অনুসরণকারী

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬

ফ্রেমের বাইরে কেউ অষ্টম পর্ব


 

ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

অষ্টম পর্ব



                                                                    ।। লাস্ট আপলোড ।। 


অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে সাম্পান নিজের ফোনটা ফেরত পেয়েছে। ওর ফোনে তেমন আপত্তিজনক কিছুই পাওয়া যায়নি। এমনকি অবন্তীর সঙ্গে কোনও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের এক টুকরো ছবি পর্যন্ত ছিল না। অবন্তীকে সঙ্গে নিয়ে সাধারণ দু-চারটে ছবি, যা কোনোভাবেই ওকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে না।


থানা-পুলিশ নিয়ে জলঘোলা হয়েছে বিস্তর। সাম্পান হোটেল কিংবা সমুদ্র সৈকত ছেড়ে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পায়নি। তবে নিজের বাড়িতে ফোন করে জানানো হয়েছে, সাম্পান সমুদ্র ভ্রমণের মেয়াদ খানিক বাড়িয়ে নিয়েছে। সেই দিক থেকে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেছে। কিন্তু সে আর কতদিনের জন্য! দুশ্চিন্তায় সাম্পানের কপালে ভাঁজ পড়েছে। এই দুশ্চিন্তা কেবল ওর নিজের জন্য নয়। জলজ্যান্ত মেয়েটা হঠাৎ এভাবে উধাও হয়ে গেল কোথায়! 


অবন্তীর মায়ের কান্নার তীব্রতা খানিক কমে এসেছে। তবে অবন্তীর বাবা ভীষণ রকম চুপ করে গেছে। তাকে দেখলে হঠাৎ মনে হয়, পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কোনও আতঙ্ক প্রতি মুহূর্তে মানুষটাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। 


অবন্তীর প্রোফাইলে ঢুকে বসেছিল সাম্পান। ফোন ঘেঁটে ওর সর্বশেষ পোস্টটা দেখছিল। সমস্ত দিন অবন্তী সঙ্গে থাকায় ফোন খুলে ওর পোস্টগুলো দেখা হয়নি। এখন খুব খুঁটিয়ে সাম্পান দেখল, শেষ কয়েকটা ভিডিওতে অবন্তীর কথাবার্তা এমনকি চোখের দৃষ্টিও যেন একটু অসংলগ্ন ছিল। 


বালিশে মাথা রাখতেই সাম্পানের চোখদুটো কালঘুমে ভেঙে আসতে চাইল। কিন্তু ও একের পর এক ভিডিও দেখে চলল। ভিডিওতে কোথাও কিছু নেই। তবে অবন্তীর দু'চোখে জেগে রয়েছে কেমন এক আতঙ্ক, নীরব অস্থিরতা। কিংবা বলা যায়, কারও আদেশ একমনে পালন করে চলেছে সে। অবন্তীর ফোন পুলিশের কাছে জমা রয়েছে। ওটা ঘেঁটে যদি কোনও সূত্র পাওয়া যেত, তবে হয়তো ওর এই আকস্মিক অন্তর্ধান রহস্যের কিছু কিনারা করা সম্ভব হত। 


চোখ বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে ছিল সাম্পান, ভাবছিল একের পর এক কথা। প্রত্যেকটা সূত্রকে এক জায়গায় রাখার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হিসেব মেলেনি। অবন্তীর বাবার দৃষ্টিতে উদ্বেগ যথেষ্টই রয়েছে, তবে সেই সঙ্গে তার অস্থির দৃষ্টি যেন পথেঘাটে কিছু খুঁজছে। ওই ভদ্রলোকের মধ্যে সমস্ত দিন ধরে একটা অস্থিরতা দেখেছে সাম্পান। 


ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ভিডিওতে অবন্তী হাসছে, কখনও আবার গম্ভীর হয়ে পিছু ফিরে দেখছে। অবন্তী বলেছিল, ওকে যেন এখানে টেনে আনা হয়েছে। ও নিজে আসতে চায়নি। এই কথার অর্থ কী? বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও কিছু নেশার ঘোরে বকে যাওয়া প্রলাপ ভেবে এত সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


দরজা খুলে হোটেলের বারান্দায় পৌঁছতেই মুখোমুখি দেখা হল অবন্তীর বাবার সঙ্গে। বিপরীত দিকের হোটেলে যে ঘরে অবন্তী ছিল, ঠিক তার পাশের ঘরেই ওরা রয়েছে। অবন্তীর ঘরের মধ্যে যে বৃত্ত দেখা গিয়েছিল, তা কে এঁকেছে? ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চুলগুলোই বা কার? 


রহস্য ঘনীভূত হতে হতে সাম্পানের উত্তেজনা অস্থিরতা একেবারে চরম সীমায় পৌঁছেছে। একটা সিগারেটে অগ্নিসংযোগের আশায় সাম্পান বারান্দায় এসেছিল। কিন্তু অবন্তীর বাবার ইশারা ওর কপালে গভীর ভাঁজের জন্ম দিল। ভদ্রলোক ডাকছেন ওকে। ধূমপানের আশা বিসর্জন দিয়ে হোটেল ছেড়ে রাস্তায় নেমে এল সাম্পান। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় একটা। ঘুমে ঢলে পড়া দারোয়ান সাম্পানের দিকে একটু অদ্ভুত দৃষ্টিতে চাইলেও বিশেষ হৈ-হল্লা বা আপত্তি করেনি। 


-আমার মেয়ের সঙ্গে যদি তোমার কোনও সম্পর্ক থাকে, তবে তুমি আমায় বলতে পারো। 

-আপনার মেয়ের সঙ্গে আমার সামান্য বন্ধুত্বও নেই। সম্পর্ক তো দূরের কথা। আলাপ হয়েছে এখানে এসে। আপনি বিশ্বাস না করলে আমার সত্যিই কিছু করার নেই। 

-একটা কথা ওর মাকে আমি বলতে পারছি না। পৃথিবীর কাউকে কখনও বলতে পারিনি। 

-কী কথা? কী হয়েছে? 


অবন্তীর বাবার দিকে চেয়ে সাম্পানের মনে হল, পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র অসহায় মানুষটার সামনে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার দু'চোখে ভয় আর অবিশ্বাসের মিশেল স্পষ্ট। হঠাৎ সাম্পানের হাত ধরে থরথর করে কাঁপতে লাগল অবন্তীর বাবা। 


-পুলিশকে আমি সব কথা বলতে পারিনি বাবা। 

-আপনি আগে বসুন এখানে। পড়ে যাবেন। 

-আমার মেয়ে নিজে এখানে আসেনি। তাকে আনা হয়েছে। ওই মেয়ে আমার সব, ওকে তুমি বাঁচাও। ওকে খুঁজে বের করো। আমার ভুলের শাস্তি ও পেতে পারে না। 


স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সাম্পান। এই একই কথা ও অবন্তীর মুখেও শুনেছে। সমস্ত দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে গেল। কার্য-কারণ খুঁজে পেতে বেশি কষ্ট করতে হল না। এ যেন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনও গভীর অথচ গোপন রহস্যের উদঘাটন হতে চলেছে। 


-একটু খুলে বলুন তো, কী বলতে চাইছেন! 


ঘড়িতে রাত দুটো। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে অবন্তীর বাবা বলল, 'তার গালে একটা কাটা দাগ ছিল। ওই মুখ আমি কখনও ভুলব না বাবা, কোনও দিনও না.... আমি ইচ্ছে করে তার মেয়েকে ছেড়ে দিইনি। আমি বুঝতে পারিনি। নিজের মেয়ের কাছে পৌঁছনোর জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম.... আমার মেয়ে আমাকে না জানিয়ে কিছুতেই সমুদ্রে বেড়াতে আসবে না। নিশ্চয়ই এসব তার কীর্তি।'


জনবহুল শহরের বুকে বসে এসব গল্পকথা শুনলে সাম্পান হয়তো হেসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু বাতাসে নোনা গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের গর্জন, সেই সঙ্গে গা ছমছমে অন্ধকার। হঠাৎ দূরে চাইলে মনে হয় শত-শত প্রেত অট্টহাসি হেসে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। এই অবস্থায় মন দুর্বল হয়, ফেলে আসা অতীতকে এত সহজে অস্বীকারের সাহস হয় না। 


সমুদ্রের শব্দ যেদিক থেকে ভেসে আসছে সেদিকে চেয়ে সাম্পান বলল, 'আপনিই বলুন, কোথা থেকে শুরু করব আমরা?' 


(চলবে...)

ছবি : সংগৃহীত

মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬

ফ্রেমের বাইরে কেউ সপ্তম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

সপ্তম পর্ব



                                                                ।। শেষ রেকর্ডিংয়ের পর ।। 


অবন্তীর সকাল-সন্ধ্যার হিসেব নেই। নিজের আশেপাশে অশরীরীর উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়েছে অবন্তী। তবে কনকনে ঠান্ডাটা সহ্য করা যাচ্ছে না। হঠাৎ দরজা খুলে গেল। লোহার ছিটকিনি আর শিকলের শব্দ কানে যেতেই অবন্তী সোজা হয়ে বসল। খিদেয় শরীর অবশ হয়ে এসেছে। খাবারের গন্ধ নাকে আসতেই অবন্তীর বমি পেয়ে গেল। তবে কারণটা খাবার নয়, আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো আঁশটে গন্ধের প্রভাবে গা ক্রমাগত গুলিয়ে উঠছে। 


লোকটার হাতে একটা আলো রয়েছে। কিন্তু সেই আলোয় অন্ধকার দূর হয়নি। বরং আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। পরম মমতায় থালাটা মেঝেতে নামিয়ে রাখতেই অবন্তী চিৎকার করে উঠল ভয়ে.... " কে আপনি? আমাকে কেন এখানে এনেছেন?" 


লোকটার পরনে কেমন যেন আলখাল্লা পোশাক। প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত নেমে এসেছে। কেবল টাকা লোকটার উদ্দেশ্য নয়, হতেই পারে না। ওকে এখানে আটকে টাকার জন্য বাড়িতে ফোন করলে সে কিছুতেই নিজের মুখ অবন্তীর সামনে মেলে ধরত না। আলোর দুলুনিতে অবন্তী দেখল লোকটার ডান দিকের গালে একটা গভীর কাটা দাগ আছে। 


-আমায় কেন এখানে এনেছেন? টাকা চাই? কত টাকা? 


লোকটা ধীরে ধীর অবন্তীর কাছে এগিয়ে এল। ঝাপসা আলোর অবন্তী স্পষ্ট দেখতে পেল, একটা ছায়ামূর্তি লোকটার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে। একটা বাচ্চা মেয়ে। একটু যেন খুঁড়িয়ে হাঁটছে। ঠিক হেঁটে নয়, খানিকটা যেন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সে। ঠান্ডার প্রকোপ আরও বাড়ল। লোকটা নিজের ময়লা রুক্ষ হাতটা তুলে অবন্তীর গালে হাত রাখতেই ও একদম গুটিয়ে সেঁটে গেল দেওয়ালের সঙ্গে। লোকটা অদ্ভুত কর্কশ কণ্ঠে বলল, "তোকে দেখতে কী সুন্দর হয়েছে মা!" 


লোকটার ফ্যাসফ্যাসে গলায় মায়া যথেষ্ট আছে, কিন্তু সেই মায়ায় বিগলিত হওয়ার মতো মনের অবস্থা অবন্তীর নেই। লোকটার মাথার পিছনদিকে জ্বলজ্বল করছে দুটো জোনাকি। অবন্তী ভালো করে দেখল, ওই দুটো জোনাকি নয়, একজোড়া চোখ। অবন্তী ভয়ে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল।  


-আমাকে দেখে ভয় কী মা? আমি তোকে খুব ভালোবাসব। দেখবি, এখানে তোর একটুও কষ্ট হবে না। 

-প্লিজ আমাকে বেরোতে দিন। আমি বাইরে যাব। 

-এটাই তোর ঘর। আমাদের ঘর। আজ থেকে আমরা বাপ-বেটি হয়ে থাকব। কেউ জানবে না। হুশ! চুপ চুপ চুপ। কাঁদে না মা...

-আপনি কে? কেন আমার সঙ্গে এমন করছেন? আমি আপনাকে চিনি না... 

-আমাকে চিনতে পারলি না মা রে! আমি.... আমি তোর জন্মদাতা বাপ না হয়েও তোকে জীবন দিয়েছি মা। তুই আমার কথা ভুলে গেলি কীভাবে মা? খা.... খা! আয় এদিকে। তোকে হাতে করে খাইয়ে দিই। 

-না না.... আমি খাব না। আপনি ছোঁবেন না আমায়.... খাব না আমি...


ঢং শব্দে থালাটা ছিটকে গেল বহুদূরে। জোনাকি দুটো বারকয়েক দপদপ করে নিভে গেছে। সজোরে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল অবন্তীর গালে। ওর মাথাটা একটু টলে গেল। কানে অদ্ভুত একটা ঝিম ধরা শব্দ। পরমুহূর্তেই লোকটা দ্বিগুণ স্নেহে ঝাঁপিয়ে পড়ল অবন্তীর ওপর। 


-ও মা! জোরে লেগেছে মা? আমি তোকে মারতে চাইনি। তুই এত অবাধ্য কেন মা? পেটের দুটো ভাত জোটাতে কষ্ট হয় না মা? সেই ভাত কেউ এভাবে ফেলে-ছড়িয়ে নষ্ট করে? 


অবন্তীর ঠোঁটের গা বেয়ে কষ গড়িয়ে পড়ছে। জিভে রক্তের নোনতা স্বাদ। চড় খেয়ে তিরতির করে কাঁপছিল অবন্তী। ভয়, ঘৃণা, কৌতূহল সব মিলিয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছে ও। লোকটা একনাগাড়ে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে। 


-তুই একবার আমাকে নিয়ে রেকর্ড করবি মা? ওই যেমন ভিডিও করিস। আমিও তোর বাবার মতো। চিনতে পারছিস আমায়? মা রে...

-কে আপনি? আমি সত্যিই আপনাকে চিনতে পারছি না। কে আপনি!! 


লোকটার মাথার পিছনে দপ করে জ্বলে উঠল দুটো জোনাকি। এবার সেই আলো দুটো একেবারে স্থির হয়ে আছে। যেন জগতের যত রাগ, যত যন্ত্রণা ঠিকরে পড়তে চাইছে ওই চোখদুটোর মধ্যে দিয়ে। লোকটার ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠ কানে অস্বস্তির জন্ম দেয়। তবুও লোকটা থেমে থেমে দম নিয়ে বলে চলল এক অত্যাশ্চর্য কাহিনি। 


বাপ-মা বড় সাধ করে লোকটার নাম রেখেছিল নারায়ণ। কিন্তু পরবর্তীতে লোকমুখে সে নারান নামে পরিচিতি লাভ করে। নামের মতোই তার জীবন ছিল সহজ। জোয়ারের জল নামলেই নারান কোমরে গামছা বেঁধে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ত। কখনও নদীর মোহনায়, কখনও সাগরের ধারে। সূর্য হয়তো তখনও পুরোপুরি উঠত না। হাওয়ায় নোনা গন্ধ আর ঢেউয়ের শব্দে নারানের দিন শুরু হত। 


সাগর পাড়ে যারা মাছ ধরে, তাদের জীবনটা ঢেউয়ের মতোই। কখনও শান্ত, কখনও ভয়ংকর। নারান জানত, সাগরকে ভয় পেলে চলবে না, আবার অতিরিক্ত ভরসাও করা যাবে না। জাল ফেলবার সময় সে মনে মনে প্রার্থনা করত, যেন আজ অন্তত পেট ভরে ভাত জোটে। জালে বড় মাছ ধরা পড়লে যেমন খুশি উপচে উঠত, তেমন ছোট মাছে মন ভার। সাগরের দয়া মানেই ঘরে নামত চাঁদের হাসি, পেটে দুটো গরম ভাত। 


নারানের মতো আরও অনেকেই আছে। কেউ জাল টানে, কেউ নৌকা চালায়, কেউ মাছ শুকোয় রোদে। ভোরে তারা ঘর ছাড়ে, রাতে ফেরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে। নৌকা চালানো লোকগুলো সাগরের বুক চেনে হাতের রেখার মতো। কোন স্রোত কখন বদলায়, কোন মেঘ ঝড়ের ইশারা দেয়, এসব তাদের চোখে বড় সহজে ধরা পড়ে। কোনও স্কুলের পাঠ্যবই তাদের শিক্ষিত করে তোলেনি। বছরের পর বছর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই এই কঠিন শিক্ষা অর্জন করতে হয়েছে। 


এই জীবনে আনন্দ কম, সংগ্রাম বেশি। জাল ছিঁড়ে গেলে নতুন জাল কেনার টাকা জোটে না। ঝড় এলে কয়েক দিন সাগরে নৌকা নামানো বন্ধ থাকে, তখন ঘরের উনুন ঠান্ডা। কিন্তু পেটে আগুন জ্বলে। তবু নারান কখনও সাগরকে ছাড়ার কথা ভাবেনি। কারণ সাগরই তাদের জীবন, জীবিকা আর পরিচয়। নারানের ভাবনায়.... সাগর রাগ করে, মুখ ফেরায়। আবার বুকেও টেনে নেয়। 


সন্ধ্যার সময় সাগর পাড়ে নৌকাগুলো ভিড়লে অন্য রকম ছবি তৈরি হয়। আকাশে লালচে আলো, জাল থেকে ঝরে পড়া রুপালি মাছ আর মানুষের কোলাহল। নারান তখন দিনের হিসাব কষে। আজ কত পেল, কাল কী হবে। পাশে বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, এই জীবন কি ওরও হবে? কোমরে একফালি কাপড়ের আঁচল পেঁচিয়ে আঁশটে গন্ধে গা ভাসানোই কি ওর ভবিতব্য? 


তবু আশা ছাড়ে না কেউই। কারণ পরদিন আবার জোয়ার নামবে, আবার গামছা বাঁধা হবে কোমরে। সাগরের মানুষগুলো জানে, বাঁচতে হলে ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে। তাদের জীবন ছোট, কিন্তু সাহসে ভরা। নারানের মতো নাম না জানা অসংখ্য মানুষের গল্পই হল সাগর পাড়ের আসল গল্প। দু'দিনের বিলাসবহুল ট্যুরে গিয়ে কোনও মানুষের পক্ষে সেই গল্পের ধারেকাছেও পৌঁছনো সম্ভব নয়। 


নারানের বউ খুব সাধ করে নিজের মেয়ের নাম রেখেছিল যমুনা। মেয়ে হওয়ার পর বাচ্চার মুখের দিকে ফিরেও চায়নি নারান। বাপের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার জন্য অভাবের সংসারে ব্যাটামানুষের প্রয়োজন হয়। তারপর বউটা যখন সাপের কামড়ে মারা পড়ল, তখন থেকে দোলনায় কেঁদে ওঠা ওই একরত্তি পুতুলটাই হয়ে উঠল নারানের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। কত মায়া জড়িয়ে থাকে মানুষ পুতুলের গায়ে...


তখনও বিষয়টা তেমন স্পষ্ট হয়নি। যখন যমুনা একটু হাঁটতে শিখল, তখন বোঝা গেল ওর একটা পা আর একটা পায়ের চেয়ে বেশ খানিকটা ছোট। প্রথমে এক পা ফেলে একটু টেনে মাটিতে অল্প ঘষটে হাঁটে যমুনা। ওর এই শারীরিক খামতি জন্য নারানের মনে তেমন দুঃখের প্রকাশ নেই। যত দুঃখ মেছো গন্ধটা নিজের গা থেকে ঘোচাতে না পারার জন্য। 


যদিও নারানের দুঃখের দিন ফুরোল। যমুনা একটু বড় হতেই ওকে চোখে হারাতে শুরু করল নারান। মাঝ সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে মেয়ের জন্য মন কাঁদত। ঘরের কোণে একলা ঘুমিয়ে রয়েছে তার মেয়ে। সঙ্গে কেউ নেই। ভাড়ার নৌকায় স্বাধীনতা চলে না। অবশেষে শেষ সঞ্চয়টুকু খরচ করে নিজের একটা নৌকা হল বটে! মেছুয়াপাড়ার কানাকানিতে শোনা গেল, বাজারে নারানের বেজায় দেনা হয়েছে। 


নারানের গা থেকে এখন আর আঁশটে পাঁক গন্ধ বেরোয় না। মেয়েটাকে অন্য লোকের ভরসায় রেখে আসার প্রয়োজন পড়ে না। যাত্রী নিয়ে নৌকা পারাপার করে নারান। ভাড়া নামমাত্র। তবুও নারান খুব খুশি। সমস্ত দিন মেয়ে বসে থাকে গলুইয়ের ওপর, ওর চোখের একেবারে সামনে। 


দিন কারও একরকম যায় না। নারানেরও ভাগ্য ফিরল। উৎসবের মরশুমে নিত্য যাত্রীবাহী নৌকাগুলো হয়ে উঠত ট্যুরিস্টদের মনোরঞ্জনের কারণ। ওই কয়েকটা মাস দম ফেলার সময় পেত না নারান। সমস্ত দিন অমানুষিক খাটনি খেটে সন্ধ্যার পর গতরে বিষ ব্যথা। 


তাড়ির সঙ্গে আড়ি হয়েছে বহুকাল। সেই টাকায় যমুনার জন্য মুড়ি-চিঁড়ে বাতাসা কিংবা মোয়া কিনে সন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফেরে নারান। তারপর মেয়ে যখন মুড়ি চিবোতে-চিবোতে বাপের পিঠে ছোট-ছোট হাতে কিল চড় ঘুষি বসিয়ে দেয়, মুহূর্তেই নারানের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আরামে নারানের চোখ বুজে আসে। ঘরের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে গরম ভাতের গন্ধ। উনুনে গনগনে আঁচ... 


ট্যুরিস্ট নারানের মা-বাপ। বছরের অর্ধেক রোজগার উঠে আসে ওই উৎসবের মরশুমে। এই সময় নারানের ছুটি নেই। লাল টুকটুকে জামা গায়ে পরেছে যমুনা। লাল ফিতে দিয়ে চুল বেঁধেছে অনভ্যস্ত হাতে। তারপর প্রতিদিনের মতো বাবার কাঁধে চড়ে চেপে বসেছে গলুইয়ের ওপর। 


নৌকা বড় টলমলে। ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী চেপে বসেছে তার বুকে। ট্যুরিস্টদের কাছে সমুদ্র বিহারের চেয়েও আকর্ষণীয় হল উত্তেজনা। ঘেমে-নেয়ে অস্থির হয়ে গেছে নারান। তবে যমুনা বড় খোশমেজাজে আছে। নৌকার একটি মেয়ের সঙ্গে তার ভারী খাতির হয়েছে। 


দুটির বয়স প্রায় কাছাকাছি। মেয়েটির বাবা যমুনাকে একটা বিস্কুট দিল, আর একটু কেক। ওই মেয়েটির মা পরের বারে নৌকায় উঠবে। যাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই নৌকায় ঠাঁই হয়নি তার। যমুনার খুশিতে নারান খুশি হয়। মনের আনন্দে নারান যুদ্ধ ঘোষণা করল ঢেউয়ের সঙ্গে। 


হঠাৎ কেঁপে উঠল নারানের পৃথিবী। অদূরে একটি জাহাজ সুবিশাল দৈত্যের মতো ধেয়ে আসছে যেন.... বাড়তি স্রোতের আনাগোনা সামলে নিতে নিতেও মুহূর্তের মধ্যে কী যেন একটা ঘটে গেল। সামাল-সামাল রব উঠলেও দূরে বসে থাকা জনসমুদ্রের মধ্যে দেখা গেল দারুণ চাঞ্চল্য। নারানের নৌকা ছোট হতে-হতে পাখির মতো হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ যেন পাখিটা ফস করে ডানা মেলে উড়ে গেল, একেবারে অদৃশ্য... 


অনেকটা দূরে জাহাজ চলেছে আপন গতিতে। কিন্তু সমুদ্রে ভেসে ওঠা কৃত্রিম ঢেউয়ের সঙ্গে যুঝতে পারেনি নারানের যাত্রীবাহী নৌকা। 


দু-হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল অবন্তী। এ গল্প ওর অজানা নয়। এই দুর্ঘটনার পর জলে ফাঁড়া আছে এই বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে এতকালব্যাপী ওকে সমুদ্র থেকে দূরে রেখেছিল ওর বাবা। সেই আতঙ্ক ওর অবচেতন মনে এতখানি গেঁথে গিয়েছিল, সমুদ্রে এলেও জলে নেমে ঢেউ স্পর্শ করার সাহস সেভাবে হয়নি। 


স্বামী এবং একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্য সেদিন অবন্তীর মা পাড়ে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো করছিল। ডুবুরীরা একের পর এক দেহ তুলে এনেছিল সমুদ্র গর্ভ থেকে। ঢেউয়ের ধাক্কায় কারও ফুসফুসে আঘাত লেগে নাক-মুখ দিয়ে অবিরত রক্তপাত হচ্ছে। কেউ সম্পূর্ণ মৃত। যেন মানুষের নিথর দেহ উঠে আসছে সমুদ্র মন্থনে। বিষক্রিয়ায় নীল হয়ে গেছে তারা। কত মানুষকে আস্ত গিলে খেয়েছে কঠিন সমুদ্র। জ্যান্ত মানুষের আকস্মিক সলিলসমাধি... 


-তোকে কে বাঁচিয়েছিল জানিস মা?  

-আপনি, আপনিই বোধহয়। আমাকে জড়িয়ে নিয়ে অনেকক্ষণ ভেসে ছিলেন আপনি! আপনিই কি সেই লোক? 

-আর তোর বাপ কী করেছিল আমার যমুনার সঙ্গে? 

-আ.... আমি জানি না! আমি জানি না আঙ্কেল! 

-আমার সঙ্গে তোকে ভাসতে দেখে সব ভুলে খাবি খেতে খেতে ছুটে এসেছিল তোর বাপ। কত লোককে ঠেলে এগিয়ে এসেছিল। লাল ফিতে.... আমার মেয়ের চুলের লাল ফিতে.... ছোট মাথাটা ডুবিয়ে তার ওপর পা তুলে তোর বাপ এসে তোকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিল। আমি ডুব দিলাম। কত খুঁজলাম আমার যমুনাকে। ডাকলাম.... ওরে যমুনা রে.... পাইনি.... আমি পাইনি... আমার মেয়েটা আজও ঘুমোচ্ছে ওখানে। ওকে কেউ তুলে আনতে পারেনি। 

-আঙ্কেল.... আঙ্কেল সরি! আঙ্কেল প্লিজ.... আমার বাবার জায়গায় থাকলে আপনি কী করতেন বলুন? আপনিও তো যমুনাকে বাঁচানোর জন্য... 

-কাউকে ঠেলে সরিয়ে ডুবিয়ে দিতাম না।আমার মেয়েটা বাঁচতে চেয়েছিল। তোর বাপের হাত জাপ্টে ধরেছিল। তোর বাপ নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। আমি দেখেছি নিজের চক্ষে। তবু তোকে জড়িয়ে আমি যমুনার কাছে যেতে চেয়েছি। পারলাম না, পারলাম না। দেরি হয়ে গেল! আমার যমুনা রে.... ও যমুনা, মা আমার... 


ঘরের মধ্যে অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা। কন্যাশোকে অবন্তীর চোখের সামনে দাপিয়ে মরে যাচ্ছে নারান। জোনাকি দুটো দপদপ করে জ্বলছে, নিভছে। আবার স্থির হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডায় অবন্তীর দাঁতের সঙ্গে দাঁত লেগে যাচ্ছে। 


-আঙ্কেল.... আঙ্কেল প্লিজ.... আমায় যেতে দিন।

-কয়েক মাস আগে বাদল দার ফোনে তোর রেকর্ডিং দেখলাম। বাবাকে নতুন পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিস। মাকে নতুন শাড়ি। কত বড় বড় দোকান থেকে কেনাকাটা, কত বড় ব্যাপার তোর। তুই বিশ্বাস কর মা, তোর ওপর আমার কোনও রাগ নেই। কিন্তু ভিডিওতে তোর বাপের হাসি-হাসি মুখটা দেখেই আমি পাগলা হয়ে গেলাম। এই এই মাথার মধ্যে সব ঘেঁটে গেল। ওই দোকান, তোর বাড়ি, ফ্ল্যাট সব খুঁজে বের করেছি আমি। ভিখিরি হয়ে তোর ফ্ল্যাটের বাইরে পড়ে ছিলাম। দশদিন অপেক্ষার পর তোর একটা জামা একদিন তোর ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে উড়ে পড়ল রাস্তায়। ব্যস! খি খি! সুতো দিয়েই কাজ সেরে দিলাম। পাঠিয়ে দিলাম এমন একজনকে যাকে দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। সে তোকে ঘর থেকে বের করে টেনে আনল এখানে। যমুনা তো সেই কবে থেকেই আমার সঙ্গে আছে। ওর হাড়গোড় মাথার খুলি কিচ্ছুটি ছিল না আমার কাছে। সব জলে ডুবে গেছে। কিন্তু চুল! ঘরে ওর ঝরে পড়া চুলের গাছি ছিল। তাই দিয়ে আমি ওকে আমার সঙ্গে বেঁধে রেখেছি। মুক্তি দিইনি ওকে। পরশু অমাবস্যা। যে তান্ত্রিক আমার যমুনাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, এখন সেই ওকে তোর মধ্যে রেখে দেবে। তারপর আমরা বাপ-বেটিতে মিলে...

-আঙ্কেল! আঙ্কেল প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমিও তো যমুনারই মতো। আমি আপনার মেয়ের মতো। প্লিজ আঙ্কেল! 

-তুই যমুনার মতো কেন হবি মা? আর ক'দিন পর থেকে তুই-ই তো আমার যমুনা। তারপর আমি তোকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। শুধু তুই আর আমি থাকব। কেউ জানবে না। কেউ খুঁজবে না আমাদের। 

-কেন এমন করছেন আপনি? 

-আমাকে কাঁদিয়ে তোর বাবা হাসবে বল তো? এত হাসি হাসবে! সে মানুষ জানবে না বুকের পাঁজর ভেঙে গুঁড়িয়ে গেলে কেমনটা লাগে! 

-আঙ্কেল...

-কাল বাদ পরশু। তারপর তুই আমাকে নিয়েও রেকর্ডিং করবি। আমিও খুব হাসব। বলবি, আমার বাবা.... আমাকে বাবা বলে ডাকবি তো মা? একবার বল.... বাবা... 


(চলবে...)

ছবি : সংগৃহীত

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফ্রেমের বাইরে কেউ দ্বিতীয় পর্ব


 

ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

দ্বিতীয় পর্ব



 ।। অ্যালগরিদমের অভিশাপ ।।


অবন্তীর দৃঢ় বিশ্বাস, পৃথিবী কেবল সংখ্যায় চলে। ভিউজ, রিয়াকশন, রিচ এই তিন দেবতার কাছে ওর যত প্রার্থনা। প্রতিদিন অবন্তীর সকাল শুরু হয় ট্রেন্ডিং সাউন্ড দিয়ে। রাত শেষ হয় অ্যানালিটিক্স দেখে। কোন সময় পোস্ট করলে বেশি এনগেজমেন্ট, বেশি কৌতূহল, মাত্রাতিরিক্ত বিতর্ক, কোন কনটেন্টে মানুষ ভয় পায়, সবকিছু অবন্তীর নখদর্পণে।

অবন্তী ঠিক করেছিল আগামী কিছুদিন এই শুট, এডিটিং, আপলোড.... এসব শব্দের মোহ থেকে একটু দূরে থাকবে। নিজের জন্য বাঁচবে। কিন্তু সেই রাতে এমন কিছু ঘটল, আধো ঘুমের মধ্যেও সূক্ষ্মভাবে জেগে উঠল অবন্তীর অবচেতন মন। স্বপ্নের মধ্যে সে খুঁজে পেল নতুন কন্টেন্ট। এক নতুন রকমের খেলা। যা আগে কেউ খেলেনি।

ভোরবেলা ঘুমটা ভেঙে গেছে। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়! এভাবেও তো সাজানো যেতে পারে স্ক্রিপ্ট! অবন্তীর মাথায় এলোমেলো অনেক ভাবনা চলছে। সেই সঙ্গে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে। ও চুপ করে বিছানায় পড়ে রয়েছে অনেকক্ষণ।

ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করা হল না। তড়িঘড়ি উঠে বসে অবন্তী নিজের নোটপ্যাডে লিখে ফেলল একগুচ্ছ শব্দ। যার শেষ বাক্যে লেখা হল, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম শুধু কনটেন্ট দেখে না, শেখে না। সে মানুষও শিখে ফেলে।

সমস্ত দিন স্নান খাওয়া ঘুম নেই। একনাগাড়ে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে রইল অবন্তী। রাতে ও একটা নতুন ভিডিও আপলোড করল। একেবারে ভিন্নধর্মী, যা আগে কেউ করেনি। ভিডিওর লোকেশন, তার নিজের ফ্ল্যাট। ক্যাপশনে লিখল, আজকের ম্যানিফেস্টিশন, তুমি তাকে দেখলে সে তোমাকেও দেখবে।

স্ক্রিনে অবন্তীর হাসিমুখ। কখনও কখনও তার চোখে-মুখে বেশ রহস্যের ছোঁয়া। ঢিমে তালে কথা বলছে সে। তুমি কি কখনও অনুভব করেছ, কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে? তুমি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছ, কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছ না। তুমি কি তার দিকে চাইতে ভয় পাচ্ছ? মনে হচ্ছে, তুমি তাকে দেখলে, সে-ও তোমাকেই দেখবে!

সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে তুমি ভাবো সবই কনটেন্ট, সবটা অভিনয়। কিন্তু কিছু অদ্ভুত জিনিস আছে, যেগুলো স্ক্রিনের ভিতর বন্দি থাকে না। মিশে যায় তোমার সঙ্গে। তোমার মননে। তোমার মস্তিষ্কে।

তুমি যখন চোখ মেলে ফোনের দিকে তাকাও, ও তখন জেগে ওঠে। তুমি যখন ফোনের ওপর আঙুল থামিয়ে দাও, ও তখন আরও কাছে এগিয়ে আসে। আমার এই ভিডিওটা দেখার সময় তুমি হয়তো ঘরে একা রয়েছ। কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত? তুমি একা?

ঘরের ওই অন্ধকার কোণটা, স্ক্রিনের প্রতিফলনটা, চোখের কোণ দিয়ে দেখা ছায়াটা, ওগুলো কি সত্যিই কিছু না?

ভয় একদিনে আসে না, ভয় হঠাৎ আসে না। ভয়টা আসে ধীরে ধীরে। ঠিক আমার এই কথার মতো, তুমি তাকে দেখলে…. সে তোমাকে দেখবেই।

এখন আমায় বলো, এই ভিডিওটা দেখার পর তুমি কি আর আগের মতো স্ক্রিনের দিকে চাইতে পারবে? ঠিক আগের মতোই কি তুমি আত্মবিশ্বাসী, যে তুমি একা!

যদি মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই, কিছু একটা অনুভব করেছ, কিংবা এই ভিডিওটা দেখার পর তোমার আশেপাশে কিছু বদলে গেল, তবে কমেন্টে লিখে যাও, আমি দেখছি। আমি বুঝতে পারছি। আর যদি মনে হয় তুমি একা নও, তা হলে লাইক দাও। আমিও দেখি, কে কে এখন চেয়ে রয়েছ এই স্ক্রিনের দিকে! কোথা থেকে দেখছ এই ভিডিও!

ভুলে যেও না, তুমি তাকে দেখলে সে তোমাকেও দেখবে। এটা শুধু ম্যানিফেস্টিশন নয়, ফ্যাক্ট! যা আমি আজ ভোরের স্বপ্নে দেখেছি। আমাদের চারপাশে অদৃশ্যভাবে কিছু একটা সব সময় বিচরণ করছে, যা আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে...

ভিডিও আপলোড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নোটিফিকেশনের বন্যা। ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নিল অবন্তী। রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। ব্যাগ গোছাতে হবে। কিছু খাওয়া দরকার। পেটের মধ্যে বিড়াল ইঁদুর খুঁজে না পেয়ে সশব্দ আলোড়ন সৃষ্টি করছে।

প্রত্যেকবারের মতো এ বারও স্বাভাবিক গতিতে ভিডিওর ভিউজ বাড়তে থাকে। দশ হাজার। পঞ্চাশ হাজার। এক লাখ। মন্তব্য বিভাগ ভরে যায় হাততালিতে, ব্যতিক্রমী মন্তব্যে কিংবা গালাগালিতে। সে হোক। অবন্তীর কাছে এক-একটা মন্তব্য শুধুমাত্র এনগেজমেন্ট। সেই মন্তব্যে ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষ লুকিয়ে থাকলে ওর ভারী বয়েই গেল।

খুব অদ্ভুতভাবে সে রাতে শত-শত মন্তব্যের ভিড়ে ভেসে উঠল একটা মন্তব্য। অবন্তী তখন কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে শুনতে রান্নাঘরে ব্যস্ত রয়েছে। একটা মন্তব্য জেগে উঠল অবন্তীর ভিডিওর মন্তব্য বিভাগে। "তুমি এখন তাকে দেখছ না, তবুও সে তোমাকেই দেখছে।”

সেই রাতেই ঘটল প্রথম ঘটনাটা। বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে। সব গুছিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছিল অবন্তী। ভিডিও নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ওর ছিল না। অবন্তী কী করেছে, কেন করেছে, তার স্পষ্ট ধারণা ওর নিজেরও নেই।

একটা এলোমেলো স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সেই স্বপ্ন যতটা মনে ছিল, তার থেকে খানিকটা খামচে খানিকটা মনগড়া শব্দ দিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলে দিয়েছে। দিন দুয়েক কোনও ভিডিও আপলোড করা হবে না। এসব হাবিজাবি চলুক। একেবারে ফাঁকা মস্তিষ্কে উৎফুল্ল মনে ঘুমিয়ে পড়েছিল অবন্তী।

ঘুমের মধ্যে অবন্তী বুঝতে পারল, ওর ফোনটা তীব্রভাবে কাঁপছে। চোখ খুলে দেখে, স্ক্রিনে লাইভ চলছে। ওরই অ্যাকাউন্ট থেকে। কিন্তু অবন্তী তো কোনও লাইভ শুরু করেনি। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে তারই ঘর, বিশাল পর্দা। আলো নিভু নিভু। ক্যামেরার ফ্রেম ধীরে ধীরে অবন্তীর দিকে এগোচ্ছে। সামান্য রাতপোশাক অবন্তীর পরনে। ফোন উল্টে রেখে গায়ে চাদর জড়িয়ে কোনওরকমে লাইভটা বন্ধ করল অবন্তী। ওর শরীরটা কেঁপে উঠছে ভয়ে।

গায়ে পোশাক চাপিয়ে ফোন সোজা করে অবন্তী দেখল, ওর ঘরের ছাদ দেখা যাচ্ছে। ওর পাশাপাশি আরও একজন ঢুকে পড়েছে স্ক্রিনে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু কণ্ঠ ভেসে বেড়াচ্ছে।

“অবন্তী, তুমি নিজেকে বুঝিয়েছিলে, মানুষ শখে ভয় পেতে ভালোবাসে। আমি তোমার সেই ভয় অবন্তী। তুমি আমাকেই ম্যানিফেস্ট করেছিলে। আমি তোমার সেট করা নতুন অ্যালগরিদম। ভয়।"

হঠাৎ লাইভ বন্ধ। লাফিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিল অবন্তী। নিজের অ্যাকাউন্ট তন্নতন্ন করে খুঁজেও রেকর্ডেড লাইভটা ও খুঁজে পেল না। অবন্তীর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল একটা শিরশিরে অনুভূতি।

পরদিন অবন্তীর আগের পোস্টগুলো নিজে থেকেই কেমন যেন বদলে যেতে লাগল। আগের হাসির ভিডিওতে গা শিউরে ওঠা মিউজিক। মেকআপ রিলে অবন্তীর পিছনে অচেনা ঝাপসা ছায়া। আগের সমস্ত ভিডিওগুলো কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চলতে শুরু করেছে। কমেন্ট সেকশনে সকলে লিখছে, "তোমার পেছনে কে দাঁড়িয়ে অবন্তী?" "তোমার চোখ দুটো এমন ঘোলাটে কেন?"

অবন্তী ভিডিওগুলো মুছে ফেলতে চাইল, পারল না। অনেক ভিউজ ধারণ করে রয়েছে ভিডিওগুলো। এভাবে হঠাৎ মুছে দিলে ধস নামবে প্রোফাইলে। অ্যাকাউন্ট সেটিংসে গিয়ে অনলি মি করতে চাইল অবন্তী। সম্ভব হল না। টাকার নেশা বড় মারাত্মক। ড্যাশবোর্ডে বিছিয়ে যাচ্ছে সবুজ গালিচা। ডলারের সংখ্যাটা তরতরিয়ে চড়ছে.... এবার একটা গাড়ি কেনা আটকায় কে!

ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে। এসব উল্টোপাল্টা ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এবার বেরিয়ে পড়ার পালা। আয়নায় তাকিয়ে অবন্তী চমকে উঠল। আয়নায় তার ছায়া একটু যেন দেরিতে নড়ছে। তাই কি!

ফোন বেজে উঠল। নতুন নোটিফিকেশন। "Your content performance is improving."

অবন্তীর মনের ভিতর থেকে নারীকণ্ঠ ফিসফিস করে বলল, "ভয় না পেলে তারা তোমায় দেখবে কেন? এই পথেই হাঁটতে হবে। এটাই সঠিক পথ।"

অবন্তী মনের আনন্দে ট্রেনে চেপে বসল। ওর নতুন ভিডিও ট্রেন্ডিংয়ে যাচ্ছে। আর চিন্তা নেই। সামনের মাসেই গাড়ি কিনে ফেলা যাবে। তবে একটা জিনিস অবন্তীর দর্শকরা জানে, কিন্তু অবন্তী জানে না।

ওর শেষ আপলোড করা ভিডিওতে অবন্তী আর নেই। রয়েছে তার ঘর। তার বিছানা। আর আয়নার সামনে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা অবন্তীর মতোই কেউ একজন। এটাই নতুন অ্যালগরিদম।

অ্যালগরিদম শুধু কনটেন্ট শেখে না। সে মানুষও শিখে ফেলে। তারপর একদিন আস্ত মানুষকে গিলে খায়।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

ফ্রেমের বাইরে কেউ প্রথম পর্ব


 


ফ্রেমের বাইরে কেউ

সাথী দাস

প্রথম পর্ব


।। ঘরের দরজায় ঘনিয়ে এল রাত ।।

চোখ কচলে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল অবন্তী। ওর দৃষ্টি ভীষণ ক্লান্ত। আজ একটানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে ভিডিও এডিট করতে হয়েছে। সন্ধের আগেই পিঠ কোমর জবাব দিয়েছে। চোখ ভেঙে এসেছে ঘুমে। আর বসে থাকতে পারছিল না। তারপরই অবন্তী আশ্রয় নিয়েছে বিছানায়।

মাথায় যেন পর্বত চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। সেই যে সন্ধের মুখে ও ঘুমিয়েছিল, ঘুম ভাঙল এখন। ক'টা বাজে? সময়ের কোনও ধারণা অবন্তীর নেই। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে রইল সে।

অবন্তী নিজেকে কথা দিয়েছে, যতরকম কাজ থাক, যত ব্যস্ততাই ওকে গ্রাস করুক, কোনওভাবে ভিডিও আপলোডের সময় এদিক-ওদিক হবে না। পরিশ্রমের প্রতি প্রকৃত অর্থে সৎ হলে, সাফল্য কখনও উঁকি মেরে টুকি ব'লে পালায় না।

অবন্তী বরাবরই একগুঁয়ে মেয়ে। যদিও জেদ করে আজ পর্যন্ত ও যা করেছে, তাতে ওর ভালোই হয়েছে। অবন্তী বোঝে, যে কোনও কাজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। মাঝে-মাঝে জীবনটা যে একঘেয়ে মনে হয় না, তা নয়।

হতাশা কিংবা আলসেমি চেপে ধরলে তখন আরও বেশি জেদ চেপে যায় অবন্তীর মনে। নিজেকে শাসন করে ও বলে, ভোঁতা লোহাও ক্রমাগত ঘষতে ঘষতে এক সময় ধারালো হয়ে ওঠে। তখন সেই অস্ত্র দিয়ে মানুষ খুন করা যায়। সাফল্যকে এফোঁড়-ওফোঁড় করা তো খুব ছোট ব্যাপার।

অবন্তীর কাজের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা ভীষণ রকম প্রয়োজনীয়। মনোরঞ্জনের আরও একশো এক রকম পথ আজকের মানুষের সামনে খোলা রয়েছে। মাত্র এক ক্লিকেই উধাও হয়ে যাবে দর্শক। মানুষকে টেনে বেঁধে রাখতে হবে স্ক্রিনের সঙ্গে। সর্বক্ষণ ঝাঁ চকচকে বিষয়বস্তু হয়ে মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠতে না পারলে ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ফোন বেজে উঠল মৃদুস্বরে। অবন্তীর আলগা ঘুমে যেন কোনওভাবেই ব্যাঘাত না ঘটে, সেই স্পর্শকাতর বিষয়ে যন্ত্রটাও যেন সচেতন। অবশেষে চোখ টেনে খুলল অবন্তী। মা ফোন করছে।

'উমম.... বলো।'
'এই ভর সন্ধেবেলা পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস? ঘরে কি একটু সন্ধেবাতিও দিতে নেই? বুঝি না বাপু তোদের কাজ-কারবার! সারাদিন চোখ ঘুমে ঢুলঢুল করবে, রাতে পেঁচার মতো জেগে বসে থাকবি।'
'কী বলবে বলো না...'
'হ্যাঁ বলছি বলছি। বেশি কথা বললে তো আবার আজকালকার ছেলেমেয়েরা বিরক্ত হয়ে যায়! বলছি এবার জন্মদিনে বাড়ি আসবি তো? নাকি ওই ফ্ল্যাটেই একলা পড়ে থাকবি? বাবা জিজ্ঞাসা করছিল। তুই আসতে না পারলে এবার আমরা যাব।'
'পরশু রাতে আমার ট্রেন আছে মা।'
'ও মা! সে কী! আবার ট্রেন!! ক'দিন পরই জন্মদিন। বাপ-মা যে জন্ম দিয়েছে, সেটাও মনে রাখার প্রয়োজন নেই! ও গো শুনছ...'
'আরে মা! আবার শুরু করলে...'
'হ্যালো...'
'বাবা প্লিজ মাকে বোঝাও।'
'সে আমি তোর মাকে সামলে নেব। তা কোথায় যাচ্ছিস এবার?'
'এই জন্য আমি তোমাকে এত্ত ভালোবাসি বাবা। সে তো এখন বলব না। ওখান থেকে ছবি ভিডিও পাঠাব। তুমি গেস করবে।'
'প্রত্যেকবার তোর এই না ব'লে যাওয়াটা আমাদের খুব চিন্তায় ফেলে রে! হঠাৎ রাত নেই, দুপুর নেই.... ফোন করে বলিস, এখানে আছি। ওখানে আছি। বাড়িতে তো একটু বলে যেতে হয়! কোথায় যাচ্ছিস, ক'দিনের জন্য যাচ্ছিস...'
'উঁহু! প্রথম তিন সেকেন্ডে সব রিভিল করে দিলে শেষ পর্যন্ত ভিডিও কেউ দেখবে বাবা? জীবনে ওই থ্রিলটাই হল আসল। এরপর কী হবে? এরপর কী হবে? এটা কোথায়? এখানে যাওয়ার খরচ কেমন.... এসব জানার জন্য সবাই হাঁ করে বসে থাকবে। ভিউজ আমার, টাকা আমার। গাড়ি তোমার।'
'গাড়ি মানে?'
'মানে আমি সব মনে রেখেছি। যারা তোমাকে ন্যায্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছিল, তাদের চোখের সামনে তোমাদের বাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। এখানে আমি মাথা গোঁজার মতো একটা ছোট ফ্ল্যাটও করেছি। আর ছ'টা মাস অপেক্ষা করো বাবা। আশা করছি দুটো ট্রিপ মারতে পারলে গাড়িটাও হয়ে যাবে। আমাদের প্রথম গাড়ি বাবা! তুমি শুধু মাকে একটু সামলে রাখো প্লিজ!'

বোধহয় বাবার কন্ঠ বুজে এসেছিল। তবুও অবন্তীর খুব ভালো লাগল। মায়ের সামনে ও কোনওদিনই নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। ওর যত গল্প বাবার সঙ্গে। সেই বাবা গল্প করতে করতে হঠাৎ চুপ করে গেল আজ। অবন্তী জানে, বেশি আনন্দে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আর দুঃখে পাথর...

বিছানা ছেড়ে অবন্তী বাথরুমে গেল। একলা থাকার মতো এক কামরার একটা পুঁচকি ফ্ল্যাট গত বছর অবন্তী কিনেছে। হাত বাড়ালেই সমস্ত কিছু এখন হাতের সামনে পাওয়া যায়। অবন্তীর এই ফ্ল্যাটে অভাব নেই, একাকীত্বও নেই।

নিজেকে পরিপাটি রাখতে অবন্তী বড় পছন্দ করে। ব্রাশ করতে করতে বাথরুমের আয়নার দিকে চেয়ে অবন্তী ভাবল, এমন বিলাসিতার জীবন সত্যিই ওর প্রাপ্য ছিল! মাত্র দু'বছরের মধ্যে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেল ও।

কলেজ ছেড়ে চলে আসার দুঃখটা এখন অবন্তীকে আর কাবু করতে পারে না। রাতারাতি এই গগনচুম্বী সাফল্য ওর সমস্ত দুঃখ ঘুচিয়ে দিয়েছে। অবন্তীর একাকীত্বের সঙ্গী হয়ে সর্বক্ষণ সজাগ রয়েছে প্রায় আট লক্ষ অনুসরণকারী। ফোনটা হাতে তুলে নিলেই তারা নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে অদৃশ্য শক্তিকে সঙ্গী করে।

এই লোক দেখানো জীবন নিয়ে অবন্তী বেশ খুশি। ক্যামেরার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদেখা ভয় নিয়ে ওর বিশেষ মাথাব্যথা নেই। ক্যামেরার সামনে ঝকঝকে হাসি আর বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা ওর একমাত্র মূলধন। ক্যামেরার বাইরের অদৃশ্য সন্ত্রাস সম্পর্কে কেউ না জানলেও তেমন ক্ষতি নেই। ডিজিটাল জনপ্রিয়তার অভিশাপ ওকে আজ পর্যন্ত ছুঁতে পারেনি।

হলদে ফুলওলা সিঙ্কে কুলকুচি করে জল ছুঁড়ে দিল অবন্তী। দেখনদারির স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টগুলো থরে থরে সাজানো রয়েছে বাথরুমের একদিকে। ব্র্যান্ড প্রোমোশনের জন্য এসব জিনিস প্রায় প্রত্যেক মাসে ওর ঠিকানায় আসে। ক্যামেরার সামনে বাধ্য হয়ে কিছুক্ষণের জন্য এগুলো ব্যবহার করে প্রশংসার বন্যায় ভেসে যেতে হয়। তারপর জিনিসগুলো আবর্জনার মতো জমতে থাকে ঘরের এককোণে। সবই যে খারাপ তা নয়। কিছু জিনিস সত্যিই ভালো হয়। সেগুলো অবন্তী রেখে দেয় নিজের ব্যবহারের জন্য।

সময়বিশেষে অবন্তীরও দুঃখ হয়। এখনও ও 'না' বলতে শিখল না। বোল্ড ফটোশুট? আগেপিছে কিছু না ভেবে হ্যাঁ বলে দিল। ব্রাইডাল ফটোশুট? এককথায় হ্যাঁ। অকারণ কোল্যাব? হয়তো এতে অবন্তীর কোনও লাভ নেই। তবুও টাকার জন্য রাজি হয়ে যায় সে। অবন্তীর এখন একটাই পরিচয়, ও হল কন্টেন্ট। সেই অর্থে মানুষ নয়।

মানুষের কিছু অনুভূতি থাকে একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু অবন্তীর হাসি-কান্না, মনখারাপ, ব্যক্তিগত ভাবনা আবেগ সবই বিক্রি হয় খোলা প্ল্যাটফর্মে। বিনিময়ে ড্যাশবোর্ডে বিছিয়ে থাকে ঘন সবুজ গালিচা। হু-হু করে বৃদ্ধি পায় অনুসরণকারীর সংখ্যা।

অবন্তীর কাছে মানুষের পরিচয় মানুষ হিসেবে নয়। তারা কেবল একটা সংখ্যা, এনগেজমেন্ট, রিচ। দর্শকও সেই অর্থে নেটনাগরিক নয়। তারা আসলে অবন্তীর শিকার। অবন্তী গিলে খাচ্ছে তাদের মূল্যবান সময়। জাগিয়ে দিচ্ছে তাদের লোভ। দর্শকের মনের গোপন সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা প্রতিহিংসাপরায়ণতা, প্রতিযোগিতা.... সমস্তই জলের দামে দেদার বিকিয়ে যাচ্ছে। অবন্তীর খাতায় জমা হচ্ছে প্রচুর টাকা। কিন্তু ওর জন্য খরচ হয়ে যাচ্ছে আট লক্ষেরও বেশি মানুষ। অথচ তারা জানতেও পারছে না।

কে কাকে দেখছে? তারা অবন্তীকে দেখছে? না! হাসে অবন্তী। এটাই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। অবন্তী প্রতি মুহূর্তে ঈগলের দৃষ্টিতে দেখছে তাদের। মন্তব্য বিভাগ থেকে তাদের ভিতর পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারে অবন্তী। তাদের রাগ, ঘৃণা, হতাশা, আক্ষেপ.... প্রবল হয়ে ওঠে রিপু। তার দমন অসম্ভব। মানুষকে খেপিয়ে তোলার যে ছলাকলা অবন্তী বিগত কয়েক বছরে রপ্ত করেছে, সেই মোহ থেকে একজন অনুসরণকারীরও নিষ্কৃতি নেই।

অবন্তী যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রাণবন্ত, সুহাসিনী এবং বাকপটু। পরিবেশিত বিষয়বস্তুর মধ্যে দুর্দান্ত উপাদান রয়েছে, এ কথা জোর দিয়ে বলা চলে না। কিন্তু তার উপস্থাপনা অত্যন্ত ঝকঝকে। যদিও মনের ভিতরে সে একপ্রকার স্বীকৃতির তেষ্টায় আক্রান্ত। সেই সঙ্গে আজকাল জমা হয়েছে নিদারুণ ভয়। হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া কিংবা নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

অবন্তীর ফ্ল্যাটের দরজায় রাত নামল। শহরের আলো একে একে জ্বলছে। যেন অদৃশ্য কোনও হাত আকাশের গা হাতড়ে আলোর সুইচ টিপে দিচ্ছে। রান্নাঘরের আলো নিভিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল অবন্তী। বাতাস যেন ক্রমে ভারী হয়ে উঠছে। নীরবতার মধ্যে ভেসে আসছে অচেনা শব্দ। ঠিক শব্দও নয়, যেন ফিসফিস করে কেউ ডাকছে। অবন্তীর নাম ধরে...

এসবে অভ্যস্ত অবন্তী। রাতে একা থাকলে মনে হয় ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটা আসবাব এখনই কথা বলে উঠবে। প্রথমে একা থাকতে বেশ অসুবিধা হলেও এখন বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে। স্ক্রিনের নীলচে আলো অবন্তীর মুখে অদ্ভুত ছায়া ফেলে রেখেছে।

ভিডিওতে দ্রুতগতিতে কাটছাঁট চলছে। ফ্রেমের পর ফ্রেম, শব্দের পর শব্দ। রাতই অবন্তীর কাজের সময়। কীবোর্ডে আঙুল চলতে থাকে অবিরাম। কিন্তু মনে হয় যেন ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে নিজের প্রতিবিম্বের পেছনে হঠাৎ যেন আর একটা ছায়া দুলে উঠে। চমকে তাকায় অবন্তী। কোথাও কিছু নেই।

ফ্ল্যাটের বাইরে অলৌকিক রাত নেমে এসেছে। বাতাসে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। বারান্দার দিকের দরজাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল অবন্তী। একটু ফাঁক পেলেই ওখান দিয়ে বেয়াদপ হাওয়া ঢুকে পড়ে। লিফটের দিক থেকে ধাতব শব্দ এল। ডিং! করিডোরের দেওয়ালে আলো-ছায়া কেঁপে ওঠে, যেন দেওয়ালগুলো শ্বাস নিচ্ছে।

কাজে একদম মন বসছে না। বিরক্ত লাগছে। হেডফোন খুলে ছুঁড়ে ফেলতেই নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে আসে। নিজের শ্বাসের শব্দও অবন্তীর কাছে ঘোর অচেনা লাগে। স্ক্রিনে পজ করে রাখা ভিডিওতে থমকে গেছে অবন্তীর মুখ। যেন রক্তশূন্য প্রাণহীন রুক্ষ একটা মুখ। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম স্থির।

অবন্তীর অস্বস্তি বাড়ল। ভিডিওর এফেক্টটা ও বদলে দিল। হ্যাঁ, এবার মানুষের মতো লাগছে। সেই মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে ভাবটা চলে গেছে। প্রত্যেকবার এই একই ফিল্টার ব্যবহার করে অবন্তী। তবে আজ নিজেকে দেখে এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?

ল্যাপটপের ওপর অবন্তীর হাত থেমে যায়। ও বেশ বুঝতে পারে, ওকে গিলে খাচ্ছে ভয়। নাঃ! অনেক কাজ হয়েছে। এবার সত্যিই একটা লম্বা ছুটি দরকার। উল্টোপাল্টা ভাবনারা মাথায় ভিড় করছে।

অবন্তী মনস্থির করে এই ছুটিতে ও কেবল বেড়াবে। ট্রাইপড আর ক্যামেরা নিয়ে বেশি কারসাজি করবে না। আরামদায়ক চেয়ারে বসে আড়মোড়া ভেঙে একবার বাঁই করে ঘুরে যায় অবন্তী।

ঘরের বাইরে নিশুতি রাত হাসে না, কাঁদেও না। শুধু ধীরে ধীরে অবন্তীর দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।

।। ফিল্টারের আড়ালে ফাঁদ ।।

নাকের সামনে ম্যাগির বাটিটা নিয়ে বড় করে শ্বাস নিল অবন্তী। জিভে জল এসে গেল। এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার ও সাধারণত খায় না। তবে আজ কাজে যখন একটু ঢিলেমি দেওয়া হয়েই গেল, তখন একদিন খাবারেও চিট করাই যায়।

একনাগাড়ে হাবিজাবি স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহারের ফলে অবন্তীর মুখের চামড়াটা বেশ রুক্ষ হয়ে গেছে। শুকনো খোসার মতো মৃত কোষগুলো উঠছে। মা থাকলে চিৎকার করে বলত, অবন্তী সাপের মতো খোলস ছেড়েছে। এখন কিছুদিন ব্র্যান্ড প্রোমোশনের কাজ বন্ধ রাখতে হবে।

চামড়ার ক্ষতি করে শুট করাই যেত, কিন্তু মানুষকে নিজের বক্তব্যের সত্যতার প্রমাণ দেওয়া যেত না। মিথ্যে ব্যাপারটা খানিকটা ফিল্টারের মতো। এমনিতে বেশ ভালো, কিন্তু প্রকৃত রূপটা ধরা পড়ার আগে পর্যন্তই।

মুখের চামড়াটা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত নিজের কন্টেন্ট বদলে নিয়েছিল অবন্তী। কিন্তু একই ফ্ল্যাটের হোম ট্যুর আর কতদিন মানুষ দেখবে? ঘরের প্রতিটি দরজা-জানালার পর্দা, এমনকি বালিশের কভার থেকে শুরু করে অবন্তীর মেঝের পাপোষের রঙ পর্যন্ত মানুষ জানে। ঘরের প্রত্যেকটা কোণ ছুঁয়ে গেছে যান্ত্রিক ক্যামেরার লেন্স।

অগত্যা অবন্তীর ক্যামেরা ঘুরে গেছে নিজের থালার দিকে। স্বাস্থ্যকর কন্টেন্টের জন্য সমস্ত দিন স্যালাড আর ডালিয়ার খিচুড়ি খাওয়ার পর রাতে একবাটি মশলাদার ম্যাগি যেন অমৃত মনে হচ্ছে। সুড়ুৎ করে খানিকটা ঝোল টেনে নিতেই সরাসরি নাকে উঠে গেল মশলাটা।

খ্যাক-খ্যাক করে কাশি শুরু হল। সেই সঙ্গে নাক জ্বালা করছে। জলের বোতলের দিকে হাত বাড়াতেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সমস্ত ঘর ডুবে গেল অন্ধকারের অতলে। হঠাৎ স্থির হয়ে থাকা ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে চেয়ে চমকে উঠল অবন্তী।

গোটা ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। তার মধ্যে স্ক্রিনে ফ্যাকাশে অবন্তী একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তার চোখে কেমন যেন আতঙ্ক বিস্ফারিত শীতল দৃষ্টি। ঘরের অন্ধকারে বিদ্যুতের অভাব স্পষ্ট।

অস্ফুটে একটা আওয়াজ বেরিয়ে গিয়েছিল অবন্তীর কন্ঠ চিরে। কাশির দমকে চোখে জল আসছে। দৃষ্টি ঝাপসা। অবন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল। এখনও স্ক্রিন থেকে অবন্তী চেয়ে রয়েছে অবন্তীর দিকে। তবে চাউনিটা আগের মতো অস্বস্তিকর নয়।

এই প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে অবন্তী ভিডিও আপলোড করতে পারল না। ও স্পষ্টই বুঝতে পারল, বিশ্রাম প্রয়োজন। শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না আর। ল্যাপটপ বন্ধ করে অবন্তী বিছানায় উঠল।

ম্যাগির বাটির একটা সাধারণ ছবি তুলে অবন্তী শান্তি পেল না। খাবারের সেই ছবির ওপরে একের পর এক ফিল্টার লাগিয়ে চলল। তারপর খুলল নিজের ইন্সটা। আইডির নাম আরবান কুইন অবন্তী, ঝকঝকে প্রাণোচ্ছল একজন মানুষের ছবি রয়েছে। শতরকম ফিল্টার পেরিয়ে একবাটি ম্যাগির ছবি স্টোরিতে ঝুলিয়ে সেই রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল আরবান কুইন।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত।

রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সেই তো এলে ভালোবাসা দ্বিতীয় পর্ব


 



সেই তো এলে ভালোবাসা
সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব




মধ্যরাতের এমন কত শুভ্র অপ্রাপ্তি ভোরের আলোর সঙ্গে মিশে আলগোছে ভূমি স্পর্শ করে। যা মনকে যাতনা দেয়, তেমন অনুভূতিদের সযত্নে মনে ধরে রাখলে সংসার হয় না। সংসার করতে গেলে একজনকে নির্লজ্জ হতে হয়। যাবতীয় আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে বারংবার ভিক্ষুকের মতো হৃদয় পেতে দাঁড়াতে হয় প্রিয় মানুষের সামনে। দয়া ভিক্ষা করতে হয়। করুণাও ভিক্ষা করতে হয়। অরুণাক্ষর মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, গলা ছেড়ে কেঁদে চোখ লাল করে ফেলে। দারুণ অভিমানে ছিঁড়ে-খুঁড়ে খায় সঞ্চারিণীকে। পান করে ওর দেহসুধা। তপ্ত দুপুরে ওর সঙ্গ কামনা করতে ইচ্ছে হয়।

পরমুহূর্তেই বিস্বাদ হয়ে ওঠে মন। কামনার রাতগুলোতে একাধিকভাবে সঞ্চারিণীর প্রত্যাখ্যানে নিজেকে কেমন নারীদেহলোলুপ কামুক পুরুষ মনে হয়। মাত্রাতিরিক্ত ঘৃণা জন্মায় নিজের প্রতি। আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছয়। সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে নিজেকে নষ্ট চরিত্রের পুরুষ ভাবতে দ্বিধা হয় না।

সঞ্চারিণীর রূঢ় আচরণ প্রতি মুহূর্তে অরুণাক্ষকে মনে করিয়ে দেয়, সে প্রতারক। এ জগতে যা কিছু সঞ্চারিণীর প্রাপ্য ছিল, কথা দিয়েও সেসব কিছুই অরুণাক্ষ দিতে পারেনি। তার মতো দরিদ্র মানুষ ইহলোকে থাকার অর্থ কেবল পৃথিবীর ভার বৃদ্ধি। এর বেশি কিছু না।

কোনও এক রাতের তুমুল বাকবিতণ্ডার পর অরুণাক্ষ আকুল হয়ে থাকে নতুন সকালের আশায়। সঞ্চারিণী যদি সামান্য অনুতপ্ত হয়, তবে অরুণাক্ষর মনের গোপন ক্ষত সহজেই উপশম হতে পারে। কিন্তু সঞ্চারিণীর দৃষ্টিতে অনুতাপের দেখা মেলে না। সেখানে নীরব ক্ষোভ ছাড়া কিছু অবশিষ্ট নেই।

সম্পর্ক যখন প্রতিনিয়ত বিষধর সাপের মতো দংশন করে, তখন বিষক্রিয়ায় নীল হয় মন। ব্যথাতুর হৃদয় আশ্রয় চায়। ভরসা চায়। কিন্তু সঞ্চারিণীর গগনচুম্বী আকাঙ্খার কাছে প্রত্যেকবারই পরাজিত হয়ে মুখ লুকিয়ে পালিয়ে আসে অরুণাক্ষর যাবতীয় প্রার্থনা। অকর্মণ্য নামক বিশেষণে জর্জরিত হয় অরুণাক্ষ। পুরুষের একমাত্র নীরব ঘাতক অর্থনৈতিক অক্ষমতা। সেই ঘাতক দিন-রাত কুরে কুরে খায় অরুণাক্ষকে।

পাশের ঘরে ছাত্র পড়াচ্ছিল সঞ্চারিণী। এই সময় মিলি-মেহুও বইপত্র নিয়ে মায়ের কাছে পড়তে বসে। অতীতের মেধাবী সঞ্চারিণী আজ বড় কঠিন শিক্ষিকা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ডিগ্রি সঞ্চারিণীকে কেবল উচ্চশিক্ষা দেয়নি, সেই সঙ্গে খানিক দম্ভের প্রলেপ লেপে দিয়েছে তার শ্বেতপাথরের মতো মসৃণ গালে। কিন্তু বিয়ের আগে সেই দম্ভ প্রকাশ্যে আসেনি। তখন সঞ্চারিণীর ব্যবহারে কেবল নিখাদ প্রেমেরই প্রকাশ ছিল। নিজের চেয়ে অধিক শিক্ষিতা এবং সুন্দরী সঞ্চারিণী যখন অরুণাক্ষর বিয়ের প্রস্তাবে এককথায় রাজি হয়েছিল, তখন অরুণাক্ষ ভেবেছিল, এ গভীর প্রেম এবং মনের টান ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়। সেই ঘোর কেটেছে বহু পরে।

সঞ্চারিণী যখন রান্নাঘরে প্রবেশ করল, বাসনের ঝনঝনানিতে অরুণাক্ষ চমকে উঠল। বোতল ভরতে গিয়ে খানিক জল চলকে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু অন্যদিনের মতো সঞ্চারিণী রাগতস্বরে কথা শোনাল না। অরুণাক্ষ বুঝল, গতকাল ওর দিদির কানপাশার উজ্জ্বলতার কাছে ম্লান হয়েছে সঞ্চারিণীর যাবতীয় সান্ধ্যসুখ। অমন একজোড়া কানপাশা দিয়ে কান সাজাতে না পারলে নারীজন্ম অর্থহীন। এই লজ্জায় অরুণাক্ষর দু'কান কাটা যাওয়াই কাম্য। গুণবান স্বামীর যাবতীয় ঐশ্বর্য প্রকাশ পায় স্ত্রীর সাজসজ্জায়। আর এ বিষয়ে অরুণাক্ষ এক দারুণ দৈন্যতার পরিচায়ক। মুঠোফোন বের করে সেইদিনের সোনার বাজারদরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল অরুণাক্ষ। এতে স্বর্ণব্যবসায়ীর লাভ-লোকসান বিশেষ হল না। কেবল পুরুষ হৃদয়ের অক্ষমতা এবং দীর্ঘশ্বাস পরষ্পরকে গাঢ়ভাবে আলিঙ্গন করল।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বাইকের দিকে চেয়েছিল অরুণাক্ষ। বাইকটা বিক্রি করে দিলে ওর অনেক অসুবিধা হবে। এই মুহূর্তে স্কুলবাসের জন্য অতিরিক্ত খরচ ওর কাছে বিলাসিতার সমান। অফিস যাওয়ার পথে এই বাইকে চাপিয়েই মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়। ভিড় বাসে চেপে স্কুলে যেতে ওদের ভারি কষ্ট হবে। আর কোনও পথ খুঁজে পায় না অরুণাক্ষ। অস্থির লাগে ভীষণ। দৃষ্টি ঝাপসা হয়। একটা চেনা মুখ ক্রমে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। না না! এসব স্বপ্ন। রাজু এখানে কোথা থেকে আসবে? অসহায়তার মুহূর্তে অরুণাক্ষ নিশ্চয়ই অবচেতন মনে বাড়ির ছাদে পৌঁছে গিয়েছিল! তাই রাজুর দেখা পেল।

"দাদা, কেমন আছিস?"

স্বপ্ন নয়। মনের ভুল নয়। সত্যিই একমাত্র বোন রাজন্যা দেখা করতে এসেছে অরুণাক্ষর সঙ্গে। দাঁড়িয়ে আছে ওর একেবারে সামনে। রাজন্যার সঙ্গী একজন সুদর্শন পুরুষ।

"রাজু তুই!"
"তোর সঙ্গে কথা আছে দাদা।"
"মায়ের শরীর কেমন আছে?"
"ঠিক আছে। মা আমাকে তোর কাছে পাঠাল।"
"আমার কাছে! কী ব্যাপার?"
"ওর নাম প্রত্যূষ। দু'মাস পর আমরা বিয়ে করছি। তোর হাতে আধঘন্টা সময় হবে দাদা? কিছু কথা ছিল।"

অরুণাক্ষর ফোন পেয়ে ঘরের মধ্যে আনন্দে ফেটে পড়ল সঞ্চারিণী। ফোন কানে ধরে মহা উল্লাসে সঞ্চারিণী বলল, "দিদি.... রাজু এসেছে ওর সঙ্গে দেখা করতে। আমার শাশুড়ি বলে পাঠিয়েছে, বাড়ির একমাত্র ছেলেকে ছাড়া বাড়িতে শুভকাজ হয় না। আমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরতে বলেছে। শাশুড়ি আমার সঙ্গে আজ ফোনে কথা বলবে। ও এখন রাজু আর ওর বরকে সঙ্গে নিয়ে এ বাড়িতে আসছে। এতদিন ঐ মেয়ে একা ব্যবসার সব টাকা লুটেপুটে খাচ্ছিল। এবার আমি ঢুকব ওখানে। ওর বিয়ে হলে গেলেই সব আমার একার হবে। আমার কপাল খুলে গেল রে দিদি! আমার সুখের দিন এলো! এবারও যদি ও মানুষ বাগড়া দেয়, বাড়ি যেতে না চায়.... তুই দেখিস ওর কী অবস্থা আমি করি..."

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

সেই তো এলে ভালোবাসা প্রথম পর্ব




সেই তো এলে ভালোবাসা
সাথী দাস
প্রথম পর্ব


 


দু'কামরার ছোট ফ্ল্যাটের প্ৰতিটি কোণে অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা। জানালা-দরজায় রং-বেরংয়ের বেলুন ঝুলছে। এই ফ্ল্যাট অরুণাক্ষর নিজস্ব নয়। সে কেবল ভাড়াটে। কয়েক বছর আগে সৌভাগ্যক্রমে এক প্রবাসী বন্ধুর ফ্ল্যাট নামমাত্র ভাড়ার বিনিময়ে অরুণাক্ষ পেয়েছিল। ঠিকানা নিজের নয়, তবুও তাকে আপন করে তোলার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় অরুণাক্ষর বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই। মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে ভূমিষ্ঠ হওয়া দুটি কন্যাসন্তানের আজ জন্মদিন। স্ত্রী সঞ্চারিণী ছাড়া অরুণাক্ষর জীবনের অর্থ মৃত্তিকা ও মিহিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সৌভাগ্যের সন্ধানে একনাগাড়ে ছুটে চলেছে অরুণাক্ষ। আর্থিকভাবে খানিক সচ্ছল হতেও কেটে গেছে কয়েক বছর। তবু এখনও মাসের শেষে চিন্তার বক্ররেখা ওর কপালের শোভাবর্ধন করে। দীর্ঘকালীন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে অরুণাক্ষর মনে হয়, ভাগ্যদেবীকে প্রসন্ন করা এত সহজ নয়। পরমুহূর্তেই মৃত্তিকা আর মিহিকা নামক দুই চালিকাশক্তির হাসিমুখের ছবি ভেসে ওঠে ওর মনে। ওদের সঙ্গে যোগদান করে ভালোবাসার প্রতিমূর্তি সঞ্চারিণী। তখন অরুণাক্ষর সকল আক্ষেপ দূর হয়ে যায়। তবে গভীর রাতে স্ত্রী-কন্যা ঘুমিয়ে পড়লে অরুণাক্ষ একাকী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পরিবারের থেকে দূরে বসবাস করার কষ্ট ওর মনে সামান্য। শূন্য থেকে শুরু করার যন্ত্রণাও তেমন জোরালোভাবে নেই। নির্বাসন সেই অর্থে বেদনার নয়। কেবল যদি সেদিন মায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসা যেত.... অন্তত দূর থেকে মায়ের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যটুকু পালন করার অধিকারও যদি পাওয়া যেত...

এই স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়ে অরুণাক্ষর মনে খেদ নেই। নিজেদের বৃহৎ পারিবারিক ব্যবসা, মা-বোন সকলের থেকেই দূরত্ব বজায় রেখেছে সে। শহর একই হলেও তাদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব অনতিক্রম্য। আক্ষরিক অর্থে খাতায়-কলমে ত্যাজ্যপুত্র না হলেও, অরুণাক্ষ জানে সঞ্চারিণীকে জীবনসঙ্গিনী নির্বাচন করার অপরাধে নিজের বাড়িতে কোনোদিন ওর ঠাঁই হবে না। তবুও মনের গোপন কোণে মাঝে মধ্যে ভেসে ওঠে বাড়ির ছাদের ছবি। নাকে ভেসে আসে পেট্রোলের গন্ধ। ভাই-বোনের খুনসুটি বাতাসে ভেসে অরুণাক্ষর কান ছুঁয়ে যায়। ভাতৃদ্বিতীয়া নিজস্ব গতিতে আসে, আবার ফিরেও যায়। ঐ একটি দিনে অরুণাক্ষর বড় কষ্ট হয়। কোমল স্পর্শের অভাবে রুক্ষ কপাল চড়চড় করে। শাড়ির দোকানের দিকে চেয়ে রাস্তার ওপরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অরুণাক্ষ ফিরে আসে। একমাত্র বোন রাজন্যার কথা মনে পড়ে।

রংয়ের ডিলারশিপ নিয়ে একটি দোকানের ওপর ভরসা রেখে প্রাথমিকভাবে ব্যবসা শুরু করেছিলেন অরুণাক্ষর ঠাকুর্দা। ভাগ্যদেবী অত্যধিক সুপ্রসন্ন হওয়ায় অরুণাক্ষর বাবার মাধ্যমে সেই ব্যবসার পরিধি বিগত চল্লিশ বছরে আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। ক্রমে স্থানীয় বাজারে রংয়ের দোকান ছাড়াও একটি পেট্রোল পাম্প, একটি উপহার সামগ্রীর দোকান ও বাজার থেকে অদূরবর্তী স্থানে কয়েকটি গোডাউন ভাড়া দেওয়া আছে। তবে সে সকল পিছুটান ছেড়ে বর্তমানে একটি ইলেক্ট্রনিক্সের শোরুমে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতনের বিনিময়ে অরুণাক্ষ শ্রম প্রদান করে। সঞ্চারিণী একাধিকবার শ্বশুরবাড়ি ফিরতে চাইলেও অরুণাক্ষ মাথা নামিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। দূরে সরিয়ে রেখেছে নিজেকে।

মানে-অভিমানে, আদরে-সোহাগে সঞ্চারিণীর সঙ্গে অরুণাক্ষ বড় সুখী ছিল। এই সুখকে চিরস্থায়ী করতে নিজের পরিবার বৃদ্ধির কথা ভেবে দুটি মানুষ কামনার সমুদ্রে একান্তে ভাসিয়েছিল প্রেমের তরী। কিছুদিনের মধ্যে তারা জানতে পারে, নতুন অতিথিরা জোড়ে আসছে। একের অপেক্ষায় দ্বিগুণ প্রাপ্তিতে স্বভাবতই মানুষের মন প্রসন্ন হয়। কিন্তু অরুণাক্ষর চিন্তা বেড়েছিল। সীমিত উপার্জনে এতবড় পরিবার প্রতিপালনের ভয় চেপে বসেছিল ওর মনে। কিন্তু প্রথমবার দুটি শিশুকন্যার মুখ দেখে দারুণ মায়ায় জড়িয়ে পড়েছিল সে। এমন মায়ার টান প্রত্যেক জন্মদাতা মাত্রই বোঝে। সেদিন থেকে কোনোপ্রকার দুশ্চিন্তাকে মনে আশ্রয় দেয়নি অরুণাক্ষ। প্রাধান্য দিয়েছে কেবল কঠিন পরিশ্রম আর নিজের কর্মক্ষমতাকে।

এত বছর পরেও প্রতি মুহূর্তে একটা অপরাধবোধ অরুণাক্ষ নিজের মনের ভিতরে বয়ে বেড়ায়। মৃত্তিকা-মিহিকাকে জন্ম দেওয়ার সময় শারীরিক জটিলতার কারণে সঞ্চারিণী প্রায় মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে যায়। মৃত্তিকার ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অসুস্থতার কারণে অরুণাক্ষ তখন দিশেহারা। তিনজন মানুষকে সুস্থভাবে বাড়ি ফেরাতে অরুণাক্ষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সেই আর্থিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। ছাত্র পড়ানোর মাধ্যমে সংসারের হাল ধরেছে সঞ্চারিণীও। তবে এর মাঝে বয়ে গেছে কিছু মধুর সময়। দারুণ আর্থিক অনটনের কারণে মৃত্তিকা-মিহিকার প্রথম অন্ন গ্রহণের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া হয়নি আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে। উদযাপন করা হয়নি পাঁচ বছরের জন্মদিন। অবশেষে সংসারের টালমাটাল অবস্থা সামলে কন্যাদ্বয়ের আট বছরের জন্মদিন মহাসমারোহে পালিত হতে চলেছে। সেই আনন্দে পূর্বদিন রাত থেকে মুখরিত ছোট্ট ফ্ল্যাটের দুটি কামরা।

হই-হই করে কেটে গেল সমস্ত সন্ধ্যা। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সকলেই উৎসব সম্পর্কিত যাবতীয় আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করে ফিরে গেল। অরুণাক্ষর মন তখন কানায়-কানায় পরিপূর্ণ। নতুন জামা জুতো পরে কেক কাটার সময় মৃত্তিকা আর মিহিকার আনন্দ উপচে পড়া দৃষ্টি দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য অরুণাক্ষর দৃষ্টি ঝাপসা হয়েছিল। দুই মেয়ের মাঝে শুয়ে আদর করে ওদের ঘুম পাড়াতে চাইল অরুণাক্ষ। অরুণাক্ষর আদরের ভাগ নিয়ে মৃত্তিকা আর মিহিকার মধ্যে সবসময় এক অদৃশ্য ঠান্ডা লড়াই চলে। বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মিহিকা বলল, "বাবি, তুমি আমাকে বেশি ভালোবাসো তো?"
"না, বাবি আমাকেই বেশি ভালোবাসে। তাই না বাবি?"

দুই মেয়েকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে অরুণাক্ষ বলল, "আমি তোদের দু'জনকেই সমান ভালোবাসি। হ্যাঁ রে, সারা সন্ধ্যা হুড়োহুড়ি করেও তোদের চোখে ঘুম নেই?"
"বাবি আমরা গিফটগুলো কখন দেখব?"
"আজ অনেক রাত হয়ে গেছে। কাল আমি শোরুম থেকে ফিরে সবাই মিলে একসঙ্গে দেখব। এখন তোরা ঘুমিয়ে পড়। কাল স্কুল আছে। রাত জেগে পটর পটর করছিস, সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইবি না। তখন তোদের মা চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলবে। একদম চোখ বন্ধ। আর একটাও কথা নয়।"
"গুড নাইট বাবি!"
"তোমরা দু'জন আর একদম ঝগড়া করবে না। আমি যেন কথার আওয়াজ না পাই। গুড নাইট।"

মেয়েদের ঘরের আলো নিভিয়ে নিজের ঘরে ফিরল অরুণাক্ষ। ব্যস্ত হাতে ঘরের কাজ শেষ করছে সঞ্চারিণী। বিছানার চাদর বদলে ফেলল নিমেষে। সমস্ত সন্ধ্যায় দেহে জড়িয়ে থাকা প্রিয় শাড়িটা ভাঁজ করে ঝুলিয়ে দিল ঘরের দড়িতে। সঞ্চারিণীর মুখ বেশ থমথমে। ঘরের মধ্যে চাপা অস্বস্তি। অন্তত আজকের দিনে এটা অরুণাক্ষ আশা করেনি। অতর্কিতে সঞ্চারিণীকে জড়িয়ে ধরে অরুণাক্ষ বলল, "মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। তোমার অর্ধেক কাজ কমিয়ে দিলাম।"
"ঠিক আছে ছাড়ো। কাজ করছি।"
"কী হয়েছে সঞ্চারী?"
"দিদির কানপাশাটা দেখেছ? এই বছর দিদির জন্মদিনে দাদাভাই ওটা গিফট করেছে। আর আমি? সারা বছর যেটা কানে পরে থাকি, আজকের দিনেও সেটাই পরতে হল। নেহাৎ নিজে টিউশনি করে দু'পয়সা রোজগার করি, তাই একটা দামি শাড়ি পরতে পারলাম। নইলে সারা বছর যেমন শাড়ি পরি, আজও তেমন পরতে হত। মিলি-মেহুর বন্ধুদের মায়েদের সাজ দেখেছ? আমার এত লজ্জা করছিল ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে! তোমাকে পার্টি করতে বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। ভেবেছিলাম আমাকেও একটা ভালো শাড়ি বা একটা দামি গয়না অন্তত কিনে দেবে। সেগুলো পরে সবার সামনে ঘুরে বেড়াতে পারব। সমাজের পাঁচজনের সঙ্গে মিশতে গেলে পাঁচজনের সঙ্গে চলার মতো জিনিস লাগে।
-আমাকে আর একটা বছর সময় দাও সঞ্চারী। আমিও তোমাকে তোমার দিদির চেয়েও ভালো সোনার দুল কিনে দেব। মেয়েদের নতুন স্কুলে এডমিশন, সেশন ফিজ সব মিলিয়ে একটু...
-তুমি কোনোদিনই আমাকে কিছু দিতে পারবে না। সংসারের খরচ তো কমবে না, দিন-দিন বাড়বে। তুমিও আজীবন একই কথা শুনিয়ে যাবে। কী পেলাম আমি এতবড় বাড়ির বউ হয়ে? শখের বয়সে যদি শখ পূরণ করতে না-ই পারি, শেষ বয়সে টাকার বিছানায় শুয়ে কী করব? প্লিজ আমার চোখের সামনে থেকে সরে যাও। তোমার কথা শুনতে আমার একদম ভালো লাগছে না। বাইরে বেরোও। আমি ঘর ঝাঁট দেব। সকালে রেখা এসে এত কাজ করবে না। ঝড়ের বেগে ঘর মুছে বেরিয়ে যাবে। কী হল বেরোও!

ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দাটা অরুণাক্ষর একাকীত্বের সঙ্গী। ওখানে দাঁড়িয়ে কেটে গেল দীর্ঘ সময়। মৃত্তিকা-মিহিকা ঘুমিয়ে পড়ল। ঘর পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে অরুণাক্ষকে কেউ ডাক দিল না। অরুণাক্ষও সে রাতে ঘরে ফিরল না। ছেলে হিসেবে, দাদা হিসেবে অরুণাক্ষ ব্যর্থ। আজ স্বামী হিসেবেও ব্যর্থ হল বুঝি! এক জীবনে কি এত ব্যর্থতার ভার বহন করা সহজ? না বোধহয়...

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০২৪

দূরের পাখি দ্বিতীয় পর্ব


 


দূরের পাখি

সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব



মুঠোফোনের দিকে চেয়ে হেমাঙ্গিনীর দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে। রিও প্রয়োজন ছাড়া মাকে ফোন করে না। হিসেব মিলিয়ে নেওয়ার জন্য সপ্তাহে বার দুয়েক দোকান থেকে ডাক আসে। এ ছাড়া হেমাঙ্গিনীর জীবনে তেমন ব্যস্ততা নেই।

ওর দিনের সিংহভাগ সময় কাটে বাতাসীর সঙ্গে গল্প করে, বারান্দার ঝুলন্ত টবে বসবাসকারী গাছগুলোতে জল দিয়ে আর ল্যাপটপে ঠুকঠাক করে।

হেমাঙ্গিনী পেশাগতভাবে শব্দশ্রমিক। এই পেশা ওর দায়বদ্ধতা নয়। এই ক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত অর্থের বিনিময়ে গ্যাসে হাঁড়ি চড়ে না। এ নেহাৎই নেশা। তবে স্কুল-কলেজে শব্দ নিয়ে নাড়াচাড়া করে ম্যাগাজিন বা পত্রিকায় দু-চারপাতা লেখার শখ যে এভাবে ওকে মুক্তির পথ দেখাবে, তা হেমাঙ্গিনী কস্মিনকালেও চিন্তা করেনি।

ফ্ল্যাটে উঠে আসার পর হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে প্রতিবেশীদের আলাপ হয়েছিল বটে, তবে সেই আলাপ অন্তরঙ্গতার পর্যায়ে পৌঁছয়নি। তবে আলাপ হওয়ার কিছুদিন পর হেমাঙ্গিনী বুঝেছিল, মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলার চেয়ে মনের কথা মনে জমিয়ে লিখে ফেলা ভালো। মানুষের সুসময় কিংবা দুঃসময় তিথি-নক্ষত্র মেনে আসে না। সময়ের পরিবর্তন কেবল কথার কথা। আসলে সময় নয়, মানুষ বদলায়। আর বড় দ্রুত বদলায়। যন্ত্র বিকল হলে তাকে সারিয়ে তোলা যায়। কিন্তু মানুষ বদলে গেলে তাকে জীবন থেকে সরিয়ে ফেলা ছাড়া দ্বিতীয় পথ থাকে না।

ঘড়িতে দুপুর দুটো। বারান্দায় দুটো নাইটি আলগা বাতাসে দুলছে। বাতাসী বিকেলে আসবে না। হেমাঙ্গিনীর বিছানা ছেড়ে ওঠার তাড়া নেই। দুপুরের ভাতঘুম সেরে ও আড়মোড়া ভাঙার সময় বুঝল, গায়ে বেশ জ্বর। আনমনে হেসে জানালার ভারী পর্দা টেনে দিল সে। আধো অন্ধকারে ফিকে হল আলো। চোখ বন্ধ করল হেমাঙ্গিনী।

জ্বর বড় সুন্দর অনুভূতি। মানুষ মানুষকে ছেড়ে যাওয়ার আগে দু'বার ভাবে না। যাওয়ার আগে পিছুটানহীন হওয়ার আশায় সে স্মৃতিটুকুও হজম করে যায়। এ বিষয়ে জ্বরজ্বালা অনেক উদার। ছেড়ে যাওয়ার পর স্মৃতি হিসেবে খানিক দুর্বলতা রেখে যায়।

জ্বরের চেয়ে জ্বর পরবর্তী সময়ে মানুষ বড় কাতর হয়। তখন স্পর্শক্ষুধা তীব্র হয়ে ওঠে। এখন সেই দুর্বলতায় কাতর হয়েছে হেমাঙ্গিনী। মনের ভিতর কেমন যেন করে। একাকীত্বের উষ্ণতা বুক ভেদ করে ত্বক ছুঁয়েছে। অজান্তেই নিজের কপালে হাত দিয়ে হেমাঙ্গিনী দেখল, দেহ শীতল।

এ সবই মনগড়া মিথ্যে অসুখ। ওর মনের ভিতর যে মন আছে, সেই মনে ধ্রুবর বাস। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে জুঁইফুলের মালা আনতে গিয়ে ধ্রুব জ্বর বাধিয়ে বসে আছে। ধ্রুবর জ্বর হলে সেই উষ্ণতা হেমাঙ্গিনীকে স্পর্শ করবে না? তা আবার হয় নাকি?

জ্বরের ঘোরে ধ্রুব পড়ে রয়েছে বিছানায়। জুঁইফুল তার সৌন্দর্য এবং সৌরভ হারিয়েছে। ব্যস্ত পাখি জলপট্টি দিতে ব্যস্ত। পাখির ডানার আড়ালে আত্মগোপন করতে চাইল জ্বরতপ্ত ধ্রুব। অনিদ্রার কারণে পাখির চোখের কোলে গভীর কালি পড়েছে। রুগ্ন ধ্রুবর ভগ্নস্বাস্থ্য উদ্ধারকার্য হেতু পাখি নিজে হয়েছে শীর্ণকায়া। পাখির মলিন মুখ দেখে ধ্রুবর কষ্ট হয়। পাখিকে কষে শাস্তি দেওয়া হল বটে! কিন্তু এমন শাস্তির কথা ধ্রুব ভাবেনি।

রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির সুবাস আসছে। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। এমন বৃষ্টিতে কাদায় মাখামাখি হয়ে কাঁচা পথ বেয়ে পাখির হাত ধরে হেঁটে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ও কি রাজি হবে? জ্বর গায়ে বাইরে যেতে দেবে? একটা ছাতার নীচে দু'জনে ভিজে জবজবে হয়ে গেলে কেমন হয়? সেই সময় যদি কাকভেজা ধ্রুব ঠোঁট রাখতে চায় পাখির তীক্ষ্ণ ঠোঁটে? ও কি বিরক্তি আর ক্ষোভমিশ্রিত দৃষ্টিতে চেয়ে ধ্রুবকে ভস্ম করে দেবে? প্রবল আপত্তিতে নিজের ঠোঁট ছিনিয়ে নেবে ধ্রুবর ঠোঁটের ভিতর থেকে? ফিরিয়ে দেবে ধ্রুবর কামনাকে?

পাখি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও। তুমি বিরক্ত হও। কুকথা বলো। আমাকে শাসন করো। মনের যত ক্ষোভ আছে, যত নীরব অভিমান.... সব উগড়ে দাও নিমেষে। আমি তোমাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম। এ আমার গর্হিত অপরাধ। তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না।

পাখি তুমি পাখি হয়ে ডানা মেলে উড়ে যাও দিগন্তে। সংসার নামক খাঁচা তোমার জন্য নয়। আমি যেদিন মুক্তি পেয়ে আকাশ হবো, তুমি সেদিন পাখি হয়ে ডানা ঝটপটিয়ে ফিরে-ফিরে এসো আমার কাছে...

জ্বরের ঘোর আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরে ধ্রুবকে। গোঙানির শব্দ বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে পাখির কানে পৌঁছয় না। সমস্ত অন্ধকার কেন্দ্রীভূত হয়ে একটা উজ্জ্বল আলোর বিন্দু তৈরি হয়েছে। এ কি কেবলই দুর্যোগ? নাকি দৈবযোগ? প্রসন্ন হল পাখি? আমার পাখি! কেমন আছ পাখি? আমি প্রলাপ বকছি না। পৃথিবী ধ্বংসের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই।

ও কি লণ্ঠনের আলো? রান্নাঘর থেকে সে এসে বসেছে শয্যাপ্রান্তে? একটানা কান্নার সুর ভেসে আসছে দূর থেকে। কে কাঁদে? এ তো পাখির কান্না নয়। তবে কি চেনা গানের সুর? বৃষ্টির জলতরঙ্গ?

চেতনার অতলে ঝাঁপ দিচ্ছে স্মৃতি। সুরেলা কণ্ঠে পাখি গান ধরেছে। পাখির পা দুটো আঁকড়ে ধরতে চাইল ধ্রুব। ওর পায়ে ঠোঁট ছুঁয়ে দেবে। চুমু খাবে। এ ছাড়া ক্ষমাপ্রার্থনা করার দ্বিতীয় কোনও ভাষা ধ্রুবর জানা নেই।

বৃষ্টির বেগ বেড়ে যায়। ঘনায়মান অন্ধকার রহস্যময়ীর মতো গাঢ় হয়। আমগাছের ডালে আটকে থাকা স্বপ্নঘুড়ি ছিঁড়েখুঁড়ে শেষ হয়ে যায়। ধ্রুব আকুল হয়ে ডাকে, "পাখি.... আমি কেন তোমার মতো নিষ্ঠুর হতে পারলাম না!"

আমি পা মেপে বৃষ্টিসিক্ত পথে হাঁটব না। আমি বৃষ্টির জল চেখে দেখব না। সর্বক্ষণ তোমাকে শাস্তি দিতে চাইব না। তোমার অবাধ্য হবো না...

ধ্রুবর পাঁজরভাঙা আর্তি কেউ শুনল না। লাবণ্যহীন সম্পর্কের ধ্বংসস্তূপে নির্মিত স্যাঁতসেঁতে একটা ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চৌপায়াতে একলা শুয়ে রয়েছে সে। সঙ্গী তার শুকনো জুঁইফুলের মালা, নিকোটিন আর তিনদিনের বাসি পাঁউরুটি। যে পাঁউরুটির ভাগ নিয়ে আরশোলার সঙ্গে চলে ধ্রুবর নিত্য বচসা। জানালায় দিন-রাত্রি নিয়ম মেনে কড়া নাড়ে। দেওয়ালের ছায়াগুলো দীর্ঘতর হতে হতে প্রেতাত্মার মতো বাতাসে মিলিয়ে যায়।

ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল হেমাঙ্গিনীর। মাথার মধ্যে ও বয়ে বেড়ায় ধ্রুবর আস্ত সংসার। তার ওজন নেহাৎ কম নয়। মাথাটা ভারী হয়ে আসে। বিনবিনে ঘাম জমে চোখের কোলে। ফোনের রিংটোন আর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের যাতায়াত জানান দেয় কল্পনা ছাড়াও বাস্তবে হেমাঙ্গিনীর অস্তিত্ব আছে। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে। অর্থ, যশ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আছে। নাড়িছেঁড়া ধন রিও আছে। আর আছে প্রাক্তন স্ত্রীর তকমা।

দেবতনু...

বৃষ্টি আসে। বৃষ্টি যায়। রাস্তায় জল জমে কাদায় মাখামাখি হয় পাড়ার কুকুরটা। কেঁউ কেঁউ শব্দে ডেকে উঠলেও বৃষ্টিতে ভিজে হয়ে কেউ ওকে কোলে তুলে নেয় না। ভিজে পাঞ্জাবি আড়াল করে বুকে লুকিয়ে প্রেমিকার কাছে এসে বলে না, "আমার জন্য নয় হেম। এই অবলা প্রাণীটার জন্য এসেছি। ওকে তোমার কাছে রাখবে?"

হেমাঙ্গিনীর ঘরের দেওয়ালে কুকুরটার ছায়া দীর্ঘতর হয়। লালা ঝরে ওর জিভ থেকে। বাঙ্ময় দৃষ্টিতে জিঘাংসা! উফ! কী বীভৎস তার অভিযোগ জানাবার ভঙ্গি। অন্ধকারে নিমজ্জিত অদৃশ্য প্রাণীটা রাগে গরগর করছে। হেমাঙ্গিনীর কপালের কাছে ঝিকমিক করে জ্বলে উঠল শ্বদন্ত।

ফোন বেজে গেল। হেমাঙ্গিনী চোখ মেলল না। ভিজে চোখ মুছল না। আজ বাতাসী আসবে না। হেমাঙ্গিনীর কোনও ব্যস্ততা নেই। সঙ্গীহীন এ জগৎসংসারে হেমাঙ্গিনীর প্রয়োজন নেই।

গোঁ গোঁ করে চিৎকার করতে চাইল হেমাঙ্গিনী। বাতাসী ঘরে থাকলে কেঁদে বলত, "দিদিকে বোবায় ধরেছে গো..."

আসমুদ্রহিমাচল থরথর করে কেঁপে উঠত বাতাসীর আর্তনাদে। বাতাসী! হেমাঙ্গিনীর একমাত্র আপনার জন। জন্ম-জন্মান্তরের সই।

হেমাঙ্গিনীর বুক ধড়ফড় করে ওঠে অব্যক্ত কান্নায়। আশ্রয়ের সন্ধানে। মানুষ তুমি মানুষকে দয়া করো! মানুষ তুমি মুক্তি দাও! ভিক্ষা চাই তোমার অনুকম্পা! মানুষ তুমি করুণা করে হলেও ভালোবাসো.... আমাকে উচ্ছিষ্ট করো...

নিস্তেজ হয়ে বিছানার সঙ্গে মিশে রইল হেমাঙ্গিনী। ল্যাপটপে ভাবনার মালা গাঁথা হল না। অজস্র শব্দ অস্থির মস্তিষ্কের ইতিউতি ছড়িয়ে গেল। শহীদ হল স্নায়ুযুদ্ধের নিত্য সৈনিক। নিহন্তা হেমাঙ্গিনী।

(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত এবং প্রতীকী

ফ্রেমের বাইরে কেউ অষ্টম পর্ব

  ফ্রেমের বাইরে কেউ সাথী দাস অষ্টম  পর্ব                                                                     ।। লাস্ট আপলোড ।।  অনেক কাঠখড় প...

পপুলার পোস্ট