ফ্রেমের বাইরে কেউ
সাথী দাস
সপ্তম পর্ব
।। শেষ রেকর্ডিংয়ের পর ।।
অবন্তীর সকাল-সন্ধ্যার হিসেব নেই। নিজের আশেপাশে অশরীরীর উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়েছে অবন্তী। তবে কনকনে ঠান্ডাটা সহ্য করা যাচ্ছে না। হঠাৎ দরজা খুলে গেল। লোহার ছিটকিনি আর শিকলের শব্দ কানে যেতেই অবন্তী সোজা হয়ে বসল। খিদেয় শরীর অবশ হয়ে এসেছে। খাবারের গন্ধ নাকে আসতেই অবন্তীর বমি পেয়ে গেল। তবে কারণটা খাবার নয়, আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো আঁশটে গন্ধের প্রভাবে গা ক্রমাগত গুলিয়ে উঠছে।
লোকটার হাতে একটা আলো রয়েছে। কিন্তু সেই আলোয় অন্ধকার দূর হয়নি। বরং আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পরম মমতায় থালাটা মেঝেতে নামিয়ে রাখতেই অবন্তী চিৎকার করে উঠল ভয়ে.... " কে আপনি? আমাকে কেন এখানে এনেছেন?"
লোকটার পরনে কেমন যেন আলখাল্লা পোশাক। প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত নেমে এসেছে। কেবল টাকা লোকটার উদ্দেশ্য নয়, হতেই পারে না। ওকে এখানে আটকে টাকার জন্য বাড়িতে ফোন করলে সে কিছুতেই নিজের মুখ অবন্তীর সামনে মেলে ধরত না। আলোর দুলুনিতে অবন্তী দেখল লোকটার ডান দিকের গালে একটা গভীর কাটা দাগ আছে।
-আমায় কেন এখানে এনেছেন? টাকা চাই? কত টাকা?
লোকটা ধীরে ধীর অবন্তীর কাছে এগিয়ে এল। ঝাপসা আলোর অবন্তী স্পষ্ট দেখতে পেল, একটা ছায়ামূর্তি লোকটার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। একটা বাচ্চা মেয়ে। একটু যেন খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ঠিক হেঁটে নয়, খানিকটা যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সে। ঠান্ডার প্রকোপ আরও বাড়ল। লোকটা নিজের ময়লা রুক্ষ হাতটা তুলে অবন্তীর গালে হাত রাখতেই ও একদম গুটিয়ে সেঁটে গেল দেওয়ালের সঙ্গে। লোকটা অদ্ভুত কর্কশ কণ্ঠে বলল, "তোকে দেখতে কী সুন্দর হয়েছে মা!"
লোকটার ফ্যাসফ্যাসে গলায় মায়া যথেষ্ট আছে, কিন্তু সেই মায়ায় বিগলিত হওয়ার মতো মনের অবস্থা অবন্তীর নেই। লোকটার মাথার পিছনদিকে জ্বলজ্বল করছে দুটো জোনাকি। অবন্তী ভালো করে দেখল, ওই দুটো জোনাকি নয়, একজোড়া চোখ। অবন্তী ভয়ে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।
-আমাকে দেখে ভয় কী মা? আমি তোকে খুব ভালোবাসব। দেখবি, এখানে তোর একটুও কষ্ট হবে না।
-প্লিজ আমাকে বেরোতে দিন। আমি বাইরে যাব।
-এটাই তোর ঘর। আমাদের ঘর। আজ থেকে আমরা বাপ-বেটি হয়ে থাকব। কেউ জানবে না। হুশ! চুপ চুপ চুপ। কাঁদে না মা...
-আপনি কে? কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন? আমি আপনাকে চিনি না...
-আমাকে চিনতে পারলি না মা রে! আমি.... আমি তোর জন্মদাতা বাপ না হয়েও তোকে জীবন দিয়েছি মা। তুই আমার কথা ভুলে গেলি কীভাবে মা? খা.... খা! আয় এদিকে। তোকে হাতে করে খাইয়ে দিই।
-না না.... আমি খাব না। আপনি ছোঁবেন না আমায়.... খাব না আমি...
ঢং শব্দে থালাটা ছিটকে গেল বহুদূরে। জোনাকি দুটো বারকয়েক দপদপ করে নিভে গেছে। সজোরে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল অবন্তীর গালে। ওর মাথাটা একটু টলে গেল। কানে অদ্ভুত একটা ঝিম ধরা শব্দ। পরমুহূর্তেই লোকটা দ্বিগুণ স্নেহে ঝাঁপিয়ে পড়ল অবন্তীর ওপর।
-ও মা! জোরে লেগেছে মা? আমি তোকে মারতে চাইনি। তুই এত অবাধ্য কেন মা? পেটের দুটো ভাত জোটাতে কষ্ট হয় না মা? সেই ভাত কেউ এভাবে ফেলে-ছড়িয়ে নষ্ট করে?
অবন্তীর ঠোঁটের গা বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ছে। জিভে রক্তের নোনতা স্বাদ। চড় খেয়ে তিরতির করে কাঁপছিল অবন্তী। ভয়, ঘৃণা, কৌতূহল সব মিলিয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছে ও। লোকটা একনাগাড়ে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে।
-তুই একবার আমাকে নিয়ে রেকর্ড করবি মা? ওই যেমন ভিডিও করিস। আমিও তোর বাবার মতো। চিনতে পারছিস আমায়? মা রে...
-কে আপনি? আমি সত্যিই আপনাকে চিনতে পারছি না। কে আপনি!!
লোকটার মাথার পিছনে দপ করে জ্বলে উঠল দুটো জোনাকি। এবার সেই আলো দুটো একেবারে স্থির হয়ে আছে। যেন জগতের যত রাগ, যত যন্ত্রণা ঠিকরে পড়তে চাইছে ওই চোখদুটোর মধ্যে দিয়ে। লোকটার ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠ কানে অস্বস্তির জন্ম দেয়। তবুও লোকটা থেমে থেমে দম নিয়ে বলে চলল এক অত্যাশ্চর্য কাহিনি।
বাপ-মা বড় সাধ করে লোকটার নাম রেখেছিল নারায়ণ। কিন্তু পরবর্তীতে লোকমুখে সে নারান নামে পরিচিতি লাভ করে। নামের মতোই তার জীবন ছিল সহজ। জোয়ারের জল নামলেই নারান কোমরে গামছা বেঁধে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ত। কখনও নদীর মোহনায়, কখনও সাগরের ধারে। সূর্য হয়তো তখনও পুরোপুরি উঠত না। হাওয়ায় নোনা গন্ধ আর ঢেউয়ের শব্দে নারানের দিন শুরু হত।
সাগর পাড়ে যারা মাছ ধরে, তাদের জীবনটা ঢেউয়ের মতোই। কখনও শান্ত, কখনও ভয়ংকর। নারান জানত, সাগরকে ভয় পেলে চলবে না, আবার অতিরিক্ত ভরসাও করা যাবে না। জাল ফেলবার সময় সে মনে মনে প্রার্থনা করত, যেন আজ অন্তত পেট ভরে ভাত জোটে। জালে বড় মাছ ধরা পড়লে যেমন খুশি উপচে উঠত, তেমন ছোট মাছে মন ভার। সাগরের দয়া মানেই ঘরে নামত চাঁদের হাসি, পেটে দুটো গরম ভাত।
নারানের মতো আরও অনেকেই আছে। কেউ জাল টানে, কেউ নৌকা চালায়, কেউ মাছ শুকোয় রোদে। ভোরে তারা ঘর ছাড়ে, রাতে ফেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে। নৌকা চালানো লোকগুলো সাগরের বুক চেনে হাতের রেখার মতো। কোন স্রোত কখন বদলায়, কোন মেঘ ঝড়ের ইশারা দেয়, এসব তাদের চোখে বড় সহজে ধরা পড়ে। কোনও স্কুলের পাঠ্যবই তাদের শিক্ষিত করে তোলেনি। বছরের পর বছর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই এই কঠিন শিক্ষা অর্জন করতে হয়েছে।
এই জীবনে আনন্দ কম, সংগ্রাম বেশি। জাল ছিঁড়ে গেলে নতুন জাল কেনার টাকা জোটে না। ঝড় এলে কয়েক দিন সাগরে নৌকা নামানো বন্ধ থাকে, তখন ঘরের উনুন ঠান্ডা। কিন্তু পেটে আগুন জ্বলে। তবু নারান কখনও সাগরকে ছাড়ার কথা ভাবেনি। কারণ সাগরই তাদের জীবন, জীবিকা আর পরিচয়। নারানের ভাবনায়.... সাগর রাগ করে, মুখ ফেরায়। আবার বুকেও টেনে নেয়।
সন্ধ্যার সময় সাগর পাড়ে নৌকাগুলো ভিড়লে অন্য রকম ছবি তৈরি হয়। আকাশে লালচে আলো, জাল থেকে ঝরে পড়া রুপালি মাছ আর মানুষের কোলাহল। নারান তখন দিনের হিসাব কষে। আজ কত পেল, কাল কী হবে। পাশে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, এই জীবন কি ওরও হবে? কোমরে একফালি কাপড়ের আঁচল পেঁচিয়ে আঁশটে গন্ধে গা ভাসানোই কি ওর ভবিতব্য?
তবু আশা ছাড়ে না কেউই। কারণ পরদিন আবার জোয়ার নামবে, আবার গামছা বাঁধা হবে কোমরে। সাগরের মানুষগুলো জানে, বাঁচতে হলে ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে। তাদের জীবন ছোট, কিন্তু সাহসে ভরা। নারানের মতো নাম না জানা অসংখ্য মানুষের গল্পই হল সাগর পাড়ের আসল গল্প। দু'দিনের বিলাসবহুল ট্যুরে গিয়ে কোনও মানুষের পক্ষে সেই গল্পের ধারেকাছেও পৌঁছনো সম্ভব নয়।
নারানের বউ খুব সাধ করে নিজের মেয়ের নাম রেখেছিল যমুনা। মেয়ে হওয়ার পর বাচ্চার মুখের দিকে ফিরেও চায়নি নারান। বাপের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার জন্য অভাবের সংসারে ব্যাটামানুষের প্রয়োজন হয়। তারপর বউটা যখন সাপের কামড়ে মারা পড়ল, তখন থেকে দোলনায় কেঁদে ওঠা ওই একরত্তি পুতুলটাই হয়ে উঠল নারানের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। কত মায়া জড়িয়ে থাকে মানুষ পুতুলের গায়ে...
তখনও বিষয়টা তেমন স্পষ্ট হয়নি। যখন যমুনা একটু হাঁটতে শিখল, তখন বোঝা গেল ওর একটা পা আর একটা পায়ের চেয়ে বেশ খানিকটা ছোট। প্রথমে এক পা ফেলে একটু টেনে মাটিতে অল্প ঘষটে হাঁটে যমুনা। ওর এই শারীরিক খামতি জন্য নারানের মনে তেমন দুঃখের প্রকাশ নেই। যত দুঃখ মেছো গন্ধটা নিজের গা থেকে ঘোচাতে না পারার জন্য।
যদিও নারানের দুঃখের দিন ফুরোল। যমুনা একটু বড় হতেই ওকে চোখে হারাতে শুরু করল নারান। মাঝ সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে মেয়ের জন্য মন কাঁদত। ঘরের কোণে একলা ঘুমিয়ে রয়েছে তার মেয়ে। সঙ্গে কেউ নেই। ভাড়ার নৌকায় স্বাধীনতা চলে না। অবশেষে শেষ সঞ্চয়টুকু খরচ করে নিজের একটা নৌকা হল বটে! মেছুয়াপাড়ার কানাকানিতে শোনা গেল, বাজারে নারানের বেজায় দেনা হয়েছে।
নারানের গা থেকে এখন আর আঁশটে পাঁক গন্ধ বেরোয় না। মেয়েটাকে অন্য লোকের ভরসায় রেখে আসার প্রয়োজন পড়ে না। যাত্রী নিয়ে নৌকা পারাপার করে নারান। ভাড়া নামমাত্র। তবুও নারান খুব খুশি। সমস্ত দিন মেয়ে বসে থাকে গলুইয়ের ওপর, ওর চোখের একেবারে সামনে।
দিন কারও একরকম যায় না। নারানেরও ভাগ্য ফিরল। উৎসবের মরশুমে নিত্য যাত্রীবাহী নৌকাগুলো হয়ে উঠত ট্যুরিস্টদের মনোরঞ্জনের কারণ। ওই কয়েকটা মাস দম ফেলার সময় পেত না নারান। সমস্ত দিন অমানুষিক খাটনি খেটে সন্ধ্যার পর গতরে বিষ ব্যথা।
তাড়ির সঙ্গে আড়ি হয়েছে বহুকাল। সেই টাকায় যমুনার জন্য মুড়ি-চিঁড়ে বাতাসা কিংবা মোয়া কিনে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফেরে নারান। তারপর মেয়ে যখন মুড়ি চিবোতে-চিবোতে বাপের পিঠে ছোট-ছোট হাতে কিল চড় ঘুষি বসিয়ে দেয়, মুহূর্তেই নারানের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আরামে নারানের চোখ বুজে আসে। ঘরের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে গরম ভাতের গন্ধ। উনুনে গনগনে আঁচ...
ট্যুরিস্ট নারানের মা-বাপ। বছরের অর্ধেক রোজগার উঠে আসে ওই উৎসবের মরশুমে। এই সময় নারানের ছুটি নেই। লাল টুকটুকে জামা গায়ে পরেছে যমুনা। লাল ফিতে দিয়ে চুল বেঁধেছে অনভ্যস্ত হাতে। তারপর প্রতিদিনের মতো বাবার কাঁধে চড়ে চেপে বসেছে গলুইয়ের ওপর।
নৌকা বড় টলমলে। ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী চেপে বসেছে তার বুকে। ট্যুরিস্টদের কাছে সমুদ্র বিহারের চেয়েও আকর্ষণীয় হল উত্তেজনা। ঘেমে-নেয়ে অস্থির হয়ে গেছে নারান। তবে যমুনা বড় খোশমেজাজে আছে। নৌকার একটি মেয়ের সঙ্গে তার ভারী খাতির হয়েছে।
দুটির বয়স প্রায় কাছাকাছি। মেয়েটির বাবা যমুনাকে একটা বিস্কুট দিল, আর একটু কেক। ওই মেয়েটির মা পরের বারে নৌকায় উঠবে। যাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই নৌকায় ঠাঁই হয়নি তার। যমুনার খুশিতে নারান খুশি হয়। মনের আনন্দে নারান যুদ্ধ ঘোষণা করল ঢেউয়ের সঙ্গে।
হঠাৎ কেঁপে উঠল নারানের পৃথিবী। অদূরে একটি জাহাজ সুবিশাল দৈত্যের মতো ধেয়ে আসছে যেন.... বাড়তি স্রোতের আনাগোনা সামলে নিতে নিতেও মুহূর্তের মধ্যে কী যেন একটা ঘটে গেল। সামাল-সামাল রব উঠলেও দূরে বসে থাকা জনসমুদ্রের মধ্যে দেখা গেল দারুণ চাঞ্চল্য। নারানের নৌকা ছোট হতে-হতে পাখির মতো হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ যেন পাখিটা ফস করে ডানা মেলে উড়ে গেল, একেবারে অদৃশ্য...
অনেকটা দূরে জাহাজ চলেছে আপন গতিতে। কিন্তু সমুদ্রে ভেসে ওঠা কৃত্রিম ঢেউয়ের সঙ্গে যুঝতে পারেনি নারানের যাত্রীবাহী নৌকা।
দু-হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল অবন্তী। এ গল্প ওর অজানা নয়। এই দুর্ঘটনার পর জলে ফাঁড়া আছে এই বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে এতকালব্যাপী ওকে সমুদ্র থেকে দূরে রেখেছিল ওর বাবা। সেই আতঙ্ক ওর অবচেতন মনে এতখানি গেঁথে গিয়েছিল, সমুদ্রে এলেও জলে নেমে ঢেউ স্পর্শ করার সাহস সেভাবে হয়নি।
স্বামী এবং একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্য সেদিন অবন্তীর মা পাড়ে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো করছিল। ডুবুরীরা একের পর এক দেহ তুলে এনেছিল সমুদ্র গর্ভ থেকে। ঢেউয়ের ধাক্কায় কারও ফুসফুসে আঘাত লেগে নাক-মুখ দিয়ে অবিরত রক্তপাত হচ্ছে। কেউ সম্পূর্ণ মৃত। যেন মানুষের নিথর দেহ উঠে আসছে সমুদ্র মন্থনে। বিষক্রিয়ায় নীল হয়ে গেছে তারা। কত মানুষকে আস্ত গিলে খেয়েছে কঠিন সমুদ্র। জ্যান্ত মানুষের আকস্মিক সলিলসমাধি...
-তোকে কে বাঁচিয়েছিল জানিস মা?
-আপনি, আপনিই বোধহয়। আমাকে জড়িয়ে নিয়ে অনেকক্ষণ ভেসে ছিলেন আপনি! আপনিই কি সেই লোক?
-আর তোর বাপ কী করেছিল আমার যমুনার সঙ্গে?
-আ.... আমি জানি না! আমি জানি না আঙ্কেল!
-আমার সঙ্গে তোকে ভাসতে দেখে সব ভুলে খাবি খেতে খেতে ছুটে এসেছিল তোর বাপ। কত লোককে ঠেলে এগিয়ে এসেছিল। লাল ফিতে.... আমার মেয়ের চুলের লাল ফিতে.... ছোট মাথাটা ডুবিয়ে তার ওপর পা তুলে তোর বাপ এসে তোকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিল। আমি ডুব দিলাম। কত খুঁজলাম আমার যমুনাকে। ডাকলাম.... ওরে যমুনা রে.... পাইনি.... আমি পাইনি... আমার মেয়েটা আজও ঘুমোচ্ছে ওখানে। ওকে কেউ তুলে আনতে পারেনি।
-আঙ্কেল.... আঙ্কেল সরি! আঙ্কেল প্লিজ.... আমার বাবার জায়গায় থাকলে আপনি কী করতেন বলুন? আপনিও তো যমুনাকে বাঁচানোর জন্য...
-কাউকে ঠেলে সরিয়ে ডুবিয়ে দিতাম না।আমার মেয়েটা বাঁচতে চেয়েছিল। তোর বাপের হাত জাপ্টে ধরেছিল। তোর বাপ নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। আমি দেখেছি নিজের চক্ষে। তবু তোকে জড়িয়ে আমি যমুনার কাছে যেতে চেয়েছি। পারলাম না, পারলাম না। দেরি হয়ে গেল! আমার যমুনা রে.... ও যমুনা, মা আমার...
ঘরের মধ্যে অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা। কন্যাশোকে অবন্তীর চোখের সামনে দাপিয়ে মরে যাচ্ছে নারান। জোনাকি দুটো দপদপ করে জ্বলছে, নিভছে। আবার স্থির হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডায় অবন্তীর দাঁতের সঙ্গে দাঁত লেগে যাচ্ছে।
-আঙ্কেল.... আঙ্কেল প্লিজ.... আমায় যেতে দিন।
-কয়েক মাস আগে বাদল দার ফোনে তোর রেকর্ডিং দেখলাম। বাবাকে নতুন পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিস। মাকে নতুন শাড়ি। কত বড় বড় দোকান থেকে কেনাকাটা, কত বড় ব্যাপার তোর। তুই বিশ্বাস কর মা, তোর ওপর আমার কোনও রাগ নেই। কিন্তু ভিডিওতে তোর বাপের হাসি-হাসি মুখটা দেখেই আমি পাগলা হয়ে গেলাম। এই এই মাথার মধ্যে সব ঘেঁটে গেল। ওই দোকান, তোর বাড়ি, ফ্ল্যাট সব খুঁজে বের করেছি আমি। ভিখিরি হয়ে তোর ফ্ল্যাটের বাইরে পড়ে ছিলাম। দশদিন অপেক্ষার পর তোর একটা জামা একদিন তোর ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে উড়ে পড়ল রাস্তায়। ব্যস! খি খি! সুতো দিয়েই কাজ সেরে দিলাম। পাঠিয়ে দিলাম এমন একজনকে যাকে দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। সে তোকে ঘর থেকে বের করে টেনে আনল এখানে। যমুনা তো সেই কবে থেকেই আমার সঙ্গে আছে। ওর হাড়গোড় মাথার খুলি কিচ্ছুটি ছিল না আমার কাছে। সব জলে ডুবে গেছে। কিন্তু চুল! ঘরে ওর ঝরে পড়া চুলের গাছি ছিল। তাই দিয়ে আমি ওকে আমার সঙ্গে বেঁধে রেখেছি। মুক্তি দিইনি ওকে। পরশু অমাবস্যা। যে তান্ত্রিক আমার যমুনাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, এখন সেই ওকে তোর মধ্যে রেখে দেবে। তারপর আমরা বাপ-বেটিতে মিলে...
-আঙ্কেল! আঙ্কেল প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমিও তো যমুনারই মতো। আমি আপনার মেয়ের মতো। প্লিজ আঙ্কেল!
-তুই যমুনার মতো কেন হবি মা? আর ক'দিন পর থেকে তুই-ই তো আমার যমুনা। তারপর আমি তোকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। শুধু তুই আর আমি থাকব। কেউ জানবে না। কেউ খুঁজবে না আমাদের।
-কেন এমন করছেন আপনি?
-আমাকে কাঁদিয়ে তোর বাবা হাসবে বল তো? এত হাসি হাসবে! সে মানুষ জানবে না বুকের পাঁজর ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলে কেমনটা লাগে!
-আঙ্কেল...
-কাল বাদ পরশু। তারপর তুই আমাকে নিয়েও রেকর্ডিং করবি। আমিও খুব হাসব। বলবি, আমার বাবা.... আমাকে বাবা বলে ডাকবি তো মা? একবার বল.... বাবা...
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত