ফ্রেমের বাইরে কেউ
সাথী দাস
দ্বিতীয় পর্ব
।। অ্যালগরিদমের অভিশাপ ।।
অবন্তীর দৃঢ় বিশ্বাস, পৃথিবী কেবল সংখ্যায় চলে। ভিউজ, রিয়াকশন, রিচ এই তিন দেবতার কাছে ওর যত প্রার্থনা। প্রতিদিন অবন্তীর সকাল শুরু হয় ট্রেন্ডিং সাউন্ড দিয়ে। রাত শেষ হয় অ্যানালিটিক্স দেখে। কোন সময় পোস্ট করলে বেশি এনগেজমেন্ট, বেশি কৌতূহল, মাত্রাতিরিক্ত বিতর্ক, কোন কনটেন্টে মানুষ ভয় পায়, সবকিছু অবন্তীর নখদর্পণে।
অবন্তী ঠিক করেছিল আগামী কিছুদিন এই শুট, এডিটিং, আপলোড.... এসব শব্দের মোহ থেকে একটু দূরে থাকবে। নিজের জন্য বাঁচবে। কিন্তু সেই রাতে এমন কিছু ঘটল, আধো ঘুমের মধ্যেও সূক্ষ্মভাবে জেগে উঠল অবন্তীর অবচেতন মন। স্বপ্নের মধ্যে সে খুঁজে পেল নতুন কন্টেন্ট। এক নতুন রকমের খেলা। যা আগে কেউ খেলেনি।
ভোরবেলা ঘুমটা ভেঙে গেছে। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়! এভাবেও তো সাজানো যেতে পারে স্ক্রিপ্ট! অবন্তীর মাথায় এলোমেলো অনেক ভাবনা চলছে। সেই সঙ্গে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে। ও চুপ করে বিছানায় পড়ে রয়েছে অনেকক্ষণ।
ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করা হল না। তড়িঘড়ি উঠে বসে অবন্তী নিজের নোটপ্যাডে লিখে ফেলল একগুচ্ছ শব্দ। যার শেষ বাক্যে লেখা হল, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম শুধু কনটেন্ট দেখে না, শেখে না। সে মানুষও শিখে ফেলে।
সমস্ত দিন স্নান খাওয়া ঘুম নেই। একনাগাড়ে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে রইল অবন্তী। রাতে ও একটা নতুন ভিডিও আপলোড করল। একেবারে ভিন্নধর্মী, যা আগে কেউ করেনি। ভিডিওর লোকেশন, তার নিজের ফ্ল্যাট। ক্যাপশনে লিখল, আজকের ম্যানিফেস্টিশন, তুমি তাকে দেখলে সে তোমাকেও দেখবে।
স্ক্রিনে অবন্তীর হাসিমুখ। কখনও কখনও তার চোখে-মুখে বেশ রহস্যের ছোঁয়া। ঢিমে তালে কথা বলছে সে। তুমি কি কখনও অনুভব করেছ, কেউ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে? তুমি সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছ, কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছ না। তুমি কি তার দিকে চাইতে ভয় পাচ্ছ? মনে হচ্ছে, তুমি তাকে দেখলে, সে-ও তোমাকেই দেখবে!
সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে করতে তুমি ভাবো সবই কনটেন্ট, সবটা অভিনয়। কিন্তু কিছু অদ্ভুত জিনিস আছে, যেগুলো স্ক্রিনের ভিতর বন্দি থাকে না। মিশে যায় তোমার সঙ্গে। তোমার মননে। তোমার মস্তিষ্কে।
তুমি যখন চোখ মেলে ফোনের দিকে তাকাও, ও তখন জেগে ওঠে। তুমি যখন ফোনের ওপর আঙুল থামিয়ে দাও, ও তখন আরও কাছে এগিয়ে আসে। আমার এই ভিডিওটা দেখার সময় তুমি হয়তো ঘরে একা রয়েছ। কিন্তু তুমি কি নিশ্চিত? তুমি একা?
ঘরের ওই অন্ধকার কোণটা, স্ক্রিনের প্রতিফলনটা, চোখের কোণ দিয়ে দেখা ছায়াটা, ওগুলো কি সত্যিই কিছু না?
ভয় একদিনে আসে না, ভয় হঠাৎ আসে না। ভয়টা আসে ধীরে ধীরে। ঠিক আমার এই কথার মতো, তুমি তাকে দেখলে…. সে তোমাকে দেখবেই।
এখন আমায় বলো, এই ভিডিওটা দেখার পর তুমি কি আর আগের মতো স্ক্রিনের দিকে চাইতে পারবে? ঠিক আগের মতোই কি তুমি আত্মবিশ্বাসী, যে তুমি একা!
যদি মনে হয় কিছু একটা ঠিক নেই, কিছু একটা অনুভব করেছ, কিংবা এই ভিডিওটা দেখার পর তোমার আশেপাশে কিছু বদলে গেল, তবে কমেন্টে লিখে যাও, আমি দেখছি। আমি বুঝতে পারছি। আর যদি মনে হয় তুমি একা নও, তা হলে লাইক দাও। আমিও দেখি, কে কে এখন চেয়ে রয়েছ এই স্ক্রিনের দিকে! কোথা থেকে দেখছ এই ভিডিও!
ভুলে যেও না, তুমি তাকে দেখলে সে তোমাকেও দেখবে। এটা শুধু ম্যানিফেস্টিশন নয়, ফ্যাক্ট! যা আমি আজ ভোরের স্বপ্নে দেখেছি। আমাদের চারপাশে অদৃশ্যভাবে কিছু একটা সব সময় বিচরণ করছে, যা আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে...
ভিডিও আপলোড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নোটিফিকেশনের বন্যা। ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নিল অবন্তী। রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। ব্যাগ গোছাতে হবে। কিছু খাওয়া দরকার। পেটের মধ্যে বিড়াল ইঁদুর খুঁজে না পেয়ে সশব্দ আলোড়ন সৃষ্টি করছে।
প্রত্যেকবারের মতো এ বারও স্বাভাবিক গতিতে ভিডিওর ভিউজ বাড়তে থাকে। দশ হাজার। পঞ্চাশ হাজার। এক লাখ। মন্তব্য বিভাগ ভরে যায় হাততালিতে, ব্যতিক্রমী মন্তব্যে কিংবা গালাগালিতে। সে হোক। অবন্তীর কাছে এক-একটা মন্তব্য শুধুমাত্র এনগেজমেন্ট। সেই মন্তব্যে ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষ লুকিয়ে থাকলে ওর ভারী বয়েই গেল।
খুব অদ্ভুতভাবে সে রাতে শত-শত মন্তব্যের ভিড়ে ভেসে উঠল একটা মন্তব্য। অবন্তী তখন কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে শুনতে রান্নাঘরে ব্যস্ত রয়েছে। একটা মন্তব্য জেগে উঠল অবন্তীর ভিডিওর মন্তব্য বিভাগে। "তুমি এখন তাকে দেখছ না, তবুও সে তোমাকেই দেখছে।”
সেই রাতেই ঘটল প্রথম ঘটনাটা। বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে নিতে বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে। সব গুছিয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছিল অবন্তী। ভিডিও নিয়ে তেমন মাথাব্যথা ওর ছিল না। অবন্তী কী করেছে, কেন করেছে, তার স্পষ্ট ধারণা ওর নিজেরও নেই।
একটা এলোমেলো স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। সেই স্বপ্ন যতটা মনে ছিল, তার থেকে খানিকটা খামচে খানিকটা মনগড়া শব্দ দিয়ে যা ইচ্ছে তাই বলে দিয়েছে। দিন দুয়েক কোনও ভিডিও আপলোড করা হবে না। এসব হাবিজাবি চলুক। একেবারে ফাঁকা মস্তিষ্কে উৎফুল্ল মনে ঘুমিয়ে পড়েছিল অবন্তী।
ঘুমের মধ্যে অবন্তী বুঝতে পারল, ওর ফোনটা তীব্রভাবে কাঁপছে। চোখ খুলে দেখে, স্ক্রিনে লাইভ চলছে। ওরই অ্যাকাউন্ট থেকে। কিন্তু অবন্তী তো কোনও লাইভ শুরু করেনি। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে তারই ঘর, বিশাল পর্দা। আলো নিভু নিভু। ক্যামেরার ফ্রেম ধীরে ধীরে অবন্তীর দিকে এগোচ্ছে। সামান্য রাতপোশাক অবন্তীর পরনে। ফোন উল্টে রেখে গায়ে চাদর জড়িয়ে কোনওরকমে লাইভটা বন্ধ করল অবন্তী। ওর শরীরটা কেঁপে উঠছে ভয়ে।
গায়ে পোশাক চাপিয়ে ফোন সোজা করে অবন্তী দেখল, ওর ঘরের ছাদ দেখা যাচ্ছে। ওর পাশাপাশি আরও একজন ঢুকে পড়েছে স্ক্রিনে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু কণ্ঠ ভেসে বেড়াচ্ছে।
“অবন্তী, তুমি নিজেকে বুঝিয়েছিলে, মানুষ শখে ভয় পেতে ভালোবাসে। আমি তোমার সেই ভয় অবন্তী। তুমি আমাকেই ম্যানিফেস্ট করেছিলে। আমি তোমার সেট করা নতুন অ্যালগরিদম। ভয়।"
হঠাৎ লাইভ বন্ধ। লাফিয়ে ঘরের আলো জ্বেলে দিল অবন্তী। নিজের অ্যাকাউন্ট তন্নতন্ন করে খুঁজেও রেকর্ডেড লাইভটা ও খুঁজে পেল না। অবন্তীর শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল একটা শিরশিরে অনুভূতি।
পরদিন অবন্তীর আগের পোস্টগুলো নিজে থেকেই কেমন যেন বদলে যেতে লাগল। আগের হাসির ভিডিওতে গা শিউরে ওঠা মিউজিক। মেকআপ রিলে অবন্তীর পিছনে অচেনা ঝাপসা ছায়া। আগের সমস্ত ভিডিওগুলো কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চলতে শুরু করেছে। কমেন্ট সেকশনে সকলে লিখছে, "তোমার পেছনে কে দাঁড়িয়ে অবন্তী?" "তোমার চোখ দুটো এমন ঘোলাটে কেন?"
অবন্তী ভিডিওগুলো মুছে ফেলতে চাইল, পারল না। অনেক ভিউজ ধারণ করে রয়েছে ভিডিওগুলো। এভাবে হঠাৎ মুছে দিলে ধস নামবে প্রোফাইলে। অ্যাকাউন্ট সেটিংসে গিয়ে অনলি মি করতে চাইল অবন্তী। সম্ভব হল না। টাকার নেশা বড় মারাত্মক। ড্যাশবোর্ডে বিছিয়ে যাচ্ছে সবুজ গালিচা। ডলারের সংখ্যাটা তরতরিয়ে চড়ছে.... এবার একটা গাড়ি কেনা আটকায় কে!
ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে। এসব উল্টোপাল্টা ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এবার বেরিয়ে পড়ার পালা। আয়নায় তাকিয়ে অবন্তী চমকে উঠল। আয়নায় তার ছায়া একটু যেন দেরিতে নড়ছে। তাই কি!
ফোন বেজে উঠল। নতুন নোটিফিকেশন। "Your content performance is improving."
অবন্তীর মনের ভিতর থেকে নারীকণ্ঠ ফিসফিস করে বলল, "ভয় না পেলে তারা তোমায় দেখবে কেন? এই পথেই হাঁটতে হবে। এটাই সঠিক পথ।"
অবন্তী মনের আনন্দে ট্রেনে চেপে বসল। ওর নতুন ভিডিও ট্রেন্ডিংয়ে যাচ্ছে। আর চিন্তা নেই। সামনের মাসেই গাড়ি কিনে ফেলা যাবে। তবে একটা জিনিস অবন্তীর দর্শকরা জানে, কিন্তু অবন্তী জানে না।
ওর শেষ আপলোড করা ভিডিওতে অবন্তী আর নেই। রয়েছে তার ঘর। তার বিছানা। আর আয়নার সামনে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকা অবন্তীর মতোই কেউ একজন। এটাই নতুন অ্যালগরিদম।
অ্যালগরিদম শুধু কনটেন্ট শেখে না। সে মানুষও শিখে ফেলে। তারপর একদিন আস্ত মানুষকে গিলে খায়।
(চলবে...)
ছবি : সংগৃহীত

