনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।

চামড়ার ক্ষতি করে শুট করাই যেত, কিন্তু মানুষকে নিজের বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ দেওয়া যেত না। মিথ্যে ব্যাপারটা খানিকটা ফিল্টারের মতো। এমনিতে বেশ ভালো, কিন্তু প্রকৃত রূপটা ধরা পড়ার আগে পর্যন্তই।

মুখের চামড়াটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নিজের কন্টেন্ট বদলে নিয়েছিল অবন্তী। কিন্তু একই ফ্ল্যাটের হোম ট্যুর আর কতদিন মানুষ দেখবে? ঘরের প্রতিটি দরজা-জানালার পর্দা, এমনকি বালিশের কভার থেকে শুরু করে অবন্তীর মেঝের পাপোষের রঙ পর্যন্ত মানুষ জানে। ঘরের প্রত্যেকটা কোণ ছুঁয়ে গেছে যান্ত্রিক ক্যামেরার লেন্স।

অগত্যা অবন্তীর ক্যামেরা ঘুরে গেছে নিজের থালার দিকে। স্বাস্থ্যকর কন্টেন্টের জন্য সমস্ত দিন স্যালাড আর ডালিয়ার খিচুড়ি খাওয়ার পর রাতে একবাটি মশলাদার ম্যাগি যেন অমৃত মনে হচ্ছে। সুড়ুৎ করে খানিকটা ঝোল টেনে নিতেই সরাসরি নাকে উঠে গেল মশলাটা।

খ্যাক-খ্যাক করে কাশি শুরু হল। সেই সঙ্গে নাক জ্বালা করছে। জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সমস্ত ঘর ডুবে গেল অন্ধকারের অতলে। হঠাৎ স্থির হয়ে থাকা ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে চমকে উঠল অবন্তী।

গোটা ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তার মধ্যে স্ক্রিনে ফ্যাকাশে অবন্তী একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তার চোখে কেমন যেন আতঙ্ক বিস্ফারিত শীতল দৃষ্টি। ঘরের অন্ধকারে বিদ্যুতের অভাব স্পষ্ট।

অস্ফুটে একটা আওয়াজ বেরিয়ে গিয়েছিল অবন্তীর কন্ঠ চিরে। কাশির দমকে চোখে জল আসছে। দৃষ্টি ঝাপসা। অবন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। এখনও স্ক্রিন থেকে অবন্তী চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তবে চাউনিটা আগের মতো অস্বস্তিকর নয়।

এই প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে অবন্তী ভিডিও আপলোড করতে পারল না। ও স্পষ্টই বুঝতে পারল, বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না আর। ল্যাপটপ বন্ধ করে অবন্তী বিছানায় উঠল।

ম্যাগির বাটির একটা সাধারণ ছবি তুলে অবন্তী শান্তি পেল না। খাবারের সেই ছবির ওপরে একের পর এক ফিল্টার লাগিয়ে চলল। তারপর খুলল নিজের ইন্সটা। আইডির নাম আরবান কুইন অবন্তী, ঝকঝকে প্রাণোচ্ছল একজন মানুষের ছবি রয়েছে। শতরকম ফিল্টার পেরিয়ে একবাটি ম্যাগির ছবি স্টোরিতে ঝুলিয়ে সেই রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আরবান কুইন।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত।

রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সেই তো এলে ভালোবাসা দ্বিতীয় পর্ব


 



সেই তো এলে ভালোবাসা
সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব




মধ্যরাতের এমন কত শুভ্র অপ্রাপ্তি ভোরের আলোর সঙ্গে মিশে আলগোছে ভূমি স্পর্শ করে। যা মনকে যাতনা দেয়, তেমন অনুভূতিদের সযত্নে মনে ধরে রাখলে সংসার হয় না। সংসার করতে গেলে একজনকে নির্লজ্জ হতে হয়। যাবতীয় আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে বারংবার ভিক্ষুকের মতো হৃদয় পেতে দাঁড়াতে হয় প্রিয় মানুষের সামনে। দয়া ভিক্ষা করতে হয়। করুণাও ভিক্ষা করতে হয়। অরুণাক্ষর মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, গলা ছেড়ে কেঁদে চোখ লাল করে ফেলে। দারুণ অভিমানে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খায় সঞ্চারিণীকে। পান করে ওর দেহসুধা। তপ্ত দুপুরে ওর সঙ্গ কামনা করতে ইচ্ছে হয়।

পরমুহূর্তেই বিস্বাদ হয়ে ওঠে মন। কামনার রাতগুলোতে একাধিকভাবে সঞ্চারিণীর প্রত্যাখ্যানে নিজেকে কেমন নারীদেহলোলুপ কামুক পুরুষ মনে হয়। মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা জন্মায় নিজের প্রতি। আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছয়। সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে নিজেকে নষ্ট চরিত্রের পুরুষ ভাবতে দ্বিধা হয় না।

সঞ্চারিণীর রূঢ় আচরণ প্রতি মুহূর্তে অরুণাক্ষকে মনে করিয়ে দেয়, সে প্রতারক। এ জগতে যা কিছু সঞ্চারিণীর প্রাপ্য ছিল, কথা দিয়েও সেসব কিছুই অরুণাক্ষ দিতে পারেনি। তার মতো দরিদ্র মানুষ ইহলোকে থাকার অর্থ কেবল পৃথিবীর ভার বৃদ্ধি। এর বেশি কিছু না।

কোনও এক রাতের তুমুল বাকবিতণ্ডার পর অরুণাক্ষ আকুল হয়ে থাকে নতুন সকালের আশায়। সঞ্চারিণী যদি সামান্য অনুতপ্ত হয়, তবে অরুণাক্ষর মনের গোপন ক্ষত সহজেই উপশম হতে পারে। কিন্তু সঞ্চারিণীর দৃষ্টিতে অনুতাপের দেখা মেলে না। সেখানে নীরব ক্ষোভ ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই।

সম্পর্ক যখন প্রতিনিয়ত বিষধর সাপের মতো দংশন করে, তখন বিষক্রিয়ায় নীল হয় মন। ব্যথাতুর হৃদয় আশ্রয় চায়। ভরসা চায়। কিন্তু সঞ্চারিণীর গগনচুম্বী আকাঙ্খার কাছে প্রত্যেকবারই পরাজিত হয়ে মুখ লুকিয়ে পালিয়ে আসে অরুণাক্ষর যাবতীয় প্রার্থনা। অকর্মণ্য নামক বিশেষণে জর্জরিত হয় অরুণাক্ষ। পুরুষের একমাত্র নীরব ঘাতক অর্থনৈতিক অক্ষমতা। সেই ঘাতক দিন-রাত কুরে কুরে খায় অরুণাক্ষকে।

পাশের ঘরে ছাত্র পড়াচ্ছিল সঞ্চারিণী। এই সময় মিলি-মেহুও বইপত্র নিয়ে মায়ের কাছে পড়তে বসে। অতীতের মেধাবী সঞ্চারিণী আজ বড় কঠিন শিক্ষিকা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ডিগ্রি সঞ্চারিণীকে কেবল উচ্চশিক্ষা দেয়নি, সেই সঙ্গে খানিক দম্ভের প্রলেপ লেপে দিয়েছে তার শ্বেতপাথরের মতো মসৃণ গালে। কিন্তু বিয়ের আগে সেই দম্ভ প্রকাশ্যে আসেনি। তখন সঞ্চারিণীর ব্যবহারে কেবল নিখাদ প্রেমেরই প্রকাশ ছিল। নিজের চেয়ে অধিক শিক্ষিতা এবং সুন্দরী সঞ্চারিণী যখন অরুণাক্ষর বিয়ের প্রস্তাবে এককথায় রাজি হয়েছিল, তখন অরুণাক্ষ ভেবেছিল, এ গভীর প্রেম এবং মনের টান ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়। সেই ঘোর কেটেছে বহু পরে।

সঞ্চারিণী যখন রান্নাঘরে প্রবেশ করল, বাসনের ঝনঝনানিতে অরুণাক্ষ চমকে উঠল। বোতল ভরতে গিয়ে খানিক জল চলকে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু অন্যদিনের মতো সঞ্চারিণী রাগতস্বরে কথা শোনাল না। অরুণাক্ষ বুঝল, গতকাল ওর দিদির কানপাশার উজ্জ্বলতার কাছে ম্লান হয়েছে সঞ্চারিণীর যাবতীয় সান্ধ্যসুখ। অমন একজোড়া কানপাশা দিয়ে কান সাজাতে না পারলে নারীজন্ম অর্থহীন। এই লজ্জায় অরুণাক্ষর দু'কান কাটা যাওয়াই কাম্য। গুণবান স্বামীর যাবতীয় ঐশ্বর্য প্রকাশ পায় স্ত্রীর সাজসজ্জায়। আর এ বিষয়ে অরুণাক্ষ এক দারুণ দৈন্যতার পরিচায়ক। মুঠোফোন বের করে সেইদিনের সোনার বাজারদরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল অরুণাক্ষ। এতে স্বর্ণব্যবসায়ীর লাভ-লোকসান বিশেষ হল না। কেবল পুরুষ হৃদয়ের অক্ষমতা এবং দীর্ঘশ্বাস পরষ্পরকে গাঢ়ভাবে আলিঙ্গন করল।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বাইকের দিকে চেয়েছিল অরুণাক্ষ। বাইকটা বিক্রি করে দিলে ওর অনেক অসুবিধা হবে। এই মুহূর্তে স্কুলবাসের জন্য অতিরিক্ত খরচ ওর কাছে বিলাসিতার সমান। অফিস যাওয়ার পথে এই বাইকে চাপিয়েই মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়। ভিড় বাসে চেপে স্কুলে যেতে ওদের ভারি কষ্ট হবে। আর কোনও পথ খুঁজে পায় না অরুণাক্ষ। অস্থির লাগে ভীষণ। দৃষ্টি ঝাপসা হয়। একটা চেনা মুখ ক্রমে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। না না! এসব স্বপ্ন। রাজু এখানে কোথা থেকে আসবে? অসহায়তার মুহূর্তে অরুণাক্ষ নিশ্চয়ই অবচেতন মনে বাড়ির ছাদে পৌঁছে গিয়েছিল! তাই রাজুর দেখা পেল।

"দাদা, কেমন আছিস?"

স্বপ্ন নয়। মনের ভুল নয়। সত্যিই একমাত্র বোন রাজন্যা দেখা করতে এসেছে অরুণাক্ষর সঙ্গে। দাঁড়িয়ে আছে ওর একেবারে সামনে। রাজন্যার সঙ্গী একজন সুদর্শন পুরুষ।

"রাজু তুই!"
"তোর সঙ্গে কথা আছে দাদা।"
"মায়ের শরীর কেমন আছে?"
"ঠিক আছে। মা আমাকে তোর কাছে পাঠাল।"
"আমার কাছে! কী ব্যাপার?"
"ওর নাম প্রত্যূষ। দু'মাস পর আমরা বিয়ে করছি। তোর হাতে আধঘন্টা সময় হবে দাদা? কিছু কথা ছিল।"

অরুণাক্ষর ফোন পেয়ে ঘরের মধ্যে আনন্দে ফেটে পড়ল সঞ্চারিণী। ফোন কানে ধরে মহা উল্লাসে সঞ্চারিণী বলল, "দিদি.... রাজু এসেছে ওর সঙ্গে দেখা করতে। আমার শাশুড়ি বলে পাঠিয়েছে, বাড়ির একমাত্র ছেলেকে ছাড়া বাড়িতে শুভকাজ হয় না। আমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে বলেছে। শাশুড়ি আমার সঙ্গে আজ ফোনে কথা বলবে। ও এখন রাজু আর ওর বরকে সঙ্গে নিয়ে এ বাড়িতে আসছে। এতদিন ঐ মেয়ে একা ব্যবসার সব টাকা লুটেপুটে খাচ্ছিল। এবার আমি ঢুকব ওখানে। ওর বিয়ে হলে গেলেই সব আমার একার হবে। আমার কপাল খুলে গেল রে দিদি! আমার সুখের দিন এলো! এবারও যদি ও মানুষ বাগড়া দেয়, বাড়ি যেতে না চায়.... তুই দেখিস ওর কী অবস্থা আমি করি..."

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

সেই তো এলে ভালোবাসা প্রথম পর্ব




সেই তো এলে ভালোবাসা
সাথী দাস
প্রথম পর্ব


 


দু'কামরার ছোট ফ্ল্যাটের প্ৰতিটি কোণে অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা। জানালা-দরজায় রং-বেরংয়ের বেলুন ঝুলছে। এই ফ্ল্যাট অরুণাক্ষর নিজস্ব নয়। সে কেবল ভাড়াটে। কয়েক বছর আগে সৌভাগ্যক্রমে এক প্রবাসী বন্ধুর ফ্ল্যাট নামমাত্র ভাড়ার বিনিময়ে অরুণাক্ষ পেয়েছিল। ঠিকানা নিজের নয়, তবুও তাকে আপন করে তোলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় অরুণাক্ষর বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ভূমিষ্ঠ হওয়া দুটি কন্যাসন্তানের আজ জন্মদিন। স্ত্রী সঞ্চারিণী ছাড়া অরুণাক্ষর জীবনের অর্থ মৃত্তিকা ও মিহিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সৌভাগ্যের সন্ধানে একনাগাড়ে ছুটে চলেছে অরুণাক্ষ। আর্থিকভাবে খানিক সচ্ছল হতেও কেটে গেছে কয়েক বছর। তবু এখনও মাসের শেষে চিন্তার বক্ররেখা ওর কপালের শোভাবর্ধন করে। দীর্ঘকালীন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে অরুণাক্ষর মনে হয়, ভাগ্যদেবীকে প্রসন্ন করা এত সহজ নয়। পরমুহূর্তেই মৃত্তিকা আর মিহিকা নামক দুই চালিকাশক্তির হাসিমুখের ছবি ভেসে ওঠে ওর মনে। ওদের সঙ্গে যোগদান করে ভালোবাসার প্রতিমূর্তি সঞ্চারিণী। তখন অরুণাক্ষর সকল আক্ষেপ দূর হয়ে যায়। তবে গভীর রাতে স্ত্রী-কন্যা ঘুমিয়ে পড়লে অরুণাক্ষ একাকী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পরিবারের থেকে দূরে বসবাস করার কষ্ট ওর মনে সামান্য। শূন্য থেকে শুরু করার যন্ত্রণাও তেমন জোরালোভাবে নেই। নির্বাসন সেই অর্থে বেদনার নয়। কেবল যদি সেদিন মায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসা যেত.... অন্তত দূর থেকে মায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যটুকু পালন করার অধিকারও যদি পাওয়া যেত...

এই স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে অরুণাক্ষর মনে খেদ নেই। নিজেদের বৃহৎ পারিবারিক ব্যবসা, মা-বোন সকলের থেকেই দূরত্ব বজায় রেখেছে সে। শহর একই হলেও তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব অনতিক্রম্য। আক্ষরিক অর্থে খাতায়-কলমে ত্যাজ্যপুত্র না হলেও, অরুণাক্ষ জানে সঞ্চারিণীকে জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করার অপরাধে নিজের বাড়িতে কোনোদিন ওর ঠাঁই হবে না। তবুও মনের গোপন কোণে মাঝে মধ্যে ভেসে ওঠে বাড়ির ছাদের ছবি। নাকে ভেসে আসে পেট্রোলের গন্ধ। ভাই-বোনের খুনসুটি বাতাসে ভেসে অরুণাক্ষর কান ছুঁয়ে যায়। ভাতৃদ্বিতীয়া নিজস্ব গতিতে আসে, আবার ফিরেও যায়। ঐ একটি দিনে অরুণাক্ষর বড় কষ্ট হয়। কোমল স্পর্শের অভাবে রুক্ষ কপাল চড়চড় করে। শাড়ির দোকানের দিকে চেয়ে রাস্তার ওপরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অরুণাক্ষ ফিরে আসে। একমাত্র বোন রাজন্যার কথা মনে পড়ে।

রংয়ের ডিলারশিপ নিয়ে একটি দোকানের ওপর ভরসা রেখে প্রাথমিকভাবে ব্যবসা শুরু করেছিলেন অরুণাক্ষর ঠাকুর্দা। ভাগ্যদেবী অত্যধিক সুপ্রসন্ন হওয়ায় অরুণাক্ষর বাবার মাধ্যমে সেই ব্যবসার পরিধি বিগত চল্লিশ বছরে আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। ক্রমে স্থানীয় বাজারে রংয়ের দোকান ছাড়াও একটি পেট্রোল পাম্প, একটি উপহার সামগ্রীর দোকান ও বাজার থেকে অদূরবর্তী স্থানে কয়েকটি গোডাউন ভাড়া দেওয়া আছে। তবে সে সকল পিছুটান ছেড়ে বর্তমানে একটি ইলেক্ট্রনিক্সের শোরুমে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতনের বিনিময়ে অরুণাক্ষ শ্রম প্রদান করে। সঞ্চারিণী একাধিকবার শ্বশুরবাড়ি ফিরতে চাইলেও অরুণাক্ষ মাথা নামিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। দূরে সরিয়ে রেখেছে নিজেকে।

মানে-অভিমানে, আদরে-সোহাগে সঞ্চারিণীর সঙ্গে অরুণাক্ষ বড় সুখী ছিল। এই সুখকে চিরস্থায়ী করতে নিজের পরিবার বৃদ্ধির কথা ভেবে দুটি মানুষ কামনার সমুদ্রে একান্তে ভাসিয়েছিল প্রেমের তরী। কিছুদিনের মধ্যে তারা জানতে পারে, নতুন অতিথিরা জোড়ে আসছে। একের অপেক্ষায় দ্বিগুণ প্রাপ্তিতে স্বভাবতই মানুষের মন প্রসন্ন হয়। কিন্তু অরুণাক্ষর চিন্তা বেড়েছিল। সীমিত উপার্জনে এতবড় পরিবার প্রতিপালনের ভয় চেপে বসেছিল ওর মনে। কিন্তু প্রথমবার দুটি শিশুকন্যার মুখ দেখে দারুণ মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিল সে। এমন মায়ার টান প্রত্যেক জন্মদাতা মাত্রই বোঝে। সেদিন থেকে কোনোপ্রকার দুশ্চিন্তাকে মনে আশ্রয় দেয়নি অরুণাক্ষ। প্রাধান্য দিয়েছে কেবল কঠিন পরিশ্রম আর নিজের কর্মক্ষমতাকে।

এত বছর পরেও প্রতি মুহূর্তে একটা অপরাধবোধ অরুণাক্ষ নিজের মনের ভিতরে বয়ে বেড়ায়। মৃত্তিকা-মিহিকাকে জন্ম দেওয়ার সময় শারীরিক জটিলতার কারণে সঞ্চারিণী প্রায় মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে যায়। মৃত্তিকার ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অসুস্থতার কারণে অরুণাক্ষ তখন দিশেহারা। তিনজন মানুষকে সুস্থভাবে বাড়ি ফেরাতে অরুণাক্ষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেই আর্থিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। ছাত্র পড়ানোর মাধ্যমে সংসারের হাল ধরেছে সঞ্চারিণীও। তবে এর মাঝে বয়ে গেছে কিছু মধুর সময়। দারুণ আর্থিক অনটনের কারণে মৃত্তিকা-মিহিকার প্রথম অন্ন গ্রহণের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়নি আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে। উদযাপন করা হয়নি পাঁচ বছরের জন্মদিন। অবশেষে সংসারের টালমাটাল অবস্থা সামলে কন্যাদ্বয়ের আট বছরের জন্মদিন মহাসমারোহে পালিত হতে চলেছে। সেই আনন্দে পূর্বদিন রাত থেকে মুখরিত ছোট্ট ফ্ল্যাটের দুটি কামরা।

হই-হই করে কেটে গেল সমস্ত সন্ধ্যা। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই উৎসব সম্পর্কিত যাবতীয় আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে ফিরে গেল। অরুণাক্ষর মন তখন কানায়-কানায় পরিপূর্ণ। নতুন জামা জুতো পরে কেক কাটার সময় মৃত্তিকা আর মিহিকার আনন্দ উপচে পড়া দৃষ্টি দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য অরুণাক্ষর দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছিল। দুই মেয়ের মাঝে শুয়ে আদর করে ওদের ঘুম পাড়াতে চাইল অরুণাক্ষ। অরুণাক্ষর আদরের ভাগ নিয়ে মৃত্তিকা আর মিহিকার মধ্যে সবসময় এক অদৃশ্য ঠান্ডা লড়াই চলে। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মিহিকা বলল, "বাবি, তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো তো?"
"না, বাবি আমাকেই বেশি ভালোবাসে। তাই না বাবি?"

দুই মেয়েকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে অরুণাক্ষ বলল, "আমি তোদের দু'জনকেই সমান ভালোবাসি। হ্যাঁ রে, সারা সন্ধ্যা হুড়োহুড়ি করেও তোদের চোখে ঘুম নেই?"
"বাবি আমরা গিফটগুলো কখন দেখব?"
"আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল আমি শোরুম থেকে ফিরে সবাই মিলে একসঙ্গে দেখব। এখন তোরা ঘুমিয়ে পড়। কাল স্কুল আছে। রাত জেগে পটর পটর করছিস, সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইবি না। তখন তোদের মা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। একদম চোখ বন্ধ। আর একটাও কথা নয়।"
"গুড নাইট বাবি!"
"তোমরা দু'জন আর একদম ঝগড়া করবে না। আমি যেন কথার আওয়াজ না পাই। গুড নাইট।"

মেয়েদের ঘরের আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে ফিরল অরুণাক্ষ। ব্যস্ত হাতে ঘরের কাজ শেষ করছে সঞ্চারিণী। বিছানার চাদর বদলে ফেলল নিমেষে। সমস্ত সন্ধ্যায় দেহে জড়িয়ে থাকা প্রিয় শাড়িটা ভাঁজ করে ঝুলিয়ে দিল ঘরের দড়িতে। সঞ্চারিণীর মুখ বেশ থমথমে। ঘরের মধ্যে চাপা অস্বস্তি। অন্তত আজকের দিনে এটা অরুণাক্ষ আশা করেনি। অতর্কিতে সঞ্চারিণীকে জড়িয়ে ধরে অরুণাক্ষ বলল, "মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। তোমার অর্ধেক কাজ কমিয়ে দিলাম।"
"ঠিক আছে ছাড়ো। কাজ করছি।"
"কী হয়েছে সঞ্চারী?"
"দিদির কানপাশাটা দেখেছ? এই বছর দিদির জন্মদিনে দাদাভাই ওটা গিফট করেছে। আর আমি? সারা বছর যেটা কানে পরে থাকি, আজকের দিনেও সেটাই পরতে হল। নেহাৎ নিজে টিউশনি করে দু'পয়সা রোজগার করি, তাই একটা দামি শাড়ি পরতে পারলাম। নইলে সারা বছর যেমন শাড়ি পরি, আজও তেমন পরতে হত। মিলি-মেহুর বন্ধুদের মায়েদের সাজ দেখেছ? আমার এত লজ্জা করছিল ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে! তোমাকে পার্টি করতে বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। ভেবেছিলাম আমাকেও একটা ভালো শাড়ি বা একটা দামি গয়না অন্তত কিনে দেবে। সেগুলো পরে সবার সামনে ঘুরে বেড়াতে পারব। সমাজের পাঁচজনের সঙ্গে মিশতে গেলে পাঁচজনের সঙ্গে চলার মতো জিনিস লাগে।
-আমাকে আর একটা বছর সময় দাও সঞ্চারী। আমিও তোমাকে তোমার দিদির চেয়েও ভালো সোনার দুল কিনে দেব। মেয়েদের নতুন স্কুলে এডমিশন, সেশন ফিজ সব মিলিয়ে একটু...
-তুমি কোনোদিনই আমাকে কিছু দিতে পারবে না। সংসারের খরচ তো কমবে না, দিন-দিন বাড়বে। তুমিও আজীবন একই কথা শুনিয়ে যাবে। কী পেলাম আমি এতবড় বাড়ির বউ হয়ে? শখের বয়সে যদি শখ পূরণ করতে না-ই পারি, শেষ বয়সে টাকার বিছানায় শুয়ে কী করব? প্লিজ আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও। তোমার কথা শুনতে আমার একদম ভালো লাগছে না। বাইরে বেরোও। আমি ঘর ঝাঁট দেব। সকালে রেখা এসে এত কাজ করবে না। ঝড়ের বেগে ঘর মুছে বেরিয়ে যাবে। কী হল বেরোও!

ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দাটা অরুণাক্ষর একাকীত্বের সঙ্গী। ওখানে দাঁড়িয়ে কেটে গেল দীর্ঘ সময়। মৃত্তিকা-মিহিকা ঘুমিয়ে পড়ল। ঘর পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে অরুণাক্ষকে কেউ ডাক দিল না। অরুণাক্ষও সে রাতে ঘরে ফিরল না। ছেলে হিসেবে, দাদা হিসেবে অরুণাক্ষ ব্যর্থ। আজ স্বামী হিসেবেও ব্যর্থ হল বুঝি! এক জীবনে কি এত ব্যর্থতার ভার বহন করা সহজ? না বোধহয়...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

ফ্রেমের বাইরে কেউ অন্তিম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস অন্তিম  পর্ব                                                           ।। স্ক্রিনে যে মুখ ফিরে আসে না।।  অবন্তী...

পপুলার পোস্ট